টাগ অব ওয়্যার

দু’ঘন্টার বিরতিহীন ক্লায়েন্ট মিটিং । বেরোবার পর নোমানের মাথাটা নিরেট পাথর হয়ে থাকে। স্যাভিটেক কর্পোরেশনের ঝানু জেনারেল ম্যানেজারের সাথে পেরে উঠতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে আজ । কিউবিকলে ঢুকে অবসন্ন শরীরটা চেয়ারে এলিয়ে দিয়ে পিওনকে কড়া এক কাপ কফির অর্ডার দেয় । সেলফোনে ফেসবুক খুলে বসে হোমপেজে ঘোরাঘুরি করে অলস আঙুলে । অমুকের রেস্টুরেন্টে চেক-ইন, তমুকের চোখ ড্যাবড্যাবে ডাক-ফেস সেলফি দেখতে দেখতে একটা অনলাইন নিউজ পোর্টালের হেড লাইনে দৃষ্টি সেঁটে যায় ।

টরেন্টো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সাদমান রফিকের ‘সায়ংকাল’ পেল বেস্ট ফিচার ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড

নোমানের হেলানো শরীরটা এক ঝটকায় সোজা হয়ে বসে । সেই সাদমান রফিক! নোমানের সিনেমাপাগল বন্ধু। ইকনোমিকসের নোমান, অ্যানথ্রোপলজির সাদমান, ইংরেজীর জাবের আর কেমিস্ট্রির রনি । চারজনেরই বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কেটে গেছিল ‘সিনেমা সিনেমা’ জপ করতে করতে। সিনেমার নেশা চারজনকে চার মাথা থেকে হিড়হিড় করে টেনে এনে এক গর্তে ফেলেছিল। সাদমান ছাড়া বাকি তিনজনই সেই গর্ত ছেড়ে কবেই বেরিয়ে এসেছে। সাদমান গোঁ ধরে মাটি কামড়ে পড়ে থাকল । ফিল্ম সে বানাবেই ! একটা টিভি চ্যানেলে স্ক্রিপ্ট রাইটিংয়ের কাজ করল কিছুদিন । টেকনিক্যাল দিকগুলোর খুঁটিনাটি বুঝতে দু’তিনটা ফিল্মে সহকারী পরিচালকের কাজও জুটিয়ে নিয়েছিল । এর ওর মুখে এতটুকুই শুনেছে নোমান। একটা ঝগড়ার পর থেকে দু’জনের যোগাযোগ বন্ধ আজ বছর চারেক ।
নোমান কন্ট্যাক্ট লিস্ট থেকে নাম্বার খুঁজে বের করে সাদমানকে কল দেয় । এত দিনের দূরত্বের দেয়াল ডিঙাতে দ্বিধা-দ্বন্দ কাজ করে না কোন ।
আপনি যে নাম্বারে কল করেছেন তা এখন বন্ধ আছে ।
ও কি এখন টরেন্টোতে ? নাকি ব্যাটা নাম্বার পাল্টেছে ?
নোমান এবার জাবেরকে কল দেয় ।
‘সাদমানের নিউজটা পাইছিস ?’
‘হ্যাঁ, কাল রাতেই তো ! ব্যাটা একদম ফাটায় দিল !’
‘ওর সাথে যোগাযোগ হইছে ?’
‘ও টরেন্টোতে । ফেসবুকে মেসেজ দিসলাম। রিপ্লাই দেয় নাই এখনো ।’
পিওন কফির মগ ডেস্কে রেখে যায়। নোমান অন্যমনস্কভাবে দু’এক চুমুক দিয়ে রেখে দেয় । সাদমান ঘাঁটি গেড়ে বসেছে মাথায় । আর অন্য কিছুই সেই ঘাঁটি টপকে ভেতরে ঢুকতে পারছে না। নোমান অস্থির আঙুলে ‘সাদমান রফিক’ গুগল করে সেলফোনে। তন্ন তন্ন করে খোঁজে যেখানে যে টুকরো-টাকরা সংবাদ মেলে । ইউটিউবে ‘সায়ংকাল’ খুঁজতে থাকে । নাহ, কিছুই নেই, একটা ট্রেলারও না ! শাহবাগের দিকে যাবে নাকি একবার ? ছবির হাট তো কবেই উঠে গেছে । আজিজে অবশ্য পুরনো বন্ধু-বান্ধবদের কাউকে পাওয়া যেতে পারে । কিংবা কনকর্ডে । জাবেরকে আসতে বলবে নাকি সন্ধ্যায় ? ফোনটা হাতে নিয়ে অফিসের ইমেইল গুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে সময় আর বাকি কাজের হিসাব মেলাতে থাকে।
ল্যান্ড ফোনটা বেজে ওঠে । ও পাশে লাইন ম্যানেজার ।
‘নোমান, প্রজেক্ট প্রোপোজালটা উইদিন হাফ অ্যান আওয়ার পাঠিয়ে দিন । আরজেন্টলি । অ্যান্ড দেন উই উইল হ্যাভ আ মিটিং।’
