ইসলামের স্বর্ণযুগ – পর্ব ৪

ইসলামের স্বর্ণযুগ – পর্ব ৪
————– ড. রমিত আজাদ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

গত পর্বে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ-জাতির প্রাচীন ধর্মবিশ্বাস ও পলিথেইজম-এর কিছু বিশ্লেষণ করেছিলাম। এই পর্বে মনোথেইজমের উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে এবং মূর্তিপূজা ও মনোথেইজমের বিরোধিতা যেই মহামানবরা করেছিলেন তাদের নিয়ে আলোচনা করা হবে।

গত পর্বে পলিথেইজম-এর কিছু ত্রুটি উল্লেখ করেছিলাম। যেমন,
পলিথেইজম পৃথিবীকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করে, এবং প্রতি ভাগের জন্য এক-একটি দেবতা নিয়োগ করে, যেমন, সমুদ্রের দেবতা, সূর্যের দেবতা, ইত্যাদি। এর শেষ হয় বিভিন্ন দেবতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়ে। বিজ্ঞানহীন একটি পৃথিবীতে, যেখানে প্রকৃতি অনিশ্চিত (unpredictable), সেখানে একঝাক দেবতাকে টেনে আনা হয় flexibility-র জন্য। যেহেতু কারো কার্যক্রমই পরিপূর্ণভাবে ভালো বা মন্দ নয়, প্রত্যেকেরই কার্যের স্বাধীনতা আছে। এই পলিথেইজম-এর উপস্থিতিতে একজন মানুষ যেই কাজই করুক অথবা না করুক তা কোন না কোন দেবতার মধ্যে ক্রোধের সঞ্চার করবেই।

গ্রীসের জিনোফেনস বলেছিলেন, human projections (এটি মনোবিজ্ঞানের এমন একটি বিষয় যে, মানুষ অন্যের দোষ ধরে বেড়ায় কিন্তু তার নিজের মধ্যেই যে ঐ দোষগুলো আছে তা খেয়াল করে না)। তিনি তাঁর পূর্বেকার কবি হোমার ও তাঁর সময়কার কবি হেসোইড প্রমুখের সমালোচনা করেন। একটি উদ্ধৃতি বলে, “মানবের মধ্যে যা কিছু ভর্ৎসনা ও তিরষ্কার যোগ্য রয়েছে যেমন চৌর্যবৃত্তি, ব্যাভিচার, প্রতারণা; ইত্যাদি সবই দেবতাদের মধ্যে রয়েছে। জিনোফেন ছিলেন সেই দেবতাদের বিরোধী মৌলিকভাবেই যাদের বর্ণনা হতো নরত্বারোপমূলক (anthropomorphic) (অর্থাৎ তাদেরকে মানবের মতই মনে করা হতো)।

পলিথেইজম যেহেতু নরাত্বরোপমূলক (anthropomorphic)তাই এখানে দেব ও দেবী দুই-ই আছে। মনোথেইজম-এ স্রষ্টা নারী বা পুরুষ নন। দার্শনিক প্লেটো গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন না। গণতন্ত্রের সাথে পলিথেইজম-এর সাদৃশ্য রয়েছে। মানবের মধ্যে যা কিছু ভর্ৎসনা ও তিরষ্কার যোগ্য রয়েছে যেমন চৌর্যবৃত্তি, ব্যাভিচার, প্রতারণা; ইত্যাদি সবই দেবতাদের মধ্যে রয়েছে। বেশীরভাগ পলিথেইজম-এর কোন পবিত্র গ্রন্থ নাই। আর যাদের আছে তাদের একাধিক ধর্মীয় গ্রন্থ আছে ফলে হারমোনিক একক কোন চিন্তা-ভাবনা তাদের অনুসারীদের মধ্যে নাই। চারটি বেদ রয়েছে, এদের মধ্যে আবার অনৈক্য রয়েছে, এরা একে অপরের সমালোচনা করে, ১৮টি উপনিষদ রয়েছে তারা পরস্পরের ও চারটি বেদের সমালোচনা করে।

মূর্তিপূজা প্রগতিকে শ্লথ করে দেয়: মূর্তিপূজায় কোন কিছুকে সীমিত করে ফেলা হয়। মানুষের চিন্তাভাবনা ও কার্যক্রমকেও সীমিত করে ফেলা হয়।
এ’ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সাকার ও নিরাকার’ প্রবন্ধ থেকে একটি উদ্ধৃতি দিচ্ছি, “টলেমির জগৎতন্ত্র আমাদের ধারণাযোগ্য। পৃথিবীকে মধ্যে রাখিয়া বদ্ধ কঠিন আকাশে জ্যোতিষ্কগণ সংকীর্ণ নিয়মে ঘুরিতেছে ইহা ঠিক মনুষ্যমনের আয়ত্তগম্য; কিন্তু অধুনা জ্যোতির্বিদ্যার বন্ধনমুক্তি হইয়াছে, সে সীমাবদ্ধ ধারণার বাহিরে অনন্ত রহস্যের মধ্যে গিয়া পড়িয়াছে বলিয়া তাহার গৌরব বাড়িয়াছে। জগৎটা যে পৃথিবীর প্রাঙ্গণমাত্র নহে, পৃথিবী যে বিশ্বজগতে ধূলিকণার অধম এই সংবাদেই আমাদের কল্পনা প্রসারিত হইয়া যায়। আমাদের উপাস্য দেবতাকেও যখন কেবলমাত্র মনুষ্যের গৃহপ্রাঙ্গণের মধ্যে বদ্ধ করিয়া না দেখি,………..।”

মিশরের ফেরাউন জনগণকে ব্যস্ত রাখার জন্য পিরামিড নির্মান করেছিলো, কোন উন্নতির জন্য নয়।

দেবতাদের তুষ্টির জন্য নরবলী দেয়ার প্রচলন সব পলিথেইস্ট প্র্যাকটিস-এই ছিলো। যেমন, মিশরে নীল নদের তুষ্টির জন্য সেখানে কুমারীদের বিসর্জন দেয়া হতো। দক্ষিণ আমেরিকায়ও দেবতাদের তুষ্টির জন্য কুমারীদের হত্যা করা হতো। পক্ষান্তরে মনোথেইজমে মানুষের জীবনের মূল্য যেকোন অবজেক্ট-এর জীবনের চাইতে বেশী।

ইতিহাস ঘাটলে যতদূর পাওয়া যায়, পলিথেইজম-এর বিরূদ্ধে প্রথম যিনি প্রতিবাদ করেছিলেন ও একেশ্বরবাদ প্রবর্তন করেছিলেন তিনি হলেন হযরত ইব্রাহিম (আ.)।

হযরত ইব্রাহিম (আ.):
সংক্ষেপে : হযরত ইব্রাহিম [আ.] (আরবি: ابراهيم, হিব্রু: אַבְרָהָם), বাইবেলের তোরাহ অনুসারে আব্রাহাম (Abraham) (আনুমানিক ১৯০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১৮৬১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে জন্ম – মৃত্যু ১৮১৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১৭১৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ), ইসলাম ধর্মের একজন গুরুত্বপূর্ণ নবী ও রাসূল। কা’বুল আহবার-এর মতে তিনি ১৭৫ বছর জীবিত ছিলেন। উনার পিতার নাম ‘আযর’। উনার পিতা অগ্নি পূজক আজর ছিল নমরুদের মন্ত্রী । উনার স্ত্রীদের নাম ‘হাজেরা’ ও ‘সারা’। উনার চার পুত্র ছিলেন: ‘ইসমাইল’ (Ismail), ‘ইসহাক’ (Isaac), ‘মাদয়ান’, ‘মাদায়েন’। মতান্তরে উনার ৬-১২জন পুত্র ছিলেন। ইসলাম ধর্মমতে, জনাব ইব্রাহিমের [আ.] উপর ২০খানা সহীফা অবতীর্ণ হয়। ইসলাম ধর্মমতে তিনিই প্রথম মিসওয়াক করেন, প্রস্রাব সেরে পানি দ্বারা পরিষ্কার হোন, খৎনা করেন, হালুয়া তৈরি করেন এবং মেহমানদারির প্রচলন করেন।

হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর জন্ম শৈশব ও কৈশোর:
ইরাকের নাসিরিয়া থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার এবং বাগদাদ থেকে ৩৯৬ কিলোমিটার দূরে ‘উর’ নামক স্থান যা প্রাচীন বাবেল শহর নামে পরিচিত। এখানে একটি বিধ্বস্ত দোতলা বাড়ি, যেখানে হযরত ইব্রাহীম আঃ প্রায় চার হাজার বছর পূর্বে জন্ম গ্রহন করেন । ১৯৬৭ সালে এক প্রত্নতাত্বিক গবেষনায় দেখা গেছে ইব্রাহীম আঃ এর সময়ে এই নগরীতে ৪০ ফুট উঁচু ১১৮০টি মন্দির ছিল। বাবেল শহরের ম্যাকফেলা গুহায় তাঁর কবর রয়েছে।

সেখানে তখন কালেডীয় (كلدانى ) জাতি বসবাস করত। তাদের একচ্ছত্র সম্রাট ছিলেন নমরূদ। যিনি তৎকালীন পৃথিবীতে অত্যন্ত উদ্ধত ও অহংকারী সম্রাট ছিলেন। ধারণা করা হয় যে, নমরূদ প্রায় চারশো বছর রাজত্ব করে এবং শেষ পর্যন্ত নিজে ‘উপাস্য’ হবার দাবী করে।

হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর পিতার নাম ছিল আযর। আজর ছিলেন নমরুদের মন্ত্রী ও প্রধান ধর্মীয় পুরোহিত। তিনি নিজের হাতে মূর্তি তৈরি করতেন। আর ঐ মূর্তিগুলোকেই সারা দেশের মানুষ দেবতা বলে মানতো। ওদের পূজা উপাসনা করতো। ছেলে জন্ম হওয়ায় বাবা আজর দারূন খুশি। ভাবেন, আমার পরে আমার এই ছেলেই হবে ধর্মীয় পুরোহিত। নিজ হাতে সে দেবতা বানাবে। সে রক্ষা করবে আমার ধর্মীয় ঐতিহ্য। মনের খুশিতে আজর তাঁর পুত্রের নাম রাখেন ইব্রাহিম। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর আবির্ভাবকালীন সময়ে কালেডীয় সমাজ শিক্ষা ও সভ্যতায় অতি উন্নত ছিল। এমনকি তারা সৌরজগত নিয়েও গবেষণা করত। কিন্তু পূজার রোগে আক্রান্ত হয়ে তারা বিভিন্ন মূর্তি ও তারকা সমূহের পূজা করত।

প্রচলিত আছে যে, নমরূদকে জ্যোতিষীগণ জানিয়েছিল যে, অচিরেই একটি পুত্র সন্তান জন্মলাভ করবে, যে তার রাজ্য হারানোর কারণ হবে, তখন তিনি নবজাতক সকল পুত্র সন্তানকে হত্যা করার নির্দেশ জারি করেন। ইবরাহীম (আঃ) মা তখন একটি পাহাড়ের গোপন গুহায় লুকিয়ে ইবরাহীমকে প্রসব করেন এবং ইবরাহীম একাকী সেখানে বড় হন। ইবরাহীমের এক আঙ্গুল দিয়ে দুধ বের হ’ত, এক আঙ্গুল দিয়ে মধু বের হ’ত ও এক আঙ্গুল দিয়ে পানি বের হ’ত। এভাবে তিনি সেখানে তিন বছর কাটান। তারপর তিনি সেখান থেকে বের হয়ে এসে মাকে বলেন, আমার প্রভু কে? মা বললেন, নমরূদ। তিনি বললেন, নমরূদের প্রভু কে? তখন মা তাকে চড় মারলেন এবং তিনি বুঝলেন এটিই হ’ল সেই ছেলে, যার সম্পর্কে বাদশাহ নমরূদ আগেই স্বপ্ন দেখেছেন। (মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক্ব (৮৫-১৫০ হিঃ) বর্ণিত অলৌকিক ঘটনা)

ইব্রাহিম (আঃ) দিনে দিনে বড় হতে থাকেন। ইব্রাহীম (আঃ) অগাধ জ্ঞান, বুদ্ধি আর দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হয়ে বড় হতে থাকেন। কিশোর বয়স থেকেই ইব্রাহিম সব কিছু যুক্তি দিয়ে বুঝার চেষ্টা করতে থাকেন। এটাই রিজনিং বা লজিকাল থিকিং।

চিন্তা করেন ইব্রাহিম (আঃ) :
ইব্রাহিম ভাবেন, নিজেদের হাতে মূর্তি বানিয়ে সেগুলোকে খোদা মানা তো বিরাট বোকামি। যারা কারো উপকার করতে পারে না, কারো অপকারও করতে পারে না, তারা খোদা হয় কেমন করে? কেউ যদি ঐ দেবতাগুলির ক্ষতি করতে চায়, তা থেকেও দেবতাগুলি আত্মরক্ষা করতে পারেনা। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর পিতা ও সমাজের লোকেরা বিরাট ভুলের মধ্যে রয়েছে। তিনি তাঁর বাবাকে বলেন –

“বাবা, আপনি কি মূর্তিকে খোদা মানেন? আমিতো দেখছি, আপনি এবং আপনার জাতির লোকেরা পরিস্কার ভুলের মধ্যে আছেন।” (সূরা আল আনাম, আয়াত ৭৪)

‘তুমি এই কিতাবে ইবরাহীমের কথা বর্ণনা কর। নিশ্চয়ই তিনি ছিলেন সত্যবাদী ও নবী’(১৯/৪১)। ‘যখন তিনি তার পিতাকে বললেন, হে আমার পিতা! তুমি তার পূজা কেন কর, যে শোনে না, দেখে না এবং তোমার কোন উপকারে আসে না?(৪২)। ‘হে আমার পিতা! আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে, যা তোমার কাছে আসেনি। অতএব তুমি আমার অনুসরণ কর। আমি তোমাকে সরল পথ দেখাব’(৪৩)। ‘হে আমার পিতা! শয়তানের পূজা করো না। নিশ্চয়ই শয়তান দয়াময়ের অবাধ্য’(৪৪)। ‘হে আমার পিতা! আমি আশংকা করছি যে, দয়াময়ের একটি আযাব তোমাকে স্পর্শ করবে, অতঃপর তুমি শয়তানের বন্ধু হয়ে যাবে’ (মারিয়াম ১৯/৪১-৪৫)।

কিন্তু ইবরাহীমের এই প্রাণভরা আবেদন পিতা আযরের হৃদয় স্পর্শ করল না। রাষ্ট্রের প্রধান পুরোহিত এবং সম্রাটের মন্ত্রী ও প্রিয়পাত্র হওয়ায় সম্ভবত: বিষয়টি তার প্রেস্টিজ ইস্যু হয়। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘যখন তাকে বলা হয়, আল্লাহকে ভয় কর, তখন তার সম্মান তাকে পাপে স্ফীত করে। অতএব তার জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট। আর নিঃসন্দেহে তা হ’ল নিকৃষ্টতম ঠিকানা’ (বাক্বারাহ ২/২০৬)। বস্ত্ততঃ অহংকারীদের চরিত্র সর্বত্র ও সর্বযুগে প্রায় একই হয়ে থাকে।

পিতার জবাব :
পুত্রের আকুতিপূর্ণ দাওয়াতের উত্তরে পিতা বলল, ‘হে ইবরাহীম! তুমি কি আমার উপাস্যদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ? যদি তুমি বিরত না হও, তবে আমি অবশ্যই পাথর মেরে তোমার মাথা চূর্ণ করে দেব। তুমি আমার সম্মুখ হ’তে চিরতরের জন্য দূর হয়ে যাও’ (মারিয়াম ১৯/৪৬)।

ইবরাহীম (আঃ)-এর জবাব:
পিতার এই কঠোর ধমকি শুনে পুত্র ইবরাহীম বললেন,
‘তোমার উপরে শান্তি বর্ষিত হৌক! আমি আমার পালনকর্তার নিকটে তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। নিশ্চয়ই তিনি আমার প্রতি মেহেরবান’। ‘আমি পরিত্যাগ করছি তোমাদেরকে এবং আল্লাহ ব্যতীত যাদের তোমরা পূজা কর তাদেরকে। আমি আমার পালনকর্তাকে আহবান করব। আশা করি আমার পালনকর্তাকে আহবান করে আমি বঞ্চিত হব না’ (মারিয়াম ১৯/৪৭-৪৮)।

পিতাকে ও নিজ সম্প্রদায়কে একত্রে দাওয়াত:
হযরত ইব্রাহিম (আঃ) দেখলেন যে, তাঁর জাতির লোকেরা চন্দ্র-সূর্য, নক্ষত্রেরও পূজা করছে। তারা মনে করলো, এগুলো তো শক্তিশালী দেবতা। কিন্তু এরা যে খোদা হতে পারেনা, তা তিনি যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন। রাত্রি বেলা নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে ইব্রাহিম বলেন- তোমরা বলছো এ আমার প্রভু, অতঃপর নক্ষত্র যখন ডুবে গেলো, তখন তিনি বলে দিলেন, অস্তমিত হওয়া জিনিসকে আমি পছন্দ করিনা। এরপর উজ্জ্বল চাঁদ উদয় হলো। তিনি বললেন- তবে এই হবে প্রভু, কিন্তু যখন চাঁদও ডুবে গেলো, তিনি তখন বললেন- এতো খোদা হতে পারেনা। আসল প্রভু মহাবিশ্বের মালিক নিজেই যদি আমাকে পথ না দেখান, তবে আমিতো বিপথগামীদের দলভুক্ত হয়ে পড়বো।

অতপর সকাল হলে পুবাকাশে ঝলমল করে সূর্য উঠলো। তবে তো এই হবে খোদা। কারন এতো সবার বড়। তারপর সন্ধ্যায় যখন সূর্য ডুবে গেলো, তখন তিনি তাঁর কওমকে সম্বোধন করে বললেন- তোমরা যাদেরকে মহান সৃষ্টিকর্তার অংশীদার ভাবছো, আমি তাঁদের সকলের দিক থেকে মুখ ফেরালাম। আমি সেই মহান প্রভুর নিকট আত্মসমর্পণ করছি, যিনি আসমান আর জমিনকে সৃষ্টি করেছেন। আমি তাঁর সাথে কাউকেও অংশীদার বানাবোনা।

