রক্ত

অন্ধকার ঘরটার স্যাঁতসেঁতে বিছানায় শুয়ে কোঁকাতে কোঁকাতে বিড়ি ফোঁকে জুন্নুন মিয়া । এ মুহূর্তে তামাকের গন্ধকে দমিয়ে দিয়ে বাতাসে পোলাও-মাংসের গন্ধ । মেয়ে আর নাতনী আসছে শহর থেকে । জুন্নুন মিয়ার স্ত্রী সালেহা বেগম মরচে ধরা নড়বড়ে শরীর নিয়েই রান্নাবান্না আর ঘরদোর গোছগাছের তদারকিতে নেমে গেছে । জুন্নুন মিয়াকে অ্যান্টাসিড এগিয়ে দেয়া,পান-সুপারি পিষে দেয়া এমনকি ঝগড়া করারও ফুরসত নেই তার। কাজের লোকের আকাল পড়েছে এই গাঁয়েও। দক্ষিণপাড়ার ফিরোজাকে বলে কয়ে ধরে আনা হয়েছে এক বেলার জন্য। মেয়েটাকে ঘরদোর ঝাড়পোঁছের কাজে লাগিয়ে দিয়ে সালেহা বেগম এখন ধুলোপড়া চিনামাটির থালা-বাসন বের করছে কাঁচের আলমারির উঁচু তাকটা থেকে। আমের মৌসুম শুরু হয়নি। মুকুলেরা ফুটি ফুটি করছে। বাদ বাকি গাছগুলোকে টেক্কা দিয়ে গোয়ালের পাশের ঢ্যাঙা গাছটায় কিছু আম ধরেছে আগেভাগেই। কিন্তু সব ক’টাই নাগালের বাইরে। আম পাড়ার জন্য জলিলকে খবর দেয়া হয়েছে কিন্তু সে ব্যাটার কোন হদিস নেই।

ফিরোজা জুন্নুন মিয়ার ঘর ঝাড়তে এসে দেখে সারাটা ধোঁয়া ধোঁয়া ।

‘ও নানা, এত বিড়ি খান কেন ? নাড়িভুড়ি তো সব পইচা যাইব !’

‘যাউক ! পচারই তো সময় হইছে ! বাঁচপো আর কয়দিন !’

ফিরোজা কোমর দুলিয়ে কাঁচের চুড়ি রিনিঝিনি বাজিয়ে ঝুল ঝাড়তে শুরু করলে জুন্নুন মিয়াকে গল্প করার মেজাজে পায় । এ এক আজব মেয়ে, কক্ষনো বেজার হয় না । শত গালিগালাজেও মুখের হাসি সরে না । লোকে বলে বেহায়া ছেমড়ি । কিন্তু ও আশেপাশে থাকলে ফূর্তির হাওয়া ঘুরপাক খায়।

‘তা ফিরোজা, তুই ভাল আছিস রে ?’

‘আছি নানা ।’
‘তোর সোয়ামীর কি খবর রে ?’

‘ওই ভাতারের সংসার আর করুম না, নানা ! ঢাকা যামু, গার্মেন্টসের কাম নিমু ।’

‘আরে ঢাকা গিয়া কি কইরবি ! গার্মেন্টসে আগুন ধরে, ধইসা পড়ে । বেতন দেয় না ঠিকমতন । অর চাইতে এই বাড়িত থাক । তর নানী বুড়া হইছে, কাজ-কাম করবার পারে না।’

ফিরোজা হাসে ।

‘বেতন দিবেন তো আমারে ?’

জুন্নুন মিয়ার মন তরল হয়, রসিকতার বুদবুদ জাগে ।

‘আরে বেতন কি ! লাল শাড়ি কিইন্যা দিমু, সাবান-স্নো-পাউডার দিমু! সাইজা-গুইজা কাজ করবি। তর নানী তো বুড়ি হইছে, তুই-ই এই বাড়ির গিন্নীর মতন থাকপি ! ক্যান, আমারে পছন্দ হয় না ?’  দেয়ালে টাঙানো তার যুবক বয়সের ছবিটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে, ‘দেখ জোয়ানকালে কেমন সুন্দর আছিলাম !’

