চেতনায় একেশ্বরবাদ, হৃদয়ে বুদ্ধের বাণী – পর্ব ২

চেতনায় একেশ্বরবাদ, হৃদয়ে বুদ্ধের বাণী – পর্ব ২
ড. রমিত আজাদ

উপমহাদেশের প্রাচীনতম সভ্যতা মেহেরগড়:

‘আর্য’ শব্দটি এসেছে ‘অরি’ শব্দ থেকে। ‘অরি’ মানে বিদেশী। ভিনদেশ থেকে তারা আমাদের দেশে বা অঞ্চলে এসেছিলো বলেই বোধহয় তাদের এইরূপ নামকরণ হয়েছে। অনেকেরই সাধারণ ধারণা হলো যে, আমাদের উপমহাদেশে আর্যদের আগমণের পূর্বে উল্লেখযোগ্য কোন সভ্যতা ছিলোনা। এবং আর্যরাই অত্র অঞ্চলের প্রথম সভ্য জাতি। এই জাতীয় প্রচার-প্রচারণাও চলে। বিষয়টি একেবারেই ভুল। আর্যদের আগমণের পূর্বে আমাদের উপমহাদেশে বিশাল সভ্যতা ছিলো, এবং সম্ভবত এটিই পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতা।

সিন্ধু সভ্যতার সাথে এখন মোটামুটি সবাই পরিচিত। সিন্ধু সভ্যতা ছিল একটি ব্রোঞ্জ যুগীয় সভ্যতা (৩৩০০ – ১৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ; পূর্ণবর্ধিত কাল ২৬০০ – ১৯০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)। এই সভ্যতার কেন্দ্র ছিল মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত সিন্ধু নদ অববাহিকা। প্রথম দিকে এই সভ্যতা পাঞ্জাব অঞ্চলের সিন্ধু অববাহিকায় বিকাশ লাভ করে। পরে তা প্রসারিত হয় ঘগ্গর-ভাকরা নদী উপত্যকা ও গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চল পর্যন্ত বর্তমান পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রায় সম্পূর্ণ অংশ, ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের পশ্চিমদিকের রাজ্যগুলি, দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তান এবং ইরানের বালোচিস্তান প্রদেশের পূর্ব অংশ এই সভ্যতার অন্তর্গত ছিল।

পূর্ণবর্ধিত সময়কালে এই সভ্যতা হরপ্পা সভ্যতা নামে পরিচিত। হরপ্পা ছিল এই সভ্যতার প্রথম আবিষ্কৃত শহরগুলির অন্যতম। ১৯২০-এর দশকে তদনীন্তন ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের ফলে এই শহরটি আবিষ্কৃত হয়। ১৯২০ সাল থেকে সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নস্থলগুলিতে খননকার্য চলছে। ১৯৯৯ সালেও এই সভ্যতার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসামগ্রী ও আবিষ্কৃত হয়েছে। মহেঞ্জোদাড়ো সিন্ধু সভ্যতার একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

হরপ্পা ভাষা প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং এই ভাষার উৎস অজ্ঞাত। যদিও ইরাবতম মহাদেবন, অস্কো পারপোলা, এফ জি বি কুইপার ও মাইকেল উইটজেল প্রমুখ বিশেষজ্ঞেরা এই ভাষার সঙ্গে প্রোটো-দ্রাবিড়ীয়, এলামো-দ্রাবিড়ীয় বা প্যারা-মুন্ডা সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন।

তবে বর্তমানে সিন্ধু সভ্যতার চাইতেও পুরাতন সভ্যতা পাওয়া গিয়েছে যার নাম মেহেরগড় সভ্যতা।

মেহেরগড় (Urdu: مﮩرگڑھ ) য়ে ৭০০০খ্রীষ্টপূর্ব থেকে ৩২০০ খ্রীষ্টপূর্ব আবিস্কৃত হয়েছে। মেহেরগড় সভ্যতা ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে জাঁ ফ্রাঁসোয়া জারিজ (ফরাসি) এবং রিচার্ড মিডৌ আবিস্কার করেন। মেহেরগড়ে খননকার্য করে ৩২০০০ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। এখন এর বর্তমান অবস্থান পাকিস্তানে। বালুচিস্তানের কাচ্চি সমতলভূমিতে বোলান নদীর পাড়ে কোয়েটা শহর থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে মেহেরগড়ের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে । এই সভ্যতার প্রধান কেন্দ্রগুলি হল কিলে গুল মহম্মদ, কোট ডিজি, গুমলা, মুন্ডিগাক, রানা ঘুনডাই, আনজিরা এবং মেহেরগড়। মেহেরগড় সভ্যতার সময়কাল: প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে আনুমানিক ৭০০০ খ্রিস্টপূবাব্দে এই সভ্যতা গড়ে উঠেছিল । এই সভ্যতা বহু বছর স্থায়ী হয়েছিল বলে মনে করা হয় । সভ্যতার বৈশিষ্ঠ : মেহেরগড়ের খনন কার্যের ফলে যে সব তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে চাষবাসের কিছু প্রমাণ মিলেছে এবং বহু দূর দেশের সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্যের সম্পর্কের প্রমাণও পাওয়া যায় । এখানকার মানুষ যে ঘরবাড়ি তৈরি করে গ্রাম স্থাপন করেছিল, প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্যে তার প্রমাণ মেলে। (ক) প্রাচীনতর পর্যায়ে একাধিক ঘর নিয়ে বাড়ি তৈরি করা হত । এইসব বাড়ি তৈরি হত রোদে শুকানো ইটের সাহায্যে । এই সময় তারা চাষবাস, পশুপালন ও শিকার করত । মৃতদেহ সমাধিস্থ করা হত এবং কোঁকড়ানো অবস্থায় সমাধিস্থ মৃতদেহ পাওয়া গেছে। (খ) পরের দিকে কৃষিকার্য ও পশুপালনের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায় । এই সময় তারা মাটির তৈরি জিনিসপত্রের ব্যবহার করতে শুরু করেছিল । বাড়িগুলিও আকারে বড়ো হয়েছিল । এইসব বাড়ি থেকে ছোটো শিলনোড়ার পাথর, উনুন, হাড় দিয়ে তৈরি হাতিয়ার ইত্যাদি জিনিস পাওয়া গেছে । সমাধির মধ্যে যে সব জিনিস পাওয়া গেছে, তার মধ্যে ঝিনুকের তৈরি লকেট, পুঁতি ও ঝিনুক জাতীয় জিনিসের মালা, পাথরের লকেট, হাড়ের আংটি, পালিশ করা পাথরের কুডুল ইত্যাদি প্রধান । তখনকার মানুষ যব, গম, কুল, খেজুর ইত্যাদি চাষ করত । জন্তুজানোয়ারের মধ্যে হরিণ, হাতি, নীলগাই, বুনো ভেড়া ও ছাগল, শুয়োর, গোরু ইত্যাদির হাড় পাওয়া গেছে । গরু, ভেড়া, ছাগল এবং সম্ভবত কুকুরও পোষ মানানো হত । শুধু চাষবাস বা পশুপালন এখানকার মানুষের উপজীবিকা ছিল না । ব্যবসা বাণিজ্যও করত । এখানে পাওয়া সামুদ্রিক ঝিনুক থেকে মনে হয় সমুদ্র উপকূলবর্তী স্থানের সঙ্গে এদের ব্যাবসাবাণিজ্য চলত । মেহেরগড়ে যে সব পাথর পাওয়া গেছে তা থেকে মনে হয়, তাদের বাণিজ্য অন্তত তুর্কমেনিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল । পাথর দিয়ে অস্ত্রশস্ত্র বা জিনিসপত্র তৈরি হত । ধাতুর ব্যবহার অজ্ঞাত হলেও, সমাধি থেকে তামার তৈরি একটি পুঁতি পাওয়া গেছে । এখানে পাথরের তৈরি কুড়ুল পাওয়া গেছে । মেহেরগড় সভ্যতার গুরুত্ব: মেহেরগড় সভ্যতার আবিষ্কার কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ । প্রথমত, এখানে গম ও যব চাষের যে প্রমাণ পাওয়া গেছে, তা থেকে বোঝা যায় যে, এই দুটি শস্যের সূত্রপাত পশ্চিম এশিয়া থেকে ভারতে আমদানি করা হয়নি । দ্বিতীয়ত, এই সভ্যতা নব্যপ্রস্তর যুগের হলেও তামা, সিসা প্রভৃতি ধাতুও পুরোপুরি অজ্ঞাত ছিল না । তৃতীয়ত, এখানকার মানুষ দূরবর্তী অঞ্চলের সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্য করত । চতুর্থত, এখানে কাঁচা মাটি দিয়ে পুরুষমূর্তি ও পোড়া মাটির নারীমূর্তি পাওয়া গেছে । তবে এই সব মূর্তির সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক কতটুকু ছিল, তা সঠিক ভাবে বলা যায় না । পরিশেষে, এই সভ্যতার আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, সিন্ধু সভ্যতার আগে নব্যপ্রস্তর যুগে বালুচিস্তান অঞ্চলে একটি মোটের উপর উন্নত গ্রামকেন্দ্রিক সভ্যতা ছিল। এই জন্য অনেকে এই সভ্যতাকে আদি সিন্ধু সভ্যতা বলে অভিহিত করেছেন। এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার একটি।

সিন্ধু সভ্যতাঃ

১৮৪২ সালে চার্লস ম্যাসন তাঁর ন্যারেটিভস অফ ভেরিয়াস জার্নিস ইন বালোচিস্তান, আফগানিস্তান অ্যান্ড দ্য পাঞ্জাব গ্রন্থের হরপ্পার ধ্বংসাবশেষের কথা প্রথম উল্লেখ করেন। স্থানীয় অধিবাসীরা তাঁকে “তেরো ক্রোশ” দূরে একটি প্রাচীন নগরীর উপস্থিতির কথা বলেছিল। কিন্তু প্রায় শতাব্দীকাল এই বিষয়ে কেউ কোনো প্রকার প্রত্নতাত্ত্বিক আগ্রহ দেখাননি।

১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার জন ও উইলিয়াম ব্রান্টন করাচি ও লাহোরের মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে কোম্পানি লাইন স্থাপনের দায়িত্ব পান। জন লিখেছেন: “রেললাইন স্থাপনের জন্য উপযুক্ত ব্যালাস্ট কোথা থেকে পাওয়া যায়, সেই ভেবে আমি খুবই চিন্তিত ছিলাম।” তাঁদের বলা হয় যে, লাইনের নিকট ব্রাহ্মণাবাদ নামে এক প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। সেই শহরে এসে তাঁরা শক্ত ও ভালভাবে পোড়ানো ইঁটের সন্ধান পান এবং নিশ্চিত এই ভেবে যে “ব্যালাস্টের একটি উপযুক্ত উৎস পাওয়া গেছে।” ব্রাহ্মণাবাদ শহর এই ভাবে ব্যালাস্টে পরিণত হয়। কয়েক মাস পরে, আরও উত্তরে জনের ভাই উইলিয়াম ব্রান্টনের কর্মস্থলে “লাইনের অংশে অপর একটি শহরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। এই ধ্বংসাবশেষের ইঁট নিকটবর্তী হরপ্পা গ্রামের অধিবাসীরাও ব্যবহার করত। এই ইঁটেরই ব্যালাস্টে তৈরি হয় লাহোর থেকে করাচি পর্যন্ত ৯৩ মাইল (১৫০ কিলোমিটার) দৈর্ঘ্যের রেলপথ।”

১৮৭২-৭৫ সালে আলেকজান্ডার কানিংহাম প্রথম হরপ্পা সিলমোহর প্রকাশ করেন। তিনি ভুলবশত এটি ব্রাহ্মী লিপি মনে করেছিলেন। এর প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে ১৯১২ সালে জে. ফ্লিট আরও কতকগুলি হরপ্পা সিলমোহর আবিষ্কার করেন। এই সিলমোহর দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯২১-২২ সালে স্যার জন মার্শাল এই অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য অভিযান চালান। এই অভিযানের ফলস্রুতিতেই স্যার জন মার্শাল, রায়বাহাদুর দয়ারাম সাহানি ও মাধোস্বরূপ ভাট হরপ্পা এবং রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ই. জে. এইচ. ম্যাককি ও স্যার জন মার্শাল মহেঞ্জোদাড়ো আবিষ্কার করেন। ১৯৩১ সালের মধ্যেই মহেঞ্জোদাড়োর অধিকাংশ প্রত্নস্থল আবিষ্কৃত হয়ে গিয়েছিল। তৎসত্ত্বেও খননকার্য অব্যাহত থাকে। এরপর ১৯৪৪ সালে ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের তদনীন্তন ডিরেক্টর স্যার মর্টিমার হুইলারের নেতৃত্বে অপর একটি দল এই অঞ্চলে খননকার্য চালায়। ১৯৪৭ সালের পূর্বে আহমদ হাসান দানি, ব্রিজবাসী লাল, ননীগোপাল মজুমদার, স্যার মার্ক অরেল স্টেইন প্রমুখ এই অঞ্চলে খননকার্যে অংশ নিয়েছিলেন।

ভারত বিভাগের পর সিন্ধু সভ্যতার অধিকাংশ প্রত্নস্থল পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্গত হয়। উল্লেখ্য, পাকিস্তান ভূখণ্ডই ছিল এই প্রাচীন সভ্যতার মূল কেন্দ্র। ১৯৪৯ সালে পাকিস্তান সরকারের পুরাতাত্ত্বিক উপদেষ্টা স্যার মর্টিমার হুইলার এই সব অঞ্চলে খননকার্য চালান। সিন্ধু সভ্যতার সীমান্তবর্তী প্রত্নস্থলগুলি আবিষ্কৃত হয়েছে পশ্চিমে বালোচিস্তানের সুকতাগান ডোর এবং উত্তরে আফগানিস্তানের আমুদারিয়া বা অক্সাস নদীর তীরে শোর্তুগাই অঞ্চলে।

হরপ্পা সভ্যতার পূর্ণবর্ধিত সময়কাল ২৬০০ থেকে ১৯০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। সিন্ধু সভ্যতার পূর্বসূরি আদি হরপ্পা সভ্যতা ও উত্তরসূরি পরবর্তী হরপ্পা সভ্যতার সময়কাল মিলিয়ে এই সভ্যতার পূর্ণ বিস্তারকাল খ্রিষ্টপূর্ব তেত্রিশ শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়। সিন্ধু সভ্যতার পর্ববিভাজনের ক্ষেত্রে যে দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয় সেগুলি হল পর্ব ও যুগ। আদি হরপ্পা সভ্যতা, পূর্ণবর্ধিত হরপ্পা সভ্যতা ও পরবর্তী হরপ্পা সভ্যতাকে যথাক্রমে আঞ্চলিকীকরণ, সংহতি ও স্থানীয়ভবন যুগও বলা হয়ে থাকে। আঞ্চলিকীকরণ যুগের সূচনা নিওলিথিক মেহেরগড় ২ সময়কাল থেকে। ইসলামাবাদের কায়েদ-এ-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের আহমদ হাসান দানির মতে, “মেহেরগড়ের আবিষ্কার সিন্ধু সভ্যতা সংক্রান্ত সম্পূর্ণ ধারণাটিই পরিবর্তিত করেছে। এর ফলে আমরা একেবারে গ্রামীন জীবনযাপনের সূচনালগ্ন থেকে সমগ্র সভ্যতাটির একটি পূর্ণ চিত্র প্রাপ্ত হয়েছি। নীচে একটি কালপঞ্জী দেয়া হলোঃ

আদি খাদ্য উৎপাদন যুগ:
৭০০০ – ৫০০০ খ্রি.পূ. মেহেরগড় এক (অ্যাসেরামিক নিওলিথিক) ৫৫০০ – ৩৩০০ খ্রি.পূ. মেহেরগড় দুই – ছয় (সেরামিক নিওলিথিক)
আঞ্চলিকীকরণ যুগ:
৫৫০০ – ২৬০০ খ্রি.পূ.
৩৩০০ – ২৬০০ খ্রি.পূ. আদি হরপ্পা
৩৩০০ – ২৮০০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ১ (ইরাবতী পর্ব)
২৮০০ – ২৬০০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ২ (কোট দিজি পর্ব, নৌশারো এক, মেহেরগড় সাত)
সংহতি যুগ:
২৬০০ – ১৯০০ খ্রি.পূ. পূর্ণবর্ধিত হরপ্পা (সিন্ধু সভ্যতা)
২৬০০ – ২৪৫০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ৩-ক (নৌশারো দুই)
২৪৫০ – ২২০০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ৩-খ
২২০০ – ১৯০০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ৩-গ
স্থানীয়ভবন যুগ:
১৯০০ – ১৩০০ খ্রি.পূ. পরবর্তী হরপ্পা (সমাধিক্ষেত্র ঝ); হলদে-বাদামি রঙের মৃৎশিল্প ১৯০০ – ১৭০০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ৪
১৭০০ – ১৩০০ খ্রি.পূ. হরপ্পা ৫
সিন্ধু-গাঙ্গেয় সভ্যতা:
১৩০০ – ৩০০ চিত্রিত ধূসর বস্তু, উত্তরাঞ্চলীয় কালো পালিশকৃত বস্তু (লৌহযুগ)

সিন্ধু সভ্যতার নগরীগুলো (হরপ্পা, মোহেনজোদারো, ইত্যাদি) পরিকল্পিত নগরী ছিলো বলে মনে করা হয়। সেখানে কয়েকটি সামাজিক সম্প্রদায় ছিলো; যেমন, পুরোহিত, বণিক, কারুশিল্পী, সৈনিক ও মুচলেকাবদ্ধ মজুর সম্প্রদায়। তবে সেখানে জন্মসূত্রে নির্ধারিত কোন জাত-পাত প্রথা ছিলো না।

সেই যুগের ধর্মবিশ্বাসের যে ধারণা পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় এক ধরনের যোগাসনে আসীন ত্রি-আননের এক দেবমূর্তির ভাস্কর্য ও তাঁর সঙ্গে যেন যুক্ত হয়ে থাকা কয়েকটি কৃষ্ণসারমৃগের ছোট ছোট মূর্তি। এই দেবমূর্তির কেশদাম দুটি শৃঙ্গের আকারে বিন্যাস্ত। মূর্তিটির দুইদিকে দাঁড়িয়ে আছে বন্য জীবজন্তু। স্যার জন মার্শাল যখন এখানকার খননকার্যের তদারকি করছিলেন তখন তিনি এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, এই দেবমূর্তিটি হলো পশুপতি শিবের। এছাড়া সিন্ধু উপত্যকায় পাওয়া গিয়েছে প্রচুর সংখ্যক পোড়ামাটির স্ত্রীমূর্তি। এগুলি সেখানকার মাতৃ-দেবতার উপাসনারই সাক্ষ্য দেয়।

হরপ্পা সভ্যতায় বর্ণলিপি ছিলো। তবে তার পাঠোদ্ধার এখণো সম্ভব হয়নাই। তবে এই লিপির অস্তিত্বই প্রমাণ দিচ্ছে যে, ঐ সভ্যতা বিকশিত হয়ে কত উচ্চ স্তরে উঠেছিলো। এখানে প্রাপ্ত বর্ণ বা অক্ষরের সংখ্যা প্রায় চারশত (৪০০)। এর মধ্যে বেশিরভাগই হলো ধ্বনিনির্দেশক চিহ্ন, তবে কিছু কিছু ভাবনির্দেশক চিহ্নও রয়েছে। লেখার চল ছিলো ডান দিক থেকে বাঁয়ে (আরবী বা হিব্রুর মতো)। লিপিগুলোর পাঠোদ্ধার করতে হলে সবচাইতে প্রথম যে বিষয়টি আসে তা হলো, সেই সভ্যতার অধিবাসীরা কোন ভাষায় কথা বলতেন তা নির্ণয় করা। রুশ পন্ডিত ইউরি ক্নোরোজোভ (Yuri Knorozov) আন্দাজ করেন যে এরা logosyllabic script এবং কম্পিউটার ব্যবহার করে বিশ্লষণ করে পান যে সিন্ধু-উপত্যকার অধিবাসীরা দ্রাবিড় (আদি-দ্রাবিড়) ভাষাগোষ্ঠির অন্তর্ভুক্ত।

ভারত উপমহাদেশে আর্য জাতির আগমনঃ

ককেশীয় মহাজাতি গোষ্ঠীর একটি বৃহৎ নৃগোষ্ঠী হলো আর্য। এদের আদি পুরুষ ১ লক্ষ ২৫ হাজার বৎসর আগে আফ্রিকা থেকে বের হয়ে ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়া শুরু করে। ৭৫ হাজার বৎসর আগে এদের একটি দল আরব উপদ্বীপে পৌঁছায়। আর ৬০ হাজার বৎসরের ভিতরে এরা এশিয়া সংলগ্ন ইউরোপে বসতি স্থাপন করে। ৪০ হাজার বৎসরের ভিতরে ইউরোপের রাইন নদী থেকে তুরস্ক পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে এরা ছড়িয়ে পড়েছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫ হাজার বৎসরের দিকে এদের একটি দল দানিয়ুব নদীর তীরবর্তী বিশাল তৃণাঞ্চলে বসবাস করা শুরু করে। সে সময়ে বসবাস এদের ছিল মূল পেশা ছিল পশুপালন। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং আন্তঃগোষ্ঠী দ্বন্দ্বের সূত্রে এদের একটি দল এই অঞ্চল ত্যাগ করে দার্দেনেলিশ প্রণালী হয়ে এশিয়া মাইনরে প্রবেশ করে। খ্রিষ্টপূর্ব ২৫ হাজার বৎসরের দিকে এরা ইউফ্রেটিস-টাইগ্রিস নদী পার হয়ে মধ্য এশিয়ার বিস্তৃর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। পরে এদের একটি দল চলে যায় ইউরোপের দিকে, অপর দলটি চলে আসে ইরানের দিকে। আর খ্রিষ্টপূর্ব ১৮০০ অব্দের দিকে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের অধিবাসীরা ভারতে প্রবেশ করে। ইরানে যারা থেকে গিয়েছিল তাদেরকে বলা হয় ইন্দো-ইরানীয়। আর ভারতে যারা প্রবেশ করেছিল, তাদেরকে বলা হয় আর্য। (ম্যাক্স মুলার (Max Mueller)-এর মতে আর্যদের আদি নিবাস মধ্য এশিয়া। তারা বসবাস করতো কৃষ্ণসাগরের তীরবর্তি অঞ্চলে )। ‘আর্য’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি ‘অরি’ শব্দ থেকে যার অর্থ বিদেশী। ‘আর্য’ শব্দের অর্থ ‘নবাগত’। বৈদিক যুগে এটাই ছিলো আর্য শব্দের অর্থ। তবে পরবর্তিতে আর্যরা আত্মপক্ষ সমর্থন করে এই শব্দের অর্থ ‘মহান’ বলে প্রচার করেছে। ছোটো ছোটো দলে আর্যরা কয়েকটি তরঙ্গের দমকে ভারত উপমহাদেশে প্রবেশ করে। এদের ভারতে প্রবেশের প্রক্রিয়াটি প্রায় ১৫০০ অব্দ পর্যন্ত চলেছিল। ভারত উপমহাদেশে প্রবেশকালে আর্যরা সাথে করে নিয়ে এসেছিলো একটি গ্রন্থ যার নাম ‘বেদ’ (http://www.sacred-texts.com/hin/rigveda/index.htm )। বেদ শব্দের অর্থ ‘জ্ঞান’। বলা হয়ে থাকে যে এই বেদই ছিলো আর্যদের কথিত প্রথম জ্ঞানভাষণ। আর্যদের রচিত ঋগবেদের ভাষার সাথে জেন্দভেস্তা ভাষার অদ্ভুদ মিল রয়েছে। ধারণা করা হয়, ইরানের প্রাচীন ভাষা এবং আর্যদের ভাষা একই ছিল। হাজার হাজার বৎসর অতিক্রম করে উভয় ভাষা স্বতন্ত্র রূপ লাভ করেছিল। এছাড়া উভয় ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত দেবদেবীদেরও অনেক মিল আছে। জেন্দভেস্তায় বরুণকে দেবরাজ ও ইন্দ্রকে মন্দ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ঋগবেদে বরুণ জল ও মেঘের দেবতা আর ইন্দ্রকে দেবরাজ বলা হয়েছে। কেউ কেউ এমনও বলছেন যে কশ্যপ মুণির নামানুসারে কাস্পিয়ান হ্রদের নাম করণ করা হয়েছে। কয়েকজন পশ্চিমা নৃবিজ্ঞানিও এ মতের সমর্থন করেছেন।

পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, আর্যদের আগমণের আগেই আমাদের উপমহাদেশে সাত সহাস্রাধিক বৎসরের পুরাতন বিশাল সভ্যতা ছিলো। এই সভ্যতা গড়ে তুলেছিলো উপমহাদেশের প্রাচীন অধিবাসী দ্রাবিড়রা। দ্রাবিড়রা ছিলো তুলনামূলকভাবে শান্তিপ্রিয়।

আগ্রাসী ও হিংস্র আর্যরা ভারতের সিন্ধু নদীর অববাহিকা জুড়ে স্থানীয় দ্রাবিড়দের বিতারিত করে আধিপত্য বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছিল। ঋগ্বেদ থেকে জানা যায়, আর্যরা আফগানিস্তান থেকে পাঞ্জাব পর্যন্ত আধিপত্য বিস্তার করেছিল। এই ঋগ্বেদে গঙ্গা যমুনা, নদীর কোন নাম নেই। ঋগ্বেদের আমলে এরা হিমালয় পর্বতমালা সংলগ্ন উত্তরভারতের সাথে পরিচিত হয়েছিল। এই কারণে হিমালয় পর্বতের নাম পাওয়া যায় ঋগ্বেদে। কিন্তু বিন্ধ্যপর্বতের নাম পাওয়া যায় না। এই বিচারে ধারণা করা যায়, ঋগ্বেদের আমলে বিন্ধ্যপর্বত পর্যন্ত আর্যরা পৌঁছাতে পারে নি। চাল বা ভাত ঋগ্বেদে নাই। হিংস্র জীবজন্তুর মধ্যে ঋগ্বেদে বাঘের নাম নেই। কারণ, ভারতবর্ষের বাঘের দেখা পাওয়া যায় ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলে। সে কারণেই বলা যায়, ভারতের পূর্বাঞ্চলের বঙ্গদেশ থেকে এরা অনেকদূরে ছিল। এই সময় পাঞ্চাব অঞ্চলের সিন্ধুসহ অন্যান্য নদী-তীরবর্তী অঞ্চলে আর্যরা বসতি স্থাপন করেছিল। ঋগ্বেদ খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ বা ১১০০ অব্দের দিকে রচিত। এই সূত্রে বলা যায়, আফগানিস্তান থেকে পাঞ্জাব অঞ্চলের ভিতরে আর্যদের বিচরণ ছিল। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীদের উপর আর্যদের প্রভাব তখনো পড়ে নি।

পাঞ্জাব এবং এর আশপাশের কিছু অংশে আর্যরা বসতি স্থাপন করে নিজেদেরকে সুস্থির অবস্থায় আনতে সক্ষম হয়েছিল। এই সময় এরা পাথর, ব্রোঞ্জ এবং তামার তৈরি কুঠার কোদাল ইত্যাদি ব্যবহার করতো। এই সব অস্ত্রপাতি দিয়ে সেকালের বিশাল বনজঙ্গল পরিষ্কার করে করে গঙ্গানদী পর্যন্ত পৌঁছাতে অনেক সময় ব্যয় করেছিল। অবশ্য খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ অব্দের দিকে আর্যরা লৌহের ব্যবহার শিখেছিল। কিন্তু ব্যাপকভাবে লৌহের ব্যবহার করতে পেরেছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০ অব্দের দিকে । এরপর থেকে এদের অগ্রযাত্রা দ্রুততর হতে থাকে। শক্ত এবং ধারালো অস্ত্র তৈরির জন্য লোহার আর্য সভ্যতাকে আরও সুস্থির করতে সহায়তা করেছিল। এরা লোহার কুঠার ব্যবহার করে দ্রুত জঙ্গল পরিষ্কার করে, লোহার তৈরি লাঙ্গলের ফলার সাহায্য ব্যাপক কৃষি কাজ করতে সক্ষম হয়েছিল। সে কারণে, সে সময়ে ঋষিরা নানা রকম বিষয় নিয়ে ভাববার সময় পেয়েছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০ অব্দের দিকে আর্য ঋষিরা রচনা করেছিল উপনিষদ।

এই সময় অনার্য গোষ্ঠীদের সাথে তাদের প্রায়ই সংঘাত হতো। দখলদার আর্যরা অনার্যদের এরা নাম দিয়েছিল দস্যু।

(http://www.onushilon.org/animal/human/rece/arza.htm)

আর্য-অনার্য সংঘাত (দ্রাবিড়দের একদল আর্যদের অধীনস্থ হয়, আরেকদল পালিয়ে আসে):
আর্যদের এই উপমহাদেশে আগমণই হয়েছিলো স্থানীয় অনার্যদের আক্রমণের মধ্য দিয়ে। তাই শুরুটাই হয় আর্য-অনার্য সংঘাতের মধ্য দিয়ে। এই আর্য-অনার্য সংঘাতের বিষয়টি উঠে এসেছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘ভারতবর্ষে ইতিহাসের ধারা’ প্রবন্ধে । “পর্দা উঠিবামাত্র ভারতবর্ষের ইতিহাসের প্রথমাঙ্কেই আমরা আর্য-অনার্যের প্রচণ্ড জাতিসংঘাত দেখিতে পাই। এই সংঘাতের প্রথম প্রবলবেগে অনার্যের প্রতি আর্যের যে বিদ্বেষ জাগিয়াছিল তাহারই ধাক্কায় আর্যেরা নিজের মধ্যে নিজে সংহত হইতে পারিল।

এইরূপ সংহত হইবার অপেক্ষা ছিল। কারণ, ভারতবর্ষে আর্যেরা কালে কালে ও দলে দলে প্রবেশ করিতেছিলেন। তাঁহাদের সকলেরই গোত্র, দেবতা ও মন্ত্র যে একই ছিল তাহা নহে। বাহির হইতে যদি একটা প্রবল আঘাত তাঁহাদিগকে বাধা না দিত তবে এই আর্য উপনিবেশ দেখিতে দেখিতে নানা শাখা প্রতিশাখায় সম্পূর্ণ বিভক্ত হইয়া বিক্ষিপ্ত হইয়া যাইত। তাহারা আপনাদিগকে এক বলিয়া জানিতে পারিত না। আপনাদের সামান্য বাহ্য ভেদগুলিকেই বড়ো করিয়া দেখিত। পরের সঙ্গে লড়াই করিতে গিয়াই আর্যেরা আপনাকে আপন বলিয়া উপলব্ধি করিলেন।“
(http://tagoreweb.in/Render/ShowContent.aspx?ct=Essays&bi=72EE92F5-BE50-40B7-BE6E-0F7410664DA3&ti=72EE92F5-BE50-4577-AE6E-0F7410664DA3 )

সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসের কারণ:

এই বিষয়টি নিয়ে অনেক অনুসন্ধান ও আলোচনা হয়েছে। নানারূপ অভিমতই পাওয়া গিয়েছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাখ্যা হচ্ছে, সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসের মূল কারণ হলো আর্য জাতির আক্রমণ-অভিযান। এই সভ্যতার শহরগুলিতে ব্যাপক হত্যাকান্ডের চিহ্ন আবিষ্কৃত হয়েছে। রাস্তার উপর পড়ে থাকা মানুষের অস্থি-কঙ্কাল (স্পষ্টই আক্রমণকারী শত্রুর সঙ্গে লড়াই করতে করতে নিহত হয়েছিলো যে সকল শহরবাসী তাদের দেহাবশেষ) ইঙ্গিত দেয় যে একদা শহরবাসী ও বহিরাগত শত্রুদের মধ্যে ঘোরতর লড়াই হয়েছিলো।

Aryan invaders killed people and destroyed the Indus Valley Civilization. The Harappan people were peace loving. They did not have weapons to attack others or to defend themselves. They had implements for hunting or farming. So they could not defend themselves against the invaders. The destruction of these people by Aryans was a sad event in history. The Aryans lived in villages and knew nothing of urban life. Thus it took hundred of years again for India to have beautiful cities like Mohen-jo-daro and Harappa. (http://indiansaga.com/history/end_indusvalley.html )

আর্যদের অত্যাচারে টিকতে না পেরে অধিকাংশ দ্রাবিড় দক্ষিণ ভারত, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। . অধ্যাপক মন্মথমোহন বসু লিখেনঃ
“প্রায় সমস্ত উত্তর ভারত যখন বিজয়ী আর্য জাতির অধীনতা স্বীকার করিয়াচিল, বঙ্গবাসীরা তখন সগর্বে মস্তক উত্তোলন করিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াছিল। শতপথ ব্রাহ্মণ বলেন, আর্যদের হোমাগ্নি সরস্বতী তীর হইতে ভাগলপুরের সদানীরা (করতোয়া) নদীর পশ্চিম তীর পর্যন্ত আসিয়া নিভিয়া গিয়াছিল। অর্থাৎ সদানীরার অপর পারে অবস্থিত বঙ্গদেশের মধ্যে তাঁহারা প্রবেশ করিতে পারেন নাই”। (বাংলা নাটকের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, দ্বিতীয় সংস্করণ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৫৯, পৃষ্ঠা ২১)
Kurukhs people belonging to the north-Dravidian subgroup. Found in Eastern India and Bangladesh. It is the only Dravidian language indigenous in Bangladesh.

বৈদিক ধর্মে বর্ণভেদ প্রথা কবে এলো? কেন এলো?:
বর্ণ কথাটির অর্থ রঙ। গাত্রবর্ণের উপর ভিত্তি করেই এই প্রভেদ তৈরী করা হয়েছে। আগ্রাসী আর্যরা যেহেতু ককেশীয় ছিলো তাই তাদের গাত্রবর্ণ ছিলো সাদা, এই দখলদার সাদারা বিজয়ী হিসাবে উত্তর ভারত শাসন করতে শুরু করে। শাসক হিসাবে তারা নিজেদেরকে উচ্চ বর্ণ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে। এভাবে তাদের মধ্যে যারা ধর্ম বা জ্ঞান চর্চা করতো তাদেরকে ব্রাহ্মণ ও যারা শাসনকার্য ও যুদ্ধকার্য পরিচালনা করতো তাদেরকে ক্ষত্রিয় নামকরন করে ও এই দুই দলকে (বর্ণকে) উচ্চবর্ণের মর্যাদা দেয়। আর পরাজিত স্থানীয় দ্রাবিড়-রা, যাদের গাত্রবর্ণ ছিলো শ্যাম বা কালো তাদেরকে নিম্নবর্ণের স্থান দেয়। এদের নামকরণ হয় বৈশ্য ও শুদ্র। এদের মধ্যে শুদ্ররাই ছিলো সংখ্যাগরিষ্ঠ আর এদের সামাজিক মান-মর্যাদা বলতে কিছুই ছিলোনা, এমনকি বেদ পাঠ বা জ্ঞান চর্চা করার কোন অধিকারও তাদের ছিলোনা। তথাকথিত নিম্মমানের কাজে তাদের বংশানুক্রমিকভাবে নিয়োজিত করা হয়। এভাবে পরাজিত স্থানীয়দের বিজয়ী বহিরাগত আর্যদের সেবকে পরিণত করা হয়। আর এই সামাজিক ভেদাভেদকে চিরস্থায়ী করতে তাকে ধর্মীয় রূপ দেয়া হয় । বৈদিক ধর্মমতে স্রষ্টা ব্রহ্মার মুখ থেকে সৃষ্ট ব্রাহ্মণরা, ক্ষত্রিয়রা ব্রহ্মার বাহু থেকে, বৈশ্যরা ব্রহ্মার উরু থেকে, শুদ্ররা ব্রহ্মার পা থেকে সৃষ্ট। এ ধরণের বর্ণভেদের সাহায্যেই আর্যদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদন, তাদের জাতিগত বিশুদ্ধতা সংরক্ষণ এবং কৃষ্ণকায় স্থানীয় অধিবাসীদের শুদ্রবর্ণের স্তরে অধঃপতিত করে রেখে তাঁদের দমন করার উপায় ঠাউরেছিলো আর্যরা। (সূত্র: ভারতবর্ষের ইতিহাস – আন্তোনভ, বোনগার্দ-লেভিন)।

বাংলায় আর্যদের আগমন:

কোনো কোনো ঐতিহাসিক দ্রাবিড় জাতিকে বাঙালির আদি মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ‘আর্যোপনিবেশের পূর্বে যে প্রাচীন জাতি ভূমধ্যসাগর হতে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত স্বীয় অধিকার বিস্তার করেছিল তাহারাই বোধ হয় ঋগ্বেদের দস্যু এবং তাহারাই ঐতরেয় আরণ্যকে বিজেতৃগণ কর্তৃক পক্ষী নামে অভিহিত হইয়াছে। এই প্রাচীন জাতিই বংগ মগধের আদিম অধিবাসী।’ ভারতবর্ষে দ্রাবিড়দের আগমন ঘটেছে সুপ্রাচীনকালে, প্রাগৈতিহাসিককালে এবং তারা এসেছে সেমেটিকদের আদি আবাসভূমি পশ্চিম এশিয়া থেকে। অর্থাৎ ব্যাবিলন বা মেসোপটেমিয়াই ছিলো দ্রাবিড়দের উৎপত্তিস্থল।

দ্রাবিড় অধ্যুষিত সিন্ধু, পাঞ্জাব ও উত্তর ভারত আর্যদের দখলে চলে যাওয়ার পর তাদের অত্যাচারে টিকতে না পেরে অধিকাংশ দ্রাবিড় দক্ষিণ ভারত, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

বৈদিক আর্যগণ প্রথম দিকে উপনিবেশ গড়ার ক্ষেত্রে নানা কারণে এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণে আসার ব্যাপারে অনাগ্রহী ছিল অথবা সামরিক শক্তিতে পারবে না বুঝতে পেরে অনাগ্রহের ভান করেছিলো । আর্গুমেন্ট হিসাবে তারা বলেছিলো যে, তাদের দৃষ্টিতে পূর্বাঞ্চলীয় ভূখন্ডে ছিল অশুচি ও দস্যু বা বর্বর জনগোষ্ঠীর বাস।
মৎস্য পূরাণের এক বর্ণনায় দেখা যায় যে, এক অন্ধ বৃদ্ধ সাধু ভুলবশত নিম্নগাঙ্গেয় উপত্যকার স্রোতে ভেলা ভাসিয়েছিলেন। বালী নামের এক নিঃসন্তান রাজা বংশ রক্ষা ও রাজ্যের উত্তরাধিকারীর জন্য বৃদ্ধ সাধুকে আশীর্বাদ করার অনুরোধ করেন। সাধুর আশীর্বাদে রাজা তাঁর বৃদ্ধা রানীর গর্ভজাত পাঁচটি পুত্র সন্তানের জনক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। পাঁচ পুত্রের নাম রাখা হয় অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুন্ড্র ও সূক্ষ্ম। রাজার পাঁচ পুত্র সন্তানের নামে বাংলার পাঁচটি ভূখন্ডের নামকরণ হয়। পৌরাণিক কাহিনীতে বর্ণিত এ পাঁচটি ভূখন্ডই পরবর্তীকালে বাংলা ও বিহার অঞ্চলকে প্রতিনিধিত্ব করে।

বাংলা ভূখন্ড আর্যদের নিকট এতোটাই অপবিত্র ছিল যে, তারা সতর্কতার সঙ্গে এতদঞ্চলে প্রবেশ ও স্থায়ী বসবাস গড়া থেকে নিজেদের বিরত রেখেছিলো। সাধু ছিলেন অন্ধ এবং গঙ্গার জলস্রোতের অনুকূলে ভাসমান ভেলার গতির ওপর তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিলো না বলেই তাঁর ভুলের কারণে দুর্ঘটনাবশত: আর্যদের সঙ্গে পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ সূচিত হয়েছিল।