পবিত্র কোরআনে আছে,
‘আর তাদেরকে ইবরাহীমের বৃত্তান্ত শুনিয়ে দিন’(শো‘আরা ২৬/৬৯)। ‘যখন সে স্বীয় পিতা ও সম্প্রদায়কে ডেকে বলল, তোমরা কিসের পূজা কর’?(৭০)। তারা বলল, আমরা প্রতিমার পূজা করি এবং সর্বদা এদেরকেই নিষ্ঠার সাথে আঁকড়ে থাকি’(৭১)। ‘সে বলল, তোমরা যখন আহবান কর, তখন তারা শোনে কি’?(৭২)। ‘অথবা তারা তোমাদের উপকার বা ক্ষতি করতে পারে কি’?(৭৩)। ‘তারা বলল, না। তবে আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের পেয়েছি, তারা এরূপই করত’(৭৪)। ইবরাহীম বলল, তোমরা কি তাদের সম্পর্কে ভেবে দেখেছ, যাদের তোমরা পূজা করে আসছ’?(৭৫)। ‘তোমরা এবং তোমাদের পূর্ববর্তী পিতৃপুরুষেরা’(৭৬)। ‘তারা সবাই আমার শত্রু, বিশ্ব পালনকর্তা ব্যতীত’(৭৭)। ‘যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আমাকে পথ প্রদর্শন করেছেন’ (৭৮)। ‘যিনি আমাকে আহার দেশ ও পানীয় দান করেন’ (৭৯)। ‘যখন আমি পীড়িত হই, তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন’(৮০)। ‘যিনি আমার মৃত্যু ঘটাবেন, অতঃপর পুনর্জীবন দান করবেন’ (৮১)। ‘আশা করি শেষ বিচারের দিন তিনি আমার ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দিবেন’ (৮২)। ‘হে আমার পালনকর্তা! আমাকে প্রজ্ঞা দান কর এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত কর’(৮৩)। ‘এবং আমাকে পরবর্তীদের মধ্যে সত্যভাষী কর’ (৮৪)। ‘তুমি আমাকে নে‘মতপূর্ণ জান্নাতের উত্তরাধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত কর’(৮৫)। (হে প্রভু) ‘তুমি আমার পিতাকে ক্ষমা কর। তিনি তো পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত’(৮৬) (হে আল্লাহ) ‘পুনরুত্থান দিবসে তুমি আমাকে লাঞ্ছিত কর না’ (৮৭)। ‘যে দিনে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে আসবে না’ (৮৮) ‘কিন্তু যে ব্যক্তি সরল হৃদয় নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে’ (৮৯)। ‘(ঐ দিন) জান্নাত আল্লাহভীরুদের নিকটবর্তী করা হবে’(৯০)। ‘এবং জাহান্নাম বিপথগামীদের সামনে উন্মোচিত করা হবে’(৯১)। ‘(ঐ দিন) তাদেরকে বলা হবে, তারা কোথায় যাদেরকে তোমরা পূজা করতে’?(৯২) ‘আল্লাহর পরিবর্তে। তারা কি (আজ) তোমাদের সাহায্য করতে পারে কিংবা তারা কি কোনরূপ প্রতিশোধ নিতে পারে’? (৯৩)। ‘অতঃপর তাদেরকে এবং (তাদের মাধ্যমে) পথভ্রষ্টদেরকে অধোমুখী করে নিক্ষেপ করা হবে জাহান্নামে’(৯৪) ‘এবং ইবলীস বাহিনীর সকলকে’ (৯৫)। ‘তারা সেখানে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়ে বলবে’(৯৬) ‘আল্লাহর কসম! আমরা প্রকাশ্য ভ্রান্তিতে ছিলাম’(৯৭), ‘যখন আমরা তোমাদেরকে (অর্থাৎ কথিত উপাস্যদেরকে) বিশ্বপালকের সমতুল্য গণ্য করতাম’(৯৮)।‘আসলে আমাদেরকে পাপাচারীরাই পথভ্রষ্ট করেছিল’ (৯৯)। ‘ফলে (আজ) আমাদের কোন সুফারিশকারী নেই’ (১০০) ‘এবং কোন সহৃদয় বন্ধুও নেই’(১০১)। ‘হায়! যদি কোনরূপে আমরা পৃথিবীতে ফিরে যাবার সুযোগ পেতাম, তাহ’লে আমরা ঈমানদারগণের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম’(১০২)। ‘নিশ্চয়ই এ ঘটনার মধ্যে নিদর্শন রয়েছে। বস্ত্ততঃ তাদের অধিকাংশই বিশ্বাসী ছিল না’ (১০৩)। ‘নিশ্চয়ই আপনার পালনকর্তা পরাক্রান্ত ও দয়ালু’ (শো‘আরা ২৬/৬৯-১০৪)।

হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর আহ্বানের সারকথা ও ফলশ্রুতি :
পলিথেইস্ট ও মূর্তিপূজারী পিতা এবং সম্প্রদায়ের নেতাদের নিকটে ইবরাহীম (আঃ)-এর দাওয়াত ও তাদের প্রদত্ত জবাবের সার কথাগুলি নিম্নরূপ:

১. ইবরাহীম তাদেরকে একেশ্বরবাদের দিকে আহ্বান জানান। তিনি মূর্তি পূজার অসারতার বিষয়টি তাদের সামনে বলে দেন। কেননা এটি ছিল সকলের সহজবোধ্য। কিন্তু তারা মূর্তিপূজা ছাড়তে রাজী হয়নি। কারণ এই প্রথার মধ্যে নেতাদের লাভ ছিল মাল-সম্পদ ও পার্থীব সম্মানের নগদ প্রাপ্তি। পূজা-পার্বনের মধ্যে গরীবদের লাভ ছিল এই যে, এর ফলে তারা নেতাদের কাছ থেকে কিছু সহযোগিতা পেত। এ ছাড়াও বিভিন্ন কাল্পনিক ও ভ্রান্ত বিশ্বাস তাদেরকে মূর্তিপূজায় প্ররোচিত করত।

২. মূর্তিপূজারীদের কোন সঙ্গত জবাব ছিল না। তারা কেবল একটা কথাই বলেছিল যে, এটা আমাদের বাপ-দাদাদের আমল থেকে চলে আসা প্রথা।

৩. ইবরাহীম (আঃ)-এর এত কিছু বক্তব্যের পরেও এই অন্ধপূজারীরা বলল, আসলেই তুমি কোন সত্য এনেছ, না আমাদের সাথে কৌতুক করছ? কারণ অদৃশ্য অহীর বিষয়টি তাদের বাস্তব জ্ঞানে আসেনি। কিন্তু মূর্তিকে তারা সামনে দেখতে পায়। সেখানে সেবা ও পূজা করে তারা তৃপ্তি পায়।

৪. পিতা তাঁকে মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার হুমকি দিল এবং বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিল। কিন্তু তিনি পিতার জন্য আল্লাহর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনার ওয়াদা করলেন। এর মধ্যে পিতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য বোধ ফুটে উঠেছে, যদিও তিনি মুশরিক হন। পরে পিতার কুফরী পরিষ্কার হয়ে গেলে তিনি বিরত হন (তওবাহ ৯/১১৪)।

৫. পিতা বহিষ্কার করলেও সম্প্রদায় তখনও বহিষ্কার করেনি। তাই তিনি পুনরায় দাওয়াতে মনোনিবেশ করলেন। যদিও তার ফলশ্রুতি ছিল পূর্বের ন্যায় শূন্য।

তারকা পূজারীদের সাথে বিতর্ক :
মূর্তি পূজারীদের সাথে বিতর্কের পরে তিনি তারকাপূজারী নেতাদের প্রতি তাওহীদের দাওয়াত দেন। কিন্তু তারাও মূর্তি পূজারীদের ন্যায় নিজ নিজ বিশ্বাসে অটল রইল। অবশেষে তাঁর সাথে তাদের নেতাদের তর্কযুদ্ধ আবশ্যিক হয়ে পড়ে। কেউ কেউ বলেছেন, ইব্রাহিম (আঃ)-এর কওমের লোকেরা একই সাথে মূর্তি ও তারকার পূজা করত। (সেটাও অসম্ভব কিছু নয়)

পবিত্র কুরআনে এই তর্কযুদ্ধ একটি অভিনব ও নাটকীয় ভঙ্গিতে প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে সহজে আরবীয় পাঠক হৃদয়ে রেখাপাত করে। কেননা হযরত ইবরাহীম (আঃ) ছিলেন সমগ্র আরবের লোকদের পিতামহ। তাঁর প্রতি গোটা আরব জাতি সম্মান প্রদর্শন করত। অথচ তাদের পিতামহ যার বিরুদ্ধে জীবনভর লড়াই করলেন জাহিল আরবরা সেই সব শিরকে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল। যে কা‘বা গৃহকে হযরত ইবরাহীম (আঃ) নির্মাণ করেন এক আল্লাহর ইবাদতের জন্য। তারা সেখানেই মূর্তিপূজা শুরু করে দিয়েছিল। অথচ মুখে আল্লাহকে স্বীকার করত এবং ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আঃ)-এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করত। আজকের মুসলমানদের জন্য এর মধ্যে শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। কেননা তারাও মুখে আল্লাহকে স্বীকার করে এবং শেষনবীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করে। অথচ নিজেরা কবর পূজা ও স্থানপূজা এমনকি মূর্তিপূজার শিরকে লিপ্ত রয়েছে। আল্লাহর বিধানের অবাধ্যতা ও তার পরিবর্তে নিজেদের মনগড়া বিধান সমূহের আনুগত্য তো রয়েছেই। এক্ষণে আমরা কুরআনে বর্ণিত হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর অপর বিতর্ক যুদ্ধটির বিবরণ পেশ করব।-
আল্লাহ বলেন,
‘আমি এরূপভাবেই ইবরাহীমকে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের অত্যাশ্চর্য বস্ত্তসমূহ দেখাতে লাগলাম, যাতে সে দৃঢ়বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়’ (আন‘আম ৬/৭৫)। ‘অনন্তর যখন রাত্রির অন্ধকার তার উপরে সমাচ্ছন্ন হ’ল, তখন সে তারকা দেখে বলল যে, এটি আমার পালনকর্তা। অতঃপর যখন তা অস্তমিত হ’ল, তখন বলল, আমি অস্তগামীদের ভালবাসি না’ (৭৬)। ‘অতঃপর যখন চন্দ্রকে ঝলমল করতে দেখল, তখন সে বলল, এটি আমার পালনকর্তা। কিন্তু পরে যখন তা অস্তমিত হ’ল, তখন বলল, যদি আমার প্রতিপালক আমাকে পথ প্রদর্শন না করেন, তাহ’লে অবশ্যই আমি পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব’ (৭৭)। ‘অতঃপর যখন উদীয়মান সূর্যকে ডগমগে দেখতে পেল, তখন বলল, এটিই আমার পালনকর্তা এবং এটিই সবচেয়ে বড়। কিন্তু পরে যখন তা ডুবে গেল, তখন বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যেসব বিষয়কে শরীক কর, আমি ওসব থেকে মুক্ত’ (৭৮)। ‘আমি আমার চেহারাকে ঐ সত্তার দিকে একনিষ্ঠ করছি, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই’ (৭৯)। ‘(তখন) তার সম্প্রদায় তার সাথে বিতর্ক করল। সে বলল, তোমরা কি আমার সাথে আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক করছ? অথচ তিনি আমাকে সরল পথ দেখিয়েছেন। আর আমি ভয় করিনা তাদের, যাদেরকে তোমরা তাঁর সাথে শরীক কর, তবে আমার পালনকর্তা যদি কিছু (কষ্ট দিতে) চান। আমার প্রভুর জ্ঞান সবকিছুতেই পরিব্যপ্ত। তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না’? (৮০)। ‘কিভাবে আমি ঐসব বস্ত্তকে ভয় করব, যাদেরকে তোমরা তাঁর সাথে শরীক করেছ? অথচ তোমরা এ বিষয়ে ভয় পাওনা যে, তোমরা আল্লাহর সাথে এমন সব বস্ত্তকে শরীক করেছ, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তোমাদের প্রতি কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। এক্ষণে উভয় দলের মধ্যে কে বেশী নিরাপত্তা লাভের অধিকারী? যদি তোমরা জ্ঞানী হয়ে থাক’ (৮১)। ‘যারা ঈমান আনে এবং স্বীয় ঈমানকে শিরকের সাথে মিশ্রিত করে না, তাদের জন্যই রয়েছে নিরাপত্তা এবং তারাই হ’ল সুপথপ্রাপ্ত’ (আন‘আম ৬/৭৫–৮২)।

উপরের বর্ণনা ভঙ্গিতে মনে হয় যেন হযরত ইবরাহীম (আ.) ঐ দিনই প্রথম নক্ষত্র, চন্দ্র ও সূর্য দেখলেন এবং ‘এটি আমার পালনকর্তা’ বলে সাময়িকভাবে মুশরিক হয়েছিলেন। পরে শিরক পরিত্যাগ করে একেশ্বরবাদী হ’লেন। অথচ ঘটনা মোটেই তা নয়। কেননা ঐ সময় ইবরাহীম (আঃ) অন্যূন সত্তরোর্ধ্ব বয়সের নবী। আর নবীগণ জন্ম থেকেই নিষ্পাপ ও শিরকমুক্ত থাকেন। আসল কথা হ’ল এই যে, মূর্তি পূজার অসারতা বুঝানো যতটা সহজ ছিল, তারকা পূজার অসারতা বুঝানো ততটা সহজ ছিল না। কেননা ওটা মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাই ইবরাহীম (আঃ) এখানে বৈজ্ঞানিক পন্থা বেছে নিলেন এবং জনগণের সহজবোধ্য এমন একটি প্রমাণ উপস্থাপন করলেন, যাতে তাদের লা-জওয়াব হওয়া ব্যতীত কোন উপায় ছিল না। তিনি সৌরজগতের গতি-প্রকৃতি যে আল্লাহর হুকুমের অধীন, সে কথা না বলে তাদের অস্তমিত হওয়ার বিষয়টিকে প্রমাণ হিসাবে পেশ করেন। কারণ এটাই ছিল তাদের জন্যে সহজবোধ্য। তিনি বলেন, যা ক্ষয়ে যায়, ডুবে যায়, হারিয়ে যায়, নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারে না, ধরে রাখতে পারে না, বরং দৈনিক ওঠে আর ডোবে, সে কখনো মানুষের প্রতিপালক হ’তে পারে না। বরং সর্বোচ্চ পালনকর্তা কেবল তিনিই হ’তে পারেন, যিনি এসব কিছুর সৃষ্টিকর্তা ও বিধানদাতা। আর তিনিই হ’লেন ‘আল্লাহ’। আমি তাঁর দিকেই ফিরে গেলাম এবং বাপ-দাদার আমল থেকে তোমরা যে শিরক করে আসছ, আমি তা থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করলাম।
বলা বাহুল্য, এর অন্তর্নিহিত দাওয়াত ছিল এই যে, হে আমার জাতি! তোমরাও আমার মত আল্লাহর দিকে ফিরে এসো এবং শিরক হ’তে মুক্ত হও। কিন্তু ইবরাহীমের এই তর্কযুদ্ধ নিষ্ফল হ’ল। সম্প্রদায়ের নেতারা নিজ নিজ মতের উপরে দৃঢ় রইল। কেউ আপাততঃ উনার আহবানে সাড়া দিল না।

ইবরাহীম (আঃ) মূর্তি ভাঙ্গলেন :
মানুষ যখন কোন কিছুর প্রতি অন্ধভক্তি পোষণ করে, তখন শত যুক্তিও কোন কাজ দেয় না এটাই ফনাটিজম। ফলে ইবরাহীম (আঃ) ভাবলেন, এমন কিছু একটা করা দরকার, যাতে পুরা সমাজ নড়ে ওঠে ও ওদের মধ্যে হুঁশ ফিরে আসে, এবং তারা একেশ্বরবাদীতে পরিণত হয়। সেমতে তিনি সম্প্রদায়ের কেন্দ্রীয় দেবমন্দিরে গিয়ে মূর্তিগুলো ভেঙ্গে ফেলার সংকল্প করলেন।

ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্প্রদায় বছরের একটা বিশেষ দিনে উৎসব পালন করত ও সেখানে নানারূপ অপচয় ও অশোভন-অশালীন কাজ করত। কওমের লোকেরা তাকে উক্ত মেলায় যোগদানের আমন্ত্রণ জানালো। কিন্তু তিনি অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে সেখানে যেতে অপারগতা প্রকাশ করলেন (ছাফফাত ৩৭/৮৯)। অতঃপর তিনি ভাবলেন, আজকের এই সুযোগে আমি ওদের দেবমন্দিরে প্রবেশ করে মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেব। যাতে ওরা ফিরে এসে ওদের মিথ্যা উপাস্যদের অসহায়ত্বের বাস্তব দৃশ্য দেখতে পায়। হয়তোবা এতে তাদের অনেকের মধ্যে হুঁশ ফিরবে।

অতঃপর তিনি দেবালয়ে ঢুকে পড়লেন ও দেব-দেবীদের দিকে লক্ষ্য করে বললেন, (তোমাদের সামনে এত নযর-নেয়ায ও ভোগ-নৈবেদ্য রয়েছে)। অথচ ‘তোমরা তা খাচ্ছ না কেন? কি ব্যাপার তোমরা কথা বলছ না কেন? তারপর তিনি ডান হাতে রাখা (সম্ভবতঃ কুড়াল দিয়ে) ভীষণ জোরে আঘাত করে সবগুলোকে গুঁড়িয়ে দিলেন (ছাফফাত ৩৭/৯১-৯৩)। তবে বড় মূর্তিটাকে পূর্বাবস্থায় রেখে দিলেন, যাতে লোকেরা তার কাছে ফিরে যায় (আম্বিয়া ২১/৫৮)।

মেলা শেষে লোকজন ফিরে এল এবং যথারীতি দেবমন্দিরে গিয়ে প্রতিমাগুলির অবস্থা দেখে হতবাক হয়ে গেল। ‘তারা বলাবলি করতে লাগল, এটা নিশ্চয়ই ইবরাহীমের কাজ হবে। কেননা তাকেই আমরা সবসময় মূর্তি পূজার বিরুদ্ধে বলতে শুনি। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) সেখানে ডেকে আনা হ’ল এবং জিজ্ঞেস করল, ‘হে ইবরাহীম! তুমিই কি আমাদের উপাস্যদের সাথে এরূপ আচরণ করেছ’? (আম্বিয়া ২১/৬২)।

ইবরাহীম (আঃ) বললেন – ‘বরং এই বড় মূর্তিটাই একাজ করেছে। নইলে এদেরকে জিজ্ঞেস কর, যদি তারা কথা বলতে পারে’ (আম্বিয়া ২১/৬৩)। সম্প্রদায়ের নেতারা একথা শুনে লজ্জা পেল এবং মাথা নীচু করে বলল, – ‘তুমি তো জানো যে, এরা কথা বলে না’। ‘তিনি বললেন, – ‘তোমরা কি আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর ইবাদত কর, যা তোমাদের উপকারও করতে পারে না, ক্ষতিও করতে পারে না’ (আম্বিয়া ২১/৬৫-৬৬)। তিনি আরও বললেন, – ‘তোমরা এমন বস্ত্তর পূজা কর, যা তোমরা নিজ হাতে তৈরী কর’? ‘অথচ আল্লাহ তোমাদেরকে ও তোমাদের কর্মসমূহকে সৃষ্টি করেছেন’ (ছাফফাত ৩৭/৯৫-৯৬)। – ‘ধিক তোমাদের জন্য এবং আল্লাহ ব্যতীত তোমরা যাদের পূজা কর, ওদের জন্য। তোমরা কি বুঝ না’? (আম্বিয়া ২১/৬৭)।

তারপর যা হবার তাই হ’ল। জেদ ও অহংকারের বশবর্তী হয়ে সম্প্রদায়ের নেতারা ইবরাহীম (আঃ)-কে চূড়ান্ত শাস্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করল। তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, একে আর বাঁচতে দেওয়া যাবে না। শুধু তাই নয়, একে এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে মারতে হবে, যেন কেউ এর দলে যেতে সাহস না করে। তারা তাঁকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার প্রস্তাব গ্রহণ করল এবং সেটা বাদশাহ নমরূদের কাছে পেশ করল। সম্রাটের মন্ত্রী ও দেশের প্রধান পুরোহিতের ছেলে ইবরাহীম। অতএব তাকে সরাসরি সম্রাটের দরবারে আনা হল।

নমরূদের সঙ্গে বিতর্ক ও অগ্নিপরীক্ষা :
নমরূদ ৪০০ বছর ধরে রাজত্ব করায় সে উদ্ধত ও অহংকারী হয়ে উঠেছিল এবং নিজেকে একমাত্র উপাস্য ভেবেছিল। তাই সে ইবরাহীম (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করল, বল তোমার উপাস্য কে? নমরূদ ভেবেছিল, ইবরাহীম তাকেই উপাস্য বলে স্বীকার করবে। কিন্তু নির্ভীক কণ্ঠে ইবরাহীম জবাব দিলেন, ‘আমার পালনকর্তা তিনি, যিনি মানুষকে বাঁচান ও মারেন’। মোটাবুদ্ধির নমরূদ বলল, ‘আমিও বাঁচাই ও মারি’। অর্থাৎ মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামীকে খালাস দিয়ে মানুষকে বাঁচাতে পারি। আবার খালাসের আসামীকে মৃত্যুদন্ড দিতে পারি। এভাবে সে নিজেকেই মানুষের বাঁচা-মরার মালিক হিসাবে সাব্যস্ত করল। ইবরাহীম (আঃ) তখন দ্বিতীয় যুক্তি পেশ করে বললেন, ‘আমার আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন, আপনি তাকে পশ্চিম দিক হ’তে উদিত করুন’। ‘অতঃপর কাফের (নমরূদ) এতে হতবুদ্ধি হয়ে পড়লো’ (বাক্বারাহ ২/২৫৮)।:

কওমের নেতারাই যেখানে পরাজয়কে মেনে নেয়নি, সেখানে দেশের একচ্ছত্র সম্রাট কেন পরাজয়কে মেনে নিবেন। যথারীতি তিনিও অহংকারে ফেটে পড়লেন এবং ইবরাহীম (আঃ)-কে জ্বলন্ত হুতাশনে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার নির্দেশ জারি করলেন। সাথে সাথে জনগণকে তাদের পলিথেইস্ট ধর্মের দোহাই দিয়ে বললো, ‘তোমরা একে পুড়িয়ে মার এবং তোমাদের উপাস্যদের সাহায্য কর, যদি তোমরা কিছু করতে চাও’ (আম্বিয়া ২১/৬৮)।

যুক্তিতর্কে হেরে গিয়ে নমরূদ ইবরাহীম (আঃ)-কে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার হুকুম দিল। অতঃপর তার জন্য বিরাটাকারের আয়োজন শুরু হয়ে গেল। আল্লাহ বলেন, ‘তারা ইবরাহীমের বিরুদ্ধে মহা ফন্দি অাঁটতে চাইল। অতঃপর আমরা তাদেরকেই সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত করে দিলাম’ (আম্বিয়া ২১/৭০)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘আমরা তাদেরকে পরাভূত করে দিলাম’ (ছাফফাত ৩৭/৯৮)।

অতঃপর ‘একটা ভিত নির্মাণ করা হল এবং সেখানে বিরাট অগ্নিকুন্ড তৈরী করা হল। তারপর সেখানে তাকে নিক্ষেপ করা হল’ (ছাফফাত ৩৭/৯৭)। ছহীহ বুখারীতে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপের সময় ইবরাহীম (আঃ) বলে ওঠেন, ‘আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি কতই না সুন্দর তত্ত্বাবধায়ক’।

বস্ত্ততঃ এই কঠিন মুহূর্তের পরীক্ষায় জয়লাভ করার পুরস্কার স্বরূপ সাথে সাথে আল্লাহর নির্দেশ এল ‘হে আগুন! ঠান্ডা হয়ে যাও এবং ইব্রাহীমের উপরে শান্তিদায়ক হয়ে যাও’ (আম্বিয়া ২১/৬৯)। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) মুক্তি পেলেন।

অগ্নি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ইবরাহীম (আঃ) ফিরে আসেন এবং এভাবে পলিথেইস্টদের সমস্ত কৌশল বরবাদ হয়ে যায়। এরপর শুরু হল ইব্রাহীম (আঃ)-এর জীবনের আরেক অধ্যায়।

হযরত ইব্রাহীম (আঃ)এর সময়ে রাষ্ট্র্রপ্রধান ছিলো নমরুদ। নমরুদের রাজ্য ছিল বাবেল, ইরাক ও কলোনী অঞ্চল নিয়ে বিস্তৃত। প্রচলিত আছে যে, অতপর সামান্য মাছি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে অহংকারী নমরুদ মৃত্যুবরন করে।

হিজরতের পালা :
এই পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা গিয়েছে যারাই একেশ্বরবাদী সমাজ স্ংস্কারের ডাক দিয়েছেন তাদের হয় হত্যা করা হয়েছে অথবা নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে (যাকে হিযরত বলা হয়)। তৎকালীন পৃথিবীর সমৃদ্ধতম নগরী ছিল বাবেল। তাওহীদের দাওয়াত দিয়ে এবং মূর্তিপূজারী ও তারকাপূজারী নেতাদের সাথে তর্কযুদ্ধে জয়ী হয়ে অবশেষে অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ফলে ইবরাহীমের দাওয়াত ও তার প্রভাব সকলের নিকটে পৌঁছে গিয়েছিল। যদিও সমাজপতি ও শাসকদের অত্যাচারের ভয়ে প্রকাশ্যে কেউ উনার একেশ্বরবাদী ধর্ম কবুলের ঘোষণা দেয়নি। কিন্তু তা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল এবং সাধারণ জনগণের হৃদয়ে আসন গেঁথে নিয়েছিল।

অতএব এবার অন্যত্র দাওয়াতের পালা। দীর্ঘ দিন দাওয়াত দেওয়ার পরেও নিজের স্ত্রী সারাহ ও ভাতিজা লূত ব্যতীত কেউ প্রকাশ্যে ঈমান আনেনি। ফলে পিতা ও সম্প্রদায় কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে তিনি হিজরতের সিদ্ধান্ত নেন। যাওয়ার পূর্বে তিনি নিজ সম্প্রদায়কে ডেকে যে বিদায়ী ভাষণ দেন, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয় লুকিয়ে রয়েছে।

ইবরাহীমের হিজরত-পূর্ব বিদায়ী ভাষণ:
যেকোন মহামানবের দেয়া একটি-দুটি ভাষণ খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে, ইতিহাসে তা বিশেষ স্থান করে নেয় এবং তা পৃথিবীটাকেই পাল্টে দেয়। হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-ও একটি বিদায়ী ভাষণ দিয়েছিলেন –

‘তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তার সাথীদের মধ্যে উত্তম আদর্শ নিহিত রয়েছে। যখন তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল, আমরা সম্পর্ক ছিন্ন করছি তোমাদের সাথে এবং তাদের সাথে যাদেরকে তোমরা পূজা কর আল্লাহ্-কে বাদ দিয়ে। আমরা তোমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করছি এবং আমাদের ও তোমাদের মাঝে স্থায়ী শত্রুতা ও বিদ্বেষ বিঘোষিত হ’ল যতদিন না তোমরা কেবলমাত্র এক আল্লাহর উপরে বিশ্বাস স্থাপন করবে। … প্রভু হে! আমরা কেবল তোমার উপরেই ভরসা করছি এবং তোমার দিকেই মুখ ফিরাচ্ছি ও তোমার নিকটেই আমাদের প্রত্যাবর্তন স্থল’ (মুমতাহানাহ ৬০/৪)। এরপর তিনি কওমকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আমি চললাম আমার প্রভুর পানে, সত্বর তিনি আমাকে পথ দেখাবেন’ (ছাফফাত ৩৭/৯৯)। অতঃপর তিনি চললেন দিশাহীন যাত্রাপথে।

আল্লাহ বলেন, ‘আর আমরা তাকে ও লূতকে উদ্ধার করে নিয়ে গেলাম সেই দেশে, যেখানে বিশ্বের জন্য কল্যাণ রেখেছি’ (আম্বিয়া ২১/৭১)।

অতঃপর আল্লাহ তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রী সারা ও ভাতিজা লূতকে পথ প্রদর্শন করে নিয়ে গেলেন পার্শ্ববর্তী দেশ শাম বা সিরিয়ার অন্তর্গত বায়তুল মুক্বাদ্দাসের অদূরে কেন‘আন নামক স্থানে, যা এখন তাঁর নামানুসারে ‘খালীল’ (الخليل ) নামে পরিচিত হয়েছে। ঐ সময় সেখানে বায়তুল মুক্বাদ্দাসের অস্তিত্ব ছিল না। এখানেই ইবরাহীম (আঃ) বাকী জীবন অতিবাহিত করেন ও এখানেই কবরস্থ হন। এখানে হিজরতের সময় তাঁর বয়স ৮০ থেকে ৮৫-এর মধ্যে ছিল এবং বিবি সারা-র ৭০ থেকে ৭৫-এর মধ্যে। সঙ্গী ভাতিজা লূতকে আল্লাহ নবুঅত দান করেন ও তাকে পার্শ্ববর্তী সমৃদ্ধ নগরী সাদূমসহ পাঁচটি নগরীর লোকদের হেদায়াতের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয় ও তিনি সেখানেই বসবাস করেন। ফলে হযরত ইবরাহীম (আঃ) জীবনে নিঃসঙ্গতার এক কষ্টকর অধ্যায় শুরু হয়।

কেন‘আনের জীবন ও মিসর সফর:
জন্মভূমি বাবেল শহরে জীবনের প্রথমাংশ অতিবাহিত করার পর হিজরত ভূমি শামের (সিরিয়ার) কেন‘আনে তিনি জীবনের বাকী অংশ কাটাতে শুরু করেন। তাঁর জীবনের অন্যান্য পরীক্ষা সমূহ এখানেই অনুষ্ঠিত হয়। কিছু দিন অতিবাহিত করার পর এখানে শুরু হয় দুর্ভিক্ষ। মানুষ সব দলে দলে ছুটতে থাকে মিসরের দিকে। মিসর তখন ফেরাঊনদের শাসনাধীনে ছিল। উল্লেখ্য যে, মিসরের শাসকদের উপাধি ছিল ‘ফেরাঊন’। হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও হযরত মূসা (আঃ)-এর সময় মিসর ফেরাঊনদের শাসনাধীনে ছিল। মাঝখানে হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর সময়ে ২০০ বছরের জন্য মিসর হাকসূস রাজাদের অধীনস্থ ছিল।

দুর্ভিক্ষ তাড়িত কেন‘আন হ’তে অন্যান্যদের ন্যায় ইবরাহীম (আঃ) সস্ত্রীক মিসরে রওয়ানা হ’লেন। সেখানে উনার জন্য অপেক্ষা করছিল এক কঠিন ও মর্মান্তিক পরীক্ষা এবং সাথে সাথে একটি নগদ ও অমূল্য পুরষ্কার।

ঐ সময় মিসরের ফেরাঊন ছিল একজন নারী লোলুপ মদ্যপ শাসক। তার নিয়োজিত লোকেরা রাস্তার পথিকদের মধ্যে কোন সুন্দরী মহিলা পেলেই তাকে ধরে নিয়ে বাদশাহকে পৌঁছে দিত। যদিও বিবি ‘সারা’ ঐ সময় ছিলেন বৃদ্ধা মহিলা, তথাপি তিনি ছিলেন সৌন্দর্য্যের রাণী। মিসরীয় সম্রাটের নিয়ম ছিল এই যে, যে মহিলাকে তারা অপহরণ করত, তার সাথী পুরুষ লোকটি যদি স্বামী হ’ত, তাহ’লে তাকে হত্যা করে মহিলাকে নিয়ে যেত। আর যদি ভাই বা পিতা হ’ত, তাহ’লে তাকে ছেড়ে দিত। তারা ইবরাহীমকে জিজ্ঞেস করলে তিনি সারাকে তাঁর ‘বোন’ পরিচয় দিলেন। উল্লেখ্য যে ‘সারা’ তার বোনও ছিলেন (আপন বোন নয়)।

সারাকে যথারীতি ফেরাঊনের কাছে আনা হ’ল। অতঃপর পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ( সাঃ ) বলেন,

‘যখন সারা সম্রাটের নিকটে নীত হ’লেন এবং সম্রাট তার দিকে এগিয়ে এল, তখন তিনি ওযূ করার জন্য গেলেন ও ছালাতে রত হয়ে আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করে বললেন, হে আল্লাহ! যদি তুমি জেনে থাক যে, আমি তোমার উপরে ও তোমার রাসূলের উপরে ঈমান এনেছি এবং আমি আমার একমাত্র স্বামীর জন্য সতীত্ব বজায় রেখেছি, তাহ’লে তুমি আমার উপরে এই কাফিরকে বিজয়ী করো না’।[বুখারী হা/২২১৭ ‘ক্রয়-বিক্রয়’ অধ্যায়; আহমাদ, সনদ ছহীহ]

সতীসাধ্বী স্ত্রী সারার দো‘আ সঙ্গে সঙ্গে কবুল হয়ে গেল। সম্রাট এগিয়ে আসার উপক্রম করতেই হাত-পা অবশ হয়ে পড়ে গিয়ে গোঙাতে লাগলো। তখন সারাহ প্রার্থনা করে বললেন, হে আল্লাহ! লোকটি যদি এভাবে মারা যায়, তাহ’লে লোকেরা ভাববে আমি ওকে হত্যা করেছি’। তখন আল্লাহ সম্রাটকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিলেন। কিন্তু শয়তান আবার এগিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে আবার মরার মত পড়ে রইল।

এভাবে সে দুই অথবা তিনবার বেহুঁশ হয়ে পড়লো আর সারা-র দো‘আয় বাঁচলো। অবশেষে সে বলল, তোমরা আমার কাছে একটা শয়তানীকে পাঠিয়েছ। যাও একে ইবরাহীমের কাছে ফেরত দিয়ে আসো এবং এর খেদমতের জন্য হাজেরাকে দিয়ে দাও। অতঃপর সারাহ তার খাদেমা হাজেরাকে নিয়ে সসম্মানে স্বামী ইবরাহীমের কাছে ফিরে এলেন।

ধারণা করা হয় যে, ফেরাঊন কেবল বিবি হাজেরাকেই উপহার স্বরূপ দেয়নি। বরং অন্যান্য রাজকীয় উপঢৌকনাদিও দিয়েছিল। যাতে ইবরাহীমের মিসর গমনের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে যায় এবং বিপুল মাল-সামান ও উপঢৌকনাদি সহ তিনি কেন‘আনে ফিরে আসেন।

কেন‘আনে প্রত্যাবর্তন :
ইবরাহীম (আঃ) যথারীতি মিসর থেকে কেন‘আনে ফিরে এলেন। বন্ধ্যা স্ত্রী সারা তার খাদেমা হাজেরাকে প্রাণপ্রিয় স্বামী ইবরাহীমকে উৎসর্গ করলেন। ইবরাহীম তাকে স্ত্রীত্বে বরণ করে নিলেন। পরে দ্বিতীয়া স্ত্রী হাজেরার গর্ভে জন্ম গ্রহণ করেন তার প্রথম সন্তান ইসমাঈল (আঃ)। এই সময় ইবরাহীমের বয়স ছিল অন্যূন ৮৬ বছর। নিঃসন্তান পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। শুষ্ক মরুতে যেন প্রাণের জোয়ার এলো।

কেন‘আনী জীবনের পরীক্ষা সমূহ :
১ম পরীক্ষা: কেন‘আনী জীবনে তাঁর প্রথম পরীক্ষা হ’ল কঠিন দুর্ভিক্ষে তাড়িত হয়ে জীবিকার সন্ধানে মিসরে হিজরত করা। এ বিষয়ে পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে।
২য় পরীক্ষা: মিসরে গিয়ে সেখানকার লম্পট সম্রাট ফেরাঊনের কুদৃষ্টিতে পড়ে স্ত্রী সারাকে অপহরণের মর্মান্তিক পরীক্ষা। এ বিষয়ে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

৩য় পরীক্ষা: বিবি হাজেরাকে মক্কায় নির্বাসন : মিসর থেকে ফিরে কেন‘আনে আসার বৎসরাধিককাল পরে প্রথম সন্তান ইসমাঈলের জন্ম লাভ হয়। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই তিনি শিশু সন্তান ও তার মা হাজেরাকে মক্কার বিজন পাহাড়ী উপত্যকায় নিঃসঙ্গভাবে রেখে আসার এলাহী নির্দেশ লাভ করেন। বস্ত্ততঃ এটা ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক পরীক্ষা। এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নরূপ:

হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে শিশু পুত্র ইসমাঈল ও তার মাকে মক্কায় নির্বাসনে রেখে আসার নির্দেশ পান, এই স্থানটি তখন অনাবাদী এবং বীরাণ ছিল। পানির নাম চিহ্ন পর্যন্তও ছিল না। তখনই তার অন্তরে বিশ্বাস জন্মেছিল যে, নিশ্চয়ই এ নির্দেশের মধ্যে আল্লাহর কোন মহতী পরিকল্পনা লুক্কায়িত আছে এবং নিশ্চয়ই তিনি ইসমাঈল ও তার মাকে ধ্বংস করবেন না।

অতঃপর এক থলে খেজুর ও এক মশক পানি সহ তাদের বিজনভূমিতে রেখে যখন ইবরাহীম (আঃ) একাকী ফিরে আসতে থাকেন, তখন বেদনা-বিস্মিত স্ত্রী হাজেরা ব্যাকুলভাবে তার পিছে পিছে আসতে লাগলেন। আর স্বামীকে এর কারণ জিজ্ঞেস করতে থাকেন। কিন্তু বুকে বেদনার পাষাণ বাঁধা ইবরাহীমের মুখ দিয়ে কোন কথা বেরুলো না। তখন হাজেরা বললেন, আপনি কি আল্লাহর হুকুমে আমাদেরকে এভাবে ফেলে যাচ্ছেন? ইবরাহীম ইশারায় বললেন, হ্যাঁ। তখন সম্বিৎ ফিরে পেয়ে অটল বিশ্বাস ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে হাজেরা বলে উঠলেন, ‘তাহ’লে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করবেন না’। ফিরে এলেন তিনি সন্তানের কাছে। দু’একদিনের মধ্যেই ফুরিয়ে যাবে পানি ও খেজুর। কি হবে উপায়? খাদ্য ও পানি বিহনে বুকের দুধ শুকিয়ে গেলে কচি বাচ্চা কি খেয়ে বাঁচবে। পাগলপরা হয়ে তিনি মানুষের সন্ধানে দৌঁড়াতে থাকেন ছাফা ও মারওয়া পাহাড়ের এ মাথা আর ও মাথায়। এভাবে সপ্তমবারে তিনি দূর থেকে দেখেন যে, বাচ্চার পায়ের কাছ থেকে মাটির বুক চিরে বেরিয়ে আসছে ঝর্ণার ফল্গুধারা, জিব্রীলের পায়ের গোড়ালি বা তার পাখার আঘাতে যা সৃষ্টি হয়েছিল। ছুটে এসে বাচ্চাকে কোলে নিলেন অসীম মমতায়। স্নিগ্ধ পানি পান করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। (যা যমযম কূয়া নামে পরিচিত হয় এবং যার উৎসধারা বিগত প্রায় সোয়া চার হাযার বছর ধরে আজও সমভাবে বহমান। কিন্তু এই পানির রূপ-রস-গন্ধ কিছুরই কোন পরিবর্তন হয়নি। এ পানির কোন হ্রাস-বৃদ্ধি নেই।) হঠাৎ অদূরে একটি আওয়ায শুনে তিনি চমকে উঠলেন। উনি জিবরীল। বলে উঠলেন, ‘আপনারা ভয় পাবেন না। এখানেই আল্লাহর ঘর। এই সন্তান ও তার পিতা এ ঘর সত্বর পুনর্নির্মান করবেন। আল্লাহ তাঁর ঘরের বাসিন্দাদের ধ্বংস করবেন না’। বলেই শব্দ মিলিয়ে গেল’।

অতঃপর শুরু হ’ল ইসমাঈলী জীবনের নব অধ্যায়। পানি দেখে পাখি আসলো। পাখি ওড়া দেখে ব্যবসায়ী কাফেলা আসলো। তারা এসে পানির মালিক হিসাবে হাজেরার নিকটে অনুমতি চাইলে তিনি এই শর্তে মনযুর করলেন যে, আপনাদের এখানে বসতি স্থাপন করতে হবে। বিনা পয়সায় এই প্রস্তাব তারা সাগ্রহে কবুল করল। এরাই হ’ল ইয়ামন থেকে আগত বনু জুরহুম গোত্র। বড় হয়ে ইসমাঈল এই গোত্রে বিয়ে করেন। এঁরাই কা‘বা গৃহের খাদেম হন এবং এদের শাখা গোত্র কুরায়েশ বংশে শেষনবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর আগমন ঘটে।

ওদিকে ইবরাহীম (আঃ) যখন স্ত্রী ও সন্তানকে রেখে যান তখন হাজেরার দৃষ্টির আড়ালে গিয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন এই বলে,

‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমি আমার পরিবারের কিছু সদস্যকে তোমার মর্যাদামন্ডিত গৃহের সন্নিকটে চাষাবাদহীন উপত্যকায় বসবাসের জন্য রেখে যাচ্ছি। প্রভুহে! যাতে তারা ছালাত কায়েম করে। অতএব কিছু লোকের অন্তরকে তুমি এদের প্রতি আকৃষ্ট করে দাও এবং তাদেরকে ফল-ফলাদি দ্বারা রূযী দান কর। সম্ভবত: তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে’।[ইবরাহীম ১৪/৩৭; বুখারী ইবনু আববাস (রাঃ) বর্ণিত দীর্ঘ হাদীছের সারসংক্ষেপ; ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায় হা/৩৩৬৪।]
৫ম পরীক্ষা: পুত্র কুরবানী :

একমাত্র শিশু পুত্র ও তার মাকে মক্কায় রেখে এলেও ইবরাহীম (আঃ) মাঝে-মধ্যে সেখানে যেতেন ও দেখা-শুনা করতেন। এভাবে ইসমাঈল ১৩/১৪ বছর বয়সে উপনীত হ’লেন এবং পিতার সঙ্গে চলাফেরা করার উপযুক্ত হ’লেন। বলা চলে যে, ইসমাঈল যখন বৃদ্ধ পিতার সহযোগী হ’তে চলেছেন এবং পিতৃহৃদয় পুরোপুরি জুড়ে বসেছেন, ঠিক সেই সময় আল্লাহ ইবরাহীমের মহববতের কুরবানী কামনা করলেন। বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র নয়নের পুত্তলী ইসমাঈলের মহববত ইবরাহীমকে কাবু করে ফেলল কি-না, আল্লাহ যেন সেটাই যাচাই করতে চাইলেন। ইতিপূর্বে অগ্নিপরীক্ষা দেবার সময় ইবরাহীমের কোন পিছুটান ছিল না। কিন্তু এবার রয়েছে প্রচন্ড রক্তের টান।

দ্বিতীয়তঃ অগ্নি পরীক্ষায় বাদশাহ তাকে বাধ্য করেছিল। কিন্তু এবারের পরীক্ষা স্বেচ্ছায় ও স্বহস্তে সম্পন্ন করতে হবে। তাই এ পরীক্ষাটি ছিল পূর্বের কঠিন অগ্নি পরীক্ষার চেয়ে নিঃসন্দেহে কঠিনতর। সূরা ছাফফাত ১০২ আয়াত হ’তে ১০৯ আয়াত পর্যন্ত এ বিষয়ে বর্ণিত ঘটনাটি নিম্নরূপ:

‘যখন (ইসমাঈল) পিতার সাথে চলাফেরা করার মত বয়সে উপনীত হ’ল, তখন (ইবরাহীম) তাকে বললেন, হে আমার বেটা! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবহ করছি। এখন বল তোমার অভিমত কি? সে বলল, হে পিতা! আপনাকে যা নির্দেশ করা হয়েছে, আপনি তা কার্যকর করুন। আল্লাহ চাহেন তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত দেখতে পাবেন’ (ছাফফাত ৩৭/১০২)।

ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত হয়েছে যে, মক্কা থেকে বের করে ৮ কি: মি: দক্ষিণ-পূর্বে মিনা প্রান্তরে নিয়ে যাওয়ার পথে বর্তমানে যে তিন স্থানে হাজীগণ শয়তানকে পাথর মেরে থাকেন, ঐ তিন স্থানে ইবলীস তিনবার ইবরাহীম (আঃ)-কে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। আর তিনবারই ইবরাহীম (আঃ) শয়তানের প্রতি ৭টি করে কংকর নিক্ষেপ করেছিলেন।[ইবনু আববাস হ’তে মুসনাদে আহমাদ হা/২৭০৭, ২৭৯৫, সনদ ছহীহ, শো‘আয়েব আরনাঊত্ব।] সেই স্মৃতিকে জাগরুক রাখার জন্য এবং শয়তানের প্রতারণার বিরুদ্ধে মুমিনকে বাস্তবে উদ্বুদ্ধ করার জন্য এ বিষয়টিকে হজ্জ অনুষ্ঠানের ওয়াজিবাতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখানেই অনতিদূরে পূর্ব দিকে ‘মসজিদে খায়েফ’ অবস্থিত।

অতঃপর পিতা-পুত্র আল্লাহ নির্দেশিত কুরবানগাহ ‘মিনায়’ উপস্থিত হ’লেন। সেখানে পৌঁছে পিতা পুত্রকে তাঁর স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলেন এবং পুত্রের অভিমত চাইলেন। পুত্র তার অভিমত ব্যক্ত করার সময় বললেন, ‘ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ছবরকারীদের অন্তর্ভুক্ত দেখতে পাবেন’। ইনশাআল্লাহ না বললে হয়ত তিনি ধৈর্য ধারণের তাওফীক পেতেন না। এরপর তিনি নিজেকে ‘ছবরকারী’ না বলে ‘ছবরকারীদের অন্তর্ভুক্ত’ বলেছেন এবং এর মাধ্যমে নিজের পিতা সহ পূর্বেকার বড় বড় আত্মোৎসর্গকারীদের মধ্যে নিজেকে শামিল করে নিজেকে অহমিকা মুক্ত করেছেন। যদিও তাঁর ন্যায় তরুণের এরূপ স্বেচ্ছায় আত্মোৎসর্গের ঘটনা ইতিপূর্বে ঘটেছিল বলে জানা যায় না। আল্লাহ বলেন,

‘অতঃপর (পিতা-পুত্র) উভয়ে যখন আত্মসমর্পণ করল এবং পিতা পুত্রকে উপুড় করে শায়িত করল’। ‘তখন আমরা তাকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইবরাহীম’! ‘তুমি তোমার স্বপ্ন সত্যে পরিণত করেছ। আমরা এভাবেই সৎকর্মশীলগণের প্রতিদান দিয়ে থাকি’। ‘নিশ্চয়ই এটি একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা’। ‘আর আমরা তার পরিবর্তে একটি মহান যবহ প্রদান করলাম’ ‘এবং আমরা এ বিষয়টি পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিলাম’। ‘ইবরাহীমের উপর শান্তি বর্ষিত হৌক’ (ছাফফাত ৩৭/১০৩-১০৯)। বর্তমানে উক্ত মিনা প্রান্তরেই হাজীগণ কুরবানী করে থাকেন এবং বিশ্ব মুসলিম ঐ সুন্নাত অনুসরণে ১০ই যুলহিজ্জাহ বিশ্বব্যাপী শরীআত নির্ধারিত পশু কুরবানী করে থাকেন।

এখানে শিক্ষণীয় অনেক কিছুই আছে নিঃসন্দেহে, এর মধ্যে একটি হতে পারে নরবলী বন্ধ করা – পলিথেইস্টরা দেবতাদের তুস্টির জন্য নরবলী দিতো। কিন্তু এই ঘটনায় স্পষ্টই বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে, ‘নরবলী নয়’, কেননা এরপর থেকে পশু কোরবানীই চলে আসছে। আরও একটি হতে পারে – কোরাবানীর যে রীতি প্রচলিত হয়েছে তাতে মরুর অর্থনীতি গতিলাভ করেছে – ঐ ধুসর মরুতে অন্যতম পেশা পশুপালন, কোরবানীর ফলে ধনীরা অর্থাৎ যাদের অর্থ আইডেল মানি হিসাবে সিন্দুকে পড়ে আছে, তা ব্যবহৃত হয় ও সামাজিক অর্থনীতির স্রোতে মিশে যায়, ফলে অর্থনীতি গতিপ্রাপ্ত হয়। তাছাড়া দরিদ্ররা প্রতি বছর প্রোটিন পেয়ে থাকে।

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী :

ইসহাক (আঃ) জন্মের সুসংবাদ :
কুরবানীর ঘটনার পরে ইবরাহীম (আঃ) কেন‘আনে ফিরে এলেন। এসময় বন্ধ্যা স্ত্রী সারাহ্-র গর্ভে ভবিষ্যৎ সন্তান ইসহাক জন্মের সুসংবাদ নিয়ে ফেরেশতাদের শুভাগমন ঘটে। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, উক্ত ফেরেশতাগণ ছিলেন হযরত জিবরাঈল, মীকাঈল ও ইসরাফীল। তারা মানুষের রূপ ধারণ করে এসেছিলেন। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআন-এর বক্তব্য নিম্নরূপ:

‘আর আমাদের প্রেরিত সংবাদবাহকগণ (অর্থাৎ ফেরেশতাগণ) ইবরাহীমের নিকটে সুসংবাদ নিয়ে এল এবং বলল, সালাম। সেও বলল, সালাম। অতঃপর অল্পক্ষণের মধ্যেই সে একটা ভূণা করা বাছুর এনে (তাদের সম্মুখে) পেশ করল’ (হূদ ১১/৬৯)। ‘কিন্তু সে যখন দেখল যে, মেহমানদের হাত সেদিকে প্রসারিত হচ্ছে না, তখন সে সন্দেহে পড়ে গেল ও মনে মনে তাদের সম্পর্কে ভয় অনুভব করতে লাগল (কারণ এটা তখনকার যুগের খুনীদের নীতি ছিল যে, যাকে তারা খুন করতো, তার বাড়ীতে তারা খেত না)। তারা বলল, আপনি ভয় পাবেন না। আমরা লূত্বের কওমের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। তার স্ত্রী (সারা) নিকটেই দাঁড়িয়েছিল, সে হেসে ফেলল। আমরা তাকে ইসহাকের জন্মের সুখবর দিলাম এবং ইসহাকের পরে (তার পুত্র) ইয়াকূবেরও। সে বলল, হায় কপাল! আমি সন্তান প্রসব করব? অথচ আমি বার্ধক্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি। আর আমার স্বামীও বৃদ্ধ। এতো ভারী আশ্চর্য কথা! তারা বলল, আপনি আল্লাহর নির্দেশের বিষয়ে আশ্চর্য বোধ করছেন? হে গৃহবাসীগণ! আপনাদের উপরে আল্লাহর রহমত ও প্রভূত বরকত রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রশংসিত ও মহিমময়’ (হূদ ১১/৭০-৭৩)। একই ঘটনা আলোচিত হয়েছে সূরা হিজর ৫২-৫৬ ও সূরা যারিয়াত ২৪-৩০ আয়াত সমূহে।

উল্লেখ্য যে, অধিক মেহমানদারীর জন্য ইবরাহীমকে ‘আবুয যায়ফান’ (ابو الضيفان) বা মেহমানদের পিতা বলা হ’ত। এই সময় বিবি সারাহর বয়স ছিল অন্যূন ৯০ ও ইবরাহীমের ছিল ১০০ বছর। সারাহ নিজেকে বন্ধ্যা মনে করতেন এবং সেকারণেই সেবিকা হাজেরাকে স্বামীর জন্য উৎসর্গ করেছিলেন ও তাঁর সাথে বিবাহ দিয়েছিলেন সন্তান লাভের জন্য। অথচ সেই ঘরে ইসমাঈল জন্মের পরেও তাকে তার মা সহ মক্কায় নির্বাসনে রেখে আসতে হয় আল্লাহর হুকুমে। ফলে সংসার ছিল আগের মতই নিরানন্দময়। কিন্তু আল্লাহর কি অপূর্ব লীলা! তিনি শুষ্ক নদীতে বান ডাকাতে পারেন। তাই নিরাশ সংসারে তিনি আশার বন্যা ছুটিয়ে দিলেন। যথাসময়ে ইসহাক (আঃ)-এর জন্ম হলো। যিনি পরে নবী হ’লেন এবং তাঁরই পুত্র ইয়াকূব (আঃ)-এর বংশধারায় ঈসা (আঃ) পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হাযার হাযার নবী প্রেরিত হ’লেন। ফলে হতাশ ও বন্ধ্যা নারী সারাহ এখন কেবল ইসহাকের মা হ’লেন না। বরং তিনি হ’লেন হাযার হাযার নবীর মা বা ‘উম্মুল আম্বিয়া’। ওদিকে মক্কায় ইসমাঈলের বয়স তখন ১৩/১৪ বৎসর। যাকে বলা হয়ে থাকে ‘আবুল আরব’ বা আরব জাতির পিতা।

বায়তুল্লাহ নির্মাণ:
বায়তুল্লাহ প্রথমে ফেরেশতাগণ নির্মাণ করেন। অতঃপর হযরত আদম (আঃ) পুনর্নিমাণ করেন জিব্রীলের ইঙ্গিত মতে। তারপর নূহ (আঃ)-এর তূফানের সময় বায়তুল্লাহর প্রাচীর বিনষ্ট হ’লেও ভিত্তি আগের মতই থেকে যায়। পরবর্তীতে আল্লাহর হুকুমে একই ভিত্তিভূমিতে ইবরাহীম তা পুনর্নির্মাণ করেন। এই নির্মাণকালে ইবরাহীম (আঃ) কেন‘আন থেকে মক্কায় এসে বসবাস করেন। ঐ সময় মক্কায় বসতি গড়ে উঠেছিল এবং ইসমাঈল তখন বড় হয়েছেন এবং বাপ-বেটা মিলেই কা‘বা গৃহ নির্মাণ করেন। আল্লাহর ইচ্ছায় তখন থেকে অদ্যাবধি কা‘বা গৃহে অবিরত ধারায় হজ্জ ও ত্বাওয়াফ চালু আছে এবং হরম ও তার অধিবাসীগণ পূর্ণ শান্তি, নিরাপত্তা ও মর্যাদা সহকারে সেখানে বসবাস করে আসছেন।

হযরত ইবরাহীম (আঃ) মাক্বামে ইবরাহীমে দাঁড়িয়ে এবং কোন কোন বর্ণনা মতে আবু কুবায়েস পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে দুই কানে আঙ্গুল ভরে সর্বশক্তি দিয়ে উচ্চ কণ্ঠে চারদিকে ফিরে বারবার হজ্জের উক্ত ঘোষণা জারি করেন।

কাবা শব্দের অর্থ ঘনক (The cube) পরবর্তি কোন পর্বে এই পবিত্র গৃহ সম্পর্কে আমি বিস্তারিত লেখার চেষ্টা করবো।

হযরত লুত (আঃ) ইব্রাহীম (আঃ) এর ভাতিজা ও অনুগামী। হযরত ইসমাইল (আঃ) এর জন্মকালে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর বয়স ছিল ৮৭ বছর এবং হযরত ইসহাক (আঃ) এর জন্মকালে তাঁহার বয়স ছিল ১০০ বছর। পবিত্র কোরআনে হযরত ইব্রাহীম (আঃ)সম্পর্কে বলা হয়েছে- “নিঃসন্দেহে আমি ইব্রাহীমকে প্রথম হইতেই হেদায়েত ও সৎপথের জ্ঞান দান করিয়াছিলাম এবং তাঁহার সম্বন্ধে খুব পরিজ্ঞাত ছিলাম। যখন তিনি তাঁহার পিতা ও স্বীয় কাওমকে বলিলেন এই মূতিগুলো কি? যাহা লইয়া তোমরা বসিয়া রহিয়াছে। তাহারা বলিল আমরা আমাদের পূর্বপুরুষগনকে ইহাদেরই পূজা করিতে দেখিয়াছি। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) বলিলেন নিঃসন্দেহে তোমরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষগন প্রকাশ্য ভ্রান্তির মধ্যে রহিয়াছে। তাহারা উত্তর করিল তুমি কি আমাদের জন্য কোন সত্য লইয়া আসিয়াছে? না কি এমনি বিদ্রুপকারীদের মত বলিতেছ? ইব্রাহীম (আঃ) বলিলেন (এ সমস্ত মূর্তিতোমাদের প্রতিপালক নহে) বরং তোমাদের প্রতিপালক জমিন ও আসমানসমুহের পরওয়ারদিগার যিনি এই সমুদয়কে সৃষ্টি করিয়াছেন। আর আমি এই বিশ্বাসই পোষণ করিতেছি। (সুরা আম্বিয়া- ৫১-৫৬) ।

কুরআন মাজীদে হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর নাম উচ্চারিত হয়েছে ৬৯ বার। যেসব সুরাতে ইব্রাহিম (আঃ) সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে- সূরা আল বাকারা, আন নিসা, আন-আম, তাওবা, হুদ, ইব্রাহিম, হিজর, আন নাহল, মরিয়ম, আম্বিয়া, আল হাজ্জ, শোয়ারা, আন কাবুত, সাফফাত, যুখরুফ, যারিয়াত, মুমতাহিনা।

পবিত্র বাইবেলে আব্রাহাম (ইব্রাহীম (আঃ)) সম্পর্কে যা বলা হয়েছে:

আদিপুস্তক ১২:
১ প্রভু অব্রামকে বললেন, “তুমি এই দেশ, নিজের জাতিকুটুম্ব এবং পিতার পরিবার ত্যাগ করে, আমি য়ে দেশের পথ দেখাব সেই দেশে চল।
২ তোমা হতে আমি এক মহাজাতি উত্পন্ন করব। তোমাকে আশীষ দেব এবং তুমি বিখ্যাত হবে। অন্যকে আশীর্বাদ জানাতে লোকে তোমার নাম নেবে।
৩ যারা তোমাকে আশীর্বাদ করবে, সেই লোকেদের আমি আশীর্বাদ করব এবং যারা তোমাকে অভিশাপ দেবে, সেই লোকেদের আমি অভিশাপ দেব। তোমার মাধ্যমে আমি পৃথিবীর সব লোকেদের আশীর্বাদ করব।”
৪ অতঃপর অব্রাম প্রভুর আজ্ঞা পালন করলেন। তিনি হারণ ত্যাগ করলেন এবং লোট তাঁর সঙ্গে গেলেন। অব্রামের বয়স তখন ৭৫ বছর।
৫ অব্রাম সঙ্গে নিলেন স্ত্রী সারী, ভ্রাতুষ্পুত্র লোট এবং হারণে তাঁদের যা কিছু ছিল সে সবই নিয়ে গেলেন। হারণে অব্রামের য়েসব দাসদাসী ছিল তাদেরও তিনি সঙ্গে নিলেন। দলবল সমেত হারণ ত্যাগ করে অব্রাম কনান দেশে যাত্রা করলেন।
৬ অব্রাম কনান দেশের মধ্য দিয়ে শিখিম শহরে গেলেন এবং তারপরে মোরিতে এক বিশাল গাছের কাছে গেলেন। সেই সময় কনানীযরা সেখানে বাস করতো।
৭ প্রভু অব্রামের সকাশে আত্মপ্রকাশ করলেন। প্রভু বললেন, “তোমার উত্তরপুরুষদের আমি এই দেশ দেব।”প্রভু যেখানে অব্রামকে দর্শন দিয়েছিলেন সেখানে অব্রাম প্রভুর উদ্দেশ্যে উত্সর্গ সম্পাদনের জন্যে পাথরের একটা বেদী নির্মাণ করলেন।
৮ তারপর অব্রাম সেই স্থান ত্যাগ করে গেলেন বৈথেলের পূর্বদিকে অবস্থিত পর্বতে এবং সেখানে তাঁর শিবির স্থাপন করলেন। বৈথেল নগর ছিল পশ্চিম দিকে আর অয় ছিল পূর্ব দিকে। সেখানে অব্রাম আর একটি বেদী নির্মাণ করলেন এবং প্রভুর উপাসনা করলেন।
৯ অতঃপর তিনি পুনরায় তাঁর যাত্রা শুরু করলেন। তিনি নেগেভের দিকে অগ্রসর হলেন।
১০ তখন দেশটা ছিল খুব শুষ্ক। অনাবৃষ্টির জন্যে কোনও শস্য উত্পাদন সম্ভব ছিল না। তাই অব্রাম বসবাসের জন্য আরও দক্ষিণে মিশরে গেলেন।
১১ তিনি খেয়াল করলেন য়ে তাঁর স্ত্রী সারী কত সুন্দরী। তাই মিশরে প্রবেশের ঠিক আগে সারীকে বললেন, “আমি জানি তুমি সুন্দরী।
১২ মিশরীয পুরুষরা তোমায় দেখবে। তারা বলবে, ‘এই মহিলা ঐ লোকটার স্ত্রী।’ তারা তখন তোমাকে পাওয়ার জন্যে আমায় মেরে ফেলবে।
১৩ তাই সবাইকে বলবে য়ে তুমি আমার বোন। তাহলে তারা আর আমায় হত্যা করবে না। তারা আমায় তোমার ভাই ভাববে, আমার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করবে। এইভাবে তুমি আমার প্রাণ বাঁচাবে।”
১৪ তখন অব্রাম মিশরে গেলেন। মিশরীয পুরুষরা দেখল য়ে সারী কত সুন্দরী।
১৫ মিশরের নেতারা কেউ কেউ তাঁকে দেখলেন। সারী য়ে কত সুন্দরী সে কথা তাঁরা বয়ং ফরৌণের কানে তুললেন। তাঁরা সারীকে ফরৌণের প্রাসাদে নিয়ে গেলেন।
১৬ অব্রামকে সারীর ভাই মনে করে ফরৌণ অব্রামের প্রতি সদয় ব্যবহার করলেন। অব্রামকে ফরৌণ মেষ, গবাদি পশু এবং বোঝা বইবার জন্য গাধা দিলেন। সেই সঙ্গে দাসদাসী এবং উটও পেলেন অব্রাম।
১৭ আর ফরৌণ অব্রামের স্ত্রীকে নিলেন। এই কারণে ফরৌণ এবং তাঁর প্রাসাদের সব লোকেদের প্রভু ভয়ঙ্কর অসুখ দিলেন।
১৮ তখন ফরৌণ অব্রামকে ডেকে বললেন, “তুমি আমার প্রতি খুব অন্যায় করেছ! সারী য়ে তোমার স্ত্রী সে কথা আমায় বলো নি কেন?
১৯ তুমি কেন বলেছিলে য়ে সারী তোমার বোন? তোমার বোন মনে করে আমি ওকে আমার স্ত্রী করব বলে এনেছিলাম। কিন্তু এখন তোমায় তোমার স্ত্রী ফেরত দিচ্ছি। ওকে নিয়ে তুমি চলে যাও!”
২০ তারপর ফরৌণ তাঁর লোকজনদের আদেশ করলেন, “অব্রামকে মিশরের বাইরে নিয়ে যাও।” সুতরাং অব্রাম ও তার স্ত্রী সেই দেশ ত্যাগ করলেন। এবং সঙ্গে তাঁদের সমস্ত জিনিসপত্রও নিয়ে গেলেন।

