কৃতঘ্ন বাঙালি আমরা।

ভোদাই বাঙ্গালির বুদ্ধি-শুদ্ধি জীবনেও হবে না।

একবারও ভেবে দেখেছেন বিষয়টা? মানুষগুলো সারাদিন বসে আছে, যেই তার কাছে আসছে বলছে “আমার পেটে ব্যথা, আমার মাথা ঘুরায়, আমার ডাইরিয়া, আমার চুলকায়,আমার কুঁচকিতে ঘা,আমার বিচি ফুলে গেছে” টাইপ কথাবার্তা। জীবনের প্রতিটা দিন মানুষগুলো অন্যের অসুখের কথা শোনে। আমাকে, আপনাকে চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করে। যেন আমরা ভাল থাকি, সুস্থ্য থাকি। এরা যখন ডিউটিতে থাকে তখনতো করেই, ডিউটি ছাড়াও এখন তো মোবাইলের যুগ। দিন নাই, রাত নাই “দোস্ত বা ভাই বা আপু আমার গলায় মাছের কাটা ফুটেছে, সকালে হাগা ক্লিয়ার হয় নাই পেটটা ভারী হয়ে আছে, আমার শরীর ম্যাজম্যাজ করছে কি করব” টাইপের ফোন দিনে একটাও পায় না এমন ডাক্তার আমাদের দেশে খুঁজে পাওয়া বিরল। এসব কল না ধরলেও বিপদ, এমনিতেই পেশাগত কারনে এরা পারিবার বা বন্ধুদের সাথে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারে না, এসব কল না ধরলে তো আরও মার্কামারা সমাজ বিচ্যুত হয়ে যাবে।

এতকিছু করার পরও ওরা খারাপ আমাদের কাছে। তারপরও কিন্তু কিছু একটা হলেই ওদের কাছেই দৌড়াতে হয় আপনি যত বড় কুতুবই হন না কেন। হাগা বন্ধ হলেও ডাক্তার, হাগা বারবার হলেও ডাক্তার। আপনার সমস্যাটা হয়ত সিরিয়াস, আপনি ভুগছেন। কিন্তু এটাও মাথায় রাখেন শুধু আপনি না, যারা যাচ্ছে হসপিটালে সবার অবস্থাই আপনার মত। ঐ ডাক্তারগুলো সারাদিন এসব নিয়েই আছে। তারাও টায়ার্ড হতে পারে। তারাও আপনার বাড়াবাড়িতে বিরক্ত হতে পারে।

একবার আমার এক বন্ধুকে মহসীন হলের মাঠে কোপালো চাপাতি দিয়ে। নিয়ে গেলাম ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে। ওর সারা শরীর রক্তে ভেজা, আমাদের জামাকাপড়ও ওর রক্তে চিটচিট করতেছে। কোথাও লাল-লাল মাংস দেখা যাচ্ছে,কোথাও হাড়। ঢাকা মেডিকেলে গেছি, ঢাকা ভার্সিটির ছেলে মেয়ে আমরা সব। স্বভাবতই গিয়েই হৈ চৈ শুরু করে দিলাম। ওটি তে নিতে দেরী হচ্ছে কেন? ব্লিডিং বন্ধ হচ্ছে না কেন? ইত্যাদি ইত্যাদি। একজন ডাক্তার এসে বলল আপনি আসেন আমার সাথে, আমরা দুইজন ওটিতে ঢুকলাম। দেখি ওটিতে একসাথে দুইটা অপারেশন চলছে। একটা এক্সিডেণ্টের পেশেন্ট। একজনের একটা হাত কেটে ফেলে রাখা  একপাশে, চার পাঁচজন সার্জন চেষ্টা করছে তার পা দুটোকে বাঁচাতে। আরেকজনের মুখে চোখ, নাক, মুখ কোনটা যে কোথায় তা বোঝা যাচ্ছে না ঠিকমত। হয়ত ভালমত তাকালে আলাদা করে দেখতে পারতাম। কিন্তু তাকানোর শক্তি বা সাহস কোনোটাই আমার ছিল না। সেই লেডী ডাক্তার আমাকে জিজ্ঞেস করল বলেন এদের আগে আপনার বন্ধুর সেলাইটা করে দেব? আমি কোনো উত্তর না দিয়ে বের হয়ে আসলাম। এরা ডাক্তার আমার আপনার মতই মানুষ। এদেরও বিরক্ত লাগে, রাগ হতে পারে, খারাপ লাগতে পারে। ভেবে দেখেন অফিসে কতজন লোকের সাথে আপনাকে ডিল করতে হয়? সবাই আপনার কাছে তাদের সমস্যা নিয়ে আসে কি? তারপরও একটা সময়ের পর রাগ হয়, বিরক্ত লাগে। আর ডাক্তারদের অফিসে সবাই নিজেদের সমস্যা নিয়েই যায়।

