৮ বছর, ১১মাস, ২৫ দিন পর…

শুরুটা ১৯৯৮ সাল থেকে। সে বছরই অনেক অনুনয় বিনয়ের পরে পিতা মাতার কাছ থেকে বাসায় ডিস সংযোগের অনুমোদন পাওয়া গেল। শুধুমাত্র বিটিভির দর্শক হয়ে থাকা আমার সামনে হঠাৎ করে হাজির হলো পুরো নতুন এক জগৎ। প্রথম দু এক দিন মনে হয় শুধু চ্যানেল বদলিয়েই সময় পার করেছিলাম, কিন্তু তারপরেই রক্তের টানে পেয়ে গেলাম আমার আসল ঠিকানা, স্পোর্টস চ্যানেল। যে খেলা দেখায় তাই দেখি, গলফ, বোলিং এক্স গেমস কিছুই বাদ যায় না। তবে সবচেয়ে বেশি টানলো ছোটবেলার প্রেম ফুটবল। কিছুদিন আগে বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে, বিশ্বকাপ নিয়ে সেই ৯০ থেকে মাতামাতি শুরু করলেও ক্লাব ফুটবল সম্পর্কে ধারনা ছিল শুন্য। নিছক নিরপেক্ষ একেবারে শুদ্ধ ফুটবল দর্শক হিসেবে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ দেখা শুরু করলাম। শুধু একটা দল নিয়েই একটু বেশি আগ্রহ ছিল, আর্সেনাল। পিতার আবেশে আবেশিত হয়ে ৯০ থেকেই নেদারল্যান্ডস এর সমর্থক। ৯৮ তে তারা গেল সেমিফাইনাল পর্যন্ত, সেই নেদারল্যান্ড দলে আমার হিরো ছিল বার্গক্যাম্প, আর সে খেলে এই আর্সেনালে। এ কারনে আর্সেনালের খেলা আরো ভাল ভাবে বলতে গেলে বার্গক্যাম্পের খেলা কোনভাবেই মিস করতাম না। অবাক বিষয় হলো কয়েকটা খেলা দেখার পর আমি বার্গক্যাম্পের থেকে পুরো আর্সেনাল দলকে বেশি ভাল লাগা শুরু হলো। কারন ছিল ওদের খেলার স্টাইল, যে কারনে নেদারল্যান্ডসের খেলা ভাল লাগতো একই কারনে আর্সেনালের খেলা ভাল লাগলো, এক কথায় বলতে গেলে Beautiful attacking football. সেই থেকে শুরু, তারপর থেকে মন্ত্র একটাই

arsenal-till-i-die0
প্রথম দিকে জেতার শতকরা হারই বেশি ছিল। কলেজে তখন হাতে গোনা যে কজন ক্লাব ফুটবলের খোঁজ খবর রাখতো মঙ্গল বারের ডেইলি স্টারের খেলার পাতা পড়তে পড়তে জোর গলাই কথা বলতে পারতাম। এই গলার জোর মোটামুটি উঁচুই ছিল ২০০৬ পর্যন্ত। কিন্তু সেবারের চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালের পর থেকে আস্তে আস্তে গলার জোর কমে আসতে লাগলো, যত দিন গেলো সেটা ততই কমতে লাগলো আর হতাশা বাড়তে লাগলো। ততদিনে ক্লাব ফুটবল দেশে মোটামুটি ভালই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, ফুটবল তর্কে লোক অনেক বেড়ে গিয়েছে। আর তারও কিছু পরে ফেসবুকের কল্যানে প্রতিদিন যোগাযোগ হতে লাগলো অগনিত ফুটবল ফ্যানদের, ফুটবলের সাথে আরো বেশি সময় দেয়া শুরু হলো, আরো অনেক বেশি জানা হলো বোঝা হলো। কিন্তু ২০০৫ এর এফএ কাপ ট্রফির পরে আর্সেনালের ট্রফির সংখ্যা আর বাড়লো না। এ অবস্থা চললো পুরো ৮ বছর, ১১মাস, ২৫ দিন!

