আর কিছু চায় না মনে গান ছাড়া… গান ছাড়া

ক্লাস ইলেভেনে প্রথম টার্মটা আম চুরি, করমচা চুরি এসব টুকরো টুকরো ইনডিসিপ্লিন কাজ দিয়েই শেষ। এবার ২য় টার্মটাও বেশ কর্মবিহীন যাচ্ছে। সবার মনে তাই কিছুটা ভাব জেগে উঠেছে, বেশির ভাগ ওয়াকম্যানে গান শুনে সময় কাটাচ্ছে। আমাদের ডর্মে আমি আর কানিজ লেখালিখি করতাম। ক্লাস সেভেন থেকেই তাই আমাদের অবসরটা লেখালিখি করে ভালোই কাটছে।

একদিন দেলোয়ারা ম্যাডাম ডি.এম. ছিলেন, উনি হঠাৎ করে আমাদের ব্লক সার্চ করে সব ওয়াকম্যানগুলি সিজ করে নিয়ে গেলেন। আমাদের গান শোনার আর উপায় থাকলনা। হাউজ মাস্টার স্যারের রুমের ক্যাসেট প্লেয়ারটা বের করতে হলে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়, ঐ করতে করতে গান শোনার আগ্রহটাই চলে যায়। তাই এবার গান শোনা পুরো বন্ধ, আবার শুরু হল কর্মহীন জীবনযাপন। কেউ কাজ খুঁজে পাচ্ছে না দেখে জ্যাক কোত্থেকে একটা মুলতানি মাটি জোগাড় করে এনেছেঃ “চল্‌ আমরা রূপচর্চা করি”। ওর কথা শুনে বাকীরা হেসেই কুটিকুটি! যারা রোজ সকালে পিটি/প্যারেড করে, শার্টপ্যান্ট পরে বিকালে গেমস করে, খাকি ড্রেস পরে ক্লাস করে, জুনিয়রকে পাঙ্গায় (অথবা সিনিয়রদের কাছ থেকে খায়), তাদের জীবনযাত্রার সাথে রূপচর্চাটা একেবারেই বেনানান। আমাদের হাসাহাসি দেখে বেচারা মূলতানি মাটিটা ফেলেই দিল ডাস্টবিনে।

এখানে বলে নেওয়া ভাল – আমাদের বয়সী বাইরের মেয়েরা যখন নতুন নতুন রূপসচেতন হয়ে উঠছে আমরা তখন কলেজের নিয়মভাঙ্গা নিয়ে ব্যস্ত; বাইরের মেয়েরা যখন ড্রেস/অর্ণামেন্টস নিয়ে গল্প করে আমাদের তখন গল্পের বিষয়বস্তু হচ্ছে ক্রিকেটে কে চ্যাম্পিয়ন হল, বক্সিং-এ কে জিতল বা হারল, বুশ-সাদ্দামের যুদ্ধ এই সব। বাইরের মেয়েরা যখন টিভি দেখে, কবিতার বই পড়ে বা গান শুনে সময় কাটাত আমরা তখন টেবিল টেনিস, দাবা আর লনটেনিস খেলে সময় কাটাতাম। তাই আমাদের মাঝে মেয়েলী ব্যাপারগুলি বরাবরই একটু কম ছিল (তখন পর্যন্ত)। আমরা শুধু এটাই ভাবতাম যে আমরা ক্যাডেট। তাই কোন একজনের রুপচর্চার প্রস্তাবটা একেবারে পাত্তাই পেল না।

আমরা এবার সবাই আমাদের হারানো ওয়াকম্যানগুলাকে খুব মিস করতে থাকলাম। আমাদের গান শোনার আইডিয়াল সময় ছিল দুপুরের রেস্ট টাইমে আর রাতের ফ্রি টাইমে। এক সপ্তাহেরও বেশি হয়ে গেল আমরা কোন গান শুনতে পারছিনা। কোন কাজ না পেয়ে আমরা ভাবছি ক্লাস টুয়েল্ভ-এর সাথে ক্ল্যাশ বাধিয়ে দিব কি না। তাহলে কিছুদিন এটা নিয়ে ব্যস্ত থাকা যাবে। কিন্তু চেষ্টা করে কোন লাভ হল না, প্রিফেক্টরা খুব ভাল ব্যবহার করছে তাই ক্ল্যাশ লাগানোর কোন ইস্যু বের করা গেল না। আমাদের ইমিডিয়েট জুনিয়র ব্যাচের সাথে আমাদের সম্পর্ক ভাল ছিল তাই তাদের সাথেও কিছু করা গেল না। যাদের সাথে উঠতে-বসতে ঝামেলা হত (অল্টার্নেট সিনিয়র) তারা তো চলেই গেছে।

