প্রেম বিষয়ক প্রতিপাদ্য (প্রথম অধ্যায়)

(ডিসক্লেইমার: ডুয়াল পোস্ট নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের কারনে নিজের মাঝে একটা অপরাধবোধ অনুভব করলাম। তারপর একটা পরিসংখ্যান করলাম। আমার চারটি লেখা এখানে আগে দিয়েছি। বাকিগুলো সামুতে আগে দেয়ার অনেকদিন পর এখানে দেয়া হয়েছে। এজন্যে অবশ্য সামুর পাঠক জাতীয় কোন ফ্যাক্টর জড়িত নেই। আমি সামুর দুর্দান্ত অজনপ্রিয় ব্লগার। আমি বাজি রেখে বলতে পারি ২ বছর কোন কমিউনিটি ব্লগে মোটামুটি নিয়মিত থেকে আমার থেকে অজনপ্রিয় হওয়া সম্ভব নয়। মোটামুটি বলছি কারন সামুতে বেশ কয়েকবার দীর্ঘ শীতনিদ্রা আছে। আগে পরের কোন নির্দিষ্ট কারন নেই। মানুষ হিসেবে আমি তুলনারহিত অগোছালো। আমার ব্যাচমেটরা সে ব্যাপারে বলতে পারবে। ব্যাচের দ্বিতীয় সর্বাধিক ইডি(২৯) এবং সর্বোচ্চ বিউগল(৩) সেটাই প্রকাশ করে। যাই হোক এই লেখাটি ধারাবাহিক ভাবে সামুতে প্রকাশ করেছি। প্রথম পর্বটি এখানেও দিয়েছিলাম। কিন্তু বাকিগুলো সামুতে দেয়া হয়েছে কিন্তু এখানে দেয়া হয় নাই। আর লেখাটি অসম্পূর্ন। ব্লগীয় ক্যাচালে সামুতে ব্যান খাবার পর লেখাটা আর শেষ করা হয় নাই। আশা করি এখানে শেষ করতে পারব। আর আলাদা পর্বে ভাগ না করে একসাথে দিলাম। কলেজের পাঙ্গা খাওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে একটা জাম্বো সাইজের পোস্ট প্রসবের নাগরিক/ক্যাডেটিক অধিকার আমি রাখি বলেই মনে কর। আর শেষ দৃশ্যটা সাব্বির(৯৮-০৪ মকক) ভাইয়ের একটা পোস্ট থেকে নেয়া।)

১.

গত দশদিন হতে রফিক প্রেম আর বিষাক্ত চেতনাগত অন্তর্দ্বন্দ্ব নিয়ে একটা চিন্তার আকৃতি খোজার চেষ্টা করছে। চায়ের কাপে হাজার হাজার আন্দোলনের পরেও সেগুলো কেন যেন আকৃতি শুন্য থেকে যাচ্ছে। মুনিম নতুন সেল ফোন কিনে যখন অতিরিক্ত আনন্দে ক্যাম্পাসে আক্ষরিক অর্থেই হাতে হাটা শুরু করেছিল সেদিন রফিক এইসব তদর্থক চিন্তাকে বড়ই ফালতু বলে উড়িয়ে দিয়েছিল।

ভোগবাদ শব্দটি রফিকের সমালোচনার মূল অস্র হলেও সেদিন সে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল ভোগবাদী চিন্তা খুব ফান্ডামেন্টাল। তাকে এই শতকের প্রগতি, সমাজতান্ত্রিক জ্বালাময়ী কবিতা দ্বারা ধামাচাপা দেয়া যায় না। কারন বেশ দামে কেনা সেল ফোন টি রফিককে কোন কারন ছাড়াই আকর্ষণ করেছিল। যা কট্টর প্রগতিবাদী রফিকের জন্যে বেমানান।

প্রেম নিয়ে এইসব উথলানো চিন্তাভাবনার কোন বস্তুগত ব্যাখ্যা দাড় করাতে না পেরে এইসব চিন্তভাবনা কে মিডিয়া,বা পতিত সাংস্ক্বৃতিক অবক্ষয়ের প্যারাসাইট হিসেবে ঊড়িয়ে দিল। সোজা বাংলায় আজাইড়া।

গলি দিয়ে হাটতে হাটতে রফিক এই চিন্তা ভাবনা গুলোকে দূরে নিক্ষেপের চেষ্টা করল। ময়লা রং এর সাড়ি সাড়ি অবিন্যাস্ত বাড়ি। বিভিন্ন উচ্চতার আর বিভিন্নমাত্রার ক্ষত যুক্ত। পলেস্তরা খসে খসে যায়গায় যায়গায় তৈরী হয়েছে রোমান ঐতিহ্যের দেয়াল স্থাপত্য। রফিক বাজী ধরে বলতে পারবে ১৩১ নম্বর বাড়িটার দেয়ালে তৈরী প্রাক্বতিক যাদৃচ্ছিক চিত্রটি রোমান সম্রাট অগাস্টাসের মত হয়েছে। গলির দুপাশে ঢাকনা হীন ড্রেন। থকথকে ময়লার অলস সান্দ্র প্রবাহ। ভনভন করে জানা অজানা পোকাগুলো উড়ছে। একপাশে একপাল অর্ধনগ্ন শিশু ছালচামড়া হীন একটা ফুটবলে লাথি মেরেই যাচ্ছে। পাশে একটা মধ্যবয়সী ফেড়িওয়ালা ক্লান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুন্য চোখে। রফিক তার পাশ দিয়ে যাবার সময় “কুলফি” বলে একটা আনুনাসিক কষ্টচর্চিত শব্দ বের হল তার মুখ দিয়ে। ভীশন অস্বাস্থ্যকর দুই টাকার কুলফি খাবার জন্য রফিকের প্রাণ পুড়ে যাচ্ছিল না। তারপরেও কি মনে করে কুলফি নিল সে।

বাসায় ঢোকার আগে পকেট থেকে বিবর্ণ সেলফোন টা বের করল। বেলা বেশ পড়ে গেছে। সূর্যটা সারাদিন আলো বিইয়ে এখন বুড়োথুত্থুড়ে জটাধারী জ্ঞান তাপসের মত পশ্চিমকাশে রক্ত রঙ ছড়াচ্ছে।

বাসার ভেতরে কলিং বেল টেপার সাথে সাথেই সে শুনল ভেতর থেকে গর্জন শোনা যাচ্ছে। তার মানে উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। রণতড়ী থেকে একের পর এক নেমে আসছে এফ সিক্সটিন। বিস্ফোরনে উড়ে যাচ্ছে শান্তি। রফিক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার শৈশব কৈশর গেছে পারিবারিক চিরন্তন মহাযুদ্ধের মাঝে শ্র্যাপ্নেলে বিদ্ধ হতে হতে। অর্থনৈতিক ঘাটতি নাকি জীবনের একান্ত নিরর্থকতাকে বুড়ো আংগুল দেখানোর উদ্দেশ্যে এই প্রাথ্যহিক থিয়েটারে তার বাবা মা অংশ নেয় রফিক বুজে উঠতে পারে না।

বাসায় রফিকের চলাফেরা অনেকটাই অনুপ্রবেশ কারীর মত। নিজের উপস্তথিতি এই পারিবারিক হিংসা আর গোলাবারুদের অপার সৌরভের গ্যাস চেম্বারে অনেকটাই রফিককে মানসিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগায়। তাই সর্পচলনে অভ্যস্ত হয়াটাকেই রফিক সর্বোত্তম ডিফেন্স মেকানিজম মনে করে। রিশাদ প্রায়ই বলে বুদ্ধিস্ট ফিলোসফির কন্টেম্পোরারি ভার্সন নির্বান লাভের উপযুক্ত উপায়,”keeping low profile”

রফিকের রুমের সিলিং ফ্যানটা ঘুরছেই, হাল্কা ঘট ঘট শব্দ। বাতাস উতপাদনের হার অত্যন্ত সীমিত। সুতরাং সিলিং ফ্যান্টার অস্তিত্ব কেমন যেন গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মত অর্থহীন। রফিকের চিন্তা আবার গ্রেনেডে মরা ভিয়েতনামিজ বিপ্লবীর বিচ্ছিন্ন লাশের মত ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে লাগল। প্রেম কি জানা হঠাত এত জরুরী হয়ে গেল কেন? প্রাকৃতিক নির্বাচন আর মিউটেশন জনিত তত্বের মাঝে এইসব অসংজ্ঞায়িত মানসিক অভিক্রীয়া রফিককে খুব জ্বালাতন করতে লাগল। যাকে ডিফাইন করা যায় না তাকে কিভাবে বোঝা সম্ভব? বুড়ো দাদু ডারউইন কি যথেষ্ঠ ছিল না? প্লেটোনিক তত্বের পুর্জাগরন কেন দরকার। রফিকের মাথার চারপাশে এলিয়টের কবিতার ফাকে ফাকে ফ্রয়েড আর হ্যাভল্ক এলিস রা ঘোরাঘুরি করতে লাগল। ভীষন বিতৃষ্ণা নিয়ে কখন যেন রফিকের স্নায়ু অবশ হয়ে আসল, এবং উপরের ফ্যান্টা পারিবারিক মহাযুদ্ধের আবহ সংগীত তৈরী করতে লাগল।

২.

“তোর মেটামরফসিস হচ্ছে”
চিন্তাযুক্ত একটা ঢং এর পশ্চাদপটে বিস্ফোরক হাসির উতস লুকিয়ে রেখে বলল রিশাদ। মুখের পেশীগুলো ব্যাপক বিনোদনের সাথে টানছে তার কনফুসিয়স মার্কা চেহারাটাকে পাল্টে টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনের মডেল বানিয়ে দিতে।
রফিক বিরক্ত হয়ে জানতে চাইল
“কেন বলতেছিস?”
“তুই সাধারনত দীর্ঘসময় দার্শনিক থাকিস না, দার্শনিকতা হুট করে তোর মাঝে আসে আর চলে যায়। এবার মনে হয় ভীষনতর কিছুতে পেয়েছে তোকে। তোর চেহারাও সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মত হয়ে যাচ্ছে।”
রফিক সিগমুন্ড ফ্রয়েড শব্দটাতে রিশাদের অনাবশ্যক জোড় দেয়াতে ক্ষীপ্রতার সাথে তার চোখ গুলো হেটে যাওয়া একজন আবেদনময়ীর গজেন্দ্রগমন থেকে সরিয়ে কর্কশ কন্ঠে বলে উঠল
“বালের কথা বলবি না। এমনেতেই ভাল্লাগতেছে না, তার উপর আইছস কাটাছেড়া করতে। আর প্রমথ চৌধুরীর ভাষা ফলাইতেছস ক্যান, মাটির মানুষ ,ময়লার মত কথা বলবি”
বলতে বলতে আড় চোখে গজগামিনীকে আরেকবার দেখে নিল রফিক। সর্বজনীন পেন্ডুলামের মত দুলছে সুডৌল নিতম্ব, শতাব্দীজুড়ে জমা জ্ঞান, বিজ্ঞান সব কি নিদারুন অর্থহীন এই দৃশ্যের কাছে। মানব সমাজের মুখোশ আর আধ্যাত্নিক গালগল্পের বাগাড়ম্বরের এনসাইক্লোপিডিয়ার কথা ভেবে হেসে ফেলল রফিক।
পাশে তাকিয়ে দেখল রিশাদ কখন যেন উঠে গেছে। ক্যাফের পাশে সবুজ ঘাসে মিলির সাথে বসে আছে।
“ধুর”
মুখটা তেতো বানিয়ে ভাবতে লাগল এই পৃথিবীর অগ্রগতি কিভাবে মেয়েমানুষের আচলের ভাজে যুগের যুগ আটকে গেছে। মানুষ কিভাবে আটকে গেছে এই অসংজ্ঞায়িত অনুভুতির অচেনা চোরাবালিতে। এককালে রিশাদ গলার রগ ফুলিয়ে রিসেশনের বিশ্লেষন করত, বাজারের ক্ষুধা আর কর্পোরেট ফটকাবাজির যাত্রাপালায় নি:স্ব মানুষের কথা বলতে বলতে ওর চোখে জমা হত আজন্ম ক্রোধ। পুজিবাজারের দানব এর উতপত্তি এবং বিকাশের কথা বলতে বলতে বৃষ্টির মত থুতু ছেটাত, রফিক কখোনো বিরক্ত হয় নি এই মেঘহীন মানব উপলব্ধির বৃষ্টিতে। এখন নিশ্চয়ই রিশাদ সাবধানে কথা বলে, গলার রগটা কখোনোই দৃশ্যমান হয় না, তার উতসাহী উপলব্ধী মেকি সামাজিক সৌজন্যকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে তীব্র বেগে ওভারটেকে করে না।
আর এই অকাল মনুষ্যচেতনাগ্নির মৃত্যু ছোটখাট নীল জামা পরা প্রসাধন হীন শ্যামলা এই মেয়েটার জন্যে?মসৃন মেঘের পাশে উকি দেয়া গ্রহন আক্রান্ত সুর্যের মত চোখের অধিকারীনির জন্যে? পাতার মত কোমল শিরা বয়ে যাওয়া সমতলের হাতের জন্যে? লাজুক লুকিয়ে থাকা জলপ্রপাতের অসাবধানে বেড়িয়ে আসা একরাশ ঢেউ এর মত চুলের জন্যে? অসংখ্য প্রাকৃতিক শৈবালের মত সবুজাভ আবেশের একটি ঠোটের জন্যে?সবুজ ঘাসের উপর বসে থাকা এই কোমল দেবীর জন্যে?

রফিক বিদ্যুতস্পৃষ্টের মত ঝাকি দিয়ে উঠল। কি ভাবছে সে এসব? এসব কোথা থেকে আসল? এগুলো তো চেনে না, নিজেকে শারারীক তৃপ্তি দেবোর সময় যেমন অনুভুত হয় এই অনুভুতি গুলো খুব আলাদা। সেগুলো খুব ঝকঝকে খোলা তলোয়ারের মত তীক্ষ্ন হতে পারে কিন্তু এই গুলো অতলান্তের মত গভীর।

স্বর্গীয় বা নারকীয় যাই হোক না কেন, ফ্রয়েড হ্যাভলক এলিস যেন কোচকানো ব্যাঙ্গাত্নক আকৃতি নিয়ে রফিকের চারপাশের একসময়কার প্রেডিক্টেবল বাতাসকে হাইজেনবার্গীয় অনিশ্চয়তা দিয়ে ঢেকে ফেলল।

রফিক সবুজ প্রেক্ষাপটে সবুজ মিলির কাব্যিক দৃশ্যটাকে একটা খটমটে দার্শনিক চিন্তা দিয়ে ঢেকে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে হাটতে লাগল।

৩.

ঝরঝর করে বৃষ্টি পরছে। আকাশটা এত ঘোলাটে রহস্যময় হয়ে আছে যে ঘন্টাখানেক আগেও তার আগ্নেয় নীলাভতার কথা সম্পূর্ন অস্বীকার করা যায়। ঝমঝম শব্দে ট্রাম্পেট বাজিয়ে স্নান করাচ্ছে এই ময়লা, আস্তাকূড় আকৃতির বিশাল পৃথিবীটাকে। রফিক বৃষ্টির মাঝে কম আলোয় ঘোলাটে সবুজ দেখতে দেখতে ভাবল, বৃষ্টি পরের ভেজা সবুজের কথা, তার জ্বলজ্বলে যৌবনের কথা, বৃষ্টির সময় যে সবুজ গুটিয়ে লুকিয়ে থাকে তার কথা। আর বৃষ্টির পরের রৌদ্রে খাপখোলা তলোয়ারের মত , উন্নত স্তনের সপ্তদশীর মত, আগুন ছড়ানো কামনার মত জেগে উঠা সবুজ!! কিভাবে জৈবিক সব চাহিদা আর কামনার চারপাশে ঘুরপাক খায় মানবিক পলকা মুখোশ, আর কিভাবে বৃষ্টির ঘোলাটে সবুজ রোদের মাঝে গিয়ে যৌবনবতী হয়ে পরে, মাথা নেড়ে রফিক ভাবল সবই বিভ্রম। ঘোলাটে সবুজ থেকে আগ্নেয় নারী শরীর।

এই কংক্রীটের সমুদ্রে যান্ত্রিকআবেগুচ্ছ আর আর্টিফিশিয়াল সব সুগন্ধ দুর্গন্ধের মাঝে ভেজা মাটির গন্ধটা রফিকের দ্রোহে ক্রোধে পাথরসম অনুভুতিগুলোকেও দুর্বাঘাসের স্পর্শের মত কোমল করে দিল। কেন যেন সত্যেন দত্তের বস্তাপচা ছড়াজাতীয় কবিতার অপচেষ্টা তার মাঝে ঝিলিক দিয়ে গেল হঠাৎই। ঝর্ণা!!

তবে তিরিশের আধুনিকেরা আবার দলবল নিয়ে তাকে গত শতকীয় রোমান্টিক মেয়েলী শীৎকার থেকে উদ্ধার করল দ্রুতই যখন জনৈক উদাস বালিকা এককোনে আকাশের দিকে তাকিয়ে তার পরনের ছেড়াখোড়া কাপড় আর দারিদ্রের চাবুকের দাগ উপেক্ষার বিফল চেষ্টা করে যেতে লাগল। মনে মনে রফিক বলল “আমি ব্যাপ্টাইজড হলাম এই নরকে!”

একে তো বৃষ্টি তার উপর সমাজতান্ত্রিকদের ধর্মঘট, তাই লোকজন নেই বললেই চলে। ধর্মঘট সুপারভিশনের জন্যে কোন পাতি কমিউনিস্টকে আশে পাশে দেখা গেল না। “দীর্ঘজীবি হোক লেনিন” গলা ফুলিয়ে আবৃত্তি করা মুনিমকে রফিক দেখে এসেছে হলে গোগ্রাসে পুজিবাদী হলিউডী সিনেমা গিলতে।

চপচপে ভিজে একটা নারীমুর্তি যখন ঢুকল ক্যাফেটেরিয়াতে তখন রফিক খুব আগ্রহ সহকারে চায়ের কাপ থেকে একটা পিপড়ে তোলার চেষ্টা করছিল।

“কি করছিস?”
“তিন টাকার চায়ের অর্ধেক যাতে এই পরিশ্রমী পিপড়ের পেটে না যেয়ে অলস রফিকের পেটে যায় সেটা নিশ্চিত করছি”
রফিক মোটামুটি না তাকিয়েই উত্তর দিল।
“তুই সারাদিন এইসব কি আজাইরা জিনিস ভাবিস রে? মুনিম বলল তোর নাকি মেটামরফসিস হয়ে তেলাপোকা হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে ”
“কিছুই ভাবি না, চা খাই”
“খাইতে থাক। রিশাদ রে দেখছিস?”
“দুই ফোটা বৃষ্টি পড়লেই রিশাদের খোজ করতে হবে? আরে ধুর তোদের লাইগা তো পৃথিবীর স্বাভাবিক কাজকর্ম থাইমা যাইতে হইব। সবকিছুতেই রোমান্সের অনুষঙ্গ পাস। ফাউল।”
“এইগুলা বলিস না, কথায় কথায় কান্ট ,হেগেল মারলে মানুষ সুপিরিয়র হইয়া যায় না, তবে ছাগলা দাড়ি বড় হইতে পারে”
“হ্যা পৃথিবীতে তো লজিক্যাল সুস্থ মস্তিস্কের কিছু থাকতে পারবে না তগো লাভবার্ড দের দাবড়ানিতে।সবকিছুতেই ফিচ ফিচ কইরা গ্লিসারিন কান্নার সুযোগ খুজবি”
“চ্যাতোস ক্যান এত, প্রেমে পড়ছস নাকি? কেমন যেন ডিফেন্স মেকানিজম টাইপ আচরন মনে হইতেছে”

রফিক চমকে গিয়ে চায়ের কাপ উল্টে নিজের আধময়লা ফতুয়ার মাঝে একটা উত্তরাধুনিক ইম্প্রেশনিজম মার্কা ছবি উৎপাদন করল।
মিলি হাসতে হাসতে উল্টে পাল্টে যেতে লাগল। ওড়না দিয়ে চোখের পানি মুছতে গিয়ে মুখের উপর লেপ্টে থাকা চোখের কাজলকে আরো বিস্তৃত করে দিল। তাতে মিলির বিশেষ মাথা ব্যাথা আছে বলে মনে হল না। ভীষন বিব্রত অবস্থায় রফিক একবার মিলির আড়চোখে কাজল লেপ্টানো মুখের দিকে তাকালো। যদিও সম্পূর্নভাবে নিশ্চিত ভাবে ব্যাপারটা বলতে পারবে না, এবং সেটাকে অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেয়ার জন্যে সে প্রস্তুত তার পরেও মন্থরীকৃত সময়ের মাঝখানে ত্বরণিত হৃদপিন্ডের অদ্ভুত মিশেল তাকে বাকরুদ্ধ করে দিল।

৪.

নিউমার্কেট থেকে কেনা শক্ত মলাটের বইটা খাকী মোড়ক থেকে বেড় করে বারকয়েক নেড়েচেড়ে দেখল রফিক। অনেকগুলো টাকা বেড়িয়ে গেল এই প্রেসের গন্ধলাগা কাগজস্তুপের পেছনে। সেব্যপারে বিন্দুমাত্র মাথা না ঘামিয়ে নতুন বইএর স্বর্গীয় সুবাসটা আশ্লেষে উপভোগ করতে লাগল। রফিক। পকেটে কয়েকটা টাকা এখনও অবশিষ্ট আছে। একটা ক্যাপ্টেন ব্ল্যাক কিনে কিছুক্ষন খক খক কাশবে নাকি এই সিদ্ধান্তটা লোভীর মত রফিকের চারপাশে ঘুরতে লাগল। দীর্ঘদিন সিগারেট খাবার পরেও ক্যাপ্টেন ব্ল্যাকের ধাক্কা এখনও ঠিকমত সইতে পারে না সে।

কেন যেন, হয়ত চিন্তাগত ঝড়ের জন্যেই , রফিক আনমনে বাহারী সিগারেটের দোকানটা পাশ কাটিয়ে উচু গেট দিয়ে বেড়িয়ে আসল। অসংখ্য রিক্সা ,টুং টুংশব্দ, কাচা ছোলার ফেরিওয়ালার ভীড়েও রফিক উপরের আগ্নেয় নীল মহাকাশের দিকে তাকাল। সুধীন দত্তের উটপাখির কথা মনে পড়ে গেল তার। “নির্মম নীল মহাকাশ”। সেও কি বালুতে মুখ গুজে থাকে? মেরুদন্ডের অনন্ত অভাব আছে তার?

