স্বাধীনতা দিবস এবং একটি কবিতা

আজ স্বাধীনতা দিবসের এক অনুষ্ঠানে একটা আবৃত্তি শুনছিলাম। তার আলোকে হিসেবটা মাথায় এল- মানুষ নাকী এক সেকেন্ডে চার ফুট যেতে পারে, সেক্ষেত্রে আমরা ষোল কোটি মানুষ একসাথে হাঁটলে প্রতি সেকেন্ডে ৬৪,০০,০০,০০০ ফুট বা ১৯২,০০,০০,০০০ ইঞ্চি বা ৪,৮৭,৬৮,০০০ মিটার বা ৪৮,৭৬,৮০০ কিঃমিঃ যেতে পারি……..অথচ বিষুবীয় অঞ্চলে পৃথিবীর ব্যাস মাত্র ১২,৭৫৬ কিঃ মিঃ এবং মেরু রেখা বরাবর পৃথিবীর ব্যাস মাত্র ১২,৭১৫ কিঃমিঃ!!! মাত্র এক সেকেন্ড যদি আমরা ১৬ কোটি মানুষ এক জোট হয়ে হাঁটতে পারি তবে মাত্র এক সেকেন্ডে আমরা গোটা পৃথিবীটাকে কমপক্ষে ৩৮২৩ বার প্রদক্ষিণ করে আসতে পারব। অথচ বাস্তবে আমরা কতটা পথ পাড়ি দিলাম ২৬ শে মার্চ, ১৯৭১ থেকে ২৬ শে মার্চ, ২০১২- এই ১২৯,২৯,৭৬,০০০ সেকেন্ডে???? এই ভয়াবহ গরমিলের কারন বোধহয় ২৬ শে মার্চ,১৯৭১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ পর্যন্ত মাত্র ২,২৪,৬৪,০০০ সেকেন্ড যা এই সমগ্র সময়ের মাত্র সাড়ে ৫৭ ভাগের একভাগ সময়, আমরা একত্রে হেঁটেছিলাম ( অবশ্যই কিছু বেজন্মা কুলাংগার বাদে!)। এতেই পেয়েছি রক্তস্নাত স্বাধীনতা, যা যে কোন জাতির জন্য এক অমূল্য অর্জন, আরো হাজার বছর পরেও বাংলাদেশ থাকলে তাকে আর কখনোই স্বাধীন হতে হবে না অন্ততঃ, স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে মাত্র!!আর ঠিক যেই মূহুর্তে বিজয় হল সেই মূহুর্ত থেকেই আমরা পরস্পরের থেকে ভিন্ন হতে শুরু করলাম- আমরা বাংগালী না বাংলাদেশী, নাকী বাংগালী মুসলিম না মুসলিম বাংগালী, নাকী সোউদী, নাকী রাশিয়ান, নাকী ভারতী, নাকী পাকিস্তানী, আজো নিজের পরিচয়টাই নিজের কাছে পরিস্কার হল না; স্বাধীনতার ঘোষক কে, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গঠক কে,স্বাধীনতার পক্ষে কে, বিপক্ষে কে-এসব প্রশ্নের উত্তর আজো মিলল না; মুক্তিবাহিনী, মুজিব বাহিনী, গণবাহিনী, রক্ষী বাহিনী, সেনা বাহিনী আরো কত শত বাহিনী; আওয়ামী লীগ, বিএনপি, সমাজতান্ত্রিক দল, ন্যাপ, জাতীয় পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি, আরো কত শত পার্টি; ডানপন্থী, মধ্যপন্থী, বামপন্থী, উদারপন্থী, ইসলামপন্থী, আরো কত শত পন্থী; বরিশাইল্যা, চাটগাইয়া, নোয়াখাইল্যা, ঢাকাইয়া, অংপুইর্যাত, খুলনাইয়া, বুইংগ্যা, আরো কত শত আঞ্চলিকতা; বাংলা মাধ্যম, কওমী মাধ্যম, আলিয়া মাধ্যম, দেশী ইংরেজী মাধ্যম, বিদেশী ইংরেজী মাধ্যম,কারগরী মাধ্যম, শিক্ষার আরো কত শত মাধ্যম, সরকারী, বেসরকারী, আধা-সরকারী,প্রথম