সক্রেটিসের এ্যাপোলজি পর্ব ৪, ৫

সক্রেটিসের এ্যাপোলজি পর্ব ৪

মূল বক্তৃতাঃ মহাজ্ঞানী সক্রেটিস
লিখেছেনঃ প্লেটো

অনুবাদঃ ডঃ রমিত আজাদ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর থেকে)
এথেন্সবাসীগণ (বিচারকগণ)! আমি আপনাদের স্পষ্ট করে বলতে চাই যে, এই বিষয়ের ক্ষুদ্রতা অথবা বিশালত্ব নিয়ে মিলেটাসের আদৌ কোন মাথা ব্যাথা নেই। তারপরেও আমি জানতে চাই যে, মিলেটাস একটু বলুন তো, আমি কিভাবে তরুণদের বিপথে নিলাম? আমার মনে হয়, আপনার অভিযোগ থেকে আমি এই আবিষ্কার করতে পারি যে, রাষ্ট্র যেই সব দেবতাদের স্বীকৃতি দেয় আমি তরুণদের সেই সব দেবতাদেরকে স্বীকৃতি না দিতে শিখাই, বরং তাদের বলি অন্য কোন ইশ্বর অথবা আধ্যাত্মিক প্রতিনিধিত্বের কথা। আপনার মতে, এইতো সেই শিক্ষা যার দ্বারা আমি তরুণদের বিপথগামী করছি।

হ্যাঁ, এটাই আমি উচ্চকন্ঠে বলছি।

তাহলে যাদের সম্পর্কে আমরা বলছি, সেই সব দেবতাদের নামে, মিলেটাস, আপনি আমাকে ও আদালতকে খুব সহজ ভাষায় বলুন, আপনি কি বোঝাতে চাচ্ছেন! যেহেতু এখনও আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি না, আপনি নিশ্চিত করে বলছেন যে আমি মানুষকে ইশ্বরকে স্বীকৃতি দেয়া শিক্ষা দেই, তাহলে তো আমি ইশ্বরে বিশ্বাস করি, এবং এই হিসাবে আমি তো নাস্তিক নই — অথচ আমাকে নাস্তিকতার অভিযোগে আপনারা অভিযুক্ত করেছেন, — শুধু আপনি যা বলতে চাইছেন তা হলো আমি যে ইশ্বরের কথা বলি আর নগরী (রাষ্ট্র) যে দেবতাদের কথা বলে তারা এক নয় – অভিযোগ হলো যে, তারা ভিন্ন ভিন্ন দেবতা। নাকি আপনি এই বলতে চান যে, আমি কেবলই একজন নাস্তিক ও নাস্তিকতার একজন শিক্ষক।

আর আমি বলবো – মিলেটাস, আপনি একজন নাস্তিক।
আশ্চর্য্য এক মানুষ আপনি মিলেটাস! আপনি এমন মনে করেন কেন মিলেটাস? আপনি কি এই বলতে চান যে অনেকের মতন আমি সূর্য ও চন্দ্রের বৈভবে বিশ্বাস করিনা?

হে বিচারকগণ, আমি আপনাদের নিশ্চিত করে বলতে চাই যে, মিলেটাস বলেন, ‘সূর্য একটি পাথর আর চাঁদ হলো মাটি।‘

বন্ধু মিলেটাস, আপনি মনে করেন যে আপনি আনাক্সিগোরাসকে অভিযুক্ত করছেন: এবং আপনি যদি এই কল্পনা করেন যে বিচারকরা এতোটাই মূর্খ যে তারা ক্লাজোমেনিয়ার আনাক্সিগোরাস-এর কিতাব সমূহের ডকট্রাইন সম্পর্কে ধারণা রাখেন না, তাহলে বিচারকদের সম্পর্কে আপনার খারাপ ধারনা রয়েছে। তরুণরা আমার কাছ থেকেই এগুলো শেখে বৈকি! যেখানে কিনা তারা এটা মাত্র এক দ্রাহ্মা-র বেশি খরচ না করেই অর্থের বিনিময়ে থিয়েটার থেকেই শিখতে পারতো। (হয়তো এরিস্টোফেনাসের ব্যঙ্গচিত্রে, এবং ইউরিপিডিসের কাজে যিনি আনাক্সিগোরাসের ধারণা ধার করেছেন, তাছাড়া অন্যান্য কবিদের কাছ থেকেও হতে পারে); এবং তারপর তারা সক্রেটিসকে উপহাস করতে পারতো, যে কিনা এইসব অসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিগুলোর প্রবর্তক হওয়ার ভান করে। এইভাবে মিলেটাস, আপনি কি সত্যিই মনে করেন যে, আমি ইশ্বরে বিশ্বাস করিনা?

