তমালিকা

শুনেই মনে হলো, তমালিকা তার মনের গহিন গর্ভ থেকে কথাটা বলে ফেলল। আমার মনে অনেক রকম কল্পনার ডালপালা নড়ে উঠল। সেই ডোপামিনের ঝাপটা শত-শত ফুলের সৌরভের মতো আমার পুরো অস্তিত্বে চনমন করে প্রবাহিত হয়ে গেল। আমি ওর দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়েই রইলাম। সে আমার চাউনির অর্থ বুঝল; তারপর যত্ন করে আমার টেবিলের ওপর একটা পারফিউমের প্যাকেট রেখে বলল– ‘ফর ইয়ু’।

কথাটা আসলে একটা প্রশ্ন। এমন প্রশ্ন আমি এর আগে কখনও কারও কাছ থেকে শুনিনি। এমনকি আমার অনেক বছরের বিয়ে করা স্ত্রীর কাছ থেকেও নয়। কথাটা আমি কয়েকটা ইংরেজি রোমান্টিক সিনেমায় নায়ক-নায়িকার কথোপকথনে অনেক শুনেছি। তবে কখনও কারও কাছ থেকে শুনব বলে আমার মনে কোনো আকাঙ্ক্ষা ছিল না। কিন্তু ঠিক এই কথাটাই আজ লম্বা ছুটি কাটানোর পর আপিসে ঢুকে আমার রুমে কথা বলতে এসে, টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে তমালিকা নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করল। চোখে তখন তার হরিণের মতো উজ্জ্বল এবং সতর্ক চাউনি। কিছুটা দুষ্টুমি। অথচ আমি তার কথার উত্তর দিতে পারলাম না। আমি যে উত্তর দিতে চাইনি তা কিন্তু নয়; ঠিক সেই মুহূর্তে পারলাম না। মনে হয় নিজেকে সামলে নিতে পারলাম। আমি যে এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলে নিতে পারি তা বুঝে আমার ভালো লাগল।

আমি উত্তর না দেওয়ার কোনো কারণ তমালিকা বুঝতে পারল কিনা জানি না, তবে সে হয়তো কোনো উত্তর আশাও করছিল না। ‘আমি আসি, ভাইয়া’ বলে ঠোঁটে হাসিটা ধরে রেখেই সে আমার রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আমার থমকে যাওয়া চাউনি তার মনে কোনো প্রভাব ফেলেছে কিনা সে আমায় বুঝতে দিল না।

সে কিন্তু পুরোপুরি বাইরে বেরোল না; আমার রুমে দরজার মুখেই করপোরেট স্ট্র্যাটেজি টিমের মালিহার সাথে তার দেখা হয়ে গেল। মালিহা সেখান দিয়েই যাচ্ছিল কোনো কাজে। সে তাকে ‘হাই আপু– হোয়াসসাপ’ বলতেই তমালিকা দাঁড়িয়ে গেল এবং তার দেহের একাংশ আমার রুমের ভেতরেই রয়ে গেল। সে হয়তো খেয়াল করেনি, তবে আমি তার দিকে তাকিয়েই রইলাম; উচিত-অনুচিত চিন্তা না করেই তাকিয়ে রইলাম। সে যেই প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়ে গেল এবং তার দেহের যতটুকু আমি দেখতে পাচ্ছি তার সাথে আমি একটা যোগফল মেলানোর চেষ্টা করি। সে কী চাইছে যে আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকি? মালিহার সাথে আলাপ তো বাইরে বেরিয়েই করতে পারত! তা না হলে আমার দরজার মুখে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো অর্থ হয় না। তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ওরা কথা শেষ করে যে যার পথে চলে গেল।

কাজে মন দিলাম। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ‘মিনিংফুল থিংকিং’-এর এক ট্রেইনিং কনসালন্ট্যান্টের কাছে একটা ব্রিফ পাঠাতে হবে। তিনি আমাদের আপিসের সবাইকে আমাদের নতুন তৈরি করা ভ্যালুজ নিয়ে ট্রেইনিং দেবেন। আমাদের ডিভিশনই তা অর্গানাইজ করবে। তমালিকা আমাদের কালচারাল এনগেইজমেন্টের চিফ। প্রেজেন্টেশনটা সেই আমার কাছে কাল বাসায় বসে শেষ করে পাঠিয়েছে। আজ ওটা নিয়েই আমায় ব্রিফ করতে এসেছিল, কিন্তু তা না করেই ‘ঐ’ কথাটা বলে আমাকে তাকে নিয়ে ভাববার সুযোগ করে দিয়ে বেরিয়ে গেছে।

