মানুষ মানুষের জন্য

সিরাজগঞ্জের শাহাজাদপুরের নাম কে কে শুনেছেন? নিশ্চয়ই অনেকেই জেনে থাকবেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাচারি বাড়ির কল্যানে। জীবনে একবার মাত্র গিয়েছি শাহাজাদপুরে। কাচারি বাড়ির ছবি এখনো চোখে লেগে আছে, কবিগুরুর ব্যবহার করা আসবাব, তাঁর হাতে লেখা চিঠি, কবিতা, আরাম কেদারা, পালকি এসব রয়েছে। কাচারি বাড়ির সাথে লাগোয়া শাহজাদপুর বাজার। সেখানে বাহারি সব লুঙ্গি আর গামছা। হয়তো হাঁট বার ছিল সেদিন, অনেক মানুষ গিজগিজ করছিল। আর কাছেই মিল্কভিটার ফ্যাক্টরি দেখতে গিয়েছিলাম। বছর পনেরো আগেকার স্মৃতি।

এই লেখাটা শাহজাদপুর নিয়ে না, তবে শাহজাদপুরের মোঃ আরিফুর রহমান এবং তাঁর মাকে নিয়ে। আপনারা হয়তো কেউ কেউ তাকে চেনেন কার্টুনিষ্ট আরিফ নামে। মাঝারি গড়নের সদা হাস্য একজন তরুন। বছর কয়েক আগেও আরিফ ছিল শুধুই মফস্বলের একজন উদ্যমী এবং স্বপ্নদেখা আঁকিয়ে। কার্টুন আঁকার চেষ্টা করতো। নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকায় কার্টুন এঁকে সেগুলো শাহজাদপুর থেকে ডাকে করে পাঠাতো। সেখানকার এক কলেজের ছাত্র ছিল সে। সত্যিকথা বলতে, তখনো সে ছিল বাংলাদেশের আর দশটা মফস্বলের সাদামাঠা তরুনের মতোই। এমন তো কত তরুনই থাকে যারা জীবনের চোরাবালিতে শিল্পসত্ত্বা হারিয়ে ফেলে।

আরিফের সাথে আমার প্রথম দেখা হয় ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ চ্যাপ্টার একটি কার্টুন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। আরিফ সেই প্রতিযোগিতায় কার্টুন এঁকে পাঠায়। সেই প্রতিযোগিতায় আরিফ তৃতীয় হয় চারুকলার ছাত্র এবং তরুন অনেক প্রতিষ্ঠিত কার্টুনিষ্টদের পিছনে ফেলে। পাশাপাশি তার বেশ কয়েকটি কার্টুন বিশেষ মনোনয়ন পায়। সেটাই ছিল আরিফের প্রথম বড় প্রাপ্তি কার্টুন এঁকে। সেই সূত্রে আরিফের সাথে পরিচয়। আরিফকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ঢাকায় এসে কোথায় উঠেছো, সরল স্বীকারোক্তি সিরাজগঞ্জের টানে – বোচ্ছেন ভায়া, ঢাকায় তো আমার নিকট আত্মীয় কেউ নেই, এক মামা থাকে উত্তরায়, ওনার ওখানে উইঠল্যাম। আমি আর এবিষয়ে কথা বাড়াইনি। অন্য বিষয়ে কথা বলেছিলাম। সেই প্রতিযোগিতার স্বীকৃতি আরিফকে অনেক উৎসাহ জুগিয়েছিল। কারণ প্রতিযোগিতার বিচারক ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার, রফিকুন নবী (রনবী), আহসান হাবিব, শিশির ভট্টাচার্য্য, শাহরিয়ার খান, সবাই দেশ বরেন্য। আরিফের সাথে আরো কয়েকদফা যোগাযোগ এবং দেখা হয়েছিল, কিছুটা আরিফ নিজে থেকে এসেছিল, কিছুটা হয়েছিল কাজের প্রয়োজনে।