যে কোনো প্রকারেই হোক, আর্যজাতি বাংলায় প্রবেশ করে এবং পরবর্তী পর্যায়ে তাদের এ অঞ্চলে প্রবেশ ছিল প্রায়ই আকস্মিক ও বিরল ঘটনা। সবচাইতে কৌতুহোলদ্দীপক হলো, আরও পরবর্তী সময়ের বৈদিক সাহিত্যের বিষয়াবলীতেও বাংলার জনগোষ্ঠীকে দস্যু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মহাভারত-এ বাংলার উপকূলবর্তী অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে ম্লেচ্ছ (অপবিত্র,পাপিষ্ঠ) হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। ভগবত পুরাণে-ও বাংলার জনগণকে বলা হয়েছে ‘পাপী’। ধর্মশাস্ত্রে পুন্ড্র ও বঙ্গীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংস্পর্শে আসার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে মৃত্যুর পরবর্তী শেষ কৃত্যানুষ্ঠান আয়োজনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

যাহোক, পরবর্তিকালে আর্যরা তাদের দখল বাড়াতে আরো পুবদিকে অগ্রসর হয়। সামরিক বিজয়ের সাথে সাথে বৈদিক আর্যরা তাদের ধর্ম-সংস্কৃতির বিজয় অর্জনেও সকল শক্তি নিয়োগ করে। প্রায় সম্পর্ণ উত্তর ভারত আর্যদের অধীনতা স্বীকার করে নেয়। কিন্তু স্বাধীন মনোভাব ও নিজ কৃষ্টির গর্বে গর্বিত বঙ্গবাসীরা আর্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রবলভাবে রুখে দাঁড়ায়। ফলে করতোয়ার তীর পর্যন্ত এসে আর্যদের সামরিক অভিযান থমকে দাঁড়ায়।
আমাদের সংগ্রামী পূর্বপুরুষদের এই প্রতিরোধ-যুদ্ধ সম্পর্কে অধ্যাপক মন্মথমোহন বসু লিখেনঃ
“প্রায় সমস্ত উত্তর ভারত যখন বিজয়ী আর্য জাতির অধীনতা স্বীকার করিয়াছিল, বঙ্গবাসীরা তখন সগর্বে মস্তক উত্তোলন করিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াছিল। শতপথ ব্রাহ্মণ বলেন, আর্যদের হোমাগ্নি সরস্বতী তীর হইতে ভাগলপুরের সদানীরা (করতোয়া) নদীর পশ্চিম তীর পর্যন্ত আসিয়া নিভিয়া গিয়াছিল। অর্থাৎ সদানীরার অপর পারে অবস্থিত বঙ্গদেশের মধ্যে তাঁহারা প্রবেশ করিতে পারেন নাই”। (বাংলা নাটকের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, দ্বিতীয় সংস্করণ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৫৯, পৃষ্ঠা ২১)

সামরিক অভিযান ব্যাহত হওয়ার পর আর্যরা অগ্রসর হয় ঘুরপথে। তারা বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অভিযান পরিচালনা করে। তাই দেখা যায়, আর্য সামাজের ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যরা এ দেশে প্রথম আসেনি, আগে এসেছে ব্রাহ্মণেরা। তারা এসেছে বেদান্ত দর্শন প্রচারের নামে। কেননা, ধর্ম-কৃষ্টি-সংস্কৃতি-সভ্যতার বিজয় সম্পন্ন হয়ে গেলে সামরিক বিজয় সহজেই হয়ে যাবে। এ এলাকার জনগণ ব্রাহ্মণ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম পরিচালনা করেন, তা ছিল মূলত তাদের ধর্ম-কৃষ্টি-সভ্যতা রক্ষা করার লড়াই। তাদের এই প্রতিরোধ সংগ্রাম শত শত বছর স্থায়ী হয়। ‘স্বর্গ রাজ্যে’ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা নিয়ে দেবতা ও অসুরদের মধ্যে দীর্ঘকাল দ্বন্দ্ব-সংঘাত-সংগ্রামের যে অসংখ্য কাহিনী ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ প্রভৃতি আর্য সাহিত্যে ছড়িযে আছে, সেগুলো আসলে আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রতিরোধ ও মুক্তি সংগ্রামেরই কাহিনী। আমাদের পূর্ব পুরুষদের গৌরবদীপ্ত সংগ্রামের কাহিনীকে এসব আর্য সাহিত্যে যেভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, পৃথিবীর অন্য কোন জাতির ধর্মশাস্ত্রে কোন মানবগোষ্ঠীকে এমন আপত্তিকর ভাষায় চিহ্নিত করার নযীর পাওয়া যাবে না। উইলিয়াম হান্টার তার ‘ The annals of rural Bengal (গ্রাম বাংলার কাহিনী)’ বইয়ে ও প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ
“সংস্কৃত সাহিত্যে বিবৃত প্রথম ঐতিহাসিক ঘটনা হলো আদিম অধিবাসীদের সাথে আর্যদের বিরোধ। এই বিরোধজনিত আবেগ সমানভাবে ছড়িয়ে রয়েছে ঋষিদের স্তবগানে, ধর্মগুরুদের অনুশাসনে এবং মহাকবিদের কিংবদন্তীতে। ……… যুগ যুগ ধরে সংস্কৃত প্রবক্তারা আদিবাসীদেরকে প্রতিটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অধিকার হতে বঞ্চিত করে তাদের থেকে ঘৃণাভরে দূরে থেকেছে”।
সাংস্কৃতিক সংঘাত
কামরুদ্দীন আহমদ তাঁর ‘এ সোশ্যাল হিস্ট্রি অব বেঙ্গল’ বইয়ে দেখিয়েছেনঃ তিন স্তরে বিভক্ত আর্য সমাজের ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যরা প্রথমে বাংলায় আসেনি। এদেশে প্রথমে এসেছে ব্রাহ্মণেরা। তারা এসেছে বেদান্ত দর্শন প্রচারের নামে। বাংলা ও বিহারের জনগণ আর্য-অধিকারের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন পরিচালনা করেন, তাও ছিল ধর্মভিত্তিক তথা সাংস্কৃতিক।

বঙ্গ-দ্রাবিড়দের প্রতিরোধের ফলে অন্তত খ্রিস্টপূর্ব চার শতক পর্যন্ত এদেশে আর্য-প্রভাব রুখে দেওয়া সম্ভব হয়। খ্রিস্টপূর্ব চার শতকে মৌর্য সাম্রাজ্য ও বাংলা একীভুত হয় (তবে তার পিছনে বাংলার দর্শনের প্রভাবই কাজ করেছিলো। এই প্রবন্ধে পরবর্তিতে তা আলোচনা করবো) এবং তার পর গুপ্ত রাজবাংশ প্রতিষ্ঠার আগে বাংলায় আর্য ধর্মের প্রভাব বিস্তৃত হয়নি। মূলত গুপ্ত রাজ্যের প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাংলাদেশে আর্য প্রভাব বাড়তে থাকে। তারপর তিন শতক গুপ্ত শাসনামলে আর্য ধর্ম, আর্য ভাষা ও আর্য সংস্কৃতি বাংলাদেশে প্রত্যক্ষভাবে শিকড় গাড়ে।

গুপ্ত আমলে বাংলাদেশে আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দোর্দন্ড প্রতাপ শুরু হয়। আর্য ভাষা ও সংস্কৃতির স্রোত প্রবল আছড়ে পড়ে এখানে। এর মোকাবিলায় জনগণের প্রতিরোধ সংগ্রাম পরিচালিত হয় জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মকে আশ্রয় করে। জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতি বাংলা ও বিহারের জনগণের আত্মরক্ষার সংগ্রামে এ সময় প্রধান ভূমিকা পালন করে। আর জনগণের আর্য-আগ্রাসনবিরোধী প্রতিরোধ শক্তিকে অবলম্বন করেই বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতি দীর্ঘদিন এ এলাকার প্রধান ধর্ম ও সংস্কৃতিরূপে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়ের মতে ঐতিহাসিকও স্বীকার করেছেনঃ
“আর্যরাজগণের অধঃপতনের পূর্বে উত্তরাপথের পূর্বাঞ্চলে আর্য ধর্মের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলন উপি্থি হইয়াছিল। জৈন ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্ম এই আন্দোলনের ফলাফল”।(বাঙ্গালার ইতিহাস, পৃষ্ঠা ২৭-২৮)
এ আন্দোলনের তোড়ে বাংলা ও বিহারে আর্য রাজত্ব ভেসে গিয়েছিল। আর্য-দখল থেকে এ সময় উত্তরাপথের পুব-সীমানার রাজ্যগুলো শুধু মুক্তই হয়নি, শতদ্র নদী পর্যন্ত সমস্ত এলাকা অনার্য রাজাদরে অধীনতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল।

