ক্লাস টুয়েলভ ১৯৮৩

১ জানুয়ারী’ ৮৩।
অবশেষে তুমি এলে। অনেক প্রতীক্ষার পর, কোনো আড়ম্বর বা আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া। তুমি যুগযুগান-রে মহাকালের সূচনা এভাবেই দাও কোনো একটি দিনের মাধ্যমে। তিরাশী, বিরাশিতে তুই পঁচা ছিলি। এ বছর আমার সাথে ভালো আচরণ করিস।

৩ জানুয়ারী’ ৮৩।
”আল্লাহ তা’য়ালা তোমাকে যতটুকু দান করিয়াছেন, ততোটুকুতে শানি- থাকিয়া এবং তাহার শুকরিয়া আদায় করিয়া পরিশ্রম করিতে থাক। অবশ্যই আল্লাহ তা’য়ালা একদিন তোমাকে সম্মানিত আসনের মালিক করিবে॥”

৮ জানুয়ারী’ ৮৩।
রাতে বিয়ানী বাজার কলেজের বার্ষিক নাটক দেখতে গিয়েছিলাম। খালেদ সব ব্যবস’া করে দিল। আব্দুল্লাহ আল মামুনের ’সেনাপতি’। প্রধান আকর্ষণ সিলেট বেতারের শিল্পী রাবেয়া খাতুন দুলু। খুব ভালো লাগল।

১৪ জানুয়ারী’ ৮৩।
আমাদের গ্রামটা এখন বেশ জমজমাট। আমেরিকা থেকে জামান, লন্ডন থেকে ছালিক, হাফিজ এসেছে, সিলেট থেকে পুতুল ভাই, চট্টগ্রাম থেকে আমি। বিকেলে ফুটবল খেলা জমে উঠে।

১৫ জানুয়ারী’ ৮৩।
২ বছর আগে এই দিনে আমাদের  গ্রামের সাথে পুরুষপালের মারামারি হয়েছিল। সে দিন পুরুষ পাল গ্রামের একজন মারা গিয়েছিল। মারামারির জন্য আমাদের গ্রামের মুজন হাজি সাহেব নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আজকের এই দিনে তিনি মারা গেলেন। রাতে মরা বাড়ি গিয়েছিলাম।

১৯ জানুয়ারী’ ৮৩।
’অনেক বৃষ্টি ঝরে, তুমি এলে, যেনো একটুকু রোদ্দোর আমার দ’ুচোখ ভরে, তুমি এলে।’ শীতের রাতে লেপমুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি। হঠাৎ বাবার গলার আওয়াজ। ধড়াম করে দরোজা খুওে দেখি- বাবা। বাবা এসেছেন ১৪ মাস পর। রাতে ঘুম আসলো না। বাবা আসার আনন্দে কিছুক্ষন পর পর ঘুম ভেঙ্গে যায়।
২০ জানুয়ারী’ ৮৩।
সকাল বেলা বিছানাতে। মা একটা সিকো-ফাইভ ঘড়ি দেখিয়ে বলেন আমার পছন্দ কি না। বাবা এনেছেন। খুব সুন্দর  ঘড়ি। দুপুর বেলা বাক্‌্র খোলা হলো। জ্যাকেট, ৩ টা হাফ হাতা গেঞ্জি, প্যান্ট, ২ জোড়া কেডস,কলম। বাবা আমার এস এস সির রেজাল্টে খুব খুশী।

২৩ জানুয়ারী’ ৮৩।
মা আজ না লন্ডন চলে গেলেন। যাবার সময় আমাকে ১০০ টাকা দিয়ে গেলেন। একটা ক্যাসেট রেকর্ডারে সবার কথা রেকর্ড করে নেয়া হলো।
লন্ডন গিয়ে নানীকে শুনাবেন।

২৭ জানুয়ারী’ ৮৩।
বাড়ি ছেড়ে বেরুলাম কলেজের পথে। সাড়ে চার শ’ টাকা নিয়ে এলাম এবার। আসার সময় আমার ৪ বছর বয়সী ছোট ভাই রাসেলের কাছে গেলাম বিদায় নিতে। বিদায় দিল না। মুখ ঘুরিয়ে নিল। আমি যাবার জন্য তৈরী হলাম, আমার ব্যাগ ধরে  টান দেয়। কোনো কথা বলে না। আমি চলে আসার পর সে কি কেঁদেছিল? জানি না। ট্রেনে রিজার্ভেশন ছিল। আরামে এলাম।

২৮ জানুয়ারী’ ৮৩।
চট্টগ্রাম এসে চাকমার সাথে ম্যালোডিতে সিনেমা দেখলাম – ডেনজার ডায়াবলিক। ইমতিয়াজের বাসায় খেলাম। মি. কিবরিয়া আর ইমতিয়াজের মার জন্য ৪ টা মোড়া এনেছিলাম। সিলেটের মোড়ার এখানে খুব কদর। ৬:১৫ মিনিটে কলেজে এলাম। গ্রুপ টেবিলে বসলাম  লো টেবিলে। এখন আমরা ক্লাস টুয়েল্‌। অনেক সিনিয়ার।

২৯ জানুয়ারী’ ৮৩।
হাউজ নোটিশ বোর্ডে এপোয়েন্টমেন্ট হোল্ডারের নাম দেখলাম। আহমেদ হাউজ কালচারাল প্রিকেক্ট। যাক ও খুব মন দিয়ে চেয়েছিল। পেয়েছে। খাজাও চেয়েছিল, পায়নি। হাসান অনেক আশা করেছিল, সেও পেল না।

৩০ জানুয়ারী’ ৮৩।
ক্লাস টুয়েল্‌ভের প্রথম ক্লাস। আজ কয়েকজন নতুন টিচার জয়েন করলেন আমাদের সাথে। ২য় ঘন্টায় বাংলার জনাব আবু নাঈম চৌধুরীর সাথে পরিচয় হলো। আগে তিনি এম সি সিতে ছিলেন। ৩য় ঘন্টায় নতুন টিচার পদার্থ বিজ্ঞানের মিস্টার কাইয়ুম। আগে তিনি পাবনা ক্যাডেটে ছিলেন। ৫ম ঘন্টায় মিস্টার আইনুদ্দিন পাঠান এলেন। তিনি অংক করাবেন। এপোয়েন্টমেন্ট না পেয়ে কেউ অখুশী, কেউ পেয়েও অখুশী। পাঠান পেয়েছে কলেজ গেমস প্রিফেক্ট, সে চেয়েছিল হাউজ প্রিফেক্ট। নজরুল হাউজের হাউজ প্রিফেক্ট হয়েছে নাভিদ। তার ক্ষোভ কেনো তাকে কলেজ প্রিফেক্ট দেয়া হলো না।

৪, ফেব্রুয়ারী ’৮৩।
কলেজ থেকে চট্টগ্রাম শহরে গিয়েছিলাম। হানিফের বাসায় গেলাম। রিগান মার্কেটে গেলাম। অনেক সস-ায় জিন্সের প্যান্ট পাওয়া যায়। কিন’ টাকা নাই। কিনতে পারিনি। মা কে দিয়ে বাবাকে লিখিয়েছিলাম আমার জন্য ক্যামেরা আনতে। বাবা আনলেন না। বাবা জানেন না, একটা ক্যামেরার জন্য আমার কত শখ। আজ জাতীয় ভিত্তিক রচনা প্রতিযোগিতার জন্য রচনা জমা দিলাম । বিষয়: আমার প্রিয় বই। আমি হুমায়ূন আহমেদের ’নন্দিত নরকে’ সম্পর্কে  লিখলাম।

৬ ফেব্রুয়ারী ’৮৩।
আজ আমাদের ক্লাস কক্‌্রবাজার এক্সকার্শানে গেল। বাসের পেছনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে প্যারোডি গাইলাম। আমাদের  থাকার জায়গা হয়েছে কক্সবাজার স্টেডিয়ামের প্লেয়ার্স হোষ্টেলে। আমি, খাজা, শামীম, রায়হান আর হানিফ একটা দুই বেডের রুমে।
বিকেলে সৈকতে গেলাম। আমাদের ফৌজদারহাট বীচের পর এই প্রথম পৃথিবীর দীর্ঘতম সী বিচ দেখলাম। এক জায়গায় দেখি অনেক গুলো লোক গোল হয়ে কি যেন দেখছে। কাছে গিয়ে দেখি এক বিদেশীনি বিকিনি পরা আছেন। মানুষ এই মহিলাকে দেখছ্‌ে । মহিলা খুব বিরক্ত।

৭ ফেব্রুয়ারী’ ৮৩।
বিকেলে কক্সবাজার একাদশ বনাম আমাদের ক্লাস ফুটবল ম্যাচ। আমি রাইট আউট।
২-২ গোলে ড্র। দুপুরে রাডার স্টেশনে গেলাম। উচু পাহাড়ের উপর এই অফিস। উপর থেকে সমুদ্র খুব সুন্দর লাগে। আমরা অনেক ছবি তুললাম।

৮ ফেব্রুয়ারী’ ৮৩।
আজ টেকনাফ। ৫০ টাকা দিয়ে একটা বার্মিজ লুঙ্গি কিনলাম। কলেজে পরবো। স্যারকে বলে আজ কলেজ ক্যামেরা আমার দায়িত্বে নিয়ে নিলাম। আমি আর পাঠান মিলে একটা কালার ফিল্ম কিনেছি। কিন’ ক্যামেরার ঢাকনাটা আমি কোথায় ফেললাম মনে করতে পারিনি।
রাতে ফিরে এলাম কক্সবাজার।

