লিস্ট্নিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ – পর্ব ৫

লিস্ট্নিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ – পর্ব ৫
——————————ডঃ রমিত আজাদ

 

আমার এক চাচাতো বোন আছে , ওর নাম লাবনী। চাচা আব্বার ছোট ভাই। খুব ধনী এবং খুব তিরিক্ষি মেজাজের মানুষ। আব্বা শান্তশিষ্ট মানুষ, তিরিক্ষি মেজাজের মানুষের সাথে তার বনিবনা হয়না। তাই চাচার সাথে তার সদ্ভাব নাই। আসলে আব্বা চাচাকে খুব ভালোবাসেন, বলেন, “ছোট্ট ভাইটাকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি, কিন্তু ওর ঐ তিরিক্ষি মেজাজের কারণেই ওর সাথে ডিসটেন্স মেইনটেইন করতে হয়।” চাচার দুই মেয়ের মধ্যে ছোটটি লাবনী। আমার চাইতে তিন বৎসরের ছোট। ওর সাথে আমার একটা মধুর সম্পর্ক আছে। এটাকে কি প্রেম বলব? জানিনা। মুখ ফুটে তো কখনো কেউ কাউকে কিছু বলিনি। কথা যা হয়েছে সব তো চোখের ভাষাতেই হয়েছে। কথা বলাবলির খুব বেশী সুযোগ আমরা পাইওনি, এই জীবনে। আব্বা-চাচার বনিবনা না থাকায় ওদের বাড়িতে আমার বা আমাদের বাড়ীতে ওর যাওয়া আসা হয়না। ওর সাথে আমার দেখা হতো আমাদের অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের বাসায়। সেও কালে ভদ্রে, ঈদ বা শবেবরাত এই জাতীয় দিনগুলোতে। তাও গত ঈদে দেখাই হয়নি। আমি যদিও উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করেছিলাম।

 

 

কোন একটা বইয়ে পড়েছিলাম, ফ্রান্সে প্রেম মানে হাস্যরসের বিষয়। ইল্যাংন্ডে প্রেম খুব সিরিয়াস ব্যাপার। আর আমাদের উপমহাদেশে প্রেম একটা ভয়ের ব্যাপার। প্রেমিক-প্রেমিকা সব সময়ই ভয়ে ভয়ে থাকে, যদি কেউ দেখে ফেলে, যদি কেউ জেনে যায়! আমিও তাই লাবনীর ব্যাপারে খুব সাবধান থাকতাম।

 

 

কিশোর বয়েসে আমি একটা পেইন্টিং দেখেছিলাম – একটি যুগল সমুদ্র সৈকতে হেটে বেড়াচ্ছে। সেই চিরন্তন নারী ও পুরুষ। নারীটির পড়নে চমৎকার একটি নীল শাড়ী। নীল সাগরের তীরে নীল শাড়ী পড়া রমনীটিকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল। মনে হচ্ছিল যেন সাগরের নীল আর শাড়ীর নীল মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। সেই থেকে আমি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম যে, আমার প্রিয়তমাও এমনি নীল শাড়ি পড়ে আমার হাত ধরে নীল সাগরের তীরে হেটে বেড়াচ্ছে।

 

 

বিকাল বেলাটায় মাঝে মাঝে ছাদে বসে সময় কাটাতাম। আমাদের ছয়তলা ভবনের ছাদ থেকে আশেপাশের দৃশ্য ভালোই লাগত। উপর থেকে পৃথিবীটাকে খুব সুন্দর মনে হয়। সামান্য দূরে প্রকান্ড একটা উঁচুতলা বিল্ডিং নজরে পড়ত। ভালো করে নজর দিয়ে দেখেছি, ওখানে বিদেশীরা থাকে। বিল্ডিংটা খুব সুন্দর, প্রতিটি ফ্লোরে কয়েকটি করে এ্যপার্টমেন্ট। দূর থেকে ভালো দেখা না গেলেও মোটামুটি বোঝা যেত যে, সেই এ্যপার্টমেন্টগুলো খুব পরিপাটি। বিল্ডিংটার সামনে একটা সুইমিং পুল আছে।  বড় আপাকে বললাম বিল্ডিংটার কথা। আপা বললেন ওটা ‘রাশান ট্রেড হাউস’। ও আচ্ছা, তাহলে ওরা রাশান। আমরা সাদা চামড়া দেখলে ইউজুয়ালী আমেরিকান বা বৃটিশ মনে করতাম। আসলে তো পুরো ইউরোপের মানুষই শ্বেতাঙ্গ।

