একজন সফল প্রিন্সিপালের কথা

আমরা যখন ক্লাস টুয়েলভে পড়ি তখন আমাদের কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন লেঃ কর্নেল মোকাররম আলী স্যার। আমার জীবনের দেখা কয়েকজন ভাল মানুষের মধ্যে তিনি একজন। স্যার আমাদের অনেক আদর করতেন। ক্যাডেট কলেজে সাধারনত প্রিন্সিপালের সাথে ক্যাডেটদের ইন্টারেকসন কম হয়। কিন্তু মোকাররম স্যার ছিলেন একেবারেই আলাদা। সবসময় ক্যাডেটদের সাথে অনেক মেলামেশা করতেন। তিনি আমাদের সাথে গেমস টাইমে ভলিবল খেলতেন, ক্লাসটাইমে প্রায়ই আসতেন আমাদের সাথে গল্প করার জন্য। অনেক সময় আমাদের সাথে ক্লাসও করতেন। অন্য প্রিন্সিপালরা ক্যাডেটদের সাথে দেখা করার সময় অনেক স্টাফ, স্যার ইত্যাদি নিয়ে আসত। কিন্তু মোকাররম আলী স্যার আসত একা একা। সেই জন্যেই মনে হয় স্যারের সাথে আমরা অনেক সাভাবিক ভাবে কথা বলতে পারতাম। পিকনিকের সময়ও স্যার আমাদের সাথে ঘুরাঘুরি করত। স্যারের একটা পিচ্চি মেয়ে ছিল, নাম “ইলমা”। ওকে আমাদের কাছে দিয়ে দিত খেলার জন্য। খুব অল্প দিনের মধ্যে স্যার আমাদের সবার কাছে অনেক আপন হয়ে যায়। সেই সুযোগে আমরা স্যারের কাছে অনেক বেশি বেশি আবদার করতাম। যেমন, এইচ,এস,সি, এর সময় বেশি ভাল এক্সট্রা ডায়েট, ডিশ দেখার পারমিশন, পিটি ড্রিল এক্সকিউজ, লাইটস আউটের পর পড়ার পারমিসন ইত্যাদি। স্যারের কাছে আমরা যা আবদার করতাম তাই স্যার মেনে নিত। উনি ছিলেন অনেকটা আমাদের অভিভাবকের মত। পেরেন্টস ডে তে উনি সবার পেরেন্টসের সাথে পার্সোনালি দেখা করে কথা বলত। স্যার যে আমাদের সব আবদার মেনে নিত, এই জন্য মনে হয় কলেজের এডজুটেন্ট, ডাক্তার, হাউজ মাস্টাররা আমাদের উপর ক্ষেপা ছিল। হাউজ মাস্টার অথবা এডজুটেন্টকে যে আবদার করে আমরা ঝারি শুনতাম, সেই আবদার প্রিন্সিপালকে করলে মঞ্জুর হয়ে যেত। স্যার আমাকে পার্সোনালি অনেক স্নেহ করত। ডাইনিং হলে টহল দিতে আসলেই আমাকে জিজ্ঞাস করত “কি বাহলুল, খাবার ভালো হয়েছে?”। আমার টেবিলে ক্লাস সেভেনের আরেকটা পিচ্চি ছিল। নাম ছিল “আহসান”। মনে হয় ২৫ তম ইনটেক (১৯৯৯ সালের ইনটেক)। ওকেও স্যার সবসময় বলত “কি আহসান, খাবার খাওয়া যাচ্ছে?”। স্যারকে আমরা সবাই অনেক পছন্দ করতাম। আমদের ব্যাচ থেকে ১৯৯৯ সালে বিজ্ঞান বিভাগে ১৮ জন স্ট্যান্ড করে। খুব সম্ভবত বাংলাদেশে সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট ছিল সেটা ওই বছর। এই সাফল্যের পেছনে মুকাররম স্যারের অনেক ভুমিকা ছিল। আমরা পাস করার পর স্যার ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের প্রিন্সিপাল হয়। ওই (২০০০) বছর খুব সম্ভবত ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ সারা বাংলাদেশে সবচেয়ে ভাল রেজাল্ট করে এইচ,এস,সি, তে ( এই ব্যাপারে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ক্যাডেটদের কাছ থেকে মন্তব্য আশা করছি)। স্যার ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের পর যান রাজ়উক কলেজে। তখন রাজউক কলেজ সারা বাংলাদেশে সবচেয়ে ভাল রেজাল্ট করে। রাজউক কলেজে সারা বাংলাদেশে সবচেয়ে ভাল ফলাফল করার পর আমি স্যারকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি চিঠি লিখি। ১ সপ্তাহের মধ্যে স্যার আমাকে একটি রিপ্লাই চিঠি পাঠান ধন্যবাদ জানিয়ে। শুনেছি স্যার এখন আর্মি থেকে রিটায়ার্ড করেছে। খুব সম্ভবত মোহাম্মদপুরে একটি ক্যাডেট কোচিং এর প্রিন্সিপাল এখন। আমি একটা ক্যাডেট কোচিং এর বিজ্ঞাপনে দেখেছিলাম উনার নাম। জাপান আসার আগে স্যারের সাথে দেখা করে আসার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সময় করতে পারিনি।

