আমার বাবার বাবা

আমার দাদু আলহাজ্ব ডা: শরিফউদ্দিন আহমেদ-এর সাথে আমার স্মৃতি অনেক। নাতি-নাত্নিদের সবাইকে তিনি অনেক ভালবাসতেন, সবাইকে ফিল করতেন, এবং সর্বোপরি এতবড় একটা যৌথ পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য কিছু না কিছু সবসময়ই করে যেতেন। তবে কাউকে কোলে নিয়ে আদর করার মতন অভ্যাস তাঁর ছিল বলে আমার মনে পড়ে না; অন্ততঃ আমি তাঁর কোলে চড়েছি বলে মনে পড়ে না। অবশ্য তাঁর কথায়, বাচনভঙ্গিতে, আলোচনায়, পরামর্শে আমার প্রতি তাঁর অগাধ আবেগ আমি ঠিকই টের পেতাম; সঠিক শব্দ দিয়ে সেগুলোকে সজ্ঞায়িত করা যাবে না। ছোটবেলায় দাদুর সাইকেলে চেপে আমি তেঁতুলিয়া বাজার কিংবা রণচণ্ডীর হাটে যেতাম। মিষ্টির দোকানে নিয়ে গিয়ে আমাকে সেখানে তিনি মিষ্টি খাওয়াতেন। এই স্মৃতিটা কেন যেন বারবার ফিরে আসে। আমার ক্যাডেট কলেজের ঠিকানায় সেসময় তিনি আমাকে চিঠি লিখতেন। স্বীকার করতেই হয়, তাঁর ইংরেজি ছিল সাবলীল এবং নির্ভুল। আফসোস, সেগুলো এখন আর সংগ্রহে নেই। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি আমার সাথে বন্ধুর মতন মিশতেন, তবে তৃতীয় জেনারেশনের সাথে হালকা মানের ফাজলামো টাইপের রসিকতা তিনি আমার সাথে কখনোই করেননি। বাস্তবসম্মত, জীবনমুখি, এবং একেবারে স্বাভাবিক কথায় আমার সাথে যেভাবে মিশতেন (কিংবা আমি যেভাবে তাঁর মতন একজন পার্সোনালিটির কাছে যাবার সুযোগ পেয়েছি), তাঁর হোস্টেল জীবনের কিছু টিন-এইজ দুষ্টামির কথা যেভাবে আমার সাথে স্মৃতিচারণ করেছেন, হাতে গোনা দুয়েকদিন আমার সাথে যেভাবে তাশ খেলেছেন, তাঁর সাথে এমন/এতটা বন্ধুত্বের সান্নিধ্য আর কোন নাতি/নাত্নির কপালে জুটেছে কিনা আমার তা জানা নেই। কিছুটা গম্ভীর স্বভাবের হওয়ায় অনেকেই মনে হয় তাঁর পার্সোনালিটির কাছে যেতে সঙ্কোচ করেছে/করেছেন। কেন যেন আমার ক্ষেত্রে এই সঙ্কোচ ছিল না। এখন মনে হয়, প্রচণ্ড রকমের যাঁরা সৎ এবং দায়িত্বসচেতন, তাঁদের সম্ভবতঃ এমন একটা খোলস থাকে, যেটা হয়ত দাদুরও ছিল। আমার বাবা সহ তাঁর (দাদুর) চার ছেলের একেকজন একেক রকমের, তবে প্রত্যেকেই দাদুর পার্সোনালিটির কিছু না কিছু পেয়েছেন, কিছু বেশি আর কিছু কম, এইই যা। অন্যেরা এটা না বুঝলেও আমি নিজে সাহিত্যের ছাত্র হবার কারনেই হয়ত এটা ধরতে পারি। তবে ফুপুদের কারো মধ্যেই দাদুর পার্সোনালিটির ছাপ আমি তেমন প্রকটভাবে দেখি না। এটা মনে হয় তাঁরা সেভাবে আয়ত্বে নিতে পারেননি একটা অনেক উঁচু পার্সোনালিটিকে কিছুটা ভয় পাবার কারনেই। আসলে দাদু শুধু একজন পার্সোনালিটিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটা ইন্সটিটিউশন। দাদুর মৃত্যুতে আমি অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম; আমি সেবারই প্রথম কারো কবরে নেমে দাফনের কাজে সরাসরি অংশ নিয়েছিলাম, এবং পুরো বিষয়টা আমাকে মারাত্মক রকমের একটা মানসিক চাপের মধ্যে রেখেছিল বেশ কিছুদিন।

৭৮ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।