চেতনায় একেশ্বরবাদ, হৃদয়ে বুদ্ধের বাণী – পর্ব ১

চেতনায় একেশ্বরবাদ, হৃদয়ে বুদ্ধের বাণী – পর্ব ১
———————- ড. রমিত আজাদ

প্রোথিত হৃদয়ের কথা
——– ড. রমিত আজাদ

কি উজ্জ্বল সুন্দর এই নীল আকাশ!
কেমন ঝলমলে রোদ তাকে আলোয় উদ্ভাসিত করে!
কেমন দুঃসাহস নিয়ে উড়ে যায় শঙ্খচিল!
নির্ভয় বিহঙ্গ ঐ আকাশ করবে জয়!

নীলিমার নীল গায়ে মেখে
ধ্যানমগ্ন পর্বতের নিশ্চল উপবেশন,
হঠাৎ ঝলকে ওঠে কপোতাক্ষের অবিরাম ধারা,
খরস্রোতা স্রোতস্বীনি,
বয়ে চলে উত্তাল সাগরের পানে,
খগোলে সূর্যালোকের বন্যা,
জলধি তরঙ্গচূড়ায় নৃত্যছন্দে বিভোর!

সবুজ তৃণ-গালিচার তীর ছুঁয়ে,
শুয়ে থাকা সোনালী ধানের ক্ষেত,
কেমন দুলে দুলে ওঠে,
বাংলার মৃদু মোলায়েম বায়ে!

সেই পথে উড়ে যাওয়া কোন বসন্ত-বাউরি,
মুগ্ধ হয়ে শোনে ব্যাকুল কোকিলের গান।
ধবলী একমনে ছেঁড়ে ঘাঁসফুল-শষ্প,
মায়ের দুগ্ধপানে তার আহলাদি শিশুটি
নিবৃত করে ক্ষুধা আর মমতার তৃষ্ণা।

মহাকাশ থেকে চেয়ে দেখো,
হিমালয় আর বঙ্গোপসাগরে ঘেরা
কেমন দুঃসাহসী দেশ,
মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে,
সবুজের আভা নিয়ে গায়ে।

অজস্র জন্ম ও অজস্র মৃত্যু,
চক্রাকারে আবর্তিত হয় মহাকালের স্রোতে,
কেবল নিশ্চল নিস্পন্দ হৃদয়ের কথা,
বধু ও শিশুর প্রেম রেখে ঘরে,
বিলাসী প্রাসাদ ছেড়ে নেমে আসা মলিন কর্দমাক্ত পথে,
রাজপুত্র সিদ্ধার্থের বাণী,
বোধি বৃক্ষের মত প্রোথিত হয়
আরো গভীরে,
সেখানে মায়াবী স্বপ্ন,
কেঁপে কেঁপে ওঠে চোখের তারায়।
সেই থেকে আজ,
হয়তো বয়ে যাবে আরো বহুকাল!