এই ৮ বছর, ১১মাস, ২৫ দিনে পৃথিবীতে কত কিছু হয়ে গিয়েছে, আমার নিজের জীবনেও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। প্রেম, বিয়ে, সংসার ইত্যাদির পাশাপাশি বয়সও বেড়েছে। শুধু পরিবর্তন হয়নি আমার আর্সেনাল অনুভূতির, প্রতি মৌসুমের শুরুতে আশায় বুক বাধি এবার হবে কিন্তু হয় না। এবারের মৌসুমের শুরুতেও একই ভাবে ভেবেছিলাম এবার হবে, প্রথম দিনে যে আশায় দারুন এক ধাক্কা খেলেও মাঝ মৌসুম পর্যন্ত আশা ভাল ভাবেই জাগিয়ে রেখেছিল কিন্তু তারপরই স্ববাভসুলভ ধ্বস। লীগের আশা জানুয়ারীতে শেষ হয়ে গেলেও এফএ কাপে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছিলো। শেষ পর্যন্ত ৮ বছর, ১১মাস, ২৫ দিন পর ফাইনালে মাঠে মাঠে নামলো আর্সেনাল। প্রতিপক্ষ কাগজে কলমে অনেক দূর্বল কিন্তু সেটা আর্সেনাল ফ্যানদের মনে হয় না সাহস যোগাচ্ছিল।

আমি সাধারনত কোন কুসংস্কারে বিশ্বাষ করি না, তবে খেলা দেখার সময় কিছু অভ্যাস কাজ করে। আর্সেনালের জার্সি পরে খেলা না দেখা এর মাঝে একটা কারন আর্সেনালের জার্সি পরে খেলা দেখে ফলাফল খুব একটা পক্ষে পাইনি। তাই কাল খেলা দেখতে শুরু করলাম সাধারণ টি শার্ট পরেই। লাভ হলো না, শুরুতেই গোল খেয়ে বসলাম। এবার ভাবলাম আর্সেনালের জার্সি সামনে রেখেও না পরার কারনেই এই অবস্থা, টি শার্ট বদলে আর্সেনালের জার্সি পরলাম। ফলাফল বিপরিত, আরেকটা গোল খেলাম। এবার দোষ দিলাম জার্সি পরায়, খুলে আবার টি শার্ট। এর কিছুক্ষন পরে সবচেয়ে লাকি কাজটা হলো, খেলার মাঝে ফোন আসলো। টিভি মিউট করে ফোনে কথা বলা শুরু করতে না করতেই আর্সেনাল গোল দিল। এটা এ বছরের চতুর্থ বারের মত ঘটলো, টিভি মিউট করে ফোনে কথা বলার সময় আর্সেনালের গোল। আশা কিছুটা ফিরে পেলাম। এর মাঝে প্রথমার্ধ শেষ। আমার মাথায় তখন ঘুরছে কিছু একটা বদলাতে হবে খেলার ফলাফল বদলানোর জন্য। খেয়াল করলাম ৫ দিন ধরে শেভ করা হয় না, এটা একটা ভাল পরিবর্তন হতে পারে। সাথে সাথে বাথরুমে গিয়ে শেভ করে আসলাম। দ্বিতীয়ার্ধ শুরু, প্রথম দিকে কিছুই হচ্ছিলো না। এবার মাথায় আসলো অন্য চিন্তা, আগের বার জার্সি পরার পর পর এক গোল করা দল ২য় গোল করেছিল। সাথে সাথে আবার জার্সি পরলাম। তারপরও যখন কিছু হচ্ছিল না তখন মনে মনে চাচ্ছিলাম একটা ফোন আসুক!

