রেইনা (৩) – একটি প্রেমের গল্প

রেইনা () – একটি প্রেমের গল্প

ডঃ রমিত আজাদ

 

(রেইনা ১ ও ২ এই ব্লগেই পাবেন)

জুন মাসে তিবিলিসিতে পূর্ণ গ্রীস্মকাল। একেবারেই গরম, অনেকটা বাংলাদেশের মতই গরম। আবার দিনের দৈর্ঘ্যও বিশাল। সন্ধ্যা হয় রাত দশটা/সাড়ে দশটায়। রাত বলে ভুল হচ্ছে, বিকাল দশটা বলতে হবে। ‘ইভিনিং’ শব্দটির অর্থ এখন বুঝতে পারছি। দুপুর দুটা-তিনটা থেকে সূর্য ডোবার আগ পর্যন্ত ইভিনিং। বাংলার মত ‘বিকাল’ ও ‘সন্ধ্যা’ আলাদা আলাদা শব্দ নেই। আর সূর্য ডুবে গেলেই শুরু হয় রাত। সামারে ঘোরাঘুরি করার জন্য ইভিনিংটা চমৎকার। চারটা থেকে দশটা অবধি ছয় ছয়টি ঘন্টা, বেশ দীর্ঘ সময় ঘোরাঘুরি করা যায়।

এই সময় আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করলাম। আকাশে সাদা সাদা কি যেন উড়ছে। কিছু গায়ে এসে পড়লে দেখলাম, তুলার মত লাগে। ঢাকাতে কোন এক কালে এই রকম কিছু দেখতাম, কোথা থেকে যেন তুলার মত কিছু উড়ে উড়ে আসত। কোন গাছ-টাছ থেকে হবে হয়তো। এখানে ঐ জিনিস উড়ছে ব্যাপক ভাবে। পানামার খোরকে এসে ইন্টারক্লুবের নাতাশাকে জিজ্ঞেস করে, “এগুলো কি? স্নো?”।
নাতাশা উত্তর দিল
ঃ স্নোর মতই লাগে।
ঃ গ্রীস্মকালীন স্নো!
খোরকে রসিকতা করে বলল।
আসলে এগুলো টোপল নামে এক ধরনের গাছের ফুল থেকে বের হয়। সারা শহর জুড়ে এই গাছগুলি সারি করে লাগানো আছে। এই নিয়ে একটি মিথ প্রচলিত আছে। রাশিয়ার কোন এক রাণী স্নো ফল দেখতে খুব পছন্দ করত, তাই জারকে বলেছিল, “আমি গ্রীস্মকালেও স্নো দেখতে চাই। তুমি তো রাজা, পারবে আমার জন্য গ্রীস্মকালেও স্নো ফলের ব্যবস্থা করতে?” প্রিয়তমার আবদার রাখতে পুরুষ কি না পারে? জারের মন হয়তো তখন বলছিল, “তোমার জন্য বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে আনতে পারি, একশ আটটি নীল পদ্ম।” যাহোক রাজা নানা চিন্তা করে এই বুদ্ধি বের করলেন। হুকুম দিয়ে দিলেন, ‘সারা দেশ জুড়ে টোপল গাছ লাগিয়ে দাও’। গ্রীস্মকালেও রাণী দেখলেন স্নো ফল। প্রসন্ন হলো রাজার হৃদয়।

এই স্নো ফলের কথা বলতে গিয়ে আমার আরেকটি কথা মনে পড়ল। তখন জানুয়ারী মাস। অবিরাম তুষারপাতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাগেবী ক্যাম্পাস ও আশেপাশের উঁচুনীচু পাহাড়ী পথ যোজনব্যাপী শুভ্রতায় আচ্ছন্ন হয়েছে। তুষারপাতের প্রথম দিকে পেঁজা তুলার মত ঝরঝরে স্নো বলে পথ ভালোই থাকে। তুষার মারিয়ে যাচ্ছি এই ভেবে হাটতেও ভালো লাগে। কিন্তু ধীরে ধীরে তা শক্ত বরফে পরিণত হয়। পথ হয়ে যায় পিচ্ছিল আর চলাও হয়ে ওঠে বিপজ্জনক। এদেশীয়রা জন্ম থেকেই এই পথে হেটে অভ্যস্ত, তাই তাদের অসুবিধা অত একটা হয়না। তারপরেও দুয়েক সময় দেখি ওদেরকে পিছলে পড়ে যেতে। একবার একজনকে দেখলাম বেশ কোট টাই, ওভারকোট হ্যাট ভারিক্কী বেশভূষা নিয়েছে, তার হাতে আবার ধরানো ছিল, একটা জ্বলন্ত তামাকের পাইপ, যা তার ভার আরো বাড়িয়েছে। হাটছিলও নবাবী চালে, হাটতে হাটতে চোখের পলকে হঠাৎই উল্টে পড়ে একেবারে রাস্তায় শুয়ে পড়ল। ঘটনাটি দুঃখজনক নি:সন্দেহে কিন্তু ঠিক ঐ মুহুর্তে তার নাকানি-চুবানি অবস্থা দেখে আমি হাসি আটকাতে পারলাম না। যেখানে ওদেরই এই অবস্থা সেখানে আমাদের অবস্থা তো আরো করুণ। রেইনা বলিভিয়ার যে এলাকায় থাকে (আন্ডিজ পর্বতমালার উপরে), সেখানে কিছুটা বরফ পড়ে। তাই ওর অভ্যাস আছে। আমি জর্জিয়ায় এসেই প্রথম বরফ দেখলাম। একদিন ও আর আমি হেটে এ্যাকাডেমিক বিল্ডিং থেকে হোস্টেলের দিকে যাচ্ছি, ঐ পিচ্ছিল পথে অনেক সাবধানে হাটছিলাম, সামনে একটা ঢালু যায়গায় এসে তাল সামলাতে না পেরে পা হঠাৎ পিছলে গেল। শুনেছিলাম এরকম আকস্মিক পরিস্থিতিতে মস্তিস্ক কাজ করেনা, স্পাইনাল কর্ড ডিসিশন নেয়। আমার স্পাইনাল কর্ড ডিসিশন নিল রেইনাকে আঁকড়ে ধরার। বেচারী আর সোজা দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। আমার সাথে সাথে হুরমুড় করে পড়ে গেল মেয়েলী মিষ্টি সুগন্ধের রোমাঞ্চকের অনুভবে বুঝতে পারলাম, রেইনা একেবার আমার গায়ের উপরেই। সেই মুহুর্তে আমি কি সব চাইতে বেশী অনুভব করেছিলাম, দেহমনের তাপ? না মোটেও না যেটা অনুভব করেছিলাম সেটা হৃদয়ের উত্তাপ।

