লিস্টনিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ ১২

 

লিস্টনিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ ১২

রমিত আজাদ

Listening to the Wind of Change

 

ভূমিকাংশ

 

(সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও পতন রবর্তী সময়ের উপর ভিত্তি করে একটি ধারাবাহিক উপন্যাস)

 

যুগে যুগে মানুষ স্বপ্ন দেখেছে আদর্শ সমাজের। সেই আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নানা যুগে মানুষ আঁকড়ে ধরেছে নানা দর্শনকে। ইতিহাসের ধারায় নয়-দশ হাজার বছর পূর্বে গড়ে ওঠা মানব সভ্যতা এ’ পর্যন্ত এসেছে নানা রকম ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দি্যে, রোম সাম্রাজ্যের উথ্থান-পতন, চার্চের অনুশাসনের প্রবল প্রতাপ ও রেনেঁসার মধ্য দিয়ে তার সমাপ্তি, পারস্য সাম্রাজ্যের উথ্থান-পতন, ইসলামী খিলাফতের দ্বিগীজ্বয় আবার তার দুর্বল হয়ে যাওয়া, এবং পরিশেষে শেষ প্রদীপ অটোমান সাম্রাজ্যেরও নিভে যাওয়ার পর, মাথাচারা দিয়ে উঠতে শুরু করে প্রোটেস্টান্ট দর্শনে বিশ্বাসী ইউরোপের ছোট ছোট দেশগুলো। গোটা এশিয়া, আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়ে উপনিবেশ স্থাপন করে সূচনা করল বিশ্বব্যপী লুন্ঠনের এক নব্য ইতিহাস। কিন্তু এই লুন্ঠনে লাভবান খোদ ইউরোপীয় চিন্তাবিদরাই অনুধাবন করতে শুরু করেছিলেন, এহেন একতরফা শোষণের অবসান হতে বাধ্য। এ্যাডল্ফ তিয়ের ও ফ্রাঁসোয়া গিজোর মত ফরাসী ঐতিহাসিকেরা শ্রেণী ভেদ ও শ্রেণী সংগ্রামের কথা লিখলেন। সব সমাজেই মোটামুটি দুটি শ্রেণী আছে, শোষক ও শোষিত, এবং এদের মধ্যে সংগ্রাম বাধবেই। ১৮৬৭ সালে জার্মান ইহুদী দার্শনিক কার্ল মার্কস পূর্বসুরীদের শ্রেণী বিভাজনের চিন্তাটা গ্রহন করে জন্ম দেন এক নতুন দর্শনের, যার নাম কম্যুনিজম। যেখানে আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বললেন, সংগ্রামের মাধ্যমে শ্রেণী লোপ করাই সমাজ বিবর্তনের প্রধান পথ। পৃথিবীব্যাপী ঝড় তোলে তার লিখিত ‘ডাস ক্যাপিটাল’। নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে দিয়ে যায় এই দর্শন। শেষ পর্যন্ত একদল লোক আঁকড়ে ধরে এই দর্শনকে। তাদের বদ্ধমূল ধারণা হয়, এই দর্শনই পৃথিবী থেকে সব দুর্নীতি আর বৈষম্যের জঞ্জাল দূর করে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে আদর্শ সমাজ ব্যবস্থা। দেশে দেশে প্রতিস্ঠা হতে শুরু করে ‘কম্যুনিস্ট পার্টি’। মার্কস বলেছিলেন, “ইউরোপ ভুত দেখছে, কম্যুনিজমের ভুত।” ১৯১৭ সালের অক্টোবরে সেই ভুত হঠাৎ করে ঘাড়ে চেপে বসল রাশিয়ার। অনেকগুলো জাতি ও স্টেট নিয়ে গঠিত জারের রুশ সাম্রাজ্যের নাম রাতারাতি পাল্টে হয়ে গেল ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’। কলেবরে ইউরোপ এমনকি আফ্রিকা মাহাদেশের চাইতেও বড় এই বিশাল রাস্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে বসল ‘সোভিয়েত কম্যুনিস্ট পার্টি’। ১৯১৭ থেকে ১৯৮৪ প্রবল প্রতাপে শাসন করেছে এই রাজনৈতিক দলটি। শুধু নিজ দেশের অভ্যন্তরেই নয়, লৌহ পর্দায় ঘেরা ইউনিয়নের অভ্যন্তর থেকে সে জাল বিস্তার করে সমগ্র পৃথিবীব্যপী।

 

একের পর এক বিভিন্ন দেশে সফল হতে শুরু করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। ইউরোপের পূর্বাংশ ছেঁয়ে যায় এই আদর্শে বিশ্বাসীদের শাসনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরপরই কম্যুনিস্টরা জাঁকি্য়ে বসে গণচীনে। সেই সাথে এশিয়ার কয়েকটি দেশে। আফ্রিকাও বাদ থাকেনি। এমনকি আটলান্টিকের অথৈ জলরাশী পেরিয়ে সুদুর আমেরিকা মহাদেশেও ছড়িয়ে পড়ে এই দর্শন। এই দর্শন বিরোধী রাস্ট্রগুলোর নেতা প্রবল প্রতাপশালী মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের পেটের ভিতর দ্বীপ রাস্ট্র কিউবায় ক্ষমতা দখল করে নেয় কম্যুনিস্টরা। তালিকা থেকে পৃথিবীর যে কয়টি দেশ বাকি ছিল সেখানেও সক্রিয় হয়ে ওঠে বিপ্লবীরা। নানা রকম ঘাত-প্রতিঘাত, আঘাত-সংঘাত, কখনো নিরস্ত্র, কখনো সসস্ত্র আন্দোলনে উত্তাল ছিল ‘৬০ ও ‘৭০-এর দশকের বিশ্ব।

 

কম্যুনিস্টদের ভাষায় এটা ছিল শ্রেণী সংগ্রাম – ধনীক শ্রেণী বনাম সর্বহারা, মালিক বনাম শ্রমিক, শোষক বনাম শোষিত। গুটি কতক ধনীরা প্রবল শক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরে আছে তাদের ধন সম্পদ, আর সর্বহারারা পঙ্গপালের মত ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছে সেই সম্পদ। চলছে দু’পক্ষের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। এমনই মনে হয়েছিল দৃশ্যটা একপাশ থেকে।

 

পুঁজিবাদী দেশগুলোর নিরপেক্ষ মানুষদের মনে হয়েছিল শেষ পর্যন্ত পরাজিত হবে পুঁজিবাদ। আদর্শগত দিক থেকে কম্যুনিজমই সেরা। পুঁজিবাদী দেশগুলোকে একসময় কম্যুনিজম গ্রহণ করতেই হবে। ব্যাপার শুধু সময়ের। ঠিক সে সময়ই ঘটনা ঘটল বিপরীত দিক থেকে। ১৯৮৪ সালে বিশ্ববাসী পরিচিত হলো দুটি নতুন শব্দের সাথে ‘পেরেস্ত্রোইকা’ ও ‘গ্লাসনস্ত’। শব্দ দুটি রুশ যার অর্থ যথাক্রমে, ‘পুনর্গঠন’ ও ‘উন্মুক্ততা’। নতুন হাওয়া বইতে শুরু করেছে কম্যুনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নে। যে আদর্শকে তারা কেবল আঁকড়েই ধরে রাখেনি বরং সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে, তার কোথাও কোন ত্রুটি রয়েছে। যে ত্রুটির সংবাদ এতকাল কেউ পায়নি, তা আজ মৃদু কম্পনের মত অনুভূত হতে শুরু করেছে। সেই ত্রুটির সংশোধন প্রয়োজন, তা নইলে প্রবল ভূমিকম্পে সব ধ্বসে পড়েতে পারে।

 

তাই সেখানে গৃহিত হলো এই দু’টি নীতি। কিন্তু তাতেও কাজ হলো বলে মনে হয় না। কম্পনের মাত্রা বাড়তেই শুরু করল। ‘৮৪ থেকে ‘৯০ ঠিক ছয় বছরের মাথায় তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়ল এই এতগুলো বছরের প্রবল প্রতাপশালী সোভিয়েত ইউনিয়ন। ঠিক তার পরপর অনেক ঘটনাই ঘটল খুব দ্রুত। শান্ত-নির্জন সোভিয়েত ইউনিয়ন অশান্ত হয়ে উঠল। পরিবর্তনের ধাক্কায় পাল্টে গেল অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক রাস্ট্রগুলোও। পাল্টে গেল সমগ্র বিশ্ব। কি ঘটেছিল তখন? কি হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে? সাধারণ মানুষের জীবন ধারা চিন্তা-চেতনায় কেমন প্রভাব পড়েছিল সেই সময়ের? কেমন করে তারা প্রত্যক্ষ করেছিল সেই সময়ের রাজনীতিকে? কেমন করে মোকাবেলা করেছিল এই অস্থিরতাকে? এই সবকিছু নিয়ে এই ধারাবাহিক উপন্যাস – ‘লিস্ট্নিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ’। সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিবর্তন নিয়ে লেখা ও গাওয়া বিখ্যাত গানের গ্রুপ ‘স্করপিওন্স’-এর একটি গানের কলি থেকে এই নামটি নেয়া হয়েছে।

 

এখানে গল্পের নায়ক একজন বাংলাদেশী। যে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে গিয়েছে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে। রাজনীতিতে তার আগ্রহ সামান্য। আর ঐ বয়সে কতটুকুই বা বোঝা যায়? হঠাৎ করে তার চোখের সামনেই ঘটে যেতে শুরু করল সবকিছু। আর সেও হয়ে উঠল ঐ ঘটনাবহুল সময়ের অংশ।

 

 

 

লিস্টনিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ ১১

 

লিস্টনিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ ১২

 

সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যৌবন প্রাপ্ত আমরা চারজন যুবক বেড়িয়েছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেড়ানোর উদ্দেশ্যে। মাত্র শেষ করেছি কলেজ জীবন, চোখে রঙিন স্বপ্ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হব।  সবুজ শান্তির সমারোহ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পেরিয়ে বেরিয়ে এলাম তারুণ্যের উচ্ছলতায় মুখরিত টি, এস, সি, চত্বরে।  বিশাল চত্বরে ঢুকে খুশীতে ছেয়ে গেল মনটা।  চার রাস্তার মোড়ে আছে একটি সড়ক দ্বীপ। একপাশে টিচার্স স্টুডেন্টস সেন্টার ( টি, এস, সি,), আরেক পাশে মহীয়সী বাঙালী নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের নামানুসারে মেয়েদের হল রোকেয়া হল, আরেক পাশে বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরী ও কলা ভবন এলাকা। এই সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যার সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির কেবলমাত্র শিক্ষার ইতিহাস নয়, সংস্কৃতি ও রাজনীতির ইতিহাসও। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাই অংশ নিয়েছিল বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে, বিশেষ অবদান রেখেছিল ভাষা  আন্দোলনে, সর্বপোরী একাত্তরের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে। তারপর সেখানেই থেমে যায়নি তাদের অন্যায়ের বিরুদ্বে প্রতিবাদের সুর। স্বাধীনতার পরও তারা যেকোন চক্রের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে একটি কাউন্টার ফোর্স হিসাবে কাজ করতে থাকে। নির্ভীক, দুঃসাহসী এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা।

 

ঃ কোথায় যাবি? (প্রশ্ন করল আমীন)

ঃ ইউনিভার্সিটিতে যাব (বলল মোস্তাহিদ)

ঃ আরে এটাই তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (বলল ইমতিয়াজ)

ঃ হ্যাঁ, তবে কলা ভবনে অপরাজেয় বাংলার সামনে না দাঁড়ালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি বলে মনে হয়না। (বলল মোস্তাহিদ)

ঃ চল তাহলে। (বললাম আমি)

 

সমান লয়ে হেটে ধীরে ধীরে কলা ভবন চত্বরে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ঐতিহ্যের প্রতীকে অমর ভাষ্কর্য্য অপরাজেয় বাংলার সামনে এসে দাঁড়ালাম আমরা চারজন যুবক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করে। তাদের সম্মিলিত প্রতিরোধ ও আক্রমণে পাক বাহিনী পরাজিত হয়। সর্বস্তরের মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণের প্রতীকী চিহ্নই ‘অপরাজেয় বাংলা’। ১৯৭২-৭৩ সালে ডাকসুর ভিপি ছিলেন কম্যুনিজমে বিশ্বাসী মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং জিএস ছিলেন মাহবুব জামান। এ সময় ডাকসুর উদ্যোগে অপরাজেয় বাংলার কাজে হাত দেয়া হয়। এর তিনটি মূর্তির একটির ডান হাতে দৃঢ় প্রত্যয়ে রাইফেলের বেল্ট ধরা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। এর চোখেমুখে স্বাধীনতার চেতনা উদ্দীপন নিরাপোস। এর মডেল ছিলেন আর্ট কলেজের ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা বদরুল আলম বেনু। থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে সাবলীল ভঙ্গিতে দাঁড়ানো অপর মূর্তির মডেল ছিলেন সৈয়দ হামিদ মকসুদ ফজলে। আর নারী মূর্তির মডেল ছিলেন হাসিনা আহমেদ। ১৯৭৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টায় এ ভাস্কর্যের উদ্বোধন করা হয়। একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর্যটির উদ্বোধন করেন। তবে অপরাজেয় বাংলার কাছে ভাস্করের নাম খচিত কোন শিলালিপি নেই। স্বাধীনতার এ প্রতীক তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন গুণী শিল্পী ভাস্কর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনের বেদিতে দাঁড়ানো তিন মুক্তিযোদ্ধার প্রতিচ্ছবি যেন অন্যায় ও বৈষম্য দূর করে দেশে সাম্য প্রতিষ্ঠার গান গাইছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে। এ ভাস্কর্যে সব শ্রেণীর যোদ্ধার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরা হয়েছে।   বেদীর উপর নির্মিত এর উচচতা ১২ ফুট, দৈর্ঘে ৮ ফুট ও প্রস্থে  ৬ ফুট।  অপরাজেয় বাংলার তিন মডেলের একজন হাসিনা আহমেদ বর্তমানে কানাডা প্রবাসী।

 

ঃ আমি ছোট বেলায় বড় বোনের হাত ধরে অনেক এসেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, যতবার এসেছি অপরাজেয় বাংলা মিস করিনি একবার হলেও এর সামনে দাঁড়াতাম। আমার বুক ভরে যেত। বাংলাদেশী নারী ও পুরুষের  সাহসীকতার প্রতীক এই তিন মুর্তি। শহীদ বুদ্ধিজীবি মুনীর চৌধুরীর ছেলে সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র মিশুক ভাইকে অনেকবার দেখেছি  অপরাজেয় বাংলা-র সামনে দাঁড়িয়ে তাকে ক্যামেরা বন্দি করতে। মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনুলোতে, অজস্র তরুণ কি অসম সাহসিকতা নিয়ে দেশমাতৃকাকে রক্ষা করেছিল! ব্যাটা নিয়াজী বলেছিলো, “বাঙালী মার্শাল রেস না”। ২৫শে মার্চের পরপরই যখন লক্ষ লক্ষ তরুণ লুঙ্গি পরে হাটু কাদায় দাঁড়িয়ে অস্র হাতে প্রশিক্ষন নিতে শুরু করল, বাঙালীর এই রাতারাতি মার্শাল রেস হয়ে যাওয়া দেখে পাকিস্তানি শাসক চক্র রিতিমত আহাম্মক বনে যায়। বাংলাদেশীরা যে বিজয়ীর জাত অপরাজেয় এই তিন মূর্তিই সদম্ভে তা ঘোষণা করছে। (আমি বললাম)

ঃ গত পহেলা বৈশাখে এসেছিলাম এখানে। খুব সুন্দর অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল ইউনিভার্সিটিতে। দেশের সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্রও এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। (বলল আমীন)

ঃ আব্বা বলেছেন, ১৯৭২ সালে দেশের স্বাধীনতার পর প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারীর অনুষ্ঠান খুব ঘটা করে পালন করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে এসেছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল সেক্টর কমান্ডাররা। ছাত্রছাত্রীরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল জাতীয় বীরদের দেখার জন্য। এ ওকে বলছিল, “দেখ, দেখ ঐ জিয়াউর রহমান”, “দেখ, দেখ ঐ খালেদ মোশাররফ”, “ঐ যে আবু তাহেরকে দেখা যাচ্ছে”, ইত্যাদি। (আমি বললাম)

ঃ সেদিন দু’চারটি রাজাকার ছাড়া সমগ্র জাতি কেমন ঐক্যবদ্ধ ছিল! আজ আমাদের মধ্যে এত বিভেদ কেন? (প্রশ্ন করল ইমতিয়াজ)

ঃ কঠিন প্রশ্ন। শুধু এই দ্বিধা-বিভক্তি নয়, আরো আছে দেশের সেনাবাহিনীকে জনগণের প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা।

ঃ এতে তো শেষমেষ দেশ মানে আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এরকম কেন হচ্ছে? (মোস্তাহিদ)

ঃ জানিনা, এটা আমাদের দেশের বিরুদ্ধে কোন গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে। আব্বাকে জিজ্ঞেস করতে হবে। (বললাম আমি)

 

হঠাৎ করে আমাদের সামনে দিয়ে একটা মিছিল যেতে শুরু করল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদেরই মিছিল মনে হচ্ছে। একদল তরুণ-তরুণী মিছিল করছে। তরুণদের সংখ্যাই বেশি, তরুণীদের সংখ্যা স্বল্প। মিছিলটি নাতিদীর্ঘ, তবে সবাইকে খুব দৃপ্ত মনে হলো।  মিছিলের ভিতর থেকে কিছু শ্লোগান ভেসে এলো, ‘অন্ন চাই, বস্ত্র চাই, বাঁচার মত বাঁচতে চাই’, ‘ভাত কাপড় জমি কাজ, ইউনিয়নের এক আওয়াজ’, ‘দুনিয়ার মজদুর, এক হও’। হেলাল হাফিজের কবিতা মনে পড়ল, ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, …………….।’

 

ঃ এটা বোধহয় ছাত্র ইউনিয়নের মিছিল। (আমীন)

ঃ কোন পার্টি এটা? (ইমতিয়াজ)

ঃ বাংলাদেশ কম্যুনিস্ট পার্টির অঙ্গ সংগঠন। (আমি)

ঃ কি চায় কম্যুনিস্টরা?  (ইমতিয়াজ)

ঃ শুনলি না? ভাত চায়, কাপড় চায়। (কৌতুক করে বলল মোস্তাহিদ)

ঃ সে তো সবাই চায়। মজদুরের কথা বলল কেন? ওরা তো ছাত্র।

ঃ শোষণমুক্ত সমাজ গঠন করতে চায়। (আমীন)

ঃ শোষণ কি?

ঃ সমাজতন্ত্র।

ঃ সমাজতন্ত্র কি?

ঃ পুঁজিবাদ বিরোধী।

ঃ পুঁজিবাদটাই বা কি? (আবারও প্রশ্ন ইমতিয়াজের)

ঃ অতশত বুঝিনা। এই তুই কিছু বল না রোমান। (আমীন)

ঃ আমিও ভালো বুঝিনা। যা বুঝি আমাদের দেশে বা আমেরিকায় যেই সিস্টেমটা আছে এটা পুঁজিবাদ আর রাশিয়ায়  যেই সিস্টেমটা চলছে সেটা সমাজতন্ত্র। (আমি)

ঃ রাশিয়া কি ভালো? (মোস্তাহিদ)

ঃ খারাপ হবে কেন? খারাপ হবে কেন? রাশিয়া ভালোই। (খেকে উঠল আমীন)। তোমাদের মোল্লা-মাওলানাদের দেশ সৌদি আরব খারাপ।

ঃ সৌদির কথা আসল কিসে? (মোস্তাহিদও ক্ষেপে গেল)

ঃ আহা তোমাদের আবার শুরু হয়ে গেল! (একটু বিরক্ত হয়েই বলল ইমতিয়াজ)। রোমান বুঝিয়ে বলোতো ওদের।

ঃ বললাম, না আমি নিজেও ভালো বুঝিনা। আব্বাকে জিজ্ঞেস করতে হবে।

ঃ ঢাকা ইউনিভার্সিটি দেখা তো হলো। এখন কোথায় যাবে চল। (ইমতিয়াজ)

ঃ কি বলিস দেখা হলো? সবে তো শুরু। (আমীন)

ঃ আর কি দেখবি? (মোস্তাহিদ)

ঃ কত সুন্দরী সুন্দরী মেয়ে।

ঃ তুই আছিস তোর মেয়ে নিয়ে।

ঃ আহা তোমার বুঝি পছন্দ হয়না?

