স্মৃতির বিশ্বকাপ-২

(বিশ্বকাপের স্মৃতি নিয়ে সিরিজ শুরু করে এখন হালকা বিপদে পড়ে গেছি, ১১ই জুন দ্রুত কাছে চলে আসছে, তার আগে আরো ৪টি বিশ্বকাপ কভার করতে হবে, আজ ১৯৯৪ দিয়ে দিলাম, আশা করি বাকি তিনটেও ডেটলাইনের আগেই দিতে পারবো।)

স্মৃতির বিশ্বকাপ-১

১৯৯৪ (ইউএসএ)1

সত্যিকার ভাবে বিশ্বকাপ উপভোগ করা শুরু করেছি ১৯৯৪ এর বিশ্বকাপ থেকে। টুর্নামেন্ট শুরুর জন্য দিন গোনা, ছাদে ফ্লাগ ওড়ানো, পত্রিকা, ম্যাগাজিন থেকে ছবি, প্রিভিউ, ফিক্সচার জোগাড় করা এক কথায় পুরোদস্তুর প্রস্তুতি নিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করেছিলাম। ৯০ এর মত এবারো হল্যান্ডের সাপোর্টার, টুর্নামেন্ট শুরুর আগে টিমের তেমন কাউকেই চিনতাম না। আর এন্টি আর্জেন্টিনা হবার কারনে আশেপাশের ব্রাজিলের সাপোর্টারদের সংস্পর্শে এসে ব্রাজিল সম্পর্কে দল অনেক কিছুই জানতাম সে কারনে ব্রাজিল আমার সেকেন্ড দল হয়ে গিয়েছিল।

৯৪ এর উদ্ভোধনী অনুষ্ঠানের কথা মনে থাকবে অনেকদিন, এর সৌন্দর্যের কারনে নয় বরং উদ্ভোধনী গান গাওয়া গায়িকার(ডায়ানা রস, তখন নাম জানতাম না) পেনাল্টি মিসের কারনে। বল পেনাল্টি স্পটে বসানো ছিল, ঐ গায়িকা কিক করে গোল দিলে বার ভেঙ্গে দুভাগ হয়ে যাবার কথা। কিন্তু বল গোলপোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়, কিন্তু বার ঠিকই ভেঙ্গে পড়ে।

গ্রুপ পর্বের সবগুলো খেলা দেখার সুযোগ পাইনি, কারন পরের দিন স্কুল। তারপরও বেশ কিছু খেলাই দেখা হয়েছে। এর মাঝেই ফ্যান হয়ে গিয়েছিলাম স্টইচকভ, হাজি, রোমারিও, বেবেতো আর অবশ্যই হল্যান্ডের ডেনিশ বার্গক্যাম্পের ( এই বার্গক্যাম্পের কারনেই পরবর্তীতে আমার আর্সেনালের সাপোর্টার হয়ে ওঠা।) মনে আছে ইউএসএ’র সাথে কলম্বিয়ার এসকেবারোর আত্মঘাতী গোল দেখে বেশ হাসাহাসি করেছিলাম। তবে কদিন পরে যখন শুনলাম সে কারনে তাকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে তখন বেশ খারাপ লেগেছিল।

৯৪ এর বিশ্বকাপে আমার জন্য(সেই সাথে সব এন্টি আর্জেন্টিনা পার্টির) সবচেয়ে আনন্দদায়ক মুহুর্ত ছিল ম্যারাডোনার ড্রাগ টেস্টে ধরা পড়ে বহিস্কার হয়ে যাওয়া। এটা আর্জেন্টিনার সমর্থকদের বিরুদ্ধে আমাদের মোক্ষমতম হাতিয়ার হয়ে গেল, যদিও আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছিল। মনে আছে ম্যারাডোনার পক্ষে রাস্তায় প্রচুর মিছিলও নেমেছিল।
ড্রাগের কারনেই গ্রীসের বিপক্ষে গোলের পরে ম্যারাডোনা এই মাত্রাতিরিক্ত সেলিব্রেশন করে বলে সন্দেহ করা হয়।

