উত্তাল সাগর, উদ্বেল নদী, সোনার মাটি, প্রাণের দেশ (পর্ব – ২)

উত্তাল সাগর, উদ্বেল নদী, সোনার মাটি, প্রাণের দেশ

———————————— ডঃ রমিত আজাদ

পর্ব – ২

যে মাটির চির মমতা আমার অঙ্গে মাখা

 

বাংলাদেশের দৃশ্যমান সমস্ত শিলাই পাললিক অথবা স্তরিভূত শিলা। বিভিন্ন স্থানে খনন ও জরিপ চালানোর ফলে ভূতাত্বিক বিবরণ জানা গিয়েছে। দেশের অন্তর্গত চট্টগ্রামের পূর্বাংশ, সিলেট ও ময়মনসিংহের কিছু অংশ ছাড়া প্রায় সমস্তই সমতলভূমি। এইগুলো আমাদের ভূমিদেহটির উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া অজস্র শিরা-উপশিরা নদীগুলোর বহিত পলিমাটির দ্বারা গঠিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা অত্যন্ত অল্প। এ সমস্ত কারণে অনেকেই যদিও মনে করে থাকে যে, বাংলাদেশের ভূমি অপেক্ষাকৃত নতুন, কিন্তু দেশের উত্তরাঞ্চলের মাটি অনেক পুরাতন। দিনাজপুর জেলার মধ্যপারায় মাটির মাত্র ৪২২ ফুট নীচে এবং রাণীপুকুরে ৫৬২ ফুট নীচেই কঠিন শিলাস্তর পাওয়া গিয়েছে। রংপুর ও বগুরার কয়েকটি স্থানে এই স্তর মাত্র ৫০০ থেকে ৩০০০ ফুট নীচে অবস্থিত।

 

অন্ততপক্ষে ২৫ (পচিশ) কোটি বৎসর পূর্বে আদি অঙ্গার যুগে (Carboniferous) এই সমস্ত এলাকা সৃষ্ট। তখন এখানকার আবহাওয়া ছিল গরম ও আর্দ্র। অগভীর অবভূমি সমুহে এসময়ে প্রচুর বৃক্ষাদি জন্মে। বহুবিধ প্রাকৃতিক ও ভূতাত্ত্বিক কারণে এদের মধ্যে কিছু বিনষ্ট হয়ে যায় কিছু মাটির নীচে চাপা পড়ে সুদীর্ঘকাল পরে কয়লায় পরিণত হয়। যে সমস্ত গাছ এ সময় প্রচুর পরিমানে জন্মেছিল এদের মধ্যে গ্লোসোপটেরিস (Glossopteris), গ্যাঙ্গামোপটেরিস (Gangamopteris), নিউরোপটেরিডিয়াম (Neuropteridium) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বগুড়া ও রাজশাহীতে যে উৎকৃষ্ট মানের কয়লার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে তা এই যুগেই স্তরীভুত।

অঙ্গার যুগের পরপরই এই এলাকায় পরিবেশের বিশেষ পরিবর্তন আসে। যুরাসিক (Jurassic) এবং ক্রিটাসিয়েস (Cretaceous) যুগে অর্থাৎ ১৮ কোটি বৎসর আগে ভূপৃষ্ঠে আগ্নেয়গিরির তৎপরতা বেড়ে যায় ও এই অঞ্চলে আলোড়নের ফলে কোন কোন স্থান উঁচু হয়ে ওঠে। এই যুগেই পৃথিবীতে ডাইনোসরদের আবির্ভাব ঘটে। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে এই স্তরটি মাটির ব হু নীচে থাকায় এখন পর্যন্ত কোন ডাইনোসরের জীবাস্ম বাংলাদেশে পাওয়া যায়নাই।

 

