সোফির জগৎ

সোফির জগতের কথা প্রথম শুনেছিলাম ২০০৪ সালে। এক শনিবার, এসেম্বলিতে প্রিন্সিপাল তার বক্তৃতায় বলেছিলেন। নরওয়েজীয় ভাষায় মূল বইটির নাম “সোফিস ভার্ডেন”, লেখক ইয়স্তেন গার্ডার। পলেট মোলারকৃত ইংরেজি অনুবাদের নাম “সোফিস ওয়ার্ল্ড”। আর ইংরেজি থেকে বাংলা করেছেন জি এইচ হাবিব, নাম দিয়েছেন “সোফির জগৎ”। জি এইচ হাবীব আমাদের কলেজের (মির্জাপুর) প্রাক্তন ছাত্র, প্রথমে মনে হয়েছিল বিশেষভাবে এই বইয়ের নাম বলার কারণ বোধহয় এটাই। পরে কলেজ লাইব্রেরিতে বই হাতে নিয়ে দেখি, অন্য কারণও আছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক জি এইচ হাবীব বইয়ের ভূমিকায় মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষ “কমলপুরাণ” ও “তিন পুরুষের রাজনীতি” খ্যাত রফিকুল ইসলামকে (রফিক কায়সার) বিশেষভাবে ধন্যবাদ দিয়েছেন, প্রকাশের আগেই বইটি পড়ে বিভিন্ন পরামর্শ দেয়ার জন্য। কলেজ ভাইয়ের অনুবাদ দেখে, পড়ার উৎসাহ বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, ৫০ পৃষ্ঠা পড়ার পরই পাঠকের মৃত্যু হল। কারণ জানি না। খাবার টেবিলে আমার পাশে বসতেন শাহরিয়ার ভাই। অনেক করে বললেন, প্রথম থেকে আবার পড়তে। তারপরও পড়া হয়নি।

প্রায় চার বছর পর, এই সেদিন কিনে পড়া শুরু করলাম। এবারে দর্শনের প্রতি বিশেষ আগ্রহ থেকে। পড়তে গিয়ে প্রথমে খুব ভাল লাগে। রহস্য দিয়ে উপন্যাসের শুরু। সোফি নামের ১৪ বছরের এক নরওয়েজীয় কিশোরী তার বাসার মেইল বক্সে স্বাক্ষরবিহীন চিঠি পেতে শুরু করে। প্রথম চিঠিতে কেবল একটি বাক্য লেখা, “তুমি কে?” এই প্রশ্নই সোফিকে দ্বিধায় ফেলে দেয়। আমি সোফি আমুন্ডসেন, এই উত্তর তাকে সন্তুষ্ট করতে পারে না। পরের চিঠিতে লেখা, “বিশ্বটা কোত্থেকে এল?” নিজে নিজেই আকাশ-পাতাল ভাবতে থাকে। কোন হদিস পায় না। তবে এটা বুঝতে পারে যে, প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবতে তার ভাল লাগছে। এর পরই শুরু হয় দর্শনের কোর্স। তৃতীয় চিঠি হিসেবে পায় টাইপ করা তিনটি পৃষ্ঠা। এভাবেই প্রাক-সক্রেটীয় যুগ থেকে দর্শন শিক্ষার সূচনা ঘটে, শেষ হয় আধুনিক যুগে জঁ-পল সার্ত্র্-এর অস্তিত্ববাদে এসে।

সোফিকে দর্শন শেখাচ্ছিলো আলবার্তো নক্স নামের এক প্রৌঢ় দার্শনিক। নক্স তাকে বলে, দর্শনের ইতিহাস যেন এক গোয়েন্দা গল্প। এভাবে সোফির গোয়েন্দাগিরির পরিসর আরও বৃদ্ধি করা হলো। কারণ, সোফিকে প্রথমেই অনুসন্ধান করতে হচ্ছিল, কার কাছ থেকে এই বেনামী চিঠিগুলো আসছে? অচিরেই এই রহস্যের সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু তখনই এক অদ্ভুত সমস্যা দেখা দেয়। সোফি এবং নক্সের জগতে এমন কিছু ঘটনা ঘটতে থাকে যার কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই, নিছক অলৌকিক। আলবার্তো ন্যাগ নামের কেউ তাদের সাথে এই অলৌকিক-অলৌকিক খেলা খেলছে। দেখে মনে হয়, ন্যাগের কোন ঐশ্বরিক ক্ষমতা আছে। এটুকু তারা প্রথমেই বুঝতে পারে যে, আলবার্তো ন্যাগের মেয়ের নাম হিল্ডা মোলার ন্যাগ যার বয়স সোফির সমান অর্থাৎ ১৪ বছর। এটাও বুঝতে পারে, হিল্ডার বাবা সোফির বাবার মত বাসার বাইরে থাকে। তবে সোফির বাবা মেরিন অফিসার, আর হিল্ডার বাবা জাতিসংঘ শান্তি রক্ষী মিশনের মেজর যার পোস্টিং বর্তমানে লেবাননে। আলবার্তো ন্যাগ কিভাবে তাদের নিয়ে খেলা করছে, দর্শন কোর্সের পাশাপাশি এটা নিয়েও চিন্তা করতে হয় সোফি ও আলবার্তো নক্সকে। তাদের সূত্র হিসেবে থাকে হিল্ডার জন্মদিনকে উদ্দেশ্য করে সোফির প্রযত্নে হিল্ডার কাছে পাঠানো আলবার্তো ন্যাগের পোস্টকার্ডগুলো।

