স্পর্শের বাইরে..

রাত প্রায় একটা বাজে । কেমন এক ছিড়িবিড়ি আবহাওয়া । ধুর এই সময় এত বৃষ্টি…শীত বোধ হয় এই বাহানায় এবার তাড়াতাড়িই চলে আসবে । তাও যদি ঘুম আসতো…সারাদিন ভো ভো করে ঘুমানোর ঠেলা এবার সামলাও ।
গানের ভলিউমটা একটু কমিয়ে দিয়ে আবার ঘুমানোর চেষ্টা চালাই । অন্ধকার রুমে শুধু স্পিকারের মৃদু নীলাভ আলো । অনেক , অনেকদিন পর আজ কেন যেন আবার তোর কথা মনে পরছে । মাঝে মাঝে কেমন যেন লাগে । ভাগ্যিস মাথার ভিতরে গিয়ে ভাবনা গুলো কারো দেখার সাধ্য নেই । আর তোর কথা ভাবলেই কেন যেন এক অদ্ভুত অনুভুতি হয় , মনে হয় অনেক চেষ্টা করেও কিছু একটা ধরতে গিয়ে হাত দুটোকে বাগে আনতে পারছিনা , স্বপ্নে প্রায়ই কোন কিছু ধরতে গেলে এমন হয় ।

কলেজ লাইব্রেরির সামনে…..আজ সারাদিন অবশ্য প্রচন্ড ব্যাস্ততায় কেটেছে। আমাদের প্র্যাক্টিকাল পরিক্ষা শেষ , সারাদিন এটা ওটা জমা আর ক্লিয়ারেন্স এর জন্য মহাব্যাস্ত ছিলাম । কলেজের দিন ফুরিয়ে এল । আর খুব বেশি দিন নেই । সামিন প্রায়ই বলে , কলেজের কার কথা কতদিন মনে থাকবে জানিনা কিন্তু এই রুম , চেয়ার , ব্যাল্কনি আর ছাদের একদম শেষ কোনা , এই জড় পদার্থ গুলোর কথা কোনদিন ভুলবনা । কি অদ্ভুত একটা সময়ের একেবারে শেষ প্রান্তে চলে এসেছি । সামিনের সাথে আমিও দীর্ঘশ্বাস ফেলি ।

কিছু কিছু সময় নীরবতাই অনেক বেশি কিছু বলে দেয় । ওহহো , ভুলেই গিয়েছিলাম , তোর পরিক্ষা কেমন হয়েছে সেটা জানা হলনা । একটা হাসির কথা মনে পরে গেল । তুই খেয়াল করেছিস কিনা জানিনা তোকে ডাকার সময় আমি প্রায়ই প্রোনাউন সমস্যায় ভুগি । অনেকদিন পর দেখা হলে কেন যেন নিজের অজান্তেই বের হয়ে যেত , কেমন আছ ? পরে অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে শুধরে নিতাম , কিরে , কেমন আছিস ? হ্যা ভালো , তুই ভালো আছিস ? তোর বিশেষনটা আরেকবার শোনার চেস্টা করতাম । সীমারেখা অতিক্রমে তুই কোনদিন ভুল করিসনি । এবার ছুটির শেষ দিনটার কথা মনে পরছে । কেমন আচমকাই একটা দীর্ঘ সময় আমরা দুজন হাটলাম । এই বোধহয় আমাদের শেষ দেখা ? অবাক হয়ে আমি তোর প্রশ্নটা শুনি আর ভাবি দীর্ঘশ্বাসটা কি ঠিক শুনলাম ? না তা কেন , একই শহরে থাকি যখন দেখা হবে না কেন ? নাকি তুই বিয়ে করছিস । হাসতে হাসতে আমি বলছিলাম । মাঝে মাঝে পাগলের মত জানতে ইছ্ছে করে , বন্ধুত্ত আর ভালোবাসার মধ্যে ঠিক কতটুকু দুরত্ত ? ভাবলেশহীন তোর মুখ দেখে তাই বোঝার চেষ্টা করছিলাম । আমি…..

এই যাঃ , ট্রান্সমিটারটা মনে হয় জ্বলে গেল । ধুপ করে চারাদিক অন্ধকার । নাকি ভুল শুনলাম , মনে হয় লোডশেডিং । নাহ একটু গান শুনছিলাম ….। মেজাজ একটু খারাপই হল । রাতে ঘুম বাদ দিয়ে কি সব আজগুবি চিন্তা যে ঘুরপাক খাছ্ছে, কাল নির্ঘাত বস এর ঝারি খেতে হবে..ঝিমানোর জন্য ।