এখানে শীতকালটা প্রচন্ড ঠান্ডা। বাংলাদেশের শীতের সাথে কোনক্রমেই তুলনা হয়না। প্রিয় গায়ক ভূপেন হাজারিকার একটি গানে শুনেছিলাম, ‘মাঘের শীতে বাঘে পালায়…..।’ হা হা হা, ভুপেন সোভিয়েত ইউনিয়নে আসলে বুঝতেন শীত কাকে বলে, বাঘ শুধু না বাঘের দাদা পরদাদাও পালিয়ে যাবে। মোটামুটিভাবে নভেম্বরের মাঝের দিকে শীত শুরু হলো, এরপর থেকে শীতের তীব্রতা শুধু বেড়েছেই, ডিসেম্বর, জানুয়ারী, ফেব্রুয়ারী, মার্চের শেষ দিক পর্যন্তও ঠান্ডা ছিল। এপ্রিলে উষ্ণতা আসতে শুরু করল। পৃথিবীর এ অংশটা এরকমই। শীত সহজে বিদায় নিতে চায়না। রাশিয়া, ইউক্রেণে আরো খারাপ অবস্থা, মধ্য এপ্রিলে অথবা মে মাসের শেষেও এখানে তুষারপাত হয়। শীতকালের আরেকটি সমস্যা হলো দিনের দৈর্ঘ্য খুব কম। চারটা-পাচটার দিকেই সন্ধ্যা হয়ে যায়।

যাহোক সেই অসহনীয় শীত কেটে যখন গ্রীস্মকাল এলো আমরা গরমের দেশের মানুষেরা হাপ ছেড়ে বাচলাম।এই সামারে তিবিলিসি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে একটা ট্রেডিশন আছে। বিভিন্ন দেশের ছেলেমেয়েরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে। ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর ছেলেমেয়েরা আলাদা আলাদা অনুষ্ঠান না করে সবাই মিলে একটা অনুষ্ঠান করে। এর কারণ কয়েকটি, প্রথমতঃ আলাদা আলাদা করে প্রতিটি দেশের ছেলেমেয়ের সংখ্যা কম, দ্বিতীয়তঃ ওদের সবার ভাষা এক – স্প্যানিশ। আবার তাদের ধর্মও এক। এই ধর্মের উপর ভিত্তি করেই তো সংস্কৃতির একটা মেজর অংশ গড়ে ওঠে। ওদের কালচারে পার্থক্য যে লেই তা নয়, তবে অমিলের চাইতে মিলটাই বেশী। আরবরাও সব দেশ মিলে একটা অনুষ্ঠান করে, ল্যটিনদের মত ঐ একই কারণে।

ইন্ডিয়ান আর আমরা বাংলাদেশীরা একসাথে অনুষ্ঠান কখনো করতে পারিনি। করতে চাইওনি। এটা সম্ভবও না। আমাদের সংস্কৃতিতে মিলের চাইতে অমিলটাই বেশী। আমাদের ভাষা এক নয়, ধর্মও এক নয়। এবার আমাদের তোড়জোড় খুব বেশী ছিল, উঠেপড়ে লেগেছিলাম, একটা ভালো অনুষ্ঠান উপহার দিতেই হবে। আমাদের তোরজোড়টা ইন্ডিয়ানরা টের পেয়ে যায়। ওদের পক্ষ থেকে একবার অফার দিল একসাথে অনুষঠান করার। আমরা স্ট্রেইটওয়ে নিষেধ করে দিলাম। মাথা খারাপ, ওদের সাথে অনুষ্ঠান করতে যাব কোন দুঃখে। আগেই বলেছি, ওদের আর আমাদের ভাষা ভিন্ন, একসাথে অনুষ্ঠেন করলে হিন্দির প্রভাব বেশী থাকবে। বাংলা গান-টান হয়তো একটা দুটা হবে। ফলে হিন্দির মাঝে বাংলা হারিয়েই যাবে। তাছাড়া ওদের নাচ-গানে হিন্দু ফিলোসোফির প্রভাব থাকে, আমাদের সংস্কৃতিতে তা নেই। সুতরাং ওদের সাথে অনুষ্ঠান করলে আমাদের আর নিজস্ব সংস্কৃতি উপস্থাপন করা হবে না।

তার কিছুদিন আগে ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টস কম্যুনিটির নতুন সভাপতি নির্বাচিত হয়। যে সভাপতি হয় তার নাম কেকে। রুবেল এসে আমাকে বলল, “ঐ যে মোচওয়ালা সিনিয়র ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টটা আছে না, ও আজ গিয়েছিল আমার ম্যডামকে অনুষ্ঠানের দাওয়াত দিতে। আমি শুনে বললাম,
: ও আচ্ছা, কেকে গিয়েছিল।
: ও একাই গিয়েছিল।
রুবেলের উত্তর।
: হু কেকে।
: ও একাই।
: ঐ তো, বুঝলাম কেকে গিয়েছিল।
আমি আবার জোর দিয়ে বললাম। আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রুবেল বলল।
: ও একাই তো গিয়েছিল।
: আরে দূর। আমি কোন প্রশ্ন করছি না। ওর নামই কেকে।
: ও তাই বলো,
হাসিতে ফেটে পড়ল রুবেল।

ভারতের অনুষ্ঠান হয়ে গেল, খুব সুন্দর হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে এদেশের মানুষ এম্নিতেই ভারত বলতে অজ্ঞান (আমার এক বন্ধু একবার বলেছিল, ভারত এমন একটা দেশ যে, রাশিয়া ছাড়া আর কোন দেশের সাথেই তার সুসম্পর্ক নেই, আবার রাশিয়া এমন একটা দেশ যে ভারত ছাড়া আর কোন দেশের সাথেই তার সুসম্পর্ক নেই)। হিন্দি সিনেমা তখন সোভিয়েতে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। আসলে অন্যান্য দেশের ছবি, এখানে দেখানো হতো কম। আর হিন্দি ছবি ও তার অভিনেতা অভিনেত্রিদের হাইলাইট করা হতো বেশী। বয়স্কদের দেখেছি এখনো রাজকাপুর রাজকাপুর করে। লোক ঝুঁকে পড়েছিল ওদের অনুষ্ঠানে। তার এক সপ্তাহ পর বাংলাদেশের অনুষ্ঠান, আমরা শপথ করলাম যে করেই হোক ওদের চাইতে ভালো করতে হবে। ভারতের সাথে আমাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতা।

ভারতের অনুষ্ঠান ভালো হয়েছে আমাদের আরো ভালো করতে হবে, দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে হবে, এই মটো নিয়ে প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। প্রস্তুতি অবশ্য আগে থেকেই নিচ্ছিলাম, এবার গতি ও উদ্যম বাড়ি্যে দিলাম। একসময় সমুদ্র পাড়ি দেয়া ভারতীয়দের (অথবা হিন্দুদের) জন্য পাপ ছিল, এখন সমুদ্র পাড়ি দেয়ায় আমাদের চাইতে তাদের উৎসাহই বেশী। ভারতের ছাত্র-ছাত্রী অনেক। একটা অনুষ্ঠানের জন্য নাচ-গান-বাজনা ইত্যাদি সবকিছুর পারফর্মারই তারা পেয়ে যায়। আবার ভারতীয়দের মধ্যে ছাত্রীদের সংখ্যা অনেক। আমাদের ছাত্রী প্রায় নেইই। ল্যাংগুয়েজ কোর্সে চারজন ছাত্রী এবং সিনিয়রদের মধ্যে একজন, এই পাঁচজনই সম্বল।

একটা কালচারাল ফাংশনে ছাত্রীরা সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করে। ইন্ডিয়ানরা করেছিলোও তাই। অনেক ছাত্রী নাচের পারফর্মার ছিল। একটা ফ্যাশন শোও তারা করেছে। আবার রিসিপশনে তারা অতিথিদের ঢোকার পথে দুদিকে পাঁচজন পাঁচজন দশজন ছাত্রীকে বিভিন্ন রাজ্যের জাতীয় পোশাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। শুনিতা নামে গুজরাটি একটা মেয়ে, গুজরাটি ঢংয়ে (আমাদের মত করে শাড়ি তারা পরেনা, ঢংটা ভিন্ন) শাড়ী পড়ে দাঁড়িয়ে ছিল। খুব সুন্দর লাগছিল।

