সদাচারিয়ান

তেসরা জুন, ১৯৯৯, নিরাপদ কাউন্টার, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড।
ওয়েটিং রুমে আমার সামনেই দুই ঝুটি করা গাপুস গুপুস একটা মেয়ে বসে আছে, সাথে বাপ মা ভাই বোন…। তাদের সাথে অনেক ব্যাগ বোঁচকা, একটা থেকে উঁকি মারছে বাটার জুতার প্যাকেট। মিট করে একটা হাসি আসলো ভেতর থেকে, মনে হয় সমগোত্রীয়। জিজ্ঞাস করব কিনা ভাবতে ভাবতেই ওপাশের আপুটা হঠাৎ জিজ্ঞাস করে বসলো, আচ্ছা শুন, তুমি কি ক্যাডেট কলেজের?
আমার তখন মনে হল, হুমম, আমি একা গাধা না, আমার সাথে আরো গাধা আছে।
আপুটার সাথে কথা হলো, কিন্তু গাধা মেয়েটা কথা বলে না কেন? এ কি বোবা? ভাব মারে না ডাট মারে? এহহহ…ভাব…আমি কথা বলবো কেন আগে? ওর ইচ্ছা হয় ও বলুক না।

৪জুন, মাগরিব প্রেয়ারের ফল ইন, সদাচার হাউস, মগকক।
আমি সমানে কেঁদে যাচ্ছি, নাক চোখ দিয়ে সমানে পানি পড়তেছে, কান্নার কারণ আর কিছুই না, ডাইনিং হলে পোকার যন্ত্রণায় ছোট্টখাট্ট লাফ দেয়ায় গাইড আপা বকা দিসে। মেজাজটা খুব খারাপ, হুদাই আব্বা কই রেখে গেসে আমাকে? এর মাঝে কালকের ভটকা মেয়েটা পিছন থেকে একটা টিস্যু বাড়িয়ে বলে, সুষমা আর কেঁদোনা, টিস্যু নাও, চোখ মুছ। আমি হাসব না কাঁদতেই থাকব…বুঝে উঠতে পারলাম না ঠিক।
ভটকা মেয়েটা হল ঝ্যাঙ্গের বাচ্চা, এখন ফুলে ফেপে ব্যারেল হইসে (আমার চেয়ে কিঞ্চিৎ ছোট মাপের অবশ্য)

বিশাল একটা টিনের ট্রাঙ্ক টানতে টানতে আমার রুমমেট ঢুকল, প্রস্থে যতটুক, দৈর্ঘেও ততটুক, সে আমাদের নূরা পাগলা (নামটা পরে দেয়া)। কবি মানুষ, ম্যাগি নুডলসের মত চুল কাঁধ ছাড়িয়ে নিচে এসে পড়েছে। সাত দিনের টার্ম কাটিয়ে এসেই আমি আমার রুমমেটকে আর চিনতে পারলাম না, কারণ সে তার বিশাল কেশ রাশির মায়া কাটিয়ে পুরা ন্যাড়া হয়ে আসছে। কবি মানুষ…আমি তাই বেশি কিছু বলতে পারি নাই। সে কালো একটা স্কার্ফ মাথায় দেয়ার খুব চেষ্টা করত, তবে সেইটা আমরা টেনে খুলে দিতেই বেশি পছন্দ করতাম।
আমার আরেক রুমমেট ছিল জামি, কখন যে হাসত আর কখন যে কাঁদত, আমরাই ঠিকমত বুঝতে পারতাম না। প্রথম দিকে সে লালন সঙ্গীত গাইত খুব, কালের বিবর্তনে টুয়েল্ভের আইসিসিতে সেটা ব্যান্ডে গিয়ে দাঁড়ায়। এর মাঝে এক ক্লাসমেটের নাম আমরা দিতে চাইলাম খোদার খাসী, জামির প্রবল আ[পত্তির কারণে নামটা তারই হয়ে গেল, এখনো আমরা তাকে খোখা বলেই ডাকি।

প্রায়ই দেখা যেত ঘুমাতে ঘুমাতে ঘোরানো সিড়িটা দিয়ে নামছে সেঁজুতি, নাইটি প্যান্টের সাথে খাকি শার্ট পড়ে একাডেমীতে যাচ্ছে সে, অথবা ব্রেকফাস্টে গেমসের ড্রেস, অথবা কালো অক্সফোর্ডের সাথে সাদা মোজা…এমনকি একদিন এক পায়ে পম্পি, এক পায়ে অক্সফোর্ড। ডিউটি মাস্টার জামালী স্যার খুবই বিনীত ভঙ্গিতে ওকে বললেন, মা, যাও জুতাটা ঠিকমত পরে আস।

আর ফারানার ঘুম, বাপরে বাপ। প্রত্যেক প্রেপে কামরুজ্জামান স্যারের খাতার বাড়ি খেত সে, নাহয় প্রেপ গার্ড, স্যার ম্যাডামের ঝাড়ি। ক্লাসগুলাও মিস যেত না। রুবার ফ্লাকচুয়েটেড মুড, কখন যে ভালো আর কখন যে কি… অর্চির কথা আর কি বলব…আবেগের আতিশয্যে ও মারিয়া ও মারিয়া গাইতে গাইতে মারিয়া আপাকে দেখিয়ে ফেলল একদিন, আর যায় কই………
পিটির সাথে মৌলির কোরিওগ্রাফী উইথ ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক মুসু মুসু হাসি, আয়রন উম্যান এলির শক্ত গোলক নিক্ষেপ, শৈলীর দারে দারে দ্রুম, দেরে দেরে দেরে…ভালই যাচ্ছিল দিনগুলো। আর ফারানার চানাচুর মাখানো…উমমমম (চানাচুর, চিপস, ম্যাগী নুডলস, বাদাম, মুড়ি…চিড়া ভাজা, টমেটো…)

আমার চার বছরের রুমমেট লুনা, ওর সম্বন্ধে কিছু বলব না আমি, খুব কাছের মানুষের সমন্ধে বিশেষ কিছু বলা যায় না আসলে। তবে এইটুকু না বললেই না, এখনো সবার মনের কথা ওর কাছে জমা রাখা হয়, ব্যাংক এশিয়া। এখনো আগের মতই আছে তবে যুক্ত হয়েছে আইটেমের টেনশন।

সিল্লু ছিল একটা গুল্লু বাবু, ত্রিভুজের মত দুই গালে দুটো আর থুতনীতে একটা তিল। দৌড়বিদ বনি, সারাক্ষণ হাসতে থাকা ভুটি (সরি বন্ধু 😀 ), তাপসীর সাথে ডুয়েট করে বিখ্যাত হয়ে যাওয়া পূষ্প…গানটা হলো, আমি চাকর তুমি মনিব, সে কি জাননা…

এভাবে চলতে চলতেই দুবছর পর হঠাৎ চলে গেল নিশাত আর তিষা, শারিরীক অসুস্থতার জন্য।

আর একজনকে নিয়ে বলে আজ শেষ করি, আমাদের সর্বজন খ্যাত 64 পাউন্ড. ঘুমাত সিংহাসন পোজে (আহ…ছবিটা যদি দিতে পারতাম…), পরীক্ষার আগের রাতে আমাদের যখন ফিজিক্স মোটামুটি পুরা সিলেবাস বাকি, ওর তখন ভুগোলের আর দুইটা শর্ট কোয়েশ্চেন রিভাইস দেয়া হয়নি বলে টেনশনে কাঁপাকাঁপি অবস্থা।

এই হলো আমরা সব সদাচারিয়ান। কোন এক প্রিন্সিপাল ইন্সপেকশনে হাউসের সামনে বিশাল এক বোর্ড টাঙ্গানো হল, তাতে হাউস সম্পর্কে ক্যাডেটদের কমেন্ট লেখা। কোনো কমেন্টই আজ আর মনে নেই, একটা ছাড়া, সেটা হলঃ
রামছাগলের লম্বা কান, সদাচার আমার জানের জান
:salute:

৫,৬২৬ বার দেখা হয়েছে

৭৫ টি মন্তব্য : “সদাচারিয়ান”

  1. রায়হান আবীর (৯৯-০৫)

    সুষমা স্বাগতম...

    লেখা ভালো হইছে। স্যামের পিসিতে বইসা ওরেই বাঁশ দেওয়ার জন্য সমকালীন সিসিবি ধারাবাহিকতা বজায় থেকে তোরে :salute:

    তোদের ব্যান্ড আইসিসিতে বাংলা ব্যান্ডের কভার করা একটা লালনের গান গাইছিল (তোমার ঘরে বসত করে মনে হয়)...কিন্তু ভোকাল তো ছিল জাকিয়া...এইটাই কি জামি? যাই হোক...

    রামছাগলের লম্বা কান, সদাচার আমার জানের জান

    :khekz: :khekz:

    জবাব দিন
  2. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)
    সাত দিনের টার্ম কাটিয়ে এসেই আমি আমার রুমমেটকে আর চিনতে পারলাম না, কারণ সে তার বিশাল কেশ রাশির মায়া কাটিয়ে পুরা ন্যাড়া হয়ে আসছে। কবি মানুষ…আমি তাই বেশি কিছু বলতে পারি নাই।

    ছেলেরা কবি হইলে যেমন লম্বা চুল রাখে, মেয়েরা কি কবি হইলে তার উল্টাটা হয়া যায় নাকি ;)) ;))
    কত অজানারে :dreamy:

    যাহোক সুষমা আপু, লেখা ভালৈছে। সমকালীন সিসিবি'য় ধারায় তোমারেও বলি, আরো লেখো, আরো লেখো 🙂


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  3. সায়েদ (১৯৯২-১৯৯৮)
    .... পোকার যন্ত্রণায় ছোট্টখাট্ট লাফ দেয়ায় গাইড আপা বকা দিসে।

    পোকার যন্ত্রণায় আমার বৌও লাফ দেয় 😀 😀 । তবে ছোট্টখাট্ট লাফ না বড় লাফ।

    রামছাগলের লম্বা কান, সদাচার আমার জানের জান

    দারুণ কথা 😛 ।

    অনেকগুলো লাইন খুব মনে ধরছে। কোট করলে বিশাল আয়তন হয়ে যাবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা হয়েছে সেটা হলো - নস্টালজিক করে তুলল (ইন্সপায়ার্ড ফিল করছি)। মনে মনে ভাবছি আরে এমনটা তো আমারও বলার আছে।
    আমার বন্ধুরাও তো এরকম মজার মজার স্মৃতি নিয়ে মনের মাঝে চিরস্থায়ী হয়ে আছে।

    খুব ভালো লেগেছে আপু :clap: । আরও লেখা চাই।


    Life is Mad.