২.
গ্লোরিয়া জিন্সে ছ’টা থেকে বসে আছে নোমান । মিলার দেখা নেই। দশ মিনিট আগে জানিয়েছে পাঁচ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাবে । নোমানের মেজাজটা এখন বারুদে ঠাসা, যেকোন মুহুর্তে দুম করে ফেটে পড়বে। অফিস ডে-তে সময় বের করার সুযোগ হয় নি । তাই আজ শুক্রবারের সন্ধ্যায় শাহবাগে জড়ো হচ্ছে ভার্সিটির বন্ধুরা । মিলা আসবেই বা কখন, ডেট সেরে যাবেই বা কখন, আর নোমান জ্যাম ঠেলে শাহবাগে পৌঁছাবেই বা কখন !
মিলা এসে পৌঁছায় সাড়ে ছ’টায় ।
‘স্যরি, স্যরি ! পাঁচ মিনিটের রাস্তায় জ্যামে আটকে ছিলাম আধ ঘন্টা! প্লীজ ডোন্ট বি ম্যাড অ্যাট মি !’ মিষ্টি হাসি দিয়ে নোমানকে ঘায়েল করার কায়দা করতে করতে বলে, ‘তা আমাকে কেমন দেখাচ্ছ বলো !’
ইদানীং বেশ মেকআপ করার বাতিক ধরেছে মিলার । দেখতে সুন্দর লাগে, চোখ-মুখ নাকের খুঁতগুলো ঢেকে যায় । কিন্তু কেমন মেকি পুতুল মার্কা সৌন্দর্য। সরলতাহীন।
তবে এখন মনের কথা ফাঁস করে ঝলমলে সন্ধ্যাটাকে নিকষ কালো অমাবশ্যা বানানোর মানে হয় না ।
‘ঠিক সময়ে আসলে তোমাকে সুন্দর বলতাম । কিন্তু এখন আর বলব না। আয়্যাম সো পিসড অফ !’
মিলা আহ্লাদি-আদুরে গলায় নোমানকে পটানোর চেষ্টা চালিয়ে যায়। এ কথা ও কথা পেরিয়ে শেষতক সেই কথা টেনে বের করে আনে যেটা ইদানীং নোমানের ভেতরটাকে নিংড়ে শুকিয়ে ছিবড়ে বানিয়ে ফেলে ।
‘আমার বাসায় বিয়ের প্রোপোজাল কবে পাঠাচ্ছ বলো ! মাস্টার্স তো শেষ হয়ে যাচ্ছে। আম্মু আজকেও আসার সময় আমাকে জিজ্ঞেস করল বিয়ের ব্যাপারে।’
‘এত তাড়াহুড়ার কি আছে ? আমার সেভিংসটা আরেকটু বাড়ুক । বিয়েতেই তো সব টাকা বেড়িয়ে যাবে। সংসার মেইনটেইন করা ইজ নট আ জোক !’
‘নেক্সট ইয়ারে তুমি ইনক্রিমেন্ট পাচ্ছ, না ? আর আমি নিজেও তো হাউজ ওয়াইফ হয়ে বসে থাকব না ।’
এই দৃশ্যটা খুব ক্লিশে। সিনেমা-নাটকে,গল্প-উপন্যাসে এমন ঘটনা ঘটেছে বহুবার। এমন দো-টানা, টানাপোড়নের পুনরাবৃত্তি চারপাশেও হরহামেশাই । নোমানও এই বৃত্তেই খাবি খায়। চিরাচরিতভাবে এ দৃশ্যে অসহায় বোধ করে। খরচাপাতির ব্যাপারটা ছুতো । সংসারে ঢোকা মানে ছা-পোষা নিরাপদ পাঁচিলঘেরা জীবনে আটকে পড়া । প্রথমে স্বামী আর তারপর বাবার ভূমিকায় ঠিক ঠিক এঁটে ওঠা । অথচ ওর রক্তে এখনো সিনেমার নেশা । বেপরোয়া জীবনের ডাক। ভার্সিটির সেই ভবঘুরে দিনগুলো ওকে এখনো হাত নেড়ে ইশারা করে । নোমানের মাথায় প্রতিধ্বনি ওঠে, ‘আই উইল হেইট মাইসেলফ ইফ আই ডাই লিভিং আ মিডিওকার লাইফ…’।
৩.
পাবলিক লাইব্রেরির ক্যাফেতে একটা টেবিল দখল করে বসেছে ওরা। জাবের, রনি, মিনহাজ আর নাম না জানা একটা ছেলে । নোমান আসতেই হইহই করে উঠল রনি !
‘কর্পোরেট আয়া পড়ছে ! এখন খাবারের অর্ডার দেই ! বিল অন কর্পোরেট নোমান !’
মিনহাজের সাথে আগে থেকেই নোমানের পরিচয় আছে । ছেলেটা লিটল ম্যাগাজিনে লিখত, বাম রাজনীতিতেও জড়িয়ে পড়েছিল । এখন কোন একটা পত্রিকায় কাজ করে ।
অচেনা ছেলেটার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় জাবের , ‘ও সুমন । খুব ভাল ফোক গায় । সৌম্যদার গানের দলে ঢুকছে।’