আর্য রাজা অশোক নিজেই বাংলার দর্শন বৌদ্ধ গ্রহন করলেন:

রাজা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (Chandragupta Maurya (Sandrakottos) (324–301 BC)) খ্রীষ্টপূর্ব ৩২৪ সালে উপমাহাদেশে মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে তিনি বৈদিক দর্শনে বিশ্বাসী হলেও, জৈন মতানুসারে শেষ বয়সে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য জৈন ধর্মগ্রহণ করে সিংহাসন ত্যাগ করে জৈন সন্ন্যাসী ভদ্রবাহুর সাথে দাক্ষিণাত্য যাত্রা করেন ও বর্তমানের কর্ণাটকের শ্রাবণবেলগোলায় স্বেচ্ছায় উপবাসে দেহত্যাগ করেন।

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের পর তাঁর পুত্র বিন্দুসার সিংহাসনে বসেন। পিতৃসূত্রে তিনি এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী হন। তাকে বিন্দুসার দক্ষিণ দিকে আরো প্রসারিত করেন ও বর্তমান কর্ণাটক রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল মৌর্য সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। চোল, পান্ড্য ও চের রাজারা তাঁর সঙ্গে মিত্রতার সূত্রে আবদ্ধ হন। প্রকৃতপক্ষে তাঁরা বাধ্য হন। তাই বিন্দুসার সে’সব অঞ্চল আক্রমণ করেননি। এছাড়া কলিঙ্গ তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল না। ইতিহাসে তাঁর পিতা চন্দ্রগুপ্ত বা পুত্র অশোকের মত বিন্দুসারের সপম্পর্কে অধিক তথ্য পাওয়া যায় না। বিন্দুসারকে বলা হয় ‘পিতার পুত্র ও পুত্রের পিতা’।

অশোক বিন্দুসারের অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বসম্পন্ন রাণী ধর্মার সন্তান ছিলেন। তবে এ’নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ আছে। তাঁর চেয়ে বয়সে বড় বিন্দুসারের অনেক দাদা ছিলেন, একমাত্র বিদ্দাশোকই ছিলেন তাঁর অনুজ। কিন্তু পরাক্রম ও বুদ্ধির জন্য তিনিই সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন।

অশোক তাঁর সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার জন্য মৌর্য সেনাবাহিনীর উচ্চপদে আসীন ছিলেন ও সেনাবাহিনীর এক বড় অংশের পরিচালক ছিলেন। অশোকের এই শক্তিবৃদ্ধি বাকি ভাইদের ঈর্ষান্বিত করে তোলে; সুসীম, বিন্দুসারের জ্যেষ্ঠ পুত্র তার উত্তরাধিকার নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। ইতোমধ্যে সুসীমের অপদার্থতায় তক্ষশীলায় বিদ্রোহ দেখা দেয়। সুসীমেরই চক্রান্তে বিন্দুসার অশোককে সেখানে বিদ্রোহে দমনে পাঠান। অশোক আসার খবরে সেনাবাহিনী উজ্জীবিত হয়ে ওঠে, পরে বিদ্রোহী সেনারাও তাঁর আগমনে বিদ্রোহের পথ ত্যাগ করে ও বিনাযুদ্ধে অশোক বিদ্রোহ দমন করে ফেলেন।

যখন বিন্দুসারের অসুস্হতার খবর ছড়িয়ে পড়ে তখন অশোক মগধের বাইরে ছিলেন। এরপর বিন্দুসারের পুত্রদের মধ্যে সিংহাসনের দখল নিয়ে রক্তাক্ত দ্বন্দ্ব শুরু হ্য়। লোকশ্রুতি অনুসারে অশোক তাঁর ভাইদের হত্যা করে সিংহাসনের বাধা দূর করতে সক্ষম হন।

প্রচন্ড যুদ্ধবাজ ও রক্তপিপাসু অশোক রাজা হওয়ার পরই সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোযোগী হন। তিনি পূর্বে বর্তমান আসাম ও বাংলাদেশ, পশ্চিমে ইরান ও আফগানিস্তান, উত্তরে পামীর গ্রন্থি থেকে প্রায় সমগ্র দক্ষিণ ভারত নিজের সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।

কিন্তু যে বড় একটি ঘটনা সমগ্র পৃথিবীতেই একটি নবযুগের সূচনা করে তা হলো, বঙ্গোপসাগরের পশ্চিম উপকুলস্থ শক্তিশালী এক রাষ্ট্র কলিঙ্গের (বর্তমান ওড়িষ্যার) বিরুদ্ধে যুদ্ধ।

কলিঙ্গ যুদ্ধ-এর সঠিক কারণ এখন জানা যায় না। এক হতে পারে কেবল নিজের শৌর্য প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে তিনি এটা করেছিলেন, আবার মনে করা হয়ে থাকে, অশোকের কোন ভাই কলিঙ্গে আশ্রয় নেন। তার প্রতিশোধ নেবার জন্য অশোক কলিঙ্গ আক্রমণ করেন। খ্রীষ্টপূর্ব ২৬১ (মতান্তরে খ্রীষ্টপূর্ব ২৬৩) অব্দে দয়া নদীর ধারে ধৌলি পাহাড়ের কাছে ভীষণ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। দু’দলের মধ্যে প্রচুর হতাহত হয় এবং অশোক কলিঙ্গ জয় করেন। এই যুদ্ধে কলিঙ্গবাহিনীর ১,০০,০০০ সেনা ও মৌর্য সেনাবাহিনীর ১০,০০০ সেনা নিহত হয় ও অসংখ্য নরনারী আহত হয়। যুদ্ধের এই বীভত্সতা সম্রাট অশোককে বিষাদগ্রস্ত করে তোলে। অবশেষে যুদ্ধের পথ ত্যাগ করে তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন ও অহিংসার পথে সাম্রাজ্য পরিচালনের নীতি গ্রহণ করেন।

এতকাল আর্য রাজারা যেই বৌদ্ধ দর্শনকে দূর দূর করেছিলেন, অবশেষে প্রবল প্রতাপশালী আর্য রাজা অশোক নিজেই সেই বৌদ্ধ দর্শনকে হৃদয়ে স্থান দিলেন।

(সম্রাট অশোক মগধ ও বাংলার অহিংস ও সাম্যের দর্শন বৌদ্ধ দর্শন গ্রহনপূর্বক যে নবযুগের সূচনা করেন পরবর্তি পর্বে তা নিয়ে আলোচনা করা হবে)

(চলবে)

১,৭৬৭ বার দেখা হয়েছে

১৪ টি মন্তব্য : “চেতনায় একেশ্বরবাদ, হৃদয়ে বুদ্ধের বাণী – পর্ব ২”

  1. টিটো মোস্তাফিজ

    রমিত ভাই, আপনি বেশ তথ্যবহুল সুন্দর লেখা লিখেন। আপনার ব্লগে মন্তব্য কম দেখে দুঃখ পাই। আমার মনে হয় পোলাপান একটু হালকা জিনিসে আসক্ত। আমি নিজেও অবশ্য তেমন কমেন্ট দিতে পারিনা। তবে আপনার লেখার ভক্ত। এ ধরণের লেখা হাতে সময় নিয়ে পড়ে মন্তব্য করতে হয়। না হলে আত্মপ্রতারণা হয়ে যায়। শুভেচ্ছা জানবেন। ধন্যবাদ 🙂


    পুরাদস্তুর বাঙ্গাল

    জবাব দিন
  2. ড. রমিত আজাদ (৮২-৮৮)

    প্রিয় মোস্তাফিজ,
    মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ। আমি চেষ্টা করি পড়ালেখা/গবেষণা করে প্রবন্ধ লিখে পোস্ট দেয়ার। কমেন্ট কম হয় আমি জানি। তবে মন খারাপ হয়না। কারণ পড়ে অনেকেই, এটা আমি লক্ষ্য করি। একবার সামু ব্লগে প্লেটো ও গণতন্ত্রের উপর একটা লেখা দিয়েছিলাম। পাঠক ছিলো প্রচুর, লেখাটি নির্বাচিত পাতায়ও গিয়েছিলো, তবে বেশ কয়েকদিন যাবৎ একটি কমেন্টও ছিলো না। অবশেষে একজন কমেন্ট লিখলেন, "এতো ভালো একটা লেখা, অথচ একটি কমেন্টও নেই!"
    যাহোক, হালকা লেখাই বেশিরভাগ পাঠক পছন্দ করে। ইন্টারেস্টিং হলো, সাহিত্য জগতে হালকা লেখার লেখকরা জনপ্রিয় হয় বেশী। মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ রফিক কায়সার স্যার দুর্দান্ত একজন গবেষক-লেখক। কিন্তু স্যারের লেখার জনপ্রিয়তা কম। তবে বিদগ্ধ মহলে তিনি সুপরিচিত।

