ইসলাম নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক ও মুসলিমবিশ্ব


বইয়ের প্রচ্ছদ দেখে খানিকটা ধান্ধায় পড়ে গেলাম আমি- ইসলামিক বইয়ের প্রচ্ছদ এত ‘কালারফুল’ কিম্বা এমন কাব্যিক কাব্যিক হয় নাকি? প্রচ্ছদ শিল্পী, চারু পিন্টুকে ইমেইলে তা জানালে ওনার মোবাইলে ফোন করতে বললেন আমাকে। চারু পিন্টু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিউট থেকে পাশ করেছেন অনেকদিন আগে। বইয়ের প্রচ্ছদ করছেন দীর্ঘদিন ধরে। কথায় কথায় জানালেন, অন্তত হাজার খানেকের ওপরে বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছেন তিনি এ যাবৎকাল। আমার অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে খানিকক্ষণ হাসলেন। তারপর জানালেন, বইয়ের ভূমিকা পড়ে শুরুতে যদিও তিনি খুব একটা নিশ্চিত ছিলেননা প্রচ্ছদটা কেমন করবেন, কিন্তু প্রকাশক মেজবাহউদ্দিন আহমেদ উনাকে পরিষ্কার বলে দিয়েছেন বইয়ের প্রচ্ছদ যেন প্রগতিশীল ধরনের ‘থিম’-এর ওপর ভিত্তি করে হয় যা বইয়ের সার্বিক মেসেজের সাথে সংগতিপূর্ণ হতে হবে। এবং তিনি যথেষ্ট সময় নিয়ে অত্যন্ত যত্ন করে প্রচ্ছদটা করেছেন। নিজের কাজ সম্পর্কে চারু পিন্টুর কন্ঠস্বরে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সুর শুনে সন্তুষ্ট চিত্তে ফোন রেখে দিলাম আমি।

চলতি বই-মেলার মাঝামাঝি (ফেব্রুয়ারী ১৫ নাগাদ) আমার বহু প্রতীক্ষিত ও নিজস্ব স্বপ্ন-পূরনের বই, ‘ইসলাম নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক ও মুসলিমবিশ্ব’ অবশেষে বের হচ্ছে। ৩৪০ পৃষ্ঠার এ বইটা বের করছে অংকুর প্রকাশনী। মূদ্রিত মূল্য ৩০০ টাকা। বইটা বের করার জন্যে বিগত দুই-তিন বছর ধরেই বাংলাদেশের নানা প্রকাশনা সংস্থার সাথে যোগাযোগ করেছি আমি। গত ২০১০ ও ২০১১ সালের বই-মেলায় আমার একটা করে ছোট গল্পের বই বের হলেও এ বইটা বের করতে অধিকাংশ প্রকাশকই রাজি হননি। ধর্মের গন্ধ আছে, এমন বই অনেকেই ছাপতে চাননা।

গত বছরের জুন-জুলাইতে আমার পরিচিত ও অপরিচিত বেশ কতগুলো প্রকাশনা সংস্থাকে বইয়ের পান্ডুলিপিটা পাঠিয়েছিলাম। দু’তিন মাস পরও কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে একে একে ওনাদের সবাইকে ফোন করা শুরু করলাম। দু’একজন প্রকাশক স্পষ্টই জানিয়ে দিলেন এ ধরনের বই তাদের প্রকাশনী বের করেননা। বইটা তারা বের করবেননা শুনে কিছুটা ভগ্ন-হৃদয় হলেও তাদের স্পষ্ট উত্তরে আমি বরং খুশীই হয়েছিলাম। বরং অসন্তুষ্ট হয়েছিলাম ঐসব প্রকাশকদের ওপরে যারা সুস্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’ কিম্বা ‘না’ কিছু বলেননি। বরং “পান্ডুলিপি এখনও দেখছি” ধরনের উত্তর দিয়ে আমাকে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। সবচেয়ে বেশী আহত হয়েছিলাম যখন জনৈক প্রকাশক দীর্ঘ দুই-আড়াই মাস পর ফোনে আমার বইটা বের করা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে জানতে চাইলেন “আপনার বইয়ের মূল বক্তব্যটা কী তা আমাকে সংক্ষেপে একটু বলুনতো”। অর্থাৎ উনি পান্ডুলিপিটা খুলে পর্যন্ত দেখেননি। একজন প্রকাশকের এহেন ‘আনপ্রফেশনালিজম’ দেখে আমি যার-পর-নাই আশ্চার্যান্বিত হয়েছিলাম।