কিছুদিন আগে মামাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলাম ল্যাব-এইডে। মামা শুরু করল এভাবে “ডাক্তার সাহেব অমুক ইঞ্জিনিয়ার আমার বন্ধু, সে আমাকে আপনার কথা বলল। তাই আপনার কাছে আসলাম।” ডাক্তার বলল অনেক রোগী দেখিতো ঠিক সেভাবে মনে পড়ছে না। জিজ্ঞেস করল আপনার কি হয়েছে সেটা বলেন। মামা বলে “আমার গ্যাস, ১৯৯২ সালে একবার এন্ডসকপি করেছিলাম,অমুক ইঞ্জিনিয়ার আমার বন্ধু, বাড়ি অমুক জায়গায়। সে আমাকে আপনার কথা বলল। তাই আপনার কাছে আসলাম।” ডাক্তার বলল “এত আগে! রিসেন্ট কোনো কিছু কি করা হয়েছে? কি ঔষধ খাচ্ছেন?” মামার উত্তর “অমুক ইঞ্জিনিয়ার আমার বন্ধু, সে অমুক খানে চাকরি করে, সে আমাকে আপনার কথা বলল। তাই আপনার কাছে আসলাম।” আমি নিজেই বিরক্ত। মনে হচ্ছিল মামাকে বলি আপনি ঐ ইঞ্জিনিয়ারের কাছে যান। সে আপনার চিকিৎসা করে দেবে। ডাক্তারের কথা আর কি বলব। এরা ডাক্তার। এরা বিরক্ত হলে দুনিয়া উলটে যায়। এরা প্রতিদিন এমনই সব রোগী সামলায়। একবার ভেবে দেখেন আপনি একদিনও পারবেন কিনা? চিকিৎসা করতে হবে না, শুধু ধৈর্য ধরে মানুষের সমস্যা গুলো শুনবেন।

আমরা পয়াদা হই ডাক্তারদের হাতে, সারা জীবন তো আছেই, মরার সময়ও এই মানুষ গুলোই আমাকে আপনাকে আরো কিছুদিন এই দুনিয়ায় বাঁচিয়ে রাখার জন্য লড়াই করে যায়। একটা মানুষ আপনার সেবা করছে আর আপনি তার সাথে দূর্ব্যবহার করছেন, আপনার মত কৃতঘ্ন মানুষের সেবা করাটা তাদের জন্য কষ্টকর হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমার খুব জানতে ইচ্ছা করছে যারা বারডেমে মারামারি করল, তাদের কেউ কি আহত হয় নাই? তারপর তারা কার কাছে গেছে চিকিৎসার জন্য?

১,৯১৭ বার দেখা হয়েছে

১৯ টি মন্তব্য : “কৃতঘ্ন বাঙালি আমরা।”

  1. ফেরদৌস জামান রিফাত (ঝকক/২০০৪-২০১০)

    এই দেশ থেকে ডাক্তারি পড়া নিষিদ্ধ করে দেয়া উচিত, দেশে কোন ডাক্তার না থাকলেই সব ঝামেলা মিটে যায় ~x(


    যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা

    জবাব দিন
  2. মোকাব্বির (৯৮-০৪)