ছোটবেলা থেকেই ফুটবলে আমার ফেভারেট পজিসন হল গোলকিপার। কলেজ লাইফ পর্যন্ত নিজেও খেলেছি ঐ পজিসনে। ৯৪ এ প্রথম ভাল লেগেছিল ইউএসএ’র টন মেওলা। মূলত তার কাঁধে ভর করেই ওরা সেকেন্ড রাউন্ডে উঠেছিল। সেখানে খেলা পড়ে ব্রাজিলের সাথে। যদিও ঐ ম্যাচে আমি ব্রাজিল সাপোর্ট করছিলাম, তারপরো খেলা শেষে কেদে ফেলা মেওলাকে দেখে মন বেশ খারাপ হয়েছিল। আর গোলকিপিং কোয়ালিটির দিক থেকে ভাল লেগেছিল সুইডেনের টমাস রিভেলিকে। তবে ঝকমকে ড্রেস আর হালকা পাগলামির কারনে আমার ফেভারিট ছিল মেক্সিকোর ক্যাম্পোস।

এই বিশ্বকাপের আমার সেরা ম্যাচ হল্যান্ড-ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনাল। ব্রাজিলের প্রতি কিছুটা দূর্বলতা থাকলেও এ খেলায় মনে প্রানে চাচ্ছিলাম হল্যান্ড জিতুক। আর এ ম্যাচের আগে নতুন একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল, সেটা হল প্রচুর হল্যান্ড সাপোর্টারের খোঁজ পাওয়া। বলাই বাহুল্য তারা সবাই ছিল এন্টি ব্রাজিল পার্টি। ব্রাজিল রোমারিও আর বেবেতোর গোলে ২-০ তে এগিয়ে গিয়েছিল। বার্গক্যাম্প আর উইন্টারের গোলে হল্যান্ড সমতা ফিরিয়ে আনলেও শেষ পর্যন্ত ব্রাঙ্কোর গোলে ব্রাজিল ম্যাচ জিতে যায়।
হল্যান্ডের বিপক্ষে গোল করার পর বেবেতো’র সেই বিখ্যাত সেলিব্রেশন।

বিশ্বকাপের দুই সারপ্রাইজ দল ছিল বুলগেরিয়া আর সুইডেন। উভয়েই সেমিফাইনালে উঠেছিল। বুলগেরিয়ার শুধু স্টইচকভের কথা মনে থাকলেও সুইডেনের কেনেথ এন্ডারসন, টমাস ব্রোলিন, মার্টিন ডাহলিন আর গোলপোস্টে রিভেলি নজর কেড়ে ছিল।

৯৪ এর বিশ্বকাপকে বলা যায় রোমারিও আর ব্যাজিও’র বিশ্বকাপ। নিজেদের দলকে ফাইনাল পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছিল তারা। কিন্তু ফাইনালে ঐ ব্যাজিও’র টাইব্রেকার মিসের মধ্য দিয়েই বিশ্বকাপ চলে যায় ব্রাজিলের ঘরে। ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে ৪র্থ বারের মত কাপ জেতে ব্রাজিল। মনে আছে ফাইনাল উপলক্ষে পরের দিন স্কুল ছুটি পেয়েছিলাম।

১৯৯৪ এখানেই শেষ, তবে তাড়াহুড়ো করে লেখায় অনেক কিছুই বাদ পড়েছে। এবার বাকিদের স্মৃতিকথা শোনার অপেক্ষায়…

২,৭৯৮ বার দেখা হয়েছে

৩০ টি মন্তব্য : “স্মৃতির বিশ্বকাপ-২”

    • রকিব (০১-০৭)