৯ ফেব্রুয়ারী’ ৮৩।
আজ কক্সবাজার থেকে কলেজে ফেরার পালা। মন ভালো নাই। কক্সবাজারে নিজের একটা ক্যামেরা থাকলে কত সুন্দর ছবি তুলতে পারতাম!
রাতে কলেজে ফিরলাম।
১২ ফেব্রুয়ারী ’৮৩
একটা ক্যামেরার জন্য বড় আফসোস হয়। মাকে দিয়ে লিখালাম, আট শ’ টাকার মধ্যে ও ক্যামেরা পাওয়া যায়। বাবা আনলেন  না। কিন’ হাজার টাকা দামের জুতা আনলেন। জুতা বড় না ক্যামেরা বড়? বাবাকে আমি লিখলেই হতো। তখন ঠিকই আনতেন। কক্সবাজার গিয়ে প্রথম দিন কারো ক্যামেরায় ছবিই তুলিনি। পরে অবশ্য নিজের সাথে কমপ্রোমাইজ করেছি। বাবা, তুমি আমাকে ক্যামেরা দিলেনা। আমি কিন’ বাবা হলে আমার ছেলেকে প্রথমেই ক্যামেরা দিব।

১৩ ফেব্রুয়ারী ’৮৩
সকালে ফৌজদারহাট বীচে আর্টিলারী বাহিনীর এন্টি এয়ার ক্রাফট গান এর মহড়া দেখতে গিয়েছিলাম। বেশ উপভোগ্য। অনেক দূরে বেলুন উড়িয়ে একে লক্ষ করে মেশিনগান চালিয়ে একে ছেড়া হলো। ৮টা বেলুন গুলি করে ফাটানো হয়।

২০ ফেব্রুয়ারী ’৮৩।
আজ ৩ বিষয়ে Fortnightly Test  দিলাম। কাল গ্যাপ, পরশু আবার ৩ টে। বাংলায় ৩ টা প্রশ্নই ছিলো সিলেবাসের বাইরে। তাও দিলাম।

২১ ফেব্রুয়ারী ’৮৩।
রাত একটায় হাউজ গার্ডেনের ফুল নিয়ে আমি, শামীম আর জুনিয়ার ফয়েজ শহীদ মিনারে গেলাম। খালি পায়ে শহীদ মিনারের কাছে দাঁড়িয়ে মিনারের উপর ছিটিয়ে দিলাম ফুলের পাপড়ি গুলো। একুশে ফেব্রুয়ারীর দেয়াল পত্রিকায় আমার লেখা একটা ’সংলাপ’ আর একটা কবিতা ছাপা হলো। সারা দিন তাস খেলা, গান শুনা আর টেনিস খেলা নিয়ে ছিলাম। আজ কলেজে প্রভাত ফেরী হয়নি। ঢাকায় খুব আন্দোলন চলছে।

২২ ফেব্রুয়ারী ’৮৩।
Obstacle course competition এ সিনিয়ার গ্রুপ থেকে ৪.২৮ সেকেন্ডে অতিক্রম করে হাউজ এর মধ্যে দ্বিতীয় হলাম।

২৬ ফেব্রুয়ারী ’৮৩।
আজ প্যারেন্টস ডে আমাদের জুনিয়ার মুসতাকের বাবা বিখ্যাত নাট্যকার মমতাজউদ্দিন আহমেদ এসেছিলেন। সবুজ পাঞ্জাবী,সাদা পাজামা, বুক পকেটে বলপেন, কয়েক টুকরা কাগজ, লম্বা লম্বা চুল, চোখে চশমা , গাঢ় শ্যামলা চেহারার এ প্রৌঢ়ের অটোগ্রাফ চাইলাম। লিখলেন –
’বাংলাদেশ আমার মা’ মমতাজউদ্দিন আহমেদ
২৬-০২-৮৩

১ মার্চ ’৮৩।
রেস্ট টাইমে হাউজ রিডিংরুমে বসে বসে তাস খেলছিলাম। আমি, আহমেদ, আলাউদ্দিন আর পাঠান। সবার লুঙ্গি পরা। এমন সময় ডিউটি মাস্টার মিস্টার বজলুর রশীদ এসে হাজির। উনি এম সি সি থেকে এসেছেন। নতুন টিচার। খুব কড়া। হাতে নাতে ধরে ফেলার পর কার্ড নিয়ে চলে গেলেন। নাম জিজ্ঞাসা করলেন, বললাম। হাউজ মাস্টারের নাম জিজ্ঞাসা করলেন , বললাম।
রাতে সেকেন্ড প্রেপে হাউজ মাস্টার মি. বাচ্চি খান একে একে চারজনকে ডাকলেন। বললেন- লিখিত এক্সপ্লেনেশন দিতে হবে। আর আমাকে আলাদা করে লিখতে হবে, কেন কার্ড নিয়ে কলেজে এলাম।
রাতে উপুড় হযে ঘুমালাম । বুঝতে পারছিনা, কি হবে। কলেজ থেকে আউট হবার সমূহ সম্ভাবনা।

২ মার্চ ’ ৮৩
সেকেন্ড পিরিয়ডে এক্মপ্লেনেশন জমা দিলাম মি. বাচ্চি খানের কাছে। এ ধরনের অপরাধের শাসি- কলেজ থেকে আউট হওয়া। জানিনা ভাগ্যে কি আছে।
এ মুহূর্তে কলেজকে দুর্বিসহ মনে হচ্ছে। আচ্ছা, আমাদের স্যাররা কি কখনো আমাদের বয়সে ছিল না? আগেওতো দেখেছি ইলেভেন ক্লাসের  ভাইরা কত কি করেছে। কৈ , তাদেরতো কোনো এ্যাকশন হয়নি। আমাদের কেন হবে?

৩ মার্চ ’৮৩
আজ আবার ক্রস কান্ট্রি রেস। এখন আমরা সিনিয়ার গ্রুপ।
পেটে ব্যাথা নিয়ে দৌড়ালাম। পথে কয়েকজনকে সাহায্যও করলাম। এবার নাইনথ হয়েছি।

৪ মার্চ ’৮৩
আজ ফিউচার ওযার্ল্ড নামক একটা সিনেমা দেখালো। খুব সুন্দর। কলেজে অনেক টাকা দিয়ে প্রজেক্টর কিনেছে। কিন’ সিনেমা দেখায় না। খুব খারাপ লাগে সিনেমা না দেখালে।

৫ মার্চ ’৮৩
আজ প্রথমবারের মতো কলেজ স্টেজে উঠলাম। Inter House English set speech. বিষয় ছিলো-The role of mass media in building a nation.. আমার বক্তব্য প্রশংসিত হলো।কিন’ ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ডে আমি নাই।
রাতে হাউজ মাস্টার্স ইনসপেকশনে হাউজ টিউটর মিস্টার কিবরিয়ার হাতে গিয়াস ধরা পড়লো। ওর কাবার্ডে সিগারেটের প্যাকেট পাওয়া গেছে।

৬মার্চ ’৮৩।
রাতে প্রেপে কামরুলের সাথে অনেক গল্প করলাম। সে তার রীমার গল্প শোনালো।

৭ মার্চ ’৮৩।
নাভিদ আজ একটা খাটি কথা শোনালো। বললো- ক্যাডেট কলেজে কোনো বন্ধু তোর ভালো কিছু চাইবে না। তোর সুখের সংবাদে সুখী হবে না, কেউ তোকে উপরে তুলে দেবে না। সবাই চাইবে তোকে নীচে নামিয়ে রাখতে। সুতরং নিজেই নিজেকে বড় ভাববি, নিজেকেই বড় করবি।

আজ শবনমের (আমার সবচেয়ে ছোট বোন) জন্মদিন। ৮ বছর পার করলো আজ। একটা কার্ড পাঠালাম তাকে।

৮ মার্চ ’৮৩।
আজ প্রেপে বসে আমাদের ক্লাসের ছেলেদের মধ্যে একটা পরিসংখ্যান দাঁড় করালাম। তাতে দেখি ৫৮% ছেলে শুধু ধূমপান করে, ৫০% তাস পেটায়, ২২% ছেলে ধূমপানও করে তাসও পেটায়্‌ তবে আমাদের হাউজের ঐ ঘটনার পরে কলেজে এখন কেউ তাস খেলে না।
জাবেরকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম । ওর খুব জ্বর। অথচ পরশু ওর এস এস সি পরীক্ষা।

১০ মার্চ ’৮৩।
জাবের ১০৪ ডিগ্রী জ্বর নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। ক্লাস এইটের একটা ছেলে ওর হয়ে লিখে দিয়েছে। বিকেলে দেখতে গিয়েছিলাম। ওর বাবাও এসেছিলেন। ওর বাবা সিলেট মেডিকেলের খুব নাম করা গাইনোকলজিস্ট। নাম- ডাঃ সৈয়দ ইরশাদ আলী।

১৭ মার্চ ’৮৩।
আজ কামরুলের ব্যবহারে আঘাত পেয়েছি। সাথে সাথে সে আমাকে সরি বলেছে। এ সুযোগে তাকে অনেক কথা শুনিয়ে দিয়েছি। মনে হয় একশন হয়েছে।
২৪ মার্চ  ৮৩

আজ আমাদের ক্লাসের জন্য একটা বড় অঘটন  ঘটে গেল। কেমিস্ট্র পরীক্ষা চলছে। এমন সময় মিস্টার মাইনদ্দিন পাঠান এসে ’সা’র খাতা টেনে ধরলেন। ভেতর থেকে বেরুলো কাগজের উভয় পৃষ্ঠায় লেখা নোট। নকল। আর যায় কোথায়? সাথে সাথে তাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। ’সা’ খুব অনুনয় করছিল। পায়ে ধরেছিল। আমরা সবাই বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। কাজ হলো না।
বিকেলে শুনি ’সা’ কে ইভনিং ড্রেস পরিয়ে দুইজন হাবিলদারকে সঙ্গে করে বাসায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ’সা’ আজ আউট হয়ে গেল।

২৫ মার্চ’ ৮৩
আজ ’বিন্দুর  ছেলে’ দেখানো হলো। সিনেমা শেষে মিস্টার হুমায়ূন কবীর কাঁদতে কাঁদতে অডিটোরিয়াম থেকে বেরুলেন।

Nepolean said, “last act makes the people to forget the past”.