আমাকে রেইনা বলল
ঃ ওদের ফ্যাশন শো তোমার কেমন লাগছিল?
ঃ ভালোইতো।
ঃ আমার ভালো লাগেনি
ঃ কেন?
ঃ তোমার কি মনে হয়নি, এখানে নারীদের অসম্মান করা হয়েছে?
ঃ কেন এমন মনে করছ?
ঃ আমি দেশে থাকতে ইন্ডিয়ান সিনেমা দেখতাম।ওদের কিছু কিছু কাহিনী হৃদয়স্পর্শী সত্যি, কিন্তু তারপরেও সিনেমাগুলোর মধ্যে এমন কিছু উপাদান থাকে যা একেবারেই নোংরা।
ঃ যেমন?
ঃ ওদের নাচগুলো একেবারেই অশ্লীল। ওরা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এটা করে।
ঃ বিষয়টা নিয়ে আমি আসলে আগে কখনো গভীরভাবে ভাবিনি, আমাকে একটু বুঝিয়ে বল।
ঃ নারীদেহের উপস্থাপনাটা এমন যৌন আবেদনময়ী কেন হবে বলতো? এসব দেখে শুনে মনে হতে পারে, নারী মানেই নির্লজ্জ্ব ও রতিসর্বস্ব। কেন কোন সংযত ও মিতশ্রী রমনীর কথা তোমরা ভাবতে পারনা? নারী নিজেকে কখন বেশী সন্মানিত বোধ করে? সৌন্দর্যের নামে যখন নারীদেহকে পণ্য হিসাবে উপস্থাপন করা হয়, তখন কি নারী নিজেকে সন্মানিত বোধ করে? কেউ যখন মন প্রাণ সঁপে দিয়ে নারীকে একটি ফুল উপহার দেয়, তখন কি নারী নিজেকে সন্মানিত বোধ করে, না কি যখন তাকে কেউ প্রেমহীন সেক্স প্রস্তাব দেয় তখন। কখন নারীর দেহমন পুলকিত হয়, যখন মুগ্ধ নয়নে তার দিকে চেয়ে বলে, “তুমি অপূর্ব! নাকি, যখন লোলুপ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলে, “ইউ আর সো সেক্সি!”

আমাদের অনুষ্ঠানের জন্য ঠিক করা হলো দুয়েক জনকে মস্কো থেকে আনা হবে। উনারা তিবিলিসিরই, ল্যাংগুয়েজ কোর্সটা তিবিলিসিতে পরে মস্কো চলে গি্যেছেন। তাদের সাথে যোগাযোগ করলে তারা সানন্দে মস্কো চলে আসেন। তাদের আনন্দ ছিল অনেকটা নেটিভ শহরে ফেরার আনন্দের মতো। সাথে করে নিয়ে এলেন ওলগা কিরিলোভনা নামে একজন রুশ ম্যডামকে। গান-বাজনায় অদ্ভুত পারদর্শী তিনি। বিশেষ করে আমাদের উপমহাদেশীয় সঙ্গিতগুলো তিনি সহজেই তুলতে পারেন যে কোন বাদ্যযন্ত্রে। উনার বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে গিয়েছে, এখনো অবিবাহিতা। অবিবাহিতা নারী রুশদের মধ্যে কম দেখা যায়, প্রায় না থাকার মতই। তাহলে তিনি অবিবাহিতা রইলেন কেন? উনার সম্পর্কে গুজব আছে, ছাত্রীজীবনে উনার একজন ইন্ডিয়ান অথবা বাংলাদেশী ছাত্রের সাথে প্রেম ছিল। ছেলেটি পাশ করার পর দেশে ফিরে যায়। উনাদের আর বিয়ে হয়নি। সেই থেকে একাই আছেন ওলগা কিরিলোভনা। প্রেমের জন্য এত ত্যাগ এই যুগে কমই দেখা যায়।

মূল ঘটনা সম্ভবত: অন্য জায়গায় ছিল। সে সময় সোভিয়েতদের ভিন জাতি বিবাহে প্রচন্ড জটিলতা ছিল। আইনি জটিলতা এর মধ্যে একটি। বিবাহের পর দম্পতি কোথায় থাকবে, এটা একটা ভাইটাল কোশ্চেন ছিল। অনেক পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন হেলসিংকির কনভেনশন মেনে নেয়। সেই কনভেনশন অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন রাস্ট্রের নাগরীকদের মধ্যে বিবাহ হলে, দম্পতি তাদের পছন্দ অনুযায়ী দুই দেশের যে কোন একটি দেশেই থাকার আইনগত অধিকার রাখে। এত গেল আইনের কথা। সমাজ কি দৃষ্টিতে দেখছে? সোভিয়েত সমাজে ভীন দেশী বিবাহকে খুবই নেতিবাচকভাবে দেখা হত। এছাড়া তথাকথিত কম্যুনিষ্ট আদর্শ অনুযায়ী, এটাকে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হুসাবে নেয়া হত। অনেক সময় সেই নারী অথবা পুরুষকে রাষ্ট্রের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার দায়েও অভিযুক্ত করা হতো। এই সম্পর্কিত অনেক করুণ কাহিনীও শোনা যায়। আবার সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, সোভিয়েত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ও পরবর্তিতে রাষ্ট্রনায়ক, জোসেফ স্তালিন-এরই মেয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল এক ভারতীয়র সাথে।

আমরা প্রানান্ত চেষ্টা করতে লাগলাম অনুষ্ঠান সফল করার জন্য। অনেকেই ভয় পাচ্ছিল দর্শক হবে না। ইন্ডিয়া নাম শুনতেই তো পাগল, সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে, বাংলাদেশের নাম শুনে অমন হুমড়ি খাওয়ার কিছু নাই। সবাই নানা প্ল্যান প্রোগ্রাম করছে , কি করে লোক বাড়ানো যায়। আমি বললাম, “ঘাবড়াবেন না, ডিসেম্বরে ল্যাংগুয়েজ কোর্সের প্রোগ্রামে আমরা যত ভালো পারফর্ম করেছি, তাতা আমাদের অনেক শুনাম হয়েছে। ল্যাংগুয়েজ কোর্সের সব বিদেশীদের নিয়ে আসতে পারব।” একজন সিনিয়র আমাকে বললেন, “তোমার উপর আমাদের অনেক আশা, ভালো করে যাদু দেখাবে, তাক লাগিয়ে দেবে, সবাইকে।” সবাই আমার দিকে আশার দৃষ্টিতে তাকালো। আমি যাদু দেখানোর আশ্বাস দি্যেছি। আমার সাথে থাকবে রুবেল আর দোলন।

আরেকজন বলল, “আমাদের গানও সুন্দর হবে, লোক শুনে তারিফ করবে দেখবেন।” সেলিম ভাই বললেন, “আরে ধুর! আমাদের ভাষা স্প্যানিশের মত মিষ্টি মধুর নয়। তাই গান সিলেক্ট করার ব্যাপারে আমাদের সচেতন থাকতে হবে।” আমার তখন মনে পড়ল হিণ্দুস্থানী রমেশের কথা, “বেঙ্গলী ল্যাংগুয়েজ ইজ ভেরী সুইট! আমাদের ভারতের জাতীয় সঙ্গিতটাতো বাংলাতেই।”