ফিরোজা এবার হেসে গড়িয়ে পড়ে। তার কলকল হাসির ঢেউ সালেহা বেগমের কানে ধাক্কা দিলে চিনামাটির প্লেট হাতেই সে জুন্নুন মিয়ার ঘরে চলে আসে।

‘অই ছেমড়ি, এত হাসি কিসের ! শরমও নাই তর ! এইটুক কাজ করলি এতক্ষণে ! তর হাসি দেখনের জইন্য ডাইকা আনছি নাকি! যাহ, বারান্দা ঝাড়তে যা এক্ষনি !’

ফিরোজাকে সরিয়ে দিয়ে সালেহা বেগম জুন্নুন মিয়ার ওপর চড়াও হয়,

‘বুড়ার ভিমরতি ধরছে গো ! বাপের তিন বউ আছিল না ! তারও এখন বিয়া বসার শখ হইছে ! ছেমড়ি দেখলে আর হুঁশ থাকে না বুড়ার !’

বুড়া বয়সেও মেয়েমানুষের হিংসা আর সন্দেহের আগুন নেভে না ! জুন্নুন মিয়া হাসে মনে মনে । সালেহার কথার উসকানিতে পুরনো দিনের স্মৃতি ঘাঁটতে বসে । আহা, কি দাপুটে লোক ছিলেন বাপজান ! তিন তিনটা বিবি ছিল । স্বামীর ভয়ে তিনজনই থাকত তটস্থ! মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পঞ্চায়েতগিরি করে গেছেন , টানা ছত্রিশটা বছর । বড় শৌখিন মানুষ ছিলেন । বাড়ির ছাদে তার পোষা পায়রার দল লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে দাপিয়ে বেড়াত! কমলগঞ্জ থেকে আনিয়েছিলেন ঘোড়া । তবে বালক জুন্নুন মিয়ার কাছে সবচেয়ে বিস্ময়ের ছিল বিশাল খাঁচায় বন্দি ময়ূরটা। কি তার পেখমের বাহার ! সেই ময়ূরের পালক এ বাড়ির ফুলদানিতে এখনো আছে। আহা,সেই সব দিন যেন নিমেষে মিলিয়ে গেছে! শরীকদের ভাগাভাগিতে পুরনো বাড়িটা ছিন্নভিন্ন ! জুন্নুন মিয়া অবশ্য বাপের সম্পত্তির কানাকড়িও পায়নি। বাপের অবাধ্য ছিল, আর তার ওপর সৎমায়েদের কানপড়া ! তবে সম্পত্তি না জুটলেও বাপের মত গাঁয়ের মাথা হওয়ার খায়েশ ছিল তার। পেনশনের টাকা ভেঙে দু’বার দাঁড়িয়েছিল চেয়ারম্যান ইলেকশনে। দেদারসে ঢেলেছে টাকা । বিলিয়েছে বাক্স বাক্স বিড়ি-সিগারেট, বস্তা বস্তা মুড়ি-মুড়কি, ধামা ধামা খোরমা-মুরলী । কিন্তু দু’বারই গো-হারা ! হারবে না কেন, নিজের বংশের ভেতরটায় এত ঘুণ ধরলে বাহিরটা ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়তে কতক্ষণ !

জুন্নুন মিয়ার ভাবনায় মেয়ে সাবেরা আর নাতনী রিয়ানার কণ্ঠস্বর ঢুকে পড়ে। ঘোর কেটে যায়। ‘আইসা পড়ছে !’ বিছানা থেকে উঠে বসে চোখে চশমা লাগায় জুন্নুন মিয়া। দরজায় মা-মেয়ে ।

‘কে ? রিয়ানা আপুমণি নাকি !’ জুন্নুন মিয়ার কণ্ঠ থেকে ছেলেমানুষী  উচ্ছ্বাস ঝরতে থাকে।

সাবেরা ঘরে পা রেখেই পুরো ঘরটা একবার জরিপ করে । তার ভ্রু কুঁচকে যায়।

‘আব্বা, ঘরটাকে এমন দোযখ বানায় রাখছেন কেন! জানালাটাও তো খোলেন নাই ! বিড়ি খাওয়া আর বাদ দিলেন না ! বিড়ির আগুন দিয়া বিছানার চাদর তো ঝাঁজরা করে ফেলছেন! হজ্জ করে আসছেন, এখন এইসব বাদ দেওয়া উচিত !’

