যেদিন চলে এলাম

আমাদের হাউজের সামনে থেকে শুরু করে একেবারে একাডেমি ব্লক পর্যন্ত লাইন। কলেজ জীবনে কোনদিন চোখে পড়ার মত কিছু করিনি। আমার মতো ছেলেদেরকে সবার চোখে পড়িয়ে দেয়ার জন্যই বিদায় বেলার এ আয়োজন, তখন এমনটিই মনে হচ্ছিল। একে একে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যখন ক্লাসমেটদের মাঝে আসলাম তখন অনুভূতিটা কেমন ছিল মনে নেই। কারণ মনে রাখার মতো কোন অনুভূতি হচ্ছিল না।
কলেজ মসজিদের সামনেই আমাদের গাড়িটা পার্ক করানো। আব্বু-আম্মু কেউ আসে নি, আসার কারণও নেই। বয়স তো আর কম হয়নি আমার। ড্রাইভার বদলুল ভাই মুখে চিরাচরিত সেই হাসি মেখে বলেছিলেন,
– কেমন আছেন ভাইজান?
সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন জন আমার সাথে যেসব কথা বলেছেন তার কোনটিই ভুলতে পারিনি। এমন অনেক কথাও অন্তরে গেঁথে গেছে যা আসলে কেউ বলেননি।
কলেজের মেইন গেইট পেরিয়ে বাঁ দিকে মোড় নিয়ে গাজীপুর চৌরাস্তার উদ্দেশ্যে ছুটল আমাদের গাড়িটা। গাড়িতে ড্রাইভার আর আমি ছাড়া কেউ ছিল না। সাথে অবশ্য বেশ কয়েকটা ব্যাগ ছিল, কলেজের সব স্মৃতি ধারণ করে।
কালিয়াকৈর পেরিয়ে চন্দ্রার কাছাকাছি আসতেই সন্ধ্যা নেমে এলো। অস্তমান সূর্যের আলোয় অনেক দূরে এক লোককে দেখলাম, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গাড়ি থামানোর চেষ্টা করছেন। যতদূর মনে হল, লিফ্‌ট চাইছেন। এদেশে অবশ্য এভাবে লিফ্‌ট চাওয়ার ঘটনা বিরল।
যাহোক, গাড়িতে উঠিয়ে নিলাম তাকে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ, তবে কথায় ধার রয়েছে লোকটির। এই ধার অবশ্য আমার সহ্য হচ্ছিল না। উঠানোর পর থেকেই বকবক করে যাচ্ছেন।
মির্জাপুরে পড়তেন নাকি?
কথা বলার কোন উৎসাহই ছিল না। ব্লেজারের পকেটে লাগানো কলেজ মনোগ্রাম থেকেই বুঝতে পেরেছেন আমি মির্জাপুরের। ব্লেজারটা সিটের পাশেই রাখা ছিল। – অতি আগ্রহ নিয়ে পরিমল সাহেব বলেছিলেন, “এই কলেজ তো গোটা টাঙ্গাইলের গর্ব!”
আপনি হয়তো ভাবছেন ভালই হল। চলে এসেও তাহলে কলেজ নিয়ে গর্ব করা যাবে।
“তাহলে কলেজ নিয়ে গর্ব করা যাবে…” দাড়ান দাড়ান। কি যেন মনে পড়ে গেল। আচ্ছা আপনাকে কি আগে কোথাও দেখেছি বা আপনার সাথে আগে কখনও কথা হয়েছে আমার?
অসম্ভব।
ওহ্‌ হো। বুঝতে পেরেছি। দেজা ভু। ঠিক এই কথাটা এভাবেই আগে কখনও শুনেছিলাম। কি আশ্চর্য বলেন তো। ইদানিং বারবার এমন হচ্ছে। এমন সব ঘটনা ঘটছে যেগুলো ঠিক একইভাবে আগেও ঘটেছিল আমার জীবনে। এমনিতেই ছোট্ট জীবন, তার উপর একবার ঘটে যাওয়া ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়াটা তো খুবই খারাপ।