রিকশা ডেকে উঠে পড়ল সে। ভাড়া বেশী চেয়েছিল। আজকে কিছুটা স্বাস্থ্যবান পকেটের সম্মান হিসেবে উৎকট দরদাম টা ক্ষুধায় আক্রান্ত পকেটের দিনের জন্যে রেখে দিল সে।

অনেক গুলি ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তার। কিন্তু যে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার কোন ইচ্ছাই নেই সেই ব্যাপারটি মাথার ফোকরে দিগ্বিদিক লম্ফঝম্প দেয়া শুরু করাতে বিরক্ত হল সে। আরে প্রবলেম কি? মিলি দেখতে খারাপ না। সেইসাথে যৌবনের সব খাজভাগও দৃশ্যমান। কিন্তু একই জেনারেল ক্যারেক্টারইস্টিকস সত্য আরো হাজার হাজার ললনার। বরং স্তনের ইচ্ছাপূর্বক বিস্ফোরন আর নিতম্বের ঢেউ একশতবার দেখা যায় অসংখ্য ভিন্ন পরিস্থিতিতে, পরিবেশে। সেখানে কি কারনে মিলির মিডিওকার দেহসৈষ্ঠব ফ্রয়েডীয় মনস্ত্বত্বে আক্রমন করবে সবার আগে? আরে এই সকল আক্রমন তো অপরিচিত না। সেই ছোট বেলা থেকেই, যখন থেকে পৌরুষ উথিত হওয়া শিখেছে তখন থেকেই নিয়মিত আনাগোনা করে এইসকল নার্ভের ইলেক্ট্রিক পালস। তাদের চক্করে পরে নিয়মিত অন্তর্জাল কে ভালোই কষ্ট দিয়েছে রফিক। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে তৃপ্তির। মিলি দৃশ্যপটে আসবে কেন? কেন ঐ যে মেয়েটা কানের পাশের চুল ঠিক করছে, আর ওড়না খসে পরে যাচ্ছে, যাকে নিয়ে রফিক আরেকবার ঘুরে আসতে পারে ইমাজিনারী হেরেম থেকে , কেন মিলি এর থেকে আলাদা কোন অনুভুতি উৎপাদন করবে? ধুর শালার মন!

রফিক কষে গোল্ডলীফের নিকোটিন মেশানো বায়ু ফুসফুসে আরো কিছু কৃষ্ণাভ ক্ষত তৈরীর জন্যে পাঠিয়ে দিল। ভাঙ্গাচোরা রাস্তায় ধাক্কা খেতে খেতে এগোতে থাকা রিক্সায় বসে রফিক নতুন কেনা বইটা খুলে বসে পড়ার ভান করতে লাগল। তার প্রিয় বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যানের একটা ছবি বইটার প্রথমে দেয়া আছে। সেটার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকল। তারপর বিক্ষিপ্ত কিছু চিন্তাভাবনার মাঝখানে স্বল্প পরিসরে বইএর একটি বাক্য পড়ার চেষ্টা করতে লাগল।

তখনই উল্টা দিক থেকে হুড ওঠানো একটা রিকশা আসতে লাগল। হাজার রকম মুক্তচিন্তাভাবনা করার পরও গুহাবাসী আদিম স্বত্তার প্রেরণায় রফিক উকি দিল হুডের ভেতরের দৃশ্যের দিকে। মিলির ছোটখাট অবয়ব টা চিনতে মোটেও ভুল হল না তার, আর তার ঠোটে চিরদিনের তৃষ্ণার্তের মত চষে বেড়ানো রিশাদকেও চিনতে ভুল হল না তার।