    রিফাত যেটা বললো, বাংলাদেশে ডাক্তারি পেশা ও পড়াশুনা আইন করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা সময়ের দাবী। এই অমানুষ, পশুগুলা ডাক্তারি পইড়া জাতে উইঠা যায়।


    \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
    অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

    জবাব দিন
  3. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    আমরা ভুলে যাই ডাক্তারেরা ভিন গ্রহের কোন এলিয়েন না, দেশের অন্যান্য দেশের মতই মানুষ। আর সবার মাঝে যে ধরনের দোষ ত্রুটি আছে, তাদের মাঝেও সেটা থাকাটাই স্বাভাবিক। মানুষ কি করে যেন একটা ধারনা পেয়ে গিয়েছে যে ডাক্তার মানেই কসাই, এরা শুধু টাকা বানাওর কাজে ব্যস্ত। এর পিছনে যেমন কিছু ডাক্তারের আচরন, কাজকর্ম আছে তেমনি আছে মিডিয়ার নেগেটিভ খবর। কেন জানি সাংবাদিকরা ডাক্তারদের ভুলের খবর দেয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে।

    আরেকটা অভ্যাস আমাদের জাতিগত সমস্যায় পরিনত হয়েছে সেটা হলো কিছু হলেই মারধোর, ভাংচুর। রাস্তায় গন পিটুনির সুযোগ পেলে কিছু না জেনেই আমরা তাতে ঝাপিয়ে পড়ি, কোচিং সেন্টারের অনুষ্ঠানে চেয়ার না পেলে আমরা রাস্তায় নেমে গাড়ি ভাঙ্গা শুরু করি। আর হাসপাতালে ক্ষমতাবান কারো আত্মীয়র সাথে কিছু হলে মাইর পড়তে দেরি হয় না।

    তবে এর সাথে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ত্রুটিও জড়িয়ে আছে, কোন এক রিপোর্টে দেখছিলাম গত ৪০ বছরের ইতিহাসে ম্যালপ্রাকটিসের কারনে কোন ডাক্তারের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে এরকম কোন ইতিহাস নেই। প্রচুর ভূয়া সার্টিফকেট ওয়ালা ডাক্তার কাজ করে যাচ্ছে, নামের শেষে ইচ্ছে মত ডিগ্রি লাগাচ্ছে এসবের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেই। ঔষধ কম্পানি, ডাক্তার, হাসপাতাল, ল্যাবদের মাঝে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধেও কোন ব্যবস্থা নেই। ক্ষমতাবান আত্মীয় যাদের নেই তাদের একটা বড় অংশ, যারা কখনোই মারামারিতে যেতে পারে না নিজেদেরকে কিন্তু বঞ্চিতই ভাবে।

    এসব থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সবার আগে দরকার ডাক্তার সংগঠনগুলোর নেতাদের রাজনীতি আর নিজেদের আখের গোছানোর ধান্দা হেকে বেরিয়ে এসে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য কিছু করা। এতে রোগী এবং ডাক্তার দুই পক্ষই লাভবান হবে। তবে অদূর ভবিষ্যতে সেরকম কিছু হবে সে আশা দেখি না।


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  4. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    শুক্রবার দুপুরে স্টেশনের কোয়ার্টারে লাঞ্চ করছিলাম। এমন সময় বাইরে কিছু লোকজনের আনাগোনা টের পেলাম ডাক্তারের খোঁজ করছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর মেডিকেল সহকারী তখন টিউবওয়েলে গোসল করছিলেন; বললেন একটু আগে দেখেছি স্যার দুপুরের খাবার খাচ্ছেন, যান ভেতরে আছেন। তখন এঁদের বলতে শুনলাম, ডাক্তারের আবার খাওয়া কি?

