শেষ হয়ে গেল টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসব

টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল যে এত সমৃদ্ধ আগে ভাবতেও পারিনি। স্বয়ং আম্রিকার কোন চলচ্চিত্র উৎসবও এত গমগম করে না। অস্কার আর গোল্ডেন গ্লোব দিয়ে তারা চলচ্চিত্র উৎসবকে ছেয়ে ফেলেছে। সেখানে উৎসব মানেই পুরস্কার। পুরস্কার ছাড়া যেন উৎসব হয় না, কিংবা উৎসব থাকলেই যেন সেখানে পুরস্কারের সমারোহ থাকতে হবে।

মহাবিশ্বের ইতিহাস নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করতে গিয়ে টরন্টোর ভাল ফিচার করতে পারছি না। তারপরও কয়েকটা বিষয় তুলে না আনলে নয়।

1

উৎসবের উদ্বোধন হয়েছে আমার গুরু চার্লস ডারউইন এর জীবনী নিয়ে করা একটা সিনেমা দিয়ে। প্রামাণ্য চিত্র না, সাক্ষাৎ পূর্ণদৈর্ঘ্য ইংরেজি ছায়াছবি। সিনেমার নাম দিয়েছে “ক্রিয়েশন“। ক্রিয়েশনিস্টদের ব্যঙ্গ করার একটা প্রবণতা আছে মনে হয়। কাভারটাও হয়েছে চমৎকার। ঈশ্বরের আদম সৃষ্টির সেই বিখ্যাত ছবিটাই সিনেমার পোস্টার, কিন্তু চরিত্রগুলো ভিন্ন। ঈশ্বরের বদলে সেখানে স্থান পেয়েছে ডারউইন। পরিচালক তেমন বিখ্যাত কেউ না। তবে ডারউইনের স্ত্রীর চরিত্রে জেনিফার কনেলি অভিনয় করেছে। “ওয়ান্স আপোন আ টাইম ইন অ্যামেরিকা” থেকে এ যুগের “ডার্ক সিটি” তে অভিনয় করে আমার হৃদয়ে জায়গা করে নেয়া জেনিফার কনেলিকে এবার গুরুর বউ হিসেবে দেখতে না জানি কেমন লাগে।

এখন পর্যন্ত অন্য কোন উৎসবের উদ্বোধনী সিনেমা ও সেরা গালা প্রেজেন্টেশনের সাযুজ্য আমাকে এতোটা বিহ্বল করে নি। টরন্টোর বসেরা আমাদের প্রেজেন্ট করেছে আরেক কিংবদন্তীর জীবনী নিয়ে করা সিনেমা। সিনেমার নাম “আগোরা“। ভয়ে ভয়ে বলি, সিনেমাটা করা হয়েছে লেজেন্ড অভ আলেকজান্দ্রিয়া “হাইপেশিয়া” কে নিয়ে। আসলে হাইপেশিয়া-র নাম উচ্চারণ করতে ভয় হয়, মনে হয় এই বুঝি পৃথিবীটা ধ্বংস হয়ে যাবে। নাস্তিকতা আর ধর্মদ্রোহীতার অভিযোগে যে ২৩ বছর বয়সী যুবতীর দেহ টুকরো টুকরো করে পৃথিবীর পথে পথে ছিটিয়ে দেয়া হয়েছিল তাকে পর্দায় দেখে সহ্য করতে পারব কি-না কে জানে। সিনেমাটা পরিচালনা করেছেন আমার অন্যতম প্রিয় স্পেনীয় চিত্র পরিচালক আলেহান্দ্রো আমেনাবার।

এই উৎসবে প্রিমিয়ার হয়েছে আমার ফেভারিট প্রামাণ্য চিত্র পরিচালক মাইকেল মুর এর সাম্প্রতিক সিনেমা। নাম “ক্যাপিটালিজম: আ লাভ স্টোরি“। চলমান অর্থনৈতিক মহামন্দা নিয়ে এবার ফিচার করেছেন মুর সাহেব। তার “ফারেনহাইট ৯/১১” ছিল আমার দেখা দ্বিতীয় মহত্তম রাজনৈতিক ব্ল্যাক কমেডি, কুবরিক দ্য গ্রেট-এর “ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ” এর পরই। এখানেও নাকি অর্থনীতিবিদ ও নেতা-ফেতাদের নিয়ে ইচ্ছা মতো রসিকতা করেছেন।

ইঙ্গমার বারিমান এর মতে আধুনিক আম্রিকার যে চলচ্চিত্রকার এর সিনেমা বানানোর কোন কারণ আছে তিনি হলেন স্টিভেন সোডারবার্গ। কারণ আছে বলেই তিনি সিনেমা বানান, মজাক করার জন্য না। ওশান ১১-১২-১৩ র জন্য তিনি সুপরিচিত হলেও আমার কাছে সোডারবার্গের পরিচয় “এরিন ব্রকোভিচ” আর “ট্রাফিক” এর নির্মাতা হিসেবে। তার “দি ইনফরম্যান্ট!” ছবিটা এই উৎসবে সেইরকম নাম কুড়িয়েছে। রজার ইবার্ট এর প্রশংসা করে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন। গত বছরই সোডারবার্গের “চে” মুক্তি পেল, ধারাবাহিক ভাবে বস বস সিনেমা বানিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ব্রাভো সোডারবার্গ!- তোমার মাঝেই ফিরে পেতে চাই আধুনিক আম্রিকার সেই হারিয়ে যাওয়া শিল্পাত্মা-টি।

মহাকাশ এবার ডাক দিয়েছে। তাই আর লিখতে পারছি না। এক কাজ করি, উৎসবে আমার প্রিয় পরিচালকদের যেসব সিনেমার প্রিমিয়ার হয়েছে সেগুলোর নাম লিখে দেই-

– Baaria – জিওসেপ্পি তোর্নাতোরে (সিনেমা পারাদিসো)
– Bad Lieutenant: Port of Call New Orleans – ভের্নার হের্‌ৎসগ
– My Son, My Son, What Have Ye Done – ভের্নার হের্‌ৎসগ (এ দেখি উড়াইছে)
– Broken Embraces – পেদ্রো আলমোদোবার
– The Invention of Lying – রিকি জার্ভিস (প্রিয় কমেডিয়ান)
– Mother – বোং জুন-ও (মেমোরিস অভ মার্ডার)
– A Serious Man – কোয়েন ব্রাদার্স (কি আর বলতাম!)
– Soul Kitchen – ফাতিহ আকিন (একবার আমায় স্বর্গের কিনারায় পৌঁছে দিয়েছিলেন)
– Up in the Air – জেসন রাইটম্যান (জুনো দেখছেন তো…)

আমরা বর্ণবাদী ইসরায়েলী রাষ্ট্রযন্ত্র-কে ঘৃণা করি

প্রথমেই আমার সাথে সাথে এই কথাটুকু বলে নিন। টরন্টোর একমাত্র কেলেংকারীর কথা শুনতে এখন আর ভাল লাগবে না। ওরা প্রতি উৎসবে “সিটি টু সিটি” নামে একটা অনুষ্ঠান করে। এখানে পৃথিবীর কোন একটি শহর থেকে আসা বিভিন্ন চলচ্চিত্রকার দের সিনেমা প্রদর্শিত হয়। একটা শহরকে ফিচার করা আর কি! এবার ফিচার করা হয়েছে ইসরায়েল এর দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর তেল আবিব কে।

ইসরায়েলী সিনেমার প্রতি আমার কোন বিদ্বেষ নেই। এমনকি জীবনে দেখা তিনটা ইসরায়েলী সিনেমাই আমার চমৎকার লেগেছে। তাদের শৈল্পিক মান বা মানবিক আবেদন অস্বীকার করি না। কিন্তু টরন্টোর মত একটা উৎসবে তেল আবিব এর সংস্কৃতিকে মহান করে ফলাও করার পেছনে যে ইসরায়েলী লবি-র হাত আছে এবং এই সূত্রে যে পৃথিবীর অনেক আবাল জনতা ইসরায়েলের পেছনে গিয়ে দাঁড়াবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এজন্যই আরও ১৫০০ চলচ্চিত্রকার ও সমালোচকের সাথে আমিও নিরবে নিভৃতে টরন্টোর এই সিটি টু সিটি র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। রজার ইবার্ট প্রথমে এটাকে সমর্থনই করেছিলেন। কিন্তু পরে যখন ইসরায়েলী লবি-র ব্যাপারটি বুঝতে পেরেছেন তখনই সমর্থন ত্যাগ করে বয়কট করেছেন সিটি টু সিটি। ১৫০০ চলচ্চিত্রকার ও সমালোচক বিশেষ দরপত্রে স্বাক্ষর করে এর বিরোধিতা করেছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সূত্র ধরে কানাডায় ইহুদী প্রভাব বেড়েই চলেছে।

এই ১৫০০-র মত সংখ্যাগুলোই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবী সামগ্রিকভাবে সৃজনশীল, সে সৃষ্টি করে, ধ্বংসাত্মক জঞ্জালগুলো ঝেড়ে ফেলে। ইসরায়েলের মধ্যে যেসব জঞ্জাল আছে সেসব ঝড়ে গিয়ে পৃথিবীটা আবার স্বর্গের দিকে ঝুঁকে পড়ুক, এই কামনা করা ছাড়া আমার-আপনার বোধহয় এখন আর কিছু করার নেই।

শেষে একটা গালি

অনেক হইছে। একটা গালি-র মাধ্যমে লেখাটা শেষ করি।

গালি এই বাঙ্গাল দেশটারে। একটা সিনেমাও আগামী ৬ মাসের মধ্যে দেখতে পারার সম্ভাবনা নাই। নেটে ভাল প্রিন্ট পাওয়া যাবে না। ডিভিডি বের হলে কেউ যদি শেয়ার করে তখনই কেবল পাইরেসি-র মত অপরাধের সুবাদে সিনেমা দেখতে পাব অবৈধ ভাবে। এই দেশে থেকে বৈধভাবে কিছু করার ইচ্ছাটাই দিন দিন মরে যাচ্ছে। কোন দুঃখে যে জন্মাইছিলাম এইখানে…

১,৭৯৭ বার দেখা হয়েছে

১৪ টি মন্তব্য : “শেষ হয়ে গেল টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসব”

  1. রকিব (০১-০৭)

    আমার ভার্সিটির সামনে যে থিয়েটার সেখানে ফিল্ম ফেষ্টিভ্যালের ফিল্ম দেখাচ্ছিলো। আমি গিয়েছিলাম :goragori: :awesome: , বাইরে দিয়া ঘুরাঘুরি কইরা চলে আসছি ;;) ।


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
  2. রকিব (০১-০৭)

    ভাইয়া, সিনেমা দেখি; তবে হলে যেয়ে দেখতে কেন যেন আগ্রহ জাগে না, ঘরের মধ্যে আরামসে বসে পিসি অথবা ল্যাপটপের পুচকা স্ক্রীনেই তাই বেশি চোখ রাখা হয়। পয়সা জমলে একটা বড় এইচ ডি টিভি কিনে হোম থিয়েটার বানাবার প্ল্যান আছে 😀 ।
    সত্যি বলতে টরন্টোতে ইহুদী প্রভাব বেশ ভালোই বিদ্যমান। যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডিয়ান ইহুদী লবিং এর কারণেই মূলত এখনো কানাডিয়ান সৈন্যরা আফগান-ইরাক প্রান্তরে মারা পড়ছে। এবছর মার্চের দিকে একজন এমপি(সম্ভাব্য ইন্টেলিজেন্স চেয়ায়পারসন নমিনিও) পদত্যাগ করেছিলেন তার যুদ্ধ-বিরোধী মনোভাবের জন্য; উনি সরাসরি ইস্রায়েলী লবিং এর দিকে আঙ্গুল তুলেছেন।

    অফটপিকঃ আগেরবার ফ্লিম ফেস্টিভ্যালে জোলি-পিট দম্পতিরে দেখছিলাম। 😀


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
  3. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    চলচ্চিত্র নিয়ে তোমার লেখা পড়তে মজাই লাগে। আর আফসোস হয়, কেন যে এত্তোসব ভালো ছবি দেখতে পারছি না! তোমার না আমারে কয়েকটা ছবি দেওনের কথা আছিল? শেষ পর্যন্ত তুমিও ফাঁকি মারলা? তুমি কি "বুধবার"-এ লেখা শুরু করছো?


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
    • মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

      না লাবলু ভাই, 'বুধবার' এ লিখতে পারলে খুব ভাল লাগত। কিন্তু ওদের রিকোয়ারমেন্ট আমার পক্ষে মেইনটেইন করা অনেক কষ্টকর ছিল। একে তো ঢাকায় থাকি না, তার উপর হলে গিয়ে বাংলা সিনেমা দেখা সম্ভব ছিল না। আসলে দেশের সিনেমার জন্য ইতিবাচক কোন ভূমিকা রাখা আমার পক্ষে মনে হয় সম্ভব না। কারণ, দেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি বা আর্ট এর সাথে আমার কোন যোগাযোগ নাই, এমনকি খুব একটা পরিচয়ও নাই।

      ঢাকায় না থাকায় রিসেন্ট বাংলা ছবি দেখা এবং সেগুলো নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করা সম্ভব ছিল না। ওরা বলেছিল, অর্ধেক বিদেশী সিনেমা এবং অর্ধেক বাংলা সিনেমা নিয়ে লিখতে হবে। 🙁

      জবাব দিন
  4. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    টরন্টো আর কান ফিল্ম ফ্যাস্টিভেলে সিনেমা নিয়ে যাবার একটা স্বপ্ন আছে মনে! সত্যি হবে কিনা জানিনা !

    ছবিগুলি যোগাড় করতে পারলে আমার জন্যে নিয়া আসিস।


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন
    • মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

      অবশ্যই সত্যি হবে কামরুল ভাই।
      তারেক মাসুদ তো কান পর্যন্ত যেতে পারছে। আর টরন্টো উৎসব পুরা কানাডা দেশটার মতই অনেক বেশি আন্তর্জাতিক।

      এই সিনেমাগুলো অদূর ভবিষ্যতে পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই। সুদূর ভবিষ্যতে যেন মনে থাকে সে জন্যই এগুলোর নাম ডিজিটাল স্মৃতিতে লিখে রাখলাম, যাতে মুছে না যায়।

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।