    তুমি আমার লেখার ভক্ত শুনে খুশী হলাম।
    আমাদের জাতির অন্তর্নিহিত শক্তিটি বিশাল। এই প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে, আমি সেই শক্তিটিকে বোঝার ও বোঝানোর চেষ্টা করছি।

    জবাব দিন
  3. মোস্তফা (১৯৮০-১৯৮৬)

    আপনার এই লেখাটি তথ্যবহুল ও শ্রমসাধ্য--এতে কোন সন্দেহ নেই। লেখাটির কোন অংশটুকু চয়িত আর কোন অংশটুকুতে আপনার নিজস্ব বিবেচনা-বিশ্লেষনের সমাবেশ ঘটেছে, সেটি আরেকটু গুছিয়ে নিলে চমৎকার হয়। এমন লেখায় সাধারণত তথ্যের স্রোতে নিজস্ব বক্তব্য হারিয়ে যায়। আপনি এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন আছেন বলেই মনে করি।

    আর হ্যাঁ, জুড়ে দেয়া ছবিটি চমৎকার। (সম্পাদিত)


    দেখেছি সবুজ পাতা অঘ্রানের অন্ধকারে হতেছে হলুদ

    জবাব দিন
    • ড. রমিত আজাদ (৮২-৮৮)

      অনেক ধন্যবাদ সাইদুল ভাই।

      আসলে মেহেরগড় আবিষ্কৃত হয়েছে অনেক পরে।
      অনেকের ধারনা গ্রীক সভ্যতাটাই সবচাইতে পুরাতন, আসলে এই উপমহাদেশের সভ্যতাই প্রাচীনতম।
      পাকিস্তানে ৭০০০ বছরের প্রাচীন সভ্যতা পাওয়া গিয়েছে। আমার বিশ্বাস আমাদের বাংলাদেশেও এরকম প্রাচীন সভ্যতা পাওয়া যাবে। মিশরের মাটি শক্ত, তাই অনেক পুরাতন সভ্যতা এখনও মাটির উপরেই আছে, পক্ষান্তরে বাংলাদেশের মাটি নরম, তাই সভ্যতাগুলো মাটির নীচে চলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। একটু খোঁজা-খবর নিয়ে খোরাখুরি করলেই অনেক কিছু পাওয়া যাবে বলে আমার বিশ্বাস।

      জবাব দিন
  4. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    মেহেরগড় সভ্যতার কথা জানতে পেরে নিজের যৎকিঞ্চিত জ্ঞানের ভান্ডার সমৃদ্ধ হলো।
    "মৃতদেহ সমাধিস্থ করা হত এবং কোঁকড়ানো অবস্থায় সমাধিস্থ মৃতদেহ পাওয়া গেছে" - চমৎকার তথ্য। মেহেরগড় সভ্যতা সম্বন্ধে দেয়া অন্যান্য তথ্যাবলীও বেশ চমকপ্রদ।
    সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসের কারণ আর সম্রাট অশোকের বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণের কাহিনী জানতে পেরেও ভালো লাগলো।

    জবাব দিন
  5. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)
    ১৮৪২ সালে চার্লস ম্যাসন তাঁর ন্যারেটিভস অফ ভেরিয়াস জার্নিস ইন বালোচিস্তান, আফগানিস্তান অ্যান্ড দ্য পাঞ্জাব গ্রন্থের হরপ্পার ধ্বংসাবশেষের কথা প্রথম উল্লেখ করেন। স্থানীয় অধিবাসীরা তাঁকে “তেরো ক্রোশ” দূরে একটি প্রাচীন নগরীর উপস্থিতির কথা বলেছিল। কিন্তু প্রায় শতাব্দীকাল এই বিষয়ে কেউ কোনো প্রকার প্রত্নতাত্ত্বিক আগ্রহ দেখাননি।

    ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার জন ও উইলিয়াম ব্রান্টন করাচি ও লাহোরের মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে কোম্পানি লাইন স্থাপনের দায়িত্ব পান। জন লিখেছেন: “রেললাইন স্থাপনের জন্য উপযুক্ত ব্যালাস্ট কোথা থেকে পাওয়া যায়, সেই ভেবে আমি খুবই চিন্তিত ছিলাম।” তাঁদের বলা হয় যে, লাইনের নিকট ব্রাহ্মণাবাদ নামে এক প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। সেই শহরে এসে তাঁরা শক্ত ও ভালভাবে পোড়ানো ইঁটের সন্ধান পান এবং নিশ্চিত এই ভেবে যে “ব্যালাস্টের একটি উপযুক্ত উৎস পাওয়া গেছে।” ব্রাহ্মণাবাদ শহর এই ভাবে ব্যালাস্টে পরিণত হয়। কয়েক মাস পরে, আরও উত্তরে জনের ভাই উইলিয়াম ব্রান্টনের কর্মস্থলে “লাইনের অংশে অপর একটি শহরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। এই ধ্বংসাবশেষের ইঁট নিকটবর্তী হরপ্পা গ্রামের অধিবাসীরাও ব্যবহার করত। এই ইঁটেরই ব্যালাস্টে তৈরি হয় লাহোর থেকে করাচি পর্যন্ত ৯৩ মাইল (১৫০ কিলোমিটার) দৈর্ঘ্যের রেলপথ।”

    ১৮৭২-৭৫ সালে আলেকজান্ডার কানিংহাম প্রথম হরপ্পা সিলমোহর প্রকাশ করেন। তিনি ভুলবশত এটি ব্রাহ্মী লিপি মনে করেছিলেন। এর প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে ১৯১২ সালে জে. ফ্লিট আরও কতকগুলি হরপ্পা সিলমোহর আবিষ্কার করেন। এই সিলমোহর দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯২১-২২ সালে স্যার জন মার্শাল এই অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য অভিযান চালান। এই অভিযানের ফলস্রুতিতেই স্যার জন মার্শাল, রায়বাহাদুর দয়ারাম সাহানি ও মাধোস্বরূপ ভাট হরপ্পা এবং রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ই. জে. এইচ. ম্যাককি ও স্যার জন মার্শাল মহেঞ্জোদাড়ো আবিষ্কার করেন। ১৯৩১ সালের মধ্যেই মহেঞ্জোদাড়োর অধিকাংশ প্রত্নস্থল আবিষ্কৃত হয়ে গিয়েছিল। তৎসত্ত্বেও খননকার্য অব্যাহত থাকে। এরপর ১৯৪৪ সালে ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের তদনীন্তন ডিরেক্টর স্যার মর্টিমার হুইলারের নেতৃত্বে অপর একটি দল এই অঞ্চলে খননকার্য চালায়। ১৯৪৭ সালের পূর্বে আহমদ হাসান দানি, ব্রিজবাসী লাল, ননীগোপাল মজুমদার, স্যার মার্ক অরেল স্টেইন প্রমুখ এই অঞ্চলে খননকার্যে অংশ নিয়েছিলেন।

    পুরো পোস্ট ঘাঁটলামনা। উপরের অংশ নেয়া হয়েছে এখান থেকে ---
    https://www.facebook.com/permalink.php?story_fbid=766385636725996&id=741502835880943

    জবাব দিন
  6. একজন প্রত্নতত্বের ছাত্র হিসেবে যখন দেখি আমাদের মাতৃভাষায় খুব কম তথ্যবহুল লেখা আছে আনেক সময় খোঁজ দ্যা সার্চ করেও বাংলায় কোন লেখা পাই না। সেক্ষেত্রে আপনার লেখা সত্যিই চমৎকার ও তথ্যবহুল। ধন্যবাদ আশা করি আরো তথ্যবহুল আরো লেখা পাব।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।