২৬ মার্চ’ ৮৩
আজ পেরেন্টস ডে। রুমে বসে থাকি। হাউজ বেয়ারা আব্দুল হক ভাই স্লিপ নিয়ে রুমে আসেন। এক একজন বেরিয়ে যায়। আমার কেউ আসার নেই। তারপর ও স্লিপ হাতে হাউজ বেয়ারাকে দেখলে মনে হয়- এই বুঝি আমার কেউ এলো। আমার আবার কে আসবে?
তবে আজ আমি ভালো জামা কাপড় পরে বেরিয়ে গেলাম প্যারেন্টস ডে দেখতে । কার প্যারেন্টস  এর কেমন স্ট্যাটাস, মোটামুটি বোঝা যায়। কেবল মাত্র এই দিনই বুঝতে পারি- কোন ক্যাডেট কার চেয়ে আলাদা। অন্যদিনে বোঝা যায় না। অবশ্য আমি নিজেকে সবচেয়ে নিম্ন পর্যায়ের ভাবতে পারি।

১ এপ্রিল ’৮৩।
আজ সিলেট এসেছি। কাল বাড়ি যাবো। তুহীন ওর এক বন্ধু ফেরদৌস ভাইর বাসায় নিয়ে গেলো। ভি সি আর – এ একটা হিন্দী সিনেমা দেখলাম। ’কাভিকাভি’। এটা আমার জীবনে প্রথম ভিসিআর ও হিন্দি সিনেমা দেখা।

২ এপ্রিল ’৮৩।
রেডিওতে শুনলাম হৃদরোগে আক্রান- হয়ে মস্কোতে মারা গেছেন হাসান হাফিজুর রহমান।

১৮ এপ্রিল ’৮৩।
বাড়িতে পুকুর পাড়ে গাছের তলায় কাপড়ের খাটিয়ার উপর বসে সুকানে-র কবিতা পড়ছি। এমন সময় বাবা ডাকলেন। বাবা ডাকলে খুব ভয় লাগে। তাও আসেত্ম আসেত্ম কাছে গেলাম। কাছে যেতেই বললেন  –  তুমি যাবে কবে? বলি –  ২১ তারিখ। –  ২১ তারিখ? বাবার মনে হলো ২১ তারিখ খুব কাছে চলে এসেছে। তারপর কি যেন ভাবলেন। তারপর আমার হাতে ৫০ টাকা দিয়ে বললেন, ’যাও, বাজার থেকে তোমার যা পছন্দ হয়,  কিনে আনো।’ আমি বাজার থেকে এক ব্যাগ ভালোবাসা নিয়ে রাত সাড়ে আটটায় বাড়ি এলাম।

২১ এপ্রিল ’৮৩।
সাড়ে চারশ টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে কলেজের পথে রওয়ানা দিলাম। রাতে ট্রেনে একটা মর্মানি-ক ঘটনা ঘটলো। সেকেন্ড ক্লাস কম্পার্টমেন্টে উঠলাম  – কয়েকজন ক্যাপ্টেনের সঙ্গে। ২ জন সিভিলিয়ান বাইরে থেকে এ কম্পার্টমেন্টে উঠলো। ক্যাপ্টেনরা তাদেরকে উঠতে নিষেধ করেছিল। তারা বলে  –  এটাতো রিজার্ভ কামরা না, আমরা কেনো উঠবো না? ট্রেন ছাড়ার পর দুইজন ক্যাপ্টেন মিলে ঐ দুই সিভিলিয়ানকে প্রথমে চড় মারলো। পরে ঘুষিও। লোকগুলো ভয় পেয়ে গেছে। কোনো প্রতিবাদ করেনি। ট্রেন প্রথম যে স্টেশনে থামলো, সেখানেই লোকগুলো নেমে গেল। আমি এই প্রথম এভাবে কোনো মানুষকে মার খেতে দেখলাম। ক্যাপ্টেনদের একজনের নাম কামাল।

২২ এপ্রিল’ ৮৩
চট্টগ্রাম এসে সিনেমা দেখলাম ‘Horrors in the spider island’। তারপর মেহেদীবাগ গেলাম ইশতিয়াক ভাইদের বাসায়। উনার আম্মা আমাকে খুব আদর  করলেন।
কলেজে এলাম রাত ৬  টায়। সন্ধ্যায় বাংলা সিনেমা দেখলাম ’মহারাজা’। বাজে সিনেমা।

২৯ এপ্রিল’ ৮৩
৩ দিন ধরে হাসপাতাল। অনেক জ্বর। বোধ হয় ম্যালেরিয়া। আমাকে কেবিনে রাখা হয়েছে। খুব একা লাগে। ডাক্তারটা খুব ভালো। বাসা থেকে ক্যাসেট এনে দেন। গান শুনি। কাল টিভিতে রঙিন নাটক দেখলাম – ‘শাহজাদীর কালো নেকাব’।

৭ মে’ ৮৩
আজ চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে খেলা দেখার জন্য আমাদের ক্লাসকে নিয়ে যাওয়া হয়। আবাহনী বনাম মহামেডান। সালাহউদ্দিন, সালাম, টুটুল, বাদল, চুন্নু, এদের মতো তারকা খেলোয়ারদের প্রথমবারের মতো সরাসরি দেখলাম। আমি মোহামেডানের সাপোর্টার। কিন’ আবাহনীর খেলা আমার ভালো লাগলো। কাল থেকে ভড়ৎঃহরমযঃষু ঃবংঃ শুরু হবে।

৯ মে’ ৮৩
আজ পঁচিশে বৈশাখ। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন। রবীন্দ্র জয়নি-তে আমার উপর দায়িত্ব ছিলো  –  রবীন্দ্রনাথের শৈশব ও কৈশোর নিয়ে বতৃতা দেয়া। আমি স্ক্রীপ্ট ছাড়াই ১০ মিনিট বললাম।
১৩ মে’ ৮৩
রাতে উর্দু সিনেমা দেখানো হলো। ’সমুন্দর’। সারাদিন শাহেদের সাথে লন টেনিস খেললাম।

Potato does not know how to talk. He is a selfish guy.

১৪ মে ’৮৩।
’’ একটা মিথ্যাবাদী। কাল তাকে ক্যারামে নীল গেমে হারালাম। আজ অস্বীকার করে। ’খ’ একটা বুদ্ধু। মাথায় কিছু নাই। নিজেকে অনেক বড় কিছু মনে করে। ইডিয়ট।

১৫ মে ’৮৩।
সকালে প্যারেড করতে ইচ্ছে হচ্ছিলো না। তাও করলাম। প্রিন্সিপালস ডায়াসের কাছে যেতেই এডজুটেন্ট মেজর মাশকুর চিৎকার করে উঠেন –  শাকুর , March properly.  সমস- কলেজের ক্যাডেটদের সামনে এবং infront of all Lecturing staff. আমার খুব লজ্জা লেগেছিল।
আজ একটা গল্প লিখলাম।

১৬ মে ’৮৩।
গত কাল হানিফ বলে – আমি নাকি লুকিয়ে লুকিয়ে পড়ি। সবার সামনে দেখাই, আমি সবচেয়ে কম পড়ি। ডুবে ডুবে জল খাই। কথাটা ঠিক নয়।

১৮ মে ’৮৩।
কলেজের ২৫ বছর পূর্তিতে সিলভার জুবলী অনুষ্ঠান হবে। আমরা হচ্ছি ২৫ তম ব্যাচ। আমাদের সৌভাগ্য, কলেজের ২৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান আমরা দেখে যেতে পারবো।
ব্রেকফাস্টের আগে ১ ঘন্টা , ব্রেকফাস্টের পর আরো দেড় ঘন্টা প্যারেড প্র্যাকটিস হলো। সি এম এল এ হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ আসবেন অনুষ্ঠানে। কলেজকে  রঙিন করা হচ্ছে। সুপারী ও নারকেল গাছগুলোর  নীচে সাদা সাদা রং দেয়া হচ্ছে।

২০ মে’ ৮৩।
আহমেদের সাথে আমি কথা বলি না। আমার বিছানা থেকে আড়াআড়ি তার বিছানা। শুতে যাবার আগে, দেখি আমার দৃষ্টি আকর্ষন করে একটা কৌতুকের ভঙ্গি করলো। আমার অবশ্য হাসি এসেছিল, কিন’ হাসিনি। কারণ তাতে সে মনে করে ফেলতে পারে,  আমি ভাব জমাতে চাইছি। ছেলেটা সবাইকে অনন্দ দিতে চায়। মনটাও ভালো। কিন’ মাঝে মাঝে কেমন যেন করে। সহ্য হয় না।

২৫ মে’ ৮৩।
টুয়েলভের ভাইরা আজ চলে গেলেন। টুয়েন্টি ফোর্থ ব্যাচের বিদায়। আজ থেকে আমরা কলেজের সিনিয়র মোস্ট ব্যাচ।
কাল থেকে রজত জয়ন-ী উৎসব। ২ দিন চলবে। আজ বিকেল থেকে Ex-Faujian দের আগমন শুরু হয়ে গেলো।
রাত  Jipsy Girl নামক একটা সিনেমা দেখানোর কথা ছিলো। কিন’ দেখায়নি।

১৮ মে’ ৮৩
আজ শুরু হয়েছে সিলভার জুবিলি অনুষ্ঠান। সকালে প্যারেডে স্যাল্যুট নিলেন
CMLAএরশাদ। ’আইজ রাইট’ করার সময় রওশন এরশাদকে দেখলাম। ফর্সা চেহারা, চোখে সান গ্লাস, বাদামী চুল। বেশ সুন্দরী।
দুপুরে অডিটোরিয়ামে সেমিনার  বসলো । বক্তৃতা করলেন আমাদের প্রিন্সিপাল, ওফা চেয়ারম্যান হারুন ভাই, গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল সাদেকুর  রহমান এবং সি এম এল এ এরশাদ। টি এর পর পুরো কলেজ এক সাথে এরশাদের সাথে ছবি তুললাম। ১২ টায় এরশাদ বিদায় নিলেন। রাতে কালচারাল ফাংশন ভালো হয়নি। অবশ্য দিলশাদের কৌতুকাভিনয় ভালো লেগেছে।

