রহস্যময় মহাবিশ্ব ও চিরন্তন জীবন জিজ্ঞাসা – ৮

রহস্যময় মহাবিশ্ব ও চিরন্তন জীবন জিজ্ঞাসা – ৮

 

————————————–ডঃ রমিত আজাদ

অপার রহস্যে ঘেরা আমাদের এই মহাবিশ্ব। আর তার মধ্যে রহস্যময় একটি সত্তা আমরা – ‘মানুষ’। এই দু’য়ের সম্পর্কও কম রহস্যময় নয়। মহাবিশ্বের বিবর্তন বা বিকাশের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ ফলাফল মানুষ, সেই মানুষই আবার গভীর আগ্রহ নিয়ে অধ্যয়ন ও পর্যবেক্ষণ করছে তার চারপাশের মহাবিশ্বটিকে। কি এই মহাবিশ্ব? আমরা কারা? কি সম্পর্ক মহাবিশ্বের সাথে আমাদের অথবা আমাদের সাথে মহাবিশ্বের? কোথা থেকে এল এই মহাবিশ্ব? তারপর থেকে ক্রমাগত কি ঘটছে? এর শেষ কোথায়? এই সব প্রশ্ন অবিরাম ঘুরে ফিরে মানুষের মস্তিস্ক থেকে হৃদয় আর হৃদয় থেকে মস্তিস্ক পর্যন্ত। এইসব চিরন্তন জীবন জিজ্ঞাসার যতটুকু উত্তর এ যাবতকাল আমাদের জানা হয়েছে দর্শন ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোন থেকে। সেইসব উত্তর ধারাবাহিকভাবে দেয়ার চেষ্টা করব আমার এই সিরিজে।

প্রথম পর্বে বস্তু (matter) সম্পর্কে কিছু আলোচনা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করা হয়েছে গতি (motion) নিয়ে। তৃতীয় পর্বে আলোচনা করা হয়েছে স্থান ও কাল (space and time) নিয়ে, ইতিহাসের গতিধারায় নিউটন-লেইবনিজ বিতর্ক পর্যন্ত। চতুর্থ পর্বে আলোচনা করা হয়েছে স্থান ও কাল সংক্রান্ত আলবার্ট আইনস্টাইনের বৈপ্লবিক চিন্তাধারা নিয়ে।
পঞ্চম পঞ্চম পর্বের আলোচনা করা হয়েছে স্থান-কাল সংক্রান্ত আরো কিছু দর্শন নিয়ে।

ষষ্ঠ পর্বে আলোচনা করেছি বিশ্ব জুড়ে নানাবিধ সংস্কৃতি ও শিল্পের ক্যাটাগোরী হিসাবে কাল নিয়ে।
সপ্তম পর্বে আলোচনা করেছি বিশ্ব জুড়ে নানাবিধ সংস্কৃতি ও শিল্পের ক্যাটাগোরী হিসাবে স্থান নিয়ে।

এবারের অর্থাৎ অষ্টম পর্বে আলোচনা করব মহাবিশ্বের কণিকা জগৎ নিয়ে।
মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম গঠন একক

 

পদার্থের যেসব মৌলিক উপাদানে জগৎ তৈরী হয়েছে তাদের নাগাল পাওয়ার আকাঙ্খা এই জগতের মতই পুরণো। কিন্তু বহু বহু শতাব্দী ধরে এই বিষয়টি জ্ঞানী ব্যাক্তিদের পন্ডিতি তর্ক আশ্রয় করেছিল। প্রাচীন যুগেই এ্যটোমিসম নামে একটি Natural Philosophy বিকশিত হয়েছিল। যেই দর্শন বলেছিল প্রকৃতি জগৎ দু’টি মৌলিক অংশ দ্বারা গঠিত – এ্যটম ও শূণ্যতা। এ্যটম (অতম – যাকে আর ভাঙা যায়না)। গুজরাটী ঋষি ও দার্শনিক কণাদ, খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রথম এই ধারণা দেন। এই নি্যে একটি মজার গল্প প্রচলিত আছে। একদিন কণাদ হাতে খাবার নি্যে হাটছিলেন, তারপর তিনি খাবার আঙুল দিয়ে ভাঙতে শুরু করলেন। ভাঙতে ভাঙতে একটা পর্যায়ে এসে আর ভাঙতে পারছিলেন না। সেখান থেকেই উনার মনে ধারণা আসে যে, মাহাবিশ্বকেও ভাঙতে ভাঙতে এমন একটি ক্ষুদ্র অংশে নিয়ে আসা যাবে যাকে আর ভাঙা যাবেনা। তিনি তার নাম দিয়েছিলেন অণু। ঋষি কণাদ ছিলেন বৈশেশিকা দর্শন বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। এই দর্শন বিদ্যালয় বিশ্বাস করত যে, অণু অবিভাজ্য, এইরূপে অমর (eternal)। তারা আরো বিশ্বাস করত যে, অণু খালি চোখে দেখা যায়না, এবং তা হঠাৎ আবির্ভুত হয় এবং হঠাৎ তীরোহিত হয়।