আমার দিকে একজন তাকিয়ে বলল, “ল্যাটিনদের লাম্বাদা, নাচটাওতো দেয়া যায়, ভীষণ দর্শক মাতাবে।” সে সময় লাম্বাদা নামে একটি গান পুরো ইউরোপে প্রচন্ড জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। জর্জিয়াতেও তার ঢেউ এসে লেগেছিল। আমার মনে আছে বাংলাদেশের ঘরে-বাইরে, চায়ের দোকানে, এখানে-সেখানে তখন একটা গান বাজত – ‘চিরদিনই তুমি যে আমার, যুগে যুগে আমি তোমারই।’ এমন অবস্থা হয়েছিল যে আমরা ঠাট্টা করে একে জাতীয় সঙ্গীত বলতে শুরু করছিলাম। সেরকম লাম্বাদাও জর্জিয়ায় আনাচে-কানাচে একবারে জাতীয় সঙ্গীতের মত বাজতে শুরু করছিল। এর মূল কারণ ছিল দুটি, প্রথমত গানটির সুর ও তাল খুব মন কাড়া ছিল, দ্বিতীয়তঃ এর সাথে নাচটি ছিল প্রচন্ড যৌন আবেদনময়ী। একটি যুগল নাচটি নাচত, সেখানে মেয়েটির পোষাক ছিল একেবারেই সংক্ষিপ্ত। একপাশ থেকে আরেকপাশ পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে মেয়েটি নাচত বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে আবেদনের ঝড় তুলে। লাম্বাদা বলতে সেই সময়ে যদিও আমরা ঐ গানটিকে বুঝতাম আসলে লাম্বাদা একটি পুরাতন নাচের স্টাইল। “Chorando se foi” (which means: the one who left crying) গানটির সাথে সেই পুরাতন নাচের স্টাইলটিই ব্যবহার করা হয়। আমি রেইনাকে একবার বলেছিলাম
ঃ ব্রাজিলিয়ান এই গানটি কিন্তু চমৎকার!
ঃ ব্রাজিলিয়ান?
ঃ কেন, আমি কি ভুল জানি?
ঃ শুধু তুমি না, সারা পৃথিবীই ভুল জানে।
ঃ তাহলে?
ঃ গানটি বলিভিয়ান।
ঃ বলিভিয়ান?
ঃ হ্যাঁ, বলিভিয়ার একটি গানের গ্রুপ গানটি প্রথম গেয়েছিল। পরে ব্রাজিলিয়ানরা এটা অনুকরণ করে আর তাল একটু দ্রুত করে দেয়। তারপর থেকে পুরো পৃথিবীই মনে করছে এটা ব্রাজিলিয়ান গান।

সবাই মিলে ঠিক করল এই নাচটি অনুষ্ঠানে ইনক্লুড করা হবে। ধীরে ধীরে অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ চলে এলো। আমরা ভাড়া করেছিলাম নগরীর নামজাদা একটি অডিটোরিয়াম। আমাদের সাথে বাজনায় সহযোগিতা করার জন্য জর্জিয়ার একটি গানের গ্রুপকে ভাড়া করা হয়েছিল। সকাল থেকেই আমরা অডিটোরিয়ামে রিহার্সাল, হল গুছানো ইত্যাদি নানা কাজে লেগে গেলাম। এত কিছুর পরও আমাদের একটু ভয় ভয় হচ্ছিল, দর্শক হবে তো? সেলিম ভাই হঠাৎ এসে উপস্থিত হয়ে বললেন দর্শকের অভাব হবেনা। পুরো বার এসে উপস্থিত হবে।
আমি কানে কানে এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, “বার মানে, সেলিম ভাই কি বলতে চাচ্ছেন?”
ঃ আরে জানোই তো, সেলিম ভাই শুরায় আসক্ত।
ঃ সে তো জানিই। সাকীতেও অরুচী নেই।
ঃ সিটি সেন্টারের একটি বারে, নিয়মিত পান করেন। সেখানকার সবাই উনার বন্ধু।

“বুঝলে, আমি ওদেরকে বলে এসেছি তুমি মানুষ শূণ্যে তোলার যাদু দেখাবে। শুনে তো ওদের তাক লেগে গি্যেছে। আবার লাম্বাদা নাচ হবে। এই সব শুনে বারশুদ্ধ সব, দল বেধে রেডী হচ্ছে আসার জন্য। আমাদের আশা ভাঙবে না কিন্তু সন্মান রাখতেই হবে।” বললেন সেলিম ভাই।

বিকালের দিকে অনুষ্ঠান শুরু হওয়ায়র ঘন্টাখানেক আগেও লোকজন খুব কম দেখলাম। আমার দু’একজন ঘনিষ্ট আরব, ল্যাটিন বন্ধু-বান্ধব ছিল, তারা এসে উপস্থিত। জিজ্ঞাসা করলাম, “বাকীরা, বাকীরা কি আসবে না?”
ঃ আরে আসবে আসবে সবাই আসবে। এখনওতো এক ঘন্টা বাকী।
রেইনা এসে উপস্থিত হলো, পয়তাল্লিস মিনিট আগে। অপূর্ব সাজে সেজেছে, একেবারে সাক্ষাৎ পরী। আমার বান্ধবী বলে বলছি না। সাজগোজের অদ্ভুত কৌশল জানে ও। যেকোন পোষাকের সাথেই মানানসই সব গয়নাগাটি মেক আপ, ইত্যাদি। সাথে নিয়ে এসেছে একগাদা ফুল।
ঃ ফুল? ফুল কেন?
ঃ বারে, তোমাকে দিতে হবেনা?
ঃ আমাকে হঠাৎ ফুল?
ঃ ওমা তুমি যাদু দেখাবে না!
ঃ ও, আচ্ছা।
বুঝলাম পারফর্মেন্সের পর স্টেজে উঠেই ফুল দেয়ার একটা রীতি আছে। আমাদের দেশে এই রীতি তখনও দেখিনি।
ঃ তোমাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন? পারফর্মেন্সের ভয়ে?
ঃ না না, আমার পারফর্মেন্সের ব্যাপারে আমি সব সময়ই কনফিডেন্ট।
ঃ তাহলে?
ঃ বাংলাদেশের কোন নাম ডাক নেই, দর্শক হবে কিনা তাই ভাবছি।
ঃ উহু, নিজের দেশকে এতো ছোট ভেবোনা। আমি ইতিহাস পড়ে দেখেছি, তোমাদের কালচারাল হেরিটেজ খুব স্ট্রং। শুধু ইংরেজ শাসনামলের কারণে, তোমাদের একটা বড় ইন্টারাপশন হয়েছে। এখন তো তোমাদের দেশ স্বাধীন। সেটা রিকভার করার চেষ্টা কর।
আমি মনে মনে ভাবছি, বুকের রক্ত ঢেলে দেশ আমরা স্বাধীন করেছি সত্য, কিন্তু দেশ গঠনে কতটুকু এগুতে পেরেছি সেটা একটা বড় প্রশ্ন।
ঃ চিন্তা করোনা। আমি দেখে এসেছি ল্যাংগুয়েজ কোর্সের সবাই রেডী হচ্ছে, সবাই আসবে।
কিছুক্ষণ পর দেখলাম সত্যিই বানের পানির মত মানুষ আসতে শুরু করল। একটা সময় আর জায়গা হচ্ছিল না, অনেকেই অডিটোরিয়ামের মাঝখানের সিঁড়ীতে বসে গেল।

