আমি যেভাবে ক্যাডেট হইলাম…এবং অতঃপর – ২

(ঠিক করেছিলাম শুধু প্রথম দিন, প্রথম মাস আর প্রথম টার্মের কথা লিখবো। পরে ভাবলাম…ক্যাডেট কলেজ ব্লগে আজকাল অনেক কম লেখা পড়ছে সবার…আরেকটু সূচনা দিয়ে এটাই আরেকটু টেনে নিয়ে গেলে কেমন হয়… তাই এই লেখা)

আগের লেখাঃ
আমি যেভাবে ক্যাডেট হইলাম…এবং অতঃপর – ১

২. ভর্তির আগের গল্প
আমাকে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি করার শখটা আমার আব্বার। দুই খালাতো ভাইয়ের একজন ছিল রংপুর ক্যাডেট কলেজের ফার্স্ট ব্যাচের কলেজ প্রিফেক্ট…যে কিনা পরে আর্মির মেজর, আর আরেকজন পাবনা ক্যাডেট কলেজে। আরো দুই মামাতো ভাই মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে পড়াশোনা করে ডাবল স্ট্যান্ড করে হাতি ঘোড়া মেরে বেড়িয়ে দেশের বাইরে চলে গেছে। কাজেই ক্যাডেট কলেজের ডিসিপ্লিন্ড লাইফের এহেন সাফল্যে মুগ্ধ আব্বা অনেক আগে থেকেই আমার কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করতো, ‘তোকে ক্যাডেট কলেজে দিয়ে দিব।’ কিন্তু যাকে দেয়া হবে, তার ইচ্ছে কতটুকু? ঢাকার গভমেন্ট ল্যাবের তখন অনেক নামডাক। প্রতি এসএসসির পরে পেপার আলো করা একগাদা ছেলেদের হাসি মুখে ছবি আর অমুক বড় হয়ে তমুক হতে চায় দেখে আমার মনে হলো…আহা! ওখানেই তো আমার যাওয়া দরকার। কি হবে ক্যাডেট কলেজে গিয়ে খামাখা পিটি প্যারেড করে! ক্লাস সিক্সে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম গভমেন্ট ল্যাবে। তখনকার স্কুলের সবগুলো ছেলের সিট পড়লো এক লাইনে…শুধু রজতের পড়লো পাশের রুমে। আমরা অনেক দাঁত কেলাইলাম ওর কষ্টে। বেচারা! আমরা সবাই দেখাদেখি করে পরীক্ষা দিব আরে ও একা একা কি পারবে না পারবে…। তারপর রজতই চান্স পাইলো আর আমরা কেউ পাইলাম না। বুঝে গেলাম, আসলে আঙ্গুর ফল ভালোই টক।

এই সময় বাসা পাল্টানোর কারণে স্কুলও পালটে বিসিএস আই আর হাই স্কুল থেকে ক্লাস সিক্সে চলে আসলাম মগবাজারে ন্যাশনাল ব্যাংক পাব্লিক স্কুলে। সেখানকার প্রিন্সিপাল আবার মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন প্রিন্সিপাল এফ এম আব্দুর রব স্যার…(বিখ্যাত সেলফ টিচিং ইংলিশ গ্রামার বইয়ের রাইটার)যিনি কিনা আমার মির্জাপুরে পড়া মামাতো ভাই দুটোকে খুব ভালো করে চেনেন। ঢোকার পরে দেখি একি কান্ড! ক্যাডেট কলেজের প্রিন্সিপাল সিভিল স্কুলের প্রিন্সিপাল হলেও এখানে এসে ক্যাডেট কলেজের নিয়ম কানুন চালু করে বসে আছেন। অন্য সব স্কুল যেখানে পিটি করে, লাইনে দাঁড়ায়ে জাতীয় সংগীত গায়…আমরা সকালে অক্সফোর্ড শু পরে ড্রিল করার চেষ্টা করি, ডানে বামে ঘুরি…লেফট রাইট করি। মর্নিং এসেম্বলি করি, সেখানে কোরান তেলাওয়াত আর জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়। প্রিন্সিপাল ভাষন দেয়। আবার দেখি ডিউটি ক্যাডেট স্টাইলে হাতের বাহুতে কাপড় পেচিয়ে ক্লাস নাইনের একজন ঘুরে বেড়ায়। সেটায় আবার ডিউটি প্রিফেক্ট লেখা! এখানে আসার পর আমার রেজাল্টের ব্যাপক চেঞ্জ আসলো। বিসিএস আই আরে যেখানে ফিফথের উপরে কখনো উঠতে পারিনি, ন্যাশনাল ব্যাংকে এসে সেকেন্ড ফার্স্ট হওয়া শুরু করলাম। গায়ে হাওয়া লাগলো ফুরফুরে। ভাবলাম, নাহ! এবার ক্যাডেট কলেজের এডমিশন টেস্টটা দিয়ে না ফেললে আর চলছেই না। আমিতো তারকা ছাত্র। গভমেন্ট ল্যাবে চান্স পাইনাই তো কি হয়েছে, ক্যাডেট কলেজ এডমিশন টেস্টে দেখলুঙ্গা!