যাহোক, বইটি শেষপর্যন্ত বের হচ্ছে। গত বছরের অক্টোবরে হঠাৎ করেই একদিন অংকুর প্রকাশনীর মেজবাহউদ্দিন আহমেদ জানালেন উনি বইটা বের করতে রাজি আছেন। অবশ্য সাথে এটাও জানালেন যে, বইটা একজন পেশাদার এডিটরকে দিয়ে এডিট করা লাগবে। একজন প্রুফরীডার ও একজন এডিটরের হাত ঘুরে অবশেষে বইয়ের পান্ডুলিপিখানা প্রকাশকের হাতে আসতে আসতে অনেকটা সময় লেগে গেল। এছাড়া কিছুটা শারিরিক অসুস্থতাজনিত কারনে মেজবাহ ভাই ঠিকমত অফিস করতেও পারেননি গত দু’তিন মাস ধরে। আমার বইটার সবকিছু শুরু থেকে উনি নিজেই তদারকি করছিলেন বলে অফিসে ওনার অনিয়মিত উপস্থিতিও বইয়ের কাজটাকে কিছুটা পিছিয়ে দিল। যাহোক, ফেব্রুয়ারীর ১২ তারিখ নাগাদ বইটা শেষপর্যন্ত মেলায় নামবে বলে আমাকে ব্যক্তিগতভাবে আশ্বাস দিয়েছেন মেজবাহ ভাই। সাথে যদি অতিরিক্ত দু’তিন দিন অনাকাংক্ষিত দেরীর সম্ভাবনাকে যোগও করি, তাহলেও আশা করা যায় ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি নাগাদ বই-মেলায় অংকুর প্রকাশনীর ষ্টলে পাওয়া যাবে আমার বইটা।

পরিচিত কিছু কিছু ব্লগে আমার লিখিত শেষ প্রবন্ধ ‘গ্রাউন্ড জিরো মসজিদ বনাম ড্যামেজ কন্ট্রোল’ প্রকাশিত হয়েছিল সেপ্টেম্বর ২০১০-এ; প্রায় বছর দেড়েক আগে। এরপর প্রায় গোটা দশেক প্রবন্ধ লিখেছি আমি যা কখনও কোনো ব্লগে প্রকাশিত হয়নি। মূলত এ বইটা বের করার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে (এবং একইসাথে পরিচিত বিভিন্ন ব্লগে অতিরিক্ত সময় ক্ষেপণ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে) ইচ্ছে করেই এ প্রবন্ধগুলো ব্লগগুলোতে পাঠানো হয়নি। আমার লিখিত ইংরেজী প্রবন্ধগুলোর বঙ্গানুবাদ বাদ দিলে এই শেষোক্ত নয়-দশটা প্রবন্ধ পৃষ্ঠাসংখ্যার দিক দিয়ে প্রথম দিকের বাকি পঁচিশটা প্রবন্ধের সম্মিলিত পৃষ্ঠাসংখ্যার প্রায় সমান। বলাবাহুল্য, প্রচুর তথ্য ও বিশ্লেষন সন্নিবেশিত করা হয়েছে এই শেষোক্ত প্রবন্ধগুলোতে।

আমেরিকার রাজনীতিতে সেদেশের প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে একটা প্রসিদ্ধ মনোভাব হলো, একজন প্রেসিডেন্ট যখন একইসাথে দেশের উদারপন্থি ও রক্ষনশীল- উভয় দলের সমর্থকদের কাছেই সমানভাবে বিরাগভাজন, তখন বুঝতে হবে- দেশের কল্যানে প্রেসিডেন্ট সম্ভবত সঠিক সিদ্ধান্ত সমুহই নিচ্ছেন। আমি অবশ্যই তেমনটা দাবী করবোনা। তবে এটুকু অন্তত বলতে পারি, ধর্মীয় রক্ষনশীল ও উদারপন্থি- উভয় পক্ষের ভ্রূ কোঁচকানোর মত যথেষ্ট পরিমান রসদ আমার এ বইটাতে আছে বলেই আমার ধারনা।

