ভবঘুরে, রং আর ক্যানভাসের গল্প

প্রথম পর্বঃ ভবঘুরের দিনলিপি

সন্ধ্যা ৭টা বেজে ১২ মিনিট, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৫।
খুলনা রেলওয়ে জংশন।

টয়লেট থেকে বের হয়ে থমকে গেল নরেন। হারামজাদা স্যামুয়েল দাঁত কেলাচ্ছে। গা জ্বলে গেল নরেনের। পেটের যন্ত্রণায় আর বারবার টয়লেটে যাওয়ার ঝামেলায় ওর নিজের লেজে গোবরে অবস্থা, আর এই ব্যাটা এতে মজা পাচ্ছে। অবশ্য ওর মজা পাওয়ার যথেষ্টই কারণ আছে। এই দেশের খাবারে কোন সমস্যা হয়নি স্যামের। জার্মান হয়েও ঠিক থাকা আর আপাদমস্তক বাঙ্গাল হয়েও নরেনের বদনা হাতে দৌড়াদৌড়ি করা বিনোদনের কারণ হবার জন্য যথেষ্ট। গত দুই সপ্তাহে সমস্যা হয়নি, কিন্তু শেষের দিকে এসে তেলে ভাজা ডালপুরি দেখে আর লোভ সামলাতে পারেনি নরেন। কিন্তু পুরি তো স্যামও খেল, ইউরোপিয়ান পেটে বাঙ্গাল ভাইরাস কিছু করতে পারছে না? সম্ভবত অপরিচিত জার্মান অন্ত্রে কোন ঝামেলা পাকাতে ভয় পাচ্ছে এডেনো, ক্যালসি আর তরো ভাইরাসবৃন্দ। অথবা ভাষা না বুঝে আউলা হয়ে গেছে। আর নরেনের পেটের বেলায় পিকনিক – পেয়েছি মামা, বহুদিন দেখি এই বাড়িতে কেউ আসেনি! দৌড়া ব্যাটা এবার, বদনা হাতে দৌড়া!

স্যামুয়েলের হাসিটাও অবশ্য কেলানো-টাইপের, মেজাজ বেশিক্ষণ খারাপ করে রাখা যায় না। কিন্তু এখন পেটের ব্যাথায় ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, বদমাইশটাকে কষে চড় লাগাতে পারলে কাজ হত। শালাকে নিয়ে আসাটাই ভুল হয়েছে, গোদের ওপর বিষফোঁড়া। খাইয়ে দাও, জামার বোতাম লাগাতে হবে, হিসু পেয়েছে – বেল্ট খুলে দাও; আছেই একের পর এক হুকুম। করতে সমস্যা নেই নরেনের, স্যামুয়েলের দুটো হাতই অচল – জন্মের পর থেকেই অচল সেরেব্রাল প্যালসির কারণে। “বুঝলি নরেন, কাঁদতে ভুলে গিয়েছিলাম জন্মের পরে, কেলাচ্ছিলাম তখনো। হা হা হা। দশ মিনিট ধরে নার্স পিটিয়ে যখন আমার হাগু বের করে আধ মরা করে ফেলল, তখন চিন্তা করলাম – বললেই ত হয় যে কান্নাকাটি করা লাগবে! আমি ত নার্সকে দেখতে ব্যাস্ত! হা হা হা।” “ডাক্তার ছিলা না? নার্স কেন?” অধৈর্য নরেনের প্রশ্ন। “আরে আমি থার্টি ফার্স্ট নাইটে জন্মালাম পার্টি করা লাগবে বলে। কিন্তু পার্টি মুডে বের হয়ে কানতে ভুলে গেছি আর আশেপাশে ডাক্তারও ছিলা না মনে করিয়ে দেয়ার জন্য, ঐ ব্যাটা নিজেই গেছে পার্টিতে।”

সেই দশ মিনিটে মরে গেছে মস্তিষ্কের বেশ কিছু মোটর নিউরোন, যাদের দিয়ে হাত নাড়ানোর মত জটিল কাজ করা যায়। দুটো হাত, দশটি আঙ্গুল – সবই আছে ঠিকঠাক মত। নেই শুধু ওদেরকে এক সুতোয় বেঁধে রাখার মত কিছু নিউরোন। আবার অধৈর্য নরেন টেনে স্যামুয়েলের আঙ্গুলগুলো সোজা করবার চেষ্টা করেছিল। “তুই কি মনে করেছিস যে এই চেষ্টা আমি করিনি গত পঁচিশ বছরেও?” নির্বাক মুহুর্তে বোধোদয় হয়েছে নরেনের – প্রতিদিন যা কিছু কোন চিন্তা ছাড়াই করে ফেলা যায়, সেটা করতে বহু কসরত করতে হয় স্যামকে। কিন্তু চলছে সেভাবেই – টেনে হিঁচড়ে, পা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে, স্কি করে, লেখাপড়া করে, চুল আঁচড়িয়ে, জুতার ফিতে বেঁধে, পেট পুজো আর বেচে থাকার নিয়মে চলে যাচ্ছে জীবন।