মহাজ্ঞানী কপিল: পৃথিবীর প্রথম দর্শন:
আজ থেকে ২৭০০ কি ২৭৫০ বছর আগে আমাদেরই এই মনোরম বাংলায় জন্ম নেন এক প্রাজ্ঞ ব্যাক্তি। মানুষের চিরন্তন জীবন-জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজে পেতে মিথ-মুক্ত র‍্যশনাল এনালাইসিস সম্পন্ন এক নতুন ধরণের জ্ঞান চর্চা শুরু করেন তিনি, এর নাম ‘দর্শন’। গ্রীসের প্রথম দার্শনিক থেলিস-এরও অন্ততপক্ষে এক শত বছর আগে জন্ম জ্ঞানী কপিল-এর। রাজপুত্র সিদ্ধার্থের (বোধি লাভ করে যিনি হয়েছিলেন গৌতম বুদ্ধ) জন্ম কপিল মুনির ১০০ বা ১৫০ বছর পর। দর্শনের প্রবক্তা কপিলের প্রবর্তিত দর্শনের নাম হয় ‘সাংখ্য’ দর্শন। “সাংখ্য” শব্দটির অর্থ “অভিজ্ঞতা-প্রসূত” বা “সংখ্যা-সম্বন্ধীয়”। কপিল প্রাচীন বাংলার অধিবাসী ছিলেন। প্রাচীনকালে যশোরের কপোতাক্ষ নদের পাশে কপিলমুনি গ্রামে এই দার্শনিকের জন্ম হয়েছিল-অনেকেই এরকম অনুমান করেন। কপিলের শেষ জীবন কেটেছিল বর্তমান পশ্চিম বাংলায় । এ প্রসঙ্গে একজন ভারতীয় পন্ডিতের মন্তব্য: …. Sagara an island on the bank of Ganga 90 miles form Calcutta spend later life and meditated.
প্রাচীন ভারতে ছটি দার্শনিক মত ছিল। সাংখ্য, যোগ, মীমাংশা, বেদান্ত, ন্যায়, এবং বৈশেষিক। এর মধ্যে কপিল-প্রবর্তিত সাংখ্যই সবচাইতে প্রাচীন দর্শন। সাংখ্য দর্শন অবৈদিক উৎস থেকে উদ্ভূত হয়েছে। ধ্রুপদি সাংখ্য যে বেদ-সহ রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত হয়নি, তাতেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। সাংখ্য বেদ সম্পর্কে নীরব। বেদের রক্ষক (ব্রাহ্মণ সমাজ), সমগ্র জাতিভেদ ব্যবস্থা, বৈদিক দেবদেবীদের সম্পর্কে সাংখ্য নীরব। প্রাচীন বৈদিক ধর্মে যে পশুবলি প্রথা প্রচলিত ছিল, তার বিরুদ্ধেও সাংখ্য যৎসামান্য সরব। যে কপিলের মেধা আজও বিশ্বের দার্শনিক পরিমন্ডলে কে বিস্ময়াভূত করে রেখেছে। কপিলের অগ্রসর মনন সম্বন্ধে জার্মান ভারততত্ত্ববিদ অধ্যাপক Richard Garbe লিখেছেন, `In Kapila’s doctrine, for the first time in the history of the world, the complete independence and freedom of the human mind, its full confidence in its own powers were exhibited. একজন দার্শনিক হিসেবে কপিল যথার্থই বিশ্বাস করতেন মানবজীবনে দর্শনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, জীবন দুঃখময়। দুঃখের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে দর্শন চর্চা জরুরি । জার্মান অধ্যাপক Richard Garbe তাঁর Die Sāmkhya-Philosophie বইতে কপিলের সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ৭ম শতক বলে নির্ধারণ করেছেন। (কিন্তু উল্লেখ করতে ভুলে গিয়েছেন যে কপিলের জন্ম প্রাচীন বাংলায়!) পন্ডিতগণ আরও মনে করেন যে ‘তত্ত্বসমাস’ ও ‘সাংখ্য প্রবচন’ এই দুই গ্রন্থ ঋষি কপিল রচিত| যাই হোক। দার্শনিক বলেই একদল লোক ভাবলো যে, কপিল নিরেশ্বরবাদী এবং বেদ বিরোধী। সে জন্য উত্তর ভারতের আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদীরা কপিলের ঘোর বিরোধীতা করেছে এবং কপিলের মূল রচনাবলী নষ্ট করে ফেলেছে। তাহলে আমরা কি ভাবে সাংখ্যদর্শন সম্বন্ধে জানতে পারলাম? প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিক মহলের একটি বৈশিষ্ট্য হল এই যে-কোনও মত খন্ডন করার আগে সেই মতের পূর্ণ উল্লেখ করা। কাজেই কপিলের মতবাদ খন্ডন করার আগে আর্যপন্ডিতেরা কপিল-এর সাংখ্যদর্শনের পূর্ণাঙ্গরূপে উল্লেখ করেছিলেন। এ ছাড়া খ্রিষ্টীয় ৩০০ শতকে ইশ্বরকৃষ্ণ নামে একজন পন্ডিত সাংখ্যদর্শনের ওপর ‘সাংখ্যকারিকা’ নামে একটি গ্রন্থরচনা করেছেন। যাতে কপিলের বহু উক্তি রয়েছে। ওই গ্রন্থটি কপিলের সাংখ্যদর্শনের ওপর একটি মূল্যবান তথ্যের উৎস।)