নীচে বইয়ের সূচিপত্র ও ভূমিকা পাঠকদের জ্ঞাতার্থে দিয়ে দিচ্ছি।

সূচিপত্র

ভূমিকা
আরব দেশের মুসলমান
আমেরিকার সম্ভাব্য ইরাক আক্রমনের নেপথ্যে
ইসলাম ও আমেরিকান মিডিয়া
তাবলীগ জামাত কী এবং কেন
আমেরিকার ইরাক আক্রমনঃ যুদ্ধের জন্যেই যে যুদ্ধ
এক চোখে পৃথিবী দর্শনঃ ধার্মিক বনাম নির্ধর্মীর দৃষ্টি
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশঃ আমরা কোন্‌দিকে যাচ্ছি?
খাবার-দাবারে তাকওয়া
কোরান ও বিজ্ঞানঃ দ্বন্দ্ব নাকি সমন্বয়?
প্রসঙ্গঃ নৈতিকতা ও ধর্মীয় শিক্ষা
ইহুদী চক্রান্ত ও মুসলিম বিশ্ব
মুসলিম সন্ত্রাসবাদ ও ইসলাম
বাই-প্রডাক্ট
বাংলাদেশে ইসলামী জঙ্গীবাদের উত্থানঃ সমস্যার শেকড় কতদূর?
Freedom of Speech/Expression, When it Comes to Religion
Deliberate Blasphemy to Islamic Faith: Where could be the Catch?
When Humanity is a Hostage of Media Propaganda
আস্তিকতা, নাস্তিকতা ও মানবতার ভুল সমীকরন
ধর্মীয় সম্প্রিতী বিনষ্টে পশ্চিমা মিডিয়ার ভূমিকা
Pat Robertson Said it Again, But What’s with Bob McDonnell?
ধর্মীয় বিভাজন ও অসহিষ্ণুতার শিক্ষা- কতদূর প্রোথিত এর শেকড়?
অতিরিক্ত ধর্মীয় জোশ ও গোঁড়ামী চরমপন্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে
মডারেট মুসলিম
ধর্মকে ‘না’ বলা কতখানি বাস্তব?
গ্রাউন্ড জিরো মসজিদ বনাম ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’
মুসলিম মাইন্ডসেট- ১
মুসলিম মাইন্ডসেট- ২
ইসলামী শরিয়াঃ মধ্যযুগ থেকে একবিংশ শতাব্দির পথে
ধর্মীয় মৌলবাদের সাম্প্রতিক উত্থানঃ একটি সার্বিক পর্যালোচনা
বিন লাদেনঃ এক দুর্বিনীত মুসলিম যোদ্ধা, নাকি এক কিংবদন্তি সন্ত্রাসী?
ইতিহাসের আলোকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যা
চাঁদ দেখা ও মুসলিম উম্মাহর বিভাজন
বাংলাদেশঃ যে দেশকে নিয়ে গর্ব করা যায়
ক’জন মুসলিম কন্‌ভার্ট এবং প্রচলিত একটা হাসির গল্প

