গল্পটা একটু অন্যরকম হতে পারত

গল্পটা একটু অন্যরকম হতে পারত।
হ্যা। একটু অন্যরকম।

রাতুল বেশ কিছুক্ষণ ধরে বসে আছে করিডোরের বেঞ্চে।এমনিতে অনেক অশান্ত প্রকৃতির। কিন্তু আজ ওর অপেক্ষা করতে একটুও খারাপ লাগছে না। বরং বুকে একরাশ আশা। অনেক স্বপ্ন। মিরপুর স্টেডিয়ামে প্রাকটিস গ্রাউন্ডের পাশে বসে আছে। দূর থেকে দেখছে তার সেই স্বপ্নের মানুষ গুলোকে প্রাকটিস করতে। ও এসেছে বোলিং ট্রায়াল দিতে। ছোটবেলা থেকেই খুব ভাল ক্রিকেট খেলে। পাড়ার ক্রিকেটে ও ছিল এক ভয়ংকর নাম। স্কুল টীমের ক্যাপ্টেন হয়ে ওর স্কুর জামালপুর জিলা স্কুল কে চ্যাম্পিয়ন ও করেছে। ওই টুর্নামেন্টে ও ছিল হাইয়েস্ট উইকেট টেকার। স্কুল জীবন পেরিয়ে কলেজে ভর্তি হল।ওর প্রতিভা আরো ছড়িয়ে পড়ল। একটা স্থানীয় ক্লাব ওকে টীমে ভেড়াল। জেলায় চ্যাম্পিয়ন হল সে ক্লাব। দ্বিতীয় সারি থেকে উঠে এল প্রথম সারিতে।ক্লাবের কোচ ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন ওর প্রতিভা। তাই ঠিক করলেন যে ভাবেই হোক ওকে আরো এগিয়ে নিতেই হবে। জেলা টীমের কোচের সাথে কথা বলে ওকে নিয়ে এলেন মিরপুরে। রাতুল অপেক্ষায় আছে। ওর ডাক আসবে। দূর থেকে কে যেন ফাইল হাতে এগিয়ে আসছে। হয়ত ওকে ডাকতেই। রাতুলের মুখে হাত। অনেক স্বপ্ন। কিন্তু………

এই রাতুল ওঠ। ওঠ। আর কতক্ষণ ঘুমাবি? বাসের সময় হয়ে যাচ্ছে তো। মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙে রাতুলের।হুট করে বসে পড়ে। কি হচ্ছে বুঝতে একটু সময় নেয়। মা চলে যায়। আবারো বলে “তাড়াতাড়ি কর।সময় হয়ে যাচ্ছে।”
আজ রাতুলের মিলিটারি একাডেমীতে যোগদান করার দিন। ক্রিকেট খেলে ভালই যাচ্ছিল রাতুলের দিন। পড়াশুনায় ওত মন ছিল না। হয়ত ভাল কিছুই করত। কিন্তু হঠাৎ ওর বাবা স্ট্রোক করে। খুব বেশি খারাপ কিছু না ঘটলেও ডাক্তার বলে উনি যেন কোন টেনশনে না থাকেন। আর কাজও আগের মত ওত বেশি করতে পারবেন না। আগের চেয়ে অনেক রিলাক্সড লাইফ কাটাতে হবে। পরিবারের বড় ছেলে রাতুল। বাবা ক্রিকেট খেলাটা অত ভাল চোখে দেখত না। বারবার পড়ায় মন দিতে বলত। কিন্তু রাতুল শুনত না। বাবার ইচ্ছা ছিল এইচএসসি পাশ করে রাতুল আর্মিতে যোগ দেবে।ও কখনো ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু। কিন্তু এবার আর কিছু করার নেই। বাবার স্ট্রোকটা হয় ওর ফার্স্ট ইয়ারের শেষের দিকেই। সব কিছু শুনে বুঝে রাতুলকে পড়াশুনায় সিরিয়াস হতে হয়। ক্রিকেট ছেড়ে দেয়। এইচএসসির পর আইএসএসবি দিয়ে টিকে যায়। কাল ওর জয়েনিং ডে। আজ বাসে রওনা দিবে। কিন্তু……..

গল্পটা একটু অন্যরকম হতে পারত। দূর থেকে এগিয়ে আসা আগন্তুক রাতুলের সামনে এসে দাঁড়ায়। ফাইলে কিছু একটা দেখে জিজ্ঞাসা করে “তুমি রাতুল?”
নার্ভাস ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে রাতুল।
-আমার সাথে এসো। এবার তোমার পালা।
বাধ্য ছেলের মত এগিয়ে যায় রাতুল। নেটের কাছে এসে থামে। একজন, সম্ভবত কোচ হাতে বল ছুড়ে দেয়। বলে “শুরু কর।”
একটু এ পাশ ও পাশ তাকিয়ে নেয় রাতুল।দূরে দাঁড়িয়ে আছে তার সেই ক্লাবের কোচ। চেহারা ঠিক দেখা যাচ্ছে না। তবে যেন বলতে চাচ্ছেন “রাতুল, তুমি পারবে।”
একটা নিঃশ্বাস নিয়ে রান আপ নেয় রাতুল। প্রথম বলটা ইনসুয়িং করে মিডল স্ট্যাম্প। উজ্জ্বল হয়ে ওঠে কোচের মুখ। রাতুলের চোখে বিস্ময়। পরের বলটা শর্ট লেন্থে স্ট্যাম্পের উপর দিয়ে যায়। এরকম এক্সট্রা বাউন্সে কোচের চোখে বিস্ময়। এক ওভারের প্রতিটা বলেই কোচকে তাক লাগিয়ে দেয় রাতুল। ওভার শেষে কোচ পিঠ চাপড়ে বলে ” ওয়েল ডান মাই বয়।”
কিন্তু………

-কিরে এখনও উঠিস নি??
মায়ের ডাকে আবারো ঘুম ভাঙে রাতুলের। এবার আর চোখে কোন বিস্ময় নেই।সোজা উঠে বাথরুমে চলে যায় ফ্রেশ হতে। ব্রাশ করার সময় আয়নার দিকে তাকায়। কেমন জানি লাগছে ওর নিজেকে। কেমন অজানা। কেমন অচেনা। কিন্তু………
কিন্তু গল্পটা একটু অন্যরকম হতেও পারত।।

১,৩৩৫ বার দেখা হয়েছে

৯ টি মন্তব্য : “গল্পটা একটু অন্যরকম হতে পারত”

  1. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    এবার 'অন্যরকম' ফিনিশিং দিয়ে আবার গল্পটা লেখা শুরু কর...
    আশা করি খারাপ হবে না। অন্তত একটি এক্সপেরিমেন্ট তো করা হবে....


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  2. লুৎফুল (৭৮-৮৪)

    গত ক'দিন গল্পের শিরোনামটা দেখছি । কিন্তু হেভী ট্রাফিকের দিকে ছুটে পড়বার ফুরসত পাইনি।
    এমনই একটা শিরোনামে আমার একখানা গল্প আছে। যদিও সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় নিয়ে।

    খুব ভালো লাগলো পড়ে।
    এমন লিখা পড়তে চাই ।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।