ভবঘুরের গপ্পোঃ দেবশিশু দর্শন

জগৎ সংসারে মায়া দুই প্রকার – অপরাপর মানুষের মায়া এবং তাহার চারপাশের নশ্বর পৃথিবীর কিয়দংশের প্রতি সৃষ্ট মায়া। ব্যক্তি বিশেষের মায়া ছাড়িয়া থাকিলে একাকীত্ব চাপিয়া ধরে, আর পরিপার্শের বস্তুসর্বস্ব নিবাসের প্রতি মায়া উঠিয়া গেলে মানুষ হইয়া যায় ভবঘুরে। কথায় আছে না – এক জায়গায় বেশিদিন থাকিলে মায়া পড়িয়া শেকড় গজাইয়া যায়? আমাদের নরেন বোধহয় এই শেকড়ের ভীতিতে কাবু। নইলে ছোটাছুটি করিবার আর কোন হেতু আছে বলিয়া মনে হইতেছে না।

জীবিকার সন্ধানে আর বাঁচিয়া থাকিবার নিয়ম মানিয়া বিদেশ বিভুঁইয়ে ঘুরিতে থাকা নরেনের নূতন নিবাস সুইডেনের ছোট্ট এক শহরে। ভূগোল বিষয়ে যাহাদের দখল আমার মতই ক-অক্ষর গোমাংস, তাহাদের উদ্দেশ্য করিয়া সদ্য-লব্ধ জ্ঞান কিঞ্চিত জাহির করিয়া লইবার লোভ সংবরণ করিতে পারিতেছি না। এই শহরটি সুইডিশ ভূ-খন্ডের মাঝামাঝি জায়গায়। তবে কাছাকাছি বড় শহর – অসলো, যাহা কিনা প্রতিবেশী দেশ নরওয়ের রাজধানী। নরেন জানিত বঙ্গদেশের মত খাল-বিল আর নদী-নালায় ভরপুর জায়গা আর মিলিবে না। কিন্তু, এই এলাকায় নদী আর বিলের প্রাচুর্য ঈর্ষনীয়। মাছধরা এস্থানের অধিবাসীদের পেশা না হইলেও নেশা তো বটেই। নিকটবর্তী উত্তর গোলার্ধের কল্যাণে পুরো দেশ বছরের ছয় মাস জুড়িয়াই বরফের তলায় পড়িয়া থাকে। আর তাপমাত্রা শূন্যেরও তিরিশ ডিগ্রী নিচে নামিয়া যায়। শীতের নির্মমতায় পুরো এলাকাকেই প্রাণহীন এক ভুতুরে নগর বলিয়া মনে হয়। নিদারুণ ঠান্ডা হাওয়া টানিয়া লইলে বঙ্গসন্তানের ফুসফুস-হৃৎপিন্ড সমেত পুরো বক্ষ জমিয়া যাইবার উপক্রম হয়। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা – আলোক স্বল্পতা। কপাল ভাল থাকিলে দিনে চার-পাঁচ ঘন্টারও কম সময়ের জন্যে সূর্যের আলো পাওয়া যাইতে পারে। কিন্তু বিরামহীন তুষারপাতের কারণে সপ্তাহ জুড়িয়া আলো না পাইলেও অবাক হইবার কিছু নাই। আলোবিহীন পৃথিবী নরেনের নিকট বড়ই বিষন্ন ঠেকে।

বসন্ত আসিলে চারিপাশে প্রাণের সঞ্চার হয়। তুষার গলিয়া জল হইয়া গড়ায়, আর সাথে করিয়া যেন সকল জরা-জীর্নতা ধুইয়া লইয়া যাইতে থাকে। উদ্ভিদকূলের ডগায় সবুজের কূঁড়ি গজাইতে থাকে সবার অলক্ষে। সহসাই এক রোদ ঝলমলে দিনে সবুজের সমারোহ চকচক করিতে থাকে। নাম না জানা ফুলের রং আর গন্ধমাখা বর্নিল পৃথিবীকে স্বর্গ বলিয়া ভ্রম হয়। শীতের বৈরীতা আর রুক্ষতার জন্যেই হয়তোবা বসন্ত এতটা আনন্দদায়ক। লোকজনের আচরণেও উৎফুল্লতা লক্ষ্যনীয়। খাল-বিলের সুকঠিন বরফ গলিয়া গেলে দলে দলে অনেকেই শখের মৎস্যশিকারী হইয়া যায়। নরেন অবাক হইয়া লক্ষ্য করিল – ইহারা কোনরূপ খাবারজাতীয় টোপ ছাড়াই শিকারে নামিয়া পড়িয়াছে। মৎস্যকূল শীতনিন্দ্রা শেষে যারপরনাই ক্ষুধার্ত থাকে। আর তাই প্লাস্টিকের টোপও কামড়াইয়া ধরিতে কুন্ঠাবোধ করে না।

