ক্যাডেট কলেজে ভুতের সন্ধানে – ৩

ক্যাডেট কলেজে ভুতের সন্ধানে

 

(পূর্ব প্রকাশিতের পর থেকে)

 

খুব ভোরে সময় মতো ঘুম ভেঙে গেল। কিন্তু এটাকে পুরোপুরি ঘুম ভাঙা বলেনা। চোখ জেগে আছে আর দেহ ঘুমিয়ে আছে।  তড়াক করে উঠে গেলাম। ঐ কাজটা করতে হবে। অনেক দিন যাবৎ আশায় আশায় আছি, ভুতের দেখা চাই। আজ সেই আশা পূর্ণও হয়ে যেতে পারে। আধো ঘুম আধো জাগ্রত অবস্থায়ই সোজা চলে গেলাম সিঁড়ির দিকে। সিলেট ক্যাডেট কলেজে যারা পড়েছেন বা গিয়েছেন তারা জানেন, বিশাল এইচ শেইপ্‌ড হাউজের সামনে একটা বড় সিঁড়ি আর পিছনের দিকে দুইটা সিঁড়ি। এই পিছনের সিঁড়ি দুইটার মধ্যে একটা একেবারেই পিছনে, যেই সিঁড়িঘরের  কাঁচের জানালার মধ্যে দিয়ে দেখা যাবে রাতের গা ছমছমে জনমানবহীন জংলা পাহাড়। আর অপরটি অনেকটা মাঝামাঝি, নীচের তলার কমন রূম থেকে উঠে এসেছে তিনতলা পর্যন্ত, যেখানে তখন ছিল অস্থায়ী কলেজ মসজিদ।

 

আমি সামনের সিঁড়িটা বেয়ে উপরে উঠতে লাগলাম। ঐদিক দিয়ে ওঠার কয়েকটা কারণ ছিল, প্রথমতঃ ঐদিক দিয়ে সবসময়ই ওঠানামা করতাম, তাই ওভাবেই অভ্যস্ত ছিলাম, দ্বিতীয়তঃ ‘সা’ ভাইয়েরা কোথায় থাকবেন তাতো আমাকে বলেননি, সুতরাং খুজতে হলে সামনে থেকেই খোজা শুরু করি, তৃতীয়তঃ, প্রথমেই পিছনের ঐ গা ছমছমে সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সাহস আমার হচ্ছিল না।

 

সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে উঠে গেলাম সত্যি, সেই ওঠার মুহূর্তে ভয়ের কথা ভুলে এক্সাইটমেন্ট বেশী কাজ করছিল। তারপরে যেই হা করে খোলা রাখা দরজা গলিয়ে ছাদে পা রাখলাম। সাথে সাথে অনুভূতি পাল্টে গেল। সময়টা ছিল ভীষণ ভোর, ফজরের নামাজেরও আগে। ছাদে পা রেখে আমি নিকষ কালো অন্ধকারের জগৎে প্রবেশ করলাম। আমার মনের এক্সাইটমেন্ট উবে গিয়ে একটা ভোতা ভয় ঘিরে ধরল। কালো অন্ধকারে কিছুই দেখতে না পেয়ে, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। একটু পর চোখ সয়ে এলে লক্ষ্য করলাম আবছা আলোয় সবকিছু ছায়া ছায়া দেখা যায়।

 

 

কিন্তু ‘সা’-ভাইয়েরা কোথায়? দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডানে বামে তাকালাম। ডানদিকে ছাদ হয়ে কলেজ ক্যাম্পাসের অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। আর বাঁ দিকে ছাদ ছাড়িয়ে এ্যকাডেমিক ব্লক দেখা যায়। ছাদের এপাশের উইংটাতে আমি কাউকেই দেখতে পেলাম না। তাহলে কি উনারা ওপাশের উইংটায়? দৃষ্টি প্রসারিত করে ঐদিকে তাকালাম। আবছা দেখা যাচ্ছে পিছনের উইংটা, আর তার পরেই সেই ভয়াল পাহাড় আর গণকবর। ঐদিকে যাব কি যাব না ভাবলাম। তারপর ভাবলাম, না কাপুরুষতা দেখানো ঠিক হবেনা। সাহসে ভর করে ছাদের মাঝখানের অংশটি দিয়ে ঐদিকে এগিয়ে গেলাম। ওপাশের উইংটিতে পা রাখা মাত্রই ঝটপট করে কালো কি একটা যেন মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল। চকিতে চমকে উঠলাম, টলমল করে উঠল আমার পা। পরমুহূর্তেই সামলে নিলাম নিজেকে, বাদুর বা অন্য কোন পাখি হবে।

 

আগের মতই আবার ডানে বামে তাকালাম, ‘সা’-ভাইদের সন্ধানে। না কাউকেই দেখছি না। এবার পাহাড়ের দিকে তাকালাম। জমাট কালো অন্ধকার বুকে নিয়ে দৈত্যের মত দাঁড়িয়ে আছে। কেউই ছাদে নাই বুঝতে পারলাম। তাহলে কি এই নিকষ অন্ধকারে বিশাল ছাদে আমি একা? মানুষ যে আমি ছাড়া আর কেউই নেই বেশ বুঝতে পারলাম। এবার ভয় সত্যিই ঘিরে ধরল। ‘সা’-ভাইরা কেউ নেই। কোন মানুষ নেই, তাহলে? এই ছাদ নিয়ে অনেক ভয়াল গল্প শুনেছি। বিউগলার শাবদুল একবার বলেছিল ভোরে যখন সে বিউগল বাজাতে ছাদে উঠেছে, হঠাৎ কে যেন তার গলা টিপে ধরেছে। সেটা ছিল এ্যাকাডেমিক ব্লকের ছাদ। সে যাহোক ছাদ ছাদই। তাছাড়া এই ছাদকে নিয়েও কাহিনী কম নেই। বুক দুরু করতে লাগল। এখন যদি অশরীরি কেউ আমার পাশে এসে দাড়ায়! দ্রত সামনের দিকে হাটতে লাগলাম, উদ্দেশ্য পিছনের সিঁড়িটা বেয়ে নীচে নেমে যাব। যতই ঐ সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি ততই পাহাড়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। প্রতিটি মুহূর্তেই ভয় বেড়ে চলছে, কিন্তু আমাকে যে নামতেই হবে।

 

একেবারে সিঁড়ির কাছাকাছি আসতেই তীব্র স্বরে চিৎকার করে উঠল একটি শিয়াল। সাথে সাথে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিলাম, নামব না এই ভয়াল সিঁড়ি বেয়ে। ঝট করে পিছনে ঘুরে গেলাম। দ্রুত পা ফেলে মাঝখানের সিঁড়িটা দিকে এগুলাম। কয়েক সেকেন্ড পরেই পৌছে গেলাম সেখানে। ভাগ্য ভালো ছিল দরজা খোলা পেলাম। সপ করে নেমে গেলাম সেই সিঁড়িতে।  কয়েক ধাপ নামতেই, আলোর দেখা পেলাম, ফজরের সময় আসন্ন, এই কারণে হুজুর বোধহয় মসজিদের লাইট জ্বালিয়ে দি্যেছেন। এতক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। আলোময় পরিবেশ দেখে ঘোর কেটে গেল। আস্তে আস্তে নিজের রূমের দিকে এগিয়ে গেলাম।

 

প্রিয় পাঠকগণ, এখানেই কিন্তু শেষ নয়। এই ছাদ ও মসজিদের সিঁড়িকে ঘিরে আরো কিছু কাহিনী আছে। যেমন আছে আমার, তেমনি আছে প্রত্যক্ষদর্শির নিজের মুখে শোনা বর্ণনা। আমি পরবর্তি পর্বে তা বলব।

 

(চলবে)

 

৩৪৯ বার দেখা হয়েছে

৮ টি মন্তব্য : “ক্যাডেট কলেজে ভুতের সন্ধানে – ৩”

  1. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    ভুত কই?

    তবে অনুভুতির বর্ণনাটা চমৎকার হয়েছে। আমরো কলযে ছ্যাৎ করে উঠা অনুভুতি হয়েছে অনেকবার, কিন্তু ভুত-টুত দেখি নাই।


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  2. শেখ সাদী (০৬-১২)

    রাতের বেলা বধ্যভূমির পাশ দিয়ে গেসি বেশ কয়েক বার। কিন্তু ভুত দেখিনাই একবারও। অবশ্য তখন অন্য টেনশন ছিল! হেহে...
    তবে সিলেটে আসলেই কিছু একটা আসে বলে মনে হয়! আমারও দুই একটা উল্টা পালটা অভিজ্ঞতা আসে। কিছু কাহিনিও শুনসি।


    \"why does the weasel go pop? does it matter?
    if life is enjoyable, does it have to make sense?\"

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।