ধর্মঃ একটি নৃতাত্ত্বিক অধ্যয়ন – ১

Geertz’র ধ্রুপদী রচনা “Religion as a Cultural System”-এ লেখক ধর্মকে আরও বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণের আহ্বান জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি মূলত ধর্মের সমাজবিজ্ঞানভিত্তিক অধ্যয়নে ব্রিটিশদের সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। মার্কিন নৃবিজ্ঞানীরা লেখকের এই আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন যার প্রতিফলন পড়েছে তাদের সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতে। এর পর ১৯৭২ সালের এক প্রবন্ধে Geertz ধর্মের অধ্যয়নে তার ঐতিহাসিক, মনোবিজ্ঞানভিত্তিক, সমাজবিজ্ঞানভিত্তিক এবং শাব্দার্থিক প্রচেষ্টাগুলো তুলে ধরেন। পরিশেষে তিনি বলেন, ধর্মের একটি পূর্ণাঙ্গ তত্ত্বে এই সবগুলো ক্ষেত্রে ধর্ম অধ্যয়নের প্রচেষ্টাগুলোর সমন্বয় থাকবে। এরকম পূর্ণাঙ্গ তত্ত্ব এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। Geertz এই পূর্ণাঙ্গ তত্ত্ব আবিষ্কারের উদ্দেশ্যেই কাজ করছেন। তিনি জাভায় উন্নত মানের গবেষণা পরিচালনা করেছেন এবং বালি ও মরক্কোতেও এ নিয়ে কাজ করেছেন।


প্রথম প্রকাশ: International Encyclopedia of Social Sciences, David L. Sills
পরবর্তী প্রকাশ: Magic, Witchcraft and Religion: An Anthropological Study of the Supernatural. Editors: Arthur C. Lehmann, James E. Myers; University of California, Chico.


মূল রচনা: ক্লিফোর্ড গার্টস (Clifford Geertz)
অনুবাদ: খান মুহাম্মদ


ধর্মের নৃতাত্ত্বিক অধ্যয়ন বর্তমান কালের সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক পরিবেশের অভ্যন্তরীন পরিবর্তনসমূহের প্রতি খুবই স্পর্শকাতর, যদিও এই পরিবেশ বিনির্মাণে ধর্ম নিজেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এডওয়ার্ড টাইলরের প্রাথমিক আলোচনার পর থেকে দূরবর্তী, প্রাচীন বা অপেক্ষাকৃত সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও প্রথাগত আচারানুষ্ঠানের প্রতি আমাদের আগ্রহ বেড়েছে; এই আগ্রহের কারণ সমসাময়িক কিছু ইস্যুতে আমাদের সচেতনতা। আধুনিক পাশ্চাত্য সমাজের বিভিন্ন কাজ বা অকাজ, বিশেষত তাদের আত্ম আবিষ্কারের বিরামহীন প্রচেষ্টা থেকেই বিচিত্র ধর্মগুলো নিয়ে নৃবিজ্ঞানীদের মনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে নৃবিজ্ঞানীদের আবিষ্কারগুলোই সেই বিরামহীন প্রচেষ্টার বেছে নেয়া পথ ও চূড়ান্ত অবস্থানগত দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করেছে।

কিছু বিষয় আছে যেগুলো পশ্চিমা সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে তুলে ধরলে তীব্র সামাজিক প্রতিরোধ ও ব্যক্তিগত অসহিষ্ণুতার সম্মুখীন হতে হয়, কিন্তু আদ্যিকালের অস্বচ্ছ ও অলীক উপাদানের জন্য তুলে ধরলে তেমন কিছুই হয় না, বরং স্বাধীন ভাবে কাজ করা যায়। এ কারণেই বোধহয় তুলনামূলক ধর্ম অধ্যয়নের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। “আদিম ধর্মের” অধ্যয়নকে খুব সহজেই কুসংস্কার নিয়ে গবেষণা বলে চালিয়ে দেয়া যায় এবং গুরুতর ধর্ম ও আধুনিক সভ্যতার নীতি-নৈতিকতার সাথে তার কোন সম্পর্কও থাকে না। তা খুব বেশী হলে গুরুতর ধর্মগুলোর দুর্বল পূর্বাভাস বা সামঞ্জস্যহীন বিদ্রুপ হতে পারে। এতে আমাদের যা লাভ হয়েছে তা হল, বিচ্ছিন্ন থেকে খুব পরিষ্কারভাবেই সকল ধরণের স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। এই স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর মধ্যে আছে মূলত বহুত্ববাদ, মূল্য সাপেক্ষবাদ, আছর পড়া ও বিশ্বাস নিরাময়। পলিনেশীয় পৌরাণিক কাহিনীর ঐতিহাসিকতা বিষয়ে যে কোন অনুসন্ধানমূলক প্রশ্ন করা যেতে পারে, কিন্তু খ্রিস্ট ধর্ম সম্পর্কে এমন কোন প্রশ্ন করলে এই সেদিন পর্যন্তও যথেষ্ট ভয়ের কারণ ছিল। অস্ট্রেলীয় আদিবাসীদের টোটেমীয় কৃত্যানুষ্ঠানে যৌন আকাঙ্ক্ষার যে উপাদানগুলো পাওয়া যায় সেগুলোর ব্যাপ্তি নিয়ে যে কেউ আলোচনা করতে পারেন। এছাড়া আফ্রিকান পূর্বপুরুষ পূজার সামাজিক মূল বা কার্যাবলি, মেলানেশিয়ার “জাদুকরী চিন্তার” আদি-বৈজ্ঞানিক গুণাগুণ ইত্যাদি নিয়েও আলোচনা করা যায়। এ ধরণের আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের পলেমীয় বিতর্কে জড়িয়ে পড়া বা আবেগী হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ার সম্ভাবনাও থাকে না। নৃতাত্ত্বিক চিন্তাধারার আবশ্যকীয় অঙ্গ তুলনামূলক পদ্ধতির সফল প্রয়োগের কারণেই মানব জীবনের আধ্যাত্মিক মাত্রার বৈজ্ঞানিক গবেষণা দিন দিন বিকশিত হয়ে উঠেছে।

