তত্ত্বাবধায়ক সরকারে এক্স-ক্যাডেট তামিম

গত ৯ তারিখ বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের চারজন উপদেষ্টা পদত্যাগ করেছেন। ১০ তারিখ ৫ জনকে নতুন উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কে কে উপদেষ্টা হল তা দেখার জন্যই বিবিসি’র বাংলা ওয়েবসাইটে গেলাম। গিয়ে দেখি ৫ জন উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়ার পাশাপাশি আরও ৩ জনকে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই তিন জন হলেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এ মালেক মোল্লা, চাকমা রাজা এবং পাব্যর্ত শান্তি চুক্তির অন্যতম সংগঠক ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তামিম। শেষের নামটি দেখে তো নিজের বুকের ছাতি কয়েকগুণ বেড়ে গেল। কারণ তামিম ভাই আমাদের এক্স ক্যাডেট।

মেকার ৯ম পুনর্মিলনীতে (২০০৩, আমরা এসএসসি পরিক্ষার্থী ছিলাম) মির্জাপুরের সবাই তাকে দেখেছে। কারণ তিনি পুরো তিনদিনই উপস্থিত ছিলেন। এরপর আরও একবার তাকে দেখেছি। এসএসসি পরীক্ষার পর মেকা ধানমণ্ডির অফিসে আমাদের সংবর্ধনা দিয়েছিল। এই অনুষ্ঠানেও তিনি উপস্থিত ছিলেন। তাকে কেমন দেখেছি, এই নিয়েই ব্লগটি লিখছি। ও, তার আগে তামিমের বর্তমান পরিচয়টা দিয়ে নিই। তিনি বর্তমানে বুয়েটের “পেট্রোলিয়াম ও খনিজ সম্পদ বিভাগ”-এর প্রধান। এই বিভাগটি কেবল মাস্টার্স ও পিএইচডি’র জন্য, ব্যাচেলর্স নেই।

আমি কলেজে ব্যান্ড পার্টির পাইপার ছিলাম। ক্লাস টেনের প্রথম দিকেই আমাদের ব্যাচ ব্যান্ড পার্টি থেকে অবসর নেই। কিন্তু ক্যান্ডিডেট থাকার সময় রিইউনিয়নের জন্য আমাদেরকে আবার ব্যান্ড পার্টিতে আসতে বাধ্য করা হয় যা নিয়েই আমরা মোটেই সন্তুষ্ট ছিলাম না। আসলে আমাদের রিইউনিয়নের দ্বিতীয় দিনে সব ক্যাডেট, এক্স-ক্যাডেটদের নিয়ে একটা প্যারেড হয়। সেবার প্যারেডের প্রধান অতিথি হিসেবে আসছিলেন তৎকালীন এজি। জুনিয়রদের ব্যান্ডের অবস্থা ভাল ছিলনা বলেই আমাদেরকে ফিরে আসতে হয়েছিল। দ্বিতীয় দিনে প্যারেডের আগে আগে নির্দিষ্ট জায়গায় বসে আমরা অপেক্ষা করছিলাম, এমন সময় কাচা-পাকা চুলের ক্যাপ পরা এক লোক আমাদের সাথে দেখা করতে আসেন। এসে বললেন তিনি সেভেন্‌থ ব্যাচের এবং ব্যান্ড পার্টিতে ড্রামার ছিলেন। একটা সাইড ড্রাম নিয়ে কিছুক্ষণ বাজালেন। পাইপও ভালই পারেন। বেশ অনেকক্ষণই আমাদের সাথে আলাপ করেছিলেন। প্রিন্সিপাল নিয়ে উনি যে কথাটা বলেছিলেন তা অবশ্য আমরা কেউই ভালভাবে নেইনি, কারণ প্রিন্সিপালকে আমরা দুই চোখে দেখতে পারতাম না। তিনি বলেছিলেন, “আমি ২৩টি দেশে পড়াশোনা করেছি। কিন্তু আমার দেখা সেরা শিক্ষক হলেন রফিকুল ইসলাম”। উল্লেখ্য রফিকুল ইসলাম ব্যাচেলর হিসেবে দীর্ঘ ১৫ বছর আমাদের কলেজে ছিলেন। আমাদের হাউসের তিন তলাতেই থেকেছেন। অবশ্য প্রিন্সিপালের জ্ঞান এবং পড়ানোর স্টাইল যে ভাল এ নিয়ে আমরাও একমত ছিলাম। তবে তিনি জনপ্রিয় হতে পারেন তা মেনে নিতে পারিনি। তাকে আমাদের চিন্তার কথাও বলেছিলাম। জবাবে রফিকুল ইসলাম ভাল শিক্ষক কিন্ততু সেরকম প্রশাসক নন বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন।