১,৫১৮ বার দেখা হয়েছে

১৪ টি মন্তব্য : “একজন সফল প্রিন্সিপালের কথা”

  1. আমিন (১৯৯৬-২০০২)

    লেখা যেভাবে আগাচ্ছিলো ভাবছিলাম শেষে আইসা স্যারের মৃত্যু সংবাদ শুনতে হইবো।
    সেটা হয় নাই এই জন্য ভালো লাগতেসে।
    আল্লাহ স্যারকে সুস্থ সবল দীর্ঘায়ু দাল করুন এই শুভকামনা রইল।

    জবাব দিন
        • আশিক (১৯৯৬-২০০২)

          রফিকুল ইসলাম স্যারকে অনেকটাই দুমুখো মনে হয়েছে। আমরা যখন ক্যান্ডিডেট, তখন রাতে লাইট জ্বালানোর পারমিশন দিচ্ছিলো না কিছুতেই। আমরা গ্যালারীতে...এমন সময় স্যার আসলেন রাউন্ডে। আমরা তখন স্যারকে নানা ভাবে বুঝানোর চেষ্টা করলাম যে এটা খুব দরকার। এটাও বললাম যে অন্যান্য ক্যাডেট কলেজে আনঅফিশিয়ালি দিচ্ছে আরো আগে থেকে। জিজ্ঞেস করলে স্বীকার করবেনা কিন্তু আমরা আমাদের ক্লাসমেটদের থ্রুতে জানি। সব শুনে টুনে উনিও একমত পোষন করলেন যে, না রাতে আরেকটু পড়তে দিলে ভালো হবে।

          পরে দিন চলে যায়...পারমিশন আর পাই না। ভিপির কাছে গিয়ে বলতে সুন্দর বলে দিল যে প্রিন্সিপাল স্যার 'না' করসে! বুঝেন অবস্থা!!!! x-(

          জবাব দিন
  2. নাঈয়াদ (৯৮-০৪)

    বাহলুল ভাই, আপনার েলখা পেড় খুব ভাল লাগেলা। েমাকাররম sir আসেলই খুব ভােলা িছেলন। আহসান আমােদরই CCR 24 Batch(98-04) এর েছেল। এখন BUET এ পড়েছ ও। আপনার আেরা েলখা পড়ার অেপক্ষায়

    জবাব দিন
  3. আহসানুল ময়েজ

    বাহলুল ভাই আমরাও পাইছিলাম পুরা ১২ ক্লাস , রাজউক এ থাকার সময় উনি সবসময় আমাদের ২ ব্যাচ নিয়ে
    কথা বলতেন এটা এক ছোটভাই এর কাছ থেকে শুনেছিলাম।

    আমি একবার ১২ ক্লাস এ টয়লেটে সিগারেট খেয়ে বের হয়ে দেখি স্যার পাসদিয়ে এমন ভাবে যাচ্ছে উনি বুঝতে পারেন নি হয়তো বা সত্যি বুঝতে পারেন নি
    চিন্তা করে দেখেন অন্য কেউ হলে আমার লাইফ টা মনে হয় ওখানেই শেষ হয়ে যেত
    আমি স্যারের কাছে সারাজীবনের জন্যে কৃতঞ্জ


    আহসানুল ময়েজ

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : আশিক (১৯৯৬-২০০২)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।