২৭ মে’৮৩
ব্রেকফাস্টের পর সানডে ড্রেস বদল করে খাকী পোষাক পরতে বলা হলো। কারণ ওল্ড ফৌজিয়ান এবং তাদের স্ত্রীরা প্যারেড করবেন। আমরা বেঞ্চে বসে দেখবো। প্যারেড শেষে এফ সি সি ও  ওএফএ ফুটবল ম্যাচ ১-১ গোলে ড্র হয়।’মিলক’ এর পর অডিটেরিয়ামে গেলাম ওল্ড ফৌজিয়ানদের স্মৃতি চারণ শুনতে। খুব মজা লাগলো। হায়াত হোসেন ভাই আামাদের খুব হাসিয়েছেন।
বেলা দু’টায় ওল্ড ফৌজিয়ানরা চলে গেলেন। সিলভার জুবিলি অনুষ্ঠান ও শেষ হয়ে গেলো।

২৯ মে’৮৩
কয়েকটি প্রতিজ্ঞা করলাম।
১.    T F কে ডাকবো না।
২.    Geography কে এড়িয়ে চলবো। ও আমার ক্ষতি করছে।
৩.    ২৬ কে ও চেষ্টা করবো দূরে রাখতে । ও ভালো ছাত্র ভালো থাক। রুম চেঞ্জের সময় আমার সাথে এলো না।  অন্য রুম নিল। আমি কি তাকে বিরক্ত করি?
৪.    উপরে থাকতে পারতাম। রাজনীতির শিকার হয়ে নীচে চলে এলাম। ভালোই হলো অন-তঃ বি এম এর সাথে থাকা হয়নি। আমি উপরে যাবো না।
৫.    ৩৬ পি দুঃখ পেয়েছে। চেষ্টা করবো, ওকে আগের  জায়গায় ফিরিয়ে নিতে।
৬.    পড়াশুনায় সিরিয়াস হয়ে যাবো।
৭.    নামাজ পড়বো। জানি, নামাজ ছাড়া মুক্তি নাই।

৬ জুন’ ৮৩।
অবশেষে পরীক্ষা শেষ হলো। কিন’ হলে কি হবে, পরীক্ষাতে যে লাড্ডা মারিয়াছি তাহার হিসাব বাপজানের কাছে যাইয়া কি করিয়া দিব ভাবিয়া পাইতেছি না। পরীক্ষার আগের রাত্রি ছাড়া পড়িতে মন চাহে না। সমস- ছুটির দিন টেনিস খেলায় মাতিয়া থাকি। মাথার উপর গ্রীষ্মের প্রখর রৌদ্রের আবেস্টনীর উপসি’তি ও আমায় কিছুতেই খেলা হইতে বঞ্চিত করিতে পারে না। রাত্রি বেলা নৈশভোজ শেষে জ্ঞান হয়, সারাদিন কিছুই পড়ি নাই । তখন রাত্রি বেলা পড়িতে বসি। আল্লাহকে অসংখ্য ধন্যবাদ, তিনি, আমাকে এমন শক্তি দিয়াছেন যে, খুব কম সময়েই আমি যে কোনো কঠিন বিষয়ও আয়ত্ব করিতে পারি। অন্য ছেলেরা ভাবে আমি ভন্ডামী করি।

১২ জুন’৮৩।
আজ একটা দুঃসাহসিক কাজ করে ফেললাম। বাড়িতে বসে বসে মাত্র ২/৩ ঘন্টার মধ্যে একটা নাটক লিখে ফেললাম । নাম ঠিক করিনি। হয়তো ’প্রায়শ্চিত্ব’ অথবা ’ফিফটি ফিফটি’ দেবো। রিডার ডাইজেস্টে প্রকাশিত একটা গল্প ‘হাফ অব ইউ, হাফ অব মি’ পড়ার পর এই নাটকটির কথা আমার মাথায় আসে। খালেদকে পড়তে দিবো।
আজ মাথিউরা বাজার মাঠে একটি ফুটবল ম্যাচ খেললাম । বুট দিয়ে ফুটবল খেলা এটাই আমার  প্রথম।

১৫ জুন’৮৩
ওহে শাকুর, তোমার জীবনটা কি এভাবেই যাবে? দিনের বেলা রোজা রেখে রাত্রে খাবারে খাবারে মুখরিত তোমার সাজানো কামরায়, বেশ তো আরামে আয়েশে  দিন কাটাচ্ছো! ওহে পরীক্ষায় যে গোল্লা মেরে এসেছো, সেটা কি মনে আছে? তোমার কি আদৌ পড়াশুনার ইচ্ছা নাই? এইচ, এস, সি কি তোমার দিতে হবে না? বলি ওসব ছেড়ে পড়াশুনায় মন দাও। গান, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ওসব তোমার কোনো কাজেই আসবে না। আবার নাটক লেখো? ডাক্তার হবার ইচ্ছা, নাটক লিখে কি হবে? রোজা রাখছো, ভালো কথা, নামাজ ও পড়িও।
ইতি   –
শাকুরের অবাধ্য কলম

১৭ জুন’৮৩
ঈদ সংখ্যা গুলো থেকে যে সকল উপন্যাস পড়ে শেষ করলাম ঃ

১.    আমার সময়  –  রাহাত খান
২.    মিলির চোখে জল  –  ববিতা
৩.    এক প্রকার নিরবতা  –  সৈয়দ হক
৪.    ফিরে যাওয়া  –  সেলিনা হোসেন
৫.    নিয়ত মন-াজ  –  শামসুর রহমান
৬.    মহাপুরুষ  –  রাহাত খান
৭.    দেবদাস ৮৩ –  ইমদাদুল হক মিলন
৮.    বিরহকাল  –  আফজাল হোসেন

২২ জুন’ ৮৩।
বিকেলে নৌকা নিয়ে বেরিয়েছিলাম হাওয়া খেতে। সাথে রেডিও। বর্ষার পানিতে থৈ থৈ করছে চারদিক। তবুও চমৎকার অনুভূুতি। রেডিওতে ডড়ৎষফ World cup cricket এর  ommentatry+গান+ হাওয়া+রোদহীন মেঘলা আকাশ+প্রকৃতির অফুরন- শোভায় কত যে আরাম! জীবনটা যদি এমনই হতো!

২৫ জুন’৮৩।
রাত একটায় খেলা শেষ হলো। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৪০ রানে অল আউট। ইন্ডিয়া চ্যাম্পিয়ান। বিশ্বকাপ চলে এলো ভারতের ঘরে।

Congratulations Kapil Dev, Congratulations Mahinder Amarnath.
৮ জুলাই’৮৩।
বাড়িতে আজ একটা বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারতো। পুকুর পাড়ে আমি বসে ’শ্রীকান-’ পড়ছি। এমন সময় ঝর্না (চাচাতো বোন) চিৎকার করে উঠেছে। তাকিয়ে দেখি – পুকুরের অপরপাড়ে একটা ছোট্ট নৌকা ঘুরছে। নৌকায় কেউ নেই। মুহুর্তের মধ্যে দেখি শবনম (৮) এক হাতে নৌকা ধরে আছে, অপর হাতে রাসেল(৪)। শবনম আর রাসেল দুজনেই পুকুরের পানিতে। শবনমের হাত নৌকা থেকে সরে গেলে দু’জনেই ডুবে যাবে। শবনমের খুব বুদ্ধি ও সাহস । আমি অন্য নৌকা নিয়ে দ্রুত ওখানে গিয়ে তাদের টেনে উঠালাম। কিন’ আমার পৌছাতে দেরী হলে, কিংবা শবনম এই বিপদে সাহস হারিয়ে ফেললে আজ খুব বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো।

১৮ জুলাই’৮৩।
চট্টগ্রাম শহরে রেড সান’ সিনেমা দেখে কলেজে এলাম সন্ধ্যায়। এ আমি আর কয়েক ঘন্টা আগের আমির মধ্যে অনেক তফাৎ। এখানে আমাকে প্রায়ই কৃত্রিমতার খোলস পরতে হয়। যা কিছু ভালো লাগে না, লাগাতে হয়। অনেক কিছুর সুযোগ আছে, ইচ্ছা করে না। অনেক কিছুর ইচ্ছা হয়, সুযোগ মিলে না।

২৩ জুলাই’৮৩।
রাত ১০ টার পর প্রসেনজিতের একটা ভেজা টাওয়াল রুমে রাখা নিয়ে প্রথমে রায়হানের সাথে কথা কাটাকাটি হয়। পরে শামীমের সাথে ও তার ঝগড়া হয়। তিন বছর আগের কথা উঠেছে। ওদের মধ্যে মনোমালিন্য চলছে। ’র’ আজ রিক্রেশন রুমের সামনের প্যাসেজে রেলিঙ দিয়ে প্রস্‌্রাব করেছে। রাত তখন ১২:১৬ মি। আশরাফ আর রায়হান  গল্প করে রাত কাটাচ্ছে। এখন ৩:৩০ বাজে। কাল প্যারেড আছে, খেয়াল নেই।

২৫ জুলাই’৮৩
খুব বাজে সময় যাচ্ছে। নিজেকে কনট্রল করা উচিৎ। এখন থেকে নিম্ন  লিখিত রুটিন মেনে চলবা।
Rest time :  প্রথম ১৫ মিনিট রেস্ট, পরবর্তী ৪৫ মিনিট পড়াশুনা। practical খাতায় লেখাই প্রাধাণ্য পাবে। তারপর একটা গল্পের বই নিয়ে শুয়ে পড়ব। যদি ঘুম আসে ঘুমাবো, না হলে বই পড়বো।

Afternoon prep:  অংক করবো।
Evening   prep:  নোট। প্রথমে বাংলা ধববো, পরে ইংরেজী।

১ আগস্ট ’৮৩।
আজ কলেজের সবার মুখে হাসি ফুটলো। ৮ মাস বন্ধ থাকার পর এখন থেকে সপ্তাহে ৭ দিন টিভি দেখার পারমিশন পাওয়া গেছে। তবে উইক ডেজে রাতে আধা ঘন্টা। উইক এন্ডে ১০ টা পর্যন-।

৪ আগস্ট ’৮৩।
আজ আমাদের রঙিন উইক এন্ড। ৮ মাস পর আজ অডিটরিয়ামে টিভি দেখানো শুরু হলো। অডিটরিয়ামে রঙিন টিভি। শোনা যাচ্ছে সবগুলো হাউজে নাকি ব্লাক এন্ড হোয়াইট টিভি গুলো দেয়া হবে।

৯ আগস্ট ’৮৩।
ইদানিং সিরিয়াস হয়ে গেছি। রাত ১২ টা ১ টা পর্যন- পড়ি। ইংরেজী নোট করছি, অংকে ক্লাসের সাথেই আছি। বেশী এগোই নি। আমি কোনো নির্দিষ্ট বিষয় কে প্রাধান্য দিচ্ছি না । তবে আমি জানি, ফলাফল ভালো করতে হলে অংকে পরো নম্বর পাওয়া দরকার। বাবার চিঠি পেলাম। চিঠি অনুযায়ী গত ৪ তারিখে হংকং পৌছার কথা। বাবা এখন কি হংকং?
কলমী বন্ধু বানাতে ইচ্ছা করছে। আজ বিচিত্রার ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপনে আমি, শামীম, প্রসেনজিত আর রায়হান একসাথে একটা বিজ্ঞাপন পাঠালাম। খরচ পড়লো সাত টাকা। ওরা তিন জন দু’ টাকা করে দিল। আমি এক টাকা।

১১ আগস্ট ’৮৩।
আজ বৃহস্পতিবার। রঙিন উইকএন্ড। বিকেলে ভালো করে খেললাম। পরে
Swimming poolএ সাতরালাম। ক্লীন সেভ করলাম। রাতে Special dinner. Best evening dress  টা আমরা Week end পরি। ছানু একটা সেপ্র পাঠিয়েছিল –  ওয়ান ম্যান শো। খুব কড়া গন্ধ। ওটা মেখে টি ভি দেখতে যাই। আজ টিভিতে সিনেমা দেখলাম –  সুখের উপমা। আফজালের অভিনয় ভালো লাগলো। আমার হাতে এখন ইবসেনের ’ডলস হাউজ’, শংকরের ’সম্রাট ও সুন্দরী’, ঈদ সংখ্যা বিচিত্রা, রোববার। কোনটা ছেড়ে কোনটা পড়ি।’মুক্তাঙ্গন’ এর জন্য একটা কবিতা লিখলাম। ছেলেরা বলে দারুন হয়েছে।

১২ আগস্ট ’৮৩।
আজ  আমার জীবনের একটা মর্মানি-ক ঘটনা ঘটে যেতে পারতো। বিকেলে সুইমিং পুলে সুইমিং করছিলাম। সখ হলো ৮ ফুট উপরের মিডল টাওয়ার থেকে একটা ডাইভ দেবো। তার আগে ও ২ বার জাম্প দিয়েছি। এবার ডাইভ দেবো। আমি ডাইভ দেয়ার জন্য যেই না পা টা সরিয়েছি, এমন সময় সিদ্ধান- নিলাম না, ডাইভ নয়; জাম্পই দেবো । কিন’ ততোক্ষনে আমি বাতাসে ভাসছি। মাধ্যাকর্ষনের টানে আমার শরীর নীচের দিকে নামছে। আমি বুঝতে পারছি মুহুর্তের মধ্যে কিছু একটা হতে যাচ্ছে। আমি চোখ বন্ধ করে দিলাম। এবং লক্ষ করলাম, সুইমিং পুলের কিনারা ঘেসে আমি টুপ করে পানিতে পড়ে গিয়েছি। ততোক্ষনে আমাকে উদ্ধারের জন্য ৪/৫ জন এগিয়ে এলো। ওদের আদর আপ্যায়ন দেখে মনে হলো. আমি হয়তো খুব ব্যথা পেয়েছি। আমিও তাদেও নিরাশ করলাম না। দেখালাম যে অনেক ব্যাথা পেয়েছি। কারন আমার বা পায়ের বুড়ো আঙ্গুল সুইমিং পুলের কোনায় লেগেছিল  এবং সেখান থেকে রক্তও বেরুচ্ছিল। কিন’ কয়েক ইঞ্চি আগে যদি পড়ে যেতাম, তবে মারাত্মক কিছু হতে পারতো।আল্লাহ বাঁচিয়েছেন।

১৩ আগস্ট’ ৮৩।
কদু আজ গায়ে পড়ে আমার সাথে ঝগড়া করেছে। তাকে আমি দেখে নেবো।

১৪ আগস্ট’ ৮৩।
এম জি আমার সাথে ব্ল্যাক মেইলিং করলো। সে বলে আমি নাকি সারা রাত পড়ি আর দিনে সবাইকে ডিস্টার্ব করি।

১৬ আগস্ট’ ৮৩।
আজ ভাবি পড়াশোনা করে শুধু শুধু সময় নস্ট করছি। আমি যদি ডাক্তারী পড়ি, তবে এই statics, dynamics, calculas, physics  –  এসব আমার কি কাজে আসবে? বিএম এ বা মেরিন এ গেলেও তো এসব বিদ্যা আমার কোথাও লাগবে না। ফলাফল দিয়ে কি হয়? তবে হ্যা, এডমিশন টেস্ট এ চান্স পাওয়ার জন্য আমার এসব বিষয় নাকি দরকার। মার্ক নির্ভর করে ঐ পরীক্ষায় ঠিক ঐ অংকটি আমি জানি কি না তার উপর। হয়তো পুুরো বই আমার জানা, একটা অংক ছাড়া। ঐ অংকটা পরীক্ষায় এলো। আমি পারলাম না। তার মানে তো এই যে আমি ঐ বিষয়টি জানি না। এসব আমার ভালো লাগে না। শুধু সাহিত্য পড়া যেতো!

১৯ আগস্ট’ ৮৩।
চমৎকার একটা ছবি দেখানো হলো। ‘আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু বর্ন’। সারাটাদিন টেনিস খেলে, সুইমিং করে কাটিয়ে দিলাম।

২০ আগস্ট’ ৮৩।
রাতে শামীমের সাথে এক সন্ধি চুক্তিতে এলাম। আমরা দুইজন একসাথে পড়াশুনা করতে বদ্ধ পরিকর হব। একজন না পড়লে আরেকজন তাকে পড়তে বাধ্য করবে। রাতে ‘এখনই’ নামক একটা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দেখলাম। ভালো লাগলো। টি এফ এর সাথে অনেকক্ষন কথা হলো।

২২ আগস্ট’ ৮৩।
Nowshad is now under my observation  আমি তাকে এক সপ্তাহ দেখবো। এর মধ্যে ওর সম্পর্কে আমার যা ধারনা হলো, তা হলো: শান- স্বভাব। কথা কম বলে, কিন’ যা বলে খাটি কথা। তার ভেতর একটা প্রতিবাদী সত্তা আছে। সে কাউকে তেমন পাত্তা দেয় না। আজ বললাম চল ফিসিকস গ্যালারীতে প্রপ করি। রাজী হয়নি।
আজ মাসিক ’নিপুন’ এ আমার লেখা দুটো চিঠি ছাপা হলো্‌ তার একটির শিরোনাম  ’ দেবদাস ৮৩ ও মিলন’ এবং অপরটি ’আফজালকে অভিনন্দন’।

২৩ আগস্ট’ ৮৩।
ইউসুফ খুব সরল ছেলে। গতকাল আমার সাথে গোলমাল করেছিল। আজ থ্রেট করলাম। দেখি মাফ চায়। নওশাদের ব্যাপারে, আজকের অবসার্ভেশন তার সৎ সাহসের অভাব। স্যারকে সামনে দেখে দেখি, সে রাব্বির পেছনে দাঁড়ানো। ওর সাহস কম বলে রাব্বীর পাশে বা সামনে দাঁড়ায়নি।

২৪ আগস্ট’ ৮৩।
১ম ও ৩য় পিরিয়ডে ঘুমালাম, রেস্ট আর ফ্রি টাইমে ক্যারাম খেললাম। বিকেলে গেমস আর ইভিনিং প্রিপারেশনে মহিরুলের সাথে আড্ডা। আজ পড়া হয়নি কিছুই। নওশাদ সব সময়ই সিরিয়াস। বেশী রাত পড়ে না। কিন’ নিয়মিত। ঠান্ডা মাথায় কথা বলে।

২৫ আগস্ট’ ৮৩।
নওশাদের সাথে আজ অনেক গল্প হলো। সে একটা  জুনিয়ার ছেলেকে খুব পছন্দ করে। ওর কন্ঠের গান শুনতে তার সবচেয়ে ভালো সময় কাটে। নওশাদ বলে  –  জীবনে সে অনেক দুঃখ পেয়েছে। এখন আর কোনো দুঃখ গায়ে লাগে না।  স্যাড প্রুফ হয়ে গেছে । বললো  –  আমার আর আমিনুলের সাথে দীর্ঘদিন কথা না বলে থাকার সময়টা তার খুব দুঃখের ছিল। এজন্য তার অনেক অনুশোচনা হয়।
নিজের প্রতি সে খুব সচেতন। বেশ আত্মসম্মানী। কেউ তাকে চালিত করুক, এমনটা সে চায়  না।
ভালো একটা নাটক দেখলাম টিভিতে। ’আমি গাধা বলছি’।

২৬ আগস্ট’ ৮৩।
শুক্রবার। হলিডে। কাল রাত সাড়ে ৪টা পর্যন- জেগেছিলাম। ঘুমালাম সকাল ১০টা পর্যন-। ব্রেকফাস্টে যাইনি। লুৎফুল আর চাকমা লুচি নিয়ে এসেছিল।
শামীম পরচর্চায় খুব আনন্দ পায়।

৩০ আগস্ট’ ৮৩।
ইন্টার হাউজ ইনডোর গেমসে আমি ক্যারাম খেললাম নজরুল হাউজের সাথে। প্রথম গেম নীলে হারালাম। পরের গেম আমার ২৮, জসিমের নীল।সেখান থেকে ১পয়েন্ট পেলে আমি জিতে যাই। কিন’ এক পয়েন্ট পেলাম না। জসীমের কাছে হেরে গেলাম।পরের গেম আমাকে ৩ এ রেখে জসীম জিতে গেল। হায়রে ট্রাজেডী!