কর্দমা ও দেবধুতির সন্তান প্রাজ্ঞ কপিল বলেছিলেন: জগতে প্রত্যেক প্রাণি দুঃখভোগ করে। তিনি আরও বলছেন যে, ‘প্রকৃতির সহিত সংযোগই পুরুষের দুঃখের কারণ।’ সাংখ্য দর্শনের মুখ্য প্রতিপাদ্য বিষয় হল ‘দুঃখ নিবৃত্তি’ অর্থাৎ মানুষের জীবনে দুঃখের অবসান ঘটাতে হবে| সাংখ্য মতে দুঃখ তিন প্রকারের – ১)আধ্যাত্মিকা – রোগ হতে উৎপন্ন এই দেহের ও মনের কষ্টসমূহ ২)আদিভৌতিক – বর্হিজগৎ হতে উৎপন্ন দুঃখসমূহ এবং ৩) আদিদৈবিক – গ্রহ-নক্ষত্র প্রভৃতির কোপ হতে উৎপন্ন দুঃখসমূহ|

কোন একটি জনপদে কোন এক জ্ঞান হঠাৎ করে উদ্ভুত হয়না। তার পিছনে কাজ করে ঐ জনপদের জনগোষ্ঠির চিন্তা-চেতনা, জীবন-ধারা ইত্যাদি। সুতরাং প্রাচীন বাংলায় উদ্ভুত এই জ্ঞান (সাংখ্য দর্শন) মূলত ছিলো বাংলার মানুষের চিন্তা-চেতনা, জীবন-ধারা ইত্যাদিরই ফলাফল। এই দর্শনের কথা বাংলার মানুষেরই মনের কথা।

কপিল মুনির জন্মের ১০০ বা ১৫০ বছর পর জন্ম নেন রাজপুত্র সিদ্ধার্থ। বাংলার অদূরে লুম্বিনীতে এক ভরা পূর্ণিমার রাত্রে জন্ম নেন রাজা শুদ্ধোধন ও রাণী মায়াদেবী-র ঘরে জন্ম নেন তিনি। তবে রাজপুত্রের জন্ম রাজপ্রাসাদে হয়নি। তাঁর জন্ম হয় অধুনা নেপালের তরাই অঞ্চলেরে অন্তর্গত লুম্বিনী গ্রামে এক শালগাছের তলায়।

ঋষি কপিল বলেছিলেন: জগতে প্রত্যেক প্রাণি দুঃখভোগ করে, ‘প্রকৃতির সহিত সংযোগই পুরুষের দুঃখের কারণ।’ মুখ্য প্রতিপাদ্য বিষয় হল ‘দুঃখ নিবৃত্তি’। কপিলের অনুসারী মহামতি বুদ্ধ সেই দর্শনকে আরো অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে গেলেন। ‘দুঃখ নিবৃত্তি-র উপায়গুলোও বললেন তিনি। বললেন চিরন্তন জীবন-জিজ্ঞাসা সংক্রান্ত আরও অনেক কথা। এভাবে মানবচিন্তা এগিয়ে যায় …। এগিয়ে গেলো বাংলার দর্শন।

বুদ্ধের মহান বাণী:

বোধিলাভের পর থেকে মহাপরিনির্বান পর্যন্ত মহামতি বুদ্ধ মানবজাতির হিতের জন্য ধর্মপিপাসুদের মধ্যে অমৃতবাণীবর্ষণ করেছিলেন। মানবপ্রকৃতি দেশকাল নিরপেক্ষ। মানব জীবন বড়ই দুর্লভ। অনেক পূণ্য প্রভাবে আমরা এই মনুষ্যজন্ম লাভ করেছি। পশু, পক্ষি, গরু, ছাগল কত প্রাণী এই দুনিয়ায় আছে। তাদের জ্ঞান শক্তি নেই। তারা উন্নত জীবন লাভ থেকে বঞ্চিত। তাদের সৎ কর্ম করার ক্ষেত্রও নেই।

মানুষের জ্ঞান ও চিন্তা শক্তি আছে। চিন্তা শক্তি দ্বারা মানুষ ভাল মন্দ বুঝতে পারে। সৎ চিন্তা দ্বারা মানুষ নৈতিক জীবন গঠন করতে পারে। বুদ্ধ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে মানব জীবনের নৈতিক উপদেশ প্রদান করেছেন।

মহামতি বুদ্ধ জীবনের সত্যকে খুব সহজভাবে বর্ণনা করেছেন । জীবনে দুঃখ আছে । দুঃখের কারণ আছে । দুঃখের কারণ আসক্তি । আসক্তির কারণ অবিদ্যা । অবিদ্যা দূর হবে শীল অর্থাৎ সদাচরণ ও প্রজ্ঞা দ্বারা । সৎ মন প্রস্ফুটিত হবে সৎ কর্মে । তখনই আসক্তির বৃত্ত ভেঙ্গে যাবে । দুঃখের বিনাশ ঘটবে । তৃপ্ত জীবন লীন হবে অনন্ত প্রশান্তিলোকে ।

আলেকজান্ডার নয় গৌতম বুদ্ধই প্রথম পৃথিবী জয় করেছিলেন:

জনকল্যাণমূলক বুদ্ধের মহান বাণীগুলো উত্তুঙ্গ হিমালয় থেকে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র পৃথিবীতে। মগধ ও বাংলা থেকে উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লো এই আলো। উত্তরে ভুটান হয়ে হিমালয় দুহিতা তিব্বতকে আলোকিত করে তরঙ্গ সঞ্চালিত হয়ে চলে গেলো চীন, মঙ্গোলিয়া ও রাশিয়ার অংশবিশেষ পর্যন্ত; দক্ষিণে শ্রীলংকা, মালেশিয়া, ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত; পূর্বে মায়ানমার, শামদেশ (থাইল্যান্ড), লাওস, কম্পুচিয়া, ভিয়েতনাম, কোরিয়া হয়ে সুদুর জাপান পর্যন্ত; পশ্চিমে উত্তর ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, কাজাখিস্তান হয়ে সুদুর তুরষ্ক পর্যন্ত।

বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্মের সূচনা :

