মেঘ বলেছে যাব যাব

বিকাল থেকে রোদের তাপটা আজ একটু কম। উত্তর দিকের আকাশে মেঘের আনাগোনা। চৈত্র মাসের শেষ দিকে এমনিতেই ভ্যাঁপসা একটা গরম থাকে। তার ওপর প্রতিদিন লোকাল বাসের ভীড়ে বাড়ি ফিরতে যা তা অবস্থা হয়ে যায় অভ্রর। আজকে পরিস্থিতি ভিন্ন। সন্ধ্যার পর থেকেই হালকা ঠান্ডা একটা বাতাস বইছে। হয়ত কাছে পিঠেই কোথাও বৃষ্টি হয়েছে। বাসায় ফিরে স্ত্রী নীলার হাতে ব্যাগ টা দিয়েই অভ্র গোসল করতে চলে যায়। গুন গুন করে কি একটা গান গাইতে গাইতে হাতের কাজ গুলো সেড়ে নেয় সে। নীলার সাথে অভ্রর বিয়েটা মাত্র কমাসের। অনেক দিনের পরিচয়। তারপর প্রণয়। তারপর কিভাবে কিভাবে যেন হুট করে ওদের বিয়ে হয়ে গেল। ঘোড় কাটতে না কাটতে এক ছাদের নিচে আবিস্কার করে নিজেদের। গল্পের মত শুরু না হলেও গত ক’মাসে বেশ গুছিয়ে নিয়েছে নিজেরা। অভাবের টানাপোড়েনের মাঝেও দিব্যি চলে যাচ্ছে দিন। গোছল সেড়ে সাদা একটা পাঞ্জাবি পড়ে নেয় অভ্র। আজকে মনটা অনেক ফুড়ফুড়ে। তোয়ালেটা বারান্দায় ঝুলিয়ে দিয়ে মেঝেতেই বসে পড়ে সে।
‘’নীলা। তোমার কিছু লাগবে? রান্নাঘরে হেল্প লাগবে কোন?’’ গলা উঁচু করে জিজ্ঞেস করে অভ্র। কাজ থাক আর না থাক। ভাগ বাটয়ারা করে কাজ করতে দুজনের খুব ভাল লাগে। আর ছোট সংসারের কাজটাও দ্রুত গুছিয়ে আনা যায়।
‘না, কিছু লাগবে না। তুমি বস। চা নিয়ে আসছি।‘ নীলার কথা শেষ হতে না হতেই কারেন্ট চলে যায়। অন্য দিনের মত মেজাজ খারাপ হল না অভ্রর। বরং অন্ধকারে বসে দূরে লঞ্চ গুলোর টিমটিমে আলো দেখতে ভালই লাগছিল। ঘরের ভিতর থেকে মোমবাতির আবছা আলো আসছে। সেই আলো অন্ধকারকে না সড়িয়ে আরও ঘন করে তুলছে যেন। এদিকে নীলা রাতের রান্না শেষ করে চা তুলে দেয় দুজনের জন্য। বৃষ্টির দিনে নাকি ইলিশ খিচুড়ি খাওয়ার নিয়ম। গত কবছরে এমনটাই শুনে আসছে নীলা। তবে আজকের রান্না খিচুড়ী না। ঝাল করে রান্না করা চ্যাপা শুটকি, শুকনো মরিচ ভর্তা আর ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত। ব্যাস এটুকুই। শুটকি অভ্রর খুব প্রিয় আর মরিচ ভর্তা নীলার। টানাটানির সংসারে এই টুকটাক কিছু জিনিসই যেন অমৃত।
বাইরের বাতাস জোড়ালো হচ্ছে। বৃষ্টি নামতে পারে যে কোন সময়। বাতাসের ঝাপটায় চারপাশের সবকিছুকে যেন অপার্থিব লাগতে থাকে অভ্রর। চোখ দুটো বন্ধ করে অভ্র গুন গুন করে গান ধরে। “মেঘ বলেছে যাব যাব, রাত বলেছে যাই। সাগর বলে কূল মিলেছে, আমি তো আর নাই।“ ধীরে ধীরে গলা উঁচু হয় অভ্রর। গমগমে গলার সুর পুরো বাসার কোণে ঘুড়ে ফেরে। খুট করে একটা শব্দ শুণে পিছে ফিরে তাকায় অভ্র। নীলা চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে। এর মাঝে কখন যেন মেয়েটা একটা শাড়ী গায়ে চাপিয়েছে। সাদা রঙয়ের তাতের শাড়ী। জমিনে নীল রঙয়ের হালকা কাজ। দুহাতে নীল রঙ্গা চুড়িগুলো টুং টাং করে বাজছে। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে অভ্র। এক টুকরো আকাশ যেন নেমে এসেছে পৃথিবীর বুকে। হুট করে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামে। পানির ঝাপটা বারান্দার ভেতরে থাকা দুজনকেও ছুয়ে যায়। আধো আধারিতে নীলাকে একজন মায়াবিনী বলে ভুল হয়। মনে হয় টোল পড়া হাসির দিকে তাকিয়ে পাড় করা যাবে বহু বছর।
অভ্রর অবাক মুখ দেখে ফিক করে হেসে দেয় নীলা। তার হাতে একটা মাত্র কাপ। দুজন মিলে এক কাপে খাবে বলে নিয়ে এসেছে। “চা খাও। তারপর ছাদে যাব। দুজন মিলে ভিজব।“ চায়ের কাপ নামিয়ে রাখে অভ্র। মুচকি হেসে বলে, “চল।“
পড়ে থাকে চায়ের কাপ। গরম ভাতের ধোয়া উড়তে উড়তে ঠান্ডা হয় একসময়। এর মাঝে দুই মানব শিশু ছুটে বেড়ায় বৃষ্টির মাঝে। পানির ছিটাতে ভিজে একাকার হয়। খিল খিল হাসিতে মুখর হয় চারপাশ। আহারে। কি সুন্দর। কি সুন্দর।

৪,১৫৯ বার দেখা হয়েছে

২ টি মন্তব্য : “মেঘ বলেছে যাব যাব”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।