আরিফের দুর্নীতিবিরোধী কার্টুন প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান প্রাপ্ত কার্টুন

আরিফের কার্টুনের কনসেপ্টগুলো ছিল দুর্দান্ত। এর বেশি এই আরিফকে নিয়ে আমার কোনদিন আহামরি কিছু মনে হয়নি। সেই আরিফের ভিতর যে এত শক্তি লুকিয়ে ছিল আমি কোনদিন ভাবতেই পারিনি। কোনদিন ঘুনাক্ষরেও কল্পনা করিনি, আরিফ বাংলাদেশের উদার সংবাদপত্র (!) এবং তথাকথিত নিরপেক্ষ সরকারের চেহারা উন্মোচন করে দিতে পারবে এক ঝটকায়। ঘটনাটি খানিকটা ঝড়ে বক ছিল হয়তো, কিন্তু তবুও সেটা সাংঘাতিক। আলপিনের প্রদায়ক হিসেবে আরিফের একটি কার্টুন ছাঁপা হয়। ঘটনা খুবই সাধারন, এমন ভুরি ভুরি কার্টুন এখানে সেখানে আমরা দেখি। সেটিকে কাটমোল্লারা রঙচঙ মাখিয়ে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায় যে প্রথমআলোর বারোটা প্রায় বেজে যায়, সাথে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গদি নড়ে যাবার অবস্থা। তড়িঘড়ি করে, প্রথমআলো এবং সরকার মোল্লাদের সাথে একটা রফা করে ফেলে, বিনিময়ে বলীর পাঠা হয় কার্টুনিষ্ট আরিফ। বাদবাকিটা যারা নিয়মিত সংবাদপত্রে চোখ রাখেন তারা নিশ্চিত জানেন।

শুধু এটুকুই বলি, আরিফ এখনো মাথায় যশোরের আদালতে দেশদ্রোহীতার মামলা নিয়ে ঘুরছে, মামলাটা করা জামাত সমর্থিত লোকজনের। মামলার রায়ে দুইমাসের সশ্রম কারাদন্ড এবং পাঁচশো টাকা জরিমানা দেওয়া হয়েছে আরিফকে পলাতক আসামি দেখিয়ে যখন সে ঢাকায় গ্রেফতার হয়ে ছিল। যশোরের মূল মামলায় প্রথমআলো এবং দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকের নাম ছিল, কিন্তু মামলা গ্রহন করার সময় তাদের নামগুলো বাদ পড়ে যায়। আরিফ অনেকদিন এই মামলার কথা জানতোই না। এখন আদালতে পূর্নবিবেচনার আর্জি জানিয়েছে। গড়িমসি চলছে সেখানে। হায় সেলুকাস! কী বিচিত্র এই দেশ! ঢাকার মামলায় ছয়মাস কারাবাসের সময় আরিফের পরিবার এবং ব্যারিষ্টার সারা হোসেন ছাড়া কেউই তার সাথে দেখা করেনি আক্ষরিক অর্থে। আমরা বিরাট বিব্রত এক জাতি, সবাই একের পর বিব্রত হই, শেষপর্যন্ত একজন নারী বিচারক বিব্রত না হয়ে আরিফকে মুক্তি দিলেন ঢাকার করা রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা থেকে। কেমন চিড়েচ্যাপ্টা জীবন সেসময়ে পার করতে হয়েছে সে কথা আজ না হয় থাক। আর মৌলবাদীদের ভালবাসার লিস্টে যে তার নাম সযত্নে রক্ষিত আছে সে ব্যাপারে আর সন্দেহ কী!

