স্মৃতিতে নির্মল সেন

স্মৃতিতে নির্মল সেন
————- ডঃ রমিত আজাদ

নির্মল সেন নামটির সাথে পরিচিত প্রায় জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই ।  নির্মল সেনকে ব্যাক্তিগতভাবে দেখার ও কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। তিনি আমার ফুপা মরহুম মোজাম্মেল হক-এর পেশাগত ও রাজনৈতিক জীবনের শিষ্য ছিলেন। দেশবিভাগের পর নির্মল সেনের পুরো পরিবার ভারতে চলে গেলে, তিনি যখন দ্বিধায় পড়েছিলেন ভারত চলে যাবেন কি দেশে থাকবেন, সেই সময় ফুপা তাকে বাংলাদেশে থেকে যেতে অনুরোধ করেন, গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে তিনি আর যান নি। এই কথা তিনি তার স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন। দুজনকেই সালাম জানাই। তিনি রয়ে গি্যেছিলেন বলেই বাংলাদেশ এমন একজন সাংবাদিককে পেয়েছে।

উনার সাথে প্রথম দিনের আলাপে নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করেছি। আমি একজন অতি সাধারণ মানুষ আর তিনি সব দিক থেকেই অসাধারণ। ছোটবেলায় আলিঝালি উনাকে কয়েকবার দেখার সুযোগ হয়েছিল, কিন্তু উনাকে প্রথমবার খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় ১৯৯৬ সালে। মাসটা খুব সম্ভবতঃ সেপ্টেম্বর ছিল। নির্মল সেন বাম রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন একথা সর্বজনবিদিত। আর আমি লেখাপড়া করেছি, ল্যান্ড অফ কম্যুনিজম ‘সোভিয়েত ইউনিয়নে’। এম, এস, কমপ্লিট করার পর কয়েক মাসের জন্য দেশে এসেছিলাম। বাংলাদেশে তখন সকলের আগ্রহ সমাজতন্ত্রের পতন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন নিয়ে।

আমার বড় বোন তখন বাম রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন, এবং নির্মল সেনের সাহচর্যে এসে সেই ধারনা আরো মজবুত হয়েছিল। আপা মনে করতেন ‘সোভিয়েত ইউনিয়নে’-এর পতন বিশ্ব রাজনীতিতে একটি দুঃখজনক ঘটনা এবং সোভিয়েত জনগণ ভুল করেছে।। হঠাৎ করে আমি দেশে ফিরে কম্যুনিজম বিরোধী কথাবার্তা বলাতে, উনি একরকম ধাক্কা খেলেন। কিন্তু আমার সাথে যুক্তি তর্কে উনি পেরে উঠছিলেন না। একদিন বললেন চল তোকে নির্মল কাকার কাছে নিয়ে যাই। বড় হওয়ার পর তো তোকে আর দেখেননি। দেখাও হবে রাজনীতি নিয়ে কথাও হবে।

পরবর্তি শুক্রবারে গেলাম উনার বাসায়। যতদূর মনে পড়ে, ঢাকায় জোনাকী সিনেমা হলের ঐদিকে একটা বাসায় ভাড়া থাকতেন তিনি। সিঁড়ী বেয়ে দোতলায় উঠে গেলাম। উনার বেডরূম কাম ড্রইংরূমে অপেক্ষা করছিলেন তিনি। একটি পান্জাবী আর লুঙ্গী পড়ে ছিলেন। চট করে দেখলে বই-পত্রে চিত্রিত প্রাইমারী স্কুলের মাস্টার মশায়ের মত মনে হয়। আমার দিকে তাকালেন। আমি সালাম দিলাম। তিনি বসতে বললেন।সাধারণ কূশল বিনিময়ের পর। রাজনীতি প্রসঙ্গে আলাপ শুরু হলো। তিনি সমাজতন্ত্রের পক্ষে কথা বলছিলেন, আমি বলছিলাম বিপক্ষে। আমার বয়স তখন কম ছিল। তাই আমি কথা বলছিলাম চটুল ভঙ্গীতে, তিনি জ্ঞানী ব্যাক্তি, আস্তে ধীরে সময় নিয়ে যৌক্তিক কথা বলছিলেন। সেদিনের পক্ষ-বিপক্ষের বিতর্ক সভা বেশ জমেছিল। একদিকে ছিলেন সমাজতন্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ , আরেকদিকে ছিলাম সমাজতন্ত্র বিরোধী সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় সমাপ্তকারী তরুণ। তবে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদের সমাজতন্ত্রিক রাষ্ট্র দেখার অভিজ্ঞতা খন্ড খন্ড ভাবে ক্ষুদ্র সফরে, আর তরুণ সমাজতন্ত্রিক রাষ্ট্র দেখেছে দীর্ঘকাল অতি কাছ থেকে। আলোচনা বেশ জমেছিল।

কিছুক্ষণ কথা বলার উনার বিজ্ঞানের জ্ঞান দেখে অবাক হচ্ছিলাম। ভাবছিলাম সাংবাদিক মানুষ আর্টসের লোক, বিজ্ঞান জানেন কি করে! তিনি নিজেই আমার মনের কথার উত্তর দিলেন, “আমি কেমিস্ট্রিতে অনার্স করেছি”। উনার প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ বেড়ে গেল। আমি ফিজিক্সের লোক, থিওরী অফ রিলেটিভিটি নিয়ে কথা শুরু হলো।সস্তা পুরাতন ফার্নিচারে সাজানো, কয়েক শত বইয়ের ভীড় থেকে, তিনি একটা বই বের করে আমার হাতে দিলেন, ‘এ, বি, সি, অফ রিলেটিভিটি – বার্ট্রান্ড রাসেল’। বইটার নাম আগে শুনেছি, কিন্তু হাতে পেলাম এই প্রথম। বললাম, “একটু পড়তে চাই, আমাকে দেবেন”। সোজাসাপটা উত্তর দিলেন, “তুমি বলেই দিচ্ছি, অন্য কেউ চাইলে দিতাম না”। বুঝলাম বই উনার জান। সেদিন ঘন্টা দুয়েকের মত উনার বাসায় ছিলাম। যিনি দেশের একজন খ্যতিমান ব্যাক্তি, যার কথা সারা জীবন শুনেছি, তাকে খুব ভালো করে অবজার্ভ করলাম। যে বাড়ীটিতে উনি থাকতেন ওটা ছিল খুব মামুলি একটি বাড়ী। তিনি অকৃতদার ছিলেন, সেই হিসাবে উনার কোন সংসার থাকার কথা না, কিন্তু উনার বাসায় অনেকেই থাকতেন। পরে বুঝতে পেরেছি তারা সবাই আত্মীয় স্বজন অথবা নিজ গ্রামের লোক, আবার কেউ গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছে কোন কাজে, উনার বাড়ীতেই উঠেছে। আসার সময় বললাম, “কাকা আবার আসব কিন্তু”। তিনি বললেন, “এসো, কোন সমস্যা নেই”।

এরপর আরো বহুবার উনার বাসায় গিয়েছি। আমাদের রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিরোধ থাকা সত্বেও, অনেক সময় যাবৎ আলোচনা চলত। একবার বললাম, ” একটা আর্টিকেল লিখেছি, ছাপানোর ব্যবস্থা করবেন?”। তিনি উত্তর দিলেন, “নিয়ে এসো, দেখি”। পরদিন নিয়ে গেলাম, আমার গবেষণার উপর একটি সহজপাঠ্য আর্টিকেল, ‘অলবার্স প্যারাডক্স – সুর্যাস্তের পর অন্ধকার নামে কেন?’। আর্টিকেলটি উনার পছন্দ হলো, খ্যাতিমান পত্রিকা ‘দৈনিক বাংলায়’ ছাপানোর ব্যবস্থা করে দিলেন। পরবর্তিতে আরো কয়েকটি লেখা প্রকাশের ব্যবস্থা করে দেন সাংবাদিক সন্জীব চৌধুরীর মাধ্যমে, দৈনিক ‘ভোরের কাগজে’।

বিভিন্ন সময় উনার সাথে দেখা করে অনেক বিষয়েই আলোচনা করতাম ও জ্ঞান লাভ করতাম।
বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের খ্যাতিমান বিপ্লবী ত্রৈলক্ষ মহারাজ সম্পর্কে প্রথম শুনি উনার কাছে। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তান  বিরোধী আন্দোলন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি নানা অভিজ্ঞতার কথা আমাকে বলেন। বাংলাদেশের রাজনীতি ও বিভিন্ন খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ (বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে জিয়াউর রহমান পর্যন্ত) যাদেরকে তিনি কাছ থেকে দেখেছিলেন তাদের সম্পর্কে অনেক কিছু তিনি আমার সাথে শেয়ার করেছিলেন।  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, বঙ্গবন্ধু তার অনেক কথাই রেখেছিলেন। মাওলানা ভাষাণী প্রসঙ্গে প্রায়ই বলতেন, “একজনই মানুষ ছিলেন, মাওলানা সাহেব”।শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, “সেনা কর্মকর্তা হিসাবে জিয়া তুখোড় ছিলেন। হি ওয়াজ এ ভেরী গুড ট্যাক্টিসিয়ান”। যদিও জিয়ার সাথে উনার রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিরোধিতা ছিল, কিন্তু জিয়ার দেশপ্রেম নিয়ে তিনি কখনো সন্দেহ প্রকাশ করেননি। ‘দৈনিক বাংলা’ বিলুপ্ত হতে পারে এমন আভাস তিনি আমাকে দিয়েছিলেন। সমাজতান্ত্রিক আদর্শ ভালো না খারাপ, এই নিয়ে আমার সাথে দীর্ঘ তর্ক-বিতর্ক হয়েছে উনার সাথে। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে গিয়ে তিনি খোলামেলা তর্ক-বিতর্ক করতেন, ফলে অনেক রাষ্ট্রেরই বিরাগভাজন হন তিনি। স্ট্যালিন ও  স্ট্যালিনিজম-এর তীব্র সমালোচনা করেছিলাম আমি, তিনি সহমত প্রকাশ করেছিলেন। মাঝে মাঝে কিছু বিদেশী ডিপ্লোমেট ইনার বাড়ীতে যেতেন উনার সাথে দেখা করতে। আমাকে বলেছিলেন উনার রাজনীতি উনার সংগ্রাম, উনার রাজনৈতিক যুদ্ধ। সাংবাদিকতা উনার পেশা আর রাজনীতি উনার নেশা।

নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন কয়েকবার, প্রতিবারই পরাজিত হয়েছিলেন। দেশের মানুষ সম্ভবতঃ তাঁর মত জ্ঞানী-গুনী মানুষকে সংসদে দেখতে চায়না।একবার ঢাকার রমনা তেজগা এলাকা থেকে নির্বাচন করলেন। এই নির্বাচনী এলাকাটির সুনাম ছিল। তিনি বলেছিলেন, “দেখি এবার ভদ্রলোকেরা কি করে!” সেই এলাকায়-ও তিনি হেরেছিলেন।

এরপর কয়েক মাসের ব্যবধানে পি, এইচ, ডি, প্রোগ্রামে স্কলারশীপ নিয়ে আবার বিদেশে পাড়ি জমাই। উনার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

অনেকগুলো বছর পর দেশে ফিরে এসে উনার খোঁজ নিতে গিয়ে জানলাম তিনি অসুস্থ। সাংবাদিক শাহীন রেজা নূরকে প্রশ্ন করেছিলাম, “নির্মল সেন কোথায় আছেন?” তিনি বললেন, “কাকা গ্রামে চলে গেছে, চিকিৎসার প্রয়োজন, কেউ টাকা পয়সা দেয়না”। আমি বললাম, “আপনারা একটু লেখালেখি করেন, সরকার যাতে তাঁর চিকিৎসার ভার নেয়, নির্মল সেন তো দেশের সম্পদ”। তিনি বলেছিলেন দেখবেন। তারপর কি হলো জানিনা। সরকার কোন ভার নেয়নি বুঝতে পারছি, উল্টো তিনিই দান করলেন।

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার পশ্চাত্পদ জনপদের মেয়েদের শিক্ষিত করার প্রত্যাশায় নিজ বাড়িটি লিখে দিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক, কলামিস্ট, বাম রাজনীতির পুরোধা ও মুক্তিযোদ্ধা নির্মল সেন। ত্যাগী এ সাংবাদিক একটি কলেজ স্থাপনের জন্য নিজ বাড়িটি লিখে দিয়ে ত্যাগের নতুন আরেকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন বলে মনে করছেন এলাকাবাসী। প্রথিতযশা সাংবাদিক নির্মল সেন তার জীবনের শেষ ইচ্ছা পূরণের লক্ষ্যে সোমবার তার বাড়িতে একটি মহিলা কলেজ স্থাপনের জন্য দেড় একর জমি শিক্ষা সচিব বরাবরে লিখে দেন। তার এ ইচ্ছা পূরণের জন্য জমির অন্য শরিক ভাইপো রতন সেন কংকন, চন্দন সেন ও বোন নন্দিতা সেন তাদের অংশটুকুও লিখে দেন। উপজেলা সাব-রেজিস্টার অফিসার রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস তার কার্যালয়ে বসে জমিটি রেজিস্ট্রি করেন। এ সময় উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আমিনুজ্জামান খান মিলন, উপজেলা আ’লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও পিনজুরী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার, স্থানীয় দলিল লেখক সমিতির সভাপতি ইন্দ্রজিত্ সেনগুপ্ত, প্রেস ক্লাব সভাপতি মিজানুর রহমান বুলু উপস্থিত ছিলেন। নির্মল সেন তার জীবনে শেষ ইচ্ছা বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী ও দেশবাসীকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। নির্মল সেনের দান আমরা গ্রহন করে নিলাম, প্রতিদান কি দিতে পারিনা? একজন অতি সাধারণ মানুষ হিসাবে আমি কেবল আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করতে পারি। পাশাপাশি আমি লজ্জ্বিত যে, দেশ নির্মল সেনের মত সম্পদের মূল্যায়ন করতে পারেনা। এ জন্যই বোধ হয় আমরা এত দরিদ্র!