 

ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সামনে দিয়ে ছুটির সময়টায় যাইনা। আগেই বলেছি বখাটেরা ঐ সময় স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। আমাকে ওখানে দেখলেই লোকে ভাববে, মেয়েদের দেখার জন্য দাঁড়িয়ে আছি। একদিন মা বললেন

ঃ যা, বার্গার কিনে নিয়ে আয়। বিকেলের নাস্তায় খাব।

বার্গার কাছেপিঠে পাওয়া যায় বেইলী রোডে। ওখানে যেতে হলে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সামনে দিয়েই যেতে হবে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম এখন স্কুল ছুটির সময়। তাছাড়া ঐ সময়টায় ঐ রাস্টায় প্রচন্ড জ্যাম হয়। গাড়ীর প্যাঁ-পুঁ হর্ন আমাদের বাসা থেকেই সোনা যায়। মিনিট পনের যাবৎ এই হর্ণও শুনতে পাচ্ছিলাম। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে ছুটির সময়। এখন ঐ পথ দিয়ে যাওয়া ঠিক হবেনা। মাকে বললাম

ঃ পরে গেলে হয়না?

ঃ পরে আবার কখন? এখনই সময়, যা।

মায়ের আদেশ। কি আর করা? টাকা নিয়ে বের হলাম। পথের মধ্যে গাড়ী, রিকসা, যানবাহনে ভরে বিশাল জ্যাম। পুরণো ঢাকা বাদ দিলে, ঢাকা শহরের অন্যান্য রাস্তা তো একরকম ফাঁকাই থাকে। কিন্তু স্কুল ছুটির সময় এই রাস্তয় আসলে  মনে হবে, ঢাকা শহরের সব গাড়ী যেন এই রাস্তাতেই জমে আছে। হাটাও মুশকিল। চিকন ফুটপাত দিয়ে হাটতে লাগলাম। অনেক মেয়ে একা আর অনেক মেয়ে অভিভাবকের সাথে ঐ ফুটপাত দিয়ে হাটছে। দু’একজন আবার আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালো, ‘বখাটে নাকি!’ মুখভঙ্গিতে যাথাসম্ভব ভদ্রভাব ফুটিয়ে হাটতে লাগলাম। মাঝে মধ্যে দুএকজনের দিকে যে চোখ যায়নি তা নয়। যাওয়ারই কথা। বয়সের দোষ (অথবা গুন)! হঠাৎ গেটের দিকে চোখ গেল। চমকে উঠলাম! আবার ভালো করে তাকালাম। বুকটা ধুক করে উঠল। লাবনী! হ্যাঁ লাবনীই তো। ও এই স্কুলে পড়ে আমি জানতাম। কিন্তু এভাবে দেখা হয়ে যাবে ভাবিনি। এবার লাবনীরও চোখ পড়ল আমার দিকে। ওর চোখ দুটো ঝলমল করে উঠল। একটু সময়ের জন্য আমরা দুজনেই থেমে গেলাম। কিন্তু এভাবে থেমে থাকা তো যাবেনা। আমি সামনের দিকে হাটতে লাগলাম। লাবনীও আড়াআড়ি পথ ধরে এগিয়ে চলল। সেখানে হয়তো ওদের গাড়ীটা অপেক্ষা করছে। কিছুদূর গিয়ে আমি পিছনে ফিরে তাকালাম। লাবনীও ঘুরে তাকিয়েছে। আমার বুকের ধুকধুকানী আরো বেড়ে গেল। একটা বইয়ে পড়েছিলাম, মেয়েটিকে ভালোবাসেন বুঝবেন কি করে? যদি মেয়েটিকে দেখে আপনার বুক  ধুকধুক করে ওঠে, তাহলে বুঝবেন আপনি মেয়েটিকে ভালোবাসেন। তবে কি লাবনীকে আমি ভালোবাসি?