তমালিকার সাথে সারাদিনই তার সাথে অন এবং অফ কথা হচ্ছে। দুই বছর আগে সে যখন আমাদের ডিভিশনে ভিপি হয়ে আসে, তখন আমি তার ইন্টারভিউ বোর্ডে ছিলাম। সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে সে উত্তীর্ণ হয়ে আমাদের টিমে যোগ দিয়েছিল। এর আগে একটা টেলকোতে ছিল– ওখানে তার অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। অনেক সময় মেয়েরা বেশি সুন্দরী হলে ইন্টারভিউ বোর্ডের সবাই টাশকি খেয়ে যায়। তমালিকার ক্ষেত্রে অবশ্য বিষয়টা তেমন ছিল না। সে দেখতে সুন্দরী, তবে পুরুষেরা যেই সুন্দরীকে দেখে কাত হয়ে যায়, তেমন নয়। তমালিকার চেহারা গোলাকৃতি বা ডিম্বাকৃতি– কোনো ছাঁচেই ফেলা যায় না; নাক টিকোলো নয়, একটু চাপা এবং ঠোঁট জোড়া অনেক পাতলা– উষ্ণতার উগ্র কোনো আহ্বান সেখানে খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে চোখের দিকে তার সেখানে এক অতল গভীরতা টের পাওয়া যায়। সব মিলে এক কারুকাজময় চেহারার ব্যঞ্জনা। যে কোনো দিক থেকেই তার দিকে তাকালে তার সৌন্দর্য বোঝা যায়। আমি আমাদের অনেক সহকর্মীকে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছি। ইন্টারভিউতে সে পাস করেছিল অর্গানাইজেশনাল কালচার কেমন করে গড়ে তুলতে হয় সেই কয়েকটা পরিকল্পনা উদাহরণসহ বর্ণনা করে; তার নিজের যোগ্যতায়।

দুই বছর পেরিয়ে গেছে; কাজ বুঝে নিয়ে সে আমাদেরই একজন হয়েছে। আমার সাথে তার প্রতিদিনই কোনো না কোনো কাজ থাকে, তবে ও-ই আমার একমাত্র ডিরেক্ট রিপোর্ট নয়। ওর মতো আরও সাতজন আছে। তমালিকা আমাদের প্রতিষ্ঠানে জয়েন করার পরপরই একদিন আমি তাকে সাথে নিয়ে আমার বসের রুমে এক গুরুত্বপূর্ণ আলাপে গিয়েছি। বস ওকে একটা প্রশ্ন করলেন। তার অ্যাটিটিউডে একটু চ্যালেঞ্জ-চ্যালেঞ্জ ভাব ছিল। আমি চেয়েছিলাম তমালিকা যেন তার মতো করে বসকে বুঝিয়ে দিক। কিন্তু সে ভড়কে গেল। সাহসী মেয়ে; তবে তখন ইতস্তত করতে করতে কিছুই বলতে পারল না; কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। আমি পরিস্থিতি বুঝে নিজেই তার হয়ে প্রশ্নের উত্তর দিলাম। আমাদের কথোপকথন বেশ স্বাভাবিকভাবেই শেষ হলো। এই ক্ষণটা নিয়ে আমি তেমন চিন্তা করিনি। আপিসে এমন অনেক হয়েছে– আমি আমার টিমমেটের হয়ে উত্তর দিয়ে দিয়েছি। কেউ কিছু মনে করেছে বা করেনি তা নিয়ে আমি চিন্তা করিনি।

সেই সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে দেখি তমালিকা হোয়াটসঅ্যাপে লিখেছে– ‘বস, উত্তরটা আমাকে দিতে দিলেই পারতেন; আই নিউ দ্য আনসার কোয়াইট ওয়েল; বিষয়টা আমার খুব ভালোই জানা– ইউ নো ইট ভেরি ওয়েল। প্লিজ, এর পর থেকে লেট মি টক।’

