পুষ্পাকাহিনী

“১৯৭১ সালে আমাদের কলেজে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প ছিল। এইখানে তারা বিভিন্ন বন্দীদের আটক করে রাখত। অনেক মেয়েদের উপর নির্যাতন চালানো হতো। এমন একজন মেয়ের নাম ছিল পুষ্পা। সে একদিন পালাতে গিয়েছিল কিন্তু পাকিস্তানিরা তাকে দেখে ফেলে। সে দৌড়াতে দৌড়াতে পানির ট্যাংকির উপরে উঠে। মিলিটারিরা তার পিছে ধাওয়া করে। ট্যাংকির উপরে উঠার পরে সে আর পালানোর রাস্তা না দেখে ট্যাংকি থেকে লাফ দেয়। মিলিটারিরা নীচে এসে দেখে রক্ত আছে, কিন্তু কোন শরীর নাই। এরপর থেকে আজও পুষ্পাকে ট্যাংকির উপরে সাদা শাড়ি পরে ঘুরতে দেখা যায়। পুষ্পার আত্মা হাউজের প্রতিটা ঘরে ঘরে ঘুরাফেরা করে।”

এভাবেই ক্লাস সেভেনে থাকতে সিনিয়ররা আমাদেরকে বিশ্বাসযোগ্য সব গল্প শোনাতেন এবং আমরা সেইসব কাহিনী বিশ্বাস করে রাতের বেলা পানির ট্যাংকির দিকে তাঁকাতে পর্যন্ত ভয় পেতাম। “আজকে টার্ম এন্ড নাইট, রুমে কিছু আসতে পারে, সাবধানে থাকবা।”- শুধু এই কথাটার উপর ভিত্তি করে আমাদের ৩ ক্লাসমেট এক হাতে বেল্ট আর এক হাতে হ্যাংগার স্টিক নিয়ে রাত কাটিয়েছিল, রুমে “কিছু” আসলে সেটাকে পিটাবে বলে।

ভাইয়ারা বলেছিল রাত বারোটার পরে টয়লেটে যাবা না। বারোটার পরে টয়লেটের ট্যাপ ছাড়লে পানি পরবে না, রক্ত পরবে। এই কথা শোনার পরেও একদিন সাহস করে টয়লেটে গিয়েছিলাম। এক দৌড়ে গিয়েছি, কাজ শেষ করে এক দৌড়ে চলে এসেছি। ট্যাপ ছাড়ার কোন প্রয়োজন কিংবা সাহস কোনটাই হয়নি। নতুন ক্লাস সেভেন, সবাই আদরে রাখে। ডর্ম লীডার বলেছিল রাতে টয়লেটে যেতে ভয় পাইলে ডাক দিবা। প্রায় রাতেই ভাইকে অনেক ডাকতাম, কিন্তু সে আর উঠত না।

আমার রুম থেকে টয়লেটে যেতে হলে কেচিগেটের সামনে দিয়ে যেতে হত। যাওয়ার সময় মনে হত কেচিগেটের ওইপাশের অন্ধকারে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। একটু পরে ডাক দিবে, “হাসনাঈন, কেমন আছ? ডিনারে কী ছিল? কালকে সকালে পিটি না প্যারেড?” তাই কেচিগেট, বাথরুমের ট্যাপ এইসবের কথা চিন্তা করে প্রকৃতি হাজার ডাক দিলেও ভোর হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতাম। একদিন আর পারি না। চোখ পরল রুমমেটের টেবিলের দিকে। ২ লিটারের খালি বোতল একটু পরে ভরে গেল এবং জানালা দিয়ে ফেলে দিলাম। সেই রাতের কথা মনে করে আমার সেই সেভেনের রুমমেট এবং তার বোতলের প্রতি আমি আজও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।

একসময় সিনিয়র হলাম। টার্ম এন্ড নাইট মানেই ছিল জুনিয়রকে ভয় দেখাতে হবে। অনেকে শুধু গল্প বলেই সন্তুষ্ট থাকত না। চোখে মুখে লাল সবুজ পেস্ট মাখত। সাদা বেড শীট গায়ে দিত। কত আয়োজন! ভীতু ক্লাসমেটদেরকেও ভয় দেখাতাম। তাড়াতাড়ি এসে লকারের ভেতর লুকিয়ে থাকতাম। সে লকার খুলবে, আর আমি লাফ দিয়ে তার গায়ে পরব। মাঝে মাঝে অনেক সময় ধরে বসে থাকতাম, কিন্তু কেউ আর লকার খুলতে আসত না। শেষমেশ বোরিং হয়ে নিজেই বের হয়ে যেতাম। আরও কত কী হত! ভয় দেখাতে গিয়ে ধরা খেয়ে কত ক্লাসমেটের মারের স্বীকারও হয়েছি তার হিসাব নেই।

ভয় দেখানোর সবচেয়ে ভালো জায়গা ছিল কলেজ হাসপাতাল। নির্জন জায়গা। গুজব ছিল হাসপাতালের নীচে গনকবর। গুটি কয়েক সিনিয়র আর জুনিয়র একসাথে এডমিট থাকলেই হয়েছে। কিছু সিনিয়রের পাল্লায় পরে অনেক সাহসী জুনিয়রও বলত, “আমি আর হাসপাতালে থাকতে চাই না। আমি আর রেস্ট চাই না। আমাকে রিলিজ দেওয়া হোক।” শুধু ভয় দেখানোর জন্যই অনেকে লিজেন্ড হয়ে গিয়েছিল।

একটা সময় ছিল ট্যাংকির দিকে ভয়ে তাঁকাতে পারতাম না। একদিন গভীর রাতে সাহস নিয়ে তাঁকিয়ে দেখেছিলাম ট্যাংকির উপর কিছু মানুষ দেখা যায়। ক্লাস সেভেনে ওইটাই প্রথম তাঁকানো, আর ওইটাই শেষ। সিনিয়রের দিকে মাথা উঁচু করে তাঁকানোর সাহস পেতাম, কিন্তু ট্যাংকির দিকে না। ক্লাস ইলেভেন টুয়েলভে উঠলাম। বুঝলাম ট্যাংকির মানুষের রহস্য। রাতের বেলা ট্যাংকির উপরে উঠা ছিল এডভেঞ্চারের মত। অন্ধকারে ট্যাংকির উপরে উঠলে মনে হতো চারদিকে বিশাল সমুদ্রের পানি, মাঝখানে জাহাজের ডেকের উপর আমরা কয়েকজন নাবিক। সেইদিনের ভয় পাওয়া সেভেন গুলো যখন টুয়েলভ হয়ে রাতের বেলা ট্যাংকিতে উঠে বসে থাকতাম, তখন হয়তো হাউজ থেকে নতুন কোন ক্লাস সেভেন তাঁকিয়ে ভাবত- ওই যে, পুষ্পা দেখা যায়।

১,৯৩৯ বার দেখা হয়েছে

১১ টি মন্তব্য : “পুষ্পাকাহিনী”

  1. Sorry for writing in english as i dont have this facility in my office laptop. Probably this sorts of rumors have been developed day by day. 😀 In fact,when i entered cadet college in 1982, these sort of rumors were absent. But in the biology dept,there was a skeleton( i dont know really it is there or not till today), we heard that the skeletons belong to a lady who was tortured to death in the Pak Camp wch were established in the college during our liberation war..

    জবাব দিন
  2. সাবিনা চৌধুরী (৮৩-৮৮)

    :clap: :clap: :clap: :clap:

    কাগজে কলমে ফোর্থ ব্যাচ হলেও আমরাই প্রথম কলেজে গিয়েছিলাম। তাই ভয় দেখানোর কেউ ছিলনা। তবে রাত নিঝুম হলে নিম পাখির ডাকে কী যে ভয় পেতাম! আর ছিল শেয়াল... আমাদের শহরে যে শেয়াল ছিল সেটি তো কলেজে গিয়েই জানতে পারি।

    তোমার লেখা আমার ভাল লেগেছে, ভাইয়া। আরো পড়বার অপেক্ষায় রইলাম।

    জবাব দিন
  3. মোস্তফা (১৯৮০-১৯৮৬)

    আমাদেরও এমন কিছু ভৌতিক জনশ্রুতি ছিল। এই ভৌতিক জনশ্রুতিগুলোকে আরো মসলাপাতি মিশিয়ে গল্পের মত করে রাঁধলে আরো মজাদার হবে বলেই মনে হচ্ছে।


    দেখেছি সবুজ পাতা অঘ্রানের অন্ধকারে হতেছে হলুদ

    জবাব দিন
  4. লুৎফুল (৭৮-৮৪)

    হুমম ... সব কলেজেই এমন দু'একটা গল্প আছেই ...
    তবে আজকাল আর এসবে বাচ্চা কাচ্চারা ভয় পায় বলে মনে হয় না ...

    আমার ভাই ক'দিন আগে এসেছিলো কানাডা থেকে বেড়াতে । তার পাঁচ বছরের মেয়েটিকে এক রাতে (ঠিক মধ্যরাত) খেয়ে দেয়ে ঘরে ফেরার পথে পুরোনো গাছ দেখিয়ে ব্ল্যাক ঘোস্ট আর রেড ঘোস্ট এর গল্প ফাঁদার চেষ্টা করলাম । যথেষ্ট সচেষ্ট হবার পরও দ'লাইন না বলতেই চোখ গোল গোল করে আমার দিকে তাকিয়ে বললো - "জোকিং ! বড় চাচ্চু ইজ জোকিং !" আরো চেষ্টা করতে বললো - "ইউ আর আ জোকার । হোয়াই ডু ইউ মাক আপ অল দিজ জোকস !"

    তবু আমাদের এখনো ভালোই লাগে ... হয়তো শৈশবে ফিরে যাবার একটা অনুভূতি আমাদের এক রকম আন্দোলিত করে ...

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।