দু মুঠো ভাত

(গল্পের বিষয় এবং চরিত্র সম্পূর্ণরূপে কাল্পনিক। কারো নাম বা বিষয়ের সাথে আংশিক বা পুরোপুরিভাবে মিল থাকলে সেটা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত এবং তার জন্যে অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।)

ক্রাচ জোড়া নিয়ে মুখ থুবড়ে ড্রেনের ভেতর পড়ে গেলো মফিজ। ঠোঁটের ওপরের কিছু অংশ কেটে বেরিয়ে এলো গাঢ় লাল তরল পুষ্টিহীন রক্ত। সামনের ওপরের দুটো দাঁতও বোধ করি ভেঙ্গে গেছে। জিহবার আগায় সেখানটায় ফাঁকা হয়ে গেছে বুঝতে পারলো সে। তবে নিজের প্রতি খেয়াল করার অবসর নেই মফিজের। আফিয়ার কথা ভেবে তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিলো।

ড্রেনের থকথকে ভেজা নাঁড়িভুড়ি ছেঁড়া তরল অপদার্থের গন্ধে তার কোন অসুবিধা হচ্ছে না। ভেজা বর্জ্যের মাঝে দুহাত দিয়ে খুঁজতে লাগলো বছর খানেক আগে একটা এন জি ওর বিনা মুল্যে চিকিৎসার সুবাদে পাওয়া তার এক ইঞ্চি পুরু কাঁচের চশ্মা জোড়া। ওগুলো ছাড়া অনেক আগেই হয়তো কোন দ্রুতগামী নিয়ন্ত্রণহীন বাস বা ট্রাকের মসৃন চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে পথচারী দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানের খাতায় শুধু আরেকটি সংযোজন হতে হতো তাকে।

পুলিশের ধাওয়া খেয়ে ফার্মগেট এলাকার ফকিরেরা যে যেদিকে পারছে ছুটে পালাচ্ছে। দু-একজন হতভাগা ফকিরের পিঠে পুলিশের ব্যাটনের হাঁড়ভাঙ্গা ধুব! ধাব! প্রকট শব্দ আর মাইরে বাপরে আর্তনাদ ঢাকা শহরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকার কোলাহলের মাঝেও শুনতে পাচ্ছে মফিজ । এইটারে ধর ! ওইটারে ধর ! হুংকার ধ্বনির আর কর্কশ কন্ঠের গর্জনে বাতাস ভারী করা অসহায় মিনতিগুলো কর্ণগোচর হচ্ছেনা উন্মত্ত খাকি পোশাকধারী আইন শৃংখলা রক্ষী বাহিনীর কারও।

অনেক দিন থেকেই এরকম একটা ঘটনার আশঙ্কা করছিল মফিজ। অন্যান্য ফকিরেদের মুখে শুনেছিলো সরকার আগামি পাঁচ বছরের মাথায় দেশের সব ভিক্ষুকদের নির্মূল করার পরিকল্পনা করেছে। তা বাস্তবায়ন করতে গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গদের জন্য গড়া রাজধানীসহ দেশের সকল মহানগরীগুলো থেকে সব ফকিরদের উতখাৎ করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

নয় বছর বয়সের মফিজ কি আর এত কিছু বোঝে। অনেক শখ ছিলো অন্যান্য ছেলে মেয়েদের মত স্কুলে যাবে, স্কুলের মাঠে হাডুডু আর ডাঙ্গুলি খেলবে। সে স্বপ্ন দেখতো বড় হয়ে বিশাল একটা জাহাজে চড়ে সিন্দাবাদের মত হীরা রত্নের সন্ধানে কত জানা অজানা দেশে পাড়ি জমাবে। সাগরের লোনা বাতাসের স্বাদ নেবে। এভাবেই সে হারিয়ে যেতো তার সাগর পারের বাড়ির কাছে সুদূর দিগন্তে অস্ত যাওয়া রক্তিম সূর্যের পশ্চিমাকাশে।

দুবছর আগে নির্মম রাক্ষুসে সিডর ভেঙ্গে চুরমার করে দিলো তার স্বপ্নীল আশাগুলো। কোনো এক অকাল রাতে সেই ভয়াবহ বিশালাকৃতির মাতাল হাওয়া ঘুরে ঘুরে বিকট তারে দামাল শিস দিয়ে সাগরকূলবর্তী নিরীহ জেলে পাড়ার উপর আঘাত হানলো। হাটি হাটি পা পা দুবছরের আফিয়া আর মফিজ ভয়ে থর থর কাচুমাচু হয়ে চকির নিচে মায়ের বুকের ভেতর আশ্রয় নিয়েছিল। বিড়বিড় করে তার মা কি যেন দোয়া পড়ছিলেন অবিরত। দুদিন আগে বাবা একটি বড় ট্রলারে করে মাছ ধরতে গভীর সমুদ্রে গিয়ে তখনও ফিরে আসেন নি। যাবার সময় মফিজ বাবার কাছে ঘুড়ির আবদার করেছিলো। বাবা স্মিতমুখে তার মাথায় পরম আদরে হাত বুলিয়ে বলেছিলেন ফিরে এসে অনেকগুলো রঙ বেরঙ-এর ঘুড়ি কিনে দেবেন। এই প্রথম বারের মত বড় ট্রলারে কাজ পেয়ে বেশী টাকা এনে অভাব আর আবদার মেটানোর আশ্বাস দিয়ে হাতছানি দিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন বিশাল সাগরের বুকে।

প্রচন্ড গর্জনে ঘন ঘন আকাশ থেকে বিচ্ছুরিত আগুনের ফুলকি ক্রমশই আলোকিত করছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতের কৃষ্ণতা। পাখির বাসার মতো ছোট্ট বাঁশের জরাজীর্ণ দুর্বল কুড়েঘরটির ওপর হঠাৎ করে বিকট মটমট শব্দে অদূরের শতবছরের পুরাতন বট গাছটা নেমে এলো। ভোঁতা হাঁড়ভাঙ্গা একটা মড়মড় কানে লাগলো মফিজের। তারপর একটা আকূল গোঙানী। থেমে গেলো বিড়বিড় করে পড়াটা। আঁকড়ে ধরা হাত দুটো এক সময় হয়ে গেলো শিথিল, নিঃসাড়, নিষ্প্রাণ। ঘাড়ের কাছে তীব্র ব্যথা অনুভব করলো মফিজ। সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে যেতে লাগলো। মাথার ভেতরটা ঝাপসা হতে হতে ক্রমশঃ সব কিছু অন্ধকার হয়ে গেলো। চোখ খোলার পর মফিজের জীবনের চারপাশের অনেক কিছু বদলে যায়, চিরতরে।

আফিয়ার সুপরিচিত ক্ষীণ গলার ভাইজান ডাকে স্বস্তির দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো মফিজ। বোনটি এসে গলায় জড়িয়ে ধরতেই চোখ টলমল করে গলা ধরে এলো তার। ক্রাচ জোড়া আর চশ্মাটা হাতে ধরিয়ে দিলো আফিয়া। পাঁচ হতে চলেছে আফিয়ার। একে অপর ছাড়া এ বিশাল ভুবনে কেউ নেই তাদের। সহায় সম্বল বলতে বিবর্ণ দুটি থালা আর ভিক্ষের ঝুলিটি।

সেই কর্কশ বজ্র কন্ঠ, বুটের ধাপ ধাপ যেন আরও কাছে চলে আসতে লাগলো। মফিজ হামাগুড়ি দিয়ে ড্রেনের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে ক্রাচের সাহায্যে উঠে দাড়ালো। আফিয়া তার একটা ক্রাচে ধরে দুজনে দ্রুত মিলিয়ে গেলো এক কোটি মানুষের ঢাকার চির অচেনা ভীড়ে, দু মুঠো ভাতের সন্ধানে।

(০৬/০৪/২০০৯)

১,২৬৮ বার দেখা হয়েছে

১৩ টি মন্তব্য : “দু মুঠো ভাত”

  1. রকিব (০১-০৭)
    আফিয়া তার একটা ক্রাচে ধরে দুজনে দ্রুত মিলিয়ে গেলো এক কোটি মানুষের ঢাকার চির অচেনা ভীড়ে, দু মুঠো ভাতের সন্ধানে।

    আবারো অনুভব করলাম নিজের অক্ষমতা।
    ভালো লেগে্ছে :clap: :clap: ।


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : শহীদ (১৯৯৪-২০০০)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।