প্রিয় সেগুন বাগান

খুব সিরিয়াসলি সত্যজিৎ রায় হতে চাইবার আগে আমি তারচেয়ে সিরিয়াসলি হতে চেয়েছি ম্যাকগাইভার কিংবা মিঠুন চক্রবর্তী। এই দুইয়ের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বন্ধুদের নিয়ে গোয়েন্দা দল বানিয়ে আমি প্রায় হয়েই গিয়েছিলাম কিশোর পাশা। গোয়েন্দা রাজু খুব বেশিদিন আমার সহচর ছিলো না। কাকাবাবু বা ফেলুদা পড়েছি, তবে হতে চাই নি কোনদিন। এখন এই আধাযুবক বয়সেও ছেলেবেলার যে হিরোর আবেদন একটুও কমেনি আমার কাছে, সেই দুর্দান্ত ছোকরার নাম ‘মাসুদ রানা’। হু, ইনি তিনিই, যে ‘টানে সবাইকে, কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না।’
এইরকম স্বার্থপর একটা বর্ণনাই বোধকরি আমাদের মাসুদ রানার প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিলো। আরো অনেক কারণও ছিলো। সদ্য কিশোর তখন আমরা, এরকম একটা সময়ে প্রতিবার বিপদে পড়া বাংলাদেশকে বাঁচাতে, অথবা কোন বন্ধুরাষ্ট্রকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে যখন কাঁচা পাকা ভুরুর মেজর জেনারেল রাহাত খান অফিসে ডেকে পাঠাতেন মাসুদ রানা-কে, আমরা সেই সময় আরো একটি চমৎকার স্পাই থ্রিলারের আশায় বসের সামনে বসা মাসুদ রানার কানের পাশে সমানে ফিসফিস করে বলে যেতাম, ‘রাজি হয়ে যা ব্যাটা, রাজি হয়ে যা।’
সোহানা চৌধুরির আদুরে ভালোবাসার লোভ ছিলো হামেশাই। সেই সাথে প্রতি পর্বে নতুন কোন স্বর্ণকেশিনীর সাথে সাক্ষাৎ হওয়াটাতো অনিবার্য। এইরকম গল্প গুলোই তখন আমাদের কাছে সোনামাখা স্বপ্ন হয়ে দেখা দিতো।

এইবার দেশে গিয়ে নিজেকে সাংসারিক সকল বাঁধনে জড়ানোর ব্যবস্থা করার ফাঁকে ফাঁকেও বেশ মনে হচ্ছিলো এই ‘কোনদিন বাঁধনে না জড়ানো’ যুবকের কথা। আমার ফেলে আসা পুরনো বইগুলোর ভীড় থেকে টেনে বের করি মাসুদ রানা সিরিজের আমার খুব পছন্দের একটি বই ‘মুক্ত বিহংগ’। এই গল্পের আর দুটি প্রধান চরিত্রও আমার ভীষন পছন্দের ছিলো, মাইকেল সেভারস আর এনি উইসপার।

ঠাকুমার ঝুলি দিয়ে হাতে খড়ি হবার পর, আমার পুরো ছেলেবেলাটাই কেটেছে সেবা প্রকাশনীর বই পড়ে।
অনেকেরই দেখি সেবা প্রকাশনীর বইগুলো নিয়ে নাক উঁচু একটা ভাব রয়েছে। খুব প্রিয় আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদও একবার এরকম কিছু বলেছিলেন, সেবা প্রকাশনীর সস্তা বইগুলো পড়ে নাকি আমাদের ছেলেমেয়েরা গোল্লায় যাচ্ছে। এটা পড়ে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। আমি নিজের ও আমার বন্ধুদের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, সেবা প্রকাশনীর ঐ সস্তা ও অগভীর থ্রিলার বইগুলোই আমাদের দেশের কিশোরদের বই-পড়ুয়া হিসেবে বড় হতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে। একেকটা স্বপ্নের রাজ্যের দরোজা খুলে দিত সেইসব অবাস্তব ফিকশানগুলোই। আমি নিজের কথা বলতে পারি, ঐ বয়সে সেবা’র বই না হলে পড়বার অভ্যাসটাই হয়তো ঠিকমতন গড়ে উঠতো না। আর সেটা না হলে বিশ্বসাহিত্যের অন্য সব বইগুলোও আমার ধরা ছোয়ার বাইরে থেকে যেত নিশ্চিত। তাই সুরুচির পতাকাধারীদের ভুরু বেঁকে গেলে যাক, আমার রুচির ফিল্টারে বিশাল বিশাল ফাঁক। তা দিয়ে পটেমকিন জাহাজ যেমন করে বেরিয়ে যায়, তেমনি যায় ক্যাসিনো রয়্যালও। আবার সে ভাবেই গোর্কী আর কাজীদা সেখানে পাশাপাশি চলেন।