ভূমিকা

আজ থেকে প্রায় চৌদ্দশ বছর আগে আরবের মরুঅঞ্চলে শান্তির বাণী নিয়ে আগমন ঘটেছিল ইসলামের নবী, মুহাম্মদ (সঃ)-এর এবং সূচনা হয়েছিল সাম্য ও শান্তির ধর্ম, ইসলামের। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান পৃথিবীতে ইসলাম ধর্মের অনুসারী তথা মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় দেড় শ’ কোটি (১.৫ বিলিয়ন)। একসময়ের তথাকথিত ইসলামী সোনালী যুগ পার হয়ে বর্তমানে পশ্চিমাবিশ্বের সাথে দৃশ্যতঃ সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ ইসলাম ধর্ম ও তার অনুসারীরা পাড়ি দিয়েছে সুদীর্ঘ পথ, অতিক্রম করেছে অনেক চড়াই-উৎরাই। একদিকে শান্তিপূর্ণ ধর্ম প্রচার এবং অন্যদিকে অমুসলিম বিরুদ্ধাচারী বা আক্রমনকারীদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সমরাভিযান পরিচালনা- চুড়ান্ত এই দুই পর্যায় বা সীমারেখাসহ এর মাঝখানে ইসলামের বহুবিধ ভূমিকা বা ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়েছে বিগত চৌদ্দ শ’ বছর ধরে। মতানৈক্যের কারনে সময়ের সাথে শিয়া, সুন্নীসহ অনেকগুলো ‘সেক্ট্‌’-এ (উপদলে) ভাগ হয়ে গেছে মুসলমানরা; জন্ম হয়েছে চার সুন্নী ‘মাহযাব’-এর। মুসলিম নেতৃত্ব কিম্বা আলেম-ওলামাদের নিরীহ বা শান্তিপূর্ণ মতানৈক্য অনেকসময় শেষ হয়েছে পারষ্পরিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে; জন্ম দিয়েছে একদিকে যেমন ‘সুফিজম’ (সুফীবাদ), অন্যদিকে তেমন ‘রেডিক্যাল’ (প্রতিক্রিয়াশীল) ইসলাম। আমাদের দেশে ধর্মপ্রচার করতে আসা শাহ্‌ জালাল কিম্বা শাহ্‌ মখ্‌দুমের মত শান্তিকামী ধর্মপ্রচারকারীর জন্ম দিয়েছে যে ইসলাম, সেই ইসলামই জন্ম দিয়েছে শায়খঃ আব্দুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই থেকে শুরু করে একসময়ের গোটা পশ্চিমাবিশ্বের জন্যে হুমকি, আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা, ওসামা বিন লাদেন-এর মত ধর্মীয় সন্ত্রাসীর। আর মজার ব্যাপার হলো, শান্তিকামী এবং রেডিক্যাল- উভয় দলই ইসলাম ধর্মের সঠিক ধারক ও বাহক এবং কোরআনের সঠিক বাণী প্রচার ও প্রতিষ্ঠার দাবীদার।

মাঝখান থেকে বিপদে পড়েছি আমরা সাধারন মুসলমানরা, বাপ-দাদার ধর্মে জন্ম নিয়ে যারা অনেকখানিই নামমাত্রে মুসলমান, যাদের ধর্ম-জ্ঞান অতি সামান্য এবং যাদের ধর্মপালন অধিকাংশ সময় কেবল পারিবারিক ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কাজেই আজ যখন ইসলামের নামে একদিকে সংঘটিত হচ্ছে আমেরিকার নাইন-ইলেভেন কিম্বা বৃটেনের সেভেন-সেভেন-এর মত মর্মান্তিক সন্ত্রাসী ঘটনা, লক্ষ লক্ষ মানুষ ইরাকে প্রাণ হারাচ্ছে সুইসাইড বম্বিং-এ, বোমা বিস্ফোরণে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে পাকিস্তান ও আফগানস্তানে, গোটা বাংলাদেশ কেঁপে উঠছে সিরিজ বোমার আঘাতে এবং অন্যদিকে অধিকাংশ পশ্চিমা মিডিয়া (প্রচার মাধ্যম) প্রক্রিয়াগতভাবে এ সবকিছুর জন্যে ক্রমাগত দায়ী করে চলেছে ইসলামী ধর্মগ্রন্থ কোরআন ও ইসলামের নবীকে, তখন আমরা সাধারন মুসলমানরা হয়ে পড়েছি হতবিহব্বল; হয়ে পড়েছি বিভ্রান্ত। কে ঠিক কে ভুল, কোন্‌টা সত্যি কোন্‌টা মিথ্যে, কাকে বিশ্বাস করবো আর কাকে করবো না- এহেন সন্দেহ, এহেন দ্বিধা আজ যেন আমাদের প্রায় সবার। তদুপরি এমতাবস্থায়, মুসলিম নেতৃত্ব ও ওলামা সমাজের চলমান নিরবতা ও দিক নির্দেশনাহীনতা যেন আরও জটিল করে তুলেছে সবকিছু। এ-ই যখন পরিস্থিতি, তখন পশ্চিমা মিডিয়ার সুরে সুর মিলিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রচারনায় নেমেছেন নাস্তিকতার দাবীদার একদল মানুষ। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইন্টারনেটভিত্তিক যুক্তিবাদী বা নাস্তিকপন্থী অনেকগুলো ই-ফোরাম যেখানে ধর্মের বন্ধনমুক্ত যুক্তিবাদ ও মুক্তচিন্তা প্রচারের নামে প্রকারান্তরে ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষ প্রচার করছেন অনেকেই। (তবে সবাই নয়। বিজ্ঞান বা দর্শন নিয়ে কিম্বা ধর্ম নিরপেক্ষতার পক্ষে লেখেন, এমন অনেক লেখকও আছেন সেখানে)। বাংলা ভাষাভাষি তেমন কিছু ই-ফোরামে প্রকাশিত ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী কিছু লেখার ‘রিবাটাল’ (প্রত্যুত্তর) লিখতে গিয়েই মূলত ই-ফোরামের লেখালেখিতে আমার অনুপ্রবেশ।