আমার বোন হলো আমার টিচার। একটু এদিক সেদিক করলেই চড়ায়ে দাঁত ফেলে দিবে এরকম হুমকি খেতে লাগলাম অহরহ। ধুমধাম কোটি কোটি দেশের কোটি কোটি মুদ্রার নাম মুখস্ত হয়ে যেতে থাকলো। এক খালাতো বোন ইংলিশ শেখাতে লাগলো। দু পাতা ট্রান্সলেশন করে খালাতো ভাইয়ের সাথে আধা ঘন্টা ধরে রুমের মধ্যেই টেনিসবল আর কাঠের ব্যাট দিয়ে ক্রিকেট খেলতাম। আমার বলে ও ধুমধারাক্কা দেয়াল পেটাতো আর আমাকে বাউন্সার দিয়ে দিয়ে ক্যাচ আউট করতো। তখন আবার পড়তে বসতাম। এই করে করে কোন বাইরের কোচিঙে ক্যাডেট ভর্তি কোচিং না করেই রিটেন টেস্ট দিয়ে দিলাম ভর্তি পরীক্ষার। আর সবাইকে অবাক না করে, শুধু নিজেকে একদম তাজ্জবের মধ্যে ফেলে দিয়ে হঠাৎ একদিন পেপার খুলে দেখি ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্টে অনেকের মধ্যে আমার রোল নাম্বার খানাও জ্বলজ্বল করছে।

নাহ। এবারে তো আর ফেলে দেয়া যায় না। ভাইভার আগে হাতে সময় ও বেশি নাই। আম্মা নিয়ে গেল আইডিয়াল কোচিঙে। এখান থেকে কোচিঙ করলে নাকি ক্যাডেট কলেজে চান্স পাওয়া একদম ছেলের হাতের লজেঞ্চুশ। গিয়ে দেখি ওদিন নাকি শেষ ক্লাস। কি ব্যাপার! শুনলাম রিটেন পরীক্ষা দিয়েই নাকি সবাই পরের দিন থেকে ভাইভার ক্লাস করা শুরু করে দিয়েছে রেজাল্টের আগেই। এরা চান্স পাবে নাতো কি আমি চান্স পাবো নাকি! নিজেকে বড়ই বেকুব মনে হলো। আমাকে পরের দিন একটা মক ভাইভা হবে…সেটার জন্য ভরতি করে নেয়া হলো। তারপর বললো, ‘আসো, এখন স্টুডেন্টদের ফটো সেশন করা হবে।’ অনেকের সাথে এককোনায় আমিও দাঁত বের করে ছবি তুললাম। দুইদিন পরে পেপারে বিজ্ঞাপনের ছবি আসলো…’আইডিয়াল কোচিঙের ক্যাডেট ভর্তির লিখিত পরীক্ষার অবিস্মরনীয় সাফল্য!’ ছবির এককোনায় অনেকের সাথে একদিনের জন্য ভর্তি হওয়া আমি। বিজ্ঞাপনে লেখা – সুষ্ঠু নিয়মে কোচিঙে পড়াশোনা করার জন্যেই নাকি আমি আর বাকি সবাই সেই লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার গৌরবে গর্বিত। মক ভাইভা দিতে গেলাম। আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা বলতো, তোমার মাথার উপরে যে ফ্যানটা ঘুরছে,ওটার কয়টা পাখা? উপরে তাকায়ে দেখি ওটা ফুল স্পীডে ঘুরে রুম উড়িয়ে বাতাস দিচ্ছে। কোন রকমে মাথা চুল্কে বললাম, ‘চারটা?’ ওনারা খুব হতাশ। সঠিক উত্তর নাকি হবে, ‘স্যার, সুইচ অফ করে ফ্যান থামলে তখন বলতে পারবো।’ এগুলো নাকি কোচিং ক্লাসে ভালো মতন শেখানো হয়েছে। বুঝলাম…আমার মতন আহাম্মকের দ্বারা হবে না। আম্মাকে ডেকে ওনারা বললেন, ওকে তো আগেই কোচিঙে দেয়া দরকার ছিল…সমস্যা নাই। সাহস রাখতে হবে। আম্মা বললেন…দিয়ে দে… রিটেনে যখন চান্স পাইলি…