হঠাৎ কি মনে করে পরিমল সাহেব বললেন। গাড়ি থামান আমি এখানে নেমে যাচ্ছি। অন্য একটা কাজ পড়ে গেছে। বাই দ্য ওয়ে, এই এলাকায় আমাকে সবাই বসাক পণ্ডিত নামে চেনে। কখনও আসলে দর্শন দিয়ে যাবেন আশাকরি।
কেন দর্শন দিয়ে যাবো তা বুঝতে পারিনি। কেবল দেখলাম মফস্বলের এক ছোট্ট গলিতে ঢুকে অন্ধকারে হারিয়ে গেলেন তিনি।

চৌরাস্তায় একটা ব্রেক নিলাম। হাতমুখ ধোয়ার জন্য একটি হোটেলে ঢুকতে যাবো এমন সময় কোত্থেকে এক পিচ্চি এসে বলল,
– ভাইজান, দুইডা টাহা দেন।
এমনিতেই আনমনা হয়ে আছি তার উপর পরিমল জনিত চিন্তায় আচ্ছন্ন। পাত্তা দিলাম না। পিচ্চিটা অন্যদিকে ঘুরতেই কি মনে হল, ডাক দিলাম তাকে।
– ঐ পিচ্চি, এদিকে আস।
কাছে আসার পর কেন জানি জিজ্ঞেস করলাম,
– নাম কি তোমার?
এই প্রশ্নটি করার সাথে কেমন একটা শিহরণ বোধ করলাম। মনে নয়, অন্তরে। ঘোর কাটিয়ে উঠতেই মনে পড়ে গেল, ক্লাস সেভেনে প্রথম যখন হাউজে ঢুকেছিলাম, পরিমল ভাইই প্রথম ব্যক্তি যিনি আমার নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন। ঠিক এভাবেই। এর আগেও কখনও কখনও এমন ঘটেছে বলে মনে পড়ছে। কিন্তু একেবারে খাঁটি “দেজা ভু” এই প্রথম। এতো কিছু অবশ্য তখন মনে আসছিল না। বদলুল ভাইকে এই হোটেলে অপেক্ষা করতে বলে গাড়ি নিয়ে রওয়ানা হলাম বসাক পণ্ডিতের খোঁজে। পেছনে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা পিচ্চিটা আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল কি-না ভেবে দেখার সুযোগ হয়নি।

সেই মফস্বল পাড়ায় গিয়ে বসাক পণ্ডিতের কথা জিজ্ঞেস করায় আকাশ থেকে পড়েছে সবাই। এ নামের কাউকে সবাই তো দূরের কথা একজনও চেনে না। জিজ্ঞেস করতে করতে মফস্বলের শেষ প্রান্তে চলে এলাম। রাতে অন্ধকার গ্রাস করে নিল আমাকে। সেই অন্ধকারে প্রদীপ জ্বেলে উপস্থিত হল এক মনুষ্যমূর্তি।
আসলেই একটি মূর্তি। বসাক পণ্ডিত নামের এক ব্যক্তির প্রতিলিপি এটা। ছুটি শেষে প্রতিবার কলেজে আসার সময়, বাসের বাম পাশে বসতাম। যাতে এই মূর্তিটি দেখা যায়।
সেই মূর্তি আজ আর অপলক চোখে চেয়ে থাকতে পারলাম না। বিস্ময়ের ঘোর কাটার আগেই চোখ ফিরিয়ে নিলাম। এরপরের কাহিনী খুব একটা গুরুত্ববহ নয়। তবে কথা হল, আমি ফিরে এসেছি আমার শহরে। গত পরশু দিনের এই ঘটনা এখনও বর্তমান বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে। আজীবনই কি মনে হবে?