সোফি এবং আলবার্তো নক্স দর্শনের ইতিহাসে অভিযান চালানোর পাশাপাশি নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজে পেতে চেষ্টা করে। এক হিসেবে বলা যায়, অস্তিত্ব অন্বেষণের এই প্রচেষ্টা না থাকলে, সোফির জগৎ কেবলই দর্শনের এক পাঠ্যবই হতো। তার মানে, সোফি ও আলবার্তো নক্সের অস্তিত্বের সন্ধানই উপন্যাসের কাহিনী তৈরী করেছে। কাহিনী বিচারে একে অধিসাহিত্য (মেটাফিকশন) বলা যায়, অর্থাৎ পাঠক একসময় বুঝে যাবেন যে তিনি একটি উপন্যাস পড়ছেন। অধিসাহিত্য আগে কখনও পড়িনি। “অ্যাটোনমেন্ট” সিনেমাটি অধিসাহিত্য থেকে করা। কিন্তু, অ্যাটোনমেন্ট উপন্যাস তো আর পড়া হয়নি। সে হিসেবে অন্য ধরণের এক মুগ্ধতা কাজ করেছে। সোফির জগৎ আধুনিক “থ্রো দ্য লুকিং গ্লাস”-এর মোড়কে শিক্ষণবিজ্ঞানের এক সফল সৃষ্টি। সাহিত্য হিসেবে সফলতা যদিও খুব বেশি না। টাইম ম্যাগাজিনের সমালোচক জন ইলসন তো বলেই দিয়েছেন,

As fiction, Sophie’s World deserves no better than a D+. But as a precis of great thought, Gaarder’s tour de force rates a solid B.

আমি অবশ্য সাহিত্য বিচারে একে ডি+ দেব না। আমার কাছে সোফির জগৎকে “এ-” এর যোগ্য বলে মনে হয়েছে। এন্টারটেইনমেন্ট ডেইলিতে “এ-” দেয়া হয়েছে।

উপন্যাসের নামের নিচেই লেখা, দর্শনের ইতিহাস বিষয়ক একটি উপন্যাস। বইয়ে পাশ্চাত্য দর্শনের কোন কিছুই বাদ পড়েনি। তবে এক গৌতম বুদ্ধ ছাড়া এতে প্রাচ্য দর্শনের তেমন কিছুই নেই। প্যাগান এবং মধ্যযুগীয় মুসলিম দর্শনকেও এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তার পরও মুগ্ধ না হয়ে পারিনি। প্রথম দিকেই গ্যেটের কবিতার একটি চরণ পড়েছিলাম,

যে তিন হাজার বছরকে কাজে লাগাতে পারল না, তার জীবন ব্যর্থ।

সোফির জগৎ পড়ার পর মনে হয়েছে, তিন হাজার বছর কাজে লাগাতে না পারলেও কিভাবে কাজে লাগাতে হবে তা অন্তত বুঝতে পেরেছি। আমার মনে হয়েছে, সোফির জগৎ যে কোনও মনোযোগী পাঠকের জীবন পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।

ইয়স্তেন গার্ডারের অন্যান্য উপন্যাসের মত, সোফির জগতেরও দুটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। প্রথমত, কিশোরের দৃষ্টি দিয়ে দেখা এবং দ্বিতীয়ত, শেখানোর চেষ্টা। এ ধরণের উপন্যাসের বেস্টসেলার হওয়ার কথা না। তারপরও সোফির জগৎ দীর্ঘ ৪ বছর নরওয়েতে বেস্টসেলার তালিকায় এক নম্বরে ছিল। পৃথিবীর যে দেশেই প্রকাশিত হয়েছে, সে দেশেই বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাংলাদেশেও সোফির জগৎ কম বিক্রি হয়নি। এটা দেখেও খুব ভাল লেগেছে। এটাই প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ প্রাচীন ধর্ম এবং অতিপ্রাকৃতের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করছে। তারা সবকিছুর জাগতিক ব্যাখ্যা চাচ্ছে। এ কারণেই দর্শনের জটিল সব প্রশ্নের একটি সহজ উত্তরকে এভাবে লুফে নিয়েছে। স্টিফেন হকিংয়ের “আ ব্রিফ হিস্টরি অফ টাইম” যে কারণে জনপ্রিয় হয়েছিল, সোফির জগতের জনপ্রিয়তার কারণও অনেকটা সেরকম। অনেকে তো সোফির জগৎকে “আ ব্রিফ হিস্টরি অফ টাইম”-এর দার্শনিক প্রত্যুত্তর হিসেবে দেখছেন।

অনুবাদ বিষয়ে দুই এক কথা বলা দরকার। প্রথমেই মনে রাখতে হবে, এটা ইংরেজি থেকে করা। সুতরাং মূল বইয়ের ভাব অনেকখানিই নষ্ট হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। কারণ, নেটে দেখলাম ইংরেজি অনুবাদের তুলনায় ফরাসি অনুবাদকে মূল বইয়ের বেশি কাছাকাছি বলা হয়েছে। তথাপি ইংরেজি থেকে অনুবাদ খারাপ লাগেনি। তবে আরও ঝড়ঝড়ে হলে ভাল হতো।

*****

লেখাটা পূর্বে সচলায়তনে প্রকাশিত।

১০ টি মন্তব্য : “সোফির জগৎ”

  1. তৌফিক

    মুহাম্মদ,

    ফয়েজ ভাইয়ের "রেটিং" লেখাটার মন্তব্যে বলছিলাম সিসিবি সেই অর্থে ব্লগ সাইট না, আমার এই মতামত ভুল প্রমাণিত হোক তাই চাই। আর এই ভুল প্রমাণের কাজটা তুমি খুব ভালোমতো করতেছো ভাই। এই রকম বৈচিত্র্যময় লেখা আসতে থাকলে সিসিবি-র ফোরাম থাইকা পূর্ণাঙ্গ ব্লগ সাইটে বিবর্তিত হইতে আর বেশি টাইম লাগব না।

    লেখাগুলা শেয়ারের জন্য ধন্যবাদ। পারলে সবগুলা লেখা এইখানে আস্তে আস্তে দিয়া দিও।

    জবাব দিন
  2. মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

    ঠিক তৌফিক ভাই, এটা পুরোদস্তুর ব্লগ সাইট হোক সেটাই আমরা চাই। এখানে এক্স-ক্যাডেটরা লিখবেন। কিন্তু লেখার বিষয় যে কোনকিছু হতে পারে। ক্যাডেট কলেজের সাথে লেখার কোন সম্পর্ক না থাকলেও তা দেয়া যেতে পারে। আমি সচলায়তনে দেয়া কিছু লেখা এখানেও দেয়ার চেষ্টা করবো। তবে অবশ্যই অতিরিক্ত বিতর্কিত কোন লেখা এখানে দেব না।

    জবাব দিন
  3. মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

    ফয়েজ ভাই, এইটারে কাঁচা হাতের বুক রিভিউ বলতে পারেন। জি এইচ হাবীবের অনুবাদটা পড়ার পর যতটুকু শেয়ার করার ইচ্ছা হইছিল ততটুকুই লিখছি। অনুবাদটা কিনে পড়তে পারেন। বইটা বেশ বড়: প্রায় ৩০০-৪০০ পৃষ্ঠা।

    জবাব দিন
  4. টিটো রহমান (৯৪-০০)

    চমতকার রিভিউ। থ্যাংকস মুহাম্মদ

    আর হ্যা। এই ব্লগটি সকল ক্যাডেটদের চর্চার জায়গা হোক.......বিষয়বস্তুর কোন গন্ডি না থাকাই ভালো। তবে ক্যাডেট ছাড়া আর কাউকে ঢুকতে দেয়া উচিত না। তা হলে এই ব্লগের নিজস্বতা বলে আর কিছু থাকবে না


    আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই

    জবাব দিন
  5. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    ই রকম বৈচিত্র্যময় লেখা আসতে থাকলে সিসিবি-র ফোরাম থাইকা পূর্ণাঙ্গ ব্লগ সাইটে বিবর্তিত হইতে আর বেশি টাইম লাগব না।

    :boss: :boss: :boss:


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।