অনুষ্ঠান অদ্ভুত সুন্দর হয়েছিল সেদিন। চারিদিকে প্রশংসার ঢেউ উঠেছিল। আমার যাদুও ব্যাপক প্রশংসা পেল। গুজরাটি মেয়ে আলিশা বলেছিল, “ইস ফাংশন মে সবসে আচ্ছা থা তেরা যাদুকা খেল।” এই ধীর শান্ত ভারতীয় রূপসীর আমার প্রতি দুর্বলতা ছিল, আমি জানতাম। আর রেইনা একগাদা ফুল নিয়ে মঞ্চে উঠে এসে সবার সামনেই আমার গালে চুমু খেয়ে সবাইকে অবাক করে দি্যেছিল।

আরেকটি কথা বারবার বলছিল (সেটা সে আগেও বলেছে) শাড়ী পড়ে তোমাদের মেয়েরা যখন হাটছিল পরীর মত লাগছিল। অদ্ভুত সুন্দর তোমাদের এই পোষাকটি।
ঃ তুমি শাড়ী পড়বে?
ঃ হু, কিন্ত পাবো কোথায়?
ঃ ঠিক আছে আমি দেশে গেলে এনে দেব।

তার এক সপ্তাহ পরে হলো ল্যাটিন আমেরিকানদের অনুষ্ঠান। সালসা, মিরেঙ্গে, বাচাটা, ট্যাঙ্গো, রুম্বা, সাম্বা, মুরালিজম আর কার্নিভালের মহাদেশ ল্যাটিন আমেরিকা। ওরাও খুব সুন্দর করেছিল। রেইনা গিটার বাজিয়েছিল। খুব সুন্দর গিটার বাজায় ও। ওর গিটারের সুরের মূর্ছনায় আমার কাছে মনে হয়েছিল যেন পাহাড়ী ঝর্নার গায়ে ঝরে ঝরে পড়ছে সোনালী ফুল। মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনেছিল পুরো হল। আলিশা বলেছিল তোমরা দুজন তো শহর মাতিয়ে দিলে দেখছি।

ল্যাটিন আমেরিকানরা নাচতে গাইতে খুব পছন্দ করে। ডিসকোতে আমি নাচতাম না, সংকোচ হতো। রেইনা চমৎকার নাচে। নাচের আসরে মাঝে মাঝে স্লো মিউজিক হয়। ছেলে-মেয়েরা তখন যুগলবন্দি হয়ে স্লো ডান্স করে। সব সাউথ আমেরিকান ছেলে-মেয়েরাই স্লো ডান্স করে, এর সাথে অশ্লীলতার কোন সম্পর্ক নেই । এটা ওদের কালচারেররই একটা পার্ট। ভব্যতা রেখেই ওরা এটা করত। আমি লক্ষ্য করলাম , রেইনা যখন ডিসকোতে যায় তখন ও ইন্ডিভিজুয়ালি নাচে, স্লো ডান্স করে না। একদিন প্রশ্ন করলাম
ঃ তুমি স্লো ডান্স কর না কেন?
ঃ উহু করব না। নিজের বন্ধুর সামনে অন্যের বাহুপাশে কোনদিন আবদ্ধ হব না।

ভিনদেশে এসে আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে নানা দেশের নানা বর্ণের মানুষদের কাছ থেকে দেখে আমার গভীর বোধ জন্মেছে – দেশ-বিদেশ আমাদের খন্ড দৃষ্টি ও বাস্তব বোধের অস্বস্তিকর সৃষ্টি মাত্র। এই মাটির পৃথিবীর পুরোটাই আমার দেশ। রঙে, রূপে, রম্যতায় নানা ভিন্নতা সত্ত্বেও হৃদয়বোধে ও মানবিক অনুভবে সকল মানব-মানবীই অভিন্ন।

এদিকে শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা। বলিভিয়া এই টুনার্মেন্টে অংশগ্রহনকারী দেশ ছিল। বাংলাদেশ তখন ফুটবল তো দূরের কথা কোন খেলাতেই বিশ্বকাপ খেলেনা। রেইনা অবশ্যই বলিভিয়ার সমর্থক। বাঙলাদেশ যেহেতু খেলেনা তাই আমরা যেই দেশটিতে আছি অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থক হলাম।

পরিক্ষার রেজাল্টের পর কে কোন শহর পাবে এটা নিয়ে নানা হৈ চৈ হচ্ছিল। সাধারনতঃ এটা রেজাল্টের উপর নির্ভর করে। যাদের রেজাল্ট ভালো তাদের ভালো শহরগুলোতে দেয়া হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন কলেবরে একটি মহাদেশের মতই বিশাল। তার শহরের সংখ্যার কোন ইয়ত্তা নেই। রিপাবলিকই তো পনেরটা। সেই পনেরটি রিপাবলিকের আবার পনেরটি রাজধানী। গতানুগতিকভাবেই সবাইই মস্কো যেতে চায়, রাজধানী, দেশের কেন্দ্র সবরকম সুযোগ সুবিধাই অনেক বেশী। এশিয়ান সিটি যেমন তাসখন্দ, বাকু, আশগাবাদ ইত্যাদিতে কেউ যেতে চায়না। বলে ওখানে কিছু নেই। এই কিছু নেই বলতে একেবারে কিছি নেই তা নয়। এর যেকোনটিই আমাদের ঢাকার চাইতে বহু গুনে উন্নত। আসলে সবার লক্ষ্য ইউরোপ। অগ্রসর সংস্কৃতি। অপেক্ষাকৃত কম উন্নত, কনজারভেটিভ এশিয়া কেউ চুজ করতে চায়না। জনপ্রিয়তার দিক থেকে মস্কোর পর আসে লেনিনগ্রাদ (বর্তমান নাম সাংক্ত পিতেরবুর্গ বা ইংরেজী উচ্চারণে সেন্ট পিটার্সবার্গ), ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ, ইউক্রেনের পুরাতন রাজধানী খারকভ, বিলোরাশিয়ার রাজধানী মিনস্ক, ইত্যাদি। অনেকে একটু এগিয়ে গিয়ে মস্কোর চাইতেও বেশী প্রেফারেন্স দেয় তিনটি বাল্টিক প্রজাতন্ত্র লাটভিয়া, লিথুনিয়া এবং এস্থোনিয়ার রাজধানী যাথাক্রমে রিগা, ভিলনুস ও তাল্লিন। কারণ অনেকে মনে করেন সংস্কৃতিগত দিক থেকে তারা রুশদের চাইতে উন্নত। আবার ছেলেরা মুচকি হেসে আকর্ষণের কারণ হিসাবে বলে, ওখানকার মেয়েরা অনেক বেশী সুন্দরী আর অনেক বেশী খোলামেলা।

