বিমানবালা

কলেজে কিছু কিছু ব্যাপার ছিলো খুবই মনোমুগ্ধকর। জানিনা সভ্যতার কোন প্রাঙ্গনে এই ঘটনাগুলির স্থান, তবুও এসব ঘটনা মনে পড়লে হঠাৎ নিজের অজান্তে হেসে উঠি, মনে মনে বলি, ‘হায়, আমি এমন ছিলাম।’ জানিনা আজ এই বয়সে এসে ব্যাপারগুলো ক্যাডেট কলেজ ব্লগে লেখা উচিত হচ্ছে কিনা, কিন্তু না লিখেও পারছি না। যেহেতু সুযোগ আছে, তাই লিখে ফেললাম।

ক্যাডেট কলেজের ‘টার্ম-এন্ড’ দিন গুলি খুবই আনন্দের থাকে ক্যাডেটদের কাছে। একদিকে বাড়ি যাওয়ার আনন্দ, স্পেশাল ডিনার অন্যদিকে সবাই মিলে চমৎকার একটা গ্যাদারিং। ওইদিনের জন্য সবাই মনে হয় সারা টার্ম ধরে অপেক্ষা করে। আমিও ব্যাতিক্রম নয়। আমাদের ‘টার্ম-এন্ড’ ডিনারে আমাদের স্যাররা তাদের ম্যাডামদের নিয়ে আসতেন এবং ডিনার শুরু হবার আগে ডাইনিং হলের সামনে থেকে তাদের রিসিভ করে ভিতরে নিয়ে আসা ছিলো ক্লাস এইটের দায়িত্ব। কোন স্যার-ম্যাডাম কোন টেবিলে বসবেন এইটা নির্ধারন হয়ে যেতো সেদিন দুপুর বেলা বা মিল্ক ব্রেকে।

আমি তখন নতুন ক্লাস এইটে। তখনো জুনিয়র আসে নাই। পুরো ক্লাস সেভেন জুড়ে আমার ধারনা ছিলো পৃথিবীতে আমার জন্ম হুদাই। ক্যাডেট কলেজই আমার নিয়তি, এখানে একদিন এসব করতে করতে , মানুষের মার এবং ধমক খেতে খেতে আমার জীবনের অবসান ঘটবে। :bash: একজন সোজা সাপ্টা, নিরেট চিন্তা চেতনার লোক ছিলাম আমি। জীবনের যোগ বিয়োগ দূরে থাক, পৃথিবীর যাবতীয় জটিল বিষয় সম্পর্কে কোন ধারনাই ছিলো না আমার। আমি শুধু জানতাম দিন আর রাত হয়, কিন্তু কেনো হয়, জানে ভগবান। 😮

এরকমই যখন আমার মনের অবস্থা ঠিক তখনই টার্ম-এন্ড ডিনারে এক ঘটনা ঘটলো। মিল্ক ব্রেকে দেখি আমাদের টেবিলে নেম-প্লেট দেয়া হইছে। সবার মন উসখুস করছে, কার টেবিলে কোন স্যার-ম্যাডাম পড়ছে দেখার জন্যে। আমার টেবিলে তাকিয়ে দেখি নেম-প্লেটে দেয়া মিসেস বিমান রায় চৌধুরী 😉 । আমার শিরদাঁড়া দিয়ে হিম শীতল স্রোত বয়ে গেলো। 😉
সেই সময় নিজের সৌন্দর্যের কারনে মিসেস বিমান রায় চৌধুরী ছিলেন ক্যাডেটদের কাছে ডাকসাইটে জনপ্রিয়। আমাদের আড্ডায় তার কথা উঠলে আমি এর-ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করতাম। ভুলেও বলতামনা, আমার কাছেও তাকে খুব সুন্দর লাগে, পাছে কেউ ‘ক্ষেত’ বলে এই ভয়ে। কিন্তু আজ তাকে রিসিভ করে আমি নিজের টেবিলে এনে বসাবো। এও কি সম্ভব !!!
(এই প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ে গেলো, আমাদের রিজভী’র প্রায়ই ভূতে’র (আমাদের রসায়ন স্যার) বউ কে রিসিভ করতে হতো। তিনি দেখতে কেমন তা বলা নিষ্প্রয়োজন :grr: , তবে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে রিজভী’র কেমন লাগতো। :-B )
যাই হউক, আমার টেবিলমেট, আমার এক ব্যাচ সিনিয়র কামরুল ভাই আমাকে বাহবা দিচ্ছেন। ‘জানো সুব্রত, বিমান রায়ের বউ একটা ‘……” । তোমার যা কপাল এই রকম একজন ম্যাডাম পাইলা রিসিভ করার জন্যে।’ আমি কামরুল ভাইয়ের দিকে ফ্যাল-ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি। কামরুল ভাই এসব কি বলছে। আগা-মাথা কিছুই বুঝতে পারি না। কিন্তু ভিতরে ভিতরে খুব টেনশন লাগছে। কাজটা ভালো ভাবে করতে হবে। একজন অপরিচিত ভদ্রমহিলাকে সম্মান সহকারে রিসিভ করে আমার টেবিলে এনে বসাতে হবে। নিজেকে একটু ফিরে পেলাম যেনো।

সবাই যখন নামাজে গেলো, তখন আমি হাউজে একা। ইচ্ছা মতো প্রসাধন করবো বলে ঠিক করলাম। যথারীতি স্নানের আগে ডন-বৈঠক দিলাম। আগাছা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে স্নান সারলাম আধা ঘন্টা ধরে। তারপর ড্রেস-আপ করলাম। মনের ভিতর চাপা চাপা আনন্দ। বডি-স্প্রে দিয়ে সারা শরীর ভিজিয়ে ফেললাম। হঠাৎ এমন এক জায়গায় 😮 স্প্রে- করলাম আমার মনের সব আনন্দ-আশ্বাস যেনো মুহুর্তে জ্বলে পুড়ে ছাড়-খাড় হয়ে সারা পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেলো। এমন জ্বলুনি। পাঠকদের কারো যদি ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা থাকে তাহলে বুঝতে পারবেন, এটা লিখে প্রকাশ করার মতো না। মনে হলো এই জ্বালা যেনো সারাজীবন জ্বলতে থাকবে………… (বাকিটা পরে লিখবো, আমার বউ চইলা আসছে 😛 )

৩,৯১৬ বার দেখা হয়েছে

৪৫ টি মন্তব্য : “বিমানবালা”

  1. তৌফিক (৯৬-০২)
    স্প্রে- করলাম আমার মনের সব আনন্দ-আশ্বাস যেনো মুহুর্তে জ্বলে পুড়ে ছাড়-খাড় হয়ে সারা পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেলো। এমন জ্বলুনি। পাঠকদের কারো যদি ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা থাকে তাহলে বুঝতে পারবেন, এটা লিখে প্রকাশ করার মতো না।

    আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নাই, সুব্রত ভাই। 😀

    আপনার তো আছে, একটু খোলাসা কইরা কইবেন? ;;) ;;)

    জবাব দিন
  2. তাইফুর (৯২-৯৮)

    রিসিভ করতে যাওয়ার আগে আগাছা পরিষ্কার করতে হইল ক্যান ??
    ম্যালা দিন ধইরা জমছিল বইলা ?? :-B
    নাকি খালি গায়ে রিসিভ করতে যাইতে চাইছিলা ?? :shy:


    পথ ভাবে 'আমি দেব', রথ ভাবে 'আমি',
    মূর্তি ভাবে 'আমি দেব', হাসে অন্তর্যামী॥

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।