আদিপুস্তক ১৩:
১ অতঃপর অব্রাম মিশর ত্যাগ করলেন। তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের সমস্ত জিনিসপত্র নিয়ে অব্রাম নেগেভের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হলেন। তাঁর সঙ্গে তখন লোটও ছিল।
২ এই সময় অব্রাম খুবই ধনী। তাঁর প্রচুর পশু এবং প্রচুর সোনা ও রূপা ছিল।
৩ অব্রাম তাঁর যাত্রা অব্যাহত রাখলেন। নেগেভ ত্যাগ করে তিনি বৈথেলে ফিরে গেলেন। সেখান থেকে বৈথেল নগর আর অয় নগরের মধ্যবর্তী স্থানে গেলেন। এখানেই অব্রাম ও তাঁর পরিবার আগে একবার শিবির স্থাপন করেছিলেন।
৪ এই স্থানটিতেই একটি বেদী নির্মাণ করেছিলেন। তাই অব্রাম এই স্থানটিতেই প্রভুর উপাসনা করলেন।

১২ অব্রাম কনানেই থেকে গেলেন এবং লোট উপত্যকার জনপদগুলিতে বাস করতে লাগলেন। লোট উপত্যকার সূদুর দক্ষিণে সদোমে চলে গেলেন এবং সেখানেই তাঁবু পাতলেন।
১৩ প্রভু জানতেন য়ে সদোমের অধিবাসীরা মহাপাপী।
১৪ লোট চলে গেলে প্রভু অব্রামকে বলল, “তোমার চারদিকে তাকিয়ে দেখ। উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম চারদিকে তাকাও।
১৫ যত জমিজায়গা দেখতে পাচ্ছ, সব আমি তোমায় এবং তোমার বংশধরদের দেব। এ দেশ চিরকালের জন্যে তোমার হবে।
১৬ পৃথিবীর ধূলোর মত আমি তোমার উত্তরপুরুষদের সংখ্যাবৃদ্ধি করব। যদি লোকে পৃথিবীর সব ধূলো গুনতে পারে তাহলে তোমার লোকেদের গোনা যাবে।
১৭ অতএব এগিয়ে যাও, তোমার নিজের দেশে তুমি হেঁটে বেড়াও। এই দেশ আমি তোমায় দিলাম।”
১৮ তখন অব্রাম তাঁর তাঁবু উঠিয়ে নিলেন। তিনি মম্রির উচ্চ বৃক্ষগুলির কাছে বাস করতে গেলেন। স্থানটি ছিল হিব্রোণ নগরের কাছে। সেখানে অব্রাম প্রভুর উদ্দেশ্যে উপাসনা করার জন্যে একটি বেদী নির্মাণ করলেন।
আদিপুস্তক ১৪:
১৮ শালেমের রাজা মল্কীষেদকও অব্রামের সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে গেলেন। মল্কীষেদক ছিলেন পরাত্পর ঈশ্বরের একজন যাজক। মল্কীষেদক নিয়ে এলেন রুটি ও দ্রাক্ষারস।
১৯ অব্রামকে আশীর্বাদ করে মল্কীষেদক বললেন,“হে অব্রাম, পরাত্পর তোমাকে আশীর্বাদ করুন। ঈশ্বর স্বর্গ ও মর্ত্য সৃষ্টি করেছেন।
২০ আমরা পরাত্পর ঈশ্বরের প্রশংসা করি। তিনি শত্রুদের পরাস্ত করতে তোমাকে সাহায্য করেছেন।”অব্রাম যুদ্ধের সময় যা যা পেয়েছিলেন তার থেকে এক দশমাংশ মল্কীষেদককে দিলেন।
২১ সদোমের রাজা বললেন, “আপনি নিজের জন্যে সব রেখে দিন। শত্রুরা য়ে লোকেদের নিয়ে গেছে শুধু আমার সেই লোকদের আমাকে দিন।”
২২ কিন্তু সদোমের রাজাকে অব্রাম বললেন, “পরাত্পর ঈশ্বর, যিনি স্বর্গ মর্ত্য সৃষ্টি করেছেন সেই প্রভুর কাছে আমি শপথ করছি।
২৩ যা কিছু আপনার তার কিছুই আমি রাখব না। আমি প্রতিশ্রুতি করছি য়ে আমি কিছুই রাখব না। এমনকি একটা সুতো অথবা জুতোর ফিতেও না. আমি চাই না য়ে আপনি বলবেন, ‘অব্রামকে আমি বড় লোক বানিয়েছি।’
২৪ আমি শুধু সেটুকুই নেব যা আমার য়োদ্ধারা খেয়েছে। কিন্তু অন্যদের আপনি তাদের ভাগ দিন। যুদ্ধে যা জিতেছি তা আপনি নিয়ে যান, কিন্তু কিছু আনের, ইষ্কোল এবং মম্রিকে দিয়ে যান। এরা যুদ্ধে আমায় সাহায্য করেছে।”
আদিপুস্তক ১৫:
১ এইসব ঘটনাবলির পরে অব্রাম দর্শনের মধ্যে প্রভুর কথা শুনতে পেলেন। ঈশ্বর বললেন, “অব্রাম চিন্তা কোরো না। আমি তোমায় রক্ষা করব। আমি তোমায় এক মহাপুরস্কার দেব।”
২ কিন্তু অব্রাম বললেন, “প্রভু ঈশ্বর, আমায় খুশী করার মত আপনি কিছুই দিতে পারবেন না। কেন? কারণ আমার কোনও পুত্র নেই। তাই আমার মৃত্যুর পরে আমার দম্মেশকীয দাস ইলীযেষর আমার সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে।”
৩ অব্রাম বললেন, “আপনি আমায় পুত্র দেননি। তাই য়ে দাস আমার ঘরে জন্ম লাভ করেছে সে-ই পাবে আমার সমস্ত ধনসম্পত্তি।”
৪ তখন প্রভু অব্রামের সঙ্গে কথা বললেন। ঈশ্বর বললেন, “ঐ দাস তোমার নিজের পুত্র হবে. এবং তোমার ঔরসজাত পুত্রই তোমার সমস্ত কিছুর উত্তরাধিকার পাবে।”
৫ তখন ঈশ্বর অব্রামকে বাইরে ডেকে নিয়ে গেলেন। ঈশ্বর বললেন, “আকাশের দিকে তাকাও। দেখ, সেখানে কত তারা। এত তারা য়ে তুমি গুণতেই পারবে না। ভবিষ্যতে তোমার বংশধরেরাও ঐরকম অগুনতি হবে।”
৬ অব্রাম ঈশ্বরকে বিশ্বাস করলেন এবং ঈশ্বর অব্রামের বিশ্বাসকে তার ধার্মিকতা হিসেবে বিবেচনা করলেন।
৭ এবং ঈশ্বর অব্রামকে বললেন, “আমিই সেই প্রভু, যিনি তোমায় বাবিলের উর থেকে নিয়ে এসেছিলেন, যাতে এই দেশটা আমি তোমায় দিতে পারি। এই দেশ তুমি পাবে।”
৮ কিন্তু অব্রাম বললেন, “প্রভু আমার গুরু, এই দেশ য়ে আমি পাব তার নিশ্চয়তা কি?”
৯ ঈশ্বর অব্রামকে বললেন, “আমরা একটা চুক্তি করব। আমায় একটা তিন বছরের বাছুর, তিন বছরের ছাগল আর তিন বছরের মেষ এনে দাও। একটা বাচ্চা পায়রা আর একটা ঘুঘুপাখীও এনে দাও।”
১০ অব্রাম এই সমস্ত ঈশ্বরের কাছে এনে দিলেন। অব্রাম প্রাণীগুলি হত্যা করে এবং প্রতিটির দুটি করে খণ্ড করে ঐ খণ্ডগুলি থাক-থাক করে সাজিযে রাখলেন। কিন্তু পাখীগুলিকে অব্রাম দুখণ্ড করেন নি।
১১ পরে ঐসব প্রাণীর মাংসখণ্ডের জন্যে বড় বড় পাখী ছোঁ মেরে এলো। কিন্তু অব্রাম সেগুলি তাড়িয়ে দিলেন।
১২ বেলা বাড়তে থাকল, ঢলে পড়তে লাগল সূর্য়। অব্রামের ভীষণ ঘুম পেল এবং শেষ পর্য্ন্ত তিনি ঘুমিযে পড়লেন। তখন নেমে এল এক ভীষণ অন্ধকার।
১৩ তখন প্রভু অব্রামকে বললেন, “তোমার কযেকটা কথা জেনে রাখা উচিত্। তোমার উত্তরপুরুষরা য়ে দেশে বাস করবে সেই দেশ তাদের নয়, সেখানে তারা বিদেশী বলে গণ্য হবে। এবং সেই দেশের অধিবাসীরা ৪০0 বছর ধরে তোমার উত্তরপুরুষদের দান করে রাখবে এবং তাদের উপর নানা উত্পীড়ন করবে।
১৪ কিন্তু তারপর য়ে জাতি তোমার উত্তরপুরুষদের দাস করে রেখেছিল তাদের আমি শাস্তি দেব। তোমার উত্তরপুরুষরা সেই জাতি ত্যাগ করবে এবং তাদের সঙ্গে নিয়ে যাবে বহু ভাল জিনিস।
১৫ “তুমি নিজে বহুকাল জীবিত থাকবে। শান্তিতে তুমি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবে। তোমার সমাধি হবে তোমার পরিবারের মধ্যে।
১৬ চার প্রজন্ম পরে তোমার আত্মীয়স্বজনরা আবার এই দেশে আসবে। তখন তারা এখানকার অধিবাসী ইমোরীয়দের পরাস্ত করবে। তোমার আত্মীয়স্বজনদের মাধ্যমে আমি ইমোরীয়দের শাস্তি দেব। এটা ভবিষ্যতে ঘটবে। কারণ ইমোরীয়রা এখনও আমার কাছে শাস্তি পাওয়ার মত খারাপ হয় নি।”
১৭ সূর্য় অস্ত গেলে গাঢ় অন্ধকার ঘনাল। দুখণ্ড করা মৃত পশুগুলি তখনও মাটির উপরে পড়ে আছে। সেই সময় আগুন ও ধোঁযার স্তম্ভ মৃত পশুগুলির অর্ধেক খণ্ডগুলির মধ্য দিয়ে চলে গেল।
১৮ সুতরাং ঐদিন প্রভু অব্রামকে একটা প্রতিশ্রুতি দিলেন এবং সেই অনুসারে অব্রামের সঙ্গে একটা চুক্তি করলেন। প্রভু বললেন, “এই দেশ আমি তোমার উত্তরপুরুষদের দেব। মিশর নদ এবং ফরাত্ নদের মধ্যবর্তী বিশাল ভূভাগ আমি তাদের দেব।
১৯ এটা হল কেনীয়, কনিষীয, কদ্মোনীয,
২০ হিত্তীয়, পরিষীয়, রফাযীয,
২১ ইমোরীয়, কনানীয়, গির্গানীয় এবং যিবুষীয় বংশগুলির দেশ।”
আদিপুস্তক ১৬:
১ সারী ছিল অব্রামের স্ত্রী। তার ও অব্রামের কোনও সন্তানাদি ছিল না। সারী মিশর থেকে একজন দাসী এনেছিল। তার নাম হাগার।
২ সারী অব্রামকে বললেন, “প্রভু আমায় সন্তান ধারণের ক্ষমতা দেন নি। তাই তুমি আমার দাসী হাগারের কাছে যাও। আমাকে একটি সন্তান দাও এবং আমি সেই সন্তানকে নিজের বলে গ্রহণ করবো।”অব্রাম সারীর নির্দেশ অনুসরণ করলেন।
৩ অব্রাম কনানে দশ বছর বাস করার পরে এই ঘটনা ঘটে। সারী হাগারকে তাঁর স্বামী অব্রামের কাছে পাঠালো। (হাগার ছিল তাঁর মিশরীয দাসী।)
৪ অব্রামের দ্বারা হাগার গর্ভবতী হলো। যখন সে একথা জানতে পারল সে খুব গর্বিতা হয়ে উঠল এবং ভাবল সে তার প্রভু পত্নী সারীর চেযে ভাল।
৫ কিন্তু সারী অব্রামকে বলল, “আমার দাসী এখন আমাকেই তিরস্কার করে এবং এর জন্যে তুমি দায়ী। আমিই তাকে তোমার কাছে পাঠিয়েছিলাম। সে গর্ভবতী হল। এখন সে নিজেকে আমার চেয়ে ভাল মনে করে। প্রভু বিচার করুন য়ে কোনটা ঠিক।”
৬ কিন্তু অব্রাম সারীকে বলল, “তুমিই হাগারের গৃহকর্ত্রী। তোমার য়ে রকম ইচ্ছে সে রকমভাবেই তুমি হাগারের ব্যবস্থা করবে।” ফলে সারী তাঁর দাসী হাগারকে দুঃখ দিলেন এবং হাগার সেখান থেকে পালিয়ে গেল।
৭ মরুভূমির মধ্যে এক জলপূর্ণ কূপের পাশে প্রভুর দূত হাগারকে দেখতে পেল। জলাশযটি ছিল শূর যাওয়ার পথে।
৮ সেই দূত বলল, “হাগার তুমি তো সারীর পরিচারিকা। তুমি এখানে কেন? তুমি কোথায় যাচ্ছো?”হাগার বলল, “আমি সারীর কাছ থেকে পালাচ্ছি।”
৯ প্রভুর দূত হাগারকে বলল, “সারী তোমার গৃহকর্ত্রী। তার কাছে ফিরে যাও। তার বাধ্য হও।
১০ হাগারকে প্রভুর দূত আরও বলল, “তোমার থেকে বিশাল জনসমষ্টি সৃষ্টি হবে। এত বিপুল জনসংখ্যা হবে য়ে তাদের গুনে শেষ করা যাবে না।”
১১ প্রভুর দূত আরও বলল,“হাগার, এখন তুমি গর্ভবতী, তুমি হবে এক পুত্রের জননী। পুত্রের নাম দেবে ইশ্মায়েল, কারণ প্রভু শুনেছেন তোমার উপর দুর্ব্যবহার হয়েছে, তিনি তোমাকে সাহায্য করবেন।
১২ “ইশ্মায়েল স্বাধীন এবং উদ্দাম হবে য়েমন উদ্দাম হয় বন্য গাধা। সে সবার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে এবং সবাই হবে তার প্রতিপক্ষ। সে স্থান থেকে স্থানান্তরে ঘুরে বেড়াবে এবং ভাইদের বসতির কাছে তাঁবু গাড়বে।”
১৩ প্রভু হাগারের সঙ্গে কথা বললেন। হাগার ঈশ্বরের এক নতুন নাম দিল। সে তাঁকে বলল, “আপনি হলেন ঈশ্বর যিনি আমায় দেখেন।” সে এই কথা বলল কারণ সে ভাবল, “এরকম জায়গাতেও ঈশ্বর আমায় দেখতে পাচ্ছেন, আমার ভালমন্দের কথা চিন্তা করছেন।”
১৪ সুতরাং ঐ কূপের নাম হল বের-লহয়-রোযী। কাদেশ এবং বেরদ অঞ্চলের মধ্যে ঐ কূপের অবস্থান।
১৫ হাগার অব্রামের পুত্রের জন্ম দিল। সে অব্রাম পুত্রের নাম দিল ইশ্মাযেল।
১৬ যখন হাগারের গর্ভে ইশ্মাযেলের জন্ম হয় তখন অব্রামের বয়স ৮৬ বছর।
আদিপুস্তক ১৭:
১ অব্রামের ৯৯ বছর বয়স হলে প্রভু তাঁর সামনে আবির্ভূত হলেন। প্রভু বললেন, “আমি সর্বশক্তিমান ঈশ্বর। আমার জন্যে এই কাজগুলি করো: আমার কথামত চলো এবং সত্পথে জীবনযাপন করো।
২ এটা যদি করো তাহলে আমাদের মধ্যে একটা চুক্তির ব্যবস্থা করব। আমি প্রতিশ্রুতি করছি য়ে তোমার বংশধরদের আমি এক মহান জাতিতে পরিণত করব।”
৩ তখন অব্রাম ঈশ্বরের সামনে প্রণামে নত হলেন। ঈশ্বর তাঁকে বললেন,
৪ “আমাদের চুক্তিতে এটি আমার অংশ। আমি তোমাকে বহু জাতির পিতা করব।
৫ আমি তোমার নাম পরিবর্তন করব। তোমার নাম অব্রামের পরিবর্তে অব্রাহাম হবে। আমি তোমায় এই নাম দিচ্ছি কারণ আমি তোমায় বহু জাতির পিতা করছি।
৬ আমি তোমার বংশ অতিশয বৃদ্ধি করব। তোমার থেকে নতুন নতুন জাতির এবং রাজার জন্ম হবে।
৭ এবং তোমার ও আমার মধ্যে এক চুক্তি সম্পন্ন হবে। তোমার সমস্ত উত্তরপুরুষগণের জন্যও এই একই চুক্তি প্রয়োজ্য হবে। এই চুক্তি চিরকাল বহাল থাকবে। আমি তোমার ও তোমার উত্তরপুরুষগণের জন্য ঈশ্বর থাকব।
৮ আমি তোমাকে এবং তোমার সব উত্তরপুরুষদের এই কনান দেশ দেব যার মধ্য দিয়ে তোমরা যাত্রা করছ। আমি তোমাকে এই দেশ চিরকালের জন্য দেব। আমি হব তোমার ঈশ্বর।”
৯ এবং ঈশ্বর অব্রাহামকে বললেন, “এখন তোমার দিক থেকে এই চুক্তি হবে এই রকম। তুমি এবং তোমার উত্তরপুরুষগণ আমার চুক্তি মান্য করবে।
১০ এটাই চুক্তি যা তুমি মেনে চলবে। তোমার ও আমার মধ্যে এটাই হল চুক্তি। তোমার উত্তরপুরুষগণের জন্যেও এটাই চুক্তি। যত পুত্র সন্তান হবে প্রত্যেককে সুন্নত করতে হবে।
১১ তোমার আর আমার মধ্যে চুক্তি য়ে তুমি মেনে চলবে, এই সুন্নত হবে তার প্রমাণস্বরূপ।
১২ শিশু পুত্রের বয়স আট দিন হলে এই সুন্নত সম্পন্ন করবে। তোমার পরিবারে যত ছেলের এবং তোমার দাসদের মধ্যে যত ছেলের জন্ম হবে, তোমার বংশধর নয় এমন বিদেশীদের কাছ থেকে তোমার অর্থ দিয়ে তুমি য়ে দাসদের কিনেছিলে তাদের য়ে ছেলেরা জন্মাবে, সকলের অবশ্যই সুন্নত করা হবে।
১৩ সুতরাং তোমার জাতির প্রত্যেক শিশু পুত্রকে সুন্নত করা হবে। তোমার পরিবারের অথবা ক্রীতদাসের সব পুত্রদের এভাবে সুন্নত করা হবে।
১৪ অব্রাহাম, তোমার ও আমার মধ্যে এটাই চুক্তি; সুন্নত করা হয়নি এমন কোন পুরুষ থাকলে সে হবে তার নিজের লোকেদের স্বজাতির থেকে বিচ্ছিন্ন। কারণ সে ব্যক্তি আমার চুক্তি ভঙ্গকারী।”
১৫ ঈশ্বর অব্রাহামকে বললেন, “তোমার স্ত্রী সারীকে আমি এক নতুন নাম দেব। তার নতুন নাম হবে সারা অর্থাত্ রানী।
১৬ আমি তাকে আশীর্বাদ করব। আমি তাকে একটি পুত্র দেব এবং তুমি হবে সেই পুত্রের পিতা। সারা হবে বহু নতুন জাতির মাতা। সারা থেকে আসবে বহু জাতির বহু রাজা।”
১৭ ঈশ্বরকে য়ে তিনি মান্য করেন এই কথা বোঝাবার জন্যে অব্রাহাম আভূমি মাথা নত করলেন। কিন্তু তিনি নিজের মনে হেসে বললেন, “আমার ১০0 বছর বয়স। আমার আর সন্তান হতে পারে না। এবং সারার ৯০ বছর বয়স। সে সন্তানের জন্ম দিতে পারবে না।”
১৮ তখন অব্রাহাম ঈশ্বরকে বলল, “আশা করি ইশ্মাযেল বেঁচে থেকে আপনার সেবা করবে।”
১৯ ঈশ্বর বললেন, “না! আমি বলেছি য়ে তোমার স্ত্রী সারার একটি পুত্র হবে। তুমি তার নাম দেবে ইসহাক। তার সঙ্গে আমি আমার চুক্তি সম্পাদন করব। তার সঙ্গে ঐ চুক্তি এমন হবে যা তার উত্তরপুরুষগণের সঙ্গেও চিরকাল বজায় থাকবে।
২০ “তুমি ইশ্মাযেলের কথা বলেছ এবং আমি সে কথা শুনেছি। আমি তাকে আশীর্বাদ করব। তার বহু সন্তানসন্ততি হবে। সে বারোজন মহান নেতার পিতা হবে। তার পরিবার থেকে সৃষ্টি হবে এক মহান জাতির।
২১ কিন্তু আমি ইসহাকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হব। সারার য়ে পুত্র হবে সে-ই হবে ইসহাক – পরের বছর ঠিক এই সময় সেই পুত্রের জন্ম হবে।”
২২ অব্রাহামের সঙ্গে কথা শেষ করে ঈশ্বর উপরে স্বর্গে চলে গেলেন।
২৩ ঈশ্বর অব্রাহামকে পরিবারের সমস্ত পুরুষ ও বালকের সুন্নতের কথা বলেছিলেন। সুতরাং অব্রাহাম ইশ্মাযেল এবং তাঁর গৃহে জন্ম হয়েছে এমন সমস্ত দাসদের একত্রে সমবেত করলেন। যাদের অর্থ দিয়ে ক্রয করা হয়েছিল, সেই ক্রীতদাসদেরও তিনি সমবেত করলেন। অব্রাহামের বাড়ীর প্রত্যেক পুরুষ ও বালককে একত্র করা হল। এবং প্রত্যেককে সুন্নত করা হল। তাদের সকলকে একই দিনে সুন্নত করা হল।
২৪ অব্রাহামকে যখন সুন্নত করা হল তখন তাঁর বয়স ৯৯ বছর।
২৫ এবং তাঁর পুত্র ইশ্মাযেলের সুন্নতের সময় ১৩ বছর বয়স ছিল।
২৬ অব্রাহাম ও তাঁর পুত্রের একই দিনে সুন্নত করা হয়।
২৭ সেই একই দিনে অব্রাহামের বাড়ীর সমস্ত পুরুষেরাও সুন্নত হয়। য়েসব দাসদের অর্থ দিয়ে ক্রয করা হয়েছিল এবং য়েসব দাসদের তাঁর গৃহেই জন্ম হয়েছিল সকলেরই সুন্নত করা হল।
আদিপুস্তক ১৮
১ পরে প্রভু পুনরায় অব্রাহামের সামনে আবির্ভূত হলেন। মম্রির ওক বৃক্ষগুলির কাছে অব্রাহাম বাস করছিলেন। একদিন অব্রাহাম নিজের তাঁবুর প্রবেশ পথে বসেছিলেন। তখন দিনের সবচেয়ে চড়া গরমের সময়।
২ অব্রাহাম চোখ তুলে দেখলেন য়ে তাঁর সামনে তিনজন আগন্তুক দাঁড়িয়ে। তাঁদের দেখে অব্রাহাম তাঁদের কাছে গিয়ে অভিবাদন জানালেন।
৩ অব্রাহাম বললেন, “মহাশয়গণ, আমি আপনাদের সেবক, আমার এখানে আপনারা কিছুক্ষণ অবস্থান করুন।