    আরেকদিন ভোর বেলা পাশেই অবস্থিত পুলিশলাইন থেকে কিছু পুলিশ তাদের একজন কলিগকে গাড়িতে করে কোয়ার্টারে নিয়ে এলেন। দরজা খুলে কি সমস্যা করলাম, বললাম ভেতরে নিয়ে আসেন।পরীক্ষা করার জন্যে ভেতরে পেশেন্ট বেডে এনে শোয়াতে বলতে' শুনতে পেলাম গাড়ি থেকে আরেকজন কলিগ চিৎকার করে বলছে -- ভেতরে যেতে পারবেনা, গাড়িতেই পরীক্ষা করতে বলো আইসা। প্রয়োজনে আমি নিশ্চয়ই ছুটে যেতে পারতাম গাড়িতে বা পেশেন্টের মেসে। কিন্তু যেটা আমাকে হতাশ করলো সেটা হচ্ছে এটিচ্যুড।

    উপজেলা নির্বাহী অফিসার (উপজেলা প্রশাসনের সর্বেসর্বা ব্যক্তিত্ব) একবার এত্তেলা পাঠান তাঁর কোয়ার্টারে গিয়ে ব্লাড প্রেশার মাপার জন্যে, আরেকদিন এত্তেলা পাঠান তার অধীনস্থ কর্মচারী ভর্তি আছেন হাসপাতালে, আমি যেনো অমুক সময় সেখানে থেকে তাঁকে ধন্য করি। একদিন সন্ধ্যায় অফিসার্স ক্লাবে ব্যাডমিন্টন খেলারত তাঁর পাশ দিয়ে 'সালাম' না দিয়ে চলে গেছি বলে অন্যদের বললেন - ডাক্তাররা হচ্ছে কসাই, ব্যবহার জানেনা।

    জবাব দিন
    • ফেরদৌস জামান রিফাত (ঝকক/২০০৪-২০১০)

      (ক্ষমাপ্রার্থনা পূর্বক) এক ক্যাডেট বড়ভাইয়ের ফেইসবুক স্ট্যাটাস থেকে~

      সার্টিফিকেট থাকলেই শিক্ষিত হয় না। হাবিলদার নজরুল বললেন, চির উন্নত মম শির। এখন সেপাই থেকে জেনারেল তা’ চিৎকার করে বলছেন। নজরুল নিয়া গবেষণা কইরা অনেকে ডক্টরেট হইতাছেন। স্কুল পালিয়ে রবীন্দ্রনাথ বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছিলেন।
      বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়া কথা কইতে যাইয়া বেশ কিছু তরুণ শিক্ষানবিশ ডাক্তারের সাথে আলাপচারিতা হইসে। তাদের কথাবার্তায় সার্টিফিকেট নিয়া আমার সন্দেহ নাই, তবে শিক্ষা নিয়া ঘোরতর সন্দেহ আছে। বেতন কম বইল্যা তারা প্রাইভেট প্রাকটিসের পক্ষে যুক্তি দেখান। যখন পাল্টা যুক্তিতে বলি, নিম্ন আদালতের বিচারকেদেরও বেতন কম, তারা তাইলে বিকালে আইন ব্যবসা করছেন না কেন? বেতন কম বইল্যা কি ম্যাজিস্ট্রেটের ঘুষ থাওয়াকে আমরা বৈধতা দেবো? তরুণ প্রজন্মের এই মানসিকতা নিয়া দেইখা আমি মর্মাহত। তর্কে ধরা খাইয়া তারা ব্যক্তিগত আক্রমণ করছে। বলছে, আপনেতো মেডিকেলে পড়েন নাই, সায়েন্সেও পড়েন নাই। আপনার এ সব কথা বলার অধিকার নাই।
      আমার চিকিৎসা সেবা নিয়া আমি কথা কইতে পারুম না, এই ফ্যাসিবাদী মানসিকতার নিন্দা জানাই। মেডিকেলে চান্স পাইয়া, পড়াশোনা করতে করতে যারা ধরাকে সরা জ্ঞান করতাছেন, তাদের প্রতি নিতান্তই করুণা। কোনও এক দৈব প্রক্রিয়ায় তাদের ভুল ভাঙুক, এই প্রত্যাশায় আছি।


      যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা

      জবাব দিন
  5. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)
    একবার ভেবে দেখেন আপনি একদিনও পারবেন কিনা? চিকিৎসা করতে হবে না, শুধু ধৈর্য ধরে মানুষের সমস্যা গুলো শুনবেন।

    :thumbup:


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।