সৌম্যদা ! বহুদিন দেখা হয় না মানুষটার সাথে । সৌম্যদার গানগুলো বিচিত্র, অন্যদের থেকে একদমই আলাদা । ওগুলো শুধু গান না,তার অনুভূতি-ভাব-ভাবনা-চিন্তা-আদর্শের সন্তান । গানের কথা আর সুর জড়াজড়ি করে ঢুকে পড়ে বুকের ভেতরে। সেখানে গিয়ে মোচড় দেয়, ঘাই মারে, আঁচড় কেটে যায়। সৌম্যদা নিজেই একটা ঘরানা। নোমান ভেবে রেখেছিল কখনো সিনেমা বানালে তাকেই ধরে বসবে মিউজিক ডিরেক্টর হওয়ার জন্য।
নোমান আড্ডা শুরু করে, ‘তা সাদমান তো দেখায় দিল ! প্রথম ছবিতেই ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড ! প্রডিউসার কই পাইল ব্যাটা ?’
জাবের বলে , ‘কোন সিঙ্গেল প্রডিউসার পায় নাই । দুইতিনজনের কাছ থাইকা টাকা ম্যানেজ করছে । বেশি বাজেটের ফিল্ম কিন্তু না । ডিজিটাল ফিল্ম । সিনেমাটোগ্রাফার, এডিটর সবাই নাকি বেগার খাইটা দিছে ।’
রনির গলায় সন্দেহ, ‘প্রজেকশন করতে পারব তো ? ডিজিটাল ফিল্ম দেখানোর ভাল বন্দোবস্ত তো দেশে নাই । আর এইসব ফিল্মগুলা হয় কোন টিভি চ্যানেল কিইন্যা নেয়, নয় সিনেপ্লেক্স বা বলাকায় এক দুই সপ্তাহ চইলা মুখ থুবড়ায় পড়ে ।’
নোমান বলে , ‘এই নিউজটা পেয়ে একদিকে যেমন খুব খুশি হইছি, অন্যদিকে ভিতরে ভিতরে খুব অস্থিরতা টের পাইছি, জানিস ! দেখ, আমরা চারজনই ফিল্মমেকার ছাড়া আর কিছু হতে চাই নাই । কিন্তু সবাই অন্য প্রফেশনে চলে গেছি । শুধু সাদমানেরই প্যাশনটা যায় নাই ! হি প্রুভড হিমসেলফ ! সামটাইমস আই রিগ্রেট ফর গিভিং আপ অন মাই ড্রিম ! ও যখন টরেন্টোতে অ্যাওয়ার্ড নিচ্ছে আমি তখন অফিসের খোপে ঢুকে বসের ঝাড়ি খাচ্ছি নাইলে তেল দিচ্ছি !’
মিনহাজ মুখ খোলে, ‘তুমি কিন্তু বোকামি করো নাই । কর্পোরেটে খুব ভাল একটা পজিশনে আছ । একটা সার্টেন ফিউচার আছে তোমার ! আমার দিকে দেখো ! কি হইল আমার ! লেখালেখি চালায় যাব বইলা পত্রিকায় কাজ নিলাম । একটা বই বের করলাম । কিন্তু ওই পর্যন্তই! আর কিছু হইল না । না পুরস্কার, না নামযশ, না টাকাপয়সা ! পাঠক পাইলাম না । আজকাল কোন লিডিং পত্রিকা নাইলে বড় কোন অর্গানাইজেশন প্রোমোট না করলে পাঠকে লেখা পড়ে না ! আর ইদানীং মনে হয় কি, আমারে দিয়া আসলে লেখালেখি হয় না ! নিজেরে ওভারএস্টিমেট করছিলাম ! ফিল্মমেকিংয়ে তাও এদেশের ছেলেপেলেরা কিছু ইন্টারন্যাশনাল রিকগনিশন পাচ্ছে, লিটারেচারে তো কিছুই না ! ’
জাবেরের দিকে তাকায় নোমান, ‘সাদমান তোর মেসেজের রিপ্লাই দিছে ?’
‘হু, কাল রওনা দিছে টরেন্টো থাইকা । তা তোর কি এখনো সাদমানের সাথে মিটে নাই ? কি হইছিল বলতো তোদের ? কানাঘুষা কিছু শুনি, তুই খুইলা বল আজকে !’
নোমান কিছু বলে না । হেসে উড়িয়ে দেয় ।
ওয়েটার শিক-নান আর হালিম দিয়ে গেলে ওরা আলাপ ছেড়ে তড়িঘড়ি প্লেটের ওপর হামলে পড়ে।
রাতে বাসায় ফেরার পর নোমান প্যাকেট থেকে বের করে আজিজ থেকে কেনা বই ক’টা । সব ক’টাই চলচ্চিত্রের । দেশি , বিদেশি । শেলফে না রেখে বালিশের পাশে ফেলে রাখে। ল্যাপটপে চালিয়ে দেয় আব্বাস কিয়োরোস্তামির ‘ক্লোজ-আপ’ । টিএসসিতে একটা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রথম দেখেছিল । ব্যাস, তখন থেকেই হিপনোটাইজড, সিনেমার মাদক রক্তে ছড়িয়ে পড়ল অপ্রতিরোধ্য গতিতে।

