শিক্ষকের ডায়রি: পর্ব-১১

এস.এস.সি., এইচ.এস.সি., কোনটাতেই আমার বিশাল কোন অর্জন ছিল না। প্রথমটাতে মাত্র এক পেপারে লেটার মার্ক্স পেয়ে স্টার সহ ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছিলাম। আর পরেরটাতে এক বিষয়ে লেটার মার্ক্স সহ একটা সিম্পল ফার্স্ট ডিভিশন। সাধারণ রেজাল্ট, তবে আমার মা-বাবার এতে খেদ ছিল না মোটেও। ছেলেটা পাশ করেছে, এটাই তাদের আনন্দ ছিল। আমি যেন ভাল মানুষ হই, আর সম্মানের সাথে থাকি, সম্ভবতঃ এটাই তাদের চাওয়া ছিল। তাদের সেই চাওয়া কতখানি বাস্তবায়িত হয়েছে বা হবে, সেটার চেয়ে আমার কাছে এখন এটাই অনেক বড় যে, আমি তো ভালই আছি। পড়াশুনা, রেজাল্ট কিংবা তথাকথিত পজিশন নিয়ে অহেতুক আসমান ছোঁয়ার চাপ না থাকাতে শৈশব আর কৈশোরটা তো বেশ আনন্দেই কেটেছিল।

তবে হ্যাঁ, নিজের তাগিদে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা, মূল ট্র্যাকের পড়াশুনার পাশাপাশি আর দুচারটা বিষয়ে আগ্রহী হওয়া, খুব সাবলীল ভাবে কেবলমাত্র নিজের অনুধাবনেই এসব চিন্তায় ঢুকেছিলাম, তাও আবার কখনোই ক্রেজি হয়ে নয়। আর সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত মনে হয়, ভালই তো আছি, শান্তিতে আছি।

লেখাপড়া-রেজাল্ট এসবে ক্রেজি হলে কি হতো? জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলো কি তাহলে আর সেভাবে ছুঁয়ে দেখা হতো?

আসমান ছোঁয়া স্বপ্ন আমার কখনোই ছিল না, এখনো নেই। কাজ নিয়েই আছি, কাজে মগ্ন থাকছি, সময় ভাল কাটছে, এইই যা। আর এর বাইরে, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-আত্মীয়, কলিগ-ছাত্র, এদের সবার মাঝে, অধিকাংশের ভালবাসায়-ভাললাগায় বেশ তো আছি। এর চেয়ে বেশি আর কিইই বা চাওয়ার আছে?

খুব বেশি মাত্রায় টার্গেট ওরিয়েন্টেড হলে আমার আর কিইই বা লাভ হতো? সবাই মিলে, সবার সাথে একটা হাসিখুশি জীবনই তো অনেক বড় পাওয়া। আর কি চাই!

পরিবারের সন্তানেরা/ছোটরা যে রেজাল্টই করুক না কেন, তাদের পাশে থাকুন, উৎসাহ দিন। এই বাচ্চাটাই পরিনত বয়সে তার মনের অজান্তেই ভালবেসে এর প্রতিদান দেবে। নয়তো বড়দের বা মুরুব্বীদের ঠ্যালায় পড়ে অনেক কিছু অর্জন করার পরেও দিনশেষে শুধু দায়িত্বই পালন করে যাবে। অন্তরের অন্তস্থল থেকে মনের অজান্তেই ভালবেসে কোন কিছু করবে কিনা, তাতে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তার চেয়ে বরং তাদের পথ দেখান, সাধ্যমত ছোট-বড় সব অপশন তাদের সামনে এনে দিন, পছন্দমত তাদেরকেই বেছে নিতে দিন। বড় হবার রাস্তায় তার নিজের ভালমন্দ তাকেই শিখতে দিন। সাহায্য করুন, তবে আপনার অজান্তেই তার উপরে আপনার ইচ্ছেগুলো চাপিয়ে দিচ্ছেন কিনা, সেটা দশবার ভাবুন।

হরণ হয়ে যাওয়া শৈশব/কৈশোর আর চাপিয়ে দেয়া ভবিষ্যতের স্বপ্ন কি আদৌ কোন কাজে আসে?

৫৪ বার দেখা হয়েছে

২ টি মন্তব্য : “শিক্ষকের ডায়রি: পর্ব-১১”

  1. মাসুম বিল্লাহ সায়েম

    সুন্দর লিখেছেন স্যার। পড়লাম। আপনার সন্তানরা সত্যিই খুব ভাগ্যবান যে আপনার মত একজন বাবা পেয়েছেন। লেখার এক পর্যায়ে আপনি পারিপার্শ্বিক চাপের সাথে ভালোবাসার প্রতিদান এর সম্পৃক্ততা নিয়ে যে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে আপনার সন্দেহের সাথে বাস্তবতার খুব বেশি একটা তারতম্য নেই। অবশ্য যারা অনুরূপ আচরণকে এখনো সমর্থন করেন তাদেরও যথেষ্ট যুক্তি আছে। কিন্তু একটা সময় পর আসলে এটাই মুল যে ব্যক্তি তার জীবন কতটুকু তৃপ্তিসহকারে যাপন করল। এছাড়া আর কিছুই না। Glad that you are happy Sir and i think that's what makes you more successful in your career and life both.

    __আপনার সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র, মাসুম 😅
    মানারাত আশুলিয়া ক্যাম্পাস ইংরেজি ১০ম ব্যাচ।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।