জুন্নুন মিয়া মেয়ের কথা কানে তোলে না । বরং এটা ওটা জিজ্ঞেস করে নাতনীর সাথে আলাপ জমানোর চেষ্টা করে।

‘আমার নাত-জামাই কবে দেখব, নাতনী?’

রিয়ানা সাবেরার মতই ভ্রু কুঁচকে বলে,

‘কেন ? আমাকে দেখেও আপনার শখ মেটেনি ?’

‘কেন,কারও সাথে নাতনীর ভাব-ভালবাসা হয় নাই ?’

জুন্নুন মিয়ার কথা না শোনার ভাণ করে গভীর মনযোগে মোবাইলের স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে থাকে রিয়ানা ।

জুন্নুন মিয়া ভেবেছিল প্রেম-ভালবাসা নিয়ে রসিকতা করলে নাতনী সহজ হবে, মন খুলে দু’টো কথা বলবে । কিন্তু নাহ,জমে না । সুর-তাল মেলে না ! কত বড় হয়ে গেছে মেয়েটা । মনে হয় অচেনা কোন শহুরে মেয়ে, যে কিনা মেহমান হয়ে এসেছে এক বেলার দাওয়াতে । অথচ এই ঘরটাই তো ছিল রিয়ানার আঁতুড় ঘর! ছোটবেলায় নানাবাড়ি আসার জন্য মেয়েটা বায়না ধরত হরদম। প্রতিবার পূজার ছুটিতে নানার মোটরসাইকেলের পেছনে চড়ে ঘুরত মেলায় মেলায় । মাটির হাঁড়িকুঁড়ি কিনে জিলাপি আর হাওয়াই মেঠাই খেতে খেতে ফিরত ভর সন্ধ্যায়। এখন হাজার সেধেও তাকে গ্রামে আনা যায় না। গ্রামে ঘনঘন লোডশেডিং হয়,মোবাইলের নেটওয়ার্ক থাকে না, বাথরুম ভাল না,পানিতে আয়রন,এটা নেই, সেটা নেই ইত্যাদি ইত্যাদি! জুন্নুন মিয়া-সালেহা বেগম ক্রমাগত কয়েকদিন ফোন করে শত অনুরোধে ত্যক্ত-বিরক্ত করে শেষমেশ তাকে রাজি করাতে পেরেছে।

সাবেরা মেয়েকে তাড়া লাগায়,

‘চলো, কলপাড়ে চলো, হাতমুখ ধুয়ে আসি ।’

‘টিউবঅয়েলের পানিতে তো আয়রন !’

‘ফিল্টার আছে তো!’

‘ওই ব্রিটিশ আমলের ফিল্টার ?’

সত্যিই আদ্যিকালের ফিল্টার । বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসছে। ছিদ্রঅলা মাটির বড় হাঁড়িতে ইটের খোয়া আর মোটা বালি বিছিয়ে তার ওপর ঢালা হয় পানি । সে পানি চুইয়ে চুইয়ে পড়ে নিচের বালতিতে ।

জুন্নুন মিয়া হাসে ।

‘রিয়ানা, তুমি চাকরি কইরা একটা ফিল্টার কিন্যা দিও ।’

রিয়ানা এবার মায়ের দিকে তাকায়।

‘মা, তুমি একটা পিওরইট কিনে দিতে পারো না ?’

‘আরে রাখো ! তোমার নানাবাড়িতে কি সেই পরিবেশ আছে ! দুইদিনে নষ্ট করে ফেলবে এরা! আসছ একবেলার জন্য, এই ফিল্টারেই চলবে তোমার, আসো!’

সাবেরা আর রিয়ানা কলপাড়ের দিকে গেলে জুন্নুন মিয়া  এদিক ওদিক তাকিয়ে ওদের আনা মিষ্টির প্যাকেটটা আলগোছে খুলে ফেলে । অনেকক্ষণ থেকেই জুলুজুল করে তাকিয়ে ছিল এটার দিকে। কেউ দেখে ফেলার আগে একসাথে দু’টো মিষ্টি মুখে পুরে গিলে ফেলে । তিন নম্বরটা খেতে গিয়ে এক কোণা ভেঙে পড়ে যায় মেঝেতে । জুন্নুন মিয়া স্যান্ডেল দিয়ে ঘষে ঘষে অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলার চেষ্টা করলে মিষ্টির শিরায় মাখামাখি হয় মেঝে ।

 

কলপাড় থেকে ফিরে রিয়ানা বলে,

‘নানুভাই, একটা অ্যাটাচড বাথরুম করা যায় না ?’

জুন্নুন মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে । নাতি-নাতনী আর ছেলেমেয়েদের জোরাজুরিতে এই ঘর লাগোয়া একটা বাথরুম বানানোর পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু পাশের জমিটা চাচাতো ভাই জহির মিয়ার। তার সুপারি বাগানের এক হাত জমি ছাড়তেও সে নারাজ । হাতি গর্তে পড়লে পিঁপড়াও লাথি মারে ! বিপদে ফেলার সুযোগ এই বংশের কেউ ছাড়ে না !

মাস ছয়েক আগে হজ্জ্ব করে আসা জুন্নুন মিয়া এবার নাতনীকে ইসলামী বয়ান দেয়ার সুযোগ হাতছাড়া করে না।

‘তুমি কি পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়তেছ রিয়ানামণি ?’

সাবেরা এবার বাগে পায় মেয়েকে ।

‘না আব্বা, ও তো নামায-টামায পড়া সব ছেড়ে দিছে ! ভাল করে বুঝান তো আপনার নাতনীকে !’

সম্প্রতি অ্যাথিজমে দীক্ষা নেয়া রিয়ানা চুপচায় শুনে যায় নানার ওয়াজ । ভেতরে ভেতরে যুক্তির ঘুঁটি সাজাতে থাকে। কিন্তু এতদিন বাদে নানাবাড়ি এসে ঝগড়া করাটা ভাল দেখায় না ভেবে ক্ষান্ত দেয় ।

ছোট ছেলের বউ চুমকি দেড় বছর বয়সী ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘরে ঢুকলে জুম্মন মিয়ার বয়ানে ছেদ পড়ে । চুমকি বয়সে রিয়ানার বছর খানেকের বড়। পরনে রিয়ানারই একটা সালোয়ার-কামিজ, চলতি ফ্যাশনের সাথে যায় না বলে যেটাকে ও বাতিল করে দিয়েছিল । ছোট মামীর পরনে নিজের পুরনো জামা দেখে সংকোচে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে ও। মায়ের কি আক্কেল, পুরনো জামা মামীকে দিয়েছে কেন!

ছোট মামা রাজু জুয়া-গাঁজা নিয়ে পড়ে থাকে । লেখাপড়ায় মন ছিল না । সংসারেও মন নেই, নিজের একটা ছেলে জন্মানোর পরও স্বভাব শোধরাল না । শ্বশুর বাড়ি থেকে পাওয়া লাখ টাকার প্রায় পুরোটাই উড়িয়েছে ফূর্তির পেছনে । শেষে জুম্মন মিয়া নিজের সঞ্চয়ের লাখ খানেক খরচ করে গঞ্জে তুলে দিয়েছিল মুদি দোকান । প্রথম দেড়-দু’মাস ভালই চলল ব্যবসা, তারপর দোকানের মাল বেচে বেচে মদ-জুয়া-গাঁজা ।

মামাতো ভাইটা রিয়ানার দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে ফোকলা দাঁতে। মাথার চুল সরিষার তেলে চুপচুপে। কপালের নজর ফোঁটাটা ধ্যাবড়ানো। নাকে সর্দি । কিন্তু চোখ দু’টোতে ভীষণ মায়া। পিচ্চিটাকে কোলে নেবে কি নেবে না ভাবতে ভাবতে শেষমেশ কোলেই নেয় । নিজের মামাতো ভাইকে কি ঘেন্না করা সাজে ! ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ গা গুলিয়ে উঠলে নামিয়ে দেয় বিছানায়।

সাবেরা সালেহা বেগমকে বলে,

‘আম্মা, আব্বাকে মিষ্টি দেও । চুমকিকে দেও ।’

সালেহা বেগম মিষ্টির প্যাকেট খুলতে গেলে তার ক্ষীণ দৃষ্টিতেও ধরা পড়ে মেঝের একটা অংশে অজস্র পিঁপড়ার সারি।

চোর ধরার ভঙ্গিতে সে জুন্নুন মিয়ার দিকে তাকায়, ‘তুমি মিষ্টি খাইছ , না ? তা চুরি কইরাই যখন খাবা, মেঝেত ফেলছ ক্যান ?’