এর কিছুক্ষন পরেই প্রায় মিরাকল ঘটলো, ফোন আসলো। আমি টিভি মিউট করে ফোনে কথা বলছি কিন্তু মনযোগ খেলার দিকে, গোল এবার নিশ্চিত। অকারনে ফোনের কথা লম্বা করলাম। এর মাঝে গোল প্রায় হয়েই যাচ্ছিল কিন্তু গোলপোস্টের পাশ ঘেষে বল বাইরে চলে গেল। হতাশ হয়ে এবার আর হবে না ভেবে ফোন রেখে দিয়েছি। তবে টিভি তখনও মিউট করা। দেখলাম রেফরির ভুলে গোলকিকের বদলে কর্ণার পেয়েছি। আর সেই কর্ণার থেকে গোল! ২-২। আশা কিছুটা ফিরে পাওয়া গেল। এবার মনে হলো ফোনে কথা আসল ব্যাপারনা, টিভি মিউট করাই আসল। বাকি খেলা মিউট করেই দেখতে লাগলাম। কিছুক্ষন পরে দেখি তাতেও লাভ হচ্ছে না। এর মাঝে দারুন একটা সুযগ নষ্ট করলো আর্সেনাল। ততক্ষনে আবার মাথায় চলে এসেছে ফোনে কথা বলার কথা। নিজে কাউকে ফোন দিয়ে কখনো চেষ্টা করে দেখিনি তাই হিতে বিপরীত হতে পারে ভেবে সেই চেষ্টায় গেলাম না। কিন্তু আরো উদ্ভট কাজ করলাম।

বিশ্বাষ করুন আর নাই করুন, তখন ফোন দিলাম গ্রামীন ফোনের ১২১ নম্বরে। রেকর্ডেট ভয়েসের কথা শুনে যদি কিছু হয়! প্রায় দুমিনিট চেষ্টা করেও লাভ হলো না। গোল আর হচ্ছে না।

এত কিছুর মাঝেও আমার ল্যাপটপে তখন চলছে অন্য খেলা, বার্সিলোনা আর এথলেটিকো মাদ্রিদ। আর্সেনালের খেলার ৯০ মিনিটের কিছু সময় আগে শেষ হলো ঐ খেলা, ড্র করে স্প্যানিশ লীগ চ্যাম্পিয়ন হলো এথলেটিকো। ওদের এই জয়ে এতটাই আন্দদিত হলাম যে আর্সেনালের খেলার মানসিক চাপ অনেকটাই কমে গেল। এর মাঝে আর্সেনালের খেলার প্রথম ৯০ মিনিট শেষ। এবার পুরোপুরি হাল ছেড়ে দিয়ে সব সংস্কার বাদ দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে ভলিউম বাড়িয়ে আর্সেনালের জার্সি গায়ে রেখেই খেলা দেখতে লাগলাম। অতিরিক্ত সময়ের প্রথম ১৫ মিনিটের খেলা শেষ। মনে মনে টাইব্রেকারের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে শেষ ১৫ মিনিটের খেলা দেখা শুরু করলাম। প্রথম ৫ মিনিটের মাঝেই ঘটনা ঘটে গেল, আমাদের র‍্যাম্বো রামসি দারুন এক গোল দিল। কোন ফোন ছাড়াই, মিউট ছাড়াই এবং জার্সি পরে থাকা অবস্থায়! এত জোরে চিৎকার করে উঠলাম যে আশেপাশের কেউ শুনলে দৌড়ে চলে আসতো কোন দূর্ঘটনা ঘটেছে কি না দেখার জন্য। এরপর অনেক লম্বা একটা ১০ মিনিট। মাঝে একবার হার্টবিট মিস করলাম, অল্পের জন বেঁচে গেলাম গোল খাওয়ার হাত থেকে। শেষ পর্যন্ত শেষ বাঁশি বাজলো। ৮ বছর, ১১মাস, ২৫ দিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আর্সেনাল একটা শিরোপা জিতলো। সে মূহুর্তের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব না, মুন্নি সাহা এসে জিজ্ঞেষ করলেও না।

এরপর ৮ বছর, ১১মাস, ২৫ দিন পর দেখলাম আর্সেনালের হাতে ট্রফি উঠতে, তার আগে ট্রাইপডে ক্যামেরা লাগিয়ে আমি তৈরী। এই উৎসবে আমাকেও সামিল হতে হবে, সেলফ টাইমারে অগনিত ছবি তোলা হলো(শেষ পর্যন্ত যার একটার টাইমিং পারফেক্ট হয়েছিল)।