পলাশীর মোড়ে রিকশা এসে থামল তখন পলাশীতে অনেক ভিড়। ফটোকপি মেশিনের ভোতা শব্দের পাশাপাশি পেয়াজু ভাজার চড়চড়ে শব্দ অদ্ভুত এক সিম্ফোনী তৈরী করেছে। সাদা রং এর একটা গাড়ি থেকে ঠক ঠক শব্দের দ্যোতনা দিয়ে হাইপেন্সিল হিল পড়া , একপাশে গামছার মত করে ঝুলানো কর্মহীন ওড়না, আটসাঁট জামার মধ্য ফুটে ওঠা স্তনের নকশা, প্রায় সোনালী রং এর অবিন্যস্ত চুল, বিশাল একটা নাকফুল পরা একটি ললনা বেড়িয়ে আসল। রফিক স্বীকার করল এরকম ধারালো সামুরাই তলোয়ারের মত সৌন্দর্য সে দেখেনি। রফিকের ইচ্ছা করল মেয়েটার সামনে গিয়ে দাড়াতে, এত কাছে যে মেয়েটির প্যারিস পার্ফিউম কে এড়িয়ে যাতে রফিক নি:শ্বাস না নিতে পারে, অথবা রফিকের দাড়িওয়ালা জনপ্লেয়ারকে এড়িয়ে যেতে মেয়েটি না পারে।

কাছাকাছি দাড়ানোর পর যখন দুরত্ব এতটাই কম হবে যে পলাশীর বারোয়ারি সিম্ফোনী গা ঢাকা দেবে তখন রফিক………………

ঠাস করে মেয়েটার গালে একটা চড় মেরে বলবে
“আই প্রেফার মাই হ্যান্ড, বিচ”

১,১৯৭ বার দেখা হয়েছে

১৬ টি মন্তব্য : “প্রেম বিষয়ক প্রতিপাদ্য (প্রথম অধ্যায়)”

  1. আন্দালিব (৯৬-০২)

    লেখাটার ফ্লো চমৎকার। তোমার আগের লেখা যে লেখাগুলো পড়েছি সেগুলো উপমার ভারে আরো বিনয়ী ছিলো। এই লেখায় সেই ভার কিছুটা কমেছে এবং খাপ খোলা 'সামুরাই তলোয়ার' হয়ে উঠেছে এটি!
    ভিন্ন প্রেক্ষাপটে আরো পর্ব লিখো। এটার বিস্তার এবং পরিণতি কিছুটা আন্দাজ করা গিয়েছিলো। মনস্তাত্বিক প্রেম এবং মনস্তাত্বিক ছ্যাঁকা সারাজীবনে কতো যে খাইলাম!

    কিছু বানান-বিভ্রাট চোখে পড়লো। তাড়াহুড়া করে লিখেছো নাকি? তাহলে আরেকবার রিভিশন দিয়ে ঠিক করে নিও

    জবাব দিন
  2. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    আমার খুব ভালো লেগেছে, কয়েকটি ব্যাপার ছাড়া। যেমন উপমা, আমার মনে হয়েছে উপমার ব্যাবহার অতিরিক্ত হয়েছে, যা গতিকে ব্যাহত করেছে। আরেক্টি হচ্ছে যত্ন, তুমি একটানে লিখেছো মনে হয়, রিভিশন দাওনি, দিলে কিছু ভ্রান্তি নজরে পরবে মনে হচ্ছে।

    তুমি লেগে থাক, তোমার হবে।


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  3. সামীউর (৯৭-০৩)

    একটা প্রশ্ন বেশ কিছু দিন থেকেই আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, মানুষ প্রেমে পড়ে কেন?( why the word FALL modifies LOVE). প্রেমকে কেন পতনের সাথে তুলনা করা হয়, এটাকি আদম এবং ঈভের স্বর্গ থেকে পতন /আদিপাপ এর সাথে জড়িত। প্রেম কি তাহলে পতিত মানসিক অবস্থা?

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।