তেমনই কিছু ‘রিবাটাল’ বা প্রত্যুত্তরসহ ইসলাম ও মুসলিমবিশ্বের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে রচিত অনেকগুলো মৌলিক নিবন্ধ সংকলিত করে প্রকাশিত হচ্ছে ‘ইসলাম নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক ও মুসলিমবিশ্ব’ নামে বইখানি। কোনো বিষয়ের ওপর লিখিত মূল প্রবন্ধ না পড়ে কেবল প্রত্যুত্তর পড়লে তাতে তথ্যের বা যুক্তির ধারাবাহিকতার অনুসরনে যে ক্ষুদ্র সমস্যাটুকু দেখা দেয়, আমার এ বইটির দু’চারটে নিবন্ধে স্বভাবতই সেই দূর্বলতাটুকু থাকছে। আমি যদিও এ ধরনের বিতর্কধর্মী নিবন্ধগুলোতে বিপক্ষের মূল নিবন্ধের বিষয়বস্তু বা বক্তব্যকে নিবন্ধের শুরুতেই খুব সংক্ষেপে তুলে ধরার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি পাঠকদের বুঝার সুবিধার্থে, কিন্তু তারপরও বিপরীত যুক্তির দুটো লেখাকে পাশাপাশি রেখে লেখকদ্বয়ের বক্তব্যকে মিলিয়ে দেখার যে পূর্ণ সুযোগ, তা থেকে পাঠকরা স্বভাবতই বঞ্চিত হচ্ছেন এবং এ বইয়ের দু’চারটে নিবন্ধে সেই সীমাবদ্ধতাটুকু থাকছেই। তাছাড়া নিবন্ধগুলোর রচনাকাল কম করেও আট-নয় বছর ধরে পরিব্যাপ্ত, যে কারনে কোনো কোনো নিবন্ধে তথ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটাও অস্বাভাবিক নয়। এটাও বইটির আরেকটি সম্ভাব্য দূর্বল দিক। এছাড়া বইটি অনেকগুলো নিবন্ধের সংকলন। কাজেই বইয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বক্তব্যের সুনির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা খুঁজে না পাওয়াটাই স্বাভাবিক।

আজকের এই ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব’ (World Wide Web) তথা ইন্টারনেটের যুগে ‘গুগোল ওয়েবসাইট’-এ (Google website) ঢুকে কোনো কিছু লিখে ‘সার্চ’ (খোঁজ) বোতামে চাপ দিলে কাংখিত প্রায় সব তথ্যই যেহেতু মুহুর্তেই চোখের সামনে কম্পিউটার স্ক্রীনে ভেসে ওঠে, সেকারনে নিবন্ধের কলেবর সংক্ষিপ্ত রাখার উদ্দেশ্যে ইচ্ছে করেই তথ্যসূত্র উল্লেখ করা হয়নি প্রবন্ধগুলোতে। এছাড়া, নিবন্ধগুলোয় যেখানে যেখানে ইংরেজী শব্দ বা বাক্যসমুহ ব্যবহৃত হয়েছে, সকল শ্রেনীর পাঠকদের কথা মাথায় রেখে সেখানে সেসবের বাংলা অর্থ ও ভাবানুবাদ দেবার প্রচেষ্টা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ইংরেজী বানানে আমেরিকান ধারা ব্যবহার করা হয়েছে যা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্রিটিশ বানান তথা আমাদের দেশের ইংরেজী বানান হতে ভিন্ন।