 

 

একদিন মা বললেন,

ঃ যা, ইলেকট্রিক বিলটা দিয়ে আয়।

আকাশ থেকে পড়লাম। জীবনে কোনদিন ইলেকট্রিক বিল দেই নাই। কি করে বিল দিতে হয় তাও জানিনা। এগুলো কাজ তো বাবাই করতেন, মাঝে মাঝে মা করতেন। হঠাৎ আমার কাধে চাপানো!

ঃ হা করে দেখছিস কি? যা তাড়াতাড়ি, আগামীকাল লাস্ট ডেট। দেরী হলে পরে জরীমানা দিতে হবে।

ঃ জ্বি, মানে ইলেকট্রিক বিল তো আমি কখনো দেই নাই।

ঃ দিস নাই তাতে কি হয়েছে? এখন দিবি। বড় হয়েছিস কাজ শিখতে হবে না?

ঃ ও আচ্ছা। কি করতে হবে

অনিচ্ছা সত্ত্বেও বললাম।

ঃ মগবাজার চৌরাস্তার মোড়ে একটা ব্যাংক রয়েছে। ওখানে যাবি।

তারপর মা আমাকে বিস্তারিত বুঝিয়ে দিলেন।

আমাদের বাসা থেকে হেটেই মগবাজার চৌরাস্তায় যাওয়া যায়। হাটতে হাটতে চলে গেলাম। রাস্তা পার হওয়ার জন্য একপাশে দাঁড়িয়েছি। উদ্দ্যেশ্য ট্রাফিক সিগনালে লাল বাতি জ্বললে, গাড়ীগুলো যখন জেব্রা ক্রসিংয়ের পিছনে দাঁড়াবে তখন আমি নির্বিঘ্নে রাস্তা পার হব। লাল বাতি জ্বলার পর মনে হলো গাড়ীগুলো অতি অনিচ্ছা সত্ত্বে থামছে। তাও জেব্রা ক্রসিংয়ের পিছনে নয় উপরে, আবার কোন কোন গাড়ী অনেক সামনে প্রায় মোড়ের উপরে গিয়ে পরছে, ফলে অন্য রাস্তার গাড়ী চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাস্তায় পর্যাপ্ত পরিমানে ট্রাফিক পুলিশও নেই। মনে মনে ভাবলাম এমন অবস্থা কেন? একদিকে আমাদের চালকদের সচেতনতা নেই, তাই পথচারী এবং অন্য গাড়ীগুলোর কথা ভাবিনা, আবার সরকারও ঐ কিসিমের, দুইটি প্রধান সড়কের মিলনস্থলে কি কিছু ট্রাফিক পুলিশ বেশী রাখা যায়না? এতে জনগন যেমন উপকৃত হবে, তেমনি কর্মসংস্থানও হবে। একজন ট্রাফিক পুলিশ আমার মনোভাব বুঝতে পেরে, এগিয়ে এসে গাড়ীগুলোকে জেব্রা ক্রসিংয়ের পিছনে থামানোর চেস্টা করলেন। আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে, একিয়ে বেকিয়ে রাস্তাটা পার হলাম।

 

 

দেশের এই এত বিশৃংখলা, মানুষের ঔদাসিন্য, এইসব দেখেশুনে মাঝে মাঝে রাগে অস্থির হয়ে যাই। কিন্তু এটা ঠিক না। রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন। আমার কলেজে রাহাত নামে এক জুনিয়র ভাই ছিল। ওকে দেখতাম সব সময় নীরব-নির্লিপ্ত। ওর এই বৈশিষ্ট্যটি সবারই চোখে পড়েছিল। কেমিস্ট্রির বেলাল হোসেন স্যার একবার ওকে জিজ্ঞেস করেই বসলেন, “রাহাত, তোমার এই ব্যাপারটা আমি বুঝিনা। তুমি সব সময়ই এত নির্লিপ্ত কেন? মানুষের মধ্যে উত্তেজনা থাকে, উৎকন্ঠা থাকে, উদ্বেগ থাকে, তোমার মধ্যে যেন এগুলো কিছুই নাই। তোমাকে রাগ করলেও তুমি শান্ত, তোমাকে ধমক দিলেও তুমি শান্ত, যেখানে অন্যেরা উদ্বিগ্ন সেখানেও তুমি চুপচাপ। ব্যাপারটা কি বলতো?” রাহাত মুচকি হেসে বলল, “সব সময় মাথা ঠান্ডা রাখবেন স্যার।”

 

 

ব্যাংকের ভিতরে ঢুকে দেখলাম ইলেকট্রিক বিল দেয়ার লাইনটা মোটামুটি দীর্ঘ। আধা ঘন্টা থেকে এক ঘন্টা সময় লেগে যাবে। যাহোক অসীম ধৈর্য নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে রইলাম। একটু পরে বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করল। তখন মনে হলো ভালোই হয়েছে, বৃষ্টি পড়ার আগে আগে চলে এসেছি। আর লাইনটা লম্বা হয়েও ভালো হয়েছে। যেভাবে বৃষ্টি শুরু হয়েছে তাতে খুব শীগগিরই থামার সম্ভাবনা নেই। ততক্ষণ এই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকাই ভালো। এর মধ্যে লাইনের সামনের দিকে একটা ঝগড়া শুরু হয়ে গেল। একজন হঠাৎ পাশের সোফা থেকে উঠে লাইনে ঢোকার চেষ্টা করল, তখন আরেকজন বলে উঠল, “আপনে আবার হঠাৎ কই থেইকা আইসা লাইনে ঢোকার চেষ্টা করতাছেন?”

ঃ কই থেইকা আবার কি? আমি তো এইহানেই আছিলাম।

ঃ কোনহানে আছিলেন আপনে?

ঃ এই সোফায় বইয়া আছিলাম।

ঃ ক্যা, বিল দিতে আইয়া সোফায় বইয়া থাকবেন ক্যান? লাইনে খাড়াইবেন।

ঃ আরে, আপনের আগে আইছি আমি। ঐ উনারে কইয়া, সোফায় গিয়া বইয়া আছিলাম।

ঃ আমরা, লাইনে খাড়াইয়া মরি, আর আপনে সোফায় বইয়া আরাম করেন!

ঃ আরে আমি কি, বাড়ীত যাইয়া ঘুমাইছি নাকি? আমি তো ব্যাংকের মধ্যেই আছিলাম।

ঝগড়া দেখতে মজাই লাগছিল। আবার ভাবছিলাম, আমাদের কালচার এত নীচু কেন? আমরা কি একে অপরের প্রতি সামান্যটুকুও সহনশীল হতে পারিনা?

 

 

হঠাৎ স্বচ্ছ কাঁচে ঘেরা ম্যানেজারের রূমটার দিকে নজর গেল। চাচা ঢুকেছেন ম্যানেজারের রূমে। ধনী ব্যক্তি, তাঁর হাটার চালেই অহংবোধ লক্ষ্যণীয়। ম্যানেজার উঠে দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানালেন। চাচা একটি সোফায় বসলেন। চাচার পিঠটা ছিল আমার দিকে, তাই আমাকে দেখতে পাননি। এবার আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। লাবনীদের দামী টয়োটা গাড়িটা চোখে পড়ল। এখন স্কুলে ভ্যাকেশন চলছে। ঐ গাড়ীতে লাবনীর থাকাটা বিচিত্র কিছু না। বুকটা ধুক করে উঠল। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, লাবনীর সাথে দেখা করতে হলে, বৃষ্টিতে ভিজতে হবে। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, ভিজব বৃষ্টিতে। তাও এই সুযোগ হাতছাড়া করব না। চাচা যদি দেখে ফেলে? ভীষণ গোলমাল লেগে যাবে। একটু অবদমিত হলাম। কিন্তু মনকে বোঝাতে পারলাম না। লাবনীর সাথে দেখা করতে হবেই। কোন বাধাই বাধা নয়। বৃষ্টিতে কাকভেজা, চাচার রক্তচক্ষু, সব তুচ্ছ, সব। আমার পিছনের লোকটিকে বললাম, “আমার জায়গাটা একটু দেখবেন দয়া করে, আমি এই আসছি।” বলে বাইরে বেরিয়ে এলাম।

 

বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে এগিয়ে গেলাম লাবণীদের গাড়ীটার দিকে। সাহস করে গাড়িটার দরজা টান দিয়ে খুলে ফেললাম। যা ভেবেছিলাম তাই, ভিতরে লাবণী বসে আছে। আমাকে দেখে বিস্মিত হলো ও, আবার একেবারেই অপ্রত্যাশিত কিছু পাওয়ায় ওর দুচোখে উপচে পড়ল খুশী। বিলাসবহুল গাড়ীর ভিতরে আরামদায়ক আসনে বসে অপলক আমার দিকে তাকিয়ে আছে লাবণী, আর প্রবল বর্ষণে ভিজে গাড়ীর দরজায় দাঁড়িয়ে আছি আমি। টুকটাক দুয়েকটি কথা বললাম আমরা। লাবণী বলল

ঃ তুমি!