ভাইরে , তুই বড় বেশি ইমোশনাল । সামিনের প্রস্ন শুনে আমার হাসি আসত । ইমোশনাল ব্যাপারে ইমোশনাল হব না ? আর কি করব , আমি এরকমই । আমার সহজ উত্তর । এছাড়া আর কি বা বলার আছে বল ? মাঝে মাঝে আমি আমাদের সম্পর্কের অবস্থান নিয়ে ভাবি । আমি না হয় তোর বন্ধু , কিন্তু তুই আমার কোন বিশেষনে ? প্রেমিকা , নাহ । ভালো্বাসা , ঠিক তাও না । শুধু বন্ধু কেন যেন ভাবতে ইচ্ছে করেনা , এর চেয়ে বরং কেউ না । মনে হয় একটু অক্সিজেনের স্বল্পতা দেখা দিল , জোরে একটা শ্বাস নিয়ে ভাবি প্রতিবারই এমন কেন হয় ।

নাহ আজ কাজটা করতেই হবে । কে জানে এই হয়তো আমার জন্য শেষ সুযোগ।
কিরে, চুপ করে আছিস কেন ?
বলব , নাকি থাক ?
থাকবে কেন , বলনা….সামিনের ফ্যাকাসে উত্তর , আরে কথায় বলেনা, যাব পেয়ার কিয়া তো ড্যারনা কিয়া…।
আমি হাসার চেস্টা করি , কিন্তু অর্ধেকটা হাসি মুখের ভিতরেই থেকে যায় । আমি মনে মনে আবার রিহারসেল দেই । বুকের ঢিপঢিপকে বোঝানোর চেস্টা করি , আরে ওর সাথে আলাদা করে একটু কথা বলব , কথাই তো । কিন্তু কি যেন বলব…ধুর ছাই থাকগা । পুরো ক্লাসে এই প্রথম মনে হয় এত গভী্র দৃষ্টিতে স্যারের দিকে তাকিয়ে ছিলাম , আর এই প্রথম মনে হয় একবারো তোর দিকে তাকাইনি । ক্লাস শেষে খেয়াল করলাম ঢিপঢিপ আর নেই .. এবার একেবারে ঢামঢাম । অনেক কস্টে দম নিয়ে হাসার চেস্টা করলাম , এই শোন , একটু এদিকে আসবি…..

ধুর খালাম্মা, আপনারাও জানেন আমি ক্যাডেট ছিলাম । দাত খিচিয়ে অবাক হওয়া মশাদের বলি । নাহ , একে তো লোডশেডিং তারউপর ..গজগজ করতে করতে মশারি টানানোর জন্য উঠি । কলেজের বদঅভ্যাসটা এবার ছাড়তেই হবে । যেই না একটু ঘুম আসলো আর শালীদের পিনপিনানি……

সবই তো শেষ, তাই না ? আমি নিরুত্তর দৃষ্টিতে সামিনকে বোঝার চেস্টা করি , হ্যা সব মনে হয় শেষ । ফেয়ারওয়েল, ক্রেস্ট, জুনিয়রদের বিদায় , সবার ঠিকানা লিখা…সবই তো মনে হয় শেষ । আজ আমাদের কলেজে শেষ রাত ।

ড্রাইংরুমের অন্ধকারটা সিগারেটের আলোয় আরো দুইবার জ্বলে উঠলো । শেষরাতে কেমন এক শী্ত পরেছে ..। শেষ কয়েকটা পাতার আরো দুই তিনটা ছিরে আমি সামনের আগুনে দেই ।
ডায়রিটা পুড়িয়ে ফেললি কেন ? আমি চমকে সামিনের দিকে তাকিয়ে ভাবার চেস্টা করি ।
জানি না , আমার মনে হয় আমার আর ওর সাথে দেখা হবেনা, আর আমাদের এই ছায়া ছায়া সম্পর্কের মধ্যে এইটা খুব বেশি স্পস্ট, তাই বোধহয়…। উত্তরটা আর শেষ হয়না । আমরা দুজন ই আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকি ।

বাব্বাহ, এইচএসসির প্রশ্ন দিবি নাকি ? একেবারে টপসিক্রেট ব্যাপার মনে হচ্ছে। আমি হাসার চেস্টা করি ।
নাহ , এখনো পাইনি , তবে পেলে তোকে সবার আগে পাঠাবো ।
আচ্ছা যা, ফান করলাম , এইবার বল, আমি সিরিয়াস ।
আমি তোর চোখের দিকে তাকানোর চেস্টা করি । বোধহয় একটু সময় আর, আর …জানিনা।
দেখ, এই ব্যাপারটা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি , অনেক । প্রসংগটা আমার কাছেও অযৌক্তিক , তোর কাছে তো অবশ্যই..। আমি জানি তুই কি বলবি , সত্যি বলতে তোর ঐ উত্তরটা শো্নার জন্যই বো্ধহয় আমি আজ এইখানে । আমার অন্তত একটা প্রস্নহীন অবস্থান দরকার..। আমি তোকে ..তোকে..মানে তুই আমার কাছে সবসমই বন্ধুর চেয়ে অনেক অনেক বেশি কিছু ছিলি । সত্যি বলতে তুই বোধহয় কোনদিনই আমার বন্ধু ছিলি না । আমি এক নিশ্বাঃসে কথা গুলো শেষ করি । কয়েক মুহুর্ত নিরবতা , আমার কাছে মনে হল কয়েক যুগ । দেখ, আমি আসলে…আমারতো কাউকে…। আমি তো বললাম , আমি কি শুনতে এসেছি , তোর নীজেকে এক্সপ্লেইন করার দরকার নেই । অধৈর্য আমি বাধা দেই । আবার নিরবতা । তোর উত্তরটা আমি পরে বলবো……………..