সেদিন আমি একটু লজ্জিত হয়েছিলাম। এর আগে এমন সরাসরি আমাকে আমার বস-বস আচরণ নিয়ে কোনো টিমমেট কিছু বলেনি– আসলে বলতে সাহস করেনি। ‘সরি’ বলে, উত্তরে লিখেছিলাম– ‘ঠিক আছে; তোমার কথাই রইল; আমি আর তোমার স্বাধীনতা খর্ব করব না।’ সে একটা লাভ ইমোজি দিয়েছিল।

ঘটনা এখানে থেমে থাকেনি। আমাদের চিফের সাথে আমার আর তমালিকার– দুজনের প্রায়ই মিটিং করতে হয়। মাঝে মাঝে দিনে দু’তিনবার। তেমনই এক মিটিংয়ে, বস ওকে আবার একটা প্রশ্ন করলেন। আমি জানি যে বসের প্রশ্নের উত্তর সে জানে, কিন্তু সে আবারও সেই প্রথম দিনের মতো স্থবির হয়ে গেল। আমার দিকে তৃষ্ণার্ত চোখে তাকাল। সেদিন আর আমি কিছুই বললাম না। আমি চোখে চোখে বললাম– ‘তুমিই বলো’। তমালিকা বলতে পারল না। আমাদের বস ওকে ভর্ৎসনাপূর্ণ কয়েকটা কথা বললেন এবং আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন।

এবার আর সন্ধ্যার হোয়াটসঅ্যাপ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো না। বসের রুম থেকে বেরুতে না বেরুতেই, তমালিকা চোখ বড় বড় করে আমায় বলে বসল– ‘ভাইয়া, আপনি কেন কিছু বললেন না? আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকলাম আর ইউ জাস্ট কেপ্ট কোয়ায়েট!’
আমি একটু দুষ্টুমি করলাম। ওর দিকে না তাকিয়ে তাকিয়েই বললাম– ‘কথা বললেও দোষ, না বললেও দোষ।’ আমার মুচকি হাসি দেখে সে তার হাই-হিল জুতোর গটগট শব্দ করে আমাদের ফ্লোরের দিকে চলে গেল। সে যখন সিঁড়ি দিয়ে নামছিল এবং তখনও গটগট শব্দ হচ্ছিল, আমি বুঝলাম দুষ্টুমিটা কাজে দিয়েছে।

এমন দুষ্টুমি করতে করতেই একটা না বলা সম্পর্ক গড়ে ওঠে, আমরা দুজনেই চেতন মনে টের পেয়েও কেউ কাউকে বুঝতে দেইনি। দুষ্টুমি আমিও করি, সে-ও করে। এরই মাঝে আমরা আমাদের কাজ করে চলি। কিন্তু আমি কি অন্য কিছু ভেবেছিলাম? আরও বেশি কিছু চেয়েছিলাম? তাকেও কি বেশি কিছু ভাবার সুযোগ করে দিয়েছিলাম? মাঝে মাঝে সম্পর্ক চাইতে হয় না, সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

এই তো, গত বছরের ডিভিশনাল রিট্রিটের সময় একটা ছোট্ট ঘটনা আমাদের মাঝে অনন্য এক সম্পর্কের বোধ তৈরি করেছে বলে আমার মনে হয়েছিল। সেদিন আমাদের ডিভিশনের পঁয়ত্রিশজন শহরের উপকণ্ঠে ‘মেঠোপথ’ নামে এক রিজোর্টে গিয়েছিলাম। সেখানে আগে কখনও যাইনি। রিট্রিট উপলক্ষে আমরা সবাই সেদিন সাদা পোলো শার্ট, ডেনিম রঙের জিনস আর সাদা স্নিকার্স পরেছিলাম– কেউ কেউ অন্য রঙের স্নিকার্স। অসাধারণ এক প্রাকৃতিক স্থান। ইটপাথরের দালান নেই, সব কটেজই তৈরি হয়েছে বাঁশ, চাটাই ও কাঠ দিয়ে– যেন সেই আগের কালের কুঁড়েঘর; সব রকমের ফলের গাছ স্থানটাকে ছেয়ে রেখেছে; অনেক বড় জায়গা– আমরা যারা শহরে বাস করি তাদের কাছে একটা ছোটখাটো গ্রামের মতো মনে হয়েছিল। একপাশে আছে একটা বিল, সেখানে হাজার হাজার পাখি।

