সিক্স ডেজ সেভেন নাইটস

দেশ থেকে ঘুরে আসার পর অর্থাভাবে পরেছিলাম। আসার সময় বউ ল্যাপটপটা রেখে দিলো। তাই এখানে এসে আবার একটা কম্পিউটার কিনতে সময় লাগলো । ব্লগ লেখার নেশাটা ভাল জাকিয়ে বসেছে মনের মাঝে। প্রথম লেখাগুলো ক্যাডেট কলেজের স্মৃতি থেকে সংগ্রহিত হলেও এবার তার পরবর্তী অধ্যায়। অর্থাৎ ইউনিভার্সিটি লাইফ।

বুয়েটে আমাদের একসঙ্গে থাকা, রাতভর ঘুরে বেড়ানো, হোটেলে গিয়ে খাওয়া দাওয়া এবং মাঝে মাঝে দেশে-বিদেশে ভ্রমন করাটা আমাদের মজ্জাগত হয়ে গিয়েছিলো। সে এক দারুণ সময় গেছে আমাদের, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। এই ট্রেডিশনটার জনক হিসেবে আমি কামরুলকে ধন্যবাদ দিতে চাই। আমি থাকতাম জগন্নাথ হলে। প্রথম দিকে আমাকে কামরুল যেতে বলতো বুয়েটে। সারাদিন শেষে এত ক্লান্ত থাকতাম যে আর যেতে ইচ্ছে করতো না। কিন্তু কামরুল আর মাসুদ দলবেঁধে যখন আড্ডা দিতে আসতো আমার কাছে, আমার খুব মজা লাগত। তারপর আস্তে আস্তে নেশায় পেয়ে বসলো বুয়েটে আড্ডা। নেশা থেকে চিরস্থায়ী বাসই হয়ে গেল বুয়েটে। সবাই আলাদা আলদা ইউনিভার্সিটি আর ডিপার্টমেন্টে পড়লেও থাকি একসঙ্গে সব বুয়েটে, রশিদ হলের ২০০৪ নাম্বার রুমে। দিনরাত কাটে সেখানে। আড্ডা , সিনেমা দেখা, টিউশনির বেতন পাবার পর দল বেঁধে ঢাকার বাইরে ঘুরতে চলে যাওয়া, আর বাজেট আরেকটু বেশি হলে কলকাতা, দার্জিলিং, শিলং, গোয়া- এই ছিলো মোটামোটি আমাদের অবস্থা।

আজকে আমাদের ঘুরাঘুরির কিছু গল্প বলবো।

ঠিক করলাম সবাই দল বেঁধে সেন্টমার্টিন যাবো। আমার অবশ্য একটা বাতিক ছিল। ট্যুরে যাবার আগে কেনাকাটা না করলে মনে হতনা ট্যুরে যাচ্ছি। সবার কাছে প্রস্তাব রাখলাম যেহেতু আনন্দ করতে যাচ্ছি সেটা ঢাকা থেকেই শুরু হউক। কিছু না কিছু হলেও কিনতে হবে সবার। বেশির ভাগ জিনিস ওয়ান টাইম ইউজের জন্য কেনা হবে, মাত্র ট্যুরের ছয়-সাত দিনের জন্য। তাই দল বেধে গেলাম বঙ্গ বাজার। সবাই কিছু না না কিছু কিনল। আমদের আব্দুলাহকে আমি একটা বীচ হাফ-প্যান্ট কিনে দিয়েছিলাম। বিচ হাফ প্যান্ট বলে ও’কে কিনে দিয়েছি, যদিও আমি জানতাম ওটা নাইজেরিয়ান(কালু দের) হাফ প্যান্ট। ও সেই হাফ প্যান্ট পড়ে সাত দিন কাটিয়েছে।
আমিও খুব শখ করে তিনশ টাকা দিয়ে একটা ভলিবল কিনলাম যেন সমুদ্রে গিয়ে খেলতে পারি।

ঢাকা থেকে চট্রগ্রাম যাবার পথে সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনে

ঢাকা থেকে চট্রগ্রাম যাবার পথে সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনে

তখন একেবারেই অফ সিজন। সবায় খুব হই হই করে রউনা হলাম ঢাকা থেকে ২০০৫’র জুলাই মাসের কোন এক তারিখে। কক্সবাজার গিয়ে শুনি অফ সিজন হওয়ায় টেকনাফ থেকে কোন সী-ট্রাক সেন্টমার্টিন যায় না। হায় হায় ! প্রবাল দ্বীপ দেখার স্বপ্ন কি তবে ভেস্তে যাবে? কামরুল বললো, ‘কোন না কোন ভাবে তো যাওয়া যায়ই, আমরাও যাবো।’ পরদিন সকালে যথারীতি আকাশ মেঘলা। হোটেলের সবাই আমদের যেতে না করল। এখন সেন্টমার্টিন যাওয়া নাকি লাইফ রিস্ক। কিন্তু সবার অমতের মাঝে কামরুল ছিল একরোখা। ভাগ্যিস ও গোঁ ধরে ছিলো। নইলে আমাদের সেন্টমার্টিন দেখা হতো না।

চট্রগ্রাম গিয়ে যাত্রাবিরতি ,আর ফাঁকা মাঠ পেয়ে ভলিবল খেলা শুরু

চট্রগ্রাম গিয়ে যাত্রাবিরতি ,আর ফাঁকা মাঠ পেয়ে ভলিবল খেলা শুরু

টেকনাফ গিয়ে শুনলাম কিছু মালবাহী ট্রলার নাকি যায় সেন্টমার্টিন, আর কিছু মাছ ধরার ট্রলার। সেন্টমার্টিন যেতেই হবে, তাই সে সময় আর কিছু না পেয়ে সবাই মিলে একটা মাছ ধরার ট্রলার ভাড়া করলাম। সঙ্গে দুজন সারেং।

হোটেলের সুইমিং পুলে দাপাদাপি

হোটেলের সুইমিং পুলে দাপাদাপি

ব্যস, যাত্রা শুরু হলো।
মোট নয় জন ছিলাম। যারা সাঁতার জানতো না, তারা খুব ভয়ে ভয়ে নৌকার মাঝামাঝি বসে পড়লো, বাকিরা দিব্যি কিনারে বসে একজন অন্যজনের গায়ে পানি ছিটা ছিটি শুরু করলাম।
কক্সবাজার বিচে ভলিবল খেলা

কক্সবাজার বিচে ভলিবল খেলা


নাফ নদীতে প্রবেশ করার পর বিডিআরের এক চেকপোস্ট থেকে একজন আমাদের যেতে না করল। বললো, যে মাঝ দরিয়ায় এসব সারেংরা নাকি মানুষদের একা পেলে বিপদে ফেলে দেয়। কিন্তু ততোক্ষণে আমারা অন দি ওয়ে। এসব কথায় কান দেয়া দিলাম না।
ট্রলারে উঠার পর। সেভেন-আপের বোতলের ভিতরে কিন্তু অন্য জিনিস ছিলো।

ট্রলারে উঠার পর। সেভেন-আপের বোতলের ভিতরে কিন্তু অন্য জিনিস ছিলো।

তোয়ালে বিছিয়ে চার জন তাস নিয়ে বসলো। আমি আর মাসুদ বসলাম দু’পাশে নাফ নদীর বিলাসী সৌন্দর্য দেখতে। খেলার মাঝে খুব হই ছই হচ্ছে। কামরুল ছবি তোলা নিয়ে ব্যাস্ত, নানান পোজ দিয়ে ছবি তুলছে শোয়েব , আব্দুল্লাহ আর মিশেল।

নদী পেরিয়ে যখন মোহনায় আসলাম তখন একটু ভয় লাগা শুরু হলো বিশাল বিশাল ঢেউ দেখে। আমাদের ট্রলার বেশি বড় না। আর তারপর যখন পুরোপুরি সাগরে গিয়ে পড়লাম তখন আনন্দ চলে গিয়ে অসম্ভব ভয়ে আমরা গুটিসুটি মেরে গেলাম। ঢেউয়ের তালে নৌকা দু’পাশে দুলছে আর আমরা ভয়ে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরছি। তাস খেলা বন্ধ।

এ হাসি বেশিক্ষণ থাকেনি

এ হাসি বেশিক্ষণ থাকেনি

সাগরের ঢেউ যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম। সবাই যার যার জায়গায় শক্ত হয়ে ট্রলারের কাঠ ধরে বসে আছি। ঢেউয়ের দুলুনিতে কামরুল বমি শুরু করে দিলো। কেউ কোন কথা বলছে না। আমি ভয় থেকে বাঁচার জন্য কক্সবাজার থেকে কেনা বাংলা মদ খাচ্ছি ।