নিলীম এতটুকু বলেই শেষ করলো। খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন ময়মনসিংহের সেরা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নিখিল শর্মা। এবারে পর্যালোচনা শুরু করলেন,
– আপনি খুব বিশ্বস্তভাবে ঘটনাটা বর্ণনা করেছেন। ঠিক এমনটিই চাচ্ছিলাম। আপনার মনে এই ঘটনার যে পয়েন্টগুলো দাগ কেটে আছে সেগুলোই বেরিয়ে এসেছে।
– “আপনার কমপ্লিমেন্ট আগে পেলে কলেজে উপস্থিত বক্তৃতায় অংশ নিতে পারতাম। এখন তো আর সে সুযোগ নেই।” ঘুরে ফিরে কলেজের কথাই ফিরে আসছিল।
– মনোবিজ্ঞানে এই রোগের একটা নাম আছে। খুব সহজ নাম, “রিয়েলিস্টিক দেজা ভু কমপ্লেক্স”। আমরা জীবনে যা করি তার সবই আসলে মস্তিষ্কের এক ধরণের অনুরণন। দেজা ভু আপনার মনে এমন কিছু ক্ষণস্থায়ী অনুরণন দিচ্ছে যে সেগুলো বাস্তব ঘটনা হিসেবে ধরা দিচ্ছে।
– মুক্তির উপায়?
– আপনি কি আসলেই মুক্তি চান?
– না, মুক্তি চাই বললে ভুল হবে না। আমি আসলে বসাক পণ্ডিত আর পরিমল সাহেবের সাথে কথা বলতে চাই।
– তাহলে তো আপনি নিজেই নিজের ডাক্তার হতে পারেন। আমরাও এ ধরণের রোগীদের পরামর্শ দেই, আপনার দেজা ভু জোড়ের সাথে কথা বলার চেষ্টা করুন। দেখবেন ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে।
– কলেজ থেকে বের হয়ে আসার সময়কার অনুভূতির কথা আসলেই মনে নেই। তার উপর পরিমল বাবু এসে সব উলট পালট করে দিলেন। তবে একটা বিষয় মনে হচ্ছে, কলেজের ছয় বছরের লক্ষ লক্ষ সেকেন্ডের কিয়েকটিও যদি হুবহু ফিরে আসতে আমার এই জীবনে! মনে হচ্ছে খুব ভাল লাগতো, পরিমল সাহেবের মত বিরক্ত হতাম না আমি। কিন্তু সেই ক্ষণগুলো সেভাবেই ফিরে আসুক, পরিমল হয়ে নয়।
আপনি হয়তো জানেন না, পরিমল ভাই ক্লাস টুয়েলভে থাকতেই কলেজ পন্ডে ডুবে মারা গিয়েছিলেন। আমাদের কলেজের প্রত্যেকে সব সময়ই সেই বেদনা বয়ে বেড়ায়।
– সেই লক্ষ লক্ষ সেকেন্ডের কোন একটা ফিরে আসার প্রতীক্ষা করা ঠিক হবে না। কারণ সেটা আপনাকে আরও অসুস্থ করে দিতে পারে। বরং এ ভেবেই সন্তুষ্ট থাকুন, অনেক ভাল হলেও সময় চলে যায়। পুরনো সময়ের স্মৃতি আর প্রেরণাই কেবল টিকে থাকে। সেটাকেই টিকে থাকতে দিতে হয়।
– আসলে আজ আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। উঠি।
– আপনার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখব। পুরো বাংলাদেশে এমন রোগী কোন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ পেয়েছেন বলে মনে হয় না। গুড বায়।
– গুড বায়।

আর কথা না বাড়িয়ে ডক্টর নিখিলের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলাম। গাড়িতে উঠে কিছুক্ষণ পিছনের সিটের দিকে তাকিয়ে রইলাম, যেখানে পরিমল সাহেব বসেছিলেন।
রাত আটটার মতো বাজে। গাড়ি চালাতে চালাতে মাঝে মাঝে আকাশের ধ্রুব তারাটার দিকে তাকাচ্ছিলাম। হঠাৎ পাশের সিটে চোখ পড়তেই দেখলাম, পরিমল সাহেব। কোন কথা না বললেন না। কেটে গেল একটি মিনিট। হঠাৎ করে ফোনটা বেজে উঠল। ডক্টর নিখিলের ফোন।
– কি নিলীম, আপনার পরিমল সাহেব এসেছেন?
– আমার ঠিক পাশে বসে আছেন।
– যা বলেছিলাম, কথা বলুন তার সাথে।
ফোন রেখে কোন দুঃসাহসে আমি আসলেই কথা বলতে যাচ্ছিলাম। তার আগেই বলে উঠলেন পরিমল সাহেব ওরফে বসাক পণ্ডিত।
– হোটেলটা আমাদের বাড়ি থেকে আধ মাইলের পথ। বাড়ির পরোটা কখনও কখনও এর চেয়ে স্বাদ লাগে। কিন্তু যাত্রা পথে খানিক বিরতি দিয়ে এই হোটেলে বসে পরোটা খাওয়ার স্বাদ কি কখনও পাব?