তুলনামূলক পদ্ধতির হালকা আবরণে আবৃত হয়ে টাইলর, Durkheim, রবার্টসন স্মিথ, ফ্রয়েড, Malinowski এবং র‌্যাডক্লিফ-ব্রাউনের মত প্রভাবশালী বিজ্ঞানীদের গবেষণাকর্মের প্রভাব সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই প্রভাব প্রথমে দার্শনিক, ধর্মতত্ত্ববিদ ও সাহিত্যিকদের উপর পড়েছে এবং একসময় শিক্ষিত সাধারণ মানুষের মাঝেও ছড়িয়ে পড়েছে। গত এক’শ বছরে বিভিন্ন উপজাতীয় প্রথা ও বিশ্বাস যেমন, মৃত্যু, শামানবাদ, খৎনা, রক্ত উৎসর্গ, জাদু, বৃক্ষ সমাধিস্থকরণ, উদ্যান জাদু, প্রতীকী স্বজাতিভক্ষণ এবং প্রাণী পূজা বৃহত্তর বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের রূপ নিয়েছিল। এর সাথে উনবিংশ শতকের শেষ ভাগে বিবর্তনবাদ ও ঐতিহাসিকতাবাদ নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং বর্তমান যুগে ইতিবাচকতাবাদ ও অস্তিত্ববাদ সংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্বের তুলনা করা যেতে পারে। উপজাতীয় মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনকে সমর্থন এবং তাদের বিরোধীদের আধ্যাত্মিক জীবনকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার মত তথ্য সবার কাছেই আছে, তা তিনি মনোবিশ্লেষক ও রূপতত্ত্ববিদ, মার্ক্সবাদী ও কান্টবাদী, বর্ণবাদী ও সমতাবাদী, অনপেক্ষবাদী ও সাপেক্ষবাদী, অভিজ্ঞতাবাদী ও যুক্তিবাদী, বিশ্বাসী ও সংশয়ী যা-ই হোন না কেন। এই তথ্যগুলো অনেক ক্ষেত্রেই আংশিক, পক্ষপাতদুষ্ট বা ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু এর উপর তারা অনায়াসেই নির্ভর করে থাকেন। “আদিম ধর্ম” সম্পর্কে সকল শ্রেণীর পণ্ডিতদের যথেষ্ট আগ্রহ থাকলেও তার প্রকৃতি ও গুরুত্ব নিয়ে আগ্রহ তেমন কারোরই নেই।

ধর্মের নৃতাত্ত্বিক গবেষণার উপর অন্তত ৩টি প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার সমালোচনামূলক প্রভাব রয়েছে:-
১। উনবিংশ শতকের শেষার্ধে মানুষের সার্বভৌম বিজ্ঞান হিসেবে ইতিহাসের উত্থান।
২। বিংশ শতকের প্রথম দশকগুলোতে এই সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ইতিবাচকতাবাদীদের প্রতিক্রিয়া এবং সামাজিক বিজ্ঞানের প্রগতিশীল বিভাজন যার মাধ্যমে এক দিকে মনোবিজ্ঞানভিত্তিক ও অন্য দিকে সমাজবিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার সূত্রপাত ঘটেছে।
৩। যুদ্ধ চলাকালীন এবং দুই যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে সামাজিক জীবনের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আদর্শিক বিষয়াদির ভূমিকা নিয়ে সচেতনতা।
প্রথম ধারাটির মাধ্যমে আদিম যুক্তিপাতের প্রকৃতি ও সভ্য চিন্তার দিকে এর বিবর্তনের ধাপগুলোর উপর গুরুত্ব সৃষ্টি হয়েছে।
দ্বিতীয় ধারাটির সাথে ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচারানুষ্ঠানের আবেগিক ভিত্তির অনুসন্ধান এবং এর সাথে সমন্বিত সমাজে আচার ও বিশ্বাসের পৃথক পৃথক পরীক্ষা গ্রহণ শুরু হয়েছে।
মূল্য পদ্ধতি এবং আদর্শিক পরিমণ্ডলের অন্য বিষয়গুলোতে সচেতনতা সৃষ্টি হওয়ায় ধর্মীয় ধারণা বিশেষত যে প্রতীকী যানে চড়ে এই ধারণা প্রকাশিত হয় তার দার্শনিক মাত্রা নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে।

[চলবে…]

১,৪৫০ বার দেখা হয়েছে

১০ টি মন্তব্য : “ধর্মঃ একটি নৃতাত্ত্বিক অধ্যয়ন – ১”

  1. মাসুদুর রহমান (৯৬-০২)

    আমি প্রথম হলাম।যাই হোক তুমার লেখাটা অনেক সাহসী চিন্তা। কিন্তু তুমার লেখা পরতে গেলে পরা ও চিন্তা করা একসাথে হছছেনা। চিন্তা অনেক পিছিয়ে পড়ছে। যৌগিক বাক্যকে সরল বাক্যে লিখলে ভালো হয়। তাহলে চিন্তা আর পরা পাশাপাশি হাটতে পারবে। আর সাহজ শব্দ ব্যাবহার করলে আরও ভাল লাগবে। তোমার র্সাবজ়েক্ট অনেক হার্ড, তাই এর প্রকাশ যত সহজে করা যায় তত ভাল হয়। আশা করি পরের পর্বে একটু খেয়াল রাখবে।
    আর হা অনেক ভাল হয়েছে। :clap:

    জবাব দিন
    • মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

      পরামর্শের জন্য অনেক ধন্যবাদ। আসলেই এই অনুবাদে বাক্যগুলো বেশ জটিল হয়ে গেছে। এর কারণ হল, অনুবাদটা অনেক আগে করা। প্রায় ছয় মাস আগে প্রবন্ধটার অর্ধেকের মত অনুবাদ করে রেখেছিলাম। তখন অনুবাদ করতে গিয়ে আমি সবকিছু জটিল করে ফেলতাম। আমার ইদানিংকার অনুবাদগুলো সেরকম হয় না।
      যাহোক সেই পুরনো অনুবাদটা আর পরিবর্তন করিনি। তবে পুরনোটুকু দেয়ার পর নতুন করে বাকিটুকু অনুবাদ শুরু করব। তখন আশাকরি আরও সুখপাঠ্য হবে।
      তবে শব্দের ব্যাপারে আমার খুব বেশী কিছু করার নেই। কারণ এটা একটা সায়েন্টিফিক জার্নালের লেখা। মূল ইংরেজিটাতেই অনেক কঠিন কঠিন শব্দ আছে। সেগুলোর সহজতম বাংলা করলেও খুব বেশী সহজবোধ্য হয় না। একটু কষ্ট করে সেগুলো বুঝে নিতে হবে। আমি শব্দগুলোর একটা গ্লোসারি দেয়ার চেষ্টা করব, ইংরেজি প্রতিশব্দ সহ।

      জবাব দিন
    • মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

      Magic, Witchcraft and Religion- এই বইটা কলেজ লাইব্রেরিতে পাইছিলাম। এক ছুটিতে ইস্যু করা বইটা বাসায় নিয়ে আসছিলাম। তারপর ফটোকপি করে রেখি দিছিলাম। সেই ফটোকপি দেখেই অনুবাদ করছি।
      আসলে কলেজে থাকতে দেখে আমারও বইটা একেবারে দুর্বোধ্য মনে হইছিল। কিন্তু যতই পড়তে থাকলাম ততই সহজবোধ্য হতে লাগল। পড়তে থাকলেই দিন দিন সহজ হয়ে যায়। ভাষার সাথে অভ্যস্ত হওয়াটাই আসল কথা।

      জবাব দিন
  2. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    ভালো উদ্যোগ।

    তবে এই জাতীয় লেখাগুলো বিমূর্ত কনসেপ্ট নিয়ে আলোচনা করায় সাধারন পাঠকের (যারা সেই বিষয়ের ছাত্র নয়) জন্য তা' বোঝা বেশ দূরূহ। তাই, পারলে কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারলে তাদের জন্য সহজপাঠ্য হবে।


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
    • মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

      আমিও আসলে এত ভাল বুঝি নাই। কমেন্টারি দেয়ার ক্ষমতা বোধহয় নাই। আপাতত শুধু অনুবাদটাই থাকুক। পরে নাহয় কমেন্টারি দেয়া যাবে। আপনার কাছে তো সব পরিষ্কার। আশা করি লেখার বিষয়বস্তু নিয়ে বিস্তারিত বলবেন।

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।