এপিটাফ

আমার মতে ১৯৯৯টা আমাদের সিলেট ক্যাডেট কলেজের জন্যে স্বাধীনতার বছর বলা চলে। প্রিন্সিপাল সোহরাব আলী তালুকদারের নিষ্পেষনকে যদি জেনারেল আইয়ুব খান বা ইয়াহিয়ার শাসনকাল ধরা হয় তাহলে ‘৯৯ সালটা আমার কাছে স্বাধীনতা এবং বিজয়ের প্রতীক। প্রিয় দুই ছোটভাইয়ের অকালমৃত্যুর পর ক্যাডেটদের বিপ্লব, এবং তার মধ্যে দিয়েই ‘ক্যাডেট’ নামক জাতীয় চেতনার উদ্ভব। শুধু বাকি ছিলো রাজনৈতিক সমর্থন বা নিজেদের একটা রাজনৈতিক মতবাদ। সেটা দেখাতে পারলে সিলেটের সাল্যুটিকরেও হয়তো আমরা ‘ক্যাডেট দেশ’ নামে আলাদা একটা রাষ্ট্র সৃষ্টি করে ফেলতাম। আমাদেরই কয়েকজন হয়তো সে দেশের প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিতো।

যাই হউক। যে প্রসঙ্গে কথাগুলি বলছিলাম। যুদ্ধবিধস্ত একটা দেশে যেমন লুটপাট, অরাজকতা চলে ঠিক সে রকমই হয়ে যায় আমাদের সিলেট ক্যাডেট কলেজ ৯৯ সালের পর। নেতা হিসেবে সামনে চলে আসে অনেক নতুন মুখ। অসীম সাহসী তারা, মুখমন্ডল থেকে নারায়নী আলোর ছটা বের হয় যেনো। আমরাও সেই আলোর নিচে এসে সাহস পেয়ে গেলাম।
আমাদের এক বন্ধু ছিলো, রিজভী। তার একটা কথা মনে পড়ে। ‘মামা, বিড়ি খাইতে হাটে, মাঠে, ঘাটে দৌড়াইতে আর ভালো লাগে না। হালার এখন থেইকা রুমে বইসা-ই বিড়ি খামু।’ শান্ত টিউবলাইট থেকে লাইন নিয়ে ব্লেড দিয়ে বানানো হিটারে কফি গরম করে খাওয়াচ্ছে সবাইকে। একপাশে আসর জমিয়ে কার্ড খেলা হচ্ছে।
আমার দায়িত্ব ছিলো সন্ধ্যা হলেই রুমের জানালায় কম্বল দিয়ে দেয়া যাতে বাইরে থেকে বুঝা না যায় কি হচ্ছে রুমে। আমি যথারীতি ভুলে গেলাম। রাত ১০টার দিকে কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ থেকে সদ্য আগত একজন স্যার রাউন্ডে আসলেন। রুমের দৃশ্য দেখে আর ভিতরে ঢুকার সাহস হলো না তার। হাউজ বেয়ারা মুরশেদ ভাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মুরশেদ, এই অবস্থা কেনো?’ মুরশেদ ভাই বললেন, ‘স্যার এই রকমই।’

এমনি অবস্থায় সেই বৎসর আইসিসি ফুটবল মিটে রংপুর গেলাম। সেখানে আরো বড় বড় সব মানুষের সাথে দেখা হলো যারা নিজেদের কলেজে স্বনামে খ্যাত!! রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে আমাদের এক ব্যাচম্যাট ছিলো। দশ ক্যাডেট কলেজে তখন সবচেয়ে দাগী আসামী। দুই নম্বরীতে অত্যন্ত চৌকস। ফৌজদারহাটের ভলিবল মিটে ৯ ক্যাডেট কলেজের এডজুট্যান্ট মিলে সারারাত চেষ্টা করেও তাকে ধরতে পারেনি। ফৌজদারহাটের লাইব্রেরির ছাঁদে লুকিয়ে ছিলো সে। এক পর্যায়ে সেখানে এট্যাক হবার পর, দোতলা থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। বন্ধু হিসেবে ও অসাধারন।

যাই হউক এরকম আরো অনেক দাগী ক্যাডেটের সন্ধান মিললো ফুটবল মিটে। তারাও নানান কায়দা জানে। খুব তাড়াতাড়ি তাদের সাথেও ভাব হয়ে গেলো। নাম না-ই বললাম। এরকম এক রাতে কোথা থেকে যেনো হাই-ক্লোরাইড তামাক আনা হলো। মোটামোটি সবাই সেই তামাক চেখে দেখলো। না চাখলে আবার আন্তর্জাতিক ক্যাডেট সম্মেলনে প্রেস্টিজ হারানোর ভয়। মির্জাপুর, রাজশাহী, সিলেট,রংপুর,ফৌজদারহাট সবাই যখন ঢুলু ঢুলু তখন মির্জাপুরের এক ফ্রেন্ড বললো, ‘মামা, আমার খুব টয়লেট চাপছে, আমি যাইতে পারুম না, কেউ একজন আমারে ধইরা নিয়া যাবি?’
একজন ওকে ধরে টয়লেটে নিয়ে গেলো। ও ছোট টয়লেট করতে গিয়ে কি মনে করে দাঁড়িয়েই বড় টয়লেট করে ফেললো।
আর যে ধরে নিয়ে গিয়েছিলো সে এই দৃশ্য দেখে ,দে ছুট।

৩,৪৪৯ বার দেখা হয়েছে

৪৬ টি মন্তব্য : “এপিটাফ”

  1. সাকেব (মকক) (৯৩-৯৯)

    আরে,
    তুমি কামরুলের সেই পুলওভার(নাকি মাফলার?) ওয়ালা "নিঠুর" বন্ধুটা না? :-B
    মির্জাপুরের দুষ্টুটার নাম পরে আমাকে কানে কানে বইলা দিও... 😉

    ব্যিপক মিজা পিলাম... :pira:


    "আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
    আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস"

    জবাব দিন
  2. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    ইস আমরা যদি এই অবস্থা পাইতাম, কি যে করতাম। ~x(

    আমাগো অবস্থা ছিল "মাথার ঘায়ে কুত্তা পাগল" এর মত। চ্যাপ্টা হই ছিলাম।


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  3. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)
    আর যে ধরে নিয়ে গিয়েছিলো সে এই দৃশ্য দেখে ,দে ছুট

    ঐ পরিস্থিতিতেও যার এমন সেন্স ছিল তারে :just: :salute:


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  4. ৯৯ আর ০০ এই দুই বছরের কাহিনী লিখলে সিসিবিতে ব্যান খাওয়ার সম্ভাবনা আছে। অনেক কাঁটছাঁট করার পর যা দাঁড়ায় তা মোটামোটি সুব্রত'র পোস্টের মতো।
    এমন অনেক রাত গেছে যখন ৫৩ জনের ২৫/২৬ জন একলগে কলেজের বাইরে ঘুরতে গেছে। ক্লাস ১২এর ব্লক ফাঁকা হইয়া যাইতো। স্যাররা ১২এর ব্লকে আসতেন না, বিব্রত হয়ে যান এই ভয়ে।
    আহা!! কি দিন ছিলো। 😀 😀 😀

    জবাব দিন
  5. শার্লী (১৯৯৯-২০০৫)

    ভাই আরসিসির ভাইটা কি বেনজির ভাই? উনি ছিলেন আপনাদের ব্যাচের সবচেয়ে হিট ক্যাডেট(জুনিয়রদের কাছে) ওনার বিভিন্ন কাজকর্মের জন্য। আমার টেবিল লিডার ছিলেন।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।