 

বৈশেশিকা দর্শন বিদ্যালয় বলত যে, একই পদার্থের অণুগুলো মিলে দ্বিঅণু ও ত্রিঅণু পদার্থ তৈরী করে। কণাদ আরো বলেন যে, প্রভাবকের (যেমন তাপ) প্রভাবে বিভিন্ন অণু সংযুক্ত হয়ে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায়। মৃন্ময় পাত্রের কালো হয়ে যাওয়া ও ফলের পেকে ওঠা ইত্যাদি ঘটনাকে তিনি উদাহরণস্বরূপ উপস্থাপন করেন।

 

বৌদ্ধ এ্যটোমিজমের দুইটি ধাপ রয়েছে এক, খ্রীষ্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীতে তারা বলেন উপাদানের উপর নির্ভর করে চার ধরনের অণু রয়েছে, প্রত্যেকটি উপাদানের আবার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেমন দৃঢ়তা ও গতি; দুই, খ্রীষ্টিয় পঞ্চম-সপ্তম শতাব্দীতে বৌদ্ধ দার্শনিক দিগনাগ (পঞ্চম শতাব্দী) ও ধর্মকীর্তি (সপ্তম শতাব্দী) এ্যাটম সম্পর্কে কিছু বলেছিলেন। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বৌদ্ধ দার্শনিক ধর্মকীর্তি দিগনাগের ধারণাকে এগিয়ে নিয়ে বলেন অণু হলো বিন্দু-আকৃতির (point-sized), স্থিতিকালহীন (durationless) ও শক্তি দ্বারা গঠিত। ধর্মকীর্তি momentary atom সম্পর্কেও বলেছিলেন, অর্থাৎ যা চকিতেই অস্তিত্ববান হয় আবার চকিতেই হারিয়ে যায়।

 

এ্যটোমিজমের বৌদ্ধ ধারণাকে বর্ণনা করতে গিয়ে রুশ ইন্ডোলজিস্ট ফিওদর শেরবাত্‌স্কি (Stcherbatsky (১৮৮৬-১৯৪২)) বলেছেন –  The Buddhists denied the existence of substantial matter altogether. Movement consists for them of moments, it is a staccato movement, momentary flashes of a stream of energy… “Everything is evanescent,” … says the Buddhist, because there is no stuff … Both systems [Sānkhya and later Indian Buddhism] share in common a tendency to push the analysis of Existence up to its minutest, last elements which are imagined as absolute qualities, or things possessing only one unique quality. They are called “qualities” (guna-dharma) in both systems in the sense of absolute qualities, a kind of atomic, or intra-atomic, energies of which the empirical things are composed. Both systems, therefore, agree in denying the objective reality of the categories of Substance and Quality, … and of the relation of Inference uniting them. There is in Sānkhya philosophy no separate existence of qualities. What we call quality is but a particular manifestation of a subtle entity. To every new unit of quality corresponds a subtle quantum of matter which is called guna “quality”, but represents a subtle substantive entity. The same applies to early Buddhism where all qualities are substantive … or, more precisely, dynamic entities, although they are also called dharmas (“qualities”).