1

এফএ কাপ খুব বড় কোন ট্রফি না, গুরুত্বের বিচারে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, প্রিমিয়ার লীগের পরেই এর অবস্থান হবে। তবে আমি নিশ্চিত কোন আর্সেনাল ফ্যানের আপাতত এটা নিয়ে ভাবার সময় নেই। শেষ পর্যন্ত আমরা কিছু জিতলাম। জানি না পরের ট্রফির জন্য আবার কতদিন অপেক্ষা করতে হবে, হয়তো কয়েক মাস, বছর কিংবা আরো ৯ বছর। সেটা যদি ৯ এর বদলে ৯০ ও হয় তারপরেও স্লোগান থাকবে একটাইঃ

arsenal-till-i-die0

* কেউ যদি অসীম ধৈর্য দেখিয়ে আমার এই লেখা শেষ পর্যন্ত পড়ে ফেলেন তাহলে আমার এই ফুটবল নিয়ে, আর্সেনাল নিয়ে নিন্তান্ত বাল্যসূলভ আবেগের বিবরনী দিয়ে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। লেখাটা আসলে নিজের জন্যই লেখা, কাল রাত থেকে যে আবেগ ভেতরে ভেতরে জমছিল সেটার একটু মুক্তি দেবার জন্য।

** ভবিষ্যতে কখনো আমার হার্টের কোন ধরনের অসুখ দেখা দিলে নিশ্চিন্ত মনে আর্সেনালকেই দায়ী করবেন।

১,৫৪২ বার দেখা হয়েছে

১৭ টি মন্তব্য : “৮ বছর, ১১মাস, ২৫ দিন পর…”

  1. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    আমার দেখা মতে বাঙলাদেশের গানারস দের সাপোর্টার সবচাইতে বেশি।
    সো তাদের জন্য নিঃসন্দেহে আনন্দের দিন।
    :hug: :guitar:


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  2. পারভেজ (৭৮-৮৪)

    পাঁচ দিন কম ৯ বছর। আবেগ একটু বেশী হবেই।
    লিখায় তা ভালই উঠে এসেছে।
    যারা ইংলিশ লিগ বা ইউরপিয় ক্লাব ফুটবল ফলো করে না, এই লিখাটা পড়লে তাঁদের মনে হবে কি যেন একটা মিস করে ফেলছে!!

    কোথায় যেন একবার পড়েছিলাম, ফুটবল মৌসুমে বিবাহিত ব্রিটিশ পুরুষদের যৌনজীবন প্রভাবিত হয়। কিছু কিছু বিবাহ-বিচ্ছেদ, নতুন সম্পর্কে জড়ানোর ঘটনা তো আছেই তবে যৌনতায় অনীহাই প্রধান অনুষঙ্গ।
    এত উত্তেজনার কারনে সেটা সত্য না হবার কোন কারন দেখছি না।


    Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

    জবাব দিন
  3. শাহরিয়ার (০৬-১২)

    প্রথমে আমি একটু অবাকই হচ্ছিলাম এফএ কাপের ট্রফি পেয়ে আর্সেনাল সাপোর্টারদের এতো উল্লাসে। পরে নিজেকে আপনাদের অবস্থানে চিন্তা করে কিছুটা হলেও বুঝতে পারছিলাম অনুভূতিটা। যাই হোক, অভিনন্দন। আমি আপনার অন্যতম একটা রাইভাল ক্লাবের সাপোর্টার। বলেন তো কোনটা?


    • জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব - শিখা (মুসলিম সাহিত্য সমাজ) •

    জবাব দিন
  4. নাফিস (২০০৪-১০)

    রিয়াল মাদ্রিদ এর চ্যাম্পিয়নস লিগ এর ফাইনাল এ আমার অবস্থা কেরোসিন হয়ে গেছিল। নার্ভাস নেস। এই অভিজ্ঞতা নিয়ে এরকম একটা লেখা লিখার তাগিদ অনুভব করতেছি।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।