ঘটনা প্রসঙ্গে আমার স্বল্প পরিচিত কিম্বা অতি পরিচিত কোনো কোনো সত্যি চরিত্রের আগমন ও নামোল্লেখ ঘটেছে আমার কোনো কোনো নিবন্ধে। তাদের পরিচয়ের গোপনীয়তা রক্ষার্থে নিবন্ধগুলোয় তাদের মূল নামের স্থলে ইংরেজী বর্ণমালার ‘এক্স’, ‘ওয়াই’, ‘জেড’, ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়েছে সংগত কারনেই।

সবশেষে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়ে একটু বলে নেয়া দরকার। আমরা যারা বিভিন্ন ব্লগে বা ই-ফোরামে লেখালেখি করি, তারা সবাই সম্ভবত এ্যামেচার (অপেশাদার) লেখক এবং কোনো বিষয়ের বিশেষজ্ঞ নই। বিশেষ করে আমি আমাকে নিতান্তই সীমিত জ্ঞানের একজন সাধারন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করি। তাছাড়া আমি একটা বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গী বা অবস্থান থেকে ধর্ম, মানুষের ধর্মীয় মনোবিজ্ঞান, ধর্মীয় রাজনীতি, ইত্যাদি বিষয়গুলোকে দেখার চেষ্টা করি এবং আমার মত করে সেটাকে তুলে ধরার চেষ্টা করি। সেখানে আমার নিজস্ব জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গীর সীমাবদ্ধতা এবং আমার লেখার বিশেষ ষ্টাইলের প্রবলতা থাকা খুবই স্বাভাবিক। কাজেই আমি আশা করবো বইটি পড়ার সময় পাঠকরা এ বিষয়গুলোকে মাথায় রাখবেন এবং আমার মতামতকে ধর্মের, ধর্মীয় অনুশাষনের বা ধর্মীয় রাজনীতির ব্যাপারে আমার সামগ্রিক দর্শন কিম্বা চুড়ান্ত মতাদর্শ হিসেবে ধরে নেবেননা।

একজন লেখক কোনো বিষয়ে কিছু লেখার সময় তার সামনে সাধারনত একটা ‘টার্গেট অডিয়েন্স’ (অভিষ্ট শ্রোতাকুল) থাকে। অর্থাৎ, সুনির্দিষ্ট একটা পাঠকশ্রেনীকে মাথায় রেখে একজন লেখক সাধারনত একটা প্রবন্ধ কিম্বা একখানা বই লেখেন। আমার এ বইটির প্রধান টার্গেট অডিয়েন্স হলো, নিরীহ ধর্মপালনকারী ও শান্তিপ্রিয়, মূলধারার সংখ্যাগুরু সাধারন মুসলমানরা।

চিন্তা ক্রমপরিবর্তনশীল। তারই সাথে সংগতি রেখে ক্রমপরিবর্তনশীল মানুষের দৃষ্টিভঙ্গীও। সেটাই স্বাভাবিক। বরং অস্বাভাবিক ও সমস্যা সেটা যখন সুনির্দিষ্ট কোনো ‘মাইন্ডসেট’ (মনোভাব) কিম্বা ‘ইজম’ (মতবাদ) একজন মানুষের চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গীকে ক্রমশ আবদ্ধ করে ফেলে কেবল একমূখী, টানেলভিশনগ্রস্থ (সুড়ঙ্গচোখা) কোনো দৃষ্টিভঙ্গীতে যা অধিকাংশ সময় তার উদারতা, সহনশীলতা ও নিরপেক্ষ যুক্তিবোধকে প্রতিস্থাপন করে মূলত সংকীর্ণতা, অসহনশীলতা ও একরোখা গোঁড়ামী দিয়ে। মজার ব্যাপার হলো, স্ব স্ব মাইন্ডসেট কিম্বা ইজম-এর মধ্যে সচেতন বা অবচেতনভাবে ক্রমশ আবদ্ধ হয়ে পড়ার ব্যাপারটা একজন ধার্মিক ও একজন নির্ধর্মী- উভয়ের ক্ষেত্রেই সম্ভবত প্রায় সমভাবেই প্রযোজ্য। আমার ধারাবাহিকভাবে লিখিত নিবন্ধগুলোয় সময়ের সাথে সাথে আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গীতে ক্রমপরিবর্তনের কোনো ছাপ পাঠকদের চোখে পড়লে বরং সেটাই হবে আমার জন্যে একটা পজিটিভ (ইতিবাচক) দিকচিহ্ন এবং আমার মানবিক সত্বার পজিটিভ মূল্যায়ন।

