ম্যাজিক বয় – ০৮

ম্যাজিক বয় – ০১০২০৩০৪০৫০৬০৭

রফিক কাকা তাকে ফাঁকে একটা ইংরেজি স্পিকিং কোর্সের বই কিনে দিয়েছিলেন। নানান নাটক আর ব্যস্ততায় রতন ওটা হাতানোর সুযোগই পায়নি, প্রয়োজনও মনে হয়নি এতদিন, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বইটা একটু ওল্টালে কাজে লাগত। তাহলে লোকটির সঙ্গে সে সরাসরি কথা বলতে পারত।
লোকটির নাম পিটার ব্রাউন। নিজেকে সে পরিচয় দিচ্ছে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের দূত হিসেবে। রতন দুর্ভাগ্যবশত ফার্গুসনের নাম শুনেনি, কিন্তু এই নামটা শোনার পর থেকেই পুরো ক্লাবের সবাই এমন বিমোহিত যে তাকে খোঁজ নিয়ে জানতে হয়েছে।
সকাল বেলা হীরু এসে বলললেন, রতন তাড়াতাড়ি একটু তৈরি হয়ে এসো তো!
ক্লাবে তৈরি হওয়া বলতে বোঝায় জার্সি-বুট পরা, কিন্তু এই সাত-সকালে জার্সি-বুট পরতে হবে কেন? কালই খেলা ছিল, কাজেই আজ সকালে তৈরির প্রশ্ন তো আসে না।
কালকের ম্যাচের পর থেকেই ইফাদের পুরো আচরণ বদলে গেছে। অনেক রাত পর্যন্ত ওর ঘরে ছিল। ম্যাচের পর শফিকুর রহমান এবং ফরিদা এসেছিলেন। সে তাদের গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেছে। সকালেও দরজায় ইফাদ। বলল, রতন বিরাট খবর। বিরাট ঘটনা!
কী!
ফার্গুসনের লোক চলে এসেছে।
বলেই সে চলে গেল।
ফার্গুসন কে? তাও নিজে আসেননি। তার লোক এসেছে, তবু সেটাই বিরাট ঘটনা হয় কী করে!
সেন্টু বলল, রতন বলেছিলাম না তুই মাত্র এক সিজন!
হু। বলেছিলে তো। কিন্তু…
ম্যানচেস্টারের লোক চলে এসেছে।
আমি তো শুনলাম ফার্গুসনের লোক। ফার্গুসন আর ম্যানচেস্টার কি একই লোক নাকি!
সেন্টু হেসে দিয়ে বলে, আরে বোকা। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড হচ্ছে বিশ্বের সেরা ক্লাব। ধর আমাদের যেমন আবাহনী, তেমনি ইংল্যান্ডের হলো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড।
তাহলে ফার্গুসন।
অ্যালেক্স ফার্গুসন হলেন সেই দলের কোচ। তাকে সম্মান করে স্যার ডাকা হয়।
তিনি কি কোনো স্কুলে পড়াতেন।
পড়াতেন মনে হয়। সেন্টুও স্যার-রহস্যটা ঠিক জানে না।
সে লাফাতে লাফাতে চলে গেল। চিৎকার চেচাঁমেচি শোনা যাচ্ছে বাইরে। ক্লাবের বেয়ারা ইরফান এসে বলল, রতন ভাই জানো ইংল্যান্ড থেকে লোক এসেছে তোমাকে নিয়ে যেতে। আহারে কী কপাল তোমার!
হীরু ভাই ধমক দিচ্ছেন। এই, বাইরের লোক এখন ঢুকতে দিবি না! কার রুমে গান বাজে। সাউন্ড কমা। ওখানে দোতলায় লাফাচ্ছে কে? বন্ধ করতে বল। নীচে শব্দ হচ্ছে।
রতন নামতেই পিটার ব্রাউন নামের লোকটি একটা ধাক্কা খেলো। বিড়বিড় করে বলল, হি ইজ ভেরি স্মল। ভেরি স্মল। হাউ কাম!
তার সঙ্গে একজন আছে। সে বলল, রতন ইনি ম্যানচেস্টারের স্কাউট। ওনার সঙ্গে স্যারের কথা হয়েছে। তোমার খেলার ভিডিও ফুটেজ দেখে স্যার নিজেই তাকে পাঠিয়েছেন।
এরকম নতুন কারো সঙ্গে পরিচয় দিলে তাকে সালাম দিতে হয় বলে রতন জানে। সে বলল, স্লামুআলাইকুম।
তাকে অবাক করে দিয়ে ব্রাউন বলল, ওয়া আলাইকুম সালাম।
লোকটির পোষাক দেখে অবশ্য তাকে বিশেষ কিছু মনে হচ্ছে না। সাধারণ জিন্স প্যান্ট এবং একটা পুরনো কেডস। সেটার ফিতা আবার খোলা। লোকটি শেভ করাতে খুব আনাড়ি মনে হয়, দাড়ির চিহ্ন রয়ে গেছে এবং অতিরিক্ত সাদা চামড়া বলে সেই দুয়েকটা কালো দাড়ি খুব বিশ্রিভাবে ফুটে আছে।