    জবাব দিন
  4. মুসতাকীম (২০০২-২০০৮)
    রামছাগলের লম্বা কান, সদাচার আমার জানের জান

    হো হো হো :)) :)) :))


    "আমি খুব ভাল করে জানি, ব্যক্তিগত জীবনে আমার অহংকার করার মত কিছু নেই। কিন্তু আমার ভাষাটা নিয়ে তো আমি অহংকার করতেই পারি।"

    জবাব দিন
  5. তানভীর (৯৪-০০)

    তোমার নিজের ঘর, আমাদের সবার ঘরে স্বাগতম সুষমা।

    নষ্টালজিক করা লেখা। তোমার লেখার হাত বেশ ভালো। :clap: :clap:

    খুব কাছের মানুষের সমন্ধে বিশেষ কিছু বলা যায় না আসলে।

    একদম ঠিক।

    সমকালীন সিসিবি’য় ধারায় তোমাকে :salute: এবং আরো লিখ,আরো লিখ।

    জবাব দিন
  6. তৌফিক (৯৬-০২)

    আপু, সিসিবিতে স্বাগতম।

    লেখা ভালো লাগছে, নস্টালজিক হয়ে গেলাম। আরো চাই কিন্তু।

    সদাচার, শান্তি, সত্য বুঝি না, দুনিয়ার সকল লাল হাউসরে লাল সালাম।

    রেড রেড আপ আপ। :gulli: :gulli: :gulli:

    জবাব দিন
  7. নাজমুল (০২-০৮)

    তৌফিক ভাই খালি লাল হাউসের কথা মনে করাই দেয়। 🙁
    তবুও রেড রেড আপ আপ,
    এবার জিতবো ফাইনাল কাপ :grr:
    সুষমা আপু লেখা ভালো হইছে :boss:
    কিন্তু সদাচার হাউসের একজনের কথা মনে করাই দিলেন 🙁

    জবাব দিন
  8. শার্লী (১৯৯৯-২০০৫)

    সুষমা আমি মনে হয় এই বিখ্যাত 64 পাউন্ড মানুষটাকে চিন্তে পারছি। সামিয়ার বাস্য মাঝে মধ্যে যায় তাই না সামিয়া। নামটা নাই বা বললাম, হাজার হোক আমাদের fellow arts party ই তো। 😀

    জবাব দিন
  9. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    আপু স্বাগতম,
    তোমার লেখা পড়ে নস্টাল জিয়া, খালেদা ,হাসিনা...সব কিছুতে ভুগ্লাম (রাজনৈতিক মন্তব্য হইল নাকি??)... :clap: :clap:


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  10. তাইফুর (৯২-৯৮)
    মা, যাও জুতাটা ঠিকমত পরে আস।

    কল্পনায় ভাস্লাম, আমারে 'ক্ষুরস্বামী বদর চৌ' বলছেন 'বাবা, সোনা, যাও জুতাটা ঠিকমত পরে আস' :dreamy:


    পথ ভাবে 'আমি দেব', রথ ভাবে 'আমি',
    মূর্তি ভাবে 'আমি দেব', হাসে অন্তর্যামী॥

    জবাব দিন
  11. হাসনাইন (৯৯-০৫)

    স্বাগতম সুষমা। 🙂
    আশা করি একটা লেখা দিয়েই গায়েব হয়ে যাবি না। 😛

    খুব কাছের মানুষের সমন্ধে বিশেষ কিছু বলা যায় না আসলে।

    -ঠিক ঠিক...খুব ঠিক।
    লেখা ভাল লাগছে খুব, সবাই ছিল লেখায় মনে হয়। 🙂

    জবাব দিন
  12. অর্চি (৯৯-০৫)

    সুষম আমি এদ্দিন পর এই লেখা পড়লাম!! 🙁 সুরি!! আমি দারে দারে দ্রুম এর কথা একেবারেই ভুলে গেসিলাম কেনজানি! 😕 আহহহহ কি সুন্দর ছিলো দিনগুলা... :dreamy:

    আমার আরেকটা জিঙ্গেল মনে পরসে যেটা দিয়ে আমরা চিৎকার কম্পিটিশন করতাম সত্য হাউসের সাথে ভলিবলের টাইমে-
    ইস্ট অর ওয়েস্ট
    সদাচার ইজ দা বেস্ট! :awesome:

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।