      প্রথমবারের মতো সেবার বিশ্বকাপের আমেজটা টের পেয়েছিলাম। স্কুলের আর্ট খাতার পৃষ্ঠা ছিড়ে একটা ব্রাজিলের পতাকাও এঁকেছিলাম মনে পড়ে। খেলা অতোটা না বুঝলেও ফুফাতো ভাইয়ের বদৌলতে রোমারিও, বেবেতো, বার্গক্যাম্প, লিওনার্দো্‌, ম্যারাডোনা, কাফু, ক্লাইভার্টকে চেনা হয়ে গিয়েছিলো। ফাইনালের কথা মনে আছে দুই-হাফ দেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পরে ট্রাইব্রেকারের সময় ভাইয়া জাগিয়ে তুলেছিল।
      তবে ৯৪ তে গোলি বলতে চিনতাম কেবল দুইজনকেঃ তাফারেল (ভাইয়া চিনিয়ে দিয়েছিলো) আর লম্বা ঝাঁকড়া চুলের ভালদোরামাকে যাকে আরো ভালোভাবে দেখেছি পরের বিশ্বকাপে।


      আমি তবু বলি:
      এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

      জবাব দিন
  1. মইনুল (১৯৯২-১৯৯৮)

    ৯৪ এর বিশ্বকাপটা ছিলো ক্যাডেট কলেজে প্রথম বিশ্বকাপ। বছরের শুরু থেকেই বিশ্বকাপের আলোচনাতে পরিবেশ রীতিমতন গরম থাকতো। আমাদের ব্যাচে প্রায় সমান সমান ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা সমর্থক ছিলো। আহসান আর এনাম ছিলো ইতালীর সাপোর্টার এবং তাহের আর মোস্তাফিজ ছিলো জার্মানির সাপোর্টার। অনেক চেষ্টা করেও মাজহার কোন টিমের সাপোর্টার মনে করে উঠতে পারছিলাম না। ব্যাচের গ্রুপ মেইলে জানতে চাইলে নাফিজ জানালো ওই বেডা যে জিততো তাকেই সাপোর্ট করতো। কি জানি, তবে আমার মনে পড়ে আমি তাকে হল্যান্ডের খেলাগুলো খুব আগ্রহ নিয়ে দেখতে দেখেছি। এই বিশ্বকাপের সময় হায়দার ভাই আমার রুমমেট ছিলেন। উনি কোন টিম সাপোর্ট করতেন সেটাও ভুলে গিয়েছি। যাহোক, ওই সময় ওই খোচাখুচি থেকে যা শিখলাম ---
    ১) আর্জেন্টিনা সাপোর্টারদের ধারনা, ম্যারাডোনা ছাড়া আর কেউই ফুটবল খেলতে পারে না আর পেলে একেবারেই ভুয়া।
    ২) ব্রাজিল সাপোর্টারদের মতে, ম্যারাডোনা একটা চোর এবং গাঞ্জাখোর।
    ৩) আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা বিরক্তিকর রকমের গলাবাজ। খেলাতে টিম যেমনই খেলুক, গলাতে রহিব সবার সেরা --- টাইপের মটো।
    ৪) আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা খুবই অযৌক্তিক টপিক নিয়ে খোচা মারে। এই যেমন, ২৪ বছর খবর নাই, তোরা আর কি জিতবি, বাড়িতে গিয়া ঘুমা ...... ইত্যাদি ইত্যাদি।
    ৫) প্রতিটা খেলা দেখার সময় খুবই হিসেব নিকেশ করে সাপোর্ট করতে হবে। ভালো খেলছে এমন দলকে সাপোর্ট করার চাইতে যে দল জিতলে ভবিষ্যতে আমার দলের উপকার হবে সে দল সাপোর্ট করা উচিৎ। (যেন আমি সাপোর্ট করলেই ওই দল জিতবে)