রতন জানে বিদেশে গেলে তার সেরা পোষাকট্া পরে যাওয়ারই নিয়ম। তার এক চাচা বিদেশ গিয়েছিলেন, তিনি খুব গরমের মধ্যেও স্যুট-টাই পরেছিলেন। তখন থেকে সে জানে, বিদেশে গেলে সবচেয়ে ভালো কাপড় পরে যেতে হয়। পরিপাটি থাকতে হয়। কিন্তু এই লোকটি দৌড়ানোর পোষাক পরে বিদেশ চলে এল কেন?
ব্রাউন তার পাশের বাঙ্গালীটিকে কানে কানে কী যেন বলল। এখন বোঝা গেল তিনি তার কথার তরজমাকারী। লোকটি পরিষ্কার বাংলায় বলল, হীরু সাহেব। ওর গার্জিয়ান, মানে বাবা-মা কাউকে কি খবর দেয়ার দরকার আছে?
হীরু বললেন, সেরকম দরকার নেই। সে-তো আমাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। কিন্তু ওর এক কাকা আছেন। রফিক কাকা, তিনিই গার্জিয়ান। তাকে খবর দেয়া হয়েছে।
ব্রাউন তার পকেট থেকে সাদামাটা ধরনের একটা মোবাইল বের করে রিং করল। তারপর জটিল এবং দুর্বোধ্য ভাষায় কার সঙ্গে যেন কথা বলল। রতন ক্লাস এইটে পড়ে, কাজেই ইংরেজি এক-আধটু সে জানে, কিন্তু এরা যে ভাষায় সেটা ইংরেজি হলেও সেই ইংরেজি এদেশের কেউই জানে না। এক বর্ণওতো সে বুঝতে পারল না। তখনই মনে হল, কাকার দেয়া বইটা পড়লে কিছু কাজ হতো! ওখানে নিশ্চয়ই ওভাবে কথা বলার কায়দা-কানুন লেখা আছে।
লোকটি ফোন রেখে বলল, স্যারের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমরা ওকে এই সপ্তাহেই নিয়ে যেতে চাই।
এই সপ্তাহে! হীরু অবাক হয়ে বললেন আমাদের লিগ শেষ হতে যে আরও এক মাস বাকি। প্রথম পর্ব শেষ হলে পরে সুপার লিগ।
ঊ্রাউন একটু ভেবে বলে, কিন্তু উপায় নেই। আমাদের ট্রান্সফার উইনডো বন্ধ হচ্ছে এই ৩১ আগস্ট। মানে আর ৬দিন বাকি। এখন ওকে না নিয়ে গেলে রেজিস্ট্রেশন করানো সম্ভব নয়। স্যার এখনই চাইছেন।
কিন্তু আমাদের সমর্থকরা! না। সম্ভব নয়।
ব্রাউন ঠাণ্ডা মাথায় বলল, আমি খোঁজ-খবর নিয়েছি। আপনাদের কাঠামোটা পেশাদার নয়। কিন্তু আমরা তবু আপনাদের সঙ্গে কথা বলছি। এবং বড় অংকের একটা ট্রান্সফার ফিও দেবো। তাছাড়া চাইলে ম্যানচেস্টারের রিজার্ভ দল থেকে খেলোয়াড় দিতে পারি।
হীরু উসখুশ করতে থাকলেন।
ব্রাউন আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বললেন, চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমরা আপনাদের যে ট্রান্সফার ফি দেবো…। বলে যে অংকটা বললেন তাতে হীরু চেয়ার উল্টে প্রায় পড়েই যাচ্ছিলেন। চেয়ারটা দেয়ালের সঙ্গে লাগানো ছিল, তাই রক্ষা।
ব্রাউন আবার উচ্চারন করলেন, ১০ মিলিয়ন পাউন্ড।
পাশের দোভাষীটি কোনোরকম অংক না করে বলল, বাংলাদেশী টাকায় একশত আটচল্লিশ কোটি টাকা।
আর রতন পাবে প্রতি সপ্তাহে দশ হাজার পাউন্ড। মানে বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১৫ লাখ টাকা।
গপ্তাহে ১৫ লাখ টাকা মানে ৬০ লাখ টাকা! রতনের মনে পড়ে মাসখানেক আগে মায়ের কাছে একশ টাকা চেয়ে সে কানমলা খেয়েছিল।
দোভাষীটি তখনও বলে চলছে, এর বাইরে ওর জন্য একটা ডুপ্লেক্স বাড়ি দেয়া হবে ক্লাবের তরফ থেকে। সেখানে চাইলে সে বাবা-মা নিয়ে থাকতে পারবে। থাকবে বোনাস। গোল করলে বা বিশেষ পারফরম্যান্সের জন্য বাড়তি টাকা। আরও সে বলে যায়। রতন ঠিক শুনে না। তার মনে হয়, ইংল্যান্ডে তাকে এবার যেতেই হচ্ছে। দেড়শ কোটি টাকার লোভ আবাহনী কী করে সামলাবে। সমর্থকরা চেচাঁমেচি করলে এই টাকার এক ভগ্নাংশ দিয়ে তাদের সবাইকে খুশি করে দেয়া সম্ভব।