৯ তারপর তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার স্ত্রী সারা কোথায়?”অব্রাহাম বললেন, “ওখানে ঐ তাঁবুর মধ্যে।”
১০ তখন প্রভু বললেন, “আমি আবার বসন্তকালে আসব। তখন তোমার স্ত্রী সারার একটি পুত্র হবে।”তাঁবুর ভেতর থেকে সারা সমস্ত কথাবার্তা শুনছিলেন।
১১ অব্রাহাম ও সারা তখন রীতিমত বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। সন্তান জন্ম দেওয়ার বয়স সারা অনেকদিন আগে পার হয়ে এসেছেন।
১২ স্বভাবতই সারা যা শুনলেন তা বিশ্বাস করলেন না। নিজের মনে মনে সারা হেসে বললেন, “আমি বৃদ্ধা হয়েছি আর আমার স্বামীও বৃদ্ধ। সন্তান প্রসবের পক্ষে আমার অনেক বেশী বয়স হয়েছে।”
১৩ তখন প্রভু অব্রাহামকে বললেন, “সারা হাসছে। সারা ভাবছে য়ে সন্তানের জন্ম দেওয়ার পক্ষে তার অনেক বেশী বয়স হয়েছে।
১৪ কিন্তু প্রভুর পক্ষে কি কোনও কাজ খুব কঠিন? না! আমি য়েমন বলেছি, আবার বসন্তকালে, তেমনই আসব এবং তোমার স্ত্রী সারার তখন সন্তান হবে।”
১৫ কিন্তু সারা বলল, “আমি হাসি নি! (একথা বললেন কারণ তিনি ভয় পেয়েছিলেন।)কিন্তু প্রভু বললেন, “না! আমি জানি, তা সত্যি নয়! তুমি হেসেছিলে!”
১৬ তারপর সেই তিনজন আগন্তুক যাওয়ার জন্যে উঠে দাঁড়ালেন। সদোমের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন এবং সদোম অভিমুখে চলতে শুরু করলেন। তাঁদের এগিয়ে দেওয়ার জন্য অব্রাহামও তাদের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে শুরু করলেন।
১৭ প্রভু আপন মনে বললেন, “এখন আমি কি করব তা কি অব্রাহামকে বলব?
১৮ অব্রাহাম থেকে জন্মলাভ করবে এক মহান ও শক্তিশালী জাতি এবং অব্রাহামের জন্যেই পৃথিবীর সমস্ত মানুষ আশীর্বাদ প্রাপ্ত হবে।
১৯ আমি অব্রাহামের সাথে এক বিশেষ চুক্তি করেছি। প্রভুর ইচ্ছা অনুসারে জীবনযাপনের জন্যে যাতে অব্রাহামের সন্তানসন্ততি ও উত্তরপুরুষগণ অব্রাহামের আজ্ঞা পালন করে তাই এই ব্যবস্থা করেছি। এটা করেছি যাতে তারা ন্যায়পরায়ণ ও সত্ জীবনযাপন করে। তাহলে আমি প্রভু, প্রতিশ্রুত জিনিসগুলি দিতে পারব।”
২০ তারপরে প্রভু বললেন, “য়ে নিদারুণ পাপ সেখানে সংঘটিত হচ্ছে, তার জন্য আমি সদোম এবং ঘমোরার বিরুদ্ধে তীব্র আর্তনাদ শুনেছি।
২১ যত খারাপ বলে শুনেছি তা সত্যিই তত খারাপ কিনা তা আমি নিজে গিয়ে দেখব। তাহলে আমি নিশ্চিতভাবে সব জানব।”
২২ তখন তাঁরা তিনজন সদোম অভিমুখে হাঁটতে শুরু করলেন। কিন্তু অব্রাহাম প্রভুর সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন।
২৩ অব্রাহাম প্রভুর কাছে এলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, “প্রভু, আপনি কি ভাল লোকেদেরও ধ্বংস করবেন য়েমন আপনি মন্দ লোকেদের ধ্বংস করেন?
২৪ সদোম নগরে যদি ৫০ জনও ভাল লোক থাকে তাহলে আপনি কি করবেন? তাহলেও কি আপনি নগরটা ধ্বংস করবেন? নিশ্চয়ই আপনি ঐ নগরবাসী ৫০ জন ভাল লোকের জন্যে নগরটা ধ্বংস করবেন?
২৫ তাহলে আপনি নিশ্চয়ই ঐ নগরটা বা ঐ খারাপ লোকেদের ধ্বংস করবেন না? যদি তা করেন তাহলে ভাল এবং মন্দ লোকেদের একই পরিণতি হবে। তার অর্থ, ভাল এবং মন্দ জাতীয উভয় লোকদেরই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। আপনি সমস্ত পৃথিবীর বিচারক। আমি জানি আপনি ঠিক বিচারই করবেন।”
২৬ তখন প্রভু বললেন, “আমি যদি সদোম নগরে ৫০ জন ভাল লোক পাই তাহলে আমি সমগ্র নগরটাকেই রক্ষা করব।”
২৭ তখন অব্রাহাম বললেন, “আপনার তুলনায় আমি নেহাতই ধুলো আর ছাই। কিন্তু একটা প্রশ্ন করে আবার আপনাকে বিরক্ত করছি।
২৮ যদি ভাল লোকদের থেকে ৫ জনেকে খুঁজে না পাওয়া যায় তখন কি করবেন? নগরে যদি মাত্র ৪৫ জন ভাল লোক থাকে? মাত্র ৫ জনকে পাওয়া গেল না বলে কি আপনি গোটা নগর ধ্বংস করে ফেলবেন?”তখন প্রভু বললেন, “যদি আমি ৪৫ জন ভাল লোককেও পাই তাহলে ঐ নগর ধ্বংস করব না।”
২৯ অব্রাহাম আবার বললেন, “সেখানে গিয়ে আপনি যদি মাত্র ৪০ জন ভাল লোককে পান তাহলে কি আপনি পুরো নগর ধ্বংস করবেন?”প্রভু বললেন, “আমি যদি ৪০ জন ভাল লোককেও পাই তাহলে আমি নগরটা ধ্বংস করব না।”
৩০ অব্রাহাম বললেন, “প্রভু দয়া করে আমার ওপর রাগ করবেন না। একটা প্রশ্ন করি! যদি নগরে মাত্র ৩০ জন ভাল লোককে পান তাহলেও কি আপনি ঐ নগর ধ্বংস করবেন?”তখন প্রভু বললেন, “আমি যদি ৩০ জন ভাল লোক পাই তাহলে নগরটা ধ্বংস করব না।”
৩১ তখন অব্রাহাম বললেন, “আপনাকে কি আর একবার বিরক্ত করতে পারি? যদি সেখানে মাত্র ২০ জন ভাল লোক পান তাহলে কি করবেন?”প্রভু বললেন, “আমি যদি ২০ জন ভাল লোক পাই তাহলে আমি নগরটা ধ্বংস করবো না।”
৩২ তখন অব্রাহাম বললেন, “প্রভু দয়া করে রাগ করবেন না, কিন্তু শেষবারের মতো আর একটি প্রশ্ন দিয়ে আপনাকে বিরক্ত করি। আপনি যদি সেখানে মাত্র ১০ জন ভাল লোক পান তাহলে আপনি কি করবেন?”প্রভু বললেন, “ঐ নগরে ১০ জন ভাল লোক পেলেও আমি তা ধ্বংস করব না।”
৩৩ প্রভুর অব্রাহামকে যা বলার ছিল, সব বলা হয়ে গেল। এবার প্রভু তাঁর পথে চলে গেলেন এবং অব্রাহাম নিজের বাসস্থানে ফিরে গেলেন।

আদিপুস্তক ১৯
১ সেদিন সন্ধ্যায় সদোম নগরে দুজন দূত এলেন। তখন লোট নগরের প্রবেশ পথে বসেছিলেন। তিনি দূতদের আসতে দেখলেন। লোট ভাবলেন য়ে তারা সাধারণ পথিক, নগরের মধ্য দিয়ে কোথাও যাচ্ছে। লৌট উঠে গিয়ে তাঁদের অভিবাদন করে

২৪ একই সময়ে প্রভু সদোম ও ঘমোরা ধ্বংস করা শুরু করলেন। প্রভু আকাশ থেকে আগুন আর জ্বলন্ত গন্ধক বর্ষণ শুরু করলেন।
২৫ অর্থাত্ প্রভু ঐ নগরগুলি ধ্বংস করলেন। সমস্ত গাছপালা, সমস্ত লোকজন, সমগ্র উপত্যকাটাই প্রভু ধ্বংস করলেন।
২৬ লোট যখন স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছিলেন তখন লোটের স্ত্রী নিষেধ ভুলে একবার পেছনে নগরের দিকে তাকালেন এবং তখনই লবণের মূর্ত্তি হয়ে গেলেন।
২৭ খুব সকালে অব্রাহাম আগে য়েখানটাতে প্রভুর সামনে দাঁড়িয়েছিলেন সেই স্থানটিতে তিনি আবার গিয়ে দাঁড়ালেন।
২৮ অব্রাহাম সদোম এবং ঘমোরার দিকে তাকিযে দেখলেন। সমগ্র উপত্যকার ওপর দৃষ্টিপাত করে অব্রাহাম দেখলেন য়ে সমস্ত উপত্যকা থেকে ধোঁযা উঠছে। দেখে মনে হল বিশাল অগ্নিকাণ্ডের ফলস্বরূপ ঐ ধোঁযা।
২৯ ঈশ্বর উপত্যকার সমস্ত নগর ধ্বংস করলেন। কিন্তু ঈশ্বর ঐ নগরগুলি ধ্বংস করার সময় অব্রাহামের কথা মনে রেখেছিলেন এবং তিনি অব্রাহামের ভ্রাতুষ্পুত্রকে ধ্বংস করেন নি। লোট ঐ উপত্যকার নগরগুলির মধ্যে বাস করছিলেন। কিন্তু নগরগুলি ধ্বংস করার আগে ঈশ্বর লোটকে অন্যত্র পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
আদিপুস্তক ২০
১ অব্রাহাম পূর্বের বাসস্থান ত্যাগ করে নেগেভে গেলেন। তিনি কাদেশ এবং শূরের মধ্যবর্তী গরার নগরে বাস করা শুরু করলেন।
২ গরারে বাস করার সময় অব্রাহাম সবাইকে বললেন য়ে সারা তাঁর বোন। গরারের রাজা অবীমেলক সে কথা শুনলেন। অবীমেলক সারাকে কামনা করলেন, তাই সারাকে নিয়ে আসার জন্য কযেকজন ভৃত্যকে পাঠালেন।

৭ সুতরাং তুমি অব্রাহাম ও তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে দাও। অব্রাহাম একজন ভাববাদী। সে তোমার জন্যে প্রার্থনা করবে এবং তুমি তাতে জীবন লাভ করবে। কিন্তু তুমি যদি অব্রাহাম ও তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে না দাও তাহলে আমি নিশ্চিত য়ে তোমার মৃত্যু আসন্ন এবং তোমার সমস্ত পরিবারেরও মৃত্যু হবে।”

১১ তখন অব্রাহাম বললেন, “আমি ভয় পেয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, এখানে কেউ বোধহয় ঈশ্বরকে শ্রদ্ধা করে না। তাই ভেবেছিলাম, সারাকে পাওয়ার জন্যে আমাকে কেউ হত্যা করতেও পারে।
১২ সারা আমার স্ত্রী, আবার আমার বোনও বটে। সারা আমার পিতার কন্যা বটে, কিন্তু আমার মাতার কন্যা নয়।
১৩ ঈশ্বর আমাকে পিতৃগৃহ থেকে দূরে কোথাও নিয়ে যাচ্ছেন। ঈশ্বর আমাকে অনেক দেশে নিয়ে গেছেন। যখন এরকম হল তখন আমি সারাকে বললাম, ‘আমার জন্য কিছু করো; যেখানেই আমরা যাব, সবাইকে বলবে য়ে তুমি আমার বোন।”

১৫ এবং অবীমেলক বললেন, “চারদিকে তাকিয়ে দেখুন। এসবই আমার জমি। আপনার যেখানে খুশী সেখানে থাকতে পারেন।”
১৬ আর অবীমেলক সারাকে বললেন, “তোমার ভাই অব্রাহামকে আমি ১২০0 রৌপ্যমুদ্রা দিয়েছি। যা কিছু ঘটেছে সেসবের জন্যে আমি দুঃখিত এটা বোঝাতেই এই রৌপ্যমুদ্রা। সবাই জানুক য়ে আমি ন্যায় মেনে কাজ করেছি।”
আদিপুস্তক ২১
১ প্রভু সারার জন্যে য়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা রক্ষা করলেন। প্রভু সারার জন্যে দেওয়া প্রতিশ্রুতি সম্পন্ন করলেন।
২ সারা গর্ভবতী হলেন এবং এই বেশী বয়সে অব্রাহামের জন্যে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করলেন। ঈশ্বর য়েভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেভাবেই সব সম্পন্ন হল।
৩ সারা একটি পুত্রের জন্ম দিলেন এবং অব্রাহাম তার নাম রাখলেন ইসহাক।
৪ ইসহাকের আট দিন বয়স হলে, য়েমনটি ঈশ্বর বলেছিলেন ঠিক সেইভাবে অব্রাহাম তাঁকে সুন্নত করলেন।