আমি শহর নিয়ে অতো মাথা ঘামাইনি। ভাবলাম কি হবে মস্কো গিয়ে? প্রচন্ড ঠান্ডা, অত ঠান্ডা আমি সইতে পারব না। আর রাজনীতির হাওয়া বদলের ক্রাইসিসের ছোঁয়ায় জিনিস-পত্রের দামও আকাশ ছোঁয়া। আমাকে ডেপুটি ডীন ডেকে বললেন, “তুমি ভালো ছাত্র ছিলে, তাই তোমাকে চয়েস দিচ্ছি, তোমার সাবজেক্টওয়ালাদের জন্য দুটো শহর আমার হাতে আছে, তিবিলিসি ও খারকভ। তুমি কোনটা বেছে নেবে?” তিবিলিসি শহরে একটা বছর কেটে গেছে। শহরটা আমার দেখা তাই তার প্রতি আমার আর কোন ফ্যসিনেশন ছিল না। ভাবলাম এই দেশের আরেকটা শহর দেখি।
রেইনা ভালো ছাত্রী হওয়ার পরও, মস্কোতে সীট না থাকার না কারণে ওর মস্কোর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া হলোনা। ওকে কিয়েভে সীট দেয়া হলো।
ঃ এখন কি করবে? কিয়েভে যাবে? তুমি তো মস্কো যেতে চাইছিলে।
ঃ আমি অত সহজে হার মানার মানুষ না। ব্যবস্থা একটা করবই।
বলল রেইনা।

জুনের শেষে অনেকেই হোস্টেল ছাড়তে শুরু করল। এটা ঠিক একেবারে চলে যাওয়া না। সামার ভ্যাকেশন কাটাতে বাইরে যাওয়া। বেশীরভাগই যাচ্ছে নিজ নিজ দেশে। মাত্র এক বছর আগে দেশ থেকে এসেছে, তাই দেশের প্রতি টান সবারই বেশী। অন্যদিকে, সিনিয়রদের দেখতাম ভ্যাকেশনগুলো কাটাতো ওয়েস্ট ইউরোপের কোন দেশে, মাঝে মধ্যে সিঙ্গাপুরে। আমাদের ল্যংগুয়েজ কোর্সওয়ালাদের মধ্যে থেকেও কয়েকজন ইউরোপের কোথাও গেল। জুলাই-আগস্ট এই দুমাসের জন্য বাইরে যাওয়া তারপর আবার সবাই ফিরে আসব এই হোস্টেলে। সাত-আট দিনের জন্য। এরপর একবারে চলে যাব, যে যার নির্ধারিত বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরে। আমি সামার ভ্যাকেশন কাটাতে দেশে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম আর রেইনা ঠিক করল স্পেনে যাবে।ওদের কাছে স্পেনটা অনেকটা আমাদের কাছে ইংল্যান্ডের মত।ছুটিতে দেশে যাওয়ার আনন্দে অনেক উৎফুল্ল ছিলাম। রেইনা সামারে ওর দেশে যাবেনা। ঠিক করেছে স্পেন যাবে। সামার টাইমটাতে রাশ খুব বেশী থাকায়, প্লেনের টিকিট পাওয়া খুব ঝামেলার ব্যাপার। তাছাড়া ওখান থেকে একটা এয়ারলাইন্সই তখন মস্কো থেকে ঢাকা আসত – বিশ্বের বৃহত্তম এয়ারলাইন্স ‘এরোফ্লট’। দেশে থাকতে এই এয়ারলাইন্সটির অনেক বদনাম শুনলেও আমি নিজের অভিজ্ঞতায় সেরকম কিছু দেখিনি, বরং তার ফ্লাইং ল্যান্ডিং খুবই স্মুথ। তাছাড়া তখন পর্যন্ত ইন্টারন্যাশনাল রূটে এরোফ্লটের একটিও দুর্ঘটনা ছিল না। তিবিলিসি থেকে প্লেনে চড়ে মস্কো এলাম। মাত্র দুঘন্টার পথ। মাত্র বলছি, আসলে দূরত্ব তো অনেক। ট্রেনে যেখানে লেগেছিল তিনদিন চার রাত্রি, বিজ্ঞানের অপর উপহার প্লেনের কল্যাণে, সেই দুরত্ব কমে এসে হলো দুই ঘন্টা। বাংলা সাহিত্যের অনন্য সাধারণ কর্ম যাযাবরের দৃষ্টিপাতে পড়েছিলাম, ‘বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ’। আমি এই উক্তির সাথে একমত হতে পারিনা। ট্রেন ও প্লেন দুটোই বিজ্ঞানের অবদান। আর বিজ্ঞানের কল্যাণেই আবেগ প্রকাশ করার সুযোগ অনেক বেড়ে গিয়েছে। যাহোক মস্কো এসে মাত্র একদিন ছিলাম, কোথাও আর বের হয়নি। বিশাল মস্কো শহরে অনেকগুলো এয়ারপোর্ট, যতদূর জানি ছয়টি। তিবিলিসি থেকে এসে নামলাম ভ্নুকোভা এয়ারপোর্টে। তবে এই এয়ারপোর্ট থেকে প্লেন ঢাকা যাবেনা। তাই সেখান থেকে ট্যাক্সি নিয়ে চলে এলাম, শেরমিতোভা এয়ারপোর্টে। ঢাকা থেকে এসে এই এয়ারপোর্টেই প্রথম ল্যান্ড করেছিলাম। ভ্নুকোভা থেকে শেরমিতোভা আসার পথে নতুন অগ্রহ নিয়ে মস্কো দেখছিলাম। গ্র্যান্ড সিটি। তার বিশালত্ব অল্পতে বর্নণা করা যাবেনা। ঢাকার মানিক মিয়া এ্যভেনিউকে এক সময় খুব চওড়া মনে হতো আমার কাছে। মস্কোর সব রাস্তাই সেরকম এবং অনেক রাস্তা আবার তার দ্বিগুনেরও বেশী চওড়া। দুপাশের দালান কোঠাও অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। যেতে যেতে এক যায়গায় দেখলাম সুউচ্চ ধাতব স্তম্ভের উপর, বিশাল এক ধাতব মুর্তি। পুরো ভাস্কর্যটা দেখে মনে উর্ধবগামী কোন অতিমানব। আমি ট্যাক্সি ড্রাইভারকে প্রশ্ন করলাম, “এটা কার মুর্তি?” ট্যাক্সি ড্রাইভার উত্তর দিল, “ইউরি গ্যাগারিন”। ওহ! এইতো সেই গ্যাগারিন, পৃথিবীর প্রথম নভোচারী।

মস্কো থেকে প্লেনে চড়ে রওয়ানা দিলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। বারো ঘন্টা জার্নির পর (মাঝখানে দুবাইয়ে কিছু সময়ের জন্য হল্ট করেছিলাম), যখন ঢাকা এসে পৌছেছিলাম মনে হচ্ছিল আমি আমার আপন ডেরায়, নিজের ঘরে ফিরে এসেছি। স্পষ্ট মনে আছে, প্লেন থেকে নেমেই মাটি ছুঁয়ে চুমু খেয়েছিলাম।