জুন্নুন মিয়া লজ্জা পায় । দুর্বল হাসি হেসে বলে , ‘মেয়ে তো মিষ্টি আমার জন্যই আনছে ! আমি না খাইলে খাইব কে!’

মিষ্টির প্যাকেট খুলতে না খুলতেই হাজির হয় জুন্নুন মিয়ার বড় ছেলে রাসেলের চার ছেলেমেয়ে । বাড়িতে ভাল কোন খাবারদাবার হলে ওরা পিঁপড়ার মত খবর পেয়ে যায় । তারপর সার বেঁধে সাবাড় করতে আসে । ওদের মধ্যে বড়জন রিয়ানাকে জিজ্ঞেস করে, ‘আপু, ভাল আছ ?’ বাকি তিনজন রিয়ানার দিকে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে একটু হাসে শুধু, তারপর সালেহা বেগমকে ঘিরে ধরে ।

এ বাড়িরই একটা অংশে রাসেলের বাস । জোয়ান বয়সে সে-ও ছিল বড় শৌখিন। এ বয়সে এসে সমস্ত শখ জলাঞ্জলি দিয়ে হয়েছে হাড়-কৃপণ। অভাবের সংসার । বাপ-মায়ের সাথে তেমন বনিবনা নেই, আর বউ তো শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে কথাই বলে না । কিন্তু বাচ্চাগুলো দাদা-দাদীর ন্যাওটা এবং দাদা-দাদীর খাবার-দাবারের নিয়মিত ভাগীদার ।

সবচেয়ে ছোটটা আধো আধো স্বরে সালেহা বেগমকে বলে,‘ও দাদী, আরেট্টা মিষ্টি দেও। খালি সাদাটা দিলা, কালো জাম দিবা না ?’

‘পরে খাইস, এখন যা তো, তোদের ঘরে যা !’

মিষ্টি ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় জুন্নুন মিয়া বলে, ‘রাসেলের মা, আমাকে আর দুইটা দেও তো ।’

বাপের কাণ্ড দেখে সাবেরা হাসে। ‘আম্মা, আব্বারে এখনি দুইটা মিষ্টি দেও!’ রিয়ানার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে, ‘দেখছ,বুড়া বয়সে মানুষ আবার বাচ্চা হয়ে যায় !’

 

‘আমারে রাইখা সবাই কি খায় ?’ গলায় গামছা ঝুলিয়ে ঘরে ঢোকে রাজু ।

‘বড়পা-রিয়ানা, কখন আসলা তোমরা ? রিয়ানা, ভাল আছ মা ?’ কথা বলতে বলতেই প্যাকেট থেকে দু’টো মিষ্টি তুলে নিয়ে মুখে দেয়।

সালেহা বেগম এসে ভাগিয়ে দেয় রাজুকে, ‘যাহ্‌ , গোসল সাইরা আয় আগে ! পরে কথা কইস ।’

পুরনো ন্যাকড়ায় টেবিল মুছতে মুছতে সাবেরাকে বলে, ‘রান্না হইয়া গেছে । দুপুরের খাবার দেই এখন ?’

রিয়ানা মাকে ঠ্যালা দিয়ে বলে,‘এখনি খেয়ে নিই চলো । পাঁচটার বাসে কিন্তু বাসায় ব্যাক করব । খেয়েদেয়ে রেস্ট করার সময় পাওয়া যাবে।’

ফিরোজা এসে খাবার বেড়ে দেয় । পোলাও, মুরগীর মাংস, বেগুন ভাজা আর বুটের ডাল । খানিক আগে চুলার আঁচ থেকে নামিয়ে আনা গরম গরম খাবার খেতে গিয়ে হাঁসফাঁস করে সাবেরা আর রিয়ানা । মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে না । এ গাঁয়ে পল্লীবিদ্যুৎ আছে, কিন্তু দিন দুয়েক আগে ঝড়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে বেশ কিছু বিদ্যুতের খুঁটি । আরও দিন তিনেক না গেলে কর্তাব্যক্তিদের টনক নড়বে না,বিদ্যুতেরও দেখা মিলবে না । ফিরোজা হাতপাখা এনে বাতাস করতে থাকে । রিয়ানার দিকে জোরে জোরে পাখা চালিয়ে বলে, ‘আপু, আমারে ঢাকা নিয়া যাবা ?’

‘তুই ঢাকা গিয়া কি করবি ?’ জিজ্ঞেস করে সাবেরা ।

‘গার্মেন্টসের কাম নিমু ।’

‘অর চাইতে আমার বাসায় থাক । আমার বাসায় তেমন কাজ নাই, টুকটাক কাজ।’

সালেহা বেগম মুখ বাঁকায়,‘অর দেমাগের শেষ আছে ! কাজের বেটির কাম নাকি করব না !’ ফিরোজার হাত থেকে পাখাটা নিয়ে দুর্বল হাতে ঘোরাতে ঘোরাতে বলে,

‘যা, রান্নাঘর থাইকা হাঁড়ি-পাতিলগুলা আইনা রাখ ।’

রান্নাঘর থেকে ছুটে আসে ফিরোজা।

‘ও নানী, তোমার বড় ব্যাটার ঘরের নাতি-নাতিনেরা সব মাংস খায়া থুইছে!’

রাসেলের রান্নাঘরে বারমাস অভাব । তার ছেলে-মেয়েরা তাই সুযোগ পেলেই দাদীর হাঁড়িতে মুখ দেয় । সালেহা বেগম ক্ষেপে যায় , ‘আল্লায় এত্ত বড় জিভ দিছে এই রাক্ষসগুলার ! কতগুলান মানুষের খাওন-দাওন বাকি রইছে!’

কচি কচি মামাতো ভাইবোনগুলোর জন্য রিয়ানার মায়া হয়।ওর পাতে এখনো বড় বড় তিন টুকরা মাংস । ও খাওয়া বাদ দিয়ে আস্তে আস্তে বলে, ‘ওরা কি অত বোঝে নাকি, নাহয় কাউকে কিছু না বলে খেয়ে ফেলেছে, তাই বলে এত হইচই করার কি আছে !’

সাবেরা রিয়ানাকে থামিয়ে দিয়ে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে গলা চড়িয়ে বলে , ‘তুমি কিছু জান ? এই পঙ্গপালের  অত্যাচারে আব্বা-আম্মা শান্তিমত কিছু খাইতে পারে না । খাওয়াইতে পারে না তো এতগুলারে জন্ম দিছিল কেন ?’

 

 

 

খাওয়া-দাওয়ার পর এ ঘরটায় আর টেকা যায় না । গরম তাওয়ার মত তেতে উঠেছে।পাশের ঘরটায় আশ্রয় নেয় ওরা। জানালা খুলে দিলে হু হু হাওয়া ঢুকে পড়ে । বিছানায় গা এলিয়ে এ দিক ও দিক তাকাতে তাকাতে রিয়ানার চোখে পড়ে ফুলতোলা চাদরের ফুলের ওপর লেগে আছে মুরগীর বিষ্ঠা । ভরপেট খাওয়ার পর এ দৃশ্য দেখে ওয়াক ওয়াক করে সব উগড়ে ফেলতে চায়।

সাবেরার মেজাজ চড়ে যায়,‘আম্মা, তোমারে বিছানার চাদর বদলাইতে বলছিলাম না! এইসব গু লাগা চাদরে নাতনীরে শুইতে দিছ!’

বিব্রত সালেহা বেগম দোষটা ফিরোজার ঘাড়ে পাচার করে দেয়,‘ফিরোজা হারামজাদিরে কইছিলাম চাদরটা বদলায় দিতে । রং-ঢং করতে গিয়ে মাগীর সেইদিকে খেয়াল নাই !’

এ সবের মাঝখানে রান্নাঘর থেকে রাজুর ক্ষিপ্ত কণ্ঠস্বর শোনা যায়, ‘আমার বউ চুলার খড়ি টানছে। চাকরাণীর মত এই বাড়ির সব কাম করছে । আর আমার পোলার ভাগে এক টুকরা মাংসও পড়ে নাই!কেমন বিচার রে!’

সালেহা গিয়ে থামাতে চায় ,‘তোর ভাতিজা-ভাতিজিরাই তো খাইছে । অত চিল্লাইস না !’

রাজু এবার রাসেলকে উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ ছুঁড়তে থাকে। রিয়ানার দমবন্ধ লাগে । যেন এখান থেকে বেরোতে পারলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে। মেয়ের মনোভাব আঁচ করে সাবেরা জলিলকে রিকসা আনতে পাঠায় । যদিও মেয়েকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাতটা গ্রামেই কাটিয়ে দেবার ইচ্ছা ছিল তার ।

 

বেলা পড়ে গেছে । মা-মেয়ে উঠানে হাঁটাহাঁটি করে । সিনেমা-নাটকে গ্রাম দেখলে রিয়ানার ইচ্ছা করে সেখানে কিছুদিন কাটিয়ে আসতে। জলরঙে আঁকা ছবির মত গ্রামগুলো! সেখানে সন্ধ্যাবেলা জোনাকির নাচ দেখতে ইচ্ছা করে । সর্ষে ক্ষেতের আল ধরে হাঁটতে ইচ্ছা করে । পদ্ম ছাওয়া বিলের ধারে বসে থাকতে ইচ্ছা করে। অথচ নিজের নানাবাড়ি আসতে কত বাহানা ! এলেও কেবলই পালাই পালাই মনে হয় ।

উঠানের এক কোণে গোয়াল। এখন সেখানে দু’টো গরু ঝিমাচ্ছে। একসময় এই গোয়ালে ছ’সাতটা গরু ঠেলাঠেলি করে থাকত । একবার একটা বাছুরের ওপর খুব মায়া পড়ে গিয়েছিল রিয়ানার । যে ক’টা দিন নানাবাড়ি ছিল রোজ নিজ হাতে কচি বাঁশপাতা আর ভুষি খাওয়াত তাকে । এত দরদ দেখে নানী ওকে দিয়ে দিয়েছিল সেই বাছুরটা । মিনা কার্টুনের ভক্ত রিয়ানা সেই বাছুরটার নাম রেখেছিল লালী ।

মা-মেয়েতে পুকুরপাড়ের আম গাছটা ঘুরে আসে । এই গাছের নিচেই নাকি রিয়ানার নাড়ি পোঁতা । কিন্তু কই, এই গ্রামের প্রতি তো সে নাড়ির টান বোধ করে না!

পাশের বাড়ির জহির মিয়ার বউ ওদের দেখে এগিয়ে আসে । রিয়ানাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, ‘ও মা! মাইয়া এমন বড় হইয়া গেছে !’ তার কথার সাথে জর্দার ঘ্রাণ বেরোতে থাকে । চারপাশে ভুরভুর করে সুখী সুখী মিষ্টি গন্ধ ।

 

মুরগীর মাংস না থাকায় রাগে ভাত খায় নি রাজু । ওদের আনা দু’কেজি মিষ্টির অর্ধেক সাবাড় করে শান্ত হলে উঠানে চলে আসে । ওদের পাশে হাঁটতে হাঁটতে রিয়ানাকে জিজ্ঞেস করে,

‘মামণি,তুমি এবার স্কলারশিপ পাইছ না ?’

‘হুম…’

‘কত পাইছ ?’

‘পনের হাজার।’

‘মেলা পাইছ তো ! শোন মা, নিরুপায় হইয়া তোমারেই কই, নতুন একটা ব্যবসা খুলতেছি । টাকার দরকার । তুমি এই টাকাটা আমাকে ধার দেও কয়দিনের জন্য।’

সাবেরা ক্ষেপে যায় , ‘বাটপারির আর জায়গা পাস নাই ! এখন ভাগনীদের সাথেও চালবাজি ! লজ্জা করে না তর, মামা হয়ে ভাগনীর টাকায় নজর দেস!’

মীনা কার্টুনের সেই মুরগী চোরের মত চেহারা হয়েছে মামার । পোড়া চামড়া। খোঁচা খোঁচা দাড়ি । কোটরে সেঁধানো চোখ । অথচ এক সময় কি সুন্দর ছিল ছোট মামা ! মেয়েদের মত আয়না দেখত খুব । নিজেই নিজের নাম দিয়েছিল প্রিন্স।

রাজু নিচের দিকে তাকিয়ে পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটি খুঁড়তে থাকে । চুমকির কোল থেকে ছেলেটাকে নিয়ে হাঁটতে থাকে। তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে সাবেরার দিকে এগিয়ে এসে বলে , ‘এর মুখের দিকে চাইয়া হইলেও আমারে কিছু টাকা দেও আপা ! এইবার আর বেঈমানী করব না । ব্যবসা করব ঠিকমত , কথা দিলাম তোমারে!’