৯ অব্রাহামের প্রথম সন্তানের জন্ম দিয়েছিল হাগার নামে মিশরীয দাসী। সারা দেখলেন হাগারের সেই পুত্র ইসহাককে নিয়ে মজা করছে। তাই সারা বিচলিত হলেন।
১০ সারা অব্রাহামকে বললেন, “ঐ দাসী আর তার পুত্রের হাত থেকে আমাদের বাঁচাও। ওদের বিদায় করে দাও! যখন আমাদের মৃত্যু হবে তখন আমাদের যা কিছু ধন-সম্পদ ইসহাকই পাবে। আমি চাই না য়ে আমার পুত্র ইসহাকের সঙ্গে আমার দাসীর পুত্রও সবকিছুর ভাগ পাক!”
১১ এতে অব্রাহাম খুব বিচলিত হলেন। তিনি তাঁর পুত্র ইশ্মায়েলের জন্যে উদ্বিগ্ন হলেন।
১২ কিন্তু অব্রাহামকে ঈশ্বর বললেন, “ঐ পুত্র আর দাসীর জন্যে চিন্তা কোরো না। সারা যা চায় তা-ই করো। তোমার একমাত্র উত্তরাধিকারী হবে ইসহাক।
১৩ কিন্তু তোমার দাসী পুত্রকেও আমি আশীর্বাদ করব। সে তোমার পুত্র সুতরাং তার পরিবার থেকেও আমি এক মহান জাতি সৃষ্টি করব।”
১৪ পরদিন খুব ভোরে অব্রাহাম কিছু খাদ্য ও পানীয় জল এনে হাগারকে দিলেন। তাই সম্বল করে হাগার পুত্রকে নিয়ে চলে গেল। হাগার সেই স্থান ত্যাগ করে বের্-শেবা মরুভূমির মধ্যে ঘুরে বেড়াতে লাগল।
১৫ কিছুক্ষণ পরে সব জল ফুরিযে গেল। পিপাসা মেটাবার জন্যে আর কিছু থাকল না। তখন হাগার তার পুত্রকে একটা ঝোপের নীচে রাখল।
১৬ হাগার খানিকটা দূরে হেঁটে গেল। তারপর সেখানেই বসে পড়ল। হাগারের ভয় হল, জলের অভাবে তার পুত্র বোধ হয় মারা যাবে। পুত্রের মৃত্যু সে দেখতে পারবে না। তাই সেখানে বসে বসে সে কাঁদতে লাগল।
১৭ ঈশ্বর সেই পুত্রের কান্না শুনতে পেলেন এবং স্বর্গ থেকে ঈশ্বরের দূত হাগারকে বলল, “কি হয়েছে? ভয় পেও না! প্রভু তোমার পুত্রের কান্না শুনতে পেয়েছেন।
১৮ যাও, পুত্রকে গিয়ে দেখ। ওর হাত ধরে এগিয়ে চলো। আমি তাকে এক বৃহত্ জাতির পিতা করব।
১৯ তখন হাগার ঈশ্বরের কৃপায় একটা কূপ দেখতে পেল। তারপর হাগার সেই কূপের জলে নিজের জলপাত্র পূর্ণ করল। তারপর সেই জল নিয়ে গিয়ে পুত্রকে পান করাল।
২০ সেই পুত্র বড় হতে লাগল আর ঈশ্বর সারাক্ষণ তার সঙ্গে থাকলেন। ইশ্মাযেল সেই মরুভূমির মধ্যেই বড় হতে লাগল। ক্রমে ক্রমে সে হল একজন শিকারী। তীরধনুকে সে হয়ে উঠল খুব দক্ষ।
২১ তার মা এক মিশরীয় কন্যার সঙ্গে তার বিয়ে দিল। তারা সেই পারণ নামের মরুভূমিতেই বাস করতে লাগল।

৩২ অতএব বের্-শেবাতে অব্রাহাম ও অবীমেলক দুজনে একটা চুক্তি সম্পাদন করলেন। তারপর অবীমেলক তাঁর সৈন্যাধক্ষ্যদের নিয়ে পলেষ্টীয়দের দেশে ফিরে গেলেন।
৩৩ বের্-শেবাতে অব্রাহাম একটা চিরহরিত্ ঝাউগাছ রোপণ করলেন। সেখানে তিনি প্রভু শাশ্বত ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলেন।
৩৪ অব্রাহাম পলেষ্টীয়দের দেশে বহুকাল বাস করলেন।

আদিপুস্তক ২২
১ এই সমস্ত কিছুর পরে ঈশ্বর ঠিক করলেন য়ে তিনি অব্রাহামের বিশ্বাস পরীক্ষা করবেন। তাই ঈশ্বর ডাকলেন, “অব্রাহাম!”এবং অব্রাহাম সাড়া দিলেন, “বলুন!”
২ তখন ঈশ্বর বললেন, “তোমার একমাত্র পুত্র যাকে তুমি ভালবাস সেই ইসহাককে মোরিয়া দেশে নিয়ে যাও। সেখানে পর্বতগুলির মধ্যে একটির ওপরে তাকে আমার উদ্দেশ্যে বলি দাও। আমি তোমাকে বলব কোন পর্বতের ওপর তুমি তাকে বলি দেবে।”
৩ পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে অব্রাহাম যাত্রার জন্যে গাধার পিঠে জিন সাজালেন। সঙ্গে ইসহাককে নিলেন, আর নিলেন দুজন ভৃত্যকে। অব্রাহাম হোমের জন্য কাঠ কাটলেন। তারপর ঈশ্বর যেখানে য়েতে বলেছিলেন সেই স্থানের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।
৪ তিনদিন চলার পর অব্রাহাম দূরে দৃষ্টিপাত করলেন আর গন্তব্যস্থল দেখতে পেলেন।
৫ তখন ভৃত্য দুজনের উদ্দেশ্যে অব্রাহাম বললেন, “গাধাটা নিয়ে তোমরা এখানে অপেক্ষা করো, আমি ছেলেকে নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানটিতে যাব এবং উপাসনা করব। পরে তোমাদের কাছে ফিরে আসব।”
৬ অব্রাহাম হোমের জন্যে কেটে আনা কাঠ ছেলের কাঁধে দিলেন। এবং সঙ্গে নিলেন খাঁড়া ও আগুন। তারপর অব্রাহাম ও তাঁর ছেলে দুজনেই উপাসনা সম্পাদন করার জন্যে নির্দিষ্ট স্থানটিতে গেলেন।
৭ ইসহাক পিতা অব্রাহামকে বলল, “পিতা!”অব্রাহাম উত্তর দিলেন, “বলো, পুত্র!”ইসহাক বলল, “পিতা! হোমের জন্যে সব আয়োজন দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু হোমের আগে বলি দেওয়ার জন্যে মেষশাবক কোথায়?”
৮ অব্রাহাম বললেন, “আমার পুত্র, বয়ং ঈশ্বর বলির জন্যে মেষশাবকের ব্যবস্থা করবেন।”সুতরাং অব্রাহাম আর ইসহাক দুজনে মিলে নির্দিষ্ট স্থানটিতে গেলেন।
৯ তাঁরা সেই স্থানটিতে পৌঁছলেন যেখানে ঈশ্বর য়েতে বলেছিলেন। সেখানে অব্রাহাম একটি বেদী তৈরী করলেন। বেদীর উপরে অব্রাহাম কাঠগুলো সাজালেন। তারপর অব্রাহাম তাঁর পুত্র ইসহাককে বাঁধলেন এবং বেদীর উপরে সাজানো কাঠগুলোর উপর তাকে শোয়ালেন।
১০ এবার অব্রাহাম খাঁড়া বের করে ইসহাককে বলি দেওয়ার জন্যে তৈরী হলেন।
১১ কিন্তু তখন প্রভুর দূত অব্রাহামকে বাধা দিলেন। সেই দূত স্বর্গ থেকে “অব্রাহাম, অব্রাহাম” বলে ডাকলেন।অব্রাহাম থেমে গিয়ে সাড়া দিলেন, “বলুন।”
১২ দূত বললেন, “তোমার পুত্রকে হত্যা কোরো না, তাকে কোন রকম আঘাত দিও না। এখন আমি দেখতে পাচ্ছি, তুমি ঈশ্বরকে ভক্তি করো এবং তাঁর আজ্ঞা পালন করো। প্রভুর জন্যে তুমি তোমার একমাত্র পুত্রকে পর্য্ন্ত বলি দিতে প্রস্তুত।”
১৩ তখন অব্রাহাম একটা মেষ দেখতে পেলেন। একটা ঝোপে তার শিং আটকে গেছে। সুতরাং অব্রাহাম সেই মেষটা ধরে এনে বলি দিলেন। ঐ মেষটাই হল ঈশ্বরের জন্যে অব্রাহামের বলি। আর রক্ষা পেল অব্রাহামের পুত্র ইসহাক।
১৪ সুতরাং অব্রাহাম ঐ স্থানটির একটা নাম দিলেন, “যিহোবা-য়িরি।”এমন কি আজও লোকেরা বলে, “এই পর্বতে প্রভুকে দেখা যায়।”
১৫ স্বর্গ থেকে প্রভুর দূত দ্বিতীয়বার অব্রাহামকে ডেকে বললেন,
১৬ “আমার জন্যে তুমি তোমার একমাত্র পুত্রকেও বলি দিতে প্রস্তুত ছিলে। আমার জন্যে তুমি এত বড় কাজ করেছ বলে আমি তোমার কাছে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি; আমি, প্রভু নিজেরই দিব্য করে প্রতিশ্রুতি করছি য়ে,
১৭ আমি তোমাকে অবশ্য আশীর্বাদ করব। আকাশে যত তারা, আমি তোমার উত্তরপুরুষদেরও সংখ্যাও তত করব। সমুদ্রতীরে যত বালি, তোমার উত্তরপুরুষরাও তত হবে। এবং তোমার বংশ তাদের সমস্ত শত্রুদের পরাস্ত করবে।
১৮ পৃথিবীর প্রত্যেক জাতি তোমার উত্তরপুরুষদের মাধ্যমে আশীর্বাদ পাবে। তুমি আমার আজ্ঞা পালন করেছ বলে তোমার উত্তরপুরুষদের জন্যে আমি একাজ করব।”
১৯ তখন অব্রাহাম তাঁর ভৃত্যদের কাছে ফিরে গেলেন। তাঁরা সকলে বের্-শেবাতে ফিরে এলেন এবং অব্রাহাম বের্-শেবাতেই থেকে গেলেন।
২০ এইসব ঘটনার পরে অব্রাহামের কাছে এই খবর এল, “শোনো, তোমার ভাই নাহোর এবং তার স্ত্রী মিল্কারও এখন সন্তানাদি হয়েছে;
২১ প্রথম পুত্রের নাম উষ, দ্বিতীয় পুত্রের নাম বূষ, তৃতীয় পুত্র কমূয়েল হল অরামের পিতা।
২২ তারপরে আছে কেষদ, হসো, পিল্দশ, ষিদ্লক এবং বথুযেল।”
২৩ বথুয়েল হল রিবিকার পিতা। এই আট পুত্রের মাতা হল মিল্কা এবং পিতা হল নাহোর। আর নাহোর হচ্ছে অব্রাহামের ভাই।
২৪ তাছাড়া দাসী রূমার থেকেও নাহোরের আরও চারজন পুত্র ছিল। এই চার পুত্রের নাম টেবহ, গহম, তহশ এবং মাখা।

আদিপুস্তক ২৩
১ সারা ১২৭ বছর বেঁচেছিলেন।
২ কনান দেশের কিরিয়থ অর্ব অর্থাত্ হিব্রোণ নগরে তাঁর মৃত্যু হল। অব্রাহাম ভীষণ দুঃখ পেলেন, সারার জন্যে অনেক কাঁদলেন।
৩ তারপর স্ত্রীর মৃতদেহ রেখে হেতের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলতে গেলেন।
৪ তিনি বললেন, “দেশ পর্য়টন করতে করতে আপনাদের দেশে এসে আমি পরবাসী হিসেবে বাস করছি। ফলে আমার মৃত স্ত্রীকে কবর দেওয়ার মত আমার কোনও জায়গা নেই। আমি যাতে স্ত্রীকে কবর দিতে পারি তার জন্যে দয়া করে আমায় খানিকটা জায়গা দিন।”
৫ হেতেরা উত্তরে বলল,
৬ “মহাশয়, আমাদের মধ্যে আপনি ঈশ্বরের মহান নেতাদের একজন। আমাদের শ্রেষ্ঠ জমিতে আপনি আপনার মৃত স্ত্রীকে সমাধিস্থ করতে পারেন। আপনার স্ত্রীকে আপনি আপনার পছন্দমত জায়গাতে সমাধিস্থ করলে কেউ আপনাকে বাধা দেবে না।”

১১ “না, মহাশয়, এখানেই ঐ ক্ষেত এবং গুহাটিও আমি আমার লোকেদের সামনে আপনাকে দেব। আপনি যাতে আপনার ইচ্ছা মত আপনার স্ত্রীকে সমাধিস্থ করতে পারেন সেজন্যে ঐ জমি, গুহা আমি আপনাকে দেব।”

১৯ তারপর অব্রাহাম মম্রির (হিব্রোণে) নিকটস্থ জমিতে অর্থাত্ কনান দেশের এক গুহার মধ্যে তাঁর স্ত্রী সারাকে সমাধিস্থ করলেন।
২০ অব্রাহাম হেতের জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে ঐ জমি ও জমির মধ্যেকার গুহা কিনলেন। এখন ঐ জমি গুহা হল অব্রাহামের সম্পত্তি এবং ঐ জায়গা তিনি সমাধিস্থল হিসেবে ব্যবহার করতে লাগলেন।
আদিপুস্তক ২৪
১ অব্রাহাম অত্যন্ত বৃদ্ধ বয়স পর্য্ন্ত জীবিত ছিলেন। অব্রাহাম ও তাঁর কৃত সমস্ত কর্মে প্রভুর আশীর্বাদ ছিল।

৪ আমার দেশে আমার স্বজাতির কাছে ফিরে যাও। সেখানে আমার পুত্র ইসহাকের জন্যে পাত্রী খুঁজে বের করে তাকে এখানে নিয়ে এস।”
৫ ভৃত্যটি তাঁকে বলল, “এমন তো হতে পারে য়ে কোনও পাত্রী আমার সঙ্গে এদেশে আসতে রাজী হল না। তাহলে কি আমি আপনার পুত্রকে আমার সঙ্গে নিয়ে আপনার জন্মভূমিতে যাব?”
৬ অব্রাহাম তাকে বলল, “না! আমার পুত্রকে ঐ দেশে নিয়ে য়েও না।
৭ স্বর্গের প্রভু বয়ং ঈশ্বর আমার স্বদেশ থেকে সপরিবারে আমায় এখানে নিয়ে এসেছেন। ঐ দেশ আমার পিতার ও পরিবারের স্বদেশ ছিল। কিন্তু প্রভু কথা দিয়েছেন য়ে এই নতুন দেশ হবে আমার পরিবারের স্বদেশ। প্রভু তোমার আগে তাঁর দূত পাঠাবেন যাতে তুমি আমার পুত্রের জন্য একটি পাত্রী পছন্দ করে তাকে এখানে আনতে পার।
৮ কিন্তু যদি সেই পাত্রী তোমার সঙ্গে এই দেশে আসতে না চায় তাহলে তুমি তোমার শপথ থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু তুমি কখনও আমার পুত্রকে সেই দেশে ফিরিযে নিয়ে যাবে না।”

১২ ভৃত্যটি বলল, “প্রভু, আপনি আমার মনিব অব্রাহামের ঈশ্বর। আজ আমার মনিবের পুত্রের জন্যে একটি য়োগ্য পাত্রী নির্বাচনে আপনি আমায় সাহায্য করুন। অনুগ্রহ করে আমার প্রভু অব্রাহামকে এই দয়া করুন।
১৩ এখানে কূপের ধারে আমি দাঁড়িয়ে আছি। নগরের তরুণী রমনীরা এই কূপের জল নিতে আসছে।
১৪ ইসহাকের জন্যে কোন পাত্রীটি উপযুক্ত তা জানার একটা বিশেষ ইঙ্গিত দেখতে পাব বলে এখানে আমি অপেক্ষা করছি। সেই বিশেষ ইঙ্গিতটি হল এই: আমি মেয়েটিকে বলব, ‘তোমার কলসী থেকে আমায় একটু জল দাও।’ সেই মেয়েটিই য়ে উপযুক্ত তা আমি বুঝতে পারব যদি সে বলে, ‘নিন, এই জলে তেষ্টা মেটান। আপনার উটগুলোকে আমি জল দিচ্ছি।’ এরকমটা যদি ঘটে তাহলে আমি বুঝব আপনার কাছ হতে আসা সেটাই প্রমাণ য়ে ঐ মেয়েই ইসহাকের জন্যে সঠিক পাত্রী এবং আমি জানব য়ে আপনি আমার মনিবকে দয়া করেছেন।”
১৫ ভৃত্য প্রার্থনা শেষ করার আগেই রিবিকা নামে একটি তরুনী কূপের কাছে এল। রিবিকা বথুযেলের কন্যা। বথুযেল ছিল অব্রাহামের ভাই নাহোর ও তার স্ত্রী মিল্কার পুত্র। জল নেওয়ার কলসী কাঁধে নিয়ে রিবিকা কূপের কাছে এল।
১৬ রিবিকা অসাধারণ সুন্দরী। সে কখনও কোন পুরুষের সঙ্গে ঘুমায নি। সে ছিল কুমারী। কূপের ধারে গিয়ে সে কলসী ভরে জল নিল।
১৭ তখন সেই ভৃত্য তাড়াতাড়ি তার কাছে গিয়ে বলল, “দারুণ তৃষ্ণা, দয়া করে তোমার কলসী থেকে একটু জল দাও।”
১৮ রিবিকা সঙ্গে সঙ্গে কাঁধ থেকে কলসী নামিযে তার আঁজলায জল ঢেলে দিয়ে বলল, “এই নিন, তৃষ্ণা মেটান।”
১৯ তাকে জল খেতে দেওয়ার পরে রিবিকা বলল, “আপনার উটগুলোকেও আমি জল দিচ্ছি।”
২০ তখন রিবিকা কলসী খালি করে সবটা জল ঢেলে দিল উটেদের পানপাত্রে। তারপর আবার কূপ থেকে আরও জল আনতে গেল। এভাবে সে সবগুলো উটকেই জল পান করতে দিল।
২১ সেই ভৃত্য নীরবে রিবিকার সমস্ত কাজ লক্ষ্য করতে লাগল। সে নিশ্চিত হতে চাইছিল য়ে প্রভু তার প্রার্থনা শুনেছেন কিনা এবং ইসহাকের জন্যে কন্যা সন্ধান সফল হয়েছে কিনা।
২২ উটগুলোর জলপান শেষ হলে সে রিবিকাকে একটা ১/৪ আউন্স ওজনের সোনার আংটি দিল। তাছাড়া সে এক-একটি ৫ আউন্স ওজনের দুখানা সোনার বালাও রিবিকাকে দিল।

২৮ তখন রিবিকা ছুটে গিয়ে যা যা ঘটেছে সেসব তার পরিবারের সবাইকে বলল।
২৯ রিবিকার এক ভাই ছিল। তার নাম লাবন। সেই আগন্তুক যা কিছু বলেছে, সেইসব রিবিকা যখন বলছিল তখন লাবন মন দিয়ে সব শুনছিল এবং লাবন যখন তার দিদির আঙুলে আংটি আর হাতে বালা দেখল তখন ছুটে বেরিয়ে গিয়ে সেই কূপের ধারে এল। সেই লোকটি তখন কূপের ধারে উটগুলো নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

৩১ লাবন বলল, “মহাশয়, আপনাকে আমাদের আলযে স্বাগত জানাই। আপনার এখানে দাঁড়িয়ে থাকার দরকার নেই। আপনাদের বিশ্রামের জন্যে আমি সমস্ত বন্দোবস্ত করছি এবং আপনাদের উটগুলোর জন্যে আমাদের বাড়ীতে জায়গা আছে।”

৪৯ এখন আমায় বলুন, আপনি কি আমার মনিবের প্রতি সদয এবং বিশ্বস্ত হয়ে তাঁকে আপনার কন্যাটিকে দেবেন? না কি গররাজী হবেন? আপনি খুলে বলুন যাতে আমি কি করব, না করব ঠিক করতে পারি।”
৫০ তখন লাবন এবং বথুয়েল উত্তর দিলেন, “আমরা দেখতে পাচ্ছি, সবই প্রভুর ইচ্ছা অনুসারে হচ্ছে। সুতরাং তোমাকে আমরা এটি বদলাবার জন্য কিছুই বলতে পারি না।
৫১ তাই রিবিকাকে দিলাম। ওকে নিয়ে যাও। ওর সঙ্গে তোমার মনিবের পুত্রের বিয়ে দাও। প্রভুর এটাই ইচ্ছা।”