    মোটামুটিভাবে বিশ্বকাপ শুরু হবার আগে কিভাবে যে মডারেট ফুটবল ফ্যান থেকে হার্ডকোর ব্রাজিল ফ্যান আর হার্ডকোর অ্যান্টি আর্জেন্টিনা হয়ে গেলাম টেরও পেলাম না। এই বিশ্বকাপের আগে কলম্বিয়া খুবই আলোচিত দল ছিলো। বাছাই পর্বে আর্জেন্টিনার মাটিতে আর্জেন্টিনাকে ০-৫ গোলে হারিয়েছিলো কলম্বিয়া। ভালদেরেমা, এস্প্রিয়া, ভ্যালেন্সিয়া - এরা সবাই ছিলো দুর্দান্ত ফর্মে। কিন্তু গোটা বাছাই পর্ব বা প্র্যাকটিস ম্যাচগুলো কাঁপিয়ে ওরা বিশ্বকাপের সময় খুবই জঘন্য খেলা খেললো। শেষে যুক্তরাষ্টের সাথে ম্যাচে আন্দ্রেস এস্কোবারের দুর্ভাগ্যজনক আত্মঘাতি গোলে পিছিয়ে পড়ে শেষ পর্যন্ত হেরে গিয়ে বাদ পড়ে যায়। তারপরে কলম্বিয়া ফিরে যাবার পরে এস্কোবারকে গুলি করে মেরে ফেলে মাফিয়ার বাজিকরেরা (তখন পেপারে যেটা পড়েছিলাম)। বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এটা একটা দুঃখজনক স্মৃতি হয়ে থাকবে। ব্রাজিলের শুরুটা হলো খুবই চমৎকার। প্রতিটা ম্যাচে রোমারিও স্বপ্নের মতন খেলছিলো। রাশিয়ার সাথে ২-০ গোলে আর ক্যামেরুনকে ৩-০ গোলে জেতার পরে সুইডেনের সাথে ১-১ গোলে ড্র করার পরে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের সেকি উল্লাস। ঠিক দুদিন পরেই যখন ম্যারাডোনা ডোপ টেস্টে ব্যর্থ হলো আর আর্জেন্টিনা বুলগেরিয়ার সাথে ০-২ গোলে হেরে গেলো, আমরাও সেই রকমভাবে পচিয়ে ছাড়লাম তাদের। তবে গলাবাজিতে ওদের সাথে পেরে ওঠা খুবই কষ্ট। সব চাইতে কঠিন কাহিনী হচ্ছিলো গ্রুপ ই তে। শেষ খেলার আগে ৪টা টিমেরই একটা জয় একটা পরাজয়। যে কেউই বাদ পড়ে যেতে পারে। শেষ খেলার দিন ইতালির সাপোর্টারেরা দুরুদুরু বুকে মেক্সিকোর সাথে খেলা দেখতে গেলো। গ্রুপের ম্যাচদুটো শেষ হবার পরে দেখা গেলো সাবারই পয়েন্ট ৪ এবং ইতালি আছে ৩য় স্থানে। পরের পর্বে ওঠা হবে কিনা জানতে আরো দুদিন অপেক্ষা। শেষে ইতালি ৪র্থ ৩য় টিম হিসেবে উঠতে পারলো। কলম্বিয়ার বাদ পড়া ছাড়াও এই রাউন্ডে আলোচিত বিষয় ছিলো ক্যামেরুনের সাথে ওলেগ সালেঙ্কোর ৫ গোল আর বেলজিয়ামের সাথে সাইদ আল ওয়াইরানের খুবই সুন্দর একটা গোল।
    দ্বিতীয় রাউন্ডের শুরুর দিন যথারীতি ফেবারিটেরা জিতে গেলেও পরের দিন আর্জেন্টিনা রুমানিয়ার সাথে হেরে গেলো। ম্যারাডোনাকে হারানো ধাক্কা মনে হয় তখনও সামলে উঠতে পারেনি। তারপরের দিন ব্রাজিলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের আর হল্যান্ডের সাথে আয়ারল্যান্ডের খেলা ছিলো। ভালো খেলা সত্ত্বেও যখন ব্রাজিল গোল পাচ্ছিলো না আর লিওনার্দো যখন লাল কার্ড খেয়ে গেলো তখন রীতিমতন ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু পরে রোমারিওর ক্রস থেকে বেবেতোর গোলে ওই যাত্রা পার হয়ে গেলো। এই খেলা শেষ হতেই দেখি আর্জেন্টিনার সাপোর্টারেরা কিভাবে জানি হল্যান্ডের সাপোর্টার হয়ে গিয়েছে। নাইজেরিয়া-ইতালির ম্যাচে নাইজেরিয়া সাপোর্ট করছিলাম ইউরোপ বিরোধী ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে। তবে ৮৮ আর ১০০ মিনিটে রবার্তো ব্যাজিও যে দুটো গোল দিয়েছিলো তা এক কথায় অসাধারন।