সমুদ্রজয়ী বাঙালীরা: ভারত উপমহাদেশে বাঙালীরাই প্রথম সমুদ্রভ্রমণকারী শক্তিশালী জাতি। পান্ডু রাজার ঢিবিতে স্টিটাইট (Steatite)পাথরের কতকগুলি চিহ্ন খোদিত একটি গোলাকার সীল পাওয়া গিয়েছে।মনে করা হয় যে সীলটির খোদিত চিহ্নসমূহ চিত্রাক্ষর(Pictpgraph)এবং সীলটি ভূমধ্যসাগরীয় ক্রিট দ্বীপের, প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর পূর্বে নির্মিত। এই সীল ও প্রাপ্ত অন্যান্য নিদর্শন থেকে মনে করা হয় প্রাচীন সভ্যতার ক্রীট দ্বীপের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিলো। এছাড়াও সমুদ্রপথে আমাদের জাভা, সুমাত্রা, শ্যাম (থাইল্যান্ড), ইত্যাদি দেশের সাথে বাণিজ্য ও যোগাযোগ ছিলো। মহাভামসা (Mahavamsa) অনুযায়ী বাংলার রাজপুত্র বিজয় সিংহ খ্রীষ্টপূর্ব ৫৪৪ সালে লঙ্কা জয় করেন এবং তার নাম দেন সিংহল। এই নিয়ে কবিতা রয়েছে ‘আমাদের ছেলে বিজয় সিংহ লঙ্কা করিয়া জয়, সিংহল নামে রেখে গেলো নিজ শৌর্যের পরিচয়’। এছাড়া বাঙালী-রা মালয় দ্বীপপুঞ্জ ও শ্যামে বসতি স্থাপন করেছিলো।
বাংলা শুরুতে আর্য সাম্রাজ্যের বাইরে ছিলো। আর্যরা বাংলার জনগণকে পছন্দ করতো না। ঐতরেয় ব্রাহ্মনে (Aitareya Brahmana) বাংলার (বঙ্গ-এর) জনগণকে দস্যু ও অনার্য বলে আখ্যা দেটা হয়েছে। ঐতরেয় আরণ্যক (Aitareya Aranyaka)গ্রন্থেও বাংলাদেশের মানুষের নিন্দাসূচক উল্লেখ রয়েছে (তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৯)। বাংলা ভাষাকে একসময় রৌরব নরকবাসীদের ভাষা হিসাবে উল্লেখ করেছিল আর্যরা।
খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে বাংলার বেশিরভাগ এলাকাই শক্তিশালী রাজ্য মগধের অংশ ছিল । মগধের কথা রামায়ণ এবং মহাভারতে পাওয়া যায়। গৌতম বুদ্ধের (খ্রীষ্টপূর্ব ৫৬৩ থেকে ৪৮০ পর্যন্ত) সময়ে এটি ছিল ভারতের চারটি প্রধান রাজ্যের মধ্যে একটি । মগধের ক্ষমতা বাড়ে বিম্বিসারের (রাজত্বকাল ৫৪৪-৪৯১ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ) এবং তার ছেলে অজাতশত্রুর (রাজত্বকাল ৪৯১-৪৬০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ) আমলে । বিহার এবং বাংলার অধিকাংশ জায়গাই মগধের ভিতরে ছিল তবে বাইরেও অনেক জায়গা ছিলো। গৌতম বুদ্ধ-এর ভাষা ছিলো মগধি প্রাকৃত (মগধি প্রাকৃত ও পালি ভাষা খুব কাছাকাছি)। তিনি আর্য ছিলেন কি অনার্য ছিলেন এই নিয়েও প্রচুর বিতর্ক রয়েছে (Johannes Bronkhorst’s book “Greater Magadha” was a very fine example of a revisionist history. It argued that the Aryan culture had not penetrated to Buddha’s region of birth and life (Magadha) and hence did not have a caste system and a very insignificant population of Brahmins)। তবে তাঁর প্রচারিত দর্শন যে অবৈদিক (heterodox) ছিলো এতে কোন সন্দেহ নেই।

বাংলার যুবরাজ বিজয় সিংহ শ্রীলংকায় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে সহায়তা করেছিলেন, সিংহলী কিংবদন্তী এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় (বৌদ্ধসাহিত্য মহাবংস মতে (W. Geiger, ed.; Mahavamsa. PTS. London, 1958, ch. XII)। বিষয়টি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এই কারণে যে, বিজয় সিংহ ঘটনাটি ঘটিয়েছিলে ৫৪৪ খ্রীষ্টপূর্বে, সেটা গৌতম বুদ্ধের জীবনকালেই ঘটেছিলো (গৌতম বুদ্ধের জীবনকাল ছিলো ৫৬৩ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৪৮০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত)। এর অর্থ এই দাঁড়ায় এই যে, বাংলার যুবরাজ বিজয় সিংহ গৌতম বুদ্ধের জীবনকালেই বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহন করেছিলেন ও তা প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, ড. নীহার রঞ্জর রায় প্রমুখ মনে করেন, অশোকের আগেই বৌদ্ধধর্ম প্রাচীন বাংলায় কোনো কোনো স্থানে বিস্তার লাভ করেছিল (মজুমদার, প্রাগুক্ত, পৃঃ ২০৯; রায়, প্রাগুক্ত, পৃঃ ৪৯৪-৯৬)।

