জামিল জান কোচাইয়ের আফগান গল্প ‘দ্য টোয়াইস উইডোড খালা হেলাই’

খালেদ হোসেইনির ‘দ্য কাইট রানার’ পড়ার পর এই প্রথম আফগানিস্তানের জীবন-বাস্তবতা নিয়ে একটা গল্প পড়লাম আমেরিকার নিউইয়র্কার ম্যাগাজিনে। জামিল জান কোচাইয়ের আফগান গল্প ‘দ্য টোয়াইস উইডোড খালা হেলাই’। এই গল্পকারের লেখা আমি আগে কখনো পড়িনি, এই প্রথম তার নাম জানলাম।
খোঁজ নিয়ে জানলাম, আফগান-আমেরিকান এই লেখক সমকালীন আমেরিকান-ইংরেজি সাহিত্যে আফগানিস্তানের মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে আবার সবার কাছে তুলে ধরার জন্য বেশ বিখ্যাত হয়েছেন। তার লেখায় সেই দেশে অনন্তকাল ধরে চলা যুদ্ধের গাথা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ তো আছেই, তবে তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে এরই মধ্যে মানুষের জীবন, সম্পর্ক এবং স্মৃতি বয়ে বেড়ানোর ক্ষমতা।
‘দ্য টোয়াইস উইডোড খালা হেলাই’ গল্পেও তিনি তাই দেখিয়েছেন। একজন আফগান-আমেরিকান হিসেবে, মাইগ্রেশন এবং বিদেশে তার পরিচয়ের সংকটকেও তার লেখার বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। কোচাই বড় হয়েছেন ও পড়ালেখা করেছেন ক্যালিফোর্নিয়ায়। পেশায় একজন লেখক ও শিক্ষক। তার প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৯ সালে – ’৯৯ নাইটস ইন লোগান’। নামটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আফগান লোককথা, যুদ্ধ ও জাদুবাস্তবতার অনন্য মিশ্রণের জন্য অনেক প্রশংসিত হয়েছে এই বই। তারপর ২০২২ সালে এসেছে তার গল্পসংকলন ‘দ্য হন্টিং হাজী অব হাজী হটাক এন্ড আদার স্টোরিজ’। সেই গল্পগুলোও আফগান জীবন নিয়ে। যতটুকু জানলাম, তার লেখার বিশেষত্ব হচ্ছে, তিনি যুদ্ধকে রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে না দেখিয়ে তাদের জীবনের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার গল্প বলেন। সমকালীন আফগান সাহিত্যকে বিশ্বপাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর।
‘দ্য টোয়াইস উইডোড খালা হেলাই’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র খালা হেলাই। তিনি দুইবার বিধবা হয়েছেন। প্রথম স্বামী সোভিয়েত যুদ্ধের সময় নিখোঁজ হন। অনেক বছর পর তিনি আবার বিয়ে করেন। দ্বিতীয় স্বামী রাসুলের মৃত্যু হয় তালেবানের হাতে। তারপর তিনি আবার একাকী হয়ে পড়েন। এই গল্প শক্তিশালী হয়েছে শুধু তার দুই স্বামীকে হারানোর মধ্যে দিয়ে নয়; বরং তার জীবনের দীর্ঘ অপেক্ষা, অসমাপ্ত ভালোবাসা এবং স্মৃতির বয়ে নেয়ার শক্তিকে কেন্দ্র করে।
খালা হেলাই চরিত্রটা প্রচন্ড প্রাণবন্ত, হাসিখুশি কিন্তু গভীরভাবে আহত। গল্পের শুরুতে আমরা দেখতে পাই তিনি অন্য সবার মতো আড্ডা দিচ্ছেন, স্মৃতিচারণ করছেন, হাসছেন। ধীরে ধীরে আমরা বুঝতে পারি যে তার মনের মধ্যে পঞ্চাশ বছর ধরে বয়ে বেড়ানো এক মনের ক্ষত লুকিয়ে আছে। তিনি এখনও তার প্রথম স্বামীকে স্বপ্নে দেখেন। এমনকি তার শাশুড়ির সাথে যে তার খারাপ সম্পর্ক ছিল সেটাও বর্ননা করেন। বয়স তাকে শিখিয়েছে যে মানুষকে শুধু ভালো বা মন্দ দিয়ে বিচার করা যায় না। এই মানসিকতা আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে।
গল্পের আরেকটি দিক খুব মনে ধরেছে তা হলো আফগান জীবনের বাস্তবতার চিত্রায়ন। সে দেশে যুদ্ধ মানুষের প্রতিদিনের জীবনের অংশ। সোভিয়েত আগ্রাসন, গুম, উদ্বাস্তু জীবন, তালেবানদের অত্যাচার, তার পরবর্তী বাস্তবতা, নারীদের সংগ্রাম, দারিদ্র্য, অভিবাসন – এ সবকিছুই জামিল জান গল্পের মাধ্যমে সাধারণ এবং সহজ ভাষায় বলেছেন। কেউ স্বামী হারিয়েছে, কেউ সন্তানের কাছ থেকে অনেক দূরে, কেউ আমেরিকায় চলে গিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করছেন। আফগানিস্তান যেন এই গল্পে একটা দেশ নয়, দীর্ঘমেয়াদী এক বেদনার নাম।
গল্পটা কেবলই দুঃখের নয়, এটা জীবনের সুন্দর স্মৃতিগুলোও দেখানো হচ্ছে। মানুষ কীভাবে অতীতকে টেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যায়, কীভাবে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের সঙ্গে মনের অজান্তে কথোপকথন চালিয়ে যায় – পড়তে পড়তে সেই কথাও আমাদের মনে আসে। খালা হেলাইয়ের জীবন আমাদের দেখায় যে ভালোবাসা কখনও পুরোপুরি ফুরিয়ে যায় না, বরং সময়ের প্রবাহে তার রূপ বদলায়।
গল্পের শেষটা খুব মনে রাখার মতো। অনেক বছর পর খালা হেলাই তার প্রথম স্বামীর বৃদ্ধ মায়ের সঙ্গে দেখা করেন। অন্ধ ও মৃত্যুপথযাত্রী সেই শাশুড়ি জানান, তার মৃত ছেলে এখনও খালা হেলাইকে খুঁজে বেড়ায়। একথা শোনার পর অন্ধকার ঘরে বসে হেলাই তার মৃত স্বামীর সব প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকেন। বাস্তব আর স্মৃতি, জীবন আর মৃত্যুর সীমারেখা সেখানে অস্পষ্ট হয়ে যায়।
এই সমাপ্তি খুব ভালো লেগেছে। আবেগময়। পুনর্মিলন নেই, কোনো সমাধানও নেই, কিন্তু আমি এমন এক অনুভূতির মধ্যে রয়ে গেলাম যেখানে ভালোবাসা, স্মৃতি এবং অনুপস্থিতি একাকার হয়ে গেছে। তবে পুরো গল্প পড়তে পড়তে এক ধরনের বিলাপের সুর বেশ তীব্র মনে হয়েছে। মনে হয়েছে কোনো দেশের এমন পরিস্থিতির কথা সবাইকে জানাতে লেখকদের আসলে এর বেশি কিছু করার নেই।
[শেষ]

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।