রফিক কাকাকে সঙ্গে নিয়ে রতন ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে লন্ডন নামল তিন-দিন পর। সেখান থেকে কানেকটিং ফ্লাইটে যেতে হবে ম্যানচেস্টার। রতনের একটু মন খারাপ হয়েছে, ম্যানচেস্টার ক্লাবটা লন্ডনে নয় বলে। বাংলাদেশের সব বড় ক্লাব ঢাকায়, সেখানে ম্যানচেস্টার ক্লাবটা রাজধানী লন্ডনে নয় বলে তার খুব মন খারাপ হয়েছিল। তার মানে ওটা আমাদের যশোর-বগুড়ার মতো শহর, সেখানকার ক্লাব আর কী এমন বড় হবে! অথচ সবাই বলছে সেটা নাকি বিশ্বের সেরা ক্লাব। এবার নাকি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বলে একটা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। সেটা ইউরোপের সবগুলো ক্লাবের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা। সম্ভব!
রফিক কাকা ইতিমধ্যে ম্যানচেস্টার নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করে ফেলেছেন। তিনি তাকে প্লেনে বিষয়টা বুঝিয়ে দিয়েছেন, শোন আমাদের দেশে যেমন সবকিছু ঢাকায় বিদেশে বিষয়টা মোটেও সেরকম নয়।
তাহলে কীরকম!
প্রথমে তোকে সামাজিক ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি। বাংলাদেশে মনে কর তুই বড় খেলোয়াড় হবি তোকে ঢাকায় আসতে হবে। তুই গায়ক হবি তোকে ঢাকায় আসতে হবে, কারণ সব বড় মিউজিক কোম্পানি ঢাকায়। তুই রাজনীতি করবি, তাও ঢাকায় আসতে হবে, কারণ বড় দলগুলো নিয়ন্ত্রিত হয় ঢাকা থেকে। তারপর মনে কর তুই রিকশা চালাবি, তবু ভরসা ঢাকা। বিদেশে ওরকম নয়। তাদের প্রত্যেকটা শহরেই গুরুত্বপূর্ণ সব জিনিস আছে। ইংল্যান্ডে প্রচুর লোক আছে যারা লন্ডনে কোনোদিন না এসেই তাদের যার যার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।
আচ্ছা।
আর ওদের ফুটবলটাও আমাদের মতো নয়। তুই-ই তো বললি আমাদের সব ক্লাব ঢাকার, কিন্তু ওদের একেকটা শহরের একটা ক্লাব। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড হচ্ছে ম্যানচেস্টার শহরের ক্লাব। তেমনি লন্ডন শহরের ক্লাব হলো আর্সেনাল এবং চেলসি। ম্যানচেস্টারেও আরেকটা ক্লাব আছে, নাম হলো ম্যানচেস্টার সিটি। ইতালিতে ধর মিলান শহরের ক্লাব হলো এসি মিলান এবং ইন্টার মিলান, জুভেন্টাস হচেছ তুরিন শহরের ক্লাব। আবার স্পেনে মাদ্রিদ শহরের হলো রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনার হলো এফসি বার্সেলোনা। এখন সেই ক্লাবগুলোর সঙ্গে শহরের মর্যাদা জড়িত থাকে, তাদের স্থায়ী সদস্য থাকে।
কিন্তু এই যে এত টাকা ওরা কোথায় পায়! আবাহনীকে দিয়ে দিল দেড়শ কোটি টাকা। আমাকে দেবে মাসে ৬০ লাখ। কারা এত টাকা চাঁদা দেয় ক্লাবকে।
না। চাঁদা দেয় না। ক্লাব দিয়ে ওরা ব্যবসা করে। ধর এই যে তোকে নিল, এখন তোর খেলা দেখতে অনেক লোক আসবে, তাদের টিকেটের টাকা পাবে ক্লাব।
সেটা কীভাবে? ফেডারেশন নিয়ে নেবে না!