এর পর প্যালিওসিন-ইয়োসিন (Paleocene-Eocene) সময়ে প্রায় ৭ কোটি বৎসর পূর্বে এই এলাকায় সামুদ্রিক পরিবেশের সূচনা হয় এবং অনেক স্থানের ভূমি উঁচু হয়ে যায়। সিলেটে চুনাপাথরের স্তর এই সময়ে গঠিত হয়। এই সময়ের পরপরই ভূপৃষ্ঠে মহাদেশীয় পরিবেশের (Continental environment) সৃষ্টি হয়।

 

অলিগোসিন (Oligocine) যুগে অর্থাৎ প্রায় ৪ কোটি বৎসর পূর্বে এই এলাকার ভূমির আবার অধোগমন হতে থাকে এবং ভূমি সমুদ্রের মধ্যে চলে যেতে থাকে। আরপর বেশ কয়েকবার ভূপৃষ্ঠের স্বল্প উৎক্ষেপন ও  অধোগমন হয়। অবশেষে পরিপূর্ণ মহাদেশীয় পরিবেশের (Continental environment) সৃষ্টি হয় আনুমানিক ১ কোটি বৎসর আগে। সর্বশেষ ভূভাগ উৎক্ষিপ্ত হয় প্লায়োস্টসিন যুগে (Plaestocene age) অর্থাৎ প্রায় ১০ লক্ষ বৎসর পূর্বে । এই সময় এই এলাকার সমস্ত ভুভাগ পুনরুজ্জীবন লাভ করে। নতুন করে নদী সমুহের কার্যধারা শুরু হয়। পুরাতন ভুখন্ডগুলো ভূসোপান(terrace) হিসাবে থেকে যায় এবং অবশিষ্ট সকল অংশ পলিমাটি দ্বারা প্লাবিত হয়। এই সময়ে উৎক্ষিপ্ত জমি মধুপুর গড়, লালমাই ও বারিন্দভূমি নামে পরিচিত। একই যুগে হিমালয় পর্বতমালা যখন ক্রমশঃ উঁচু হতে থাকে তখনই চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোর জন্ম হয়। বাংলাদেশের মাটির স্তরে স্তরে গ্যাসের ছড়াছড়ি। তিতাস, বাখরাবাদ ও বেগমগন্জে প্রাপ্ত গ্যাস মাইওসিন যুগের মাটির স্তরে অবস্থিত।

 

বাংলাদেশের মাটি আক্ষরিক অর্থেই সোনার মাটি। মাটির নীচে যেমন গ্যাস, তেল, কয়লা, পিট-কয়লা, চুনাপাথর, চীনামাটি, খনিজ ধাতু, কাচ-বালু, তেজস্ক্রিয় বালু, ইউরেনিয়াম ইত্যাদি আছে (পর্যাপ্ত অনুসন্ধান না করেই এইগুলো পাওয়া, বিশেষজ্ঞদের মতে যথাযথ অনুসন্ধান করলে আরো অনেক কিছুই পাওয়া যাবে )। আবার প্রাচীন ইতিহাসের বর্ণনায় এখানে স্বর্ণ পাওয়ারও উল্লেখ আছে। তেমনি, মাটির উপরের স্তর কৃষিকাজের জন্যে খুবই উপযোগী ও উর্বর। এই সোনার মাটিতে যত রকমের ফসল ফলে, যত রকমের শাক-সব্জী হয়, যত রকমের ফলাদী বৃক্ষরাজী জন্মে, আর যত রকমের ফুলের শোভা মন উদাস করে, পৃথিবীর খুব কম দেশেই তা হয়।

 

এই মাটির জন্যেই আমরা ইতিহাসের ধারায় বহুবার বুকের রক্ত ঢেলেছি, মৃত্যু পথযাত্রী দেশ রক্ষাকারী যোদ্ধারা গান গে্যেছি – ‘যে মাটির চির মমতা আমার অঙ্গে মাখা’।

২৩৮ বার দেখা হয়েছে

৪ টি মন্তব্য : “উত্তাল সাগর, উদ্বেল নদী, সোনার মাটি, প্রাণের দেশ (পর্ব – ২)”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।