রকিব হাসান নিজেই তখন আবু সাঈদ নামে লিখতেন গোয়েন্দা রাজু। জাফর চৌধুরিও কি ওনারই ছদ্মনাম ছিলো? মনে নেই সেটা, তবে রেজা-সুজার সেই রোমহর্ষক সিরিজও পড়তাম ভালই। কুয়াশা সিরিজ মোটামুটি লাগতো, আর তিন গোয়েন্দা ছিলো অসাধারণ। তারপর বয়সের দাবী অনুযায়ীই হাতে চলে এল গরমাগরম মাসুদ রানা। শেখ আব্দুল হাকিম আর খন্দকার মাজহারুল করিমের রোমান্টিক বইগুলোও লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম। কিশোর ও রহস্যপত্রিকার নিয়মিত গ্রাহক ছিলাম অনেকদিন।

ক্লাশের তাড়াহুড়া না থাকলে দুপুরের দিকে ঘুম ভাঙ্গে আমার। আজ কেমন করে জানি খানিকটা ব্যতিক্রম হলো, কাক নেই, তাই তার ডাকও শোনা যায় না এখানে, তবে আমার জন্যে সেটা কাক-ডাকা ভোরই আসলে। কি ভেবে আধ-পড়া ইলিয়াস আর মানিক বন্দ্যো-র মাঝখান থেকে টেনে নিলাম মুক্ত বিহংগটাকেই। বহুদিন পরে আবার একটা সকাল বেশ ঝলমলে হয়ে গেল। ছাপোষা জীবনে অভ্যস্ত আমার হঠাৎ করেই ইচ্ছে হলো আফ্রিকার গহীন জঙ্গলের মাঝ দিয়ে চারটে ট্যাংকের বিশাল বহরকে চালিয়ে নিয়ে যেতে।
এই কৈশোরিক আনন্দে ভরা চপল সুন্দর সকালটুকুর জন্যে তাই কৃতজ্ঞতা জানাই কাজী আনোয়ার হোসেন ও তার সেগুন বাগান প্রকাশনীকে। অনেক ধন্যবাদ আপনাদের কাজীদা, এক স্বপ্নবাজ কিশোরের ছেলেবেলাকে বাঁধনে জড়িয়ে নেবার জন্যে।

২,৬৪১ বার দেখা হয়েছে

৩৩ টি মন্তব্য : “প্রিয় সেগুন বাগান”

  1. তারেক (৯৪ - ০০)

    পুরোনো পোস্ট আর এখানে দিবো না বলেই ভেবেছিলাম। কিন্তু শওকত ভাইয়ের বই নিয়ে লেখাটা পড়ে মনে হলো, আমার কথাগুলোও এখানে তুলে দিই। পুরোনো লেখার জন্যে দুঃখ প্রকাশ করছি, কিন্তু চিরনতুন অনুভূতি, এটারে ফেলতে মন চায় না।


    www.tareqnurulhasan.com
    www.boidweep.com

    জবাব দিন
  2. আমার রুচির ফিল্টারে বিশাল বিশাল ফাঁক। তা দিয়ে পটেমকিন জাহাজ যেমন করে বেরিয়ে যায়, তেমনি যায় ক্যাসিনো রয়্যালও। আবার সে ভাবেই গোর্কী আর কাজীদা সেখানে পাশাপাশি চলেন।

    :thumbup:

    জবাব দিন
  3. রবিন (৯৪-০০/ককক)
    আমার ফেলে আসা পুরনো বইগুলোর ভীড় থেকে টেনে বের করি মাসুদ রানা সিরিজের আমার খুব পছন্দের একটি বই ‘মুক্ত বিহংগ’। এই গল্পের আর দুটি প্রধান চরিত্রও আমার ভীষন পছন্দের ছিলো, মাইকেল সেভারস আর এনি উইসপার।

    কালকে রাতেও এই বইটা রিভিশন দিলাম

    জবাব দিন
  4. শওকত (৭৯-৮৫)