 

গ্রীক এ্যটোমিজম:

কোন চূড়ান্ত অবিভাজ্য বস্তু আছে কি?

(Is there an ultimate, indivisible unit of matter?)

প্লেটো বা এরিসট টলের আগেই। গ্রীক দার্শনিক লুসিপাস ও তার ছাত্র ডেমোক্রিটাস অণুর ধারণা দিয়েছিলেন। ডেমোক্রিটাস সক্রেটিস ও সোফিস্টদের সমসাময়ীক ছিলেন। ডেমোক্রিটাসের মতে এ্যটম জ্যমিতিকভাবে নয় তবে ভৌতভাবে অবিভাজ্য। দুটি এ্যটমের মধ্যে আছে শূণ্য স্থান (empty space)। এ্যটম ধ্বংসযোগ্য নয় (indestructible), সে সর্বদাই গতিশীল, এ্যটম সমূহের সংখ্যা অসীম, এবং তা বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। এই প্রকারভেদ নির্ভর করে তার অবয়ব (shape) ও আকৃতির (size) উপর। আধুনিক বিজ্ঞানে ডেমোক্রিটাসের এই ধারণার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই, বিজ্ঞানের ভাষ্য অনুযাযী, ১১২ টি মৌলিক পদার্থের প্রত্যেকটির এ্যটমই ভিন্ন ভিন্ন আকৃতির। ডেমোক্রিটাস আরো বলেছিলেন যে, এ্যটমের প্রকারভেদ তাপ (heat)-এর উপর নির্ভর করে, যেমন গোলকাকৃতি (spherical) এ্যটম সব চাইতে বেশী উত্তপ্ত, যার দ্বারা আগুন গঠিত, আর এ্যটম ও ভর সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন যে, এ্যটম ভরের উপর নির্ভরশীল – ভর যত বেশী এ্যটমটিও তত বড়। ঠিক এখনেই এ্যটমিজমের কনট্রাডিকশন ধরা পড়ে। একদিকে বলা হচ্ছে এ্যটমই ক্ষুদ্রতম গঠন একক, আবার অপরদিকে বলা হচ্ছে যে, তা ভরের উপর নির্ভরশীল। যদি ভরের উপর নির্ভরশীলই হবে তাহলে এ্যটমের মৌলিকত্ব থাকল কোথায়?

 

গ্রীক দার্শনিক হেরাক্লিটাস বলেছিলেন যে, একই নদীতে দুবার অবগাহন করা যায়না, অর্থাৎ জগৎ-সংসার পরিবর্তনশীল; অন্যদিকে দার্শনিক পারমেনিডাস বিশ্বাস করতেন পরিবর্তন বাস্তব কিছু নয় তা হচ্ছে মায়া (illusion)।

 

পারমেনিডাস গতি, পরিবর্তন ও শূণ্যতা (void) ইত্যাদিকে অস্বীকার করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, অস্তিত্ববান সবকিছুই অনন্য (single) চারপাশে যা কিছু আছে তা সবই অপরিবর্তনীয় ভর (এই ধারণাকে বলা হয় অনন্যবাদ বা monism ), এবং গতি, পরিবর্তন সবই মায়া।  পারমেনিডাস sensory experience-কে অস্বীকার করেন এবং বলেন মহাবিশ্বকে বোঝার সঠিক পথ হচ্ছে  abstract reasoning। প্রথমতঃ তিনি বিশ্বাস করতেন যে শূণ্যতা (void) বলে এমন কিছু নেই যাকে আমরা nothing বলতে পারি, (আবার শূণ্যতা যদি something হয় তবে সেটা শূণ্যতা নয়)। এর ফল দাঁড়ালো এই যে, গতি বলে কিছু নাই কারণ কোন কিছুকে চলাচল করতে হলে তার শূণ্যতার প্রয়োজন হবে।

 

তিনি আরো বলেন যে অবিভাজ্য একটি এককের প্রয়োজন আছে, যদি সেটা manifold হয়, তাহলে void-এরও প্রয়োজন দেখা দেয় যা তাদেরকে বিভাজন করবে, কিন্তু ইতিপূর্বেই উল্লেখ করেছি যে তিনি void-এ বিশ্বাস করতেন না। ডেমোক্রিটাস পারমেনিডাসের বেশীরভাগ আরগুমেন্টই মেনে নেন, তবে পরিবর্তন একটি মায়া, এই ধারণাটি তিনি মেনে নিতে পারেননি। তিনি মনে করতেন পরিবর্তন বাস্তব, আর যদি তা না হয়, তবে মায়া কি সেটা আগে বোঝার প্রয়োজন আছে। এভাবে তিনি void-কে সমর্থন করেন এবং বলেন যে মহাবিশ্ব অনেক পারমেনিডিয়ান সত্তার দ্বারা গঠিত, যারা void-এর মধ্যে গতিশীল, আর void অসীম।

 

এ্যটমকে অস্বীকার:

প্লেটো ডেমোক্রিটাসের এ্যটমিজমের প্রয়োজনহীনতার আভাস দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, মহাবিশ্ব চিরকালিন (eternal) নয়, একে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই সৃষ্টির একাংশ হলো চারটি উপাদান আগুন, মাটি, পানি এবং বাতাস। তিনি আরো মনে করতেন যে, এই উপাদানগুলো প্রত্যেকেই জ্যমিতিকভাবে ঘনবস্তু। এরিষ্টটল মনে করতেন যে এই চারটি উপাদান এ্যটম দ্বারা সৃষ্ট নয় বরং তারা নিরবিচ্ছিন্ন (continuous)। এই উপাদানগুলোর উপর দুটা বল (force) ক্রিয়াশীল: মহাকর্ষ – মাটি ও পানির ডুবে যাওয়ার প্রবনতা, এবং লঘুত্ব – বাতাস এবং আগুনের উপরে ওঠার প্রবণতা। আমরা মহাবিশ্বের উপাদানগুলোকে পদার্থ এবং বলে বিভাজন আজও ব্যবহার করি।

 

 

এরিষ্টটলের বিশ্বাস মতে পদার্থ নিরবিচ্ছিন্ন, ফলে তাকে বিভাজন করা যায় এবং এই বিভাজনের কোন শেষ নাই। এমন কোন পদার্থ কণিকা পাওয়া সম্ভব না যাকে ভাগ করা যায়না। এদিকে ডেমোক্রিটাস বিশ্বাস করতেন যে পদার্থ বহু প্রকার দানাদার পরমানুর দ্বারা গঠিত। গ্রীক ভাষায় এ্যটম (atom) শব্দের অর্থ অবিভাজ্য। এই দ্বন্দ্ব শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলেছে, তবে কোন পক্ষেই বাস্তব কোন প্রমান পাওয়া যায়নি।

 

১৮০৩ সালে বৃটিশ বিজ্ঞানী জন ডালটন দেখালেন যে, রাসায়নিক যৌগ গুলো সব সময়ই একটি বিশেষ অনুপাতে মিশ্রণের ফলে হয়। এ তথ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় পরমাণু গুলোর বিশেষ বিশেষ এককে গোষ্ঠিবদ্ধ হওয়া। এগুলির নাম তিনি দি্যেছিলেন অণু (molecule)। তারপরেও এ্যটোমিষ্টদের সপক্ষে চরম মিমাংশা হয়নি। একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌত সাক্ষ্য উপস্থিত করেছিলেন জগৎ বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনষ্টাইন। বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের গবেষণাপত্রম প্রকাশের কয়েক সপ্তাহ আগে ১৯০৫ সালে তিনি দেখিয়েছিলেন যে, ব্রাউনীয় গতিকে (Brownian motion) একটি তরল পদার্থের অনুগুলির সাথে ধুলিকণার সংঘর্ষ দিয়ে ব্যখ্যা করা যায়। একটি তরল পদার্থে ভাসমান ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধুলিকণার এলোমেলো এবং ইতস্তত বিক্ষিপ্ত গতিকে বলা হয় ব্রাউনীয় গতি।

 

আবার এই পরমাণু আসলে অবিভাজ্য নয়, এই সন্দেহ এর ভিতরেই দানা বাধতে শুরু করেছিল।

 

(চলবে)

২৯৮ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।