১৯৪২ সালে নবম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে যোগ দিয়ে রাজনীতি শুরু করেন। সে সময় তিনি ১৬ দিন স্কুল গেটে শুয়ে থেকে ধর্মঘট করেন। ১৯৪৬ সালে নির্মল সেন আইএসসি পাশ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলে মা ভাইবোন সবাই চলে যান ভারতে। নির্মল সেন দিধ্বান্বিত হয়ে পড়েন কি করবেন। ভারতে চলে যাবেন না দেশে থাকবেন। এই বিষয়ে তিনি স্মৃতিচারণ করে লিখেছিলেন, আমি শিক্ষাগুরু মোজাম্মেল হক দা’কে প্রশ্ন করি, “কি করব আমি?” মোজাম্মেল দা’ বললে “তোমার যাওয়া হবেনা”, “আমি বাংলাদেশে রয়ে গেলাম”। নির্মল সেন থেকে যান। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে ব্যাচেলর ডিগ্রী অর্জন করেন ও অর্থনীতিতে মাস্টার্স করে।

রাজনীতি করতে গিয়ে নির্মল সেনকে জীবনের অনেকটা সময় জেলে কাটাতে হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে ১৬ বার কারাবাস করতে হয় তাকে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ৫ দলীয় জোটের নেতা হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দৈনিক বাংলাসহ বন্ধঘোষিত চারটি পত্রিকার সাংবাদিক-কর্মচারীদের পাওনা আদায়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আমরণ অনশনে বসেছিলেন তিনি। ‘অনিকেত’ ছদ্মনামে লেখা তার কলামটি বেশ জনপ্রিয় ছিল। আমাকে বলতেন, “আমি যা লেখি তার বেশীরভাগই, একবসায় স্মৃতি থেকে লেখা”।

গত ২২ ডিসেম্বর তাঁর অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকায় এনে ল্যাব এইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদিকে ঢাকায় রওনা হওয়ার আগে গ্রামের বাড়িতে বসে নির্মল সেন পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে জীবনের শেষ ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। নির্মল সেনের জীবনের শেষ ইচ্ছা ছিল নিজ বাড়িতে নারীদের জন্য একটি কলেজ নির্মাণ করা। মৃত্যুর পর তিনি কোনো মেডিকেল কলেজে দেহ দান করতেও চেয়েছিলেন। সাংবাদিকতা পেশায় বিশেষ অবদানের জন্য তাঁর মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয়ভাবে যদি কোনো পুরস্কার দেওয়া হয়, তা যেন গ্রহণ করা না হয়। বিশিষ্ট এই সাংবাদিকের আরেকটি ইচ্ছে ছিল, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী তাঁর মৃত্যুর সময় নির্মল সেনকে যে কথাগুলো বলে গিয়েছিলেন, তা বাম রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করা। তাঁর এই ইচ্ছাগুলো তিনি লিখে রেখে গেছেন বলে একটি সূত্রে জানা গেছে.