কখনও পাবো না। হিমেল প্রায়শই বলত কথাটা। ময়মনসিংহ থেকে বাসে করে ছুটি শেষে কলেজে ফিরতাম আমরা। যাত্রাপথে একটা হোটেল ছিল। আজও মুখে লেগে আছে সেই স্বাদটা।
হঠাৎ কি যেন হল। বুঝতে পারলাম প্রচণ্ড ক্ষিদে পেয়েছে। পরোটার ক্ষিদে। ছুটলাম ৮০ মাইল দূরের সেই হোটেলের উদ্দেশ্যে। এই মুহূর্তে সেই পরোটা না খেতে পেলে যেন মরেই যাব।
দুই ঘন্টা লেগেছে হোটেলে পৌঁছতে। মাঝপথে পরিমল বসাককে নামিয়ে দিয়ে এসেছি।
রাত সাড়ে দশটা। হোটেল সেই কখন বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রামের জঙলাগুলো থেকে আসা ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে। হোটেলের সামনে বসে দুই কান ঢেকে রইলাম। কতক্ষণ ছিলাম খেয়াল নেই।
বেখেয়ালে কলেজের কত স্মৃতিই না মনে এসেছে। কতই নতুন পরিমলের জন্ম দিয়েছি। অচিরেই হয়তো নতুন দেজা ভু জোড় আসবে আমার জীবনে। মুক্তি নয়, এ রহস্যের সমাধান চাচ্ছি। এজন্যই তো এতোদূর গাড়ি চালিয়ে এসেছি।
সত্যি বলছি, খাওয়ার জন্য আসিনি। এসেছি সমাধানের দাবী নিয়ে।
হঠাৎ সব ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক মিইয়ে গেল। আকাশে পৃথিবীর কলঙ্ক হিসেবে জেগে আছে পূর্ণিমার চাঁদ। আমার বাসার ছাদ থেকেও এই কলঙ্ককে এরকমই দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ অন্তরের অন্তস্হল থেকে বাসায় ফেরার তাড়া অনুভব করলাম। ভয়মিশ্রিত তাড়া।
কলেজে আমাকে ঘিরে কোন ভয়ংকর ঘটনা ঘটলে যেমন বাড়ি যাওয়ার তাড়া অনুভব করতাম, ঠিক তেমনই।

১,৬৭১ বার দেখা হয়েছে

১৬ টি মন্তব্য : “যেদিন চলে এলাম”

  1. বেশি জোসসসস ......।।
    "সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন জন আমার সাথে যেসব কথা বলেছেন তার কোনটিই ভুলতে পারিনি। এমন অনেক কথাও অন্তরে গেঁথে গেছে যা আসলে কেউ বলেননি।" - ঠিক ঠিক

    জবাব দিন
  2. কলেজ থেকে চলে আসার দিনটাই কেন জানি বেশী বেশী মনে পড়ে। দিনটা অন্যরকম ছিল। তাই সেটা নিয়ে পুরা গাজাখোরি কিছু একটা লিখে ফেললাম।
    যেভাবে ভেবেছিলাম সেভাবে লিখতে পারিনি। গল্প লেখার হাত নেই। তাই আমি যেভাবে অনুভব করছি, গল্প পড়ে কেউ সেভাবে অনুভব করতে পারবে বলে মনে হয় না।

    জবাব দিন
  3. দারুন লাগলো পড়ে।
    কঠিন সব লেখাজোকার মাঝখানে মুহাম্মদ আমাদের জন্যে কিছু কিছু গল্প লিখলেই পারো!
    এইখানে রেটিং দেয়ার সিস্টেম নাই, এটাই যা দুঃখ। তোমার জন্যে ভার্চুয়াল রেটিং দিলাম- পাঁচ তারা!

    জবাব দিন
  4. অসম্ভব সুন্দর একটা গল্প হইসে!! সাহস না পাওয়ার কোনো কারণ তো বুঝলাম না।
    কিন্তু কেন যেন মনে হলো গল্পটা ঠিক শেষ হয় নাই। মনে হলো দ্বিতীয় পর্ব রয়ে গেছে।

    জবাব দিন
  5. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    দারুণ। চমৎকার। :thumbup:
    সিসিবির পুরনো লেখা যারা সব পড়ে নাই তারা জানেও না কি মিস করছে!

    আবার একটা এইরকম গল্প লিখ।


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।