৫৮ তাঁরা রিবিকাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি এঁর সঙ্গে এখনই যেতে চাও?”রিবিকা বলল, “হ্যাঁ, আমি যাব।”
৫৯ সুতরাং তাঁরা অব্রাহামের ভৃত্য ও তার লোকজনের সঙ্গে রিবিকাকে য়েতে দিলেন। রিবিকাকে ছোটবেলা থেকে য়ে দাসী মানুষ করেছে সে-ও তাদের সঙ্গে চলল।

৬২ ইসহাক তখন বের্-লহয্-রোযী ত্যাগ করে নেগেভে বাস করছিলেন।
৬৩ একদিন সন্ধ্যায় একান্তে ধ্যান করার জন্যে ইসহাক নির্জন প্রান্তরে বেড়াতে গিয়েছিলেন। ইসহাক চোখ তুলে দেখলেন য়ে দূর থেকে উটের সারি আসছে।
৬৪ রিবিকাও ইসহাককে দেখতে পেলেন। তখন সে উটের পিঠ থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ল।
৬৫ ভৃত্যকে জিজ্ঞেস করল, “কে ঐ তরুণ মাঠের মধ্যে দিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে?”ভৃত্য উত্তর দিল, “ঐ আমার মনিবের পুত্র।” শুনে রিবিকা ওড়না দিয়ে তার মুখ ঢাকল।
৬৬ সেই ভৃত্য যা-যা ঘটেছে সব ইসহাককে বলল।
৬৭ তখন ইসহাক মেয়েটিকে তাঁর মায়ের তাঁবুতে নিয়ে গেলেন। সেদিন থেকে রিবিকা হল ইসহাকের স্ত্রী। ইসহাক তাকে খুব ভালবাসলেন। তাকে ভালবেসে ইসহাক মায়ের মৃত্যুর শোকে সান্ত্বনা পেলেন।
আদিপুস্তক ২৫
১ অব্রাহাম আবার বিবাহ করলেন। তাঁর নতুন স্ত্রীর নাম কটুরা।
২ অব্রাহামের ঔরসে কটুরা সিম্রণ, য়ক্ষণ, মদান, মিদিয়ন, যিশবক এবং শূহরের জন্ম দেন।

৭ অব্রাহাম ১৭৫ বছর বয়স পর্য্ন্ত বেঁচে ছিলেন।
৮ তারপর অব্রাহাম ক্রমশঃ দুর্বল হয়ে অবশেষে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। সুদীর্ঘ ও সুখী জীবন ছিল তাঁর। তিনি মারা গেলেন এবং তাঁকে তাঁর আপনজনের কাছে নিয়ে যাওয়া হল।
৯ তাঁর দুই পুত্র। ইসহাক আর ইশ্মাযেল মিলে তাঁর মৃতদেহ মক্পেলার গুহাতে কবর দিল। সোহরের পুত্র ইফ্রোণের জমিতে ঐ গুহা। জায়গাটা ছিল মম্রির পূর্ব দিকে।
১০ এই সেই গুহা যেটা হেতের সন্তানদের কাছ থেকে কিনেছিলেন। সেখানে স্ত্রী সারার কবরের পাশে অব্রাহামকে কবর দেওয়া হল।
১১ অব্রাহামের মৃত্যুর পরে ঈশ্বর ইসহাককে আশীর্বাদ করলেন। ইসহাক বের্-লহয়-রোযীতে বসবাস করতে থাকলেন।
১২ ইশ্মায়েলের বংশ বৃত্তান্ত এই। অব্রাহাম ও হাগারের পুত্র ছিলেন ইশ্মাযেল। (হাগার ছিলেন সারার মিশরীয দাসী।)
১৩ ইশ্মাযেলের পুত্রদের নামগুলো হল: প্রথম পুত্র ছিল নবায়োত্, তারপর জন্মায় কেদর, তারপরে যথাক্রমে অদ্বেল, মিষ্মম,
১৪ মিশ্ম, দুমা, মসা,
১৫ হদদ, তেমা, যিটুর, নাফীশ এবং কেদমা।
১৬ এইগুলি হল ইশ্মায়েলের পুত্রদের নাম। প্রত্যেকের এক-একটা ছোট বসতি ছিল এবং প্রত্যেকটি বসতি আস্তে আস্তে শহরে পরিণত হয়। বারোটি পুত্র য়েন বারো জন রাজপুত্র এবং প্রত্যেকের নিজস্ব জনবল।
১৭ ইশ্মায়েল ১৩৭ বছর বেঁচেছিলেন। তারপর তাঁর মৃত্যু হয় এবং তাঁকে তাঁর পূর্বপুরুষদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।
১৮ ইশ্মাযেলের উত্তরপুরুষরা সমগ্র মরুভূমি অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। এই অঞ্চলটি ছিল মিশরের কাছে হুবীলা থেকে শূর পর্য্ন্ত বিস্তৃত এবং এখান থেকে তা বিস্তৃত ছিল অশূরিযা পর্য্ন্ত। ইশ্মাযেলের উত্তরপুরুষেরা প্রায়ই তার ভাইয়ের লোকেদের আক্রমণ করত।
১৯ এবার ইসহাকের কাহিনী ইসহাক নামে অব্রাহামের এক পুত্র ছিল।
২০ যখন ইসহাকের বয়স ৪০ হল তখন তিনি রিবিকাকে বিয়ে করলেন। রিবিকা ছিলেন পদ্দন্ অরাম অঞ্চলের মেয়ে। তাঁর পিতা বথুযেল এবং অরামীয় লাবন ছিলেন তাঁর ভাই।
২১ ইসহাকের স্ত্রীর সন্তানাদি হচ্ছিল না। তাই তিনি প্রভুর কাছে তার স্ত্রীর জন্যে প্রার্থনা করলেন এবং প্রভু তার প্রার্থনা শুনলে রিবিকা গর্ভবতী হলেন।
২২ গর্ভবতী অবস্থায় রিবিকা যন্ত্রণা ভোগ করছিলেন কারণ তাঁর গর্ভে দুটি শিশু একে অপরকে জোরে ঠেলাঠেলি করছিল। গর্ভস্থ শিশুর জন্যে রিবিকা অনেক কষ্ট পেতে থাকেন। তিনি প্রভুর কাছে প্রার্থনা করে জানতে চাইলেন, “আমার কেন এমন হচ্ছে?”
২৩ প্রভু উত্তরে বললেন, “তোমার গর্ভের মধ্যে দুটি জাতি আছে। তুমি দুই মহান বংশের শাসকদের জন্ম দেবে। তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটবে। এক পুত্রের অপেক্ষা অন্য পুত্র শক্তিশালী হবে। ছোট পুত্রের সেবা করবে বড় পুত্র।”
২৪ যথাসময়ে রিবিকা দুটি যমজ সন্তানের জন্ম দিলেন।
২৫ প্রথম সন্তানের গায়ের রং ছিল লাল। গায়ের ত্বক ছিল লোমশ বস্ত্রের মত। তাই তার নাম রাখা হল এষৌ।
২৬ তারপরে যখন দ্বিতীয় সন্তানটির জন্ম হল তখন তার শক্ত মুঠোর মধ্যে এষৌর পায়ের গোড়ালি ধরা ছিল। তাই তার নাম রাখা হল যাকোব। এষৌ এবং যাকোবের জন্মের সময় ইসহাকের বয়স ছিল ৬০ বছর।
২৭ ছেলে দুটি বড় হতে লাগল। এষৌ হল একজন দক্ষ শিকারী। সে জঙ্গলে প্রান্তরে ঘুরে বেড়াতে ভালবাসত। কিন্তু যাকোব ছিল শান্ত প্রকৃতির। সে তাঁবুতেই থাকত।
২৮ ইসহাক এষৌকে ভালবাসতেন। এষৌর শিকার করা পশুর মাংস খেতে তিনি ভালবাসতেন। কিন্তু রিবিকা যাকোবকে ভালবাসতেন।
২৯ একবার এষৌ শিকার থেকে ফিরে এল। ক্ষুধায সে ছিল ক্লান্ত ও দুর্বল। তখন যাকোব এক হাঁড়ি শিম সেদ্ধ করছিল।
৩০ এষৌ যাকোবকে বলল, “ক্ষিধের জ্বালায় আমি ক্লান্ত। আমায় এই লাল বীন কিছু খেতে দাও।” (সেজন্যে সবাই তাকে ইদোম বলে।)
৩১ কিন্তু যাকোব বলল, “তাহলে তুমি আজ বড় পুত্রের অধিকার আমায় বিক্রি করো।”
৩২ এষৌ বলল, “ক্ষিধের চোটে আমি এমনিতেই আধমরা হয়ে গেছি। মরেই যদি যাই তাহলে পিতার সব সম্পত্তি আমার কোন কাজে লাগবে? তাই আমার ভাগ আমি তোমায় দেব।”
৩৩ কিন্তু যাকোব বলল, “আগে প্রতিজ্ঞা করো য়ে তোমার ভাগ আমায় দেবে।” অতএব যাকোবের কাছে এষৌ প্রতিজ্ঞা করল। এষৌ পিতার সম্পত্তি থেকে নিজের ভাগ যাকোবকে বিক্রি করল।
৩৪ তখন যাকোব এষৌকে রুটি ও খাবার দিল। এষৌ খেয়েদেযে পরিতৃপ্ত হয়ে চলে গেল। সুতরাং এষৌ প্রমাণ করল য়ে বড় পুত্রের অধিকার নিয়ে তার কোনও মাথাব্যথা নেই।

ইহুদীদের ধর্মগ্রন্থ তোরা হযরত ইব্রাহীম (আ.) সম্পর্কে যা বলে:
তৌরাত একটি আসমানী কিতাব যা ইসলামের রাসুল হযরত মুসা (আঃ)-এর (খ্রীষ্টপূর্ব ১৩৯২ থেকে খ্রীষ্টপূর্ব ১২৭২ পর্যন্ত) উপর নাযিল হয়েছিল। এটি হিব্রু ভাষায় লিখিত ইহুদীদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ । হিব্রু ভাষায় এর নাম তোরাহ্ । তোরাহ্ শব্দের অর্থ “আইন”, “নিয়ম”, বা “শিক্ষণীয় উপদেশ”। এটি ৫ টি পুস্তকের সমন্বয়ে গঠিত। তাই তৌরাতকে অনেকে মুসার “পঞ্চ পুস্তক” বলে থাকে। তোরাহ ইহুদিদের ধর্মীয় রীতি-বিধির মূল ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এটি একটি হিব্রু শব্দ, যার অর্থ “শিক্ষা”। তোরাহ মূলত তাদের ধর্মগ্রন্থ তানাখের প্রথম অংশকে বোঝালেও, সার্বিকভাবে তোরাহ বলতে ইহুদিদের লিখিত ও মৌখিক শিক্ষা, যেমন – মিশনাহ, তালমুদ, মিদ্রাশ, ইত্যাদি ধর্মীয় অনুশাসনমূলক গ্রন্থকে একসাথে ইঙ্গিত করে।

তোরাহ-এর মধ্যে হিব্রু বাইবেলের প্রথম পাঁচটি বই পড়ে। এই পঞ্চ পুস্তকের নাম নিম্নরূপ – জেনেসিস, এক্সোডাস, লেভিটিসাস, নাম্বারস ও ড্যুটারনমি।
ইহুদিরা মনে করেন তোরাহ হলো হযরত মুসা (আঃ)-এর নিকট ঈশ্বরের সরাসরি প্রদত্ত বাণী।

তোরাহ্ -তে হযরত ইব্রাহীম (আ.) সম্পর্কে নিম্নরূপ বর্ণিত আছে।

Why God Chose Abraham
When the Torah introduces Avram (as Abraham was initially named), he is already a grown man. The Torah mentions that he was born to a man named Terah in Ur of the Chaldees, and that Avram left Ur with his father, his brother, and their collective households and traveled to Haran (Genesis 11:27-32). God’s first reported words to Avram come when God commands Avram, at the age of 75, to leave Haran for Canaan (Genesis 12).

abraham and sarahWhat was special about Avram/Abraham? What are the character traits that motivated God to choose this man over all others? Midrashic stories of Avram’s youth provide the answers. They portray Avram as possessing logical gifts and spiritual insight that allow him to see the inconsistencies between the idolatrous practices around him and the theological claims to which they are linked.

According to the Talmud (Baba Batra 91a), Abraham’s birth was predicted by the astrologers of King Nimrod, who perceived the infant as being a threat to Nimrod’s kingship. Terah hides young Avram in a cave to save him from death. Emerging from the cave at the age of three, Avram observes that there is a powerful God above nature, who created nature. It is this God who he worships.

Abraham & the Idols
In another set of midrashim (Genesis Rabbah 38, Tanna Debei Eliyahu), we find Abraham in his father’s shop, which sells idols. Abraham demonstrates to his father the absurdity of worshipping the very idols he sculpts. In the best known of these stories, Abraham stages a “riot” among the idols in which he claims that a large idol smashed others in order to take their grain offerings as his own. Terah, upon returning to the shop, refuses to believe the tale. After all, the idols aren’t alive! Abraham catches his father in this logical flaw: Why worship the lifeless work of your own hands?

In another similar tale, we see another example of Abraham’s use of reason to convince others of the falsehood of idol worship:

“Rabbi Hiyya… said thatTerah was a maker of idols. One time, he went out, and he left Abraham to sell [the idols] in his place. A person came and asked to buy one, and [Abraham] asked him, ‘How old are you?’ And the man said to him, ’50 or 60 [years].’ And [Abraham] said, ‘Oy to the man who is 60 years old and needs to worship [an idol] that is a day old!’ [The man] was embarrassed, and he went [on his way]” (Genesis Rabbah 38:13).

In these midrashim, Abraham is an intelligent, rational boy (and, later, man) who is unafraid to challenge authorities regarding the most basic religious claims of his society. Abraham does not believe in God because God spoke to him or proved it. Instead, the midrash shows that Abraham “discovered” God for himself.

Abraham’s Mission
These outstanding characteristics made Abraham a leader even before God spoke to him. In Genesis 12:5, we learn that Abraham went to Canaan with “the people [nefesh] they made [asu] in Haran.” “Nefesh” essentially means “soul,” but is also used to refer to human beings (i.e. those possessing souls). However, how could the text be saying that Abraham “made” souls?

Contemporary scholar Everett Fox suggests the translation “people they made-their-own” (The Five Books of Moses)–a sort of adoption. This translation seems to draw on earlier commentators and the midrashim to which they refer. In the opinion of Rashi, the medieval exegete, the plain meaning of the text is that this phrase refers to the servants and household members whom Abraham acquired while in Haran, reading “asu” as “acquire” rather than as “made.”

Rashi also mentions a classical midrash that offers a different perspective. In this story, we see that Abraham had taken upon himself an evangelical mission, preaching about the One God without receiving a command from God to do so:

“‘And the people that they made in Haran.’ Rabbi Elazar ben Zimra said [the text should read] …”these are the converts that they converted.” And if it is that they converted them, why does it say “make”? Only to teach you that all those who bring a worshipper of stars [i.e. a pagan] close [to God] and converts him, it is as if [the one who converts the other] created [the one who converts]” (Genesis Rabbah 39:14).

By the time God calls upon Avram, these conversions had already taken place. These midrashim let us know that God chooses Avram after Avram has already chosen God. Abraham is a revolutionary distinguished not by blind acceptance of God’s command, but by wisdom, insight, and leadership.

Sarah’s Stories:
The Torah often is especially silent regarding female characters. Rabbinic tradition, however, emphasizes the merit and important work of our female ancestors. Midrashim illuminate the life and works of the Imahot (Matriarchs).

When the Torah first mentions Sarah–or Sarai, as she was initially named–she is among those listed as leaving Ur with Avram and his family. Initially, all that is said is that she is barren. From this bare mention, Sarah emerges in the Talmud and midrashas an equal partner in God’s work and a prophetess in her own right.

The midrash on Genesis 12:5–“…the people they made in Haran…”–includes Sarai in the missionary work that took place. The midrash says:

“And if so, let it say ‘that he made” [with the verb in the singular]. Why is it said ‘that they made’? Rav Huna said: Abraham would convert the men, and Sarah would convert the women.”

This midrashic introduction brings to light Sarah’s role in the earliest origins of the Jewish people. The Talmud lists her among the female prophets (Megillah 14a), and Sarah was universally viewed by the sages as a woman of wisdom and righteous action.

Sarah’s Tent:
Other traditional tales illustrate Sarah’s work in bringing strangers closer to the experience of God. In part, this is done by depicting Sarah’s tent a precursor to the Ohel Moed (Tent of Meeting, home of the Mishkan, which housed the Ark of the Covenant) and Beit Hamikdash (Temple in Jerusalem).

In the midrashic imagination, Sarah’s tent becomes a place in which God’s blessings and imminence can be experienced. Sarah’s death temporarily halts the miracles and good works associated with the tent; Rebecca then reactivates the holiness of the tent with her marriage to Isaac, Sarah’s son.

“And Isaac brought her [Rebecca] to the tent of Sarah, his mother. All the days in which Sarah lived, there was a cloud attached to the entrance of her tent. Since she died, the cloud ceased; and when Rebecca came, the cloud returned. All the days in which Sarah lived, the doors of the entrance [to her tent] were open to the wind (ruah)…. And all the days in which Sarah lived, there was a blessing sent through the dough [with which she baked]…. All the days in which Sarah lived, there was a light burning from one Shabbat evening to the next Shabbat evening….” (Genesis Rabbah 80:16 on Genesis 24:67).

These characteristics of Sarah’s (and later Rebecca’s) tent are parallel to characteristics of the Tabernacle and Temple. Sarah’s bread is like the shewbread, the light prefigures the Menorah, and the wind resembles the Holy Spirit, ruah hakodesh. In particular, the cloud mentioned in the midrash alludes to the cloud of the Shekhinah, the personified aspect of God that is imminent. The Shekhinah is an aspect of God specifically associated with the Tabernacle and Temple. The book of Exodus ends with the completion of the Mishkanand the Israelites witnessing a cloud descending upon the tent (Exodus 40:34-38). Linguistically, the word Mishkan (literally, a dwelling place) has the same root as Shekhinah, and both of these terms draw on the idea that God can be experienced as close-by, not only as transcendent.

The Shekhinah additionally represents the relationship between the People of Israel with God and God’s favor for individual people or groups. With Solomon’s building of the first Temple in Jerusalem, the Ark was brought to the Temple, which then replaced the Mishkan. Tradition teaches that the Temple and the sacrifices performed there further connected the Shekhinah to the People of Israel in their homeland.

The midrash’s implication, therefore, is that Sarah provided a precedent for this relationship.

ইহুদী, খ্রীষ্টান ও ইসলাম এই তিনটি ধর্মকে বলা হয় আব্রাহামিক রিলিজিওন। এই তিন ধর্মের অনুসারীরাই হযরত ইব্রাহীম (আ.)-কে আদিপিতা জ্ঞান করে থাকে। তাই এই ধর্মগুলোর পবিত্র গ্রন্থসমূহের প্রত্যেকটিতেই উনার বর্ণনা আছে, যার কিছুটা আমি উপরে তুলে ধরেছি। উপরের বর্ণনা বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় যে, হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর জীবনকাহিনী বর্ণনায় এই তিনটি ধর্মের মধ্যে কিছুটা গরমিল রয়েছে। তদুপরী অনেক কিছুতেই তারা একমত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো যে, তিনি পলিথেইস্ট ছিলেন না ও মূর্তিপূজাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি একেশ্বরবাদী ও নিরাকারের উপাসক ছিলেন। এবং এযাবৎকালের প্রাপ্ত ইতিহাস অনুযায়ী তিনিই প্রথম মহামানব যিনি পলিথেইজমের বিরূদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন এবং পৃথিবীতে একেশ্বরবাদ প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

(চলবে)

(এই প্রবন্ধে কোন ভুল-ত্রুটি থাকলে তা লেখকের অনিচ্ছাকৃত। পাঠকদের প্রতি বিনিত অনুরোধ রইলো, ভুলগুলি ধরিয়ে দেয়ার জন্যে, সংশোধন করে দেব)

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট ও বিভিন্ন বইয়ে প্রাপ্ত নানাবিধ প্রবন্ধ, সকল লেখকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

১,৭৮৯ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।