বাংলাদেশে গৌতম বুদ্ধের শুভাগমণ :

বংশ সাহিত্য অনুসারে (মহাস্থবির, ধর্মাধার; অনুঃ শাসনবংস পৃঃ ৫৫) গৌতম বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভের আট বছর পর গবম্পতি স্থবিরের আরাধনায় বার্মার প্রাচীন রামঞ্ঞ রাষ্ট্রের সুধর্মপুরে উপনীত হয়ে সেখানে ধর্ম প্রচার করেছিলেন । বার্মায় প্রাপ্ত এক শিলালিপিতে উল্লেখ আছে, (প্রাগুক্ত, পৃঃ ৫৫) বুদ্ধের সাথে বিশ হাজার অর্হৎ ভিক্খু সেদেশে গমণ করেছিলেন । বুদ্ধ যদি স্বয়ং বার্মায় গমণ করে থাকেন তাহলে বুদ্ধকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম হয়েই যেতে হয়েছিল, কেননা তখন এটাই ছিল বার্মায় যাবার প্রশস্ত ও সহজ পথ । কাজেই তখন চট্টগ্রামে বৌদ্ধধর্ম প্রচারিত হওয়া স্বাভাবিক । এছাড়া, কিংবদন্তী আছে যে, বুদ্ধ স্বয়ং একবার চট্টগ্রামের হস্তীগ্রামে এসে পক্ষকাল অবস্থান করে ধর্ম প্রচার করেছিলেন । সেই হস্তীগ্রাম পটিয়ার হাইদগাঁও বলে পণ্ডিতগণ ধারণা করেন । এ সম্পর্কে ছোট্ট মতভেদও রয়েছে, সে মতভেদ অনুসারে বুদ্ধের আগমন ঘটেছিল হস্তিপৃষ্ঠে এবং গ্রাম হিসেবে হাইদচকিয়া গ্রাম কথিত । এখানে একটি বিহার বা কেয়্যাংও ছিল (আলম, ওহিদুল; চট্টগ্রামের ইতিহাস ‘প্রাচীনকাল থেকে আধুনিককাল’ চট্টগ্রাম, ১৯৮২, পৃঃ ৮) । আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদও উল্লেখ করেছেন যে, বৌদ্ধরা এদেশের আদি অধিবাসী (ইসলামাবাদ, পৃঃ ১২) । সাহিত্যসেবী পূর্ণ চন্দ্র চৌধুরীও একই মতে বিশ্বাসী । তাঁর মতে, মগধদেশ হতে বৌদ্ধধর্মের প্রচারকগণ পূর্ব দেশে এসে ধর্ম প্রচার করেন এবং চট্টগ্রামে বৌদ্ধধর্ম প্রাচীনতম ধর্ম (চট্টগ্রামের ইতিহাস, চট্টগ্রাম, ১৯২০, পৃঃ ২) ।

হিউয়েন সাঙ বলেছেন যে, বুদ্ধ দীর্ঘ ছয়মাস বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যথাক্রমে পুড্রবর্ধন (উত্তরবঙ্গ), সমতট (পূর্ববঙ্গ), তাম্রলিপ্তি (দক্ষিণ বা দক্ষিণ পশ্চিম বঙ্গ) ও কর্ণসুবর্ণ (পশ্চিমবঙ্গ) রাজ্যে ধর্মপ্রচার করেছিলেন। হিউয়েন সাঙ তাঁর ভ্রমণ-কাহিনীতে আরো উল্লেখ করেছেন যে, তিনি উপরোক্ত জনপদ বা রাজ্যগুলো পরিদর্শনকালে অশোক কর্তৃক নির্মিত বহু স্তূপ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম-দ্বিতীয় শতকে রচিত দিব্যাবদান গ্রন্থে জানা যায় যে, মধ্যদেশের পূর্বসীমা পুড্রবর্ধন নগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল (Law, B.C; Geography of Early Buddhism, Delhi 1973, pp.1-2)|