৫ সেপ্টেম্বর’ ৮৩।
দু’দিন ধরে ৫ওয়াক্ত নামাজ পড়ছি। নামাজ মানুষকে খুব পবিত্র করে। নিজেকে সারাদিন খুব হালকা মনে হয়।

১০ সেপ্টেম্বর’ ৮৩।
আজ TL  এর সাথে  TF কে বসতে দেখে বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠলো। TL  এর সাথে আর কথা বলবো না।

১৪ সেপ্টেম্বর’ ৮৩।
আজ একটা বাজে কাজ করলাম।Class IXএর সব কটাকে এনে আমাদের ক্লাসের প্রায় সবাই পিটালো। আমি ’আ’ কে বেত মেরেছি। এতো বেশী মেরেছি যে আমার খুব খারাপ লাগছে। আমার মনে হয়, এই মার খাওয়ার পর ছেলেটা জীবনে আর মিথ্যা কথা বলবে না। বাকী গুলোর অবস’াও খারাপ। ৫জন হাসপাতালে গেলো।
রাতে সিলেটের পথে রওয়ানা। আমরা ৭জন সিলেট যাত্রীর জন্য ’৪২ জন বসিবেক’ লেখা কম্পার্টমেন্ট। আরামে এলাম।

২৩ সেপ্টেম্বর’ ৮৩।
আজ রাসেল ৫ বছরে পড়লো। পড়াশুনা Program মতো হচ্ছে না। নিজের তৈরী করা রুটিন নিজেই মানছি না।

২ অক্টোবর’ ৮৩।
একদিন আমি আর TLদু’জন কত কাছাকাছি ছিলাম। শুধু মাত্র পড়াশুনার সময়টুকু ছাড়া বাকি সব কাজ আমরা একসাথে করতাম। অথচ আজ দু’মাস ধরে আমরা কথা বলি না। সে নিশ্চয়ই কাউকে দিয়ে আমার স’ান পূরণ করে নিয়েছে। কিন’ আমি? জানি , ৮১-৮২ তে ১১কে নিয়ে আমার এ রকম হয়েছিল। ওকে যখন পাইনি , তখন তাকে অনেক বেশী আকাঙ্খা করতাম। কিন’ মিল হয়ে যাবার পর আমার আগ্রহে ভাটা পড়ে যায়। হায়রে
মানব হৃদয়!
TL এতো selfish ই। কথা ছিল, আমরা এক রুমে উঠবো। কিন’ সে তার নিরিবিলি পড়ালেখা করার কারণে আমার সাথে রুম নিল না। শান- ছেলেদের সাথে নিল।

৩ অক্টোবর’ ৮৩।
এ টার্মে অন্য রকম হয়ে গেছি। TL এর সাথে কথা বলে ফেলবো? একবার ভাবলাম TF কে ডাকি। কথা বলি। কিন’ ইচ্ছা হলো না। থাক।
TLএর সঙ্গ আমার খুব পছন্দের ছিলো। ডাইনিং এ আমরা আলাদা টেবিলে বসি। কিন’ এমন জায়গায় বসি, যাতে আমি লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে পারি।
আজ চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ থেকে ডেইজী’ নামক একটা মেয়ে আমাকে চিঠি
লিখলো। পত্র মিতালী।

৬ অক্টোবর’ ৮৩।
আজ আমাদের ব্যাচ সিলেট এলাম এক্সকারশানে। সকাল ৭.১০ মিনিটে কলেজ গেট থেকে বেরিয়েছিলাম। মাঝখানে কুমিল্লা ও মাধবপুরে যাত্রা বিরতি। সন্ধ্যায় শেরপুর ফেরীঘাটে এসে সামনে একটা ট্রাক আটকে ছিল বলে ১ঘন্টা লেট। রাত এগারটায় সিলেট ক্যাডেট কলেজে এসে উঠলাম। আমাদের সাথে আমাদের  ফর্ম টিচার মিস্টার কিবরিয়া। SCC’র হাসপাতালের ফ্লোরে কম্বল বিছিয়ে আমাদের থাকার জায়গা করা হয়েছ্‌ে আমরা পাঁচ জন এক সাথে আছি। আমি , আশরাফ,রায়হান, শামীম ও চাকমা। আমাদের গ্রুপের নাম দেয়া হয়েছে ফাইভ ম্যান আর্মি। ৫জন কমন ফান্ড থেকে খরচ করি। ৫০ টাকা করে কমন কমন ফান্ডে জমা পড়েছে। ফান্ড থেকে একটা ফিল্ম কেনা হয়েছে এর মধ্যে।

৭ অক্টোবর’ ৮৩।
ক্যাসেট প্লেয়ারে জুলফিকারের আনা হিন্দি গান শুনে ঘুম ভাঙলো। খুব ফুর্তি লাগছে। আজ বিকেলে সিনেমা দেখলাম দিলশাদ সিনেমা হলে। নাম ’তিন বাহাদুর’। অন্‌জু আর ওয়াসিমের ছবি। হলের ভেতর আমাদের হৈ চৈর জন্য সাধারণ দর্শক সিনেমা দেখতে পারেনি। আবার আমাদেরকে কিছু বলতেও পারেনি।
রাতে সাইফুল আর ইমতিয়াজ আগে ঘুমিয়ে গিয়েছিল। সে অপরাধে তাদের পা জামা ছিড়ে ফেলা হয়।

৮ অক্টোবর’ ৮৩।
আজ জাফলং গেলাম। খুব সুন্দর। আগে একবার গিয়েছিলাম সাইফুল আর হাসানকে নিয়ে। অনেক ছবি উঠানো হলো। ফেরার পথে শ্রীপুরে এসে শুনি সিনেমার সুিটং হচ্ছে। আর যায় কোথায়? ছবির নাম ’ন্যায়-অন্যায়’। অন্‌জু ,ওয়াসিম , জাভেদ, সুলতানা, আদিল, আহমেদ শরীফ এসেছেন। আমরা দৌড়ে পাহাড় ডিঙিয়ে স্পটে চলে গেলাম। দেখি নায়ক ওয়াসিম একটা চেয়ারে বসে আছেন। এক লোক পাশে ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে। একজন বলল- সান ডাউন , শুটিং হবে না। তারা প্যাক আপ করে দিল। আমরা অন্‌জুকে দেখতে ছুটলাম। দেখি দুই টিলার মাঝখানটায় উনি দাঁড়িয়ে আছেন, পার হতে পারছেন না। মাঝখানে ছোট্ট ছড়া। এক গুন্ডা গোছের লোক ধমক দিয়ে বললো ’ ঐ, ম্যাডামকে কোলে করে পার কর’। দেখি এক মোটাসোটা লোক ততোধিক মোটাসোটা নায়িকা অন্‌জুকে কোলে করে পার করে দিল। আমরা তাকে ঘিরে ধরলাম। কেউ কেউ একবার চেহারা দেখে ফিরত এলো। কেউ কেউ হাতের সামনে কাগজ ধরলো অটোগ্রাফ নেবার জন্য। আমি একটি দশ টাকার নোট বের করলাম। তিনি ভাঙা ভাঙা ইংরেজীতে লিখলেন ‘ANJU’ । আমাদের সাইফুল খুব পাঁজী। সে গায়ের জামা খুলে সামনে গিয়ে বলে  আমার বুকে কলম দিয়ে সাইন করুন। নায়িকার ভিমরি খাওয়ার অবস’া।
ফেরার পথে বাসে সারাক্ষণ আমরা গান গাইলাম – অন্‌জু ঘোষের ঠোঁট মেলানো গান – ’এক দুই তিন,আমরা তিন বাহাদুর।’
৯ অক্টোবর’ ৮৩।
আজ School of  infantry and techtis এ গেলাম। ওখানকার Commandant Ex-Faujian Brig. MG Rabbani ভাইর সাথে দেখা করার কথা ছিল। কিন’ দেখা না পাওয়ার কারণে আমাদের মন খারাপ। বিকেলে লাক্কাতুরা চা বাগানে আমাদেরকে দেখানো হলো কেমন করে দুটি পাতা একটি কুঁড়ি দিয়ে চা বানানো হয়।

১০ অক্টোবর’ ৮৩।
সকালে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরী। এসব ফ্যাক্টরী ট্যাকটরী আমার ভাল লাগে না। তবে ফেরীটা সুন্দর ছিলো। ছবি তুলেছি। ছাতকের সিমেন্ট ফ্যাক্টরী ১৯৩৯ সালে তৈরী হয়। বর্তমানে বছরে ১২,৫,০০০ টন সিমেন্ট তৈরী হয়। কিভাবে চুনাপাথর আর কাদু (৩৯ঃ৬৪) মিশিয়ে তার সাথে জিপসাম আর ডাস্ট মিশিয়ে (৬%, ১০%) সিমেন্ট তৈরী হয় তা দেখানো হলো। দুপুরে লাঞ্চ খেলাম অফিস্‌ার্স ক্লাবের গেস্ট হাউজে। ফ্যাক্টরী ম্যানেজার মি. জলিল আমাদেরকে খুব খাতির করেন।
সাড়ে তিনটায় নিয়ে যাওয়া হয় পেপার এবং পাম্প মিল এ।