প্রায় ২ সপ্তাহ হতে চলল ওয়াকম্যানগুলো সিজ হয়ে গেছে; এরই মধ্যে একদিন রেস্ট টাইমে সায়মা শুনতে পেল কোথা থেকে যেন হালকা গানের আওয়াজ ভেসে আসছে। সাথে সাথে তার চিৎকারঃ “এ্যাই কে কে তোরা গান শুনবি আমার রুমে আয়”। আমাদের রুমের ৪ জন, আর পাশের রুমের ৪ জন মিলে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম – আমাদের কলেজ বাউন্ডারি যেখানে শেষ হয়েছে তার ওপাশেই একটা পুকুর, ময়লা আবর্জনা আর কচুরিপানায় ভরপুর, সেটার সংলগ্ন একটা বস্তি এলাকা, তার-ই কোন একটা বাসা থেকে ভেসে আসছে গানের সুর। সেই সুর শুনে আমরা ৮ জন উদ্বেলিত হয়ে উঠলাম। সায়মার বিছানার উপর বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে জানালায় কান ঠেকিয়ে (এক জানালায় ৮ জনের কান) গান শুনছি…

আহ! কি সুন্দর গান শোনা যাচ্ছে! কেউ কেউ আবার গানের তালে তালে মাথাও ঝাকাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি মাথা ঝাঁকাতে দেখা গেল সায়মাকে। এত দূর থেকে ভেসে আসা গানের কিছুই ঠিকমত শোনা যাচ্ছিলোনা, আমি নিশ্চিত কেউ ভালভাবে শুনতে পায়নি কি হচ্ছে কারণ আমি নিজেই বুঝতে পারছিলাম না কিছু। কিন্তু সবাই যেহেতু শোনার চেষ্টা করছে তাই আমিও বলতে লাগলামঃ “কি সুন্দর গান!! 😛 ” এভাবে ১০/১৫ মিনিট শোনা হল; এবং এত্তক্ষণ পরে গানের একটা লাইন উদ্ধার করা গেল – “কষ্টের নাম যদি ভালবাসা হয়, ভালবাসার নাম শুধু অভিনয়”। এরকম হাস্যকর গান আমি ইহজীবনে শুনিনি কিন্তু কোন বস্তি থেকে ভেসে আসা গানে এর চেয়ে ভাল কি বা আর আশা করা যায়? যাই হোক, আমরা এই একটি লাইন-ই এবার গুনগুনাতে থাকলাম সারাদিন। পুরো টার্মে এই এক গানের একটা কলি শুনতে পেরেছি এটা নিয়েই আমরা অনেক আনন্দিত।

দুই দিন পরে (শুক্রবার) আমরা ডাইনিং হলের সামনে ফল-ইনে দাড়িয়েছি লাঞ্চের জন্য। কলেজে সব কিছু রং করা হচ্ছে, গেস্ট আসবে। ডাইনিং হল রং করা শেষ। হাউজ রং হচ্ছে। এবার আমাদের একজন পাশে পড়ে থাকা একটা ইটের খন্ড তুলে নিয়ে নতুন রং করা ডাইনিং-এর দেয়ালে অনেক বড় বড় করে লিখে দিলঃ
কষ্টের নাম যদি ভালবাসা হয়… ভালবাসার নাম শুধু অভিনয়!!

কলেজ রং করা শেষ, এবার সবকিছু ঠিকমত করা হয়েছে কিনা এটা চেক করে দেখতে এসেছে এ্যডজুটেন্ট স্যার। ডাইনিং এর সামনে এসে তো তার মেজাজ চরম খারাপ — ক্যাডেটরা দেয়ালে লিখতে শুরু করেছে এটা তো খুবই আপত্তিকর, তার উপরে গানের লাইন বেশি সুবিধার না। এবার কলেজে শুরু হয়ে গেল … প্রিফেক্টরা দফায় দফায় এ্যডজুটেন্টের কাছে বকা খাচ্ছে, যেহেতু টুয়েল্ভ এটা লিখেনি তাই আমাদের জে.পি. গুলি ঝাড়ি খাচ্ছে আপাদের কাছে; কিন্তু কোনভাবেই এটার লেখককে খুঁজে বের করা গেল না। তাই স্যার হতাশ হয়ে থেমে গেলেন। আমরা অবশ্য বেশ মজা পেয়েছিলাম, সামান্য একটা গানের ১টা লাইন নিয়ে কলেজ অথরিটির ‘দৈনিক তোলপাড়’ দেখে।