(চলবে)

তথ্যসূত্রঃ
১। ইন্টারনেটে প্রাপ্ত বিভিন্ন আর্টিকেল
২। বিভিন্ন বই

৮১৯ বার দেখা হয়েছে

১২ টি মন্তব্য : “চেতনায় একেশ্বরবাদ, হৃদয়ে বুদ্ধের বাণী – পর্ব ১”

  1. লুৎফুল (৭৮-৮৪)

    একদিকে অপার কাব্য -
    "খগোলে সূর্যালোকের বন্যা,
    জলধি তরঙ্গচূড়ায় নৃত্যছন্দে বিভোর!"
    অন্যদিকে বোধির বিপুল বৈভব -
    "আলেকজান্ডার নয় গৌতম বুদ্ধই প্রথম পৃথিবী জয় করেছিলেন"

    বিশাল ব্যাপ্তিতে ঘুরে আসলাম যেনো অগণন কথায় সময়, ইতিহাস, কৃষ্টি ও মানুষের ঐতিহ্য ... কতো কি !

    জবাব দিন
    • ড. রমিত আজাদ (৮২-৮৮)

      আমি দর্শনটি নিয়ে এখনো পড়ালেখা করছি, বোঝার চেষ্টা করছি। আপাতত যতটুকু বুঝি তা হলো - সাংখ্য দর্শনে চৈতন্য ও জগতের মধ্যে দ্বৈতবাদের উপস্থাপনা করা হয়েছে দুটি "অক্ষয়, অবাঙমনসগোচর ও স্বতন্ত্র" সত্ত্বার মাধ্যমে। এদুটি হল পুরুষ ও প্রকৃতি। প্রকৃতি এক, কিন্তু পুরুষ অনেক বলে বর্ণিত হয়েছে। প্রকৃতি চৈতন্যবিহীন, অব্যক্ত, কারণবিহীন, চিরসক্রিয়, বাক্য ও মনের অগোচর এবং চিরন্তন। এই প্রকৃতি এককভাবে জাগতিক বস্তুর সর্বোচ্চ উৎস। সকল জাগতিক বস্তু প্রকৃতির মধ্যেই স্পষ্টভাবে ও আপেক্ষিকভাবে সমাহিত। পুরুষ হল চৈতন্যময় সত্ত্বা। পুরুষ পরোক্ষ "ভোক্তা" এবং প্রকৃতি হল "ভোগ্যা"। সাংখ্য দর্শনের মতে, পুরুষ জগতের উৎস নয়। কারণ চৈতন্যময় সত্ত্বা কখনও চৈতন্যবিহীন জগতে রূপান্তরিত হতে পারে না। এটি বহুত্ববাদী আধ্যাত্মিকতা, নাস্তিক বাস্তবতাবোধ ও কঠোর দ্বৈতবাদ।

      পুরুষ
      পুরুষ হলেন শুদ্ধচৈতন্য। এটি সর্বোচ্চ, স্বাধীন, মুক্ত, বাক্য ও মনের অগোচর। তাকে অন্য কিছুর দ্বারা জানা যায় না। পুরুষ মন ও ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অনুভূত হয় না এবং যাকে শব্দ ও ব্যাখ্যা দ্বারা বোঝানো যায় না। পুরুষ শুদ্ধ এবং মূল চৈতন্য। পুরুষের সৃষ্টি বা ধ্বংস নেই। তবে পুরুষকে বহুবিধ বলা হয়, যা অদ্বৈত বেদান্ত বা পূর্ব মীমাংসা মতে মানা হয়নি।