ঃ অবাক হয়েছ?

ঃ হ্যাঁ, একটু।

ঃ আমিও। কাকতালীয়ভাবে ঘটে গেল।

ঃ কেমন আছো?

ঃ ভালো। তুমি?

ঃ ভালো।

ঃ স্কুল কেমন চলছে?

ঃ স্কুল তো বন্ধ।

ঃ ও, হ্যাঁ । মাঝে মাঝে তোমাকে দেখিতো, স্কুল ছুটির পরে।

ঃ তুমি সব সময় একটা পকেটে হাত দিয়ে থাক কেন?

ঃ পকেটে হাত দিয়ে থাকি নাকি? খেয়াল করিনি তো। তোমার পছন্দ না হলে আর পকেটে হাত দেবনা।

ঃ না তা বলছিনা। (হেসে ফেলল লাবণী)। তুমি কি করছ এখন?

ঃ এইচ, এস, সি পরীক্ষা শেষ। এখন তো ‘আল বেকার’।

ঃ  ‘আল বেকার’ কি?

ঃ মানে কাজ কাম কিছু নাই আরকি। কোচিং করছি।

বাইরে প্রবল বর্ষণ তার মধ্যে খুশী আর লজ্জ্বার মাঝামাঝি আমাদের টুকরো টুকরো কথা। বাইরের মত আমাদের  ভিতরেও কি বর্ষণ শুরু হয়েছে? আমাদের টুকটাক কথা দুয়েকটি শব্দ এক একটা টুকরো টুকরো সজল মেঘের মতো।

 

হঠাৎ খেয়াল হলো চাচার কথা। সহসা শকুণের মত চাচা উড়ে আসলে ভিষণ হইচই শুরু হয়ে যাবে। ছোঁ মেরে আমার কলজেটাও ছিড়ে নিতে পারে। তাড়াতাড়ি কথা বন্ধ করলাম। বললাম,

ঃ যাই। আবার কথা হবে।

ঃ আবার কথা! বিষন্ন হয়ে গেল লাবণীর কন্ঠ। কি জানি কবে হবে।

ঃ আমি তোমাকে টেলিফোন করব।

ঃ নাম্বার জানোতো?

ঃ তা জানি। আমার চাচার নাম্বার আমি জানব না?

ঃ আর চাচা! দুই ভাইয়ে কবে যে মিল হবে!

ঃ ঠিক আছে আমি যাই।

আরেকবার ওর দিকে তাকালাম। লাবণীর মিষ্টহাস্য অপরূপ মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে বড় ভালো লাগছে এই বর্ষণস্নাত আকাশ ও পৃথিবীটাকে। আমি কি পারিনা রূপকথার রাজকুমারের মত ওকে লুফে নিয়ে নীল আকাশে উধাও হয়ে যেতে?

 

ভিজে চুপচুপ হয়ে ব্যাংকে ঢুকলাম। লোকজন আমার দিকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকালো । তারা তো জানেনা এই বৃষ্টিতে ভিজে আমি যে কত অপার আনন্দ লাভ করেছি।

 

বাড়ী ফিরে ভাবলাম, ওকে টেলিফোন করব। টেলিফোন সেটটা হাতে নিয়ে আবার রেখে দিলাম। কি বলব ওকে আমি? ঐ একটি কথা যার সঠিকতা সম্পর্কে আমি নিজেই সন্দিহান। সেটা বলব কি?

 

(দুঃসাহসে বুক বেধে হিমশৃঙ্গে আরোহন করতে পারি,

যদি বল কন্টকাকীর্ণ ফুলও আনতে পারি,

কিন্তু বুকে পাথর বেঁধেও কোনদিন সরাসরি বলতে পারব না, “ভালোবাসি”।)

(চলবে)

৩৫৬ বার দেখা হয়েছে

৪ টি মন্তব্য : “লিস্ট্নিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ – পর্ব ৫”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।