    আমার বই পড়ার অভ্যাস আরো পাকা পোক্ত করেছে সেবা প্রকাশনী। কেবল মাসুদ রানাই নয়, মনে আছে অল দ্য কোয়ায়েট অন দি ওয়েস্টার্ণ ফ্রন্ট পড়ে কেঁদেছিলাম। উর্মি রহমান অনুবাদ করতেন আগাথা ক্রিস্টির বইগুলা। শুরুতেও ওয়েস্টার্ণে মজেছিলাম। কাজী দা কিছু ছোট গল্পের অনুবাদ করেছিলেন, পঞ্চ রোমাঞ্চ, ছায়া অরণ্য ইত্যাদি। আমার সংগ্রহে এখনো আছে।

    আমি চাই আমার ছেলে মেয়েরাও মাসুদ রানা পড়ুক।

    জবাব দিন
  5. রাশেদ (৯৯-০৫)

    কেন যে মানুষজন মাসুদ রানারে নিয়ে এত নাক সিটকায় বুঝি না 🙁 সিরিয়াস লেখার সাথে থ্রিলার টাইপ হালকা লেখারো দরকার আছে 🙂
    আর মাসুদ রানা না থাকলে কেম্নে কি 😮
    কিলাস সেভেনে থাকতে আমারে একজন মাসুদ রানাকে কোট কইরা শিখাইছিল কেম্নে নারী জাতি কে পটাইতে হয় =(( আজো সেই থিওরী ভুলি নাই 😀


    মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

    জবাব দিন
  6. তিন গোয়েন্দা বেশি পড়তাম, মাসুদ্রানার্চেয়ে।
    শেখাব্দুলহাকিম যেদিন্থেকে তিনগোয়েন্দা লিখতেছে, সেদিন্থেকে বাদ।

    এখনো মাঝে মাঝে বাসায় গিয়া পুরান বইগুলা রিভাইস দেই।
    রকিভাসান এখন আবার কিশোর্ক্লাব নামে আরেক্টা লিখতেছে। পৈরা দেখুম।

    জবাব দিন
  7. সামিয়া (৯৯-০৫)

    আমরা ফ্যামিলির সবাই আবার অতিরিক্ত ভদ্র মার্কা, একটা মাসুদ রানা শুরু করে আর শেষ করতে পারিনাই 😕 :no: । এইবার বইমেলায় ছোট ভাই আবদার করলো, মাসুদ রানা কিনবেই কিনবে, দিছি একটা ঝাড়ি।
    আমার বড় হয়ে ওঠাই জাফর ইকবালের হাত ধরে, সঙ্গী ছিল সেবা। সেবার প্রতি খুব রাগ আমার x-( , বিলেতি ভাষার বইগুলো এত সুন্দর করে অনুবাদ দিত, সেইগুলা পড়তে পড়তে আমার আর বিলেতি ভাষা শিক্ষা হলো না 🙁

    জবাব দিন
  8. শার্লী (১৯৯৯-২০০৫)

    আমার বই পড়ার সুচনাটা রুপকথার গল্প দিয়ে। সুয়োরানী দুয়োরানীর গল্প, চাঁদের বুড়ী, কাজলরেখা ইয়াত্যাদি বিবিধ গল্পের মাধ্যমে আমার বই পড়ার হাতে খড়ি। পরবর্তিতে তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা, ওয়েস্টার্ন, কুয়াশা, তিন বন্ধু ইত্যাদি পড়া হয়েছিল। ভীষন অরন্য পড়ার মাধ্যমেই আমার আমাজন সম্পর্কে প্রথম ধারনা হয়। তাই এসব বইকে রদ্দি বা সস্তা বই বললে কষ্ট পাই।
    পরবর্তিতে হুমায়ুন আহমেদ, জাফর ইকবাল গিললাম গোগ্রাসে। পশ্চিম বাংলার লেখার সাথে পরিওয় হল ক্লাস ৮ এ। প্রথম পড়া কলকাতার বই সমরেশের উত্তরাধিকার। সেই শুরু হল আর শেষ হয় নি সমরেশ, সুনীল, শীর্ষেন্দু, নিমাই ইত্যাদি পড়া। মাঝে কয়েকদিন খুব মুজতবা আলী রচনাসমগ্র পড়লাম।
    এখন ইংরেজি বই পড়ছি বেশি। ড্যান ব্রাউন, সিডনি শেলডন, জন গ্রিশাম, মারিও পুজো এদের বই বেশি পড়া হয়। সত্যিকার ইংরেজি সাহিত্যে আজও প্রবেশ করি নাই কারন ইচ্ছা হয় নাই।

    জবাব দিন
  9. আদনান (১৯৯৪-২০০০)

    মাসুদ রানা পড়তে মন চায় । দোস্ত নস্টালজিক করে দিলি । পুরোন লেখা হলেও আমার কাছে নতুন । বরাবরের মত তোর লেখা ভাল লাগসে । সেবার আ্যালান কোয়ার্টারমেইন সিরিজ টা মনে আছে? আমি বেশিরভাগ সেবার বই পড়সি শরীফ (কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ) এর কাছ থেকে নিয়ে । থ্যাংকু দোস্ত ।

    জবাব দিন
  10. কামরুলতপু (৯৬-০২)

    তারেক ভাই আপনি কি সুন্দর করে লেখেন। একেবারে মনের কথা বললেন। বহুদিন রানার বই পড়ি না। একখানা নতুন রানার বই পড়ে দেখতে ইচ্ছা করছে এখন কেমন লাগে। রিসেন্ট বই পড়লাম কাছের মানুষ। খুব ভাল লেগেছে কিন্তু দেশে থাকতে নাটকের কিছু দৃশ্য দেখে ফেলেছিলাম তারপর বইটা পড়ার সময় সব কিছুতেই দৃশ্যকল্প তৈরি হয়ে যাচ্ছিল, দেখি সুবর্ণা , আলমগীর, হুমায়ুন ফরিদী হাত পা নেড়ে কথা বলছে। এই জন্য বিরক্ত লাগছিল। নাটকের আগে বই পড়লে বেশি ভাল লাগত।

    জবাব দিন
  11. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)
    খুব প্রিয় আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদও একবার এরকম কিছু বলেছিলেন, সেবা প্রকাশনীর সস্তা বইগুলো পড়ে নাকি আমাদের ছেলেমেয়েরা গোল্লায় যাচ্ছে।

    হুম, বস্ সেবার লেখাগুলোকে যেনতেন সাহিত্য বলতেও নারাজ ছিলেন। এবং এখনো আছেন 🙁 এবং উনার এইকথাগুলোকে বিনয়ের সাথেই বিরুদ্ধমত ভাবি।


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  12. সামীউর (৯৭-০৩)

    আসলে সেবার 'রানা' হাতে উঠেছে অনেক পরে, কারণ ওটা নাকি বড়দের জন্য আর তখনো ততটা বড় হয়নি।তবে স্বপ্ন দেখিয়েছিলো 'সেবা'র রবার্ট মাইকেল ব্যালেন্টাইনেরএর অনুবাদ 'প্রবাল দ্বীপ' । মনে হয় ক্লাস সিক্সে/সেভেন কোন এক বই মেলায় কেনা। স্বপ্নের প্রবাল দ্বীপ, জাহাজ, জলদস্যু, নিজেদ্র দ্বীপ সব মিলিয়ে অন্য জগতের! আর সেবার রেমার্ক, হেমিংওয়ে ডিকেন্সের অনুবাদ গুলো এখনো সেরা। আসলেই মনের জানাল খুলে দেবার মতো বই ওগুলো।

    জবাব দিন
  13. দিহান আহসান

    ভাইয়া কেমন আছেন???? দেশে যাচ্ছেন শুনলাম? 🙁

    আমার বই পড়া শুরু হয়েছে ঠাকুরমার ঝুলি দিয়ে, পরে তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা ...।
    আমার বাসায় তো মাসুদ রানা পড়া নিষিদ্ধ ছিলো। কিন্তু আমি পরে আমার ছোট ভাই লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম। ঐযে কথায় বলেনা নিষিদ্ধ জিনিসে নাকি আকর্ষণ বেশী। ;))
    এখন খুব মিস করি, আপনিতো ভাইয়া একদম নষ্টালজিক করে দিলেন। :((

    জবাব দিন
  14. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    সাইদ স্যারের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি বিশঅ সাহিত্য কেনদ্রের অনুবাদ সেবার কাছে কিছুই না, যদিও আমারকাছে অবসরের অয়েস্ত্রআন বেশি ভাল লাগত


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।