মাথার ব্যামো -২

টম ক্রুজ আর আমি একটা অনেক বড় দালানে আটকা পরে গেছি। চারিদিকে শত্রুরা ঘুরাফেরা করছে। ধরা পরলে গুলি করে দিবে।সাহায্য পেতে হলে নিচে নামতেই হবে। টম ক্রুজকে দেখলাম দেয়াল বেয়ে নিচে নেমে গেল।আমি পরলাম বিপদে।নিচে দেখে মনে হচ্ছিল না নামতে পারব। এমন সময় ঘুম ভাঙল। আশেপাশে দেখে বুঝতে পারছিলামনা কোথায় আছি। ভয় পাচ্ছিলাম, এমন সময় আমার বেডের সাইডে নিচে দেখতে পেলাম মহসিন চাচা ঘুমাচ্ছে। আরেকটু ঘুরে তাকাতেই দেখতে পেলাম- এক সাইডে আম্মু এবং বড় চাচি আর অন্য সাইডে আব্বু,বড় চাচা এবং মহসিন চাচা ফ্লোরিং করছে। তারপরই বুঝতে পারলাম কেন ঘুম ভেঙ্গেছে। প্রচণ্ড পেশাব চেপেছে আর তেস্টা পেয়েছে।কি করব বুঝতে পারছিনা এমন সময় আম্মু বোধহয় টের পেল যে আমি উঠেছি। আমাকে জিজ্ঞেস করল কি হয়েছে? আমি জরুরতের কথা বললাম। মা আমাকে উঠিয়ে টয়লেটে নিয়ে গেল আর পানি খাইয়ে দিল। আমার পিপাসা মিটল ঠিকই কিন্তু ঐ রাতে আমার আর ঘুম এলনা। সারা রাত মা পাশে বসে থাকল আর আমাকে বলল কারা কারা আমাকে দেখতে এসেছিল। আমি জানতে পারলাম- আমার দাদি( যার দুই নয়নের মনি আমি),নানি,নানা, বাদশা চাচা আর আশেপাশের আত্মীয়রা যেমন ইসলামের দুই মামা( মোজাম্মেল এবং ),আমার ফুপুরা, চাচাত চাচারা এবং ওয়াসি এবং তার বাবা এসেছিল। তারা সবাই আমার জন্য অনেক দোয়া করছে। শুনে খুব ভাল লাগল। ভোর হওয়ার পর একটু ঘুম আসল। উঠলাম নার্সের ডাকে। নার্স ইনজেকশন দিয়ে বাবার কাছে একটা সাপজিটর দিয়ে গেল ১২টার দিকে দেয়ার জন্য। সবাই পরোটা আর সব্জি খাচ্ছিল। আমারও খুব খেতে ইচ্ছা করল। কিন্তু জানতে পারলাম আমাকে এখনও সলিড খাবার খাওয়ার আনুমতি দেয়া হয়নি। স্যুপ খেয়ে দুপুরটা পার করলাম। বিকেলে আবারো আত্মীয়রা আসলেন। দেখা করলেন। এক দাদা আসলেন, যিনি আমার ছোট খালার উকিল শ্বশুর। বেশ রসিক মানুষ। সম্পর্কে দাদা হলেও বয়স বাবার মতই। তাই দাদার বদলে ভাইটাই সুবিধা। তার সাথে আলাপ করে ভাল লাগল। বিকেলে সাকিব আসল, ইসলাম তো ছিলই। আসলে চোখের সামনে এক্সক্যাডেট থাকায় ভালই লাগছিল। সন্ধ্যায় ডাক্তার আলমগির আঙ্কেল আস- লেন।আমার এই ছোট জীবনে দেখা ভালমানুষগুলোর মধ্যে অন্যতম। তার পেশেন্টের সাথে ব্যবহারটাই অন্যরকম যা মনোবল বাড়িয়ে দেয়। আমার সাথে আলাপ করলেন, স্যালাইন খুলে দিতে বললেন এবং সলিড খাবার খাওয়ার অনুমতি দিলেন। তারপর আব্বুর সাথে বাইরে গেলেন কথা বলতে। আব্বু ফিরে এসে বললেন পরের অপারেশনটা মাত্র চারদিন পরেই করা হবে। আমার অবস্থা নাকি একটু বেশিই প্রোগ্রেসিভ। আমার আবার অপারেশনের কথা শুনেই একটু ভয় ভয় লাগতে লাগল।এতই ভয় পেলাম যে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগলাম যাতে দ্বিতীয় অপারেশনটা না হয়। কিন্তু কাউকে বললাম না। কারন সবাই আমাকে বিবেকবান হিসেবেই জানে। আমি ভয়ের কথা বললে সবাই আরও বেশি টেনশন করবে। সারাদিন সাকিব ও ইসলাম আমার সাথেই ছিল। ওদের সাথে গল্প করলাম। কিন্তু বাবা বারবার ই বাধা দিতে লাগলেন। কিন্তু ক্যাডেট কলেজের অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে কি করে অপরের চোখ বাচিয়ে কথা বলতে হয়। সন্ধ্যার পরে নার্স এসে ওষুধ দিয়ে গেল। ব্যাথা তখন অনেকটাই কমে গেছে। শুধু মাথার পিছনটা ভারি লাগত। সবাই অনেক রাত অবধি নামাজ পড়ল, দোয়া করল। রাতে খবর পেলাম ম্যান ইউ নাকি চেলসির সাথে জিতেছে। ভাল লাগল। ইসলামের মোবাইলে গোল গুলা দেখলাম। একে একে সবাই ঘুমিয়ে পড়ল। যদিও আমাকে সেডিল দেওয়া হয়েছিল তারপরেও ঘুম আসছিলনা। আমার পাশে জেগে ছিল ইসলাম। ও ঘুমাতে যাওয়ার আগে ওর কাছ থেকে মোবাইলটা নিলাম। ফেসবুকের এক্সক্যাডেট ফোরামে দেখতে পেলাম ইসলামের পোস্ট- the first operation on Mehedi-2251(42nd,Ex-RCC) went well. Doctor said he is progressing very well. His major operation will take place very soon. Pls everyone pray for him. আমার মনে সন্দেহ ঢুকল পরেরটা যদি মেজর হয় তাহলে এটা কি ছিল? সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে পারলাম না।নানা বিচ্ছিন্ন চিন্তা-ভাবনা মনকে আচ্ছন্ন করে রাখল। অবশেষে ফজরের আজানের পর ঘুম আসল।                                                                                          সকালে উঠেই দেখলাম নার্স ওষুধ খাওয়াতে চলে এসেছে। তখন ভোর ছয়টা। সবাই জিজ্ঞেস করল রাতে ঘুম হয়েছে কিনা- বললাম হয়েছে। সবাই আস্তে আস্তে নাস্তা সারল। আমিও নাস্তা করলাম- পেপে, স্যুপ আর একটা সেদ্ধ ডিম।পত্রিকা দেখে জানতে পারলাম ঐদিন ছিল সোমবার। আব্বু-আম্মু দুজনেই সকালে বললেন তারা একটু গাজীপুর যাবেন আর বিকেলের মধ্যে ফিরে আসবেন। আমি তাদের যেতে বললাম। আমার সাথে রইল মহসিন চাচা, শেফালী ফুপি আর বড় খালু। সেইদিন আরও একবার বুঝতে পারলাম অসুস্থ অবস্থায় বাবা-মা পাশে না থাকলে কেমন লাগে। ১২টার দিকে আমার ক্লাসমেটরা এল আমাকে দেখতে। সাকিব,সজল,রাব্বি,সাঈদ,এহসান,সিয়াম আর সাথে ইসলাম তো ছিলই। ওদের সাথে অনেক সময় কাটল। অনেক ভাল লাগল। তারপর বাবা-মা আসল। ফ্রেন্ডরা সব চলে গেল। কিন্তু বাবা-মাকে দেখে অনেক ভাল লাগল। সারাবিকেল মহসিন চাচার সাথে গল্প করলাম। তিনি অনেক সাহস দিলেন। বিকেলে খালু আর মহসিন চাচা চলে গেলেন। থাকল শুধু বাবা-মা আর ইসলাম।রাতে ডাক্তার আঙ্কেল এসে আমাকে উঠে বসতে বললেন। আমি বসলাম এবং হঠাৎ করেই আঙ্কেল বলে উঠলেন- excellent job Janu, excellent job. He is all fit now.চল বুধ বারেই অপারেশনটা সেরে ফেলি। (জানু আমার বাবার ডাক নাম) বাবা বলল সব আল্লাহর ইচ্ছা, আপনি যদি বলেন বুধবার তাহলে বুধবারেই হোক। আমি প্রচণ্ড টেনশনে পরে গেলাম। সেদিন সোমবার রাত ছিল, মানে হাতে আর মাত্র একটা দিন। যাইহোক কাউকে আর কিছু বললাম না। রাতে শুধু ভয়ে নাকি টেনশনে জানিনা কয়েক ফোটা অশ্রু ঝরালাম, যাতে কেউ দেখতে না পায়। বুঝতে পারছিলামনা আসলে অপারেশনের কেন করা হচ্ছে। মনে হচ্ছিল সবাই আমার কাছ থেকে কিছু একটা গোপন করা হচ্ছে। রাতে ঘুমোতে গেলাম। কিন্তু ঘুম আসছিলনা। নানা আশঙ্কা মনে এসে জড়ো হচ্ছিল। ভোরের দিকে ঘুম এল। ঘুম থেকে উঠে দেখলাম সবার নাস্তা শেষ। আমাকে আম্মু খুব যত্ন করে খাওয়াল। খাওয়ার পর বেড থেকে নিচে নামলাম। ব্যালকনিতে গেলাম, নয় তালার উপর থেকে নিচের বিখ্যাত বলধা গার্ডেন দেখতে খুব ভাল লাগছিল। পাশে ছিল খ্রিস্টান কবরস্থান। ওটার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত ফিলিংস হলো। মনে হল যাই করিনা কেন একদিন এরকম একটা জায়গায় আমাকেও থাকতে হবে। সাথে আর কেউ থাকবে না – আমার সে দিনটা কি খুব কাছিয়ে এসেছে? মার ডাকে সম্বিৎ ফিরল। নার্স ওষুধ নিয়ে এসেছে। সারাটা দিন গা শিরশির করল। অদ্ভুত এক অনুভূতি। বিকেলের দিকে কিছু মেডিকেলের স্টুডেন্ট আসল আমাকে দেখতে। সম্ভবত নিওরোলোজির ছাত্র। আমাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করল। নিজেকে তাদের সামনে গিনিপিগের মত অসহায় লাগছিল। সন্ধ্যায় মা বাবার সাথে অনেক্ষন বসে রইলাম। তারা আমাকে অনেকটা সাহস যোগালেন। আত্মীয়-স্বজনেরা আসলেন। এক চাচা বাবাকে প্রশ্ন করলেন যে এখানে অপারেশন করানোর ব্যাপারে বাবা শিওর কিনা। বাবা বললেন যে তিনি শিওর, ডাক্তার তার পরিচিত এবং উচু মাপের। আস্তে আস্তে সবাই চলে গেল। আমি ঘুমোতে গেলাম। স্বপ্নে দেখলাম অপারেশনের সময় আমাকে মোটা মোটা সিরিঞ্জে ভরে ইনজেকশন দেয়া হচ্ছে। ঘুম ভেঙ্গে গেল। মনে হচ্ছিল অপারেশনটা ছাড়াই যদি সুস্থ হয়ে যেতাম! মনকে বুঝালাম, কঠিন কিছু তো নয়। অজ্ঞান হওয়ার পর ডাক্তাররা যা খুশি তাই করুক আমিতো আর টের পাবনা।                                                             পরদিন সকাল। আমার জীবনের কঠিনতম দিন। সকালে শুনতে পেলাম রক্ত নাকি লাগবে। ইসলাম আমাদের ফেসবুকের গ্রুপে গতকালই এ ব্যাপারে লিখেছিল।ডোনর ও মিলে গেল দুইজন। আমাদের সোহরাব আর শাহরিয়ার। দুপুরে ওরা এসে হাজির। সোহরাবের সাথে আমার ব্লাড ম্যাচ করল। এদিকে যত আত্মীয় ছিল সবাই এসে হাজির। আমাদের পাড়া থেকে চাচিরা আর ফুপুরা আসলেন। তারা অজিফা হাতে দোয়া পড়তে লাগলেন। আমিতো অবাক, অপারেশন তো আগেও একটা হল কিন্তু এত আয়োজন তো ছিলনা। কলেজ থেকে প্রিন্সিপাল স্যার/ভাই লে. কর্নেল আজিম ইকবাল ফোন করলেন। আমাকে সাহস দিলেন আর বললেন কলেজে আমার জন্য দোয়া করা হচ্ছে। একটু পর ফোন করলেন হামিদ ভাই(সি.এন.১)। তার কথা ছিল এরকম- মেহেদী, টেনশন করছ? টেনশন করার কিছু নেই। সব আল্লাহর উপরে ছেড়ে দাও। তার কথা শুনে অনেকটা আশ্বস্ত হলাম। আমাকে অনেক সুরা-কালাম পরে ফু দেয়া হল। পোনে তিনটার দিকে আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলা হল। আমি সবার কাছে দোয়া চাইলাম। তারপর আব্বুর সাথে রওনা দিলাম। কিছুক্ষণ আব্বুর সাথে কথা বলার পরই চুড়ান্ত ডাক এল। বাবাকে ছেড়ে যাওয়ার সময় খারাপ লাগছিল। আমার মুখ দিয়ে একটি কথাই বের হল- চিন্তা  করোনা। অপারেশন থিয়েটারে ঢুকার পর দেখলাম মোট চারজন ডাক্তার। তখনও আলমগির আঙ্কেল আসেননি। একজন বলল কি করতে হবে? টিউমারটা শান্ট করে প্রেসার রিলিজ করতে হবে এইত?কথাটা শুনে আমার আত্মায় পানি নাই। এই তাহলে ব্যাপার, এজন্যই কেউ কিছু বলে নাই। আমি তারাতারি তওবা, কালেমা, দোয়া কালাম পড়তে থাকলাম। ব্রেন টিউমার অপারেশনের পরে যে বেচে থাকব এমন গ্যারান্টি ত নেই। এমন সময় আঙ্কেল আসলেন। তাকে দেখে ভয় আরও বেড়ে গেল। মানে এখনিতো শুরু হয়ে যাবে। ডা. আলমগির আমাকে বললেন হামিদ ভাই নাকি তাকে ফোন করেছিলেন। বললেন টেনশন করনা।আল্লার নাম নাও। আমি তখন ভাবছি কখন যে অজ্ঞান হব! ভয় লাগছিল। আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই যেন নার্স একটা মাস্ক লাগিয়ে দিল মুখে। চার-পাচবার শ্বাস নিতেই হারিয়ে গেলাম। (চলবে)

 

৮৩৮ বার দেখা হয়েছে

৬ টি মন্তব্য : “মাথার ব্যামো -২”

  1. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    প্রথম পর্বটাও পড়েছিলাম। বেশ ভালো লাগছে পড়তে তোমার চিকিৎসা চলাকালীন মুহূর্তগুলোর রুদ্ধশ্বাস বর্ণণা।

    ডায়াগনোসিস টা বলোনি। এটা কি পাঠককে সাসপেন্সে রাখা জন্যে ?

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।