ঃ ওরা আমাদের সিনিয়র।

ঃ তাতে কি? মেয়ে তো। আর দু’এক বছরের সিনিয়রিটি ব্যাপার না। (হাসতে হাসতে বলল আমীন) আধুনিক যুগ না?

এবার সবার ঠোটের কোনায়ই মুচকি হাসি দেখা গেল।

ঃ ও বোধহয় সমরেশ বসুর ‘প্রজাপতি’ পড়ে প্রভাবিত। (মোস্তাহিদ)

আবারও সবাই হাসলো।

ঃ চল তোদের একজন চমৎকার লোকের কাছে নিয়ে যাই। (আমি)

ঃ এখানে? কে উনি? (ইমতিয়াজ)

ঃ রোমানের খালু আছেন ঢাকা ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। (মোস্তাহিদ)

ঃ খালু ঢাকা ইউনিভার্সিটির না, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির প্রফেসর।

ঃ আচ্ছা, কি নাম? কোন ডিপার্টমেন্ট? (ইমতিয়াজ)

ঃ ডঃ বজলুর রহমান খান। ইতিহাসের অধ্যাপক।

ঃ নামটা চেনা চেনা লাগছে, ডঃ বজলুর রহমান খান,  ডঃ ফজলুর রহমান খান, কানে বাজছে। শুনেছি মনে হয়।

ঃ শোনার কথা,   ডঃ ফজলুর রহমান খান শহীদ বুদ্ধিজীবি,  ঢাকা ইউনিভার্সিটির সয়েল সায়েন্স-এর টিচার ছিলেন। ‘৭১-এ পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে শহীদ হন। উনার বড় ভাই-ই  ডঃ বজলুর রহমান খান।

ঃ রাইট মনে পড়েছে। শহীদ বুদ্ধিজীবি ডঃ ফজলুর রহমান খান। উনার নামে স্মারক ডাকটিকেটও আছে। তোমার খালু, খালুর ভাই! ভালো ভালো বেশ ভালো। তা এখন কার কাছে নিতে চাও?

ঃ ডঃ জামান  ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের প্রফেসর, খালুর জুনিয়র বন্ধু। (বলললাম আমি)

ঃ উনার কাছে আবার যাওয়ার দরকার কি? (আমীন)

ঃ তোর যাওয়ার দরকার নাই। তুই এখানে বসে বসে মেয়ে দেখ। (মোস্তাহিদ ঠেস দিয়ে বলল)। আমরা যাব। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে এসেছি, ভবিষ্যতে এখানকার ছাত্র হওয়ার স্বপ্ন দেখি, আর এখানকার একজন প্রফেসরের সাথে দেখা করার সুযোগ পেয়েও দেখা করব না? চল রোমান কোথায় যাবি চল।

কলা ভবনের ভিতর ঢুকে ইতিহাস বিভাগের দিকে গেলাম। অনিচ্ছা সত্বেও আমীনও আমাদের সাথে এলো। যাওয়ার পথে বাইরে, ভবনের ভিতরে বিভিন্ন পিলারের পাদদেশে জোড়ায় জোড়ায় বসে আছে কপোত-কপোতীরা। দেলোয়ার হোসেন স্যারের কথা মনে হলো। স্যার বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিলার নিয়ে কবিতা আছে, ‘আমি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিলার হতাম, আমার পাদদেশে নতুন স্বপ্ন নিয়ে হাত ধরাধরি করে বসে থাকত প্রেমিক যূগল’।

ডঃ জামান স্যারের রুমটা খোলাই ছিল। পর্দা ঠেলে ঢুকে গেলাম আমি। আমার পিছনে পিছনে ওরা তিনজনও ঢুকল। আমাদের ভাগ্য ভালো বলতে হবে ঐ মুহুর্তে স্যার একাই ছিলেন। আমাদের চার যুবকের কৌতুহলী আটটি চোখ পড়ল উনার দিকে। ইতিহাসের অধ্যাপক ডঃ জামান। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স।  পরনে ছিল এ্যাশ কালারের প্যান্ট, গায়ে সাদা শার্ট, তার উপরে মানাসই হালকা নীল রঙের টাই। একজন অধ্যাপক বললে যেমন চিত্র আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঠিক তেমনি। মুহুর্তেই আমাদের মন শ্রদ্ধাবোধে ছেয়ে গেল।

ঃ আস সালামু আলাইকুম আঙ্কেল। (আমি)

ঃ আরে রোমান যে! এসো এসো। (সানন্দে স্বাগত জানালেন ডঃ জামান ) হঠাৎ এদিকে? ওরা কারা?

ঃ জ্বী, আঙ্কেল, আমরা আসলে এখানে বেড়াতে এসেছি। ওরা আমার বন্ধু।

ঃ বেড়াতে বলতে স্রেফ ঘুরতে?

ঃ না মানে, আমাদের তো এইচ, এস, সি, পরীক্ষা শেষ। এখন ইচ্ছা আছে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবো। তাই ভাবলাম একটু ঘুরে দেখি।

ঃ ও তাই বলো। না এটা নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। বন্ধুদের নিয়ে তীর্থ দর্শন। গুড, আই এ্যাম রিয়েলি প্লিজ্‌ড। তা তোমার খালু কেমন আছেন, ডঃ বি, আর, খান স্যার?

ঃ জ্বী, ভালো আছেন।

ঃ উনি এসেছিলেন এখানে গতমাসে। একটা কনফারেন্স ছিল। ওয়েল কি খাবে বলো?

ঃ না, না, আমরা কিছু খাবনা। আপনার সাথে শুধু দেখা করতে এসেছি।

ঃ  আঙ্কেল, আমার দু’য়েকটা জিনিস জানার ইচ্ছা ছিল। (অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলল মোস্তাহিদ)

ঃ আরে দু’য়েকটা কেন যত খুশী জানতে চাও, কোন সমস্যা নেই। আমাদের শিক্ষকদের কাজই তো হলো তোমাদের সবকিছু জানানো। ইতিহাস সংক্রান্ত কিছু হলে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব আশা করি।

ঃ মানে, এই ঢাকা ইউনিভার্সিটি সম্পর্কেই। আমরা আসলে তেমন কিছুই জানিনা। শুধু জানি বাংলাদেশের সব চাইতে পুরাতন, সব চাইতে ভালো ইউনিভার্সিটি। এর বেশি কিছু জানিনা।

ঃ ওয়েল, তোমার আগ্রহ দেখে খুব ভালো লাগলো। কি নাম তোমার, বাবা?

ঃ জ্বী, মোস্তাহিদ।

ঃ ওকে শোন মোস্তাহিদ।

ধীরে  ধীরে  বলে যেতে থাকলেন, ডঃ জামান।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয় । এটি একটি সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় । এ বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। এখানে প্রায় ৩০ হাজার ছাত্রছাত্রী এবং প্রায় ১৩০০ শিক্ষক রয়েছে। এটি ১৯২১ সালে স্থাপিত হয়। প্রতি বছর এখানে প্রায় ৫,০০০ ছাত্র ভর্তি হয়। বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষিত সম্প্রদায়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকার প্রায় কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। এর উত্তর দিকে নিউ এলিফ্যান্ট রোড। পশ্চিমে ইডেন কলেজ, দক্ষিণে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, পূর্বে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ।

ঃ আঙ্কেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাসটা যদি বলতেন।

 

ঃ শোন তাহলে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে স্বাধীন জাতিসত্ত্বার বিকাশের লক্ষ্যে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ব্রিটিশ ভারতে তৎকালীন শাসকদের অন্যায্য সিদ্ধান্তে পূর্ববঙ্গের মানুষের প্রতিবাদের ফসল হচ্ছে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পূর্ববঙ্গ শিক্ষাদীক্ষা, অর্থনীতি সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে ছিল। বঙ্গভঙ্গ হওয়ার পর এ অবস্থার খানিকটা পরিবর্তন হয়েছিল, বিশেষ করে শিক্ষার ক্ষেত্রে। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর ঢাকার স্থানীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে ঢাকার নবাব স্যার সলিমল্লাহ, ধনবাড়ীর নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের দাবীর প্রেক্ষিতে ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ। ১৯১৩ সালে প্রকাশিত হয় নাথান কমিটির ইতিবাচক রিপোর্ট  এবং সে বছরের ডিসেম্বর মাসেই সেটি অনুমোদিত হয়। ১৯১৭ সালে গঠিত স্যাডলার কমিশনও ইতিবাচক প্রস্তাব দিলে ১৯২০ সালের ১৩ মার্চ ভারতীয় আইন সভা পাশ করে ‘দি ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট (অ্যাক্ট নং-১৩) ১৯২০’। সৃষ্টির শুরুতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়ে। কলকাতার তৎকালীন একটি শিক্ষিত মহল ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে। এ ছাড়া ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এর ফলে পূর্ব বাংলার মানুষ হতাশা প্রকাশ করে। ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী সরকারের কাছে অবিলম্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল পেশের আহ্বান জানান। ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ গভর্নর জেনারেল এ বিলে সম্মতি দেন। এ আইনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ভিত্তি। এ আইনের বাস্তবায়নের ফলাফল হিসেবে ১৯২১ সালের ১ জুলাই যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বার উন্মুক্ত হয় ১৯২১ সালের ১ জুলাই। সে সময়ের ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত ও সৌন্দর্যমন্ডিত রমনা এলাকায় প্রায় ৬০০ একর জমির উপর পূর্ববঙ্গ এবং আসাম প্রদেশের পরিত্যক্ত ভবনাদি এবং ঢাকা কলেজের (বর্তমান কার্জন হল) ভবনসমূহের সমন্বয়ে মনোরম পরিবেশে গড়ে উঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার এই দিনটি প্রতিবছর “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস” হিসেবে পালন করা হয়।

ঃ শুরুতে কতগুলো ডিপার্টমেন্ট ছিল স্যার (এবার আমীনও আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করল)

ঃ তিনটি অনুষদ ও ১২টি বিভাগ নিয়ে একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়। কলা, বিজ্ঞান ও আইন অনুষদের অন্তর্ভুক্ত ছিল সংস্কৃত ও বাংলা, ইংরেজী, শিক্ষা, ইতিহাস, আরবী, ইসলামিক স্টাডিজ, ফারসী ও উর্দূ, দর্শন, অর্থনীতি ও রাজনীতি, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত এবং আইন।