১১ অক্টোবর’ ৮৩।
সকাল ৯ টায় সিলেট ক্যাডেট কলেজ ছাড়লাম মৌলভী চা বাগানের উদ্দেশ্যে। এখানে লাঞ্চ করে সারা বাগান ঘুরে দেখলাম। ১৭৬০ বর্গমাইলের চা বাগান। ম্যানেজার এক্স ক্যাডেট নাসিম ভাই। তার বিদেশী বৌ। রাত ৯ টায় তার বাংলোয় ক্যাম্প ফায়ার উদ্বোধন করলেন ভাবী। তারপর শুরু হলো নাচ। আমাদের ক্যাসেট প্লেয়ারে এখন আর হিন্দি গান চলছে না। সিলেট থেকেই কেনা হয়েছিল ’তিন বাহাদুর’ এর  অডিও ক্যাসেট। ’যত খুশী তুমি আমায় চাবুক মারো’ গানটার সাথে সবাই নাচলো। মি. কিবরিয়াও বাদ গেলেন না। তিনি তালে তালে হাত তালি দিলেন। রাত সাড়ে ১২ টায় খাবার দেয়া হলো। আস- খাসীর রোস্ট। একটুও বাদ গেলো না । বাংলোর বড় ঘরে সবাই মেঝেতে ঘুমালাম। কাল কলেজে চলে যাবো। শেষ হয়ে এলো আমাদের ফুর্তির দিন।

১২ অক্টোবর’ ৮৩।
সকাল ৮ টা ২ মিনিট। আমাদের গাড়ি বাংলো থেকে নেমে মিলের গেট পার হয়ে একটা আধ ভাঙা কালভার্টের উপর উঠেছে। এমন সময় মড়াৎ করে শব্দ। এবং গাড়ি কাত। আমরা দ্রুত নেমে দেখি, গাড়িটা কাত হয়ে এর পেছন দিক একটা বড় গাছের সাথে হেলান দিয়ে আছে। গাড়ির অবস’া দেখে সবাই ভয় পেলাম । গাছটা না থাকলে কালকের দৈনিক পত্রিকার শিরোনাম হতাম আমরা।
আমরা ঝোপঝাড়ের মধ্যে বসে পড়লাম। শুনলাম কলেজে, সিলেটে, মৌলভীবাজারে যোগাযোগ করা হচ্ছে। ক্রেন দিয়ে গাড়ি উঠাতে হবে। কিন’ এই ছোট পথে ক্রেন , মাথাই ঢুকাতে পারবে না । ঠিক হলো চা বাগানের লম্বা লম্বা গাছ কেটে গাছ দিয়ে ঠেলে গাড়িকে সোজা করা হবে। সাথে সাথে ২/৩ শ কুলি জুটে গেলো। তারা গাছ কাটলো। আমরা তাদের ঠেলা দিয়ে গাড়ি সোজা করার চেষ্টা করলাম। কিন’ গাড়ি সোজা হয় না। আমরা চা বাগানের শেড ট্রি গুলোর নীচে গান শুনে তাস খেলে সময় পার করি।

১৩ অক্টোবর’ ৮৩।
আমাদের বোনাস এক্সকারশানের আজ প্রথম দিন। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি গাড়ির অবস’া অপরিবর্তিত। কোনো কাজ হয়নি। বল প্রয়োগ করা হয়েছে, কিন’ বস’র অবস’ানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ফিজিক্সে ওয়ার্ক ফরমূলা মতো কাজ হয়েছে শূন্য। নাস-া খেতে গিয়ে টের পেলাম, দুর্ভিক্ষের মধ্যে পড়ে গেছি। একটা বড় পরোটা, ১ টা পিয়াজ, ১ টা কাঁচামরিচ । আবার সবাই মিলে কাজে গেলাম। বেলা ১ টার দিকে কাজ হয়েছে বলে মনে হলো। প্রায় ২ শো লোকের বল প্রয়োগে বাস তার অবস’ান সোজা করল। কিন’ এসময় আরেকটা দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো। নওশাদের হাতে যে গাছ ছিলো, সেই গাছ গাড়ি সোজা করার পর তার উপর পড়ে যাচ্ছিল। নওশাদ ডাইভ দিয়ে সরে গেল। না গেলে ওর মাথা ভর্তা হয়ে যেতো।
দুপুরে আলু ভাজি, ডাল দিয়ে ভাত খেলাম। বিকেল ৫ টায় রওয়ানা হলাম কলেজের পথে। অন্ধকার রাতে খুব ভয় হয়েছিল। আমাদের গাড়ির একটা হেডলাইট কাটা। তাও সাইফুল ভাই খুব ভালো গাড়ি চালালেন।
রাতে কুমিল্লায় ডিসির বাংলোতে উঠলাম। কুমিল্লার ডিসি আমাদের এক্স – ক্যাডেট । সেখানে তৃপ্তি ভরে ভাত খেলাম রাত দেড়টায়। তারপর বিশাল ড্রয়িং রুমে আমরা সবাই মিলে ঘুমালাম।

১৪ অক্টোবর’ ৮৩।
সকালে নাস-া খেয়ে মাতৃভান্ডারে গিয়ে রসমালাই খেলাম আমি আর হানিফ। কুমিল্লা থেকে কলেজের পথে বাস রওয়ানা হবার সময় দেখা গেলো –  ছেলেদের মধ্যে কিছু প্রাণ চাঞ্চল্য এসেছে। আবার কিছু নাচা গানা হলো। দুপুর সোয়া একটায় কলেজে পৌছলাম। কলেজে এসে একদম ভালো লাগছে না।
১৮ অক্টোবর’ ৮৩।
টি এফ এর সাথে রাস-ায় ক্রস হলো। ফলস পজিশনে পড়ে গেলাম। আমি মাথা নীচু করে বা দিকের রাস-া দিয়ে হাঁটলাম, সে ডান দিকে চলে গেলো।

২২ অক্টোবর’ ৮৩।
একদিন আমাকে বলেছিল, অন্য একটি সিনিয়ার ওকে পটিয়ে কথা আদায় করে। তারপর ওর কথাগুলো ক্লাস ফ্রেন্ডকে বলে – ্‌েবঈমা্‌নী করে। আমি বললাম –  ’আমাকে যে এতো সব কথা বলছো। আমি যদি কাউকে বলি? সে বলেছিল – ’খুব দুঃখ পাবো।’
টি এল আমাকে এক চিঠিতে লিখেছিল -’আমি চাই, তোদের সম্পর্ক অটুট থাক।’ জানিস – টি এল, তোর চিঠি পেয়ে আমার কাঁদতে ইচ্ছা হয়েছিল।
আমি তো ছেড়ে দিয়েছি, তুই কেন নিবি না?

২৫ অক্টোবর’ ৮৩।
রায়হান – তোকে আমি ভালো মনে করেছিলাম। কিন’ তুই ও দেখি তাল মারায়
ওস-াদ।

২৯ অক্টোবর’ ৮৩।
তোমাকে ভুলতে হলে তোমাকে ঘৃনা করা ছাড়া কোন পথ নাই। কিন’, সেও তো সম্ভব নয়। একদিন যে ভালোবেসে ফেলেছিলাম।

৩০ অক্টোবর’ ৮৩।
ঃ একটা কথা বলবো
ঃ বলো
ঃআপনাকে স্ট্যান্ড করতেই হবে।
ঃ দোয়া কর।
এর বেশী আর কি বলতে পারি। আজ আমার সমস- অন-র ভালোলাগা বোধে ভরে গেলো। আজ খুব ফুর্তি লাগছে। একবার বললাম – ’তুমি তো খুব অভিনয় করতে পার।’ সে বলে আমি কষ্ট পেয়ে একটা কবিতা লিখেছি। কাল দেখাবো।

১ নভেম্বর ’ ৮৩।
উপরে লেখা ’প্রত্যাশা’।
কবিতাটা খুব ছোট: আমার ভালোবাসার রিক্ত মরুও বুকে/তোমার সিক্ত হাতের ছোয়া/ তৃষ্ণার্ত পথিকের –  একমগ জল।
তার নীচে লেখা  –  কবিতার জবাব ঃ
আমিতো চাইনি তোমার সবুজ বাগানে/ একটু আগাছা হয়ে জন্মাতে / আমিতো চাইনি তোমার সুখের সরাবে এক ফোটা হ্যামলক ঢেলে দেতে/ চেয়েছিলাম কোন এক দুঃখ জাগানিয়া গান শোনাতে/ তুমি কি শুনেছো কভু?
৫ নভেম্বর ’ ৮৩।
টিভিতে ’এখনই’ অনুষ্ঠানে নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের সচল ছবি এই প্রথম দেখলাম। উপস’াপক আনিুসল হককে শুভেচ্ছা।
রেস্ট টাইমে সাংঘাতিক ফলস পজিশনে পড়ে গেলাম।টি এফ এসেছিল ওর বোনের জন্য নোট নিতে। বলেছিলাম রেস্ট টাইমে এসো। আমি যেই নোট টা ওর হাতে দিয়েছি, দেখি টি এল এসে হাজিরা দেখে ফেললো। ও অবশ্য কিছু বললো না। চলে গেলো।

৬ নভেম্বর ’ ৮৩।
রায়হান, শামীম, প্রসেনজিত, আশরাফ এর সাথে নো কমপ্রোমাইস, নো পাত্তা। ইভেন ফোটোর ব্যাপারেও যদি তারা পয়সা দিতে না চায়, নো কমপ্রোমাইজ, ছবি ছিড়ে ফেলবো।