সাদমানের বড় ভাইয়ের একটা সিক্সটি-ডি ডিএসএলআর ক্যামেরা, একটা ট্রাইপড, এক ওয়েডিং ফটোগ্রাফার বন্ধুর কাছ থেকে ধার করা লাইট । তার আগের এক সপ্তাহ ফিল্মমেকিং এর টিউটোরিয়াল গেলা । স্ক্রীনপ্লে, স্টোরি বোর্ড, লেন্স, কম্পোজিশন, ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল,সাউন্ড, ভিডিও এডিটিং সব এক লহমায় বুঝে ফেলার চেষ্টা । উত্তেজনায় টগবগ করে লাফায় চারজন । দুর্দান্ত একটা কিছু হতে যাচ্ছে !
এই সম্বল নিয়ে এক রাতে সাদমানের ফুপুর বাড়ি কুষ্টিয়ায় চলে গেল ওরা ট্রেনে চেপে । সেই গ্রাম যাকে বলে একেবারে ‘নিভৃত পল্লী গাঁ’ , ‘আবহমান গ্রাম-বাংলা’ ! ইলেক্ট্রিসিটি পৌঁছায়নি এখনো।
ফুপু রান্নাঘরে মাটির চুলায় খড়ি ঠেলে রাঁধছেন, ফুপা লাউয়ের মাচা বাঁধছেন । ফুপাতো বোন রেখার চুলে বেণী করে দিচ্ছে রিয়াজের মা, ফুপাতো ভাই মইন সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাচ্ছে । কিংবা পুরনো দালানের ফাঁক-ফোকড় ফুঁড়ে গজিয়ে ওঠা ফার্ন, পুকুরে সাঁতরে বেড়ানো পোষা হাঁসের দল । সন্ধায় কুপি-হারিকেনের আলোআঁধারিতে রহস্যময় হয়ে ওঠা চারপাশ। কিছুই বাদ পড়ল না ওদের ক্যামেরার লেন্স থেকে ।
ভ্যান-পথে আধ ঘন্টায় চৈতা নদী । সেখানে নৌকা বাইছে টিংটিঙে এক ছেলে । নদীর বালুময় পাড়ে পা রেখে আনন্দে উজ্জ্বল হয় সাদমানের মুখ।
‘জীবনানন্দের গ্রামে আয়া পড়লাম নাকি! ’
‘আমার কিন্তু পথের পাঁচালীর কথা মনে পড়তেছে । দেখিস, আমরাও তেমন একটা কিছু বানায় ফেলব, হয়ত এই গ্রামেই !’ নোমানের চোখে ধোঁয়া ধোঁয়া স্বপ্ন ।
‘অথবা ঋত্বিক ঘটকের তিতাস একটি নদীর নাম !’ যোগ করে জাবের ।
এবার রনি মুখ খোলে ওদের বাস্তবের মাটিতে ফেলে দিতে। ‘দেখ, গ্রাম নিয়া আমরা তেমন রিয়েলিস্টিক ফিল্ম বানাইতে পারব না । অত গভীরে ঢুকতে পারব না । গ্রামে আমরা কেউই থাকি নাই কোনদিন ! শহরের ইট-কাঠ-পাথর নিয়াই আমাদের বানাইতে হবে । নাগরিক জীবন নিয়া এমন কিছু বানাব যা আগে কেউ বানায় নাই ! আমরা পথের পাঁচালী না বানায়া বরং ‘হাইওয়ে স্টোরিজ’ বানাব ! প্রান্তিক মানুষের কথা বলতে চাইলে বস্তিবাসীদের নিয়ে ফিল্ম বানাব! ’
সিনেমা বানালে কোন অভিনেতা-অভিনেত্রী নয়, সাধারণ মানুষদেরই কাস্ট করা হবে এমন পরিকল্পনাও করে ফেলল ওরা। ক’দিনে গ্রামের প্রায় অর্ধেক লোককে সিনেমায় অভিনয় করতে রাজি করিয়ে ফেলল। লোকেশন-কাস্টিং সব কিছুর বন্দোবস্ত করে ঢাকায় ফেরার পর সেই বিশাল ফুটেজের এডিটিং চলল । প্রথম দিন কয়েক উত্তেজনা নেভে না ! নিজেদের কাজে নিজেরাই মুগ্ধ! কিন্তু সময় যায় আর উৎসাহ ফিকে হয়ে আসে । ত্রুটিগুলো চোখে আঙুল দিয়ে নিজেদের দেখিয়ে বলে, ‘বড়ই কাঁচা কাজ,কিস্যু হয় নাই!’ ।
ওরা আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে। এবার ‘ওয়েসিস অব ঢাকা’ সোনারগাঁও হোটেলের ঝকঝকে দালানের পাশেই ‘গারবেজ অব ঢাকা’ কাওরান বাজারের আবর্জনাময় কাঁচা বাজারের কন্ট্রাস্ট নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি বানানোর চেষ্টা চলে । তেজগাঁওয়ের বস্তিতে ঢুঁ মেরে চলতে থাকে গল্প খোঁজাখুঁজি । এভাবেই জোড়াতালি দিয়ে ওরা কিছু শর্টফিল্ম দাঁড় করিয়ে ফেলে। বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে নিজেদের আনাড়ি কাজ পাঠাতে থাকে । কিন্তু সাড়া মেলে না । টাকার অভাবে কাজগুলো আধখেঁচড়া হয়ে পড়ে থাকে । তবু ওরা হাল ছাড়ে না, কারণ ওদের হাতে তখনো অফুরন্ত সময়, তখনো টাকা-কড়ি,ঘর-সংসার নিয়ে ওরা ভাবতে বসেনি। তখনো ওরা আপাদমস্তক সিনেমাপ্রেমী, চব্বিশঘন্টাব্যাপী ওদের একনিষ্ঠতা। তাই নিশ্চিন্তমনে ওরা নীলক্ষেতে সিনেমা বিষয়ক পুরনো বই খুঁজে বেড়ায়। পছন্দসই কিছু পেলে চারজনে পালা করে পড়ে। এখানে ওখানে ফিল্ম ফেস্টিভালের আয়োজনে ভলান্টিয়ার হয়। অমুক তমুক প্রডিউসার-ডিরেক্টরের সাথে দেখা করে,সাক্ষাৎকার নিয়ে বেড়ায়। সিনেমা পত্রিকায় লেখা পাঠায়। এই ওই সেমিনারে যায় । সুযোগ পেলে রনি গলায় আবেগ মিশিয়ে আবৃত্তির ঢঙে বক্তৃতা করে, ‘এদেশে প্রকৃত শিল্পীরা কদর পায় না। প্রযোজকদের কাছে পরিচালকদের হাত-পা বাঁধা । কয়েকটি টিভি চ্যানেলের পৃষ্ঠপোষকতায় দুই’তিন ঘন্টার নাটককে সিনেমা বলে চালানো হচ্ছে !’ রনির বক্তৃতা শেষে ওরা জোরে জোরে হাততালি দেয়। ফেসবুকে ঝড় তোলে, ‘কম বাজেটে সিনেমা বানাতে ডিজিটাল পদ্ধতি হতে পারত আমাদের জন্য একটি উপযোগী মাধ্যম। কিন্তু ডিজিটাল চলচ্চিত্রের জন্য প্রপার ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ব্যবস্থা নেই । টেকনোলজিক্যাল সাপোর্ট নেই । আমাদের এফডিসি এই যুগেও প্রাগৈতিহাসিক চেহারা নিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। আমাদের চলচ্চিত্র আন্দোলন আরও জোরদার হওয়া প্রয়োজন…’ ।
কিন্তু উল্লেখযোগ্য কিছু হয় না । শুধু একবার ওদের বানানো একটা শর্টফিল্ম কয়েকজন সিনেমাক্রিটিকের লেখায় জায়গা পায় ‘এই চার তরুণের কাজ আশাজাগানিয়া,সম্ভাবনাময়…’ । ওরা স্বপ্ন-স্বপ্ন ঘোরে ঘুরে বেড়ায়, জমিন থেকে কয়েক ফুট ওপরে ।