আহহ…স্পিকারের আচমকা তীব্র শব্দে লাফিয়ে উঠি । যাক বাবা , এতক্ষনে কারেন্ট বাবাজির আসার সুমতি হলো । গানটা বন্ধ করে ঘড়ি দেখি , পৌ্নে চারটা । নাহ, আর বৃথা চেস্টা করে লাভ নেই । একটা সিগারেট হাতে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাড়াই । পরিস্কার আকাশ , দেখে বোঝার উপায় নেই কিছুক্ষন আগে এত বৃস্টি হয়ে গেলো । শুধু সামনের পিচঢালা রাস্তাটা এখনো বোকার মত ভিজে বিষন্ন হয়ে আছে । আমি শেষ রাতের তারা গুনি , একটা..দুইটা..নাহ এ তো অনেক । পুরনো কথা মনে পরে যায় । কি অদ্ভুত একটা সময়..। এখন মনে হয় , এরকম বোধহয় কখনো হয়ই নি, মনে হয় সবি বুঝি আমার কল্পনা কিংবা প্রচন্ড ভালোলাগা কোনো উপন্যাস……মনে হয় একটা সময়, যা সবসময়ই থেকে গেল আমার স্পর্শের বাইরে ।

১,০১৩ বার দেখা হয়েছে

১৩ টি মন্তব্য : “স্পর্শের বাইরে..”

  1. আয় হাই, তৌহিদ, তুমিও ছ্যাকামাইসিন?
    সিসিবি'র সব ব্যাচেলররা দেখি ছ্যাকা খাওয়া। কি হবে আমাদের? 😉 😉

    বড়ভাইরা আমাদের দিকে এট্টু নজর দেন এইবার। নইলে কিন্তুক গাজার নৌকা আকাশ দিয়া চালামু। 😉 😉

    জবাব দিন
  2. বড় ভাইদের কাছে আমাদের একটাই দাবী, উনারা যেনো শ্যালিকা আছে এমন দেইখা একটা বিয়া করেন। 😀 তারপর আমাদেরকে সেই শ্যালিকাদের নাম্বার(কন্টাক্ট নম্বর, অন্য কিছু না)সরবরাহ করেন। 😉
    আপাতত এইটুকু নজর দিলেই আমরা খুশি। 😉 😉

    কি কস মাসরুফ?

    জবাব দিন
  3. সামিয়া (৯৯-০৫)

    তৌহিদ ভাই,বেয়াদবী নিবেন না। লেখার ধারাবাহিকতায় কি জানি একটা নেই। বুঝতে একটু সমস্যা হয়েছে, সামিনটা কে, বা লেখক কার কথা ভাবছে? আবার লেখাটা কি গল্প না স্মৃতিচারণ?

    জবাব দিন
  4. তারেক (৯৪ - ০০)

    কামরুল,
    আমার কিন্তু একটা দূর্সম্পর্কের শ্যালিকা আছে। কি খাওয়াবি এইবার বল? 😛
    *
    তৌহিদ,
    লেখাটা ভাল লাগছে। তবে সত্যিই আরেকটু গোছানো হলে আরও বেশি ভাল লাগতো।


    www.tareqnurulhasan.com
    www.boidweep.com

    জবাব দিন
  5. তৌহিদ (৯৫-০১)

    @সামিয়া
    এইটা গল্প আর স্মৃতিচারনের মিশ্রন... 😛 😛 😛 😛
    সামিন ছিল গল্পতিচারনের বক্তার ব্যাচমেট, হাউজমেট ।
    @তারেক ভাই
    পরে অবশ্য আমারো মনে হয়েছে মাঝখানে লিঙ্কগুলা মনে হয় ঠিক হয়নাই...আসলে লেখার সময় আমার ভিউ থেকে দেখার জন্য জিনিসটা ঠিক বুঝে উঠতে পারি নাই । আর সত্যি বলতে এই লেখাটা বেশ কিছু কারনে আমার জন্য কমপ্লিকেটেড ছিল । আমি প্রায় তিন সপ্তাহ ভেবেও এইটা কিভাবে লিখব বুঝতে পারছিলাম না ...

    জবাব দিন
  6. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    এই লেখাটা বেশ কিছু কারনে আমার জন্য কমপ্লিকেটেড ছিল< \blockquote>
    আবারও ছ্যাক্কাব্য ! কি মিয়া তৌহিদ, রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস কি ইটস্ কম্লিকেইটেড নাকি?


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।