এমনই এক বসন্তের শেষ বিকেলে নরেন কর্মস্থল হইতে ফিরিয়া আরাম কেদারায় হাত-পা ছড়াইয়া বসিয়া আছে। কিঞ্চিত ক্লান্তি, কিঞ্চিত অবসাদ, কিঞ্চিত বিষন্নতা, কিঞ্চিত বিরহ আর হবু গিন্নির গাল ফোলানো, অভিযোগ-মাখানো মায়াময় মুখ – সব মিলিয়া বিক্ষিপ্ত মনে সে কী যেন চিন্তা করিতেছে। এমন সময় দরজায় কড়াঘাতে হতচকিত নরেন – এ অব্দি কেউ তো এমুখি হয়নি! হন্তদন্ত হইয়া দ্বার খুলিয়া নরেন হতবাক হইয়া গেল – দুইটি হাস্যোজ্জ্বল দেবশিশু কয়েকটি ঠোঙ্গা হাতে দাঁড়াইয়া আছে। একজন যেন শ্বেত মর্মর পাথরের তৈরী, মাথায় একরাশ সোনালী চুল; অন্যজন যেন কষ্টী পাথর কুঁদে তৈরী, মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া কালো কোঁকড়া চুল। দুইজনেরই হাসিতে মুক্তো ঝড়িয়া পড়িতেছে। হড়বড় করিয়া তাহারা কিছু একটা কহিল যাহার মর্ম উদ্ধার করা নরেনের পক্ষে সম্ভব হইল না। অল্প এই কয়েক দিনে সুইডিস ভাষার ছিটেফোঁটাও সে রপ্ত করিতে পারে নাই। কোনভাবে এই কথা তাহারা বুঝিয়া দ্বিগুন উৎসাহে মুঠোফোন হাতে যুদ্ধে নামিয়া পড়িল। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় মুহুর্তেই তাহাদের মনের কথা অনূদিত হইয়া গেলঃ

“আমাদের স্কুলের শিক্ষক উদ্বাস্তু শিবিরের শিশুদের সাহায্য করিবার উপায় বাহির করিতে বলিয়াছেন। আমরা দুই বান্ধবী কিছু কেক তৈরী করিয়াছি। তুমি কি কিনিবে? কেক বিক্রয় করিয়া আমরা ঐ শিশুদের সাহায্য করিতে চাই।”

নরেন বজ্রাহত হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল, কি বলিবে তাহা খুঁজিয়া পাইল না। মনুষ্যত্বের সহজ সরলতা আর স্বাভাবিকতা যান্ত্রিক নরেনকে যেন বিকল করিয়া দিয়াছে। ইট, কাঠ আর পাথরের এই নিষ্প্রাণ জঞ্জালের মাঝে থাকিয়া আমরা কেবলই বাঁচিয়া থাকিবার প্রতিযোগীতায় মগ্ন। পেট-পূঁজো আর বাঁচিয়া থাকিবার তাড়ায় ভুলিয়া যাই গন্তব্য – মনুষ্যত্বের স্বাদ আর লওয়া হইয়া ওঠে না। অতীব কষ্টে সাহস সঞ্চয় করিয়া মাথা নাড়াইয়া সম্মতি দিল সে। শিশু দুইটি আনন্দে লাফই দিয়া দিল। কেক লইয়া তাহাদের পাওনা বুঝাইয়া দিলে খুশিমনে অজস্র ধন্যবাদ দিয়া বিদায় লইল। আর নরেন মরমে মরিয়া যাইতে লাগিল – আমি কিনা দেবশিশুদের বাহিরের রংটাই আগে দেখিলাম? তবে সে আশান্বিত হইল নূতন পৃথিবীর সম্ভাবনায় – আমার মত যান্ত্রিক নরেনরা বুড়ো হইয়া অকেজো হইতেছে। আর এই দেবশিশুরা হাত ধরিয়া একত্রে বাড়িয়া উঠিতেছে, উহারা চিনিয়াছে মনুষ্যত্বের রং – উহাদের সবার রক্তের রং লাল। এই পৃথিবী দেবালয়ে পরিণত হইতে আর বেশি দেরী নাই।

১,৫৮৩ বার দেখা হয়েছে

৫ টি মন্তব্য : “ভবঘুরের গপ্পোঃ দেবশিশু দর্শন”

  1. লুৎফুল (৭৮-৮৪)

    এমন আশাবাদে ভবিষ্যত সম্ভাবনার সমস্ত বীজ বপন করেই বর্তমানের ডোবা জলে নিমজ্জিত জীবন করছি হেসেই যাপন।
    এই দেবশিশুরা জগতজুড়ে অমন নিষ্পাপ মানবতার উদ্দীপনায় লাফিয়ে লাফিয়েই বেড়ে উঠিক। বিদ্যমান পংকিল পৃথিবীর তাবত আবর্জনা তাদের স্পর্শ করবার তাকত না পাক।
    সাধুবাদ তোমাকে, এইসব দেবশিশুদেরকে। আশাবাদের ঘুড্ডি উড়তে থাকুক ওপরে আরো ওপরে ...

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।