জিউসের নামে শপথ করে বলছি, আপনি কোন কিছুতেই বিশ্বাস করেন না।

কেউ আপনাকে বিশ্বাস করবে না মিলেটাস, এবং আমি নিশ্চিত যে, আপনি নিজেও তা বিশ্বাস করেন না। হে এথেন্সবাসীগণ, যদি আমার মত জানতে চান, তো আমি বলবো যে, মিলেটাস বেপরোয়া ও বেহায়া, এবং তিনি যে অভিযোগপত্রটি আমার বিরুদ্ধে লিখেছেন তা নিতান্তই বেহায়াপনা ও তারূণ্যের বাহাদুরি থেকে লেখা। খুব সম্ভবতঃ মিলেটাস একটি ধাঁধাঁ তৈরী করেছেন এবং পরীক্ষা করে দেখতে চান যেঃ ‘ দেখিতো জ্ঞানী সক্রেটিস আমার স্ববিরোধিতা ধরতে পারে কিনা, অথবা আমি সক্রেটিসকে ও অন্যান্যদেরকে ধোঁকা দিতে সফল হবো।’ আমার মনে হয়, নিজের লিখিত অভিযোগপত্রে তিনি স্ববিরোধিতা করছেন, যেহেতু তিনি বলেছেন যে, সক্রেটিস দেবতাদের বিশ্বাস না করার অপরাধে অপরাধী, আবার বলেছেন, সক্রেটিস ইশ্বরে বিশ্বাস করেন। এটা যে একেবারেই তামাশা!
(চলবে)

সক্রেটিসের এ্যাপোলজি – পর্ব ৫

.

হে বিচারকগণ! আমি চাই, আপনারা আমার সাথে এই পরীক্ষায় অংশগ্রহন করুন, যেখানে আমি তাঁর (মিলেটাসের) অসঙ্গতি সম্পর্কে ধারণা করছি; আর আপনি মিলেটাস, উত্তর দিবেন। আর শ্রোতাবৃন্দ আমি আপনাদের আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আমার সেই অনুরোধ সম্পর্কে যে, আপনারা অনুগ্রহপূর্বক হইচই করবেন না, যদি আমি আদালতের রীতি অনুযায়ী না বলে আমার স্বভাবসুলভ ধাঁচেই বলি:
মিলেটাস, এমন কেউ কি আছে, যে মানুষের কর্মগুলোর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে কিন্তু মানুষের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না? হে এথেন্সবাসীগণ, আমি চাই, তিনি বরাবরের মত হইচইয়ের মধ্যে দিয়ে একটা ইন্টারাপ্শনের অপেক্ষা না করে উত্তর দিন। এমন কেউ কি আছে যে ঘোড়া সংক্রান্ত সব কিছুতে বিশ্বাস করে কিন্তু ঘোড়ায় বিশ্বাস করে না? অথবা বাঁশির সুরে বিশ্বাস করে কিন্তু বাঁশির বাদকে বিশ্বাস করেনা? না বন্ধু; যেহেতু আপনি উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন, অতএব আমি আপনাকে এবং আদালতকে উত্তর দিব। এমন কেউ এই পৃথিবীতে নাই। যাহোক এখন পরবর্তি প্রশ্নের উত্তর আপনাকে দিতে হবে: এমন কেউ কি আছে যে আধ্যাত্মিকতা ও আধ্যাত্মিক প্রতিনিধিত্বে বিশ্বাস করে কিন্তু উপদেবতা (ডেমিগড)-সমূহে বিশ্বাস করেনা?