মুশকিল হচ্ছে, স্যামুয়েলের হিউমার লেভেল অন্য পর্যায়ের। প্রথম পর্যায়ে হাসি পায় আর কিছুটা মায়াও লাগেঃ “বুঝলি নরেন, আমি আসলে প্রতিবন্ধী না – ভং ধরে থাকি, গাড়ি পার্কিং-এর সুবিধা নেয়ার জন্য। হি হি হি।” দ্বিতীয় পর্যায়েও হাসি পায়, কিন্তু ভ্রু কুঁচকে যাওয়া স্বাভাবিকঃ “এই যে তোর সাথে ঘুরি-ফিরি, লোকজন আমাদেরকে কিউট কাপল ভাবতেই পারে। হে হে হে।” তৃতীয় পর্যায়ে কান বরাবর থাবড়া বসাতে ইচ্ছে করেঃ “থাম থাম, চল আগে দোকানে যাই। লুজ মোশনে এখন তোর যে অবস্থা, তাতে ডায়াপার কেনা মাস্ট! হা হা হা।” কেবল ড্রাঙ্ক হলে স্যামুয়েলের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। “নরেন, থ্যাঙ্ক ইউ ম্যান। তোর জীবন থেকে বেশ কিছু সময় আমাকে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।” নরেন হেসে বলে, “না রে দোস্ত, আমারই তোকে ধন্যবাদ দেয়া উচিত। এটা নাই, সেটা নাই এর দুনিয়ায় শুধুমাত্র বেঁচে থাকার আনন্দের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।”

নরেন আর স্যামুয়েল বাংলাদেশে এসেছে সপ্তাহ দুয়েক আগে। পড়াশুনার পাট চুকেছে একসাথে, এরপর চাকরী জুটে যাবার পর এই ভ্রমণের সিদ্ধান্ত। কক্সবাজার, সেইন্ট মার্টিন আর ঢাকা ঘুরিয়ে দেখানোর পর এসেছিল সুন্দরবন দেখতে। কিন্তু ট্রেন আসছে না, কখন আসবে – তাও কেউ জানে না। এতে কারও কোন বিকার আছে বলে মনে হচ্ছে না। সবাই গল্প করছে, খাবার কিনছে, এক বাবা আইসক্রিম কিনে দিয়ে মোবাইলে খোঁচাচ্ছে আর শিশুটি অর্ধেক খাওয়া শেষে বাকিটা মনের আনন্দে নিজের চুলে মাখাচ্ছে, আর ওর মা ফেরিওয়ালার সাথে দরদাম-বচসা করছে; যেন ট্রেন না আসলেও কিছু যায় আসে না।

প্রচন্ড মেজাজ খারাপ করে নরেন তেড়েফুড়ে কিছু বলতে যাবে, এইসময় সে প্রথম মেয়েটিকে দেখতে পেল। মাহমুদের সাথে দুষ্টুমি করছে, আর হেসে কুটিকুটি হচ্ছে মেয়েটি; সাথে স্যামুয়েলও যোগ দিচ্ছে। একটু দূরে দাড়িয়ে ওদের কান্ড-কারখানা দেখল নরেন। ওদের সাথে যেয়ে যোগ দিতে চাচ্ছে, কিন্তু বসবার আর জায়গা নেই। মাহমুদকে হিংসে হচ্ছে – কি অবলীলায় এই সুন্দরীর সাথে ভাব জমিয়ে ফেলেছে! ছোট থাকার এই এক সুবিধা – মেয়েদের কাছে ঘেঁষলে কেউ কিচ্ছু বলে না। মেয়েরাও ‘ওমা! কি কিউত!’ বলে গাল টিপে দেয়। হুট করে মাহমুদ এক ছুটে বাইরে গেল, নরেন আর দেরী না করে বসে পড়ল খালি জায়গায়। মেয়েটি ঘুরে মাহমুদের দিকে কিছু বলতে যেয়ে থেমে গেল নরেনের দিকে তাকিয়ে। এই সুযোগ – নরেন ফস করে হাত বাড়িয়ে দিল ভ্যাবাচ্যাগা খাওয়া তরুণীর দিকে।
ঃ হাই !
মেয়েটি আপ্রাণ চেষ্টা করছে সপ্রতিভ থাকার। এক মুহূর্ত দ্বিধা করে হাত বাড়িয়ে দিল।
ঃ হ্যালো !

দ্বিতীয় পর্বঃ রঙের গল্প
… … …

৭১৩ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।