লাঞ্চ সেরে সেলফোনে ফেসবুক খুলে বসেছে নোমান। একটা অনলাইন নিউজ পোর্টালে আব্বাস কিয়োরোস্তামির সাক্ষাতকারের অনুবাদ । ডেস্কের ওপর মার্কেজের ‘গল্প কিভাবে হয় – চিত্রনাট্য বিষয়ক কর্মশালা’ । অফিসে আজ কাজের আমেজ নেই । সন্ধ্যায় র‍্যাডিসনে ইয়ারএন্ড পার্টি । মিটিংরুমে অলস আড্ডা দিচ্ছে বেশিরভাগই । কিছু জরুরী মেইলের উত্তর দেওয়া ছাড়া আর কোন কাজে কেউ হাত দিচ্ছে না । এই অবসরে কোলিগদের চোখের আড়ালে নিজের ফিল্মমেকার সত্তাকে ঝালিয়ে নিচ্ছে নোমান । অফিসের কাজগুলো বেশ গুছিয়ে এনেছে । শিগগিরই অ্যানুয়াল লিভের জন্য অ্যাপ্লাই করতে চায় । ব্যস্ত দিনগুলো থেকে একটুখানি রেহাই দরকার। নিজের সাথে বোঝাপড়াটাও জরুরী হয়ে পড়েছে । সাদমান টরেন্টো থেকে ফিরেই পঞ্চগড়ের এক প্রত্যন্ত গ্রামে চলে গেছে তার নতুন ছবির শ্যুটিংয়ে । ওকে শ্যুটিং দেখার আমন্ত্রণ জানিয়ে গেছে ।
পারফিউমের আবেশ ছড়াতে ছড়াতে ওর সামনে এসে দাঁড়ায় কোলিগ সুমায়রা । সন্ধ্যার পার্টির ছুতোয় সে বেশ সেজেছ আজ ।
‘হ্যালো, হোয়াট আর ইউ আপ টু ?’
‘নাথিং মাচ…টেক আ সিট ।’ পাশের খালি চেয়ারটা এগিয়ে দেয় নোমান।
‘হোয়াট বুক আর ইউ রিডিং ?’
মার্কেজের বইটা হাতে নেয় সুমায়রা ।
‘চিত্রনাট্য ! সো ইজ হি আ ফিল্মমেকার ?’
‘নো, নো…হি ইজ আ নোবেল লরিয়েট রাইটার !’
‘ওহ, আই সি ! সো হোয়াই আর ইউ রিডিং ইট ?’
‘আই হ্যাভ গ্রেট প্যাশন ফর ফিল্মমেকিং ।’
‘ওহ রিয়েলি ! দেন মেক আ রোম্যান্টিক কমেডি অর সায়েন্স ফিকশন । অর আ ফিল্ম অন ক্ল্যাসিক রোম্যান্স! আই জাস্ট লাভ নিকোলাস স্পারক রোম্যান্টিক ম্যুভি কালেকশন !’
নোমানের চোখে আর ভ্রুতে একটা বাঁকা হাসি খেলে যায় । নিকোলাস স্পার্কের বেস্টসেলার হওয়া সস্তা প্রেম কাহিনী নিয়ে বানানো সস্তা সব সিনেমার ভক্তের সাথে সিনেমা নিয়ে কথা বলতে তার বাঁধে ,তা সুমায়রা যতই সুন্দরী হোক!
পুরো ফ্লোরে তোড়জোর পড়ে গেছে । পার্টির জন্য বেরুচ্ছে সবাই । মেয়েরা ফ্রেশরুমে চল গেছে মেকআপ টাচআপ করতে । ছেলেরা টাই বাঁধছে , গায়ে ব্লেজার চড়াচ্ছে । নানা রকম পারফিউমের ককটেলে বাতাস ভারি । নোমানের ল্যান্ড ফোনটা বেজে ওঠে। এইচআর থেকে একজন জানায়, ‘কংগ্রাচুলেশন্স ! দিস ইভনিং ইউ আর গেটিং দ্য মোস্ট আউটস্ট্যান্ডিং পারফর্মার অ্যাওয়ার্ড!’
আনন্দে আর আত্মবিশ্বাসে নোমানের মুখটা জ্বলজ্বল করতে থাকে। এরকম একটা সংবাদের জন্য গত তিনবছর অপেক্ষা করেছে সে। অবশেষে মিলছে স্বীকৃতি ! আগেই কাউকে জানায় না ও । কিন্তু নিজের খুশি চেপে রাখতেও পারে না ।