এমন হতে পারেনা। (মিলেটাস উত্তর দিলেন)

পরিশেষে আদালত আপনার মুখ থেকে উত্তর বের করে আনলো, কি সৌভাগ্যবান আমি! তাহলে অভিযোগপত্রে আপনি দাবী করছেন যে, আমি বিশ্বাস করি ও শিক্ষা দেই আধ্যাত্মিকতায় ও আধ্যাত্মিক প্রতিনিধিত্বে (হোক সে নতুন অথবা পুরাতন তাতে কিছু যায় আসেনা): যেভাবেই হোক আমি আধ্যাত্মিক প্রতিনিধিত্বে বিশ্বাস করি, — এমনই আপনি বলেছেন আপনার হলফনামায়; এবং এইভাবেই আমি ঐশ্বরিক সত্তায় বিশ্বাস করি, আর যেহেতু আমি ঐশ্বরিক সত্তায় বিশ্বাসই করি সুতরাং আমার পক্ষে উপদেবতায় বিশ্বাস না করা কি সম্ভব? নিশ্চয়তা দিয়ে বলছি, আমি বিশ্বাস করি, অতএব আমি ধরে নিচ্ছি যে, আপনার মৌনতাই আপনার সম্মতি। এবার আত্মা (spirits) বা উপদেবতা (demigods) কারা? তারা কি দেবতা বা দেবতাদের পুত্ররা নয়?

অবশ্যই তারা তাই।

– সুতরাং, উপদেবতাদের যদি আমি স্বীকার করি, আপনারা যেরকম বলেন, উপদেবতারাও দেবতা, তাহলে বিষয়টা দাঁড়ালো এই যে, যা আমি আগেই বলেছি, আপনি তামাশা করছেন ও ধাঁধাঁ দিচ্ছেন, এই কথা বলে যে, আমি একইসাথে ইশ্বরে বিশ্বাস করি আবার করিনা, কেননা অন্ততপক্ষে উপদেবতাদেরতো আমি স্বীকার করি। অপরপক্ষে, উপদেবতারা যদি পরী বা অন্য কোন সত্তার মায়েদের গর্ভজাত দেবতাদের অবৈধ সন্তান হয়, প্রচলিত রীতি অনুযায়ী এরকমই মনে করা হয়, তাহলে এমন কোন মানুষ আছে যে উপদেবতাদের স্বীকৃতি দেয় কিন্তু দেবতাদের স্বীকৃতি দেয়না? এটা তেমনই হাস্যকর হবে যদি কোন মানুষ ঘোড়া ও গাঁধার সমন্বয়ে যে খচ্চরের জন্ম সেই খচ্চরকে স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু ঘোড়া ও গাঁধাকে স্বীকৃতি দেয়না। একেবারেই ননসেন্স! মিলেটাস, সম্ভবত আমাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করানোটাই আপনার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো। আপনি অভিযোগনামায় পয়েন্টটি এই কারনে অন্তর্ভুক্ত করেছেন যে, আমাকে দোষী সাব্যস্ত করার খাঁটি কোন পয়েন্ট আপনার হাতে ছিলোনা। কিন্তু যার বিন্দুমাত্র বোধশক্তি আছে এমন কেউ আপনার এই কথা কোনদিনই বিশ্বাস করবে না যে, একই মানুষ দৈব ও অলৌকিকতায় বিশ্বাস করে অথচ ইশ্বর, উপদেবতা ও অলৌকিক সত্তায় বিশ্বাস করেনা।