আমাদের টিমমেটারা এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে এদিক-ওদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছে, সেলফি তুলছে, ভিডিও করছে। ব্রেকফাস্ট দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কেউ সেদিকে আসছে না। আমি পরোটা, ডিমভাজি, ডাল আর ভাপা-পিঠা দিয়ে নাশতা সেরে, একটা কাগজের কাপে কফি নিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছি। তমালিকাও কফি হাতে আমার সাথে এসে দাঁড়ায়। চশমা পরেছে সে। আমি ভ্রু উঁচু করে তাকাতেই, সে বলে– ‘বস, দূরে দেখতে আমার চশমা লাগে’। আমি বলি– ‘ইউ লুক নাইসার উইথ দ্য গ্লাসেস’।

ঠিক তখনই, রিজোর্টের একজন ওয়েটার আমাদের কটেজে অনেকগুলো পানির বোতল রেখে বেরিয়ে যাচ্ছিল। ছেলেটা খেয়াল করেনি; তমালিকার ডান কনুইয়ের সাথে তার ধাক্কা লেগে যায়। হাতের কাপ থেকে কফি উছলে পড়ে তার বুকের ওপর। লাফিয়ে সরে যায় সে। কফি তেমন গরম ছিল না, তাই সে যাত্রা বেঁচে যায় তমালিকা; তবে তার বুকের ডানপাশে সাদা গেঞ্জির ওপর গাঢ় খয়েরি রঙের একটা দাগ লেপটে যায়। আমি সাহায্য করতে চাইলেও সম্ভব হয় না; এমন পরিস্থিতিতে তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। সে নিজেকে সামলে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে সুন্দর করে হাসে। আমি আমার ডান হাতটা গৌতম বুদ্ধের মতো উঁচু করে বলি– ‘কিচ্ছু হয়নি; আমার কাছে আরেকটা সাদা পোলো আছে; তুমি চাইলে পরে নিতে পারো।’

তমালিকা আমার সেই পোলো শার্ট পরে সারাদিন ঘুরে বেড়িয়েছিল। আমার গেঞ্জির সাইজ তার গায়ে হয়েছে কিনা তা ভাবার চেয়ে আমার মনে হয়েছিল আমি-ই যেন গেঞ্জি দিয়ে তাকে জাপটে ধরে আছি। সারাদিন এক ধরনের আবেগের ওম অনুভব করেছিলাম। একটা আপ্লুত-আপ্লুত ভাব এসেছিল। তবে রাতে বাসায় ফিরে মনে হয়েছিল আমার মন আমার সাথে ওকে নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। আমিই শুধু এমনটা ভাবছি।

মনকে সামাল দিতে আমার খুব একটা কষ্ট করতে হয়নি, সময়ও বেশি লাগেনি। পরদিন থেকেই আমি কাজে আরও বেশি মগ্ন হয়েছি যেন যা তাকে নিয়ে ভেবেছি তা সব ছিল বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল– বিএইউ, কাজের অংশ; আপিসে কাজ করতে গেলে মাঝে মাঝে এমনটা ভাবতে হয়।

কিন্তু ঐ প্রশ্নটা করেই সে আবার আমার মনকে উসকে দিয়েছে। আমি জানি এই উস্কানিও আমি সামলে নেব। আমি যে তার বস। একটা বসি-বসি দৃঢ়তা প্রয়োগ করলেই তাকে আবার তাকে স্তিমিত করা খুব কঠিন হবে না। সে আমাকে আর এমন কোনো প্রশ্ন করার সাহস পাবে না। ওর তৈরি করা প্রেজেন্টেশনে কয়েকটা ভুল আবিষ্কার করে তাকে শাসিয়ে দিলেই কাজ হয়ে যাবার কথা। বসেরা সব সময়ই কোনো না কোনো ভুল ধরে দিতে পারে। আমিও দিলাম। কাজও হলো।

এরপর বেশ কয়েকদিন তমালিকাকে খুব ম্রিয়মাণ দেখে আমার বসত্ব যে বজায় রাখতে পারলাম তা নয়। সকালে আপিসে ঢোকার সময় সে যে আমায় গুড মর্নিং জানিয়ে যায় তা জানাচ্ছে না দেখে আমি তার গুড মর্নিং মিস করা শুরু করলাম। নিজেকে বললাম– ‘হ্যাঁ, গুড মর্নিং মিস করো কিন্তু তোমার টিমের অপারেশন চালিয়ে যাও।’