প্রথম শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন বিভাগে মোট ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৮৭৭ জন এবং শিক্ষক সংখ্যা ছিল মাত্র ৬০ জন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী লীলা নাগ (ইংরেজী বিভাগ; এমএ-১৯২৩)। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধকালীন অস্থিরতা ও ভারত বিভক্তি আন্দোলনের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা কিছুটা ব্যাহত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুইটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত প্রদেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে এ দেশের মানুষের আশা উজ্জীবিত হয়। নতুন উদ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকান্ড শুরু হয়। তৎকালীন পূর্ববাংলার ৫৫ টি কলেজ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। ১৯৪৭-৭১ সময়ের মধ্যে ৫টি নতুন অনুষদ, ১৬টি নতুন বিভাগ ও ৪টি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৫২ সনের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে গৌরবময় ভূমিকা। স্বাধীনতা যুদ্ধে এ বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়। এতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ছাত্র-ছাত্রী সহ শহীদ হয়েছেন বহুজন।

ঃ রোমানের খালুর ভাইও তো শহীদ হয়েছিলেন। (বলল ইমতিয়াজ)

ঃ আমি জানি। ডঃ ফজলুর রহমান আমার সিনিয়র কলিগ ছিলেন। অত্যন্ত অমায়িক ও কর্মঠ ব্যাক্তি ছিলেন। উনার অকাল মৃত্যুতে সয়েল সায়েন্স ডিপার্টমেন্ট তথা বিশ্ববিদ্যালয়েরই অপূরণীয় ক্ষতি হয়। ভেবে দেখ এরকম একজন মানুষকে তৈরী করতে পিতা-মাতা থেকে শুরু করে শিক্ষক, বিদ্যালয়, সমাজ ও রাষ্ট্রকে কত সাধনা করতে হয়। আর তাকে হারাতে একটি গুলিই যথেস্ট ছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কিছু শহীদ বুদ্ধিজীবি আছেন। গিয়াসউদ্দিন আহমেদ ,ডঃ এ. এন. এম. মনিরুজ্জামান, ডঃ জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা,

এ. এন. মুনীর চৌধুরী , মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ডঃ আবুল খায়ের,

ডঃ সিরাজুল হক খান, রাশীদুল হাসান, আনোয়ার পাশা, ডঃ জি. সি. দেব, ডঃ ফজলুর রহমান, ডঃ ফয়জুল মহি, আব্দুল মুকতাদির, শরাফৎ আলী,

সাদত আলী, এ. আর. খান খাদিম, সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য, মোহাম্মদ সাদেক, অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য, ডাঃ মোহাম্মদ মর্তুজা, প্রমূখ।

‘৭১-এর যুদ্ধে আমাদের দেশের জেনেটিক ফান্ডের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। একারণেই যুদ্ধের পরে উঠে দাঁড়াতে আমাদের অনেক সময় লেগেছে।

ঃ স্বাধীনতার পরে কি বিশ্ববিদ্যালয় কোন মৌলিক পরিবর্তন এসেছিল? (আমি প্রশ্ন করলাম)

ঃ  বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে ১৯৬১ সালে স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের সরকার প্রবর্তিত অর্ডিন্যান্স বাতিলের জন্য ষাটের দশক থেকে শিক্ষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতার পর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ উক্ত অর্ডিন্যান্স বাতিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডার-১৯৭৩ জারি করে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় এই অর্ডার দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে।

ঃ এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা কি?

ঃ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত প্রতিষ্ঠান দেশের সর্ব প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ১০ টি অনুষদ, ৫১ টি বিভাগ, ৯ টি ইনস্টিটিউট এবং ৩৩ টি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া ছাত্র-ছাত্রীদের থাকার জন্যে রয়েছে ১৩ টি আবাসিক হল ও হোস্টেল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ ও এর অন্তর্গত বিভাগগুলো হল:

 

কলা অনুষদ :

কলা অনুষদের বিভাগ সমূহ-

বাংলা, ইংরেজী, ফারসী ও উর্দূ, দর্শন, ইতিহাস, আরবী, ইসলামিক স্টাডিজ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, সংস্কৃত ও পালি, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা, ভাষাবিজ্ঞান, নাট্যকলা ও সঙ্গীত, বিশ্ব ধর্মতত্ত্ব বিভাগ ।

 

বিজ্ঞান অনুষদ :

বিজ্ঞান অনুষদের বিভাগ সমূহ

পদার্থ বিজ্ঞান, গণিত, রসায়ন, পরিসংখ্যান বিভাগ।

 

আইন অনুষদ

আইন অনুষদের বিভাগ

আইন বিভাগ

 

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের বিভাগ সমূহ-

অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সমাজ বিজ্ঞান, লোক প্রশাসন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, নৃবিজ্ঞান, পপুলেশন সায়েন্সেস, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন, উইমেন্স স্টাডিজ ও ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ।

 

বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ

বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের বিভাগ সমূহ-

ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ, একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস, মার্কেটিং, ফিন্যান্স, ব্যাংকিং, হোটেল এন্ড টুরিজ্যাম ও ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ।

 

জীববিজ্ঞান অনুষদ

জীববিজ্ঞান অনুষদের বিভাগ সমূহ-

মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ, উদ্ভিদ বিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, প্রাণ রসায়ন ও অনুপপ্রাণ বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, অণুজীব বিজ্ঞান, মৎস বিজ্ঞান, চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ।

 

ফার্মেসি অনুষদ

ফার্মেসি অনুষদের বিভাগ সমূহ

ফার্মাসিউটিকাল কেমিস্টি, ক্লিনিকাল ফার্মেসি এন্ড ফার্মাকোলজি, ঔষধ প্রযুক্তি বিভাগ।

 

ইঞ্জিনিয়ারিং এবং টেকনোলজী অনুষদ

এই অনুষদের অন্তর্ভূক্ত বিভাগগুলো হচ্ছে:

ফলিত পদার্থবিজ্ঞান, ইলেকট্রনিক্স এবং কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, ফলিত রসায়ন ও রাসায়নিক প্রযুক্তি, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ।

 

আর্থ এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদ

ভূগোল ও পরিবেশ এবং ভূতত্ত্ব বিভাগ

 

চারুকলা অনুষদ

চারুকলা অনুষদের বিভাগ সমূহ-

অংকন ও চিত্রায়ন, গ্রাফিক্স ডিজাইন, প্রিন্ট মেকিং, প্রাচ্যকলা, ভাষ্কর্য, কারুশিল্প, মৃৎশিল্প, শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগ।

অন্যান্য অনুষদের মধ্যে রয়েছে-

 

চিকিৎসা অনুষদ

স্নাতকোত্তর চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুষদ

 

শিক্ষা অনুষদ

 

ইনস্টিটিউট সমূহ

১। শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট

২। পরিসংখ্যান গবেষণা ও শিক্ষণ ইনস্টিটিউট

৩। ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট

৪। পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট

৫। চারুকলা ইনস্টিটিউট

৬। সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট

৭। আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট

৮। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট

৯। তথ্য প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট

 

আবাসিক হলসমূহ

বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্র-ছাত্রীকে কোনো না কোনো হলের সাথে আবাসিক/অনাবাসিক ছাত্র-ছাত্রী হিসেবে যুক্ত থাকতে হয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রিদের জন্য ১৪ টি  আবাসিক হল রয়েছে। এছাড়া চারুকলা ইনস্টিটিউট ও ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য রয়েছে আলাদা হোস্টেল এবং বিদেশী ছাত্রদের জন্য আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাস। হলগুলোর নাম এই দেখ এখানে লেখা আছে।

বলে তিনি একটি কাগজ বাড়িয়ে দিলেন। আমরা পড়লাম

 

হলের নাম:

১। সলিমল্লাহ মুসলিম হল ২। শহীদুল্লাহ হল ৩। জগন্নাথ হল ৪। ফজলুল হক মুসলিম হল ৫। সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ৬। রোকেয়া হল ৭। মাস্টারদা সূর্যসেন হল ৮। হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ৯। শামসুন নাহার হল ১০। কবি জসিম উদ্দিন হল ১১। স্যার এ. এফ. রহমান হল ১২। শহীদ জিয়াউর রহমান হল, ১৩। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ১৪। স্যার ফিলিপ হার্টগ ইন্টারন্যাশনাল হল

 

ঃ স্যার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ছাত্র কি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন?

ঃ না, এ পর্যন্ত আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ এই সম্মানে ভূষিত হন নি। তবে আমাদের মনে অনেক আশা,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বাংলাদেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গ্রামীন ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডঃ মোহাম্মদ ইউনুস নোবেল পুরস্কার লাভ করবেন। এছাড়া, বরেণ্য পাকিস্তানী বিজ্ঞানী নোবেল বিজয়ী প্রফেসর সালাম একাধিকবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদধুলী দিয়েছিলেন। স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, জামাল আব্দুল নাসের ও কাজী নজরুল ইসলামের মত বিশ্বখ্যাত ব্যাক্তিদের  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী দিয়েছে।

ঃ আঙ্কেল, সত্যেন বোস কি এই ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিলেন না? (আমি প্রশ্ন করলাম)

ঃ না তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন না, তবে এখানকার শিক্ষক ছিলেন এবং এখানে থাকাকালীন সময়েই তিনি পৃথিবীখ্যাত বোস-আইনস্টাইন থিওরী আবিস্কার করেছিলেন, আরো আবিষ্কার করেছিলেন বিশেষ ধরণের কণিকা গ্রুপ, ‘বোসন’।

ঃ স্যার আপনাদের সমাবর্তন নাকি রেগুলার হয়না? (ইমতিয়াজ)

ঃ হুঁ, এই সমালোচনা করতে পারো। তারপরেও যা হয়েছে তা নিম্নরূপ।

আরেকটি কাগজ বাড়িয়ে দিলেন তিনি। আমরা আবার পড়লাম।

 

সমাবর্তন : পিছনে ফিরে দেখা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১৯২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত প্রতিবছরই (২৪ বার) সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ আমলের শেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৬ সালের ২১ নভেম্বর। পাকিস্তান আমলে ১৫ বার সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ এবং শেষবার সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালের ৮ মার্চ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর। এরপর ২০০১, ২০০৪, ২০০৭ ও ২০০৮, ২০০৯ সালে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়।