বছর পাঁচেক পর — আমি তখন মেডিকেলে ফোর্থ ইয়ারের ছাত্রী। হঠাৎ খবর পেলাম আমাদের প্রিন্সিপাল খাদেমুল হক স্যার মারা গেছেন। AMEC-এর পক্ষ থেকে স্যারের পরিবারকে শোকসান্তনা দেবার জন্য আপারা আসবেন। জয়েন্ট সেক্রেটারি আপা আমাকে জানালেন আমি যেন মেডিকেল কলেজের সব EX-MGCC দের নিয়ে কলেজে যাই স্যার এর পরিবারের সাথে দেখা করতে। সবার পক্ষে যাওয়া সম্ভব হয়নি, আমরা ৪ জন গিয়েছিলাম কলেজে। প্রিন্সিপালের বাসা থেকে ডাইনিং এ যাচ্ছি আমরা ১২ জন এক্সক্যাডেট, সাথে বর্তমান ক্লাস টুয়েল্ভের প্রিফেক্টরা। হঠাৎ পাশের দেয়ালে তাকিয়ে দেখি, ঠিক যেখানে আমার বন্ধুটি গান লিখেছিল সেখানে অনেক বড় বড় করে লিখে দেওয়া হয়েছেঃ

দেয়ালে লেখা নিষেধ
– মেজর নাজমুল

আপারা খেয়াল করে একে অপরের দিকে তাকিয়ে বলাবলি শুরু করলো “এডজুটেন্টের খেয়ে কাজ নেই, এটা এখানে লিখার কি দরকারটা ছিল?” আমি মনে মনে বললাম “এখন কি আর সেই দিন আছে? দিন বদলাইছে না?” আর ভাবলাম, আমাদের সেই গান শোনার স্মৃতিটা শুধু আমরাই না, কলেজও মনে রেখেছে, আর স্মৃতি হিসেবে ধরে রেখেছে এই নিষেধাজ্ঞা’র লেখাটি দিয়ে!

২,৪০২ বার দেখা হয়েছে

৩০ টি মন্তব্য : “আর কিছু চায় না মনে গান ছাড়া… গান ছাড়া”

  1. কষ্টের নাম যদি ভালবাসা হয়… ভালবাসার নাম শুধু অভিনয়!!

    ==

    দেয়ালে লেখা নিষেধ
    - মেজর নাজমুল

    ????
    মজা না ব্যপারটা !!!

    লেখা পড়ে মজা পেয়েছি... আপুকে ধন্যবাদ।।
    :clap:

    জবাব দিন
    • কষ্টের নাম যদি ভালবাসা হয়… ভালবাসার নাম শুধু অভিনয়!!

      ” ==

      দেয়ালে লেখা নিষেধ
      - মেজর নাজমুল

      ” ????

      মজা না ব্যপারটা !!!
      লেখা পড়ে মজা পেয়েছি… আপুকে ধন্যবাদ।।
      :clap:

      জবাব দিন
  2. সামি হক (৯০-৯৬)

    লেখাটা পড়ে ভালো লাগলো, আমার মনে আছে আমরাও মাঝে মাঝে কান পেতে শুনতাম কলেজের বাইরে থেকে ভেসে আসা মাইকে হিন্দী গান(স্পেশালী পিকনিকের মৌসুমে পদ্মার পাড়ে পিকনিক করতে আসা পিকনিক গ্রুপগুলোর গান) আর গভীর রাতে মাঝে মাঝে ভেসে আসা যাত্রার আওয়াজ।

    জবাব দিন
  3. সায়েদ (১৯৯২-১৯৯৮)
    এবার আমাদের একজন পাশে পড়ে থাকা একটা ইটের খন্ড তুলে নিয়ে নতুন রং করা ডাইনিং-এর দেয়ালে অনেক বড় বড় করে লিখে দিলঃ
    কষ্টের নাম যদি ভালবাসা হয়… ভালবাসার নাম শুধু অভিনয়!!

    শাবাশ :hatsoff: :tuski: :awesome: ।


    Life is Mad.

    জবাব দিন
  4. হাসান (১৯৯৬-২০০২)
    প্রিন্সিপালের বাসা থেকে ডাইনিং এ যাচ্ছি আমরা ১২ জন,

    ডাইনিং এ কেন? এক্সক্যাডেটরা গেলে কি ডাইনিং এ আপ্যায়ন করা হয়? নাকি AMEC-এর জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিলেন বলে?

    জবাব দিন
  5. শার্লী (১৯৯৯-২০০৫)
    আমাদের একজন পাশে পড়ে থাকা একটা ইটের খন্ড তুলে নিয়ে নতুন রং করা ডাইনিং-এর দেয়ালে অনেক বড় বড় করে লিখে দিলঃ
    কষ্টের নাম যদি ভালবাসা হয়… ভালবাসার নাম শুধু অভিনয়!!

    একেই বলে ক্যাডেট :)) :)) ।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।