তাই, ফিটফাট জামা কাপড় পড়ে দুরুদুরু বুকে গেলাম আমি ঢাকার সেন্টারে আমার ক্যাডেট কলেজ ভর্তি পরীক্ষার ভাইভা দিতে।

চলবে……

১,৩৫০ বার দেখা হয়েছে

৬ টি মন্তব্য : “আমি যেভাবে ক্যাডেট হইলাম…এবং অতঃপর – ২”

  1. জটিল লিখছো মামা ...

    আমার কেইস তো জানোই ... বাপের ইচিংবিচিং কথায় ভুইলা কোচিং-ফোচিং না কইরা খালি মুকুল ছাত্রসখা (এই নামই তো ছিল, নাকি?) পইড়া গেলাম রিটেন টেস্ট দিতে ... তখন আমি এখনকার মত ঘাড়ত্যাড়া ছিলাম না, যে যা বলতো মেনে নিতাম, তাই কোন ইচ্ছা না থাকার পরেও এক্সাম দিছিলাম ... আর বেকুব ছিলাম ইচ্ছা করে যে এক্সাম খারাপ দেয়া যায় ধারণা ছিল না ... যাই হোক, কপাল খারাপাছিলো, টিকে গেলাম; ভাইভার জন্য গেলাম আদমজীতে (স্টীল নো কোচিং), ডাক্তারিতে মান-ইজ্জত সব জলাঞ্জলী দেয়ার পর গেলাম ভাইভার জন্য ... সুইজারল্যান্ডের মুদ্রার নাম কি ব্রিটেনের প্রাইম্মিনিস্টার ক্যাডা এই টাইপ দুই তিনটা কোশ্চেন করার পরে ব্যাটা জিগায়, কৈ কোচিং করছো?

    কইলাম, কোথাও না ...

    ব্যাটা কয়, ভয়ের কিছু নাই, কোচিং করা একদম ঠিকাছে, বল কৈ করছো?

    আরে কি আজিব, আমি যথাসম্ভব সুশীল মুখভঙ্গী কইরা কৈলাম, বিশ্বাস করেন স্যার কোথাও করি নাই ...

    হালায় আবার কয়, আহা তুমি ভয় পাচ্ছ ক্যানো ... ইটস পার্ফেক্টলি অলরাইট ...

    গেল মেজাজ খারাপ হইয়া, কইলাম, কেন কোচিং না করলে কি আপনেরা ভর্তি করেন না?

    ব্যাটা কয়, আচ্ছা ঠিকাছে তোমার ভাইবা শেষ 😀

    আল্লাই জানে ফ্ল্যাট ঠ্যাং নাকি কোচিং না করার অপরাধ কোনটা দায়ী, মির্জাপুর আমারে নিল না ...

    খামাখাই নাঙ্গা হইলাম 🙁

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।