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নির্মল সেন সংগঠক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি আগরতলা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধ চলাকালে তিনি একাধিক বার আগরতলা থেকে ঢাকায় এসে তরুণদের সংগঠিত করেন। ভারতের আগরতলায় আরএসপির সহযোগিতায় তরুণদের প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করেন।

স্বাধীনতার পর গুপ্তহত্যার প্রতিবাদে ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’ শিরোনামে দৈনিক বাংলায় কলাম লিখে তোলপাড় সৃষ্টি করেন দেশময়।

গত ১০ই জানুয়ারী ২০১৩ সালে তিনি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গিয়েছেন।

সাংবাদিকদের উদ্দেশে নির্মল সেন বলেছিলেন, “আপনারা সাহসী হোন। সাহস নিয়ে সত্য কথা লিখুন। সত্য কথা লিখলে সমাজে মাথা উঁচু করে চলতে পারবেন। সাংবাদিক জীবনে আমি কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করিনি। সারা জীবন সাহস নিয়ে সত্য কথা লিখেছি।”

হে সাহসী দেশহিতৈষী সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ, আপনাকে সালাম। এই দেশ আপনার অভাব কোনদিনও পূরণ করতে পারবে না।

৭১৪ বার দেখা হয়েছে

৭ টি মন্তব্য : “স্মৃতিতে নির্মল সেন”

      • "বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, বঙ্গবন্ধু তার অনেক কথাই রেখেছিলেন। মাওলানা ভাষাণী প্রসঙ্গে প্রায়ই বলতেন, “একজনই মানুষ ছিলেন, মাওলানা সাহেব”।শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, “সেনা কর্মকর্তা হিসাবে জিয়া তুখোড় ছিলেন। হি ওয়াজ এ ভেরী গুড ট্যাক্টিসিয়ান”। যদিও জিয়ার সাথে উনার রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিরোধিতা ছিল, কিন্তু জিয়ার দেশপ্রেম নিয়ে তিনি কখনো সন্দেহ প্রকাশ করেননি।"

        জিয়ার দেশপ্রেম নিয়ে নির্মল সেনের মত একজন ভ্রান্ত বাম রাজনীতিকের সন্দেহ না থাকারই কথা। তবে প্রগতিশীল রাজনীতির প্রবক্তা ভাসানী জীবনের পরন্ত বেলায় হসপিটালে শয্যাশায়ী অবস্হায় অবৈধ ক্ষমতা দখলদার, রাষ্ট্রদ্রোহীদের পৃষ্টপোষক, মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও সৈনিক হত্যাকারী জিয়াকে স্পষ্টভাবেই প্রশ্ন করেছেন "তুমি কি মুজিবরের মত দেশপ্রেমিক হইতে পারবা‍‌"

        জবাব দিন
  1. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    বাংলাদেশে একটা বয়সে সবাই কিছু সমাজতন্ত্রের নেশায় বুদ হয়ে থাকে। বড় হতে হতে সেই নেশা কেটে যায়। আমার নেশাটা সেই নবম দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় কেটে যায়। বাবার সাথে হাঁটছিলাম একদিন। হঠাৎ ইলশে গুড়ি বৃষ্টি শুরু হলো। সঙ্গে ছাতা না থাকায় হালকা ভিজলাম।
    বাবা বললেন, বাংলাদেশের বামরা মস্কোতে আর বেজিং এ বৃষ্টি হলে ছাতা মাথায় দেয়।
    ছোট্ট একটা কথা, কিন্তু আমার রোগ সেরে যায়।
    কিন্তু সবাই তো এক ঔষুধে নিদান পান না। তাই তারা শিশু, কিশোর, তরুণ, যুবা, প্রৌড়, বৃদ্ধ হন; কিন্তু তাদের রোগ সারে না।
    অতঃপর তারা মারা গেলে পর হয় তাদের কেওড়াতলার শ্মশানে পোড়ানো হয় গীতা, উপনিষদের শ্লোক আওড়াতে, আওড়াতে। নতুবা পল্টনে ইসলামী কায়দায় জানাযা, দেশজুড়ে গায়েবানা জানাযার পর মীরপুরের বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে দাফন করা হয়।

    শেষ কথাঃ যাদের ওহি আসে মস্কো আর পিকিং থেকে তারা মস্কো আর পিকিং এরই ভাড় হয়ে থাকেন আজীবন, দেশের ভার নিতে পারেন না।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  2. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)
    কিছুক্ষণ কথা বলার উনার বিজ্ঞানের জ্ঞান দেখে অবাক হচ্ছিলাম। ভাবছিলাম সাংবাদিক মানুষ আর্টসের লোক, বিজ্ঞান জানেন কি করে! তিনি নিজেই আমার মনের কথার উত্তর দিলেন, “আমি কেমিস্ট্রিতে অনার্স করেছি”।
    উনার প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ বেড়ে গেল।

    সাধু, সাধু।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।