ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের বাড়িতে ৩ (শেষ)

ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের বাড়িতে ১ , ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের বাড়িতে ২

সিঁড়ি দিয়ে উঠে প্রথমেই দৃষ্টি আটকে যায় কালের ধূলোয় জীর্ণ এক এলিভেটরে। একটা টানা দড়ি এর একেবারে ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত চলে গেছে আর ভেতরে একটা হুইল চেয়ার রাখা । বোঝাই যাচ্ছে হুইল চেয়ার ফ্রাঙ্কলিনের ব্যবহারের জন্য ছিল, কিন্তু টানা দড়ি? অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি বিশালদেহী ফ্রাঙ্কলিনের শরীরের সচল ঊর্ধ্বাংশের শক্তি এই এলিভেটরসহ নিজেকে টেনে তোলার পক্ষে যথেষ্ট ছিল! এটাই ছিল নীচতলা এবং ওপরতলার মাঝে তাঁর গমনাগমনের একমাত্র মাধ্যম।

বামদিকে যেতেই প্রথমে পড়ল ছোট একটি কক্ষ যেখানে ফ্রাঙ্কলিন তাঁর শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের কিছু সময় কাটিয়েছিলেন। ১৯০৫ সালে এলিনরের সাথে বিয়ের আগ পর্যন্ত ফ্রাঙ্কলিন এই কক্ষেই থাকতেন। ঐশ্বর্য আর বৈভবের মাঝে বেড়ে ওঠা ফ্রাঙ্কলিনের শৈশবে মা সারা’র প্রভাবই সব থেকে বেশী। তবে প্রেসিডেন্ট হবার পেছনে মূল অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর দূরসম্পর্কের ভাই যুক্তরাষ্ট্রের ২৬ তম প্রেসিডেন্ট থিওডর রুজভেল্ট (অফিস ১৯০১-১৯০৯)। থিওডরের প্রেসিডেন্ট হওয়াই হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে ফ্রাঙ্কলিনকে রাষ্ট্রের সবোর্চ্চ অফিস অধিকারের স্বপ্নজাল বুনিয়েছিল। হার্ভার্ডে দৈনিক মুখপাত্র ক্রিমসন পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন ফ্রাঙ্কলিন। এই কক্ষের দেয়ালে সেই ক্রিমসন অফিসের স্মৃতি ছবিবন্দী হয়ে আছে। তাঁর অফিসের ফটকে ব্যবহূত ক্রিমসনের প্রতীকটিও শোভা পাচ্ছে এ কক্ষে। ফ্রাঙ্কলিন আর এলিনরের ৫ সন্তানের মাঝে বয়োজ্যেষ্ঠ জনের জন্য এই কক্ষ বরাদ্দ থাকত। এছাড়াও করিডোরের দুপাশে সব সন্তানের জন্য ছিল আলাদা আলাদা কক্ষ। তবে সেসব কক্ষের অবস্থান আর বর্ণনা স্মৃতি থেকে পুনরুদ্ধারে ব্যর্থ হলেও যতটুকু মনে পড়ে এর প্রত্যেকটিই বেশ পরিপাটী ছিল।

করিডোর ধরে আরেকটু এগিয়ে এরপর দেখতে এলাম সাউথ উইং তৈরির আগে সারার ব্যবহূত প্রথম শোবার ঘর। গাইডের কাছে জানা গেল এই ঘরে সারার কোল আলো করে পৃথিবীতে আসা স্বাস্থ্যবান নবজাতক ফ্রাঙ্কলিনের ওজন ছিল ১০ পাউন্ডেরও বেশী। সাউথ উইং তৈরি হওয়ার পরে সারা নতুন শয়নকক্ষে স্থানান্তরিত হন। করিডোর ধরে আসার পথে তারপরেই পড়ে ফ্রাঙ্কলিন আর এলিনরের শোবার ঘর। সারার কর্তৃত্ব এবং সান্নিধ্য এলিনরকে কখনও খুব বেশী স্বাচ্ছন্দ্য দেয়নি। তাই ফ্রাঙ্কলিন প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ে ভাল-কিল কটেজ হয়ে ওঠে এলিনরের ব্যক্তিগত ধ্যানধারণা পসারের পীঠস্থল। তবে শেষদিকে ফ্রাঙ্কলিনের অসুস্থতার সময়ে এলিনর এ কক্ষেই তাঁর শুশ্রূষার জন্য পাশে ছিলেন। এই কক্ষটি সজ্জার ক্ষেত্রে উপেক্ষা আর ঔদাসীন্যের ব্যাপারটি সেই সময়গুলোর সাক্ষী।

পার হয়ে এলাম L-shaped করিডোরের সন্ধিস্থানে সারার মূল শোবার ঘরে। করিডোর এথান থেকে বাঁদিকে বেঁকে চলে গেছে বারান্দা পর্যন্ত। আসবাববিহীন সারার কক্ষটি ধূ ধূ করছে। একমাত্র পরিদৃশ্যমান – পারস্যের এক সুন্দর উপাসনার মাদুর। ফ্রাঙ্কলিনের সময়ে চমৎকার এই মাদুরটি নীচতলার মূল এন্ট্রেন্স হলেই রাখা ছিল। পরবর্তীতে National Park Service এটিকে দর্শনার্থীদের জন্য আলাদাভাবে এই ঘরে রাখে। আর এই কক্ষের শূণ্যতার রহস্য হল ফ্রাঙ্কলিনের মৃত্যুর পর সারার অনুরোধেই মিউসিয়াম কর্তৃপক্ষ এই কক্ষ থেকে সব আসবাব সরিয়ে আগের শোবার ঘরে (যে কক্ষে ফ্রাঙ্কলিনের জন্ম) স্থানান্তরিত করে।

মজার ব্যাপার হল ফ্রাঙ্কলিন তাঁর মৃত্যুর আগেই এই পুরো স্প্রিংউড এস্টেটটিকে জাতীয় দর্শনীয় স্থানে পরিণত করার সব ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন। ১৯৪৫ সালে এস্টেটটি U. S. Department of Interior এর কাছে হস্তান্তর করা হয়। ড্রেসিং রুমে ফ্রাঙ্কলিন নিজেহাতে তাই তাঁর পরণের জামাকাপড়ের ঝাঁপি থেকে কয়েকটি দর্শনার্থীদের জন্য সযত্নে সাজিয়ে রেখেছিলেন। হ্যাঙ্গারে সাজিয়ে রাখা হাল্কা আকাশী আর ধূসর রঙের ব্লেজার দুটি তাঁর অন্যতম প্রিয় ছিল।

এবারে L-shaped করিডোরের সন্ধিস্থানে হঠাৎ দেখি ৪৫ ডিগ্রী কোণে থাকা বড় এক আয়না (পেরিস্কোপের মূলনীতি অনুসরণ করে)। গাইডের কাছে জানতে পারলাম সিক্রেট সার্ভিসের স্থাপন করা এই আয়না দিয়ে ফ্রাঙ্কলিন করিডোরের এপাশ থেকে ওপাশের করিডোর ধরে আগত ব্যক্তিকে পর্যবেক্ষণ করতেন। সিক্রেট সার্ভিস কর্তৃক পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রের এহেন প্রয়োগে সবাই ভীষণ আনন্দ পেল! আমিও সেই সুযোগে এটি দিয়ে ওপাশের করিডোরে থাকা সিকিউরিটি গার্ডের সাথে বার কয়েক ইশারা বিনিময় করলাম!

এবারে করিডোরের উল্টোপথ ধরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতেই বাঁয়ে পড়ল পিংক রুম বা গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাগতদের থাকার ঘর। রাণী এলিজাবেথ এবং রাজা জর্জ IV এই কক্ষেই আতিথ্য বরণ করেছিলেন। খুব গোছানো দুটি বিছানার এই শয়নকক্ষে ড্রেসিং টেবিল, আলাদা রেস্ট রুম আছে। এই কক্ষের বিশেষত্ব হল বিছানা থেকে শুরু করে বেশ সৌখীন কিছু আসবাবপত্র যা আনা হয়েছিল অগ্নিকান্ডে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত সারা এবং জেমস এর আগের বাসভবন থেকে।

তীব্র অগ্নিভীতি ছিল ফ্রাঙ্কলিনের। সবসময় শংকা ছিল বাড়িতে অগ্নিসংযোগ হলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে যেতে পারবেন না। তাই বাড়ি সম্প্রসারণের সময় আধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার সকল সুবিধে মাথায় রেখে পরিকল্পনা করা হয় পরবর্তীতে সংযোজিত সাউথ উইংটি। স্বভাবতই অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রগুলোও হাতের নাগালের মধ্যে রাখা।

এবার সারার শয়নকক্ষের কাছে বাম দিকের সেই করিডোর ধরে পেছনের বারান্দাতে পৌঁছুলাম। ছোট্ট বারান্দাটি সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেছে উঠোন পর্যন্ত। এই উঠোনের পাশের ঢালু জায়গা ধরে শৈশবে ফ্রাঙ্কলিন বাবার সাথে স্কি করতে যেতেন শীতকালে। শেষ জীবনে ফ্রাঙ্কলিন এই বারান্দা থেকে মাঝে মাঝে অপলক দৃষ্টিতে হারানো শৈশব খুঁজে বেড়াতেন।

বারান্দার এই সিঁড়ি দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে লাইব্রেরীর সামনে গেলাম। দেখলাম ফ্রাঙ্কলিনের একটি আবক্ষ মূর্তি শোভা পাচ্ছে এর প্রবেশের মুখে। লাইব্রেরীর সামনে দাঁড়িয়ে গাইডের সাথে একমত হলাম – ফ্রাঙ্কলিন অসম্ভব বেশী রকমের ইতিহাসের আর গবেষণার বিষয়বস্তু দিয়ে গেছেন। এই লাইব্রেরীটি আজো গ্রেট ডিপ্রেসন আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনালগ্নের অনেক জীবন্ত দলিলের উৎস হিসেবে কাজ করে চলেছে। রাজনৈতিক ইতিহাসবেত্তারা তাঁদের গবেষণার প্রচুর সময় তাই এখানে কাটান। হোয়াইট হাউসে ব্যবহূত তাঁর টেবিলটি সংরক্ষিত আছে এই লাইব্রেরীতে। তাঁর শেষ জীবনে এটি Summer White House নামে খ্যাত ছিল।

এবার সংক্ষেপে ফিরে দেখি তাঁর অফিসে থাকার সময়কাল। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরে প্রথম টার্মে (১৯৩৩-১৯৩৭) ফ্রাঙ্কলিন ভঙ্গূর অর্থনীতি পূণর্গঠনেই বেশির ভাগ সময়ে ব্যস্ত ছিলেন। অভিষেক ভাষণে ফ্রাঙ্কলিন ব্যাংকার আর বড় বড় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অবহেলা এবং মাত্রাতিরিক্ত উচ্চাভিলাষকে অর্থনীতির এই ভঙ্গূরতার দায়ে অভিযুক্ত করে ভীষণ তিরষ্কারের প্রয়াস পেয়েছিলেনঃ

Primarily this is because rulers of the exchange of mankind’s goods have failed through their own stubbornness and their own incompetence, have admitted their failure, and have abdicated

ঐতিহাসিকরা ফ্রাঙ্কলিনের সে সময়ের উদ্যোগকে সংক্ষেপে “relief, recovery and reform” নামে অভিহিত করেন। প্রথম টার্মেই তিনি বেকারত্বের হার ভালই নিয়ন্ত্রণে আনতে সমর্থ হন (২৫% থেকে ১৪%)। জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার (G.N.P.) অফিসে আসার সময় থেকে ১৯৩৬ সালে প্রায় ৩৪% আর ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্বালে প্রায় ৫৬% বৃদ্ধি পেয়েছিল। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাময়িক রাষ্ট্রীয়করণ ছাড়াও ফ্রাঙ্কলিনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান হল ১৯৩৭ সালে তিনিই সর্বপ্রথম বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী এবং বেকারদের অর্থনৈতিক পুণর্বাসন নিশ্চিতকরণে ভাতার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। এটিই ঐতিহাসিক সোস্যাল সিকিউরিটি এক্ট(Social Security) নামে পরিচিত। তবে রাজস্ব বৃদ্ধিতে আয়করের নতুন আইন প্রণয়নের (Undistributed profits tax, Social Security Payroll Tax,
Fair Labor Standards Act) কারণে ১৯৩৭ সালের শেষে বেকারত্বের হার কিছুটা বেড়ে গেলেও ১৯৪৩ সালের গোড়ায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে সামরিক বাহিনীগুলোতে নিয়োগ বৃদ্ধি বেকারত্ব হ্রাসে বিশেষ অবদান রেখেছিল। ফ্রাঙ্কলিনের পুরো সময়ে প্রায় ১৮.৩ মিলিয়ন নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত ফ্রাঙ্কলিন কখনও নতুন করারোপ করেননি ।

গ্রেট ডিপ্রেসনের সময়ে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের ভূমিকা ফ্রাঙ্কলিঙ্ককে শত্রু ও মিত্রদের মাঝে করেছে নিন্দিত ও নন্দিত । ১৯৩৯ সালে আগস্ট মাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিনকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন নাৎসী জার্মানীর আণবিক বোমার তৈরির সমস্ত পরিকম্পনার কথা। এই তথ্যের ভিত্তিতেই রবার্ট ওপেনহাইমারের নেতৃত্বে সূচনা হয় আণবিক বোমা তৈরির সূতিকাগার কুখ্যাত “ম্যানহাটন প্রজেক্ট”(১৯৩৯-১৯৪৫)এর। এর ফলস্রুতিতে ফ্রাঙ্কলিনের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুমানের নির্দেশে ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোসিমা আর নাগাসাকিতে আণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয় এবং রচিত হয় ইতিহাসের কাল অধ্যায়ের। তবে ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় যুদ্ধের প্রথমদিকে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন শুধু ইংল্যাণ্ড এবং ফ্রান্সকে জার্মানীর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিরবিচ্ছিন্ন সামরিক সহযোগীতা প্রদানে সম্মত হয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের ব্যাপারটি পুরোপুরি নিশ্চিত হয় ১৯৪১ সালের ৭ই ডিসেম্বর জাপানের পার্ল হার্বারে আক্রমণের পরে। বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে মিত্র বাহিনীর জয়ের বিষয়ে নিশ্চিত হলে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ঔপেনিবেশিকতা আর সাম্রাজ্যবাদ অবসানে ইউরোপীয় রাষ্ট্রপ্রধানদের উপর চাপ সৃষ্টি করেন। পৃথিবীজুড়ে সাম্রাজ্যবাদের অবসানে ফ্রাঙ্কলিনের ভূমিকা মিত্র বাহিনীর সদস্যরাষ্ট্র বিশেষতঃ ইংল্যাণ্ড এবং ফ্রান্স এর বিশেষ অসন্তোষের কারণ হয়।

তবে ফ্রাঙ্কলিনের পারিবারিক জীবনে অবিশ্বস্ততা তাঁকে করেছে বিতর্কিত । প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ে ফ্রাঙ্কলিনের প্রতি অন্তর্মুখী স্বভাবের এলিনরের অবিশ্বাসই পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতির মূল কারণ ছিল। এই অবিশ্বাস প্রমাণিত হওয়ার পরে ৫ সন্তানের জনক এবং জননী ফ্রাঙ্কলিন এবং এলিনরের বৈবাহিক সম্পর্কের সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ না ঘটলেও নড়বড়ে হয়ে যাওয়া বিশ্বাসের ভিত কখনই শক্ত হয়নি। এজন্য এ সম্পর্কটি ইতিহাসে “Marriage of convenience” নামে খ্যাত। সম্পর্কের এই টানাপোড়েনে একমাত্র ভাল-কিল কটেজেই এলিনর খুঁজে পেতেন স্বাচ্ছন্দ্য আর উপভোগ করতেন সারার কর্তৃত্বময় সান্নিধ্য থেকে মুক্তির আস্বাদন।

ট্যূর শেষে এবারে ফিরে যাবার পালা। গাইডের মতে এই ট্যূর নাকি ছুটির দিনে দর্শনার্থীতে ঠাসাঠাসি থাকে। ৫০ জন নিয়ে ট্যূর করা তাঁর কাছে নতুন কোন ব্যাপার নয়। কিন্তু রবিবারের সেই পড়ন্ত বিকেলে আমরা মাত্র দু’দল পর্যটক সেই ট্যূরে অংশ নিচ্ছিলাম। এর কারণ বলার অজুহাতে অপ্রাসংগিকতা টেনে আনার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। সেটি হল সেদিনের নির্ধারিত সুপার বৌল (Super Bowl) ম্যাচ। সংক্ষেপে এটি হল আমেরিকান ফুটবলের গ্র্যাণ্ড ফাইনাল (আমাদের ফুটবল এখানে সকার নামে পরিচিত। যারা আমেরিকান ফুটবলের সাথে পরিচিত তারা জানেন খেলাটির নিয়মকানুন হাত,পায়ের ব্যবহার এবং প্রতিপক্ষকে বাধাদানের ব্যাপারে অসম্ভব উদার)।
সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন লীগ/কনফারেন্সের (National Football Conf. এবং American Football Conf.) চ্যাম্পিয়ন দল প্রতি বছর এই বিশেষ লড়াইয়ে অংশ নেয় তাদের একক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে। ট্যূরে স্বল্প উপস্থিতির কারণ সহজেই অনুমেয় – প্রাক্‌ আয়োজনে ব্যস্ত থাকতে হয় সেদিন ফুটবলপ্রেমী আমেরিকানদের। পরিসংখ্যানে এটিই নাকি বছরে তাদের দ্বিতীয় প্রধান উদরপূর্তির দিন(প্রথমটা হল Thanksgiving)!
ট্যূর শেষে ফিরে গিয়ে দেখলাম খেলা তখনও শুরু হয়নি। খেলার নিয়মকানুনের ব্যাপারে অন্ধকারে থাকা সত্বেও কৌতুহলবশে ম্যাচের প্রায় পুরোটাই দেখলাম। তবে বলতে দ্বিধা নেই এর স্বভাবসুলভ উত্তেজনা স্পর্শ করেছে আমাকেও। ঐতিহাসিক এক মূহুর্তের সাক্ষীও হয়েছিলাম। সেটি ছিল বিজয়ী দল পীটস্‌বার্গ স্টীলারস এর জেমস হ্যারিসন একেবারে নিজের সীমানা থেকে প্রতিপক্ষের সীমানা পর্যন্ত (১০০ গজ) একাই বল নিয়ে বাধাবিহীনভাবে দৌড়ে Longest Run in Super Bowl history এর গৌরব অর্জন করেন।

১৯৪৫ সালে চতুর্থ টার্মের জন্য আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও ফ্রাঙ্কলিনের অসুস্থতার বিষয়ে সর্বসাধারণ অন্ধকারে ছিল। শেষ সময়ে রুগ্ন ফ্রাঙ্কলিনের শরীরে অনভিপ্রেত বার্ধক্যের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৪৫ সালের ১২ই এপ্রিল জর্জিয়ার ওয়ার্ম স্প্রিং এ ফ্রাঙ্কলিন মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সেই থেকে স্প্রিং উড এস্টেটের Rose Garden এ তিনি চিরশয্যায় শায়িত আছেন। ১৯৬২ সালে এলিনরের মৃত্যু হলে ফ্রাঙ্কলিনের সমাধির পাশেই স্থান করে নেন। ফ্রাঙ্কলিনের মৃত্যুর পরে নিউ ইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিলঃ

Men will thank God on their knees a hundred years from now that Franklin D. Roosevelt was in the White House

ফ্রাঙ্কলিনের জন্ম থেকে মোটামুটি পুরো জীবদ্দশাই স্প্রিংউড এস্টেটে কাটিয়েছিলেন। ফ্রাঙ্কলিনের নীচের উক্তি তাঁর এই নাঁড়ীর সম্পর্কটি আজো মনে করিয়ে দেয়ঃ

All that is within me cries out to go back to my home on the Hudson River

এবার ফেরার পালা। ট্যূর শেষে আমরা যে যার গন্তব্যে। সাথে অনেক স্মৃতি, অনেক ইতিহাসের জ্ঞান। তবে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এত বড় এস্টেটটি পুরোপুরি দেখার অদম্য ইচ্ছেটা অপূর্ণই রয়ে গেল।
[সমাপ্ত]

তথ্যসূত্রঃ
1. Home of Franklin D. Roosevelt National Historic Site
2. Wikipedia
3. National Park Service

২,০৯৮ বার দেখা হয়েছে

১৯ টি মন্তব্য : “ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের বাড়িতে ৩ (শেষ)”

  1. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    অসাধারন বর্ননা নীল। তুমি খুব গুছিয়ে খুব যত্ন করে লিখেছ, এটা প্রথম লাইন পড়েই বুঝা যায়।

    বিনা পয়সায় রুজভেল্টের বাড়ি ভ্রমন করানো জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  2. মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

    খুব ভাল লাগল। শেষ লাইনটা পড়ে প্রচণ্ড নস্টালজিক হয়ে গেলাম।

    All that is within me cries out to go back to my home on the Hudson River

    আচ্ছা আপনার কি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রুজভেল্টের ভূমিকা নিয়ে আরও কিছু লেখার ইচ্ছা আছে? ইচ্ছা থাকলে লিখেন। এ নিয়ে আরও অনেক জানতে ইচ্ছা করছে। মূল কারণ ঐ পারমাণবিক বোমাই।

    রুজভেল্টের কাছে লেখা আইনস্টাইনের চিঠিটা পড়েছিলাম। ঐখানে সুস্পষ্টভাবেই উল্লেখ করা হয় পারমাণবিক বোমা তৈরীর কাজ শুরু করলে এক দিক দিয়ে জার্মানির পরিকল্পনার অনুরূপ কিছু করা যাবে এবং যুদ্ধ জয়ের সম্ভাবনাও অনেক বেড়ে যাবে। আর এই বিশাল ম্যানহাটন প্রজেক্টে বোধহয় প্রায় 130,000 লোক কাজ করেছিল। এই বিশাল সংখ্যক কর্মীর মধ্যে খুব বেশী হলে ১০-২০ জন হয়ত জানতো তারা কি করছে। বাকি সবাইকে কেবল তার নিজের সেক্টরটুকুর জ্ঞান দেয়া হয়েছিল। তারা কেবল বুঝত, এমন কিছু তৈরী হচ্ছে যা দিয়ে জার্মানিকে হারানো যাবে। জানি না, হয়ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষিতে এই নীতির বিকল্প ছিল না। যুদ্ধের ময়দানে যেমন সৈনিকদের অস্ত্রচালনা ছাড়া আর কিছু জানার দরকার হয় না তেমন। আর জার্মানি আর জাপান দুটি দেশই তো নিজেদের পারমাণবিক বোমা তৈরীর কাজ করছিল। জাপান অনেক এগিয়েও গিয়েছিল। এই প্রেক্ষিতে রুজভেল্টের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চিন্তা করার অনেক কিছু আছে।

    ট্রুম্যান হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আপনার কি মনে হয়, রুজভেল্ট বেঁচে থাকলে এই সিদ্ধান্ত নিতেন? অনেকেই তো বলেন, সে সময় পারমাণবিক হামলা না করলেও শীঘ্রই যুদ্ধের অবসান হতো। জার্মানি তো হেরেই গিয়েছিল। তারপরও এটম বোমা নিক্ষেপের সিদ্ধান্তটা কেবলই বর্বরতা। রুজভেল্টের ঘাড়েও তার কিছুটা দায় পড়ে। কিন্তু বারবার একই প্রশ্ন করি, রুজভেল্ট বেঁচে থাকলে কি এমন কাজ করতেন?

    জবাব দিন
    • নীলোৎপল (১৯৯১ - ৯৭)

      মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
      শুরুতে ভ্রমণকাহিনী হিসেবেই এটিকে লিখতে চেয়েছিলাম। 🙂 কিন্তু ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় এর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়াতে এ প্রসঙ্গগুলোর সংক্ষিপ্ত অবতারণা করতে হয়েছে।

      নিশ্চয়ই পড়েছ আইনস্টাইন রুজভেল্টকে লেখা চিঠিতে আণবিক বোমা তৈরির মূলনীতি, ইউরেনিয়ামের প্রাপ্যতা, জার্মানীতে নেয়া গবেষণার সমস্ত পদক্ষেপ সম্পর্কে লিখেছিলেন। আণবিক বোমার ধ্বংসাত্বক ব্যবহার নয়, পৃথিবীতে শক্তির ভারসাম্য আনাই ছিল এ চিঠির মূল উদ্দেশ্য। তাই আমার মনে হয় সময়ের প্রেক্ষাপটে "ম্যানহাটন প্রজেক্ট" অবশ্যম্ভাবী ছিল। ২ বিলিয়ন ডলারের সেই প্রজেক্টে আসলেই ভীষণ গোপণীয়তা অবলম্বন করা হয়েছিল। রুজভেল্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট হ্যারী ট্রুম্যান যিনি রুজভেল্টের মৃত্যুর পর অফিস অধিকার করেন, ১৯৪৫ সালের ১২ই এপ্রিল প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে এই প্রজেক্টের বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন। Secretary of War হ্যানরী স্টিমসন এই প্রকল্পের কথা তাঁকে অবহিত করেন এবং ৪ মাসের মধ্যেই বোমা তৈরি শেষ হওয়ার কথা বলেন। তাই রুজভেল্টের মৃত্যুর পরেই আণবিক বোমা নিক্ষেপণের সফল মহড়া হয়। ১৯৪৫ সালে যদিও মনে হচ্ছিল অক্ষশক্তির পরাজয় অবশ্যম্ভাবী (বিশেষ করে ইউরোপে হিটলার বাহিনীর স্টালিন বাহিনীর কাছে ধরাশায়ী হওয়া), যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আণবিক বোমা ব্যবহারের বিষয়ে দ্বিধাবিভক্ত ছিল। জাপানের কামাকাজি সুইসাইড এটাকের আশংকায় ধারণা করা হয়েছিল অক্ষশক্তির ত্বরিত আত্নসমর্পণে আণবিক মারণাস্ত্রের প্রয়োগ প্রয়োজন। আসল ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা না থাকা সত্বেও হ্যারী ট্রুম্যান Interim Committee এর জাপানে আণবিক বোমা নিক্ষেপের পরিকল্পনা অনুমোদন করেন।

      আইনস্টাইনের লেখা চিঠিগুলো আসলে তাঁর বন্ধু আরেক পদার্থবিজ্ঞানী লিও জিলার্ডের (Leo Szilard) তথ্যের ভিত্তিতে লেখা হয়েছিল। ধারণা করা হয় জিলার্ডই চিঠিগুলোর খসড়া তৈরি করে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আণবিক মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার জিলার্ডের রুজভেল্টের কাছে এর আসল ভয়াবহতা নিয়ে লেখা চিঠিটি মৃত্যুপথযাত্রী রুজভেল্টের কাছে কখনও পৌঁছায়নি।

      তাই আমার মনে হয় রুজভেল্ট বেঁচে থাকলে ইতিহাস হয়তো অন্যরকমও হতে পারত। তবে এ নিয়ে অবশ্যই অনেক বিতর্কের অবকাশ আছে।

      আণবিক বোমা প্রকল্প আর রুজভেল্টের ভূমিকা নিয়ে লেখার ইচ্ছে আপাতত নেই।

      জবাব দিন
  3. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    চমৎকার সুলিখিত একটা সিরিজ :clap:
    নীলোৎপল ভাই কে একটা :salute: না দিলেই নয়।
    বস্‌ হাফিজ ভাইরে লিঙ্কটা দিয়া পড়াইছি 😀 উনি আপনার আরো লেখালেখির খবর দিছে :hatsoff: সিসিবিতে একে একে দিতে থাকেন :thumbup:


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।