ফর্মাল স্পিচ, অ্যাওয়ার্ড গিভিং আর বুফে ডিনারের পর এখন চলছে ড্রিংক পার্টি । চারপাশের জাঁকজমক নোমানের চোখ ধাঁধিয়ে দেয় । খুব উৎসাহে হুইস্কিতে চুমুক দেয় সে। অ্যালকোহল ওকে হালকা বানিয়ে দিয়ে হাওয়ায় ভাসিয়ে নিয়ে বেড়ায় । অভিনন্দন জানাচ্ছে সবাই । কেউ কেউ পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে, ট্রিটের আবদার করছে। অফিসের চেনা মেয়েগুলো মেক-আপে আর লেসের শাড়িতে এখন ‘সিজলিং হট’! তাদের চাহনিতে আগ্রহ ঠিকরে বেরোয়। নোমানের নিজেকে খুব সুখী, সফল আর পরিতৃপ্ত মনে হয় । সে এখন হেলাফেলার মানুষ নয় । এভাবেই নিজের গায়ের নিম্নমধ্যবিত্ত গন্ধটাকে ধুয়ে ফেলতে চায় , উচ্চবিত্তের নামফলক শরীরে খোদাই করে নিতে চায়। হাই-সোসাইটি ইজ সেইং ‘হাই’ !
লাইন ম্যানেজার কাছে এসে আস্তে করে বললেন, ‘নেক্সট উইক ইউ আর গোয়িং টু সিঙ্গাপুর অন আ ট্রেনিং ! কংগ্রাচুলেশন্স, ম্যান !’