ব্যান্ড পার্টি নিয়ে কি কি বলেছিলেন তার সব মনে নেই। তবে এটা মনে আছে, কলেজ লাইব্রেরি নিয়ে অনেক কিছুই বলেছিলেন। এটা সত্যি, তখন লাইব্রেরি এত বড় ছিলনা। বইও ছিল তুলনামূলকভাবে কম। আমাদের লাইব্রেরিতে এত বই এসেছে এক্স ক্যাডেটদের কল্যাণেই। রফিকুল ইসলাম প্রিন্সিপাল হয়ে আসার পর তার শিষ্য ক্যাডেটরাই অধিকাংশ বই দিয়েছে। আমার মনে আছে ১৯৯৯-এ সেভেনে থাকার সময় আমাদের লাইব্রেরিতে বই সংখ্যা ছিল ১৩,০০০ (প্রসপেক্টাসে লেখা ছিল); আর টুয়েলভে যখন বেরিয়ে আসছিলাম তখন আমি নতুন বইগুলোর গায়ে ১৮,৭০০ পর্যন্ত লেখা দেখেছি। যাহোক, সে সময়ে লাইব্রেরির অনেক বইই তিনি পড়েছিলেন, পাঠ্যবইয়ের বাইরে অনেক কিছু পড়ার ঝোঁক ছিল; লাইব্রেরিতে কি কি বই আছে তার সবই তিনি বলতে পারতেন। অর্থাৎ, ক্লাসমেট কেউ বই খুঁজে না পেলে হয়তো তামিমের কাছেই যেতো।

রফিকুল ইসলাম যে কি পরিমাণ তেল খেয়েছিল সেই রিইউনিয়নে তা গ্যালন দিয়ে মাপা যাবেনা। ৭ম ব্যাচের এক্স-ক্যাডেটরাই এক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রণী ছিল। সেকেন্ড ডে-তে রাতের বেলা রেমিনিসেন্স-এর আগে একটা ছোট অনুষ্ঠান হয়েছিল যর উদ্দেশ্যই বোধ হয় ছিল প্রিন্সিপালকে তেলানো। প্রিন্সিপালসহ সব শিক্ষকরাই সস্ত্রীক উপস্থিত ছিলেন। রফিকুল ইসলামকে সে অনুষ্টানে গুরুদক্ষিণা হিসেবে ৭ম ব্যাচের ক্যাডেটরা একটি স্বর্ণের বেল্টের ঘড়ি দিয়েছিল। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন এনায়েত ভাই আর গুরুদক্ষিণা দেয়ার পর বক্তৃতা করেছিলেন তামিম নিজেই। পুরো তিন দিনই তিনি উপস্থিত ছিলেন। আমাদের মেকা’র একটি বড় দোষ হল, এক্স ক্যাডেটদের সাথে প্রেজেন্ট ক্যাডেটদের সম্পর্কের অভাব। সেদিক থেকে তিনি অনেক বেশিই আমাদের সাথে কথা বলেছেন।

রিইউনিয়ন হয়েছিল ২০০৩-এর জানুয়ারিতে। এরপর একই বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে তাকে আবার দেখি। সেবার ধানমণ্ডিতে মেকা অফিসে। কলেজ বাসে করে আমাদের ব্যাচের সবাই (৩৭তম) গিয়েছিলাম। আমরা এ+ পেয়েছিলাম ৪৩জন। মেকা ব্যাচের সবাইকেই সংবর্ধনা দিয়েছিল। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ভিসি জামিলুর রেজা চৌধুরী। আর বিশেষ অতিথি ছিলেন মেকা প্রেসিডেন্ট, আমাদের প্রিন্সিপাল এবং তামিম। জামিলুর রেজা চৌধুরী বক্তৃতার সময় একটা মজার কথা বলেছিলেন, “আমি দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে অনেক ক্যাডেটকেই ছাত্র এবং সহকর্মী হিসেবে পেয়েছি। বুয়েটের তামিম… (আরও কয়েকজনের নাম বলেছিলেন)। তাদের সাথে কাজ করতে গিয়ে আমার বেশ ভাল লেগেছে, তাদের মেধার পরিচয় পেয়েছি। আর ক্যাডেটদের একটি কোমন বিষয় আমার নজরে পড়েছে। কোন অনুষ্ঠান বা আড্ডায় কোন ক্যাডেট থাকলে সে কোন না কোন এক পর্যায়ে জানিয়ে দিতে চায় যে সে ক্যাডেট ছিল।” জামিলুর রেজা জোক্‌স করেই কথাটি বলেছিলেন। সবাই বেশ মজা পেয়েছিল। যাহোক, তামিম তার বক্তৃতায় ক্যাডেটদের মেধা ও মননের পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করেন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তাদের অবস্থানের কথা বলেন। তামিমের পরে বক্তৃতা দেন আমাদের প্রিন্সিপাল। তিনি বক্তৃতার শেষে অতি আশা নিয়ে বলেছিলেন যে, আমাদের কোন এক্স-ক্যাডেট নোবেল পুরস্কার পেলে তিনি তার জীবনকে সবচেয়ে সফল মনে করবেন। অনেকগুলো মাইলস্টোনই মির্জাপুরিয়ানরা অতিক্রম করেছে, নোবেল পুরস্কারটা এর শ্রেষ্ঠ সংযোজন হতে পারে। বক্তৃতায় তিনি তামিমের গবেষণাকর্মের দিকেই ইঙ্গিত করেছিলেন।

এরপর তাকে আর দেখিনি বা তার সম্বন্ধে কোথাও খুব একটা শুনিওনি। আবার তাকে নিয়ে জানতে হল এই খবর দেখে। জানলাম উনি পড়াশোনা করেছেন বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিঃ বিভাগে (বিএসসি), আইআইটি, মাদ্রাজের মেকানিক্যাল থেকে এম.টেক এবং আলবার্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি। বুয়েটের Department of Petroleum and Mineral Resources Engineering (DPMRE) বিভাগ ১৯৯৫ থেকে শিক্ষাবর্ষ শুরু করে। বর্তমান চেয়ারম্যান তামিম। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ সরকারের “শক্তি উপদেষ্টা কমিটি”-র সদস্য। তিনি Society of Petroleum Engineers-এর বাংলাদেশ শাখার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপার্সন। ২০০৮ সালের ১০ জানুয়ারিতে তাকে বাংলাদেশ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা পাবেন এবং প্রধান উপদেষ্টাকে তার ক্ষেত্র সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরামর্শ দেবেন। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে উপদেষ্টা পরিষদের আকার বড় করা সম্ভব না হওয়ায় পরামর্শক নিয়োগের এই উদ্যোগ নেয়া হয় বলে জানিয়েছেন সরকারি কর্মকর্তারা। সরকারি কার্যপ্রণালী বিধির অধীনে কর্মবণ্টন বিধির (এলোকেশন অব বিজনেস) ৩(৪) ধারায় বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা কোনো বিভাগ বা মন্ত্রণালয়ের জন্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপদেষ্টা নিয়োগ করতে পারেন। এই বিধি সংশোধন করে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার সঙ্গে ‘বিশেষ সহকারি’ শব্দটি সংযোজন করা হয়েছে।

আমি বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সফলতা কামনা করি এবং ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ইতিবাচক মন্বন্তর মনে করি। তামিম তার নিজস্ব ক্ষেত্রে সরকারের সফলতা অর্জনে সহায়তা করুক এবং দেশ গঠনে অবদান রাখুক। এভাবে দেশের প্রতি ক্যাডেটদের দায়বদ্ধতাও কিছুটা পূরণ হবে। আমরা ক্যাডেটরা প্রকৃত অর্থেই দেশ আমাদেরকে যা দিয়েছে তার তুলনায় তেমন কিছুই দেশকে ফিরিয়ে দিতে পারিনি। আমি ব্যক্তিগতভাবে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে আমাদের ঋণ ফিরিয়ে দেয়ার জন্য তামিমের দিকে তাকিয়ে আছি। প্রতিটি ক্যাডেটই আশা করি এমন কিছু আশা করছে।

১,২৩০ বার দেখা হয়েছে

৬ টি মন্তব্য : “তত্ত্বাবধায়ক সরকারে এক্স-ক্যাডেট তামিম”

  1. হ্য "সৈয়দ ফাহিম মোনায়েম" ডেইলি স্টারের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর। সেই সুবাদে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকেই প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করছেন। তিনি এমসিসি'র ৩য় ব্যাচের ক্যাডেট। ক্যাডেট নং ১১৭।

    জবাব দিন
  2. ফাহিম মোনায়েমকে আমরা কখনই কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাইনি। কারণ তিনি আগে থেকেই ভিআইপি। ভিআইপিদের দেখা পাওয়া সত্যিই দুঃসাধ্য। কিন্তু ভার্সিটির শিক্ষকরা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সে পর্যায়ের ভিআইপি নন। তাই হয়তো বা তামিমের দেখা পেয়েছি। ফাহিম মোনায়েমকে একবার শুধু আমাদের ইমিডিয়েট সিনিয়ররা দেখার সুযোগ পেয়েছিল। কারণ তাদেরকে মেকা সংবর্ধনা দিয়েছিল যে অনুষ্ঠান করে সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন ফাহিম মোনায়েম। অর্থাৎ ২০০২ সালে ফাহিম মোনায়েম আর ২০০৩ সালে জামিলুর রেজা চৌধুরী। তামিম কখনই সে পর্যায়ের ভিআইপি ছিলেন না।

    জবাব দিন
  3. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    নোবেল প্রাপ্তিতে মেকান, চমৎকার স্বপ্ন। তামিমের সাথে এই তালিকায় আমি আমার ব্যাচমেট সালেহ আহমেদ তানভীরকেও (৫/১৯৪) রাখি। তিনি বর্তমানে ওহায়ো বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্ক শাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।