হলোও তাই।

তমালিকার সাথে আমার আলাপচারিতা কমে যায়। অনলাইন-অফলাইন– প্রায় সব। যে কথা না হলেই নয়, আমরা তা চালিয়ে নেই। কিন্তু তার বেশি কিছু না। আমি তার ডিরেক্ট রিপোর্টদের কাছ থেকে কাজ আদায় করা শুরু করি এবং তাতে আমাদের কাজের গতি বেড়ে যায়, কিন্তু তাকে নিয়ে ভাবনা আমার মন থেকে উবে যায় না।

তমালিকা আমার আচরণ দেখে কেমন যেন নির্লিপ্ত হয়ে যায়। আমি লক্ষ্য করি যে সে তার নির্লিপ্ততা দিয়ে আমার স্ট্রেস বাড়াতে চাচ্ছে। কিন্তু আমি এমন ভাব দেখালাম যেন আমার কিছুই হয়নি। তার টিমমেটদের কাছ থেকে অনেক কিছু জানতে পারলাম যা আমি আগে কখনও জানতে পারিনি।

এমন করে আমরা প্রায় দুই মাস কেটে যায়।

একদিন রাত ন’টায় আমার ইনবক্সে এক মেসেজ আসে তমালিকার কাছে থেকে। ‘বস– আই ওয়ান্ট টু হ্যাভ আ ক্রুশ্যাল কনভারসেশন উইথ ইউ। ডু ইউ হ্যাভ আ মিনিট?’ আমি তাকে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দিয়ে জানতে চাইলাম কী হয়েছে। সে বলল– আই হ্যাভ গট আ বেটার অফার’। আমি সব শুনি। আমি শুধু তাকে ‘অল দ্য বেস্ট’ বলে ফোন রেখে দেই।
আমার কণ্ঠে নির্লিপ্ততা শুনে সে মর্মাহত হয়েছিল তা আমি বুঝেছিলাম, কিন্তু তাতে আমার কিছু যায়-আসেনি। পরদিন সকালে সে যখন তার রেজিগনেশন লেটার নিয়ে আমার রুমে এলো, আমি ভেবেছিলাম তার সেদিনের ‘ঐ’ প্রশ্নটার উত্তর দেব, কিন্তু যখন দেখলাম সে আমার সেই সাদা গেঞ্জিটা আমার টেবিলে রাখল, আমি বুঝলাম সেই প্রশ্নটা নিয়ে কোনো কথা বলা আর ঠিক হবে না।

সেদিনই তার পজিশনের জন্য আমরা একটা জবের বিজ্ঞাপন পোস্ট করে দিলাম।
তমালিকা চলে গেল। আমরা অনেক যত্ন করে সবাই তার ফেয়ারওয়েল অনুষ্ঠান করলাম। ফেয়ারওয়েলের সময় সবাই যেমনটা বলে ‘আবার হয়তো দেখা হবে’, সে তা বলল না। তবে তার স্পিচের বেশির ভাগ কথা সে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল।

তমালিকার পজিশনের যে সহকর্মী এসে আমাদের সাথে যোগ দিল, আমি তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। নতুন সহকর্মীর কাজ নিরীক্ষণ করে আমার তমালিকার কথা মনে পড়তে থাকে; সে থাকলে কেমন করে করত তাই ভাবি। সে চলে যাওয়ার পর আর কোনো যোগাযোগ করেনি। আমি প্রায়ই সেই প্রশ্নটা নিয়ে ভাবি। না করলেই-বা কী এসে যায়?
তবে ঈদের আগে লাস্ট ওয়ার্কিং ডে-তে তার কাছ থেকে একটা মেসেজ পাই। নাহ, সে ঈদ মোবারক জানায়নি। লিখেছে– ‘বস, আর ইউ স্টিল মিসিং মি? হ্যাভ আ নাইস হলিডে।’
আমার ‘ঐ’ প্রশ্নটার কথা মনে পড়ে যায়; কিন্তু আমি উত্তর দেই না। মনে মনে বলি– ‘তমালিকা, তুমি এখন আর আমাদের কেউ না।’

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।