বিছানা থেকে সিনেমার বইগুলো সরিয়ে ফেলেছে নোমান। সিঙ্গাপুরে যাওয়ার আগে প্রচুর হোমওয়ার্ক করা দরকার। ওর বিছানা এখন ঢাউস সব ফাইলের দখলে । রাত একটার দিকে মোবাইলটা বেজে ওঠে। সাদমানের গলা।
‘কি রে, আসবি না শ্যুটিংয়ে ?’
‘না রে, এবার হচ্ছে না! সিঙ্গাপুর যাচ্ছি ট্রেনিংয়ে!’
‘অ্যানুয়াল লিভ ?’
‘পাচ্ছি না।’
‘ওহ ! তা যা তাইলে…আমি ভাবছিলাম তুই আবার ফিল্মে ইন্টারেস্টেড হইছিস ।’
‘তা তো আছিই…কিন্তু দেখ, তিন বছর ইনভেস্ট করে আমি এখন একটা পজিশনে আসছি ! হুট করে সব ছেড়েছুড়ে আসি কেমনে ?’
‘হুঁ…!’
‘ভাবতেছি আরও কিছুদিন চাকরি করি, একটা ব্যাংক ব্যালান্স হোক। তখন নাহয় রিস্ক নেয়া যাবে !’
পঞ্চগড়ের প্রত্যন্ত গ্রামের দূর্বল নেটওয়ার্কে কলটা কেটে যায় । অনার্স পাশের পরপরই ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে একটা কন্ট্রাকচুয়াল চাকরি পেয়েছিল নোমান। বন্ধুকে সিনেমা থেকে দূরে সরতে দেবে না বলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা সাদমান সরিয়ে রেখেছিল। পরে নোমান জানতে পেরে ক্ষেপে গিয়ে এলোপাথাড়ি কিল-ঘুষি মেরেছিল সাদমানের মুখে। তার জের ধরেই দুই বন্ধুতে যোগাযোগ ছিল না মেলা দিন।
নোমানের চোখ ঘুরেফিরে আটকে যায় শেলফে রাখা সত্যজিতের ‘বিষয় চলচ্চিত্র’ বইটায় । বহুবার পড়েছে আগে, সত্যজিতের মত অমরতা পাবার আশায়। এতবার পড়ার কারণে মাঝেমাঝে মনে হয় বইটা আসলে ওর নিজেরই লেখা! আজ আবার সেটা পড়তে ইচ্ছা করে। কিন্তু খাটে তখনো ঢাউস একটা ফাইল পড়ে আছে যেটাকে একবারও খুলে দেখা হয় নি। রশি টানাটানি খেলার মত ওর দুইপ্রান্ত ধরে টানে ওর নিজেরই দ্বিধাবিভক্ত মন ।