৭ নভেম্বর ’ ৮৩।
যে আহমেদ আশরাফকে জাত শত্রু মনে করে, সেই আহমেদ আজ আশরাফকে নিয়ে রাতে ডাব চুরি করতে গেলো । কি নির্লজ্জ! সাথে শামীম ও । আমাকে বলেছিল। আমি যাই নি।

১১ নভেম্বর ’ ৮৩।
ঠিক দু’বছর আগে এই দিনে কাপ্তাই লেকে আমি ঢিল ছুড়ে শওকতের মাথা ফাটিয়েছিলাম। এই তারিখটা এলেই খুব অনুশোচনা লাগে।
শামীম আজ পেপসি খাওয়ালো। কোনো কারন বুঝতে পারলাম না। আজ টিভিতে একটা দারুন নাটক দেখলাম। রোকসানা শিরিন নামক একটা মেয়ের অভিনয় দেখে পাগল না হয়ে পারিনি।

১৫ নভেম্বর ’ ৮৩।
মা, বাবা আর খালেদেও চিঠি পেলাম্‌ বাবা লিখেছেন সাউথ আমেরিকা যাচ্ছেন।

১৭ নভেম্বর ’ ৮৩।
ডেইজির চিঠি পেলাম। খুব সেয়ানা মেয়ে। খুব দুষ্টুমী করে। আমিও। রাঙামাটির দুইটা মেয়েও লিখে। ওরা আবার দুই বান্ধবী। আজ টিভিতে সিনেমা দেখালো, ’হার জিত’। পেন ফ্রেন্ডদের নিয়ে ঘটনা। এক সময় জাফর ইকবালের জায়গায় নিজেকে বসালাম। কবিতার জায়গায় ডেইজী, সুমি কিংবা তানি।

২১ নভেম্বও ’৮৩।
আজ অস্ত্র প্রদর্শনী দেখতে আমাদের ব্যাচকে চট্‌্রগ্রাম নিয়ে যাওয়া হলো। অনেকে টাউনে ঘুরলো। আমি ঘুরিনি। কারণ পকেট ফুটা। আমার সম্বল দু’টো দশ টাকার নোট মাত্র। তাও আবার একটিতে অঞ্জু ঘোষ, অপরটিতে ওয়াশিম আর জাবেদের অটোগ্রাফ আছে। দেখি কত দিন না ভাঙিয়ে থাকা যায়।

২২ নভেম্বও ’৮৩।
আজ আমার জন্মদিন। আজ শপথ নিলাম- আজকের দিনে আমি একটি ছোট খাটো অন্যায়ও করবো না। কারো সাথে কোনো মিস বিহেভ করবো না। সবার সাথে প্রাণ খুলে হাসবো, কথা বলবো – এমন প্রতিজ্ঞা ছিলো আমার। কিন’ হলো না। প্রথমেই ব্রেকফাস্টে লেট করলাম। গেমস এ মার্চ অফ এর অনেক পরে গেলাম। রাতে প্রেপে অনেক হৈচৈ করলাম, নিজের পড়াও হয়নি, অন্যেরও না। দু’বার ছেলেরা আমাকে গণ দিলো।

২৪ নভেম্বর ’৮৩।
কালকে ক্লাস ইলেভেনের একটা কালচারাল ফাংশন ছিলো। প্রিন্সিপাল লে.ক. শামসুল হুদা তার তিন মেয়েকে নিয়ে স্টেজে গান গাইলেন।   ’তোকে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে।’ মেয়ে তিনটা দারুণ। আজ ডিনারে আমাদের ব্যাচ ব্লেজার পরে এলো। আজই আমার প্রথম কোট পরা।

২৫ নভেম্বর ’৮৩।
শুক্রবার, ছুটির দিন। সকাল দশটা পর্যনত্ম শাহেদের সাথে টেনিস। মিল্ক ব্রেকের পর হাউজে বসে তাস। বাহ! ভালোই কাটছে।
সন্ধ্যায় ’প্রতিহিংসা’ দেখানো হলো। ভালো লেগেছে।

২৮ নভেম্বর ’৮৩।
আজ থেকে দেশের সমসত্ম রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ করা হয়। ঢাকায় অনেক গোলমাল হলো। ২২ দল সচিবালয় ঘেরাও করেছে, দেয়াল ভেঙ্গেছে। দেশের অবস’া খারাপের দিকে।

২৯ নভেম্বর ’৮৩।
এরশাদ, তোমার প্রতিশ্রুতি ক্ষুণ হয়েছে। তোমার অঙ্গিকার – আজ পথের ধূলায়। তোমার আশার বাণী – নৈরাশ্যের দিশা
তোমার লোভ, তোমার ক্ষমতা – তুমি সংযত করো – এরশাদ
..
..

৩০ নভেম্বর ’৮৩।
আজ ফিপথ পিরিয়ডে ছেলেরা ক্লাস থেকে চলে এলো। বলে দেয়া হয়েছে যাতে সবাই হাউজে থাকে। আজ সারা দেশে হরতাল। তবে হরতাল বা স্ট্রাইকে কখনো কলেজের কারিকুলামের কোনো পরিবর্তন হয় না। এবারই প্রথম হলো। আমার মনে হয় কলেজ অথরিটি ভয় পেয়ে গেছে, যদি পাবলিক এসে এটাক করে?

৪ ডিসেম্বর ’৮৩।
আজ আম্মার চিঠি পেয়ে হতাশ হলাম। আগে লিখেছিলাম আমার হাতে কোনো টাকা নাই, পারলে কিছু দিতে। চিঠি খুলে দেখি – ভেতরে কিছু নাই। আগে ৫০ টাকা পাঠিয়েছিলেন এবার কোনো টাকা দিলেন না। আমার কাছে ২টা দশ টাকার নোট ছাড়া আর কিছু নাই। আমার কাছে ২জন মিলে ২২টাকা পাবে। একজোড়া নতুন পিটি সু আমার আছে। ওটা বিক্রি করলে ২৫ – ৩০ টাকা পাবো। দেখি কি করা যায়।

২০ ডিসেম্বর ’৮৩।
খাজার সাথে শুধু শুধু ঝগড়া করলাম। টুলুর সাথে মিল দিয়ে দিবো। লাভ কি এরকম থেকে? দু’দিন পর কে কোথায় থাকবো কে জানে?
আর মাত্র কয়েকটা দিন কলেজে, তারপর তো অন্য জীবন।

১,০৭৯ বার দেখা হয়েছে

৭ টি মন্তব্য : “ক্লাস টুয়েলভ ১৯৮৩”

  1. রুম্মান (১৯৯৩-৯৯)

    বরাবরের মতোই শাকুর ভাই ।
    অপেক্ষায় থাকলাম............


    আমার কি সমস্ত কিছুই হলো ভুল
    ভুল কথা, ভুল সম্মোধন
    ভুল পথ, ভুল বাড়ি, ভুল ঘোরাফেরা
    সারাটা জীবন ভুল চিঠি লেখা হলো শুধু,
    ভুল দরজায় হলো ব্যর্থ করাঘাত
    আমার কেবল হলো সমস্ত জীবন শুধু ভুল বই পড়া ।

    জবাব দিন
  2. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    আহা রে... সিলেট ক্যাডেট কলেজে এক্সকারশন, লাক্কাতুরা চা বাগান সব মনে পড়ে গেলো। তবে সিলেট ক্যাফডেট কলেজের কাছে ফুটবল ম্যাচে ৫-০ গোলে হেরেছিলাম.. 🙁 ...
    খুব ভালো টীম থাকা সত্ত্বেও, ওভারকনফিডেন্স আর ক্লান্তির কারণে।

    সাইফুল ভাই- এর অঞ্জু ঘোষের অটোগ্রাফ নেবার কায়দাটা জেনে পেট ফেটে হাসি পেলো।
    প্রজেক্টরে একটা সময় পর্যন্ত আমরাও খুব ভালো ভালো ছবির পাশাপাশি 'গরম মসল্লা' নামের বাজে বাংলা ছবিও দেখেছি।

    মুশতাক ভাই (মমতাজউদ্দিন আহমদ -এর ছেলে) পরে আমাদের হাউজ ক্যাপ্টেন হয়েছিলেন, আমরা পরে একই মেডিকেল থেকে পাশ করে এখন আবার একই শহরের বাসিন্দা। উনাকে বলবো আপনার এই পোস্টের কথা।

    মেডিকেলে পড়ার সময় কিছুদিন এফসিসির প্রাক্তন প্রিন্সিপাল শামসুল হুদা থাকতেন আমাদের নীচতলায়। উনাকে আমরাও ১২ দিনের জন্য পেয়েছিলাম। উনাকে নিয়ে নিশ্চয়ই ৮৪-র ডায়রীতে এব্যাপারে কিছু থাকবে।

    আর এরশাদকে নিয়ে এই যে লিখলেন ...

    এরশাদ, তোমার প্রতিশ্রুতি ক্ষুণ হয়েছে। তোমার অঙ্গিকার – আজ পথের ধূলায়। তোমার আশার বাণী – নৈরাশ্যের দিশা
    তোমার লোভ, তোমার ক্ষমতা – তুমি সংযত করো – এরশাদ

    সেটা খুব ভালো লাগলো... :thumbup:

    জবাব দিন
  3. আহসান আকাশ (৯৬-০২)
    দারুণ! দারুণ! কেমন যেন সেইসব দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যায় আপনার ডায়েরি।

    :boss: :boss:


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  4. নাভিদ আজ একটা খাটি কথা শোনালো। বললো- ক্যাডেট কলেজে কোনো বন্ধু তোর ভালো কিছু চাইবে না। তোর সুখের সংবাদে সুখী হবে না, কেউ তোকে উপরে তুলে দেবে না। সবাই চাইবে তোকে নীচে নামিয়ে রাখতে। সুতরং নিজেই নিজেকে বড় ভাববি, নিজেকেই বড় করবি। .....vaia......valo laglo kothata....
    Excellent lekha vaia....

    দারুণ! দারুণ! কেমন যেন সেইসব দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যায় আপনার ডায়েরি।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।