ইসলামের মৌলিক বিধি-বিধান নিয়ে কিম্বা রাজনৈতিক ইসলামের সমর্থনে কোনো বই লিখলে তা প্রকাশের জন্যে প্রকাশক খুঁজে পাওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ। যেমন, “ইসলামে নারীর মর্যাদা” কিম্বা “ইসলামে শরিয়ার গুরুত্ব” শিরোনামে প্রচলিত পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে কোনো বই লিখলে তা প্রকাশের জন্যে আগ্রহী অনেক প্রকাশককেই হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে। মজার ব্যাপার হলো, ঠিক ঐ একই শিরোনামে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে চরম নেগেটিভ (নেতিবাচক) দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে কোনো বই লিখলে সেগুলো প্রকাশের জন্যেও কোনো না কোনো প্রকাশককে হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু মুশকিল হলো, এই দুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থানে দাঁড়িয়ে অর্থাৎ একইসাথে একজন ধার্মিক হয়ে ধর্মের গঠনমূলক সমালোচনা করে কোনো বই লিখলে তা প্রকাশের ব্যাপারে আগ্রহী প্রকাশক খুঁজে পাওয়া একটু কঠিন। কেননা এ ধরনের বইয়ের বানিজ্যিক চাহিদা আপাতদৃষ্টিতে হয়ত খুব একটা বেশী নয় এবং বিপরীত দুই ধারার ‘স্পেশাল ইন্টারেষ্ট ব্লক’-এর (বিশেষ আগ্রহী অংশের) প্রকাশকগণ ছাড়া সাধারন ব্যবসায়ী মনোভাবী একজন প্রকাশক এ ধরনের বই প্রকাশে সাধারনত খুব একটা আগ্রহ দেখাননা।

আমি খুবই ভাগ্যবান যে অবশেষে একজন পৃষ্টপোষক প্রকাশককে খুঁজে পেয়েছি। বইয়ের ছোটখাট দূর্বলতাগুলো ‘ওভারলুক’ (উপেক্ষা) করলে বইটি সার্বিকভাবে পাঠকদের ভাল লাগবে এবং সাম্প্রতিককালের ইসলাম ও মুসলিমবিশ্ব নিয়ে তর্কে-বিতর্কে নতুন কিছু চিন্তার খোরাক যোগাবে বলেই আমার বিশ্বাস।

আব্দুর রহমান আবিদ
ফেব্রুয়ারী, ২০১২

১,৬৩৬ বার দেখা হয়েছে

১৫ টি মন্তব্য : “ইসলাম নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক ও মুসলিমবিশ্ব”

  1. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)
    মাঝখান থেকে বিপদে পড়েছি আমরা সাধারন মুসলমানরা, বাপ-দাদার ধর্মে জন্ম নিয়ে যারা অনেকখানিই নামমাত্রে মুসলমান, যাদের ধর্ম-জ্ঞান অতি সামান্য এবং যাদের ধর্মপালন অধিকাংশ সময় কেবল পারিবারিক ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ...আমার এ বইটির প্রধান টার্গেট অডিয়েন্স হলো, নিরীহ ধর্মপালনকারী ও শান্তিপ্রিয়, মূলধারার সংখ্যাগুরু সাধারন মুসলমানরা।

    এই এ্যাপ্রোচটা ভালো লেগেছে।ধর্মীয় বিষয়ক, আস্তিকতা-নাস্তিকতা জাতীয় ডিবেটে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখি সকালে উদ্দাম নৃত্য দেখা আর বিকালে নেশার বোতলে চুমুক দেয়া শুধু নামেই মুসলিম এরকম বহু মানুষ[আমি সত্যিকারের ধর্মভীরুদের কথা বলছিনা] এমন ভাব নেয় যেন তাদের জন্মই হয়েছে জিহাদের জন্যে।নিজে যে বিশ্বাস একবিন্দু পালন করেনা,সবার সামনে সেইটাকে নিয়ে লড়াই দেখাতেই এরা ব্যস্ত।আপনি এই হিপোক্রেসির ধারেকাছেও যাননি বলে মনে হচ্ছে।সুযোগ পেলে বইটা অবশ্যই কিনে পড়ব বলে আশা রাখি।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।