১,৭৫৮ বার দেখা হয়েছে

১১ টি মন্তব্য : “টাগ অব ওয়্যার”

  1. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    বাহ! দারুণ লাগল! :thumbup:
    বাস্তব জীবনে আমরা বেশিরভাগই নোমানের মতন রশি টানাটানিতে ব্যস্ত। সাদমান হতে পেরেছে হাতে গোনা কয়েকজন... 🙁


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  2. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    গল্প হলে ট্যাগে গল্প সিলেক্ট করে দিও ব্লগর ব্লগর বাদ দিয়ে।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  3. তারেক (৯৪ - ০০)

    অসম্ভব ভাল লাগলো গল্পটা পড়ে। আমি জানি না গল্পের খুঁটিনাটি তুমি কোথা থেকে নিয়েছ, কিন্তু জীবন আসলে এরকমই। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্বপ্ন, ফিল্ম সোসাইটির উন্মাতাল দিন, পত্রিকায় লেখালেখির জন্যে ঘুরাঘুরি, একুশে হলের আমার ছোট্ট বেডের পাশের দেয়াল জুড়ে সত্যজিৎ ...। হঠাৎ করে সব কিছু কিরকম হুড়মুড় করে সামনে চলে এলো।
    তোমার লেখা অনেক পরিণত লাগলো, আরও অনেক অনেক লিখতে থাকো। আমি এই ফাঁকে তোমার আগের গল্প গুলোও পড়ে ফেলি। 🙂


    www.tareqnurulhasan.com
    www.boidweep.com

    জবাব দিন
  4. ইশহাদ (১৯৯৯-২০০৫)

    :thumbup: ভালো লাগল!

    [ সমস্ত চরিত্র কাল্পনিক টাইপের ডিসক্লেইমার বাদ গেছে কি?
    আমি আবার আসলেই একজন 'কেমিস্ট্রির রনি' কে চিনি! ]



     

    এমন মানব জনম, আর কি হবে? মন যা কর, ত্বরায় কর এ ভবে...

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।