    কোয়ার্টার ফাইনালে হল্যান্ডের সাথে ব্রাজিলের খেলাটা খুবই দারুন জমেছিলো। ব্রাজিল ২-০ গোলে এগিয়ে যাবার সাথে সাথেই হল্যান্ড ১০ মিনিটের মধ্যে আবার ২-২ করে ফেলে। আমার এক বন্ধু ২-২ হয়ে যাবার কিছু পরে প্রকৃতি ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে তৃতীয় গোলটা মিস করে ফেলে আক্ষরিকভাবেই দেয়ালে মাথা ঠুকেছিলো। জার্মানির সাপোর্টারেরা, যারা দ্বিতীয় রাউন্ডে বুলগেরিয়া মেক্সিকোর ম্যাচে বুলগেরিয়াকে জিততে দেখে আহ্লাদে আটখানা হয়ে গিয়েছিলো, তাদের বুকে পাথর মেরে বুলগেরিয়া জার্মানিকে হারিয়ে দিলো। আমাদের চার ব্যাচ সিনিয়র আহমদ ভাই সেবারই প্রথম দেখেছিলাম মেজাজ হারাতে।
    ইতালি আর বুলগেরিয়া সেমি ফাইনালে যথারীতি রবার্তো ব্যাজিও ম্যাজিকে ইতালি জিতে গেলো। আর সুইডেনের সাথে অনেক কষ্টে রোমারিও একটা গোল বের করতে পারলো। আমরা খুবই নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলাম এই ম্যাচ দেখার সময়। কারন থমাস রাভেল্লী যে অসাধারন সেভ করে চলছিলো, মনে হচ্ছিলোনা খেলা টাইব্রেকারে গেলে ব্রাজিল জিততে পারবে।
    ফাইনালের দিনে গোড়া থেকেই ব্রাজিলের সাপোর্টারেরা বাদে বাকি সবাই দেখি ইতালিকে সাপোর্ট দেবে। সবাই হিসেব নিকেশ দেখালো, ইতালীর খেলা এই আসরে আস্তে আস্তে ভালো হয়েছে আর ব্রাজিলের খেলা হয়েছে খারাপ। প্রথমবারের মতন ব্রাজিলের ফাইনাল খেলা দেখছি, তাও এতো বিশাল জনসমাগমে, উত্তেজনাটাই আলাদা। ফাইনালে গোল না পাবার ব্যাপারটা বাদ দিলে খারাপ খেলেনি ব্রাজিল। তবে মালদিনির নেতৃত্বে ইতালিয়াল জমাট ডিফেন্স কেউই ভেদ করতে পারছিলো না। তাও টুকটাক যে কয়বার ডিফেন্স ফাকি দেয়া গেলো পোস্টের সামনে পাগলিউকা দেয়ালের মতন দাঁড়িয়ে আছে। এই ম্যাচ টাতে সে আসলেই অতিমানবিক কিছু সেভ করেছে। আর ব্রাজিলের ডিফেন্স ব্যাজিওকে বক্সবন্দি করে রাখায় ইতালির আগের ম্যাচগুলো যে স্ট্র্যাটেজি ছিলো --- "ব্যাজিওকে লং পাস দাও, সে গোল করে দেবে", কাজ করছিলো না। শেষে টাইব্রেকার শুরু হবার সময় মোটামুটিভাবে ধরে নিয়েছিলাম ২৪ বছর পরে এবারও হলো না। আর টাইব্রেকার দেখার সাহস না করে টিভি রুম থেকে বের হয়ে গেলাম। প্রথম শটের পরে ব্রাজিল ব্রাজিল শ্লোগান শুনে উকি মেরে দেখি ইতালির প্রথম জন মিস করেছে। একটু আনন্দিত হয়ে ব্রাজিলের শটটা দেখতে দিয়ে দেখি পাগলিউকা সেটা ঠেকিয়ে দিয়েছে। এর পরে আবার বের হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। ঠিকঠাক মতোই ইতালি ইতালি বা ব্রাজিল ব্রাজিল শ্লোগান আসছিল হঠাৎ শুনি পর পর দুবার ব্রাজিল ব্রাজিল। আবার টিভি রুমে গিয়ে কুফা না লাগিয়ে বাইরে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। আবার ব্রাজিলের শ্লোগান শুনে বুঝলাম ব্রাজিল এগিয়ে গিয়েছে। তার পরে আর শ্লোগান না, তীব্র চিৎকার এবং ব্রাজিলের সাপোর্টারদের নাচতে নাচতে বেরিয়ে আসা দেখে বুঝলাম অবশেষে পাওয়া গেলো চার নম্বরটা। পরে হাইলাইটসে দেখেছি রবার্তো ব্যাজিও শেষ কিকটা মিস করেছে। অসাধারন একটা টুর্নামেন্ট যাচ্ছিলো তার, সেটার করুন সমাপ্তি। ফুটবল আসলেই নিষ্ঠুর।

    জবাব দিন
    • মামুন (০০-০৬)
      আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা বিরক্তিকর রকমের গলাবাজ। খেলাতে টিম যেমনই খেলুক, গলাতে রহিব সবার সেরা — টাইপের মটো।

      পুরাই সহমত :boss: :boss:
      ভাই আমিও এন্টি-আর্জেন্টিনা 😀 😀 😀 😀
      তয় আমার সাপোর্ট ইংল্যান্ড :salute: :salute:

      জবাব দিন
    • আহসান আকাশ (৯৬-০২)
      আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা বিরক্তিকর রকমের গলাবাজ। খেলাতে টিম যেমনই খেলুক, গলাতে রহিব সবার সেরা — টাইপের মটো।

      আর্জেন্টিনার সমর্থকদের সম্পর্কে আপনার মতের সাথে পুরোপুরি সহমত... তবে ব্রাজিলের সমর্থকেরাও এর থেকে খুব বেশি পিছিয়ে নেই... এন্টি আর্জেন্টিনা তো প্রথম থেকেই ছিলাম, ব্রাজিলের সমর্থকদের গলাবাজির কারনে ২০০২ থেকে ওদেরও সহ্য হয় না।


      আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
      আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

      জবাব দিন
      • মইনুল (১৯৯২-১৯৯৮)

        আসলে ২০০২ এর বিশ্বকাপের ব্যাপারটা একটু অন্য রকম ছিলো আহসান। ৯৮ এর ফাইনালে পুরোপুরি নির্মম ভাবে হারের পরে, সেই দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ফ্রান্স প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়লো। তারপরে কোপাতে হন্ডুরাসের কাছে ব্রাজিল হেরে গেলে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের জ্বালাতে টেকা যাচ্ছিলো না। আর তখন আর্জেন্টিনার প্লেয়াররাও দারুন ফর্মে ছিলো। এখন সেই আর্জেন্টিনা যখন প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়ে গেলো 😀 😀 😀 😀 , সেই আনন্দ হজম করা আমাদের জন্যে বেশ কষ্টকর ছিলো। এই জন্যে সেবারে একটু বেশি হয়ে গেছে। সাধারনত ব্রাজিলের সাপোর্টারেরা কিন্তু খুব ভালো। O:-) O:-) O:-) O:-) O:-) (সম্পাদিত)

        জবাব দিন
  2. আছিব (২০০০-২০০৬)

    আমি তখন ব্যাজ্জিও,রোমারিওকে চিন্তাম,ফাইনাল মনে আছে।পুরাটা মনে নাই......আচ্ছা ওই ওয়ার্ল্ড কাপে কি রিভালদো একটা গোল মাঝমাঠ থেকে দিছিলো??কি জানি সব তাল্গোল পাকাইছে ~x(

    আহ,ভাইরা কি হার্ডকোর সাপোর্টার!!সব মনে রাখছে.........কিছুই হইতে পারলাম না জীবনে :bash:

    আহসান ভাই,স্বপ্নচারী ভাই দুইজনকেই ''প্যারেড,সাধারণ সালাম দিবে,সাধারণ সালাম'' :salute:

    জবাব দিন
    • মইনুল (১৯৯২-১৯৯৮)

      আসলে এইটা ব্যাপার না রায়েদ। ২০০২ এর বিশ্বকাপের সময় আমার এক রুমমেট, আমাদের এক বছর জুনিয়র, আর্জেন্টিনার সাপোর্টার ছিলো আর রুমে আমরা বাকি তিন জন ব্রাজিলের সাপোর্টার। তো তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আর্জেন্টিনা কেনো সাপোর্ট করে। সে জানালো, সে যখন বড় হচ্ছে, বুঝ-বুদ্ধি হওয়া শুরু হচ্ছে, তখন দেখেছে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন। ম্যারাডোনার ছবি কাভারে থাকা খাতাতে লেখা পড়া করতে করতে ম্যারাডোনা মাথায় ঢুকে গেসে। এই ভাবে আস্তে আস্তে আর্জেন্টিনার সাপোর্টার। তুমি কার হার্ডকোর ফ্যান, এইটা আসলে ব্যাপার না। আমাদের, ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার ফ্যানদের বোঝাচ্ছি, মুল ঝামেলা হলো, আমরা পরাজয়টাকে সহজে মেনে নিতে পারিনা।

      জবাব দিন
  3. মেহেদী হাসান (১৯৯৬-২০০২)

    হুম, এটাই ছিল ভালো ভাবে দেখা আমার প্রথম বিশ্বকাপ। ম্যারাডোনার বিদায়ে খুব খারাপ লেগেছিল। প্রতিদিন রাত জেগে থাকতাম খেলা দেখার জন্য, কিন্তু বেশির ভাগ দিনই খেলার মাঝামাঝিতে ঘুমিয়ে যেতাম। আবার খেলা শেষে সবাই ডেকে তুলতো। অনেক মজা করেছি সেসময়।

    জবাব দিন
  4. রবিন (৯৪-০০/ককক)

    ৯৪ এ ক্লাস সেভেনে থাকার কারনে ব্যাপক বিপদে ছিলাম। সিনিয়ররা রাতে খেলা দেখতে যাবার আগে ঘুম থেকে তুলে হ্যান্ডস ডাউন করিয়ে খেলা দেখতে যাইতো। :(( :((

    জবাব দিন
  5. আব্দুল্লাহ্‌ আল ইমরান (৯৩-৯৯)

    ৯৪ এ ক্লাশ এইটে।আমাদের হাউসে লিডিং ব্যাচের আশির্বাদ এবং স্নেহধন্য ছিলাম।তাই তাদের সাথে মজা করে খেলা দেখতাম।সিনিয়র ভাই ছিল কয়েকজন ক্ষ্যাপা,রাতে হুইসেল মেরে এবং তাও কাজ না হলে বিছানা থেকে টেনে হিচড়ে(কখনো পানি দিয়ে) সবাইকে জাগাতেন।৯০ এ অতকিছু মনে নাই তবে ফাইনাল মনে আছে।জার্মানীর চোরারা কাপ নিয়ে গেল।আর ৯৪ তে এসেও ম্যারাডোনা+আর্জেন্টিনার বিদায়ে খারাপ লাগলো। :((
    আমি আর্জেন্টিনার বিশাল ভক্ত হলেও গণহারে অন্যদের অপমান করার পক্ষপাতি নই।কিন্তু ব্রাজিলের সাপোর্টার দের কিছু ফানি মন্তব্য পড়ে হাসি পাচ্ছে। :khekz: :goragori:

    জবাব দিন
  6. মাসুদুর রহমান (৯৬-০২)

    এই আজাদ তুই মনে হয়

    আর্জেন্টিনার সমর্থকদের সম্পর্কে আপনার মতের সাথে পুরোপুরি সহমত… তবে ব্রাজিলের সমর্থকেরাও এর থেকে খুব বেশি পিছিয়ে নেই… এন্টি আর্জেন্টিনা তো প্রথম থেকেই ছিলাম, ব্রাজিলের সমর্থকদের গলাবাজির কারনে ২০০২ থেকে ওদেরও সহ্য হয় না।

