বিদায় ভোকাবুলারি মাস্টার

কেবল ক্লাশ সেভেনে কলেজে ঢুকলাম।।  ছোট ছোট চুলে প্রায় টাক মাথায় ক্লাশে বসে আছি।। দিনটা মনে নাই। তবে সেটা ছিল ফিফথ পিরিয়ড।  খাটো মতন সাদা চুলের এক স্যারের প্রবেশ ক্লাশে।  সবাই চুপ।।  ফর্ম শান করান হল।  সব স্যার বলত ” seat easy” কিন্তু ইনি বললেন কিছুটা অন্যরকম ” seat to facile ”  আমরা কোন কিছু না বুঝে আগের মতই থাকলাম। স্যার ব্যাপার টা বুঝে বোর্ডে বড় বড় করে লিখলেন FACILE.

– do you know the meaning of facile?

– no sir.

ততক্ষনে স্যার না বললেও সবাই আরামে বসে গেছে।

– facile  অর্থ সাবলীল। seat to facile মানে সাবলীল ভাবে বস।।

পুরা ক্লাশ স্যারের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিততে তাকায় আছে।  তখন প্রায় সবগুলো ক্লাশ ই ইনট্রোডাকশন ক্লাশ চলছিল। স্যার ও নিজের নাম লিখলেন

Md zahir

history department

তারপর বললেন

” যদিও আমি হিস্ট্রির টিচার কিন্তু আমার ক্লাশে তোমরা অনেক স্ট্যান্ডার্ড ইংলিশ ওয়ার্ড শিখতে পারবা। ”

কথায় কথায় জানতে পারলাম স্যারের পুরা oxford dictionary মুখস্থ।।  মনে মনে বলতেছিলাম ” এই না হলে ক্যাডেট কলেজের টিচার!!!! ”

তখন থেকেই শুরু। স্যার প্রতি ক্লাশে এসে আমাদের স্ট্যান্ডার্ড ইংলিশ শিখাতে লাগলেন। toil অর্থ পরিশ্রম, booty অর্থ লুণ্ঠন, bonafide অর্থ pure আরো কত কি!!!!  স্যারের সবচেয়ে ভাললাগার যে দিক টা ছিল সে সময় তা হল ঘুমালে স্যার কিছু বলতেন না।খুব ই নরম স্বভাবের মানুষ। স্যার কখনো বই দেখে পড়ান নি। ক্লাশে এসে ইতিহাসের গল্প শুরু করতেন যা ছিল পাঠ্য বইয়ের বাইরে।। আগ্রহ নিয়েই গল্প গুলো শুনতাম।

স্যারের ক্লাশে প্রতিদিন যে ব্যাপার টা কমন হয়ে গেছিল তা হল, স্যার বোর্ডে একটা ওয়ার্ড লিখে আমাদের জিজ্ঞাসা করতেন ” এই ওয়ার্ড টা আগে শুনছ?”

আর আমরা সমস্বরে উত্তর দিতাম ” না স্যার, জীবনেও শুনিনি।”

স্যার প্রচন্ড ভুলোমনা ছিলেন। আমাদের কারো নাম কখনো মনে রাখতেই পারেন নাই। তবে আমার দেখা দুনিয়ার গুটিকয়েক পিওর ভালমানুষের একজন। স্যার খুব চটপটেও ছিলেন।  একদিন ভুগোলের শামীম স্যার এসে বললেন ” তোমাদের জহির স্যার এত তাড়াতাড়ি খাতা দেখছে যে আমার অংশ টাও দেখে দিছে। ”  স্যারের হাতে সব সময় রুমাল থাকত। একদিন ভুলে স্যার তার রুমাল ক্লাশে রেখে গেলেন।আমরা নরমাল তেনা মনে করে সেট দিয়ে বোর্ড মুছলাম। একটু পর স্যার আবার ক্লাশে এসে বললেন “আমি আমার রুমাল টা রেখে গেছি।দেখছ?” ওই তেনা টা দেখাতেই স্যার সেটা নিয়ে মুখ মুছলেন। আমরা হাসি আটকায় রাখতে পারিনি।অনেক দুষ্টামি করছি স্যারের সাথে। চোখে ভাসে ডিউটি মাস্টার থাকার দিন স্যারের ডাল খাওয়ার দৃশ্য।

স্যার মারা গেছেন। ( ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)।

স্যার আমাদের সবাইকে মাফ করে দিবেন। যেখানেই থাকেন ভাল থাকবেন। নিজের কোন সন্তান না থাকলেও এ দুনিয়ায় অনেক গুলা সন্তান রেখে গেছেন।। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।মহান আল্লাহ আপনাকে বেহেশত নসীব করুন।

১,৮০১ বার দেখা হয়েছে

৭ টি মন্তব্য : “বিদায় ভোকাবুলারি মাস্টার”

  1. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    স্যারের প্রতি শ্রদ্ধা।

    লেখাটির জন্য ধন্যবাদ ইশরাক


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  2. মোঃ শের আলী তালুকদার

    ইন্না নিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন।
    আল্লাহ স্যারকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসীব করুক।
    আমীন।
    " নিজের কোন সন্তান না থাকলেও এ দুনিয়ায় অনেক গুলা সন্তান রেখে গেছেন। "

    জবাব দিন
  3. সাইদুল (৭৬-৮২)

    ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেঊন,
    এরকম শিক্ষকদের জন্যেই ক্যাডেট কলেজ ইশরাকদের মত মানুষ তৈরি করে


    যে কথা কখনও বাজেনা হৃদয়ে গান হয়ে কোন, সে কথা ব্যর্থ , ম্লান

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।