জলিল রিকসা নিয়ে চলে আসে । রিয়ানা মোবাইলে সময় দেখে বলে, ‘মা , তাড়াতাড়ি বিদায় নিয়ে নাও । নাহলে শেষ বাসটাও মিস হবে ।’

খাবার রাখার আলমারিটাতে রাতের বেঁচে যাওয়া খাবারটুকু তুলে রাখতে গিয়ে তাকের এক কোণে ঘাপটি মেরে থাকা পায়েশের বড় বাটিটা সালেহা বেগমের চোখে পড়ে ।

আফসোস করে সে ,‘হায় হায় রে, রাসেলের পোলাপাইনদের হাত থাইকা বাঁচাইতে পায়েশটা এইখানে রাখছিলাম । রিয়ানারে দিতে মনেই নাই । ঘন দুধের পায়েশ মাইয়াটা কত পছন্দ করত !’

বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে জুন্নুন মিয়া বলে,

‘নাতনিরে কেমন দেখলা ?’

‘কেমন আর দেখব ! শহরে মানুষ হইছে , আমাদের কি আর দাম দিব !’

‘মাইয়াটা কেমন পর হইয়া গেছে …নিজের রক্ত মনে হয় না…যাই হোক, সাবেরারে টাকার কথা কইছিলা ?’

‘কইছি তো ! কইলাম যে হাজার বিশেক টাকা দেও, নইলে তোমার বাপ এই বছর আবাদ করবার পারব না । না খায়া থাকন লাগব ।’

‘টাকা দিব তো ?’

‘গজগজ করল…তয় দিব মনে হয়…মাইয়ার কাছে টাকা চাইতে লজ্জা লাগে রাসেলের বাপ ।’

‘দুইটা পোলা আমার । একটাও কামে লাগল না ! কোনদিন কেউ একটা পয়সা দিবার পারল না এই বুড়া বাপরে। খালি খাইয়া গেল, নিয়া গেল !’ আবেগে জুম্মন মিয়ার গলা কাঁপে । সালেহার কপালের ভাঁজগুলো আরও গভীর হয় ।

উঠানের ও পাড়ের ঘর থেকে চুমকির কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায় । রাজু আবার বউ পেটাচ্ছে ।

 

 

 

 

 

১,৪১৯ বার দেখা হয়েছে

৮ টি মন্তব্য : “রক্ত”

  1. সাবিনা চৌধুরী (৮৩-৮৮)

    :clap: :clap:

    ওয়েলকাম ব্যাক, পিয়া! ভাল আছো আশাকরি।

    তোমার লেখাটির মাঝে স্পেসটা চোখে লাগছে, এডিট করে দিও। তোমার লেখা ভাল লাগলো খুব। আমাদের সাথেই থেকো।

    জবাব দিন
  2. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    পিয়া,
    আগে তোমার গল্প পড়েছি কি? মনে পড়ছে না। কিন্তু এই একটি গল্পেই এটা স্পষ্ট যে, গল্পের কথক তুমি বেশ পোক্তভাবেই হয়ে উঠেছ। একটি অত্যন্ত উৎকৃষ্ট গল্প পড়লাম।
    আরো আরো গল্প চাই।
    শেষ অধ্যায়টাই গল্পের আসল অংশ। কিন্তু তার আগে ছবিটাকে একটু একটু করে এঁকে যাওয়া ---- অ-অ-সাধারণ!

    জবাব দিন
  3. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    এগুলো বেশ পাকা হাতের লেখা বলেই মনে হলোঃ
    মরচে ধরা নড়বড়ে শরীর নিয়েই রান্নাবান্না আর ঘরদোর গোছগাছের তদারকিতে নেমে গেছে
    তার কলকল হাসির ঢেউ সালেহা বেগমের কানে ধাক্কা দিলে চিনামাটির প্লেট হাতেই সে জুন্নুন মিয়ার ঘরে চলে আসে।
    উঠানের ও পাড়ের ঘর থেকে চুমকির কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায় । রাজু আবার বউ পেটাচ্ছে
    গল্পের শিরোনামটাও বেশ চমৎকার হয়েছে।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।