শোধ

এই ধরুন যুগ দুয়েক আগে, এই বিস্তৃত মিরপুর বারো অঞ্চলে গা ছমছমে এক জঙ্গল ছিল। চাকলী গ্রাম থেকে কালশী- কালাপানি অঞ্চলে যেতে, হাতে লাঠি অথবা দা নিয়ে যেতে হত। তখন চাকলী গ্রামের মন্দির থেকে পূবে বেশ কিছুদূর এগোলে একটা ছোট সুন্দর জলাশয় ছিল। সেই জলাশয় এবং তার আশেপাশের গাছগুলোতে চমৎকার সংসার গুছিয়েছিল এক সাদা বক। আজ যেখানে ধুরন্ধর আট তলা বিল্ডিংটা উঠছে ঠিক সেখানে তার আদরের সন্তানরা খেলতো। বাজের ভয়ে মায়ের ডানার নিচে দৌড়ে লুকাতো। মা-বক হাসতো আর বলতো “আমি আছি না”

সেই জলাশয়ে ক্বচিৎ মাছ ধরতে আসতো জেলেরা। একবার তো ছমীর আলি আর জমীর আলী দুই ভাইয়ের সে কি ঝগড়া! ভয় পেয়ে মা-বক কে বাচ্চাগুলো বলতো “মা মানুষ কেমন?”
মা-বক বলতো “ভালোই রে। তবে অনেক বেশী ভিতু আর ঝগড়ুটে”
সারাদিন উড়াউড়ি, ছোটাছুটি, ঘোর ঘোর। এই মাছটা খেতে ভালো তো ঐ মাছটা পচা।
“সূর্যটাকে ডানা দিয়ে ঢেকে দেয়া যায় না মা”
“ধুর পাগল তাই কি হয়।”
মা তাঁদের পুর্ববর্তী বোকা বকদের উপকথা শোনাতেন। বাচ্চা বক গুলো অবাক হয়ে শুনত আর বলতো “তুমি তো আমাদের ডানার নিচে নিয়ে সূর্য ঢেকে দাও, মেঘ ঢেকে দাও, আমরা পারবোনা একদিন?” ……
মা সামনের বিস্তৃত অঞ্চলের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলতেন “আরেকটু বড় হও…”

একদিন এক রঙচঙে শার্ট আর প্যান্ট জুতো পড়া ভদ্র লোক সেই জলাশয়ে অদ্ভূত এক যন্ত্র চালিয়ে আসেন। মা-বক ভীত হয়ে বাচ্চাগুলোকে ডানার ভেতরে নেয়। পিছন থেকে ধোঁয়া বের হওয়া বিকট আওয়াজ করা সেই প্রাণীটা থেকে একটা মানুষ আর ভয়ঙ্কর দর্শন কুকুর নামে। লোকটার হাতে আবার ওটা কি? লম্বা মতন জিনিষটা চোখের কাছে নিয়ে তাঁদের দেখছে বলেই মনে হয় মা-বকের। মা-বক মানুষটাকে ভয় পায় না। কুকুরটাকে তার ভয় শুধু। না জানি ওটা কি করে, কি……………

ধুম ধুম ধুম

রাতে পল্লবীর সি ব্লকের ২১৪ নম্বর ফ্ল্যাট বাড়ির ছাদে ধুন্ধুমার পার্টি হয়েছিলো সেদিন। একটা বড় আর দুইটা ছোট সাদা বক। অনেকদিন পর নাক ডুবিয়ে খান সিদ্দিকুর রমান সাহেব ও তার বন্ধুরা। পড়ে আবার ভ্যাট ৬৯ এর বোতল খুলে পার্টিটাকে জমান ব্যাবসায়ী আবুল খায়ের। সিদ্দিক সাহেবের হাতের টিপ খুব ভালো বলে সবাই প্রশংসা করে।

সিদ্দিকুর সাহেবের অবশ্য মন একটু খারাপ। কুকুরটা দুপুর থেকে কিছুই খাচ্ছে না। কি হল কে জানে। মারা যাবে তো এভাবে চলতে থাকলে। ঐ পুকুরটার ওখানে নতুন বাড়ি তোলার সময় কুকুরটাকে যে বড় প্রয়োজন।।

কুকুরটা হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। সিদ্দিকুর সাহেবের দুই মেয়ে ছাদেই খেলছে। কুকুরটা মেয়েগুলোর দিকে লাল চোখে ধীরে ধীরে এগোয়……..

সিদ্দিকুর ভাবেন কুকুরের আর ভয় কি। ঐ খেলতে যায় বোধহয়। ভয় হল ছাদ থেকে পড়ে না যায় তার মেয়েগুলো। তার জানের টুকরা মেয়েগুলো……..

৯১৭ বার দেখা হয়েছে

১৪ টি মন্তব্য : “শোধ”

  1. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)
    সিদ্দিকুর ভাবেন কুকুরের আর ভয় কি।

    'কুকুরকে' লিখলে কি মানেটা পরিষ্কার হতো?

    আজ যেখানে ধুরন্ধর আট তলা বিল্ডিংটা উঠছে --- এ বিশেষণটা খুব পছন্দ হয়েছে।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।