শ্রেনী, দ্বিতীয় শ্রেনী, তৃতীয় শ্রেনী, চতুর্থ শ্রেনী, ক্যাডার, নন ক্যাডার, অ্যাডহক, আরো কত শত ধাপ; সচিবের সন্তান, ব্যাবসায়ীর সন্তান, নেতার সন্তান, নেত্রীর সন্তান, আমজনতার সন্তান, এলাকার সন্তান, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, অমুক্তিযোদ্ধার সন্তান, বৈধ সন্তান, অবৈধ সন্তান, জারজ সন্তান, পালিত সন্তান,ত্যাজ্য সন্তান,আরো কত শত সন্তান; খাঁ বাড়ী, সৈয়দ বাড়ী, মোল্লা বাড়ী, বৈকুন্ঠ বাড়ী, মালো বাড়ী, আরো কত শত বাড়ী; হিন্দু, মুসলিম, জৈন, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান, আরো কত ধর্ম, অধর্ম; শিয়া, সুন্নী, আহলে হাদীস, কাদিয়ানী, আহলে কিতাব, ওহাবী, মাইজভান্ডারী, চরমোনাই, দেওয়ানবাগী, ব্রাহ্মন, ভিক্ষু, কায়েত,আরো কত শত গোত্র-উপগোত্র; লেজুড়বৃত্তি, ঘুষবৃত্তি, ভিক্ষাবৃত্তি, দাক্ষিন্যবৃত্তি, চামচাবৃত্তি, আরো কত শত বৃত্তি; আমি কালা, তুই ধলা, তুই কানা, আমি খোঁড়া, তোর গায় ময়লা, তোর ঘামে গন্ধ, তুই ফাস্ট ফুড খাইস, আমি চিড়া চাবাই, আরো কত শত ঠেলাঠেলি,ধাক্কাধাক্কি,কামড়াকামড়ি,হানাহানি,হাতাহাতি, মারামারি,টানাটানি, দলাদলি,………।। আরো কত শত কত কত ভিন্নতার জোয়ারে আমাদের স্বাধীনতাটাই ডুবতে বসল! বাংগালী সত্ত্বাটা ভুলে অন্য সত্ত্বা খোঁজার হিড়িক পড়ল। এভাবেই চলা শুরু হয়েছিল, এত বছর চলে এল, এভাবেই বুঝি চলে যাবে। অন্ধ আমি, অন্ধ তুমি, অন্ধ সে বা তারা, আমরা বা তোমরা শৃৎকার তুলে যাব দেশের নামে, বাড়ির নামে, জাতের নামে, ধর্মের নামে, মর্যাদার নামে, পদবীর নামে, ক্ষমতার নামে, দলের নামে স্বদেশকে দু’পায়ে দলে, স্বাধীনতাকে খুবলে খুবলে- আবার গিয়ে দাড়াব যার যার বেদীতে, ধর্ষকাম নিবৃত্ত করে নিপাট ভদ্রলোকের মত ফিরে যাব নীড়ে, যার যার ঘরে।

৩১৯ বার দেখা হয়েছে

২ টি মন্তব্য : “স্বাধীনতা দিবস এবং একটি কবিতা”

  1. :boss: গুরু তোমায় সালাম।

    ব্যান্ড থিউরি পড়েছিলাম কলেজে। তাপমাত্রা বাড়লে পরিবাহীর ইলেকট্রন প্রাবহতা কমে আর অর্ধপরিবাহীর ইলেকট্রন প্রবাহতা বাড়ে। দেশের এইটুকু আয়তনে শালার ১৬কোটি মানুষ। চিন্তা করলে বুঝা যায় আমরা হইলাম পরিবাহী। অতিব সু পরিবাহী। তাই ঠেলাঠেলি আর শেষ হবে না। যত সংকট বাড়বে ততই ঠেলাঠেলি বাড়বে আর আমাদের সামনে যাওয়া হবে না। একজন আরেক জনকে কেবল পিছেই টেনে ধরব। এগিয়ে যাক এটা কেউই বোধ হয় চাই না। না হয়, আমরা কেন একটু খানিও এগুতে পারলাম না?????? কেবল পিছিয়েই যাচিছ, পিছিয়েই যাচ্ছি।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।