    বলতে আমাকে বুঝাইতাছস............কারণ ব্রাজিলের পক্ষে সবচেয়ে বেশি গলা আমি ফাটাইছি। আর হা হলান্ড আমার সেকেন্ড চয়েজ।

    জবাব দিন
  7. আমিন (১৯৯৬-২০০২)

    আমার অনেক কিছুই বলার ছিল। কিন্তু সময়ের পরে আসছি বইলা কিছুই বলা হইলো না। অবশেষে আমার নেট জীবন স্বাভাবিক হয়েছে। এই খুশিতে গত দুইদিন নেটে ছিলাম না। আজকে নেটে আইসা ফার্স্টেই এই পোস্টে কমেন্টাইলাম। ১৯৯৪ আমার কাছে স্পেশাল একজন হিরোর কিংবা এন্টি হিরোর জন্য। রবার্তো ব্যাজিও সেই স্পেশাল ওয়ান । আমার মনে পড়ে স্পেনের সাথে কোয়ার্টার ফাইনালের কমেন্ট্রি, "রবার্তো ব্যাজিও স্টিলস দ্যা বল এন্ড এ চান্স এন্ড.... শিয়ার ম্যাজিক !!! ম্যাজিক ফ্রম রবার্তো ব্যাজিওস লেগ..। ইতালি ২-১।" ফাইনালে ব্যাজিও সুস্থ থাকলে ইতালিই জিতত। তবে রোমারিওকে ভালো লেগেছিলো তার পাগলাটে আচরণের জন্য। আরেকজন আছেন এ বিশ্বকাপের স্পেশাল । সক্রেটিসের ছোট ভাই রাই। দুর্ভাগা ক্যাপ্টেন। দল চ্যাম্পিয়ন হলো কিন্তু কাপ তুলতে পারলেন না কারণ তিনি মূল দলে কিংবা বসাবেও ছিলেন না ফাইনালের।বিরাট হৈচৈ ফেলে কলম্বিয়ার বিদায় ও মনে পড়ে......। আরও অনেক কিছভুই মনে পড়ে সেগুলো বললাম না। আরেকটা কথা বলে এখানে শেষ করি। সেটা হলো এ বিশ্বাকাপের খেলা শুরুর উপস্থাপনা। শুরুতে মিউজিকের সাথে ভেন্যুগুলোর নাম আসতো ---- বোস্টন শিকাগো ডালাস ডেট্রয়েট অরল্যান্ডো লসএঞ্জেলস নিউইয়র্ক সানফ্রান্সিসকো ওয়াশিংটন -----দারুণ লাগতো একটার পর একটা নাম ভেসে আসা।

    জবাব দিন
  8. আমিন (১৯৯৬-২০০২)

    ও হ্যা আরেকটা কথা না বলে পারলাম না। সাইদ আল ওয়াইরানের সসে বিখ্যাত দৌড়। একদৌড়ে মাঠভেদ করে গোল দিয়ে এল। আর কুতার্কিক (!!) হিসাবে নিজের প্রথ পরিচিতি আমি ঘটিয়েছিলাম ওয়াইরান আর ম্যারাডোনাকে তুলনা করে

    জবাব দিন
  9. মাহমুদ (১৯৯৮-২০০৪)

    আমার আপন বড় ভাইর পরে এই প্রথম একজন ডেডিক্যাটেড ডাচ সাপোরটার দেখলাম।
    সে ফুটবল বোঝা শুরু করছে ৮৮ থেকে,তাই এখনো গুলিট,বাস্তেন,রাইকার্ড বলে সব সময়...
    প্রতিটা বিশ্বকাপে আমি হল্যান্ড টিমের সব তথ্য জানি তার কাছ থেকে।
    এখন সে একটা কলেজের কম্পিউটার সাইন্সের ডিপাঃ হেড,কিন্তু বাসায় সারাদিন পি এস-৩ এ ফিফা/পি ই এস খেলে

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।