না। ওদের সিস্টেমটা হচ্ছে লিগে প্রতি দলের সঙ্গে অন্য দলের দুই বার খেলা হয়, একেকবার একেক দলের মাঠে। যে দলের মাঠে খেলা হয় সেই দলের যাবতীয় টিকেটের টাকা সেই ক্লাব পায়। ধর তুই যাওয়াতে ওদের টিকেট বিক্রি এখন বেড়ে যাবে। সেই টাকাটা ওরা পাবে। তাছাড়া এই যে খেলাগুলো পুরো দুনিয়া জুড়ে দেখানো হবে তার টিভিস্বত্ব বিক্রির টাকাটাও ফেডারেশন ভাগ করে দেয় ক্লাবগুলোর মধ্যে। যারা ভালো করে, যাদের ম্যাচের চাহিদা বেশি তারা সে অনুযায়ী বেশি টাকা পায়।
তাই নাকি? রতন একটু অবাক হয়।
তাই নয় শুধু। দেখবি তোর নামে জার্সি তৈরি হবে। সেগুলো বিক্রি হবে। সেই টাকাও ক্লাবের। শুধুমাত্র ক্লাব এসব স্যুভেনির বিক্রি করেই কোটি-কোটি টাকা আয় করে। তারপর আছে খেলোয়াড় বিক্রি।
খেলোয়াড় বিক্রি?
ন্ড। এই যে তোকে আনার জন্য আবাহনীকে দেড়শ কোটি টাকা দিল সেটা ওদের জন্য অনেক কম টাকা। ওরা ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড মানে প্রায় হাজার কোটিও টাকা খরচ করে। এখানেও ওদের ব্যবসা আছে। ধর তোকে ১০ মিলিয়ন পাউন্ডে কিনল, তুই ভালো খেললে দেখা যাবে তোকে অন্য ক্লাব নিয়ে যাবে ১০০ মিলিয়ন পাউন্ডে। এখন ওদের লাভ হলো ৯০ মিলিয়ন পাউন্ড। এটাও একটা বড় ব্যবসা।
কিন্তু তাদের সেরা খেলোয়াড় চলে গেলে ওরা লিগে হেরে যাবে না!
সেরা খেলোয়াড়কে হয়ত বিক্রি করবে না, কিন্তু চিন্তা করে দেখবে এই খেলোয়াড়ের বয়স বেশি হয়ে গেছে, আর বেশিদিন সে ভালো খেলতে পারবে না, কাজেই সময় থাকতে তাকে বিক্রি করে তার চেয়ে অনেক কম টাকা দিয়ে একজন সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় কিনে নেয়। এই যেমন ধর রোনালদিনহোর জন্য গত বছর মিলান প্রায় ৮০ মিলিয়ন ইউরো দিতে চেয়েছিল, কিন্তু বার্সেলোনা তাদের সেরা খেলোয়াড়কে ছাড়তে চায়নি। কিন্তু এই মৌসুমটা সে ভালো না খেলায় দাম এমন পড়ে গেছে যে এবার সেই রোনালদিনহোকে মিলান নিয়েছে মাত্র ২১ মিলিয়নে। এখন বার্সেলোনা গত বছর বিক্রি করলে কতো লাভ হতো না!
পুরোটা রতনের মাথায় ঢুকে না। তবু তার মনে হয় বিষয়টা বেশ মজার। সে এতদিন শুধু দোকানে জিনিসপত্র বিক্রি হয় বলে জানত, আদা-রসুন-পেয়াজ-মাংস, এখন দেখা যাচ্ছে মানুষও বিক্রি হয়। এবং তার দাম আছে। তাকে নিয়ে ব্যবসাও আছে।
তবু একটা প্রশ্ন তার জন্য আবাহনীকে কেন এত টাকা দিল? আবাহনী তো চায়ইনি।
কাকা বললেন, ওরা কি আর অবুঝ রে! জানত অন্যান্য ক্লাবগুলোও মাঠে নেমে গেছে। দেরি করলেই দামটা বেড়ে যাবে। তাই কোনো ঝুঁকিতে না গিয়ে টাকা দিয়ে দিয়েছে। ম্যানচেস্টারের কোচ স্যার ফার্গুসন তরুণ খেলোয়াড় কেনায় এক নম্বর। তার লোক সারাদুনিয়ায় ছড়ানো আছে। কোথাও কেউ ভালো খেললেই তার কাছে খবর চলে যায়। তার পছন্দ হলেই ব্যস! এই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকেও ৫ বছর আগে তিনি যখন কেনেন তখন তাকে কেউ সেভাবে চিনতই না।
এতক্ষণে এই লোকটির গুরুত্ব রতনের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। এবং তাকে স্যার কেন বলা হয় তাও সে জেনেছে। তিনি স্কুল বা কলেজে পড়াননি কখনো, তাকে কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে নাইট উপাধি দেয়া হয়েছে। বৃটিশ রাণীর দেয়া এই বিশেষ সম্মান যিনি পান তাকে স্যার বলা হয়।
সেই স্যারকে দেখে অবশ্য রতনের মনে হল ইনি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেও পারতেন। সাদা চুল আর চোখ সবসময়ই যেন জীবন্ত। তার মুখের কথার চেয়ে চোখের কথাটাই রতনের ভালো লাগে।
তাই ক্লাবে তিনি যখন তাকে বললেন, ওয়েলকাম মাই বয় তখন রতনের ভালো লাগল না। মনে হল বন্ধ মুখ এবং সচল চোখেই তিনি বেশি মানানসই। সবসময় চুইংগাম চিবাচ্ছেন, চুইংগাম জিনিসটা রতনের ভালো লাগে না, বন্ধুদের মতো চুইংগাম ফুলাতে পারে না বলে তার জিনিসটার প্রতি একটা রাগ আছে, কিন্তু এই মানুষটিকে চুইংগামে বেজায় মানিয়ে যাচ্ছে।
ডবমানবন্দরে নেমেই রতন খেয়াল করেছে অনেক লোক এবং তাদের সবার পরনে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্র্সি। হাতে প্ল্যাকার্ড, যার বেশিরভাগের বক্তব্য ম্যাজিক বয়কে স্বাগতম। জার্সির অনেকগুলোর পেছনেই তার নাম, কেউ কেউ পিঠ উল্টিয়ে সেটা দেখিয়েছেও। রতনের খুব ইচ্ছা হল তাদের সঙ্গে কথা বলতে, কিন্তু কথা বলা নিষেধ। তাছাড়া সে-তো ইংরেজিও পারে না। এর মধ্যে বাংলায় কে যেন বলল, রতন ভাই। আমরা আছি।
ঊাংলায় কথা তো সারাজীবন শুনে এসেছে। কিন্তু বিদেশের মাটির বাংলা যেন অন্যরকম। অন্য সুর। অন্য স্বাদ।
রতন সব বাধা উপেক্ষা করে বলল, আমি আপনাদেরই লোক।
ব্যস সমাবেশে হাততালি উঠল। ইংলিশরা সেই বাঙ্গালীর কাছে জানতে চায়, রতন যা বলল তার অর্থ কী!
গাংবাদিকরা রতনের কাছে সুবিধা করতে না পেরে ওকে নিয়ে পড়ল।
রাতে সে টিভিতে দেখল সেই লোকের সাক্ষাৎকার। রতন তাকে কী বলেছে না বলেছে সেটা ব্যখ্যা করছে।
কাকা বললেন, তুই কিন্তু এই লোকের কাছেও টাকা চাইতে পারিস!
কেন?
বাহ! তোকে ভাঙ্গিয়ে সে টিভিতে চলে এল না। তার এই এক্সপোজার তো তোর জন্যই।
রতন অবাক হয়। কাকা বলেন, পেশাদার ফুটবলের এবং কর্পোরেট বাণিজ্যের অনেক কিছুই জেনে গেছি রে!
এখানে সবকিছুর জন্যই পয়সা। পয়সা ছাড়া মাতৃস্নেহও পাওয়া যায় না।
কাকার স্নেহ!
কাকা হাসেন।
রতন বলে, তোমাকেও কি আমার টাকা দিতে হবে।
কাকা বলেন, দিচ্ছিসই তো! আমি তো তোর অফিসিয়াল এজেন্ট। সেই হিসাবেই না আমি তোর সঙ্গে আসছি। খাচ্ছি। ঘুমাচ্ছি। এটা কিন্তু কাকা হিসেবে নয়। এজেন্ট হিসেবে। আমি এখন থেকে রফিক কাকা নই, এজেন্ট রফিক।
রতনের এতক্ষণ ভালোই লাগছিল। সবকিছুরই এখানে মূল্য আছে। তাই বলে সম্পর্কেরও মূল্য থাকতে হবে। এটা আবার কেমন কথা!
ভাবছিল, তখনই দরজায় টোকা। রফিক কাকার সঙ্গে কেউ একজন কথা বলতে চায়।
রফিক কাকা বেরিয়ে গেলেন এবং একটু পর ফিরে এসে বললেন, তোর সঙ্গে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আর ওয়েইন রুনি দেখা করতে চায়। সময় দেবো! নাকি বলব তুই ক্লান্ত। কাল মাঠেই দেখা হবে!

(চলবে…………)

২,১৮৮ বার দেখা হয়েছে

২৫ টি মন্তব্য : “ম্যাজিক বয় – ০৮”

  1. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    আবাহনীতে খেলছিল...কত ভাল ছিল...কি দরকার ছিল আবার ইংল্যান্ডে যাবার, আর গেলোই যখন ম্যাঞ্চেস্টারে না যেয়ে আর্সেনালে গেলেই তো হত...


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  2. আমিন (১৯৯৬-২০০২)

    আমাদের যেমন আবাহনী, তেমনি ইংল্যান্ডের হলো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড।

    মামুন ভাই এইটা কী কইলেন? আমি আবাহনীর ঘোর এন্টি আর ময়ানচেস্টারের ঘোর সাপোর্টার কোনদিকে যামু???

    জবাব দিন
  3. আহসান আকাশ (৯৬-০২)
    আমাদের যেমন আবাহনী, তেমনি ইংল্যান্ডের হলো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড।

    ইতিহাস ও ঐতিহ্যর হিসেবে বলতে গেলে মনে হয় লিভারপুল হইতে পারে, ম্যানচেস্টার এরকম হিট হইছে মনে হয় লাস্ট ২০ বছরে


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  4. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    আমি আবাহনী, ম্যান-ইউ, আর্জেন্টিনা ।
    আমার জন্যে তাই ঠিক আছে।

    বেস্ট উইশেস টু রতন। :clap: :clap:


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন
  5. রকিব (০১-০৭)
    তোর সঙ্গে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আর ওয়েইন রুনি দেখা করতে চায়। সময় দেবো! নাকি বলব তুই ক্লান্ত। কাল মাঠেই দেখা হবে!

    আমি রতন হপো। (কপিরাইটঃ মাস্ফ্যু ভাই)

    এটা থ্রিলার না, তারপরো অসম্ভব থ্রিল অনুভব করছি :thumbup: :thumbup: :hatsoff:


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।