হে বিচারকগণ, মিলেটাস আমার বিরুদ্ধে যেইসব অভিযোগ আনছে, সেইসব অপরাধে আমি অপরাধী নই, আমার মনে হয়না যে এর চাইতে বেশি আর কিছু প্রমান করার প্রয়োজন আছে, এতক্ষণ যা বলেছি সেটাই যথেষ্ট। যে সম্পর্কে আমি শুরুতেই বলেছিলাম, অনেকেরই যে আমার বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্নতা রয়েছে, এটা নির্ভেজাল সত্য। আমার যদি ধ্বংস হয় তবে আমার ধ্বংস ডেকে আনবে, মিলেটাসও নয় এনিটাসও নয়, বরং একটি বিরাট অংশের ঘৃণা ও নিন্দা, যা ইতিপূর্বে অনেক সৎ ব্যক্তিকেই হত্যা করেছে, মনে হয় আরো অনেককেই হত্যা করবে, মনে করবেন না যে, এই জাতীয় হত্যার তালিকায় আমিই সর্বশেষ ব্যক্তি হবো।

অনেকে বলতে পারেনঃ সক্রেটিস, যে কাজ করার জন্য অতঃপর আপনার অকাল মৃত্যু হতে যাচ্ছে, সেইসব কাজ করার জন্য আপনি কি লজ্জ্বিত নন? তাকে আমি ন্যায্যভাবে উত্তর দিবোঃ এখানেই আপনি ভুল করছেন, যে ব্যক্তি মানুষের মঙ্গল সাধনের জন্য মাঠে নেমেছে, তাকে নিহত হবার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতেই হয়, এই নিয়ে তিনি তেমন চিন্তিত নন, তিনি ভাবেন কেবল একটি বিষয় – যা করছেন তা ঠিক করছেন না ভুল করছেন, ভালো মানুষের কর্ম সম্পাদন করছেন না খারাপ মানুষের কর্ম সম্পাদন করছেন। এদিকে, আপনার দৃষ্টিকোন থেকে, ট্রয়ের যুদ্ধে যেসব বীরদের পতন ঘটেছিলো তারা খারাপ, এবং থেটিসের পুত্রও তাদের মধ্যে একজন, যে বিপদের চাইতে মর্যাদাহানীকে বেশি ভয় পেত, এবং যখন তিনি হেকটরকে হত্যা করার জন্য উদগ্রীব হয়ে ছিলেন, তখন তাঁর দেবী মাতা তাকে বলেছিলেন, “পুত্র আমার, তুমি যদি তোমার বন্ধু পেট্রোক্লাসের হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে হেকটরকে হত্যা করো, তবে তুমি নিজেই মারা যাবে।” ‘ভাগ্য’, দেবী বলেছিলেন এই জাতীয় ভাষায়, “প্রায়ামের পুত্র হেকটরের পর তোমার নিহত হবার পালা”, এই সাবধানবাণী শোনার পরেও তিনি বিপদ বা মৃত্যু কোনটিকেই ভয় পেলেন না, বরং বন্ধুর হত্যার প্রতিশোধ না নিয়ে কাপুরুষের মতো বেঁচে থাকার লজ্জ্বাটাকেই বেশি ভয় পেলেন। ‘আমি তৎক্ষণাৎই মরতে চাই’, তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “শত্রু আমাকে হত্যা করুক, এখানে জাহাজের পাশে বসে প্রতীক্ষা করা, বা সকলের বিদ্রুপের পাত্র হয়ে পৃথিবীর একটা বোঝা হওয়ার চাইতে সেটাই ভালো হবে।” সেইসময় একিলিসের কি মৃত্যু ও বিপদ সম্পর্কে কোন চিন্তা ছিলো? হে বিচারকগণ! বাস্তবে এমনই হয় কিন্তু: কোন ব্যক্তি নিজেকে যে অবস্থানে বসিয়েছে, এই ভেবে যে, এটাই তার জন্য সব চাইতে ভালো জায়গা, অথবা তার কমান্ডার তাকে যেখানে বসিয়েছে, সেখানে বসেই তাকে বিপদ মোকাবেলা করতে হবে, না মৃত্যু না অন্য কোন বিপদ কোন কিছুর ভয়ই তার তখন পেলে চলবে না, ভয় যদি পেতেই হয় তবে একটাই ভয়, তা হলো মর্যাদাহানির ভয়। এবং হে বিচারকগণ! এটাই হলো সত্য।

(চলবে)

৩০৮ বার দেখা হয়েছে

২ টি মন্তব্য : “সক্রেটিসের এ্যাপোলজি পর্ব ৪, ৫”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।