      প্রকৃতি
      প্রকৃতিকে জগৎ সৃষ্টির প্রথম কারণ মনে করা হয় - পুরুষ ছাড়া সব কিছুই প্রকৃতি থেকে উৎপন্ন। মন ও শক্তি সহ যা কিছু জাগতিক সব কিছুই প্রকৃতির অন্তর্ভুক্ত। এটিই জগতের প্রথম "তত্ত্ব"। তাই একে বলা বলে "প্রধান"। কিন্তু এটি চৈতন্যরহিত ও বুদ্ধিরহিত বলে একে বলা হয় "জড়"। এটি তিনটি মূল গুণ দ্বারা গঠিত। এগুলি হল:

      সত্ত্ব - স্থিরতা, সৌন্দর্য, ঔজ্জ্বল্য ও আনন্দ;
      রজঃ - গতি, ক্রিয়াশীলতা, উচ্ছ্বাস ও যন্ত্রণা;
      তমঃ - সমাপ্তি, কঠোরতা, ভার, ধ্বংস, ও আলস্য।
      সকল জাগতিক ঘটনাকে প্রকৃতির বিবর্তনের ক্রিয়া মনে করা হয়। প্রকৃতিই মূল তত্ত্ব। প্রকৃতির থেকেই যাবতীয় জাগতিক বস্তু সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যেক জীব পুরুষ ও প্রকৃতির মিশ্রণে গঠিত। জীবের আত্মা বা পুরুষ অসীম ও দেহের দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়। "সংসার" বা বন্ধন তখনই আসে যখন পুরুষ জ্ঞানের দ্বারা পরিচালিত না হয়ে নিজের আপেক্ষিক পরিচিতির অনুগামী হয় এবং অহংকারের সঙ্গে নিজেকে এক করে ফেলে। অহংকার হল প্রকৃতির একটি গুণ। জ্ঞানের মাধ্যমে আত্মা চৈতন্যময় পুরুষ ও চৈতন্যরহিত প্রকৃতির পার্থক্য সম্পর্কে সচেতন হয়। তখনই সে মুক্ত হয়।

      জবাব দিন
  2. সাইদুল (৭৬-৮২)

    যশোরে আসার সময় তোমার লেখা পড়ছিলাম। কপিলমুনি গিয়ে সেই গ্রামের ছবি তুলে তোমায়্ চমকে দেবো ভেবেছিলাম। বৃষ্টি আটকে দিলো সব।
    বরাবরের মত । ভালো লেখা


    যে কথা কখনও বাজেনা হৃদয়ে গান হয়ে কোন, সে কথা ব্যর্থ , ম্লান

    জবাব দিন
  3. খুব ভাল লাগলো এমন মহতি কর্মে আমিও যোগ দিতে পারলাম। আপনার জন্যে শুভেচ্ছা ।আবার ও পড়বো, তারপর লেখা নিয়ে আরও কিছু অভিপ্রায় প্রকাশ করব।

    ধন্যবাদ।

    ভাল থাকবেন ভাই।

    জবাব দিন
    • ড. রমিত আজাদ (৮২-৮৮)

      আপনাকে অনেক ধন্যবাদ জনাব প্রদীপ বড়ুয়া।

      আমাদের দেশের এই প্রাচীন দর্শনটি (বৌদ্ধ দর্শন) বংশানুক্রমে সকলেরই হৃদয়ে রয়ে গেছে। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত শক্তি সম্পর্কে সকলে অবগত নয়। আর এই গৌরবজ্জ্বোল ইতিহাসও ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে। যেই জাতি পৃথিবীর প্রথম দর্শন (সাংখ্য) সৃষ্টি করেছে, যেই জাতি একদিন পৃথিবী আলোকিত করেছিলো, সেই জাতি নিজেই এখন অন্ধকারে নিমজ্জ্বিত। সত্য ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক ধারনা না থাকার কারণে আমাদের মনোবলও ভেঙে পড়ছে। আমি চেষ্টা করছি ভুলে যাওয়া বিষয়গুলোকে অন্ধকার থেকে আলোয় টেনে আনতে। আপনাদের পাঠকদের সহযোগিতা একান্ত কাম্য।

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।