ভেবেছিলাম আব্দুলাহ ভয় পাবে না। ও হচ্ছে আমাদের কলেজের সেরা সাতারু। শুধু আমাদের কলেজেই না, আমরা যখন ক্লাস ইলেভেনে ছিলাম তখন ও আন্ত ক্যাডেট কলেজে সেরা সাতারু হয়েছিলো। কিন্তু এটা তো ক্যাডেট কলেজে সুইমিং পুল না। মাঝ সমুদ্রে এখন ঢেউয়ে ট্রলার ৫/৬ ফিট উপরে উঠছে আবার নামছে। ও’কে ভয় পেতে দেখে মিশেল সাহস দিচ্ছে, ‘চিন্তা করিস না দোস্ত, নৌকা ডুবে গেলে ভাঙ্গা কাঠের টুকরা ধরে ফেলবি একটা, তারপর ভাসতে ভাসতে পাড়ে চলে যাবি।’ অথচ মিশেল নিজে সাঁতারই জানে না।

নদী থেকে সাগরে প্রবেশের আগে তোলা শেষ ছবি

নদী থেকে সাগরে প্রবেশের আগে তোলা শেষ ছবি

এইরকম যখন অবস্থা তখন দূরে আরেকটা মাছ ধরার ট্রলার দেখতে পেলাম। তারা আমাদের কাছে আসার পর আমাদের ট্রলার থামিয়ে দিলো সারেং ওদের কাছ থেকে মাছ কিনবে বলে। দরাদরি শুরু হলো আর এই দেখে আমাদের মাথায় রক্ত উঠে গেলো। ব্যাটা আমরা বাঁচা মরার টেনশনে আছি আর তোরা আছিস তোদের মাছ কিনার তালে!! গালাগালি শুরু করলাম, কিন্তু হারামজাদা সারেং আমাদের কোন কথাই কানে নিচ্ছে না। বিডিআরের লোকটার সাবধান বাণী মনে পড়লো। বেশি গালাগালি করলে যদি আমাদের ফেলে দিয়ে চলে যায় কেউ হদিস পাবে না কোন দিন। তাই চুপ থাকতে বাধ্য হলাম। আর ঠিক তখন নামলো বৃষ্টি। সেই সাথে মনে হলো যেন ঢেউ আমাদের ট্রলারটাকে একবার পাঁচ তলার সমান উপরে তুলছে আবার পাঁচতলা নিচে গর্তে পুতে ফেলছে। এর নাম বুঝি প্রকৃতি !! আমার এখনো মনে আসে আমরা সেই জার্নিতে শেষ এক ঘন্টা কেউ কারো সাথে কথা বলি নাই।

আহা শান্তি!! ওইতো দূরে সেন্টমার্টিন দ্বীপ

আহা শান্তি!! ওইতো দূরে সেন্টমার্টিন দ্বীপ

অবশেষে প্রায় পাঁচ ঘন্টা ভীতসন্ত্রস্ত ভ্রমনের পর দূরে সেন্টমার্টিন দেখা গেলো। আমার তখন একবার ‘ওয়াটার ওয়ার্ল্ড’ সিনেমাটার কথা মনে পড়লো। মনে হলো যেন কেভিন কস্টনারের মতো অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কার করলাম। আবার একবার নিজেকে কলম্বাস ভাবতে ইচ্ছে হলো।

(মনে হয় চলবে……… নাও চলতে পারে 😉 )

৩,০১৬ বার দেখা হয়েছে

২৯ টি মন্তব্য : “সিক্স ডেজ সেভেন নাইটস”

  1. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    বেশ ঝরঝরে লেখা সুব্রত :clap: :clap: অবশ্যি চলবে এবং চালাতে হবে 😡
    আর এইরকম বিপদ সঙ্কুল অবস্থায় একরোখা ভাবে গোঁ ধইরা পরে নিজেই সবার আগে বমি শুরু করায় কামরুলরে সেইন্ট মার্টিন নিয়া কোনো ডোজ দেয়া হয়নাই? 😛 😛 ;;;


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  2. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    আজাইরা মাস্তানি দেখানোর জন্য কামরুলের ব্যান চাই......।
    কামরুলে মাস্তানি মাইনা নেওয়ার জন্য বাকী গুলারো ব্যান চাই......

    আবার চাইবা নাকি......।। জুলাই-অগাস্টে......। বউ সহ...।। 😉


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  3. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)
    রশিদ হলের ২০০৪ নাম্বার রুমে। দিনরাত কাটে সেখানে।

    বুঝলাম না, রশীদ হল কি ক্যাডেটদের আশ্রয়কেন্দ্র নাকি? 😮

    আমি ঢাবি'র এসএম হলের, তারপরেও রশীদের ১০৮ এ আমার সিট ছিলো ৩ বছর। :)) সপ্তাহে কমপক্ষে ৩ রাত থাকা হত সেখানে। আর রশীদ হলের ক্যান্টিন ছাড়া ত সকালের নাস্তাই হতো না।


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।