 

ঃ আঙ্কেল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য কে ছিলেন? (আমি প্রশ্ন করলাম)

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য পি. জে. হার্টগ তার কার্যভার গ্রহণ করেন। প্রস্তাবিত ঢাকা বিশ্ব্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে তাকে সাহায্য করেন মি. ডাব্লিউ হোরনেল, স্যার নীলরতন সরকার, স্যার আশুতোষ মুখপাধ্যায়, নবাব স্যার শামসুল হুদা ও নবাবজাদা খান বাহাদুর কে এম আফজাল। ১৯২১ সালে খান বাহাদুর নাজিরুদ্দীন আহমেদ প্রথম রেজিস্টার হিসেবে নিযুক্ত হন। বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগে মোট দশটি সিলেকশন কমিটি গঠন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম লাইব্রেরিয়ান হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকা কলেজে সাবেক অধ্যক্ষ মি এফ সি টার্নার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের উপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়। ঢাকা সিনিয়র মাদ্রাসার অধ্যক্ষ শামসুল ওলামা আবু নছর ওয়াহিদ অস্থায়ীভাবে ঐ বিভাগের প্রধান হন। তিনি একই সাথে ঢাকা মাদ্রাসার অধ্যক্ষের পদেও বহাল ছিলেন। পরে ঐ পদে ১৯২৪ সালের ১ জুলাই ড. আবদুস সাত্তার সিদ্দিকী যোগদান করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম স্বতন্ত্র সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগ খোলা হয়। এর আগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ছিলে ওরিয়েন্টাল ল্যাঙ্গুয়েজেস বিভাগের অন্তর্গত। সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের প্রথম অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ্যা বিশারদ, বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন ‘বৌদ্ধ গান ও দোহা’র আবিষ্কারক কলকাতা সংস্কৃত কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (সিআইই)। এ বিভাগের লেকচারার হিসেবে যোগদেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রথম কমপারেটিভ ফিললজি বা তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিভাগের প্রথম ছাত্র ও এম এ রিসার্চ এসিসটেন্ট মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও বিশিষ্ট লিপি বিশারদ শ্রী রাধাগোবিন্দ বসাক। ইতিহাস বিভাগে যোগদান করেছিলেন ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার ও এ এফ রহমান। পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন বিভাগে উপমহাদেশের বিশিষ্ট বিজ্ঞানীদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এদের মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ বসু, সুরেন্দ্রনাথ ঘোষের নাম উল্লেখযোগ্য। রসায়ন বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম প্রধান ছিলেন ড. জ্ঞানচন্দ্র। অধ্যাপক নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত প্রথম আইন বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯২১ সালের ১জুলাই ২৮ জন কলা, ১৭ জন বিজ্ঞান এবং ১৫ জন আইনের শিক্ষক নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। ইংরেজি, সংস্কৃত ও বাংলা, আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ, ফার্সি ও উর্দু, ইতিহাস, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, অঙ্ক বা গণিত, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন আইন এবং শিক্ষা এই ১২ টি বিভাগ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু করে। বিভিন্ন বিভাগের বিএ, বিএসসি ও অনার্স এবং এমএ ক্লাসে মোট ৮৭৭ জন ছাত্র নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু হয়। সকল ছাত্রকে কোন না কোন হলে আবাসিক বাস সংশ্লিষ্ট থাকতে হত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম তিন বছরের অনার্স চালু হয় যা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু ছিল দুইবছরের।এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মটো বা লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় Truth shall prevail অর্থাৎ সত্যের জয় সুনিশ্চিত।

 

ঃ আঙ্কেল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হয় কেন?

এবার হেসে ফেললেন, ডঃ জামান।

ঃ না মানে, এটা আক্ষরিক অর্থে নয়। সিম্বোলিক। একটা ক্যাচিং ওয়ার্ড বলতে পারো। তখন বৃটিশ শাসনামল চলছিল, সাহেবদের আমরা অনেক উঁচু দৃষ্টি দিয়ে দেখতাম। সেই সাহেবদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়  বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড  বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে পূর্ব বাংলায় একটা   বিশ্ববিদ্যালয়  প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এটা বোঝানোর একটা রাজনৈতিক চেষ্টা আরকি।

ঃ মানের দিক থেকে কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বখ্যাত নয়?

ঃ প্রশ্নই ওঠে না। অক্সফোর্ড তো দূর অস্ত, তার ধারে কাছেও নেই। এই কিছুদিন আগে একটা আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গিয়েছে, মানের দিক থেকে বিশ্বের ৫০০ টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও নেই আমাদের  বিশ্ববিদ্যালয়। আচ্ছা তোমরাই বলতো? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন গ্র্যাজুয়েট কোন অবদান রেখে বিশ্বে সাড়া ফেলে দিয়েছে?

ঃ কেন সত্যেন বোস, তাছাড়া শ্রীনিবাস কৃষ্ণাণ নামেও একজনার কথা শুনেছি।

ঃ হ্যাঁ তবে উনারা কেউই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট ছিলেন না, কেবল শিক্ষক ছিলেন। আমি অস্বীকার করব না যে বিজ্ঞানের বইয়ে তাদের নাম এসেছে। তবে তাদের কেউই নোবেল বিজয়ী নন। পক্ষান্তরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সাতাশ (২৭) জন গ্র্যাজুয়েট নোবেল বিজয়ী, তাছাড়া শিক্ষকদের মধ্যে থেকে পেয়েছেন চৌদ্দ (১৪) জন এবং আরো সাত জন নোবেল বিজয়ী হবার পর অক্সফোর্ড-এ কর্মরত ছিলেন। এখন তোমরা বল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি কোনভাবেই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তুলনীয়?

ঃ তাহলে এটা শুধুই বুলি? (আমীন)

ঃ একটা বিষয়ে মিল আছে। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন আবাসিক ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অক্সফোর্ডের মত আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। একটি বই নিয়ে একটা পাতা খুলে এগিয়ে দিলেন,

ঃ পড়

আমি পড়লাম

 

ক্যাম্পাস:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে শুরু থেকেই সুপরিকল্পিত ভাবে একটি আবাসিক বিম্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলা হয়। অধুনালিপ্ত পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশের রাজধানীর জন্য ঐতিহাসিক বাগ-এ-বাদশাহীতে গড়ে উঠেছিলো রমনীয় রমনা। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মনোলোভা দৃশ্যাবলী একদিকে যেমন ছিলো প্রগতিশীলতার ধারক, তেমনি তারুণ্যের উন্মত্ততাকে যেনো হাতছানি দিয়েছিলো এক উদাত্ত আহবানে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে কেন্দ্র করে তার পূর্ব পাশে অবস্থিত ঢাকা হল (বর্তমান শহীদুল্লাহ হল), লিটন হল, কার্জন হল, বিজ্ঞান ভবন সমূহ, ঢাকা হল এর পূর্ব পাশে বিরাট দীঘি, অপর পাশে ফজলুল হক মুসলিম হল। বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে প্রধান প্রবেশ পথ ছিলো ঢাকা হল (বর্তমান শহীদুল্লাহ হল)- এর দিক থেকে, মাঠে ঢুকতেই ডানে জিমনেসিয়াম আর বামে একটি পুকুর; বিশ্ববিদ্যালয় মাঠটি ত্রিকোণাকৃতি এবং তাতে দুটি ফুটবল গ্রাউন্ড ছিলো। মাঠের উত্তর দক্ষিণ পূর্ব তিনদিক দিয়েই বৃক্ষশোভিত রাজপথ প্রসারিত; বিশ্ববিদ্যালয় মাঠের দক্ষিণদিকের রাস্তাটি ইউকেলিপটাস শোভিত, যে রাস্তাটি মুসলিম হল পর্যন্ত সম্প্রসারিত এবং মুসলিম হলের সামনে শিরিষ বা রেইনট্রি জাতীয় বৃক্ষ শোভিত; পুরাতন রেললাইনের সঙ্গে সমান্তরাল সাবেক পূর্ববাংলা ও আসাম সরকারের সেক্রেটারিয়েট ভবন, সামনে ইউকেলিপটাস শোভিত প্রশস্ত রাজপথ এবং বিশ্ববিদ্যালয় ময়দান। ঐ সেক্রেটারিয়েট ভবনের দোতলায় প্রথমে মুসলিম হল এবং একতলায় বিজ্ঞান ছাড়া অন্যান্য বিভাগ বিশেষত কলা অনুষদের বিভাগ এবং ক্লাশরুম প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় এ বিশাল ভবনটির পূর্বাংশ ব্যাতীত সবটুকুই সামরিক হাসপাতালে এবং দেশবিভাগের পূর্বে মেডিকেল কলেজে রূপান্তরিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠের উত্তর দিকে প্রবাহিত রাজপথের পাশে ছিলো দুটি কি তিনটি বিরাট লাল ইটের দোতলা বাংলো, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরাই বাস করতেন। এ বাংলোগুলোর পেছনে রমনা রেসকোর্সের দিকে মুখ করে বর্ধমান হাউস ও তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষক নিবাস। দেশবিভাগের পরে যা হয়েছিলো, পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী প্রথমে খাজা নাজিমউদ্দিন এবং পরে নূরুল আমীনের বাসভবন। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের জয়লাভের পর ১৯৫৭ সালে একুশ দফার এক দফা অনুযায়ী বর্ধমান হাউস বাংলা একডেমীতে রূপান্তরিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় মাঠের ভেতরে সে কালে একটি পুকুর (উত্তর পূর্বকোণে) ছাড়াও একটি জঙ্গলাকীর্ণ পুরাতন কবরস্থান ছিলো, যা এখন নেই।

 

আবাসিক পরিবেশ:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  হলগুলো শুধু ছাত্রাবাস রুপেই নয় সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রদের শিক্ষা, সমাজ ও সাংস্কৃতিক জীবনে উপযুক্তভাবে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা ও অনুশীলন কেন্দ্ররূপেও পরিকল্পিত হয়েছিল। পরিকল্পনায় ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষক কোন না কোন হলের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন, ছাত্রদের উপদেষ্টারুপে এবং অনুশীলনী ক্লাস নিবেন। প্রত্যেকটি হলকে চারটি হাউসে বিভক্ত করা হয়েছিল চারশত ছাত্রের জন্য আর প্রতি পঁচাত্তরজন ছাত্রের তত্ত্ববধানের জন্য একজন করে আবাসিক শিক্ষক বা হাউস টিউটরের ব্যবস্থা ছিল। হিন্দু ছাত্রদের জন্য জগন্নাথ হল, মুসলমান ছাত্রদের জন্য সলিমুল্লাহ মুসলিম হল আর সবধর্মের ছাত্রদের জন্য ঢাকা হল স্থাপিত হয়েছিল।

 

ঢাকা হলের প্রথম প্রভোস্ট ছিলেন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ এফ. সি. সি. টার্নার। শুরুতে একমাত্র ঢাকা হলেরই নিজস্ব ভবনে ছিল; কার্জন হল মিলনায়তনটি তার অধিকারভুক্ত ছিল সে কারণে একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের শিক্ষা বহির্ভূত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে ঢাকা হল ছাত্র সংসদের ভূমিকা ছিল অগ্রগন্য। দেশ বিভাগের পর ঢাকা হলই ছিল প্রগতিশীল বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের সূতিকাগার, ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলন মহান গণঅভ্যুত্থানে পরিনত হয়েছিল ঢাকা হলের প্রগতিশীল ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামানের শাহাদাতের বিনিময়ে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু মুসলিম ছাত্রদের জন্য স্থাপিত প্রথম হল “সলিমুল্লাহ মুসলিম হল”। এ হলের প্রথম প্রোভস্ট নিযুক্ত হন ইতিহাস বিভাগের রিডার স্যার এ এফ রাহমান। ১৯২৯ সালের ২২ আগস্ট বাংলার গভর্ণর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর স্যার স্ট্যানলি জ্যাকসন ঢাকার প্রয়াত নবাব বাহাদুর স্যার সলিমুল্লাহ্‌র নামানুসারে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের’ এর ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন করেন। ১৯৩১-৩২ শিক্ষাবর্ষে এর ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়।

 

জগন্নাথ হলের নামকরণ হয় ঢাকার বলিয়াদির জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরীর দানে তার পিতা জগন্নাথ রায় চৌধুরীর নামে। জগন্নাথ রায় চৌধুরীর নামেই ঢাকার জগন্নাথ কলেজের নামকরণ করা হয়েছিল। জগন্নাথ হলের প্রথম প্রভোস্ট ছিলের আইন বিভাগের প্রথম অধ্যাপক নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত। অধ্যাপক নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তের উৎসাহে জগন্নাথ হলের প্রথম বার্ষিক সাহিত্যপত্র ‘বাসন্তিকা’ ১৯২৩ সালের প্রথম প্রকাশিত হয়। নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তের পর প্রভোস্ট হন ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার।

 

প্রতিষ্ঠালগ্নে ঢাকা সমাজের রক্ষণশীলতার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাত্রী ভর্তির ব্যাপারে খুব দ্বিধান্বিত ছিলেন। কিন্তু কলকাতা বেথুন কলেজের গ্রাজুয়েট লীলা নাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যাপারে ছিলেন নাছোড়বান্দা। ১৯২১ সালে লীলা নাগ ইংরেজিতে এমএ ক্লাসে ভর্তি হন এবং ১৯২৩ সালের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এমএ ডিগ্রিধারী হিসেবে বের হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ছাত্রী সুষমা সেনগুপ্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম ছাত্রী ছিলেন গণিত বিভাগের ফজিলতুন্নেসা। ধীরে ধীরে ছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলে ছাত্রী হোস্টেলের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এই উদ্দেশে ১৯২৬ সালের ২৮ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ নং বাংলো ‘চামেরি হাউস’-এ (বর্তমানে সিরডাপ ভবন) প্রথম উইমেনস হাউস প্রতিষ্ঠা করা হয়। উইমেনস হাউস মাত্র তিন জন ছাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করে। মিসেস পি. নাগ এই হাউসের হাউস টিউটর নিযুক্ত হন। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত উইমেনস হাউস চামেরি হাউসে ছিল পরে ১৯২৮ সালে তা ১০ নং বাংলোতে (বর্তমানে এস্থানে বিজ্ঞান গ্রন্থাগার অবস্থিত) স্থানান্তরিত হয়। ঐ সময় চামেরি বাংলোটিকে মুসলিম হলের এক্সটেনশন করা হয়। পরবর্তীকালে যে কোন বাংলোতেই হোক না কেন তাকে “চামেরি হাউস” বলে ডাকা হত। ১৯৩৮ সালে মেয়েদের হোস্টেল পুনরায় চামেরি হাউসে নিয়ে যাওয়া হয়।

 

১৯৪০ সালের ১ জুলাই অবিভক্ত বাংলার তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী এ. কে. ফজলুক হকের নামানুসারে “ফজলুল হক মুসলিম হল” প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ভবনের (বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ) যে অংশে সলিমুল্লাহ হলের বর্ধিতাংশ ছিল সেখানে ফজলুল হক হল যাত্রা শুরু করে। ১৯৪২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ভবনে সামরিক হাসপাতাল স্থাপিত হলে ১৯৪৩ সালে ফজলুল হক হল বর্তমান অবস্থানে স্থানান্তরিত হয়, পূর্বে যা ছিল ঢাকা ইন্টারমেডিয়েট কলেজ হোস্টেল। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ফজলুল হক হলের প্রথম প্রভোস্ট আর প্রথম দুইজন হাউস টিউটর কাজী মোতাহার হোসেন এবং আব্দুস সামাদ।

 

ঃ বাহ্‌ অনেক কিছু জানলাম স্যার !(খুশী মনে বলল মোস্তাহিদ)

ঃ আবাসিক, হওয়াতে তো খুব উপকার হয়েছে ছাত্রছাত্রীদের। (আমি বললাম)

একটু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন ডঃ  জামান

ঃ হ্যাঁ, উপকারের জন্যই তো আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু এক শ্রেণীর অসাধু রাজনীতিবিদরা এটাকেই আবার তাদের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করল। এখন তো আমরা তাদের হাতে জিম্মী!

 

আমরা একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। এমন একজন হাইলি কোয়ালিফাইড, জ্ঞানের প্রতিভূ ব্যাক্তিকে অর্ধশিক্ষিত-অশিক্ষিত চোঙা ফোকানো রাজনীতিবিদদের কাছে খুব অসহায় মনে হলো।

ঃ স্যার, শুনেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠায় অনেক প্রতিবন্ধকতা হয়েছিল। (ইমতিয়াজ)

ঃ খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও নাকি বিরোধিতা করেছিলেন? (মোস্তাহিদ)

ঃ হ্যাঁ, অনেক প্রতিবন্ধকতা হয়েছিল। সে সময় পূর্ব বঙ্গে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। পূর্ব বঙ্গ মুসলমান অধ্যূষিত বলে পূর্ব বঙ্গের মুসলমানদের জন্য উচ্চ শিক্ষার দরোজা খুলে যাওয়ার সুযোগ ঘটে। পাশাপাশি পূর্ববঙ্গের অন্যান্য ধর্মের লোকজনের জন্যও এটা বড় সুযোগ সৃষ্টি হয়। সকলেই এই প্রস্তাবটি স্বাগত জানায়। সকলেই সহযোগিতার হাত বাড়ায়।

এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার বিরোধিতাও সে সময় কিছু লোকজন করেছিলেন। এই বিরোধিতাকারীদের মধ্য ছিলেন মুসলমান ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গ ছিলেন।  বিরোধিতা করেছিলেন তিন ধরনের লোকজন–

এক. পশ্চিমবঙ্গের কিছু মুসলমান–তারা মনে করেছিলেন, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হলে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের কোনো লাভ নেই। পূর্ববঙ্গের মুসলমানদেরই লাভ হবে। তাদের জন্য ঢাকায় নয় পশ্চিমবঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় হওয়াটাই লাভজনক।

দুই. পূর্ব বাংলার কিছু মুসলমান–তারা মনে করেছিলেন, পূর্ব বঙ্গের মুসলমানদের মধ্যে ১০০০০ জনের মধ্যে ১ জন মাত্র স্কুল পর্যায়ে পাশ করতে পারে। কলেজ পর্যায়ে তাদের ছাত্র সংখ্যা খুবই কম। বিশ্ববিদ্যালয় হলে সেখানে মুসলমান ছাত্রদের সংখ্যা খুবই কম হবে।

পূর্ববঙ্গে প্রাইমারী এবং হাইস্কুল হলে সেখানে পড়াশুনা করে মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার হার বাড়বে। আগে সেটা দরকার। এবং যদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে মুসলমানদের জন্য যে সরকারী বাজেট বরাদ্দ আছে তা বিশ্ববিদ্যালয়েই ব্যয় হয়ে যাবে। নতুন করে প্রাইমারী বা হাইস্কুল হবে না। যেগুলো আছে সেগুলোও অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। সেজন্য তারা বিশ্ববিদ্যালয় চান নি।

তিন. পশ্চিমবঙ্গের কিছু হিন্দু মনে করেছিলেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বরাদ্দ কমে যাবে। সুতরাং কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় চলবে কীভাবে? এই ভয়েই তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। তাছাড়া উগ্রপন্থী হিন্দুরা ক্ষিপ্ত হয়েছিল ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় এগিয়ে যাবে বলে। তারা যেয়েছিল এই উপমহাদেশে উচ্চ বর্ণীয় হিন্দুদের চিরস্থায়ী ডোমিনেশন প্রতিষ্ঠা করতে।

মৌলানা আকরাম খান আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অর্থ বরাদ্দ করলে সাধারণ মুসলমানদের শিক্ষা সংক্রান্ত বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দানের ক্ষেত্রে অর্থের ব্যবস্থা করবেন না। মুসলমানদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা অপেক্ষা প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি (প্রাথমিক ও মাধ্যমিক) শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার উপর তিনি গুরুত্ত্ব আরোপ করেন। আবদুর রসুল আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় মুসলমানদের পক্ষে ‘বিলাসিতা’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। তার মতে কয়েকজন ভাগ্যবানের জন্য অর্থ ব্যয় না করে বেশিরভাগ মানুষের জন্য তা ব্যয় করা উচিৎ। মুসলমানদের মতে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয় হবে একটি অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান, ফলে বাংলার মুসলমানদের বিশেষ কিছু লাভ হবে না। বরং গরীব অথবা যোগ্য মুসলমান ছাত্রদের বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা এবং দু-একটি প্রথম শ্রেণীর কলেজ স্থাপন ইত্যাদি করলে মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তার সম্ভব হবে। চব্বিশ পরগণার জেলা মহামেডান এসোসিয়েশন ১৯১২-র ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যায় স্থাপনের বিরোধিতা করে।

হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু লোকজনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন সে সময়ে। ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ তার ঢাকা সফর শেষে কলকাতা প্রত্যাবর্তন করলে ১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ড. রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল তার সাথে সাক্ষাৎ এবং ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতামূলক একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বিরোধী ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় আর রাজনীতিক সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী। ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কী মূল্যে অর্থাৎ কিসের বিনিময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা থেকে বিরত থাকবেন? শেষ পর্যন্ত স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চারটি নতুন অধ্যাপক পদ সৃষ্টির বিনিময়ে তার বিরোধিতার অবসান করেছিলেন।  ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার তার আত্মস্মৃতিতে লিখেছিলেন ১৯১৯ সালের নতুন আইন অনুসারে বাংলার শিক্ষামন্ত্রী প্রভাসচন্দ্র মিত্র শিক্ষকদের বেতন কমানোর নির্দেশ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয প্রতিষ্ঠার সময় রিজার্ভ ফান্ডে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা ছিল। বাংলা সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রদত্ত সরকারী ভবন বাবদ সেগুলো কেটে নেয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রতিবছর মাত্র পাঁচ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করে। ফলে শিক্ষকদের বেতন কমিয়ে দিতে হয়।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় পূর্ব বঙ্গের বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও শিক্ষাবিদ নানাপ্রকার প্রতিকুলতা অতিক্রম করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য ঢাকার নবাব নবাব স্যার সলিমুল্লাহ। কিন্তু, হঠাৎ করে ১৯১৫ সালে নবাব সলিমুল্লাহের মৃত্যু ঘটলে নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী শক্ত হাতে এই উদ্দ্যেগের হাল ধরেন। অন্যান্যদের মধ্যে আবুল কাশেম ফজলুল হক উল্লেখযোগ্য।

ঃ স্যার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন এ কথা কি সত্য?

ঃ দেখ, আমি ইতিহাসের অধ্যাপক তথ্য উপাত্ত ছাড়া কথা বলা আমার পক্ষে সম্ভব না। আর কোন শিক্ষিত মানুষেরই উচিৎ হবে না সেটা করা। আমি নিজে যেহেতু সেই সময়টায় ছিলাম না তাই শুধু বলব বইপত্রে কি পেয়েছি।

ঃ স্যার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘প্রথম আলো’-তে লেখা আছে যে,  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। (ইমতিয়াজ বলল)

ঃ ‘প্রথম আলো’ ইতিহাস বই নয় উপন্যাস, আর সুনীলও কোন  ইতিহাসবিদ নন। (ইমতিয়াজকে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করল আমীন)

ঃ তুই থাম না। স্যার বলুক। (বিরক্ত হয়ে বলল মোস্তাহিদ)

ঃ আচ্ছা শোন।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ ধরনের একটি অভিযোগ বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। অনেকে বলেন যে, ”১৯১২ সালের ২৮শে মার্চ কলিকাতা গড়ের মাঠে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়।”  অনেকে আবার এই অভিযোগটির বিরোধিতা করেন। তারা বলেন ঐ তারিখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোলকাতায়ই উপস্থিত ছিলেন না এবং তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেন নাই। করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরের মধ্যেই ভাষণ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ করা হত না। ১৯৩৬ সালে তাকে ডিলিট উপাধী প্রদানের বিষয়েও বিরোধিতা হত। বরং তাঁকে দুবারই মুসলমান-হিন্দু সকল শ্রেণীর ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান আন্তরিকভাবে  সম্মাননা প্রদান করেছে। সর্বোপরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার সংবাদাদি সে সময়কার পত্রিপত্রিকায় পাওয়া যায়। কোথাও রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার কোনো অভিযোগ পাওয়া যায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেছেন প্রফেসর রফিকুল ইসলাম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশি বছর নামে বই লিখেছেন। সেই বইয়ের কোথাও রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায় না।  আবার অনেকে বলেন ”রবীন্দ্রনাথ একসময় বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে বিরোধী ছিলেন….কিন্তু….চারপাঁচ বছর পর তার পুরানো পজিশন পরিবর্তন করে ফেলেছিলেন। ….অবশ্যই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে গ্রহণ করেছেন বলে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মাননায় এসেছিলেন।

আবার অনেকে বলছেন, ‘১৯১২ সালের ২৮শে মার্চ গড়ের মাঠে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠার বিরুদ্ধে হিন্দুরা প্রতিবাদ সভা ডাকে। প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ। কারণ তিনি ছিলেন জমিদার। তিনি মুসলমান প্রজাদের মনে করতেন লাইভ স্টক বা গৃহপালিত পশু’( শ্রী নীরদ চৌধুরী, দি অটোবায়োগ্রাফী অব এ্যান আননোন ইন্ডিয়ান)।

১৯১২ সালে ১৬ই ফেব্রুয়ারী বড় লাটের সাথে বর্ধমানের স্যার রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিমন্ডলী সাক্ষাত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্ঠা না করার পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করেন।( রিপোর্ট অব দি ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি কমিশন) এছাড়া রমেশ চন্দ্র মজুমদার-এর ‘জীবনের স্মৃতিদ্বীপে’ গ্রন্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা সম্পর্কে বলা আছে।

ঃ এখান থেকে আমরা কি সিদ্ধান্ত নিতে পারি স্যার?

ঃ বলা মুশকিল, বইপত্রে দুরকমই তো পাচ্ছি।

ঃ স্যার মহান মুক্তিযুদ্ধে তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক অবদান তাইনা?

ঃ অবশ্যই, (আমি বললাম)

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একাত্তরে পাকিস্তান সশস্ত্রবাহিনী বাঙালি সৈনিক, বৈমানিক ও ছাত্রছাত্রীগনকে একই পর্যায়ভুক্ত করে আক্রমণ চালিয়েছিল। এই অপারেশনের নাম ছিল “অপারেশন সার্চ লাইট”। এইচ আওয়ার নির্ধারিত হয়েছিল ২৬ মার্চ রাত ১ টা। ক্যান্টনমেন্ট থেকে সেনাবাহিনী প্রথম প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় ফার্মগেটে। রাস্তায় পড়ে থাকা একটি বিশাল গাছ বাহিনীর গতিরোধ করে, রাস্তার পাশের এলাকা পুরানো গাড়ি আর স্টিম রোলার দিয়ে বন্ধ ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলের ছাত্ররা হলের সামনে একটি বড় গাছের গুড়ি ফেলে রেখে সেনাবাহিনীকে বাধাঁ দেয়। সকাল ৪টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ভবন গুলো দখল করে নেয় তারা। ১৮ নং পাঞ্জাব, ২২ নং বেলুচ এবং ৩২ নং পাঞ্জাব রেজিমেন্টের বিভিন্ন ব্যাটেলিয়ন নিয়ে গঠিত বিশেষ মোবাইল বাহিনী লেফটেনেন্ট কর্ণেল তাজের নেতৃত্বে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, ট্যাংক বিধ্বংসী বিকয়েললেস রাইফেল, রকেট লাঞ্চার, মর্টার, ভারি ও হাল্কা মেশিনগানে সজ্জিত হয়ে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ২৭ মার্চ সকাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ঘেরাও করে আক্রমন, পাইকারি হত্যা, লুন্ঠন, অগ্নিসংযোগ এবং ধ্বংস যজ্ঞ চালায়। ঐ রাতে দৈবক্রমে পাকিস্তানী আক্রমণ থেকে বেঁচে যাওয়া অধ্যাপক ড. মফিজুল্লাহ্ কবির তার ১৯৭১-৭২ সালের বার্ষিক রিপোর্টে লেখেন, ঐ রাতে ছাত্র সহ প্রায় ৩০০ ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিহত হয়। সেই সাথে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষক ও ২৬ জন অন্যান্য কর্মচারী। নিহত শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন, ড. ফজলুর রহমান (মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ), অধ্যাপক এ. আর. খান খাদিম (গণিত বিভাগ), অধ্যাপক শরাফত আলী, ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব (প্রাক্তন প্রোভস্ট জগন্নাথ হল), অধ্যাপক মনিরুজ্জামান, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা (প্রোভস্ট জগন্নাথ হল), অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য, অধ্যাপক মুহম্মদ মুকতাদির (ভূতত্ত্ব) প্রমুখ। সবচেয়ে নারকীয় ঘটনা ঘটে জগন্নাথ হলে, সেই রাতে ৩৪ জন ছাত্র শুধু সেই হলেই নিহত হয়। ২৬ মার্চ রমনা কালীবাড়িও আক্রান্ত হয়। সেস্থলে নিহত হয় জগন্নাথ হলের ৫/৬ জন ছাত্র। হানাদার বাহিনী হত্যা করে মধুর ক্যান্টিন খ্যাত মধুসূদন দে’কেও (মধুদা)। মুক্তিযুদ্ধ কালীন পাকিস্তানী সৈন্যরা মুধুর ক্যান্টিন ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিতে শুরু করলে উর্দু বিভাগের শিক্ষক আফতাব আহমদ সিদ্দিকী খবর পেয়ে তাদের বাধাঁ দেন এবং জানান যে এই ভবনেই ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১০ নভেম্বর সশস্ত্র সৈন্যরা রোকেয়া হলে প্রবেশ করে এবং ত্রিশজন ছাত্রীর উপর নির্যাতন করে। তারা প্রোভোস্ট বাংলোও অবরোধ করে রাখে।

 

একাত্তরের মার্চ মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের অধিবেশনে যোগদানের জন্য জেনেভা যান। সেখানে জেনেভার একটি পত্রিকায় দু’জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের মৃত্যু সংবাদ দেখে বিচলিত হয়ে ২৫ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক শিক্ষা সচিবকে পাকিস্তান দূতাবাসের মাধ্যমে প্রেরিত এক পত্রে লেখেন, “আমার নিরস্ত্র ছাত্রদের উপর গুলি চালানোর পর আমার ভাইস চ্যান্সেলর থাকার কোন যুক্তিসংগত কারণ নেই। তাই আমি পদত্যাগ করলাম”। ফলে মার্চের সেই কালরাত্রীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল উপাচার্য বিহীন। পরে মুজিবনগর সরকার বিচারপতি সাঈদকে “প্রবাসী সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি” হিসেবে নিয়োগ দেয়। পাকিস্তান বাহিনী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েনকে তাদের কনভয়ে করে ঢাকায় নিয়ে এসে ১৯ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদে বসান। তাকে সহায়তা করেন ড. হাসান জামান, ড. মেহের আলি। স্বাধীনতার পর তিনজনই গ্রেফতার হন এবং মুক্তির পর দেশ ত্যাগ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য ছাত্রছাত্রী মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। এদের অনেকেই পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর যান এবং প্রবাসী সরকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাবার পরে টিক্কা খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগীয় প্রধানদের ২১ এপ্রিল ও সকল শিক্ষকদের ১ জুন কাজে যোগ দিতে বলেন। টিক্কা খান ২ আগস্ট থেকে সকল ক্লাস চালু করারও আদেশ জারি করেন। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে কয়েকজন শিক্ষককে গ্রেফতার করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দী করা হয় এবং ইন্টারোগেশনের মাধ্যমে নির্যাতন করা হয়। এদের মধ্যে ছিলেন ড. আবুল খায়ের, ড. রফিকুল ইসলাম, কে এ এম সাদউদ্দিন, আহসানুল হক এবং এম শহীদুল্লাহ। টিক্কা খান অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, ড. নীলিমা ইব্রাহিম, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. এনামুল হককে লিখিত ভাবে সতর্ক করে দেন। ড. আবু মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহকে পদচ্যুত করা হয়।

ঃ মহান মুক্তিযুদ্ধে এদেশের কোটি-কোটি মানুষের অবদান রয়েছে। যেই সৈনিক বিদ্রোহ করে সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে এলেন তার যেমন অবদান আছে, আবার যেই ছাত্র বা কিষাণের ছেলে গভীর রাতে মায়ের চোখ এড়িয়ে পালিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিল তারও অবদান আছে, যেই রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবিরা অর্গানাইজার হিসাবে কাজ করেছেন তারাও কৃতিত্বের দাবীদার, যেই গৃহবধু ভাত রেধে মুক্তিযোদ্ধাদের খাইয়েছে তিনিও কম কৃতিত্ব দেখাননি। আমার মুক্তিযুদ্ধকালীন একটা স্মৃতি মনে পড়ে। একটি গ্রামে গিয়েছি আমরা অপারেশনে। গভীর রাতে এক কৃষকের বাড়ীতে আমাদের আশ্রয় হলো। তার আট বছরের ছোট শিশুটি মায়ের পাশে পাশে আমাদের থালা এগিয়ে দিচ্ছে, পানির গ্লাস এগিয়ে দিচ্ছে, মাকে বলছে, “মা উনারে আরেকটু ভাত দাও”। তারপর আমার পাশঘেষে বসে আমার অস্ত্রটিতে হাত দিয়ে বলে, “অনেক ভার উডাইতে পারমু না। আমি যদি বড় থাকতাম এইডা লইয়া আপনেগো লগে যুদ্ধে যাইতাম।”

তোমরাই বল, এই শিশুটি কি মুক্তিযোদ্ধা নয়?

ঃ স্যার আপনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন? (মোস্তাহিদ)

ঃ ছিলাম তো। ঘটা করে বলতে ভালো লাগেনা। আমি দেশের প্রতি আমার দায়িত্ব পালন করেছিলাম মাত্র। এই নিয়ে অহংকার করতে চাইনা।

আমরা লক্ষ্য করলাম স্যারের চোখের কোনে অশ্রু চিকচিক করছে।

ঃ আঙ্কেল ঐ শিশুটিকে আর দেখেছিলেন? (আমি প্রশ্ন করলাম)

ঃ হ্যাঁ, দেখেছি। ওদের সাথে আমি যোগাযোগ রেখেছিলাম। ছেলেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তো পাশ করল রিসেন্টলি। খুব ভালো রেজাল্ট করেছে। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনেও তার ভূমিকা প্রশংসনীয়। আমাকে প্রায়ই বলত, “স্যার, বয়সের কারণে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে পারিনাই, কিন্তু স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নিজেকে উজাড় করে দেব।”

 

এই কথা ও কাহিনী শুনে আমাদের সবার মধ্যে গভীর আবেগের সঞ্চার হলো।

 

ডঃ জামানের রুম থেকে যখন বেরিয়ে আসছিলাম। আমাদের সবার মনে মনে একটি কথাই ভাসছিল, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মানেই অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো’।

 

ঃ চল বাড়ী চলে যাই। (আমীন)

ঃ না ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেড়াতে এসে একটা জায়গায় না গেলে, বেড়ানোটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। (আমি)

ঃ কোথায়?

ঃ কাজী নজরুল ইসলামের মাজারটা জেয়ারত করা উচিৎ।

ঃ গুড আইডিয়া, গুড প্রপোজাল। (মোস্তাহিদ)

ঃ ঠিক রোমান এখানে এসে জাতীয় কবির মাজারটা অবশ্যই জেয়ারত করা প্রয়োজন। (ইমতিয়াজ)

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়নাভিরাম বিশাল মসজিদের পাশ দিয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম বিদ্রোহী কবির মাজারের দিকে। যেতে যেতে মনে মনে আমাদের কানে বাজছিল কবির গান, ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই, যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জীনের আযান শুনতে পাই।’ ধর্মভীরু পরহেজগার পিতার সন্তান দুঃখু মিয়ার অনুরোধ দেশের মানুষ রেখেছে। ঢাকার সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ মসজিদের পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়েছে।

 

ছোট্ট ছিমছাম কবরস্থানে শিল্পাচার্য জয়নূল আবেদীনসহ অনেক খ্যাতিমান ব্যাক্তিই শায়িত আছেন। ঠিক মাঝামাঝি লাল সিরামিকের ইট দিয়ে বাধানো বেশ কয়েকটি ধাপে উঁচু হয়ে যাওয়া কবরটির ভিতর শায়িত আছেন আমাদের প্রানের কবি কাজী নজরুল ইসলাম। মনে হয় যেন এই কবরগাহের হেলাল তিনি, আর তাকে ঘিরে ফুটে আছেন অনেক উজ্জ্বল সিতারা।

 

কবরের সামনে দাঁড়িয়ে মোস্তাহিদের নেতৃত্বে আমরা দোয়া পড়লাম। দোয়ার এক পর্যায়ে মোস্তাহিদ কবিরই একটি কবিতার লাইন পড়ল, ‘হে আল্লাহ্‌ করোনা বিচার, আল্লাহ্‌ করোনা বিচার, বিচার চাইনা, চাই আল্লাহ্‌ করুনা তোমার।’ দোয়া শেষে মোস্তাহিদ বলল, ” বীর সৈনিক, অকুতোভয় দেশপ্রেমিক, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের পথিকৃত ও অনন্যসাধারণ প্রতিভা আমাদের প্রানের কবি তোমায় সালাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্রছাত্রিদের জন্য এই কবির কবরটি সব চাইতে বড় অনুপ্রেরনা।”

আমাদের সকলের মনে তখন বাজছিল কবির লেখা কবিতার লাইন,

বল বীর, চির উন্নত মম শীর

 

(এই পর্বটি লিখতে গিয়ে আমি উইকিপিডিয়া সহ বিভিন্ন ইন্টারনেট সোর্সের সাহায্য নিয়েছি। এছাড়া আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক  প্রখ্যাত সাহিত্য গবেষক, কবি ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক রফিক কায়সারের কাছ থেকেও অনেক তথ্য সংগ্রহ করেছি। স্যারকে ও অন্যান্য সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ।)

 

উৎসর্গঃ আজ ১৪ই ডিসেম্বর ২০১২ শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস। আমার শ্রদ্ধেয় চাচা শহীদ বুদ্ধিজীবি ডঃ ফজলুর রহমান সহ সকল শহীদ বুদ্ধিজীবিদেরকে এই পর্বটি উৎসর্গ করলাম।

 

 

 

৫১২ বার দেখা হয়েছে

২ টি মন্তব্য : “লিস্টনিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ ১২”

  1. হায়দার (৯২-৯৮)

    রমিত ভাই,
    একটা ছোট টেকনিকাল ভুল পেলাম এই পর্বে।
    আপনার উপন্যাসটি যেহেতু সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও পতন পরবর্তী সময়ের উপর ভিত্তি করে, কাজেই এই পর্বের ঘটনা সম্ভবত আশির দশকের শেষ দিকের।

    ড: জামানের সাথে কথোপকথনের সময়ে লিখেছেন,
    " বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর। এরপর ২০০১, ২০০৪, ২০০৭ ও ২০০৮, ২০০৯ সালে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়।"

    এই অংশটুকু ফুটনোট আকারে (ব্রাকেটে অথবা পুনশ্চ: বা অন্য কোন আকারে) দিলে মনে হয় ভালো হবে।

    (অফ টপিক, আপনার এই সিরিজটা থেকে অনেক ঐতিহাসিক তথ্য জানতে পারছি। আপনাকে ধন্যবাদ।)

    জবাব দিন
  2. ড. রমিত আজাদ (৮২-৮৮)

    অনেক ধন্যবাদ হায়দার। এটা বড় ধরনের ভুল হয়েছে। আমার চোখ এড়িয়ে গিয়েছে। ধরিয়ে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। আমি কারেকশন করে নেব।
    আসলে উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে ব্লগে দেয়ার উদ্দেশ্যই এটা, যাতে পাঠকরা আমার দোষ-ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দিতে পারে।

    সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন রাজনীতির সাথে আমাদের দেশের একটা অংশের মানুষের (মূলত: ছাত্রসমাজ ও মধ্যবিত্ত ) চিন্তা-চেতনার গভীর সম্পর্ক ছিল। তাই 'রোমানের' সোভিয়েত ইউনিয়নে যাওয়ার আগের সময়টার বর্ণনা দীর্ঘ করতে হচ্ছে।

    মনোযোগ দিয়ে পড়ার জন্য ধন্যবাদ হায়দার।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।