দেশে এসে ডায়েরিতে লিখেছিলাম, ‘এখানে আসার পর আবার নিজেকে ফিরে পেয়েছি। ওখানে যাওয়ার পর পরিবেশ-পরিস্থিতির চাপে বা প্রভাবে নিজের অনেক বিশ্বাস এবং নীতির প্েতি নিজেরই অনেক সন্দেহ জেগেছিল। কিন্তু দেশের শান্তিময় পরিবেশ আমার সন্দেহগুলোকে ধুয়ে মুছে ফেলেছে। আপাতঃ ঝলমলে প্রতিচ্যের প্রতি সবার একটা দুর্নিবার আকর্ষণ আছে। প্রতিচ্যের কাছে তার এই ঝলমলানির কতটুকু মূল্য আছে জানিনা, কিন্তু আমাদের কাছে তা অর্থহীন। আসলে প্রাচ্যের হয়ে প্রতিচ্যের অনুসরণ করতে যাওয়াটা নিছক বোকামী, এতে নিজেকেই জলান্জলী দেয়া হয়।’
অনেক পরে আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমি সেদিন ঠিক লিখিনি। এক বৎসের বসবাস একটি দেশকে জানার জন্য যথেষ্ট নয়।

দেশ থেকে ফিরে এলাম তিবিলিসিতে। রেইনা তখনও স্পেন থেকে ফেরেনি। আমি ওর জন্য কিছু উপ হার দেশ থেকে নিয়ে এসেছিলাম, অপেক্ষায় ছিলাম ও আসলেই দেব। হঠাৎ আমার মনে হলো, ‘রেইনার জন্য একটা শাড়ীতো আনলাম না। এত কিছু আনলাম, আর শাড়ী আনার কথা বেমালুম ভুলে গেলাম!

ও স্পেন থেকে যেদিন ফিরে এলো। অনেকদিন পর ওকে দেখে আমার মন ভরে উঠল। চেয়ে চেয়ে এত দেখেও যেন সাধ মেটে না শুধু দেখতেই ইচ্ছা করে। মুক্তার মত দাতগুলি ঝিলিক দি্যে ওঠে।
বার্চ পাতার মর্মর ধ্বনির মতই মিষ্টি ও মুখর। তার লাবণ্য ও দিপ্তি-সৌরভে মন নেষায় নিমেষে রঙিন হয়ে ওঠে।
ঃ রেইনা, তুমি কয়েকদিন দেরী করে এলে মনে হয়?
ঃ হ্যাঁ তাই।
ঃ মস্কোতে হল্ট করেছিলে?
ঃ ঠিক ধরেছ।
ঃ কেন?
ঃ সারপ্রাইজ।
ঃ কি সারপ্রাইজ?
ঃ আমি মস্কো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির অনুমতি পেয়েছি।
ঃ বাহ্, বেশতো! কি করে পেলে?
ঃ বললাম না আমি হার মানব না। আমি ওখানে ডীনের সাথে দেখা করি। আমার আগ্রহ দেখে তিনি, ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। ব্যাস, টিকে গেলাম।
সাবাস, মেয়ে সাবাস। পরাজিত হবার জন্য মানুষ হয়ে জন্ম হয়নি।

পর মুহূর্তে আমার মনে হলো। এরপর কি? আমাদের মধ্যে অনেক বাধা। ধর্ম বাধা, সংস্কৃতি বাধা, এমনকি আমরা নিজেরাই বাধা। আমাদের প্রেমের জন্ম হয়েছিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে। কিন্তু স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা তো মোছার নয়। আমরা কোন চূড়ান্ত পরিণতি চাইনি। নারী-পুরুষের সম্পর্কের চূড়ান্ত পরিণতি কি? বিবাহ? এই চূড়ান্ত পরিণতির ব্যপারে আমরা কেউই সচেতন ছিলাম না। আমি কি ভাবব? এই অল্প কয়েকদিনের পাওয়াতেও স্বস্তি সার্থকতা আছে। চির ও চিরন্তন করে মানুষ মানুষকে পেতে পারেনা। এই অল্পকালকেই সেই চিরকাল ভাবব।টেপ রেকর্ডারে তখন বীর মুক্তিযোদ্ধা আজম খানের রোমান্টিক অথচ বিরহের গান বাজছে, ‘প্রেম চিরদিন দূরে দূরে এক হয়ে থাকনা, মিললেই তো ফুরিয়ে যাবে।’

আজ বিদায়ের আগের রাত। রেইনা আমার রূমে এসেছে। সেই রাতে হঠাৎ করেই ঝড় হলো। ঝরের রাত্রি। বাইরে বাতাসের প্রচন্ড দাপাদাপি। আকাশে মেঘ তেমন ছিল না, কেবল বাতাসটাই বেশী। প্রসস্ত কাঁচের জানালা দিয়ে দেখছি গাছের মাথাগুলো বাতাসের ঝাপটায় কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এই তো অভিসারের রাত্রি। এই রাত্রটিতে কি আমরা একবার আমাদের দেহ-মনের উত্তাপ গ্রহন করতে পারিনা? সুন্দর প্রসন্ন মূর্তি – বয়স কম বলে উম্যানস ক্লাসিকাল বিউটি এখনো আসেনি, অর্থাৎ সেটাকে বর্ষার ভরা নদী বলা চলবে না। কিন্তু কিছুটা চাঞ্চল্য কিছুটা সৌম্য, সে এক ভিন্ন সৌন্দর্য্য। নারীর সৌন্দর্য্যের বয়স ভেদে তারতম্য তো হবেই।
প্রসস্ত জানালা দিয়ে বাইরের ঝড়ের তান্ডবে ছেয়ে যাওয়া অন্ধকারাচ্ছন্ন পাহাড়টিকে খুব রহস্যময় মনে হচ্ছিল। আমার রূমে বাজছে রেইনার প্রিয় মোসার্টের মিউজিক, গভীর আবেগ আর দরদ ভরা সে সঙ্গীত। মোসার্ট চরম দুঃখ আর হতাশার মুহূর্তে অনন্য সুর বন্দনার রূপ দি্যেছিলেন। সেই ক্ষণ যেন আমার সামনেও উপস্থিত হয়েছে। এই মিউজিকের মোলায়েম ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে আমার খুব স্লো ডান্স করতে ইচ্ছে হলো। আমি রেইনার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। ও আবেশে আমার বাহুপাশে চলে এলো। পরস্পর পরস্পরের নিবীড় বাহুবন্ধনে আমরা অনেকক্ষণ নেচেছিলাম।

কি আশ্চর্য্য অতল রেইনার কালো জোড়া চোখের দৃষ্টি। সেই দৃষ্টির গহীন অরণ্যে ঝড় চলছে, নারী-পুরুষ সান্নিধ্যের সেই চীরকালীন ঝড়। গভীর দৃষ্টি নিয়ে ওর দিকে তাকালাম। কারো মুখেই কোন কথা নেই। কথার শেষ আছে কিন্তু অনুভূতি অতলস্পর্শী, সুদুর প্রসারী। তাই মুখের ভাষায় কথা না বলে, বললাম চোখের ভাষায়। রেইনা মনের ভাষা দি্যে সেটা পড়তে পারল। ওর ললাটে গালে আমি চুমু খেয়েছি অনেকবার। ওর ওষ্ঠ স্পর্শ এখনো পাইনি, চাইওনি। আজ মন আবেগ-দীপ্তি দিয়ে তাই চাইল। আমি আমার মুখটা ওর মুখের কাছাকাছি আনতেই, ও আগের মত ওর গাল অথবা ললাট নয় ঠোটটিই বাড়িয়ে দিল।আমার কম্পিত ঠোট দুটি রাখলাম ঐ সূর্য-পক্ক ঠোটে. নারীর ঠোটে এই প্রথম ঠোট রাখা। কেমন মৃদু কোমল সে স্পর্শ। ‘অধরের কানে যেন অধরের ভাষা’. জর্জিয়ার পাহাড়ে দেখা দুস্প্রাপ্য একটি নীলচে বেগুনী বুনো ফুলের পাঁপড়ি স্পর্শ সুখের অপেক্ষায় । আমি সমস্ত মন উজাড় করে গভীর আবেগে ওকে আলিঙ্গন করলাম।

বিদায়ের শেষ মুহূর্তে হয়তো কান্নায় ভেঙে পড়ব, সেই ভয়ে কেই কারো মুখের দিকে তাকাতে সাহস পাচ্ছিলাম না। রেইনা সাহসী শক্ত মেয়ে, ওর বুকের ভিতর অশ্রুর নদী বয়ে গেলেও বাইরের চোখে বারি ঝরবে না, এমনটিই ধরে নিয়েছিলাম। হঠাৎ করেই যেন বাধ ভেঙে গেল। রেইনা অঝোর ধারায় কাঁদছে। মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম, “কেদোনা রেইনা”। আমি বললাম। পিছন থেকে গুজরাটি মেয়ে আলিশা বলল, “ওকে ধর”। দুহাত দিয়ে মুখখানি তুলে শিশির-ভেজা কামিনী ফুলের দিকে অপলক চেয়ে রইলাম। সমস্ত আবেগ-আনন্দ, বেদনা-দুঃখ দিয়ে বহু জোড়া কৌতুহলী দৃষ্টির সামনে ওর মুখের দিকে সকাতর চেয়ে রইলাম। রেইনার মুখটি বেলা শেষের আকাশের মত ম্লান ও রক্তিম হয়ে উঠল।

এয়ারপোর্ট পর্যন্ত আমি আর গেলাম না, আবেগ ধরে রাখতে পারব না ভেবে। আমার কাশ্মিরী বন্ধু এজাজ একটি ট্যাক্সি ডেকে নিয়ে এলো। আমাকে বলল, “তুমি থাক, আমি ওকে এয়ারপোর্ট পৌঁছে দিয়ে আসি।” রেইনা, এজাজ আর পেরুর কার্লা গাড়ীতে উঠল। বুড়ো জর্জিয়ান ট্যাক্সি ড্রাইভার একবার আমার দিকে, একবার রেইনার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু আঁচ করতে পারল। আমাকে বলল, “চিন্তা করনা, আমি ঠিকমতো পৌছে দেব।” মৃদু একটা শব্দ করে স্টার্ট নিল রাশান ভলগা। স্থীর গাড়ী গতিশীল হয়ে উঠল, তারপর ককেশাস পাহাড় আর সবুজ বনের পটভূমিতে ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল। আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। এটাই বোধহয় আমাদের শেষ দেখা। “মন খারাপ করোনা এটাই জীবন।” কোন ফাকে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আফসানা, খেয়ালই করিনি। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম আফসানার পরনে আজও চমৎকার নীল শাড়ী। আগের মতই সুন্দর লাগছিল ওকে শাড়ীতে। আর রেইনা? রেইনা চলে গেছে। শাড়ী পরা এ জীবনে তো তার আর হলোনা!

 

 

১,৬৯৯ বার দেখা হয়েছে

৪ টি মন্তব্য : “রেইনা (৩) – একটি প্রেমের গল্প”

  1. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    গল্প কি শেষ?
    প্রথম দুটো পর্ব পড়া হয়নি, কিন্তু আপনার প্রকাশভঙ্গির জোরটা এ গদ্যেই টের পেলাম ভালোভাবে।হৃদয় নিংড়ে লিখেছেন।

    শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত প্রসংগে সামান্য কিছু মতামত:

    হ্যাঁ, একমত যে, বাংলাদেশ-ভারত যৌথ অনুষ্ঠান আমিও করতে চাইবোনা কখনোই, কারণ ওরা সবঅর্থেই ডমিনেট করার চেষ্টা করবে আমাদের - বাংলাদেশ ওদের কাছে খুব ছোট একটা দেশ, ওদের সংগে একসংগে মঞ্চে উঠলে আমাদের স্বাতন্ত্র‍্য রক্ষা করা মুশকিল হয়ে যাবে।ভারতীয়দের সাংস্কৃতিক প্রকাশভঙ্গি পৌরাণিক দেব-দেবী নির্ভর অনেকটাই, ঐতিহ্যগতভাবেই।

    তবে ধর্মের অমিলটা আমার কাছে গৌণ মনে হয় এক্ষেত্রে।ছাত্র বা তরুণ বয়সীদের যে কোন উপস্থাপনাতেই আমি দেখেছি ওরা বলিউডি ফর্মুলা অনুসরণ করে ভারতকে উপস্থাপন করার জন্য, যেটা আমরা করিনা। ওদের কাছে গ্ল্যামারটা অনেক প্রাধান্য পায় (লোকে তা খায়ও), আমরা প্রাধান্য দিয়ে থাকি আমাদের কাব্য, লোকাচার, সংগীত এগুলোর ওপর।

    এবং ভারতীয় সংস্কৃতির এই উপস্থাপন মূলত: উত্তরভারতীয় মানসিকতা ও বলিউডি চালচলনের একটা বাণিজ্যিক ও উৎকট মিশ্রণ।চটক আছে, বিকোয় ভালো।ভারতীয় সংগীত ও কাব্যের যে অংশটুকু অধিক সৌষ্ঠভমণ্ডিত, দুঃখজনকভাবে তার উপস্থাপন ক্যাম্পাসগুলোতে কমই দেখা যায়।

    এধরণের অনুষ্ঠানে হিন্দির উগ্রজয়জয়কার ভারতের অন্য ভাষাভাষীদের কাছেও বিরক্তির সৃষ্টি করে - যেমন বাঙালিদের কাছে।

    আবার ভাষাগত ঐক্যের কারণে যদিও দুই বাংলার প্রতিনিধিরা একসংগে অনুষ্ঠান করার কথা ভাবতে পারে, তবু সেখানেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ স্বাতন্ত্র‍্যের দাবী রাখে একারণে যে, আমরা মুক্তিযুদ্ধ, একুশে ছাড়া নিজের সংস্কৃতিকে উপস্থাপনার কথা ভাবতেও পারিনা।আমাদের পরিবেশনা তাই নিছক রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের গান-কবিতা সাজানো নয় -সেখানে আরো অনেক কিছু উঠে আসে যা কেবল আমাদের। কিন্তু সেখানে ধর্ম নেই।এমন কি আব্দুল আলীমের 'দুয়ারে আইসাছে পাল্কি' বা 'আল্লাহু আল্লাহু' গাইলেও সেটা ধর্ম না লোকাচারকেই প্রস্ফুটিত করে।কাজেই আমি মনে করি, বাংলাদেশের বাঙালি অনেক বেশি সেকুলার তার সংস্কৃতিতে।ভারতীয় বাঙালিও অনেক বেশি সেকুলার বৃহৎ ভারতের তুলনায়, কিন্তু সর্বভারতীয় ধারণার প্রকোপে তা আজকাল ম্লান হতে শুরু করেছে মনে হয়।

    -------------------------------------------------------------------------
    তবে এসব কথা কেবল কথা মনে এলো তাই বলে ফেলা।আপনার এই লেখাটির পাঠ-প্রতিক্রিয়ার সারাংশ আমার ওই প্রথম দুলাইনই। 🙂

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।