আমি আরিফকে চিনতাম। কিন্তু ওর দুঃসময়ে বন্ধুবান্ধবদের কাছে “আরিফের সাথে কাজটা খুবই অন্যায় হয়েছে” বলা এবং ফেইসবুকে “সেভ কার্টুনিষ্ট আরিফ” জাতীয় গ্রুপের সদস্য হওয়া ছাড়া কিছুই করিনি। সেল ফোনে একদিন দেখি আরিফ কার্টুনিষ্ট নামে একটা নম্বর সেভ করা আছে, ফোন দিয়েছিলাম। ফোন বন্ধ ছিল। খোলা থাকবে কিভাবে আরিফ তো তখন কারাগারে। আমার এক টিমলিডারকে একদিন বলেছিলাম আমরা কিছু করতে পারি কিনা, তিনি জানালেন যে এটা আমাদের এখতিয়ারে পড়ে না, ঘটনা ঘটেছে প্রথম আলোর সাথে তারাই এটা ডিল করুক। আমি আরেকটু অনুরোধ করলে তিনি বললেন, শোনেন এখন কেয়ারটেকার সরকার দেশে এবং বিষয়টাও সেনসেটিভ। এটা নিয়ে বেশি পাবলিক করলে ছেলেটার তাতে আরো বেশি ক্ষতি হবে। পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে প্রথমআলোই ওকে বের করে আনার ব্যবস্থা করবে। আমি আত্মপর মানুষ, ঝুট ঝামেলার চেয়ে এটাই বেশি যুক্তিযুক্ত মনে হলো। চুপ করে গেলাম। গ্লানিবোধ যে একেবারে হয়নি, তা নয়। একসময় বুঝলাম, ওসব বোধটোধ ভোঁতা হয়ে গিয়েছে। পরে আরিফ আমাকে খুঁজেছিল, কিন্তু ততোদিনে আমি ঢাকা থেকে অনেক দূরে।

আজ হটাৎ করে জানতে পারলাম খবরটা, আরিফের মা ভীষন অসুস্থ। কার্টুনিষ্ট কিশোর আহমেদের সহায়তায় কথা হলো। প্রায় তিন-চার বছর পর। আরিফ আর সেই আরিফ নেই, এখন সত্যিকার পোড়খাওয়া কার্টুনিষ্ট আরিফ। কিন্তু তাতে তার দুঃখ. দুর্দশা এবং অসহায়ত্ব কিছু কমেনি বরং বেড়েছে। অনেক পরিচিতি বেড়েছে এটা ঠিক, কিন্তু বঞ্চনা কিছু কম কুড়াতে হয়নি। তবে আরিফ এখন কার্টুনের প্রতি দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। যে কার্টুনের জন্য জীবনে এতো দুর্ভোগ তাকে ছাড়ার প্রশ্নই আসে না।

চিকিৎসাধীন আরিফের মা আয়েশা খানমমা আয়েশা খানমের কিডনি অকেজো হয়ে গিয়েছে, সেই চিকিৎসার জন্য এখন আরিফের সাহায্য প্রয়োজন। ডাইলাসিস চলছে, কিডনি প্রতিস্থাপন প্রয়োজন। সেই অর্থের পরিমানটা গগনচুম্বী  হয়তো নয়। কিন্তু আরিফের মতো তরুন কার্টুনিস্টের জন্য সংগ্রহ করা রীতিমতো অসাধ্য। কেউ কি আছেন সীমিত সাধ্যের ভেতর থেকেই আরিফের মায়ের জন্য এগিয়ে আসবেন প্লিজ? একজন মফস্বলের তরুন পোড়খাওয়া কার্টুনিষ্টের জন্য কী এটুকু সাহায্যে আমরা এগিয়ে আসতে পারিনা? নিশ্চয়ই পারি। নিশ্চিতভাবে সবারই সেই সদিচ্ছাটুকু রয়েছে। খুব বেশি কিছু করার প্রয়োজন নেই। শুধু একটি কার্টুন কিনেই আপনিও পারেন আরিফের জন্য আপনার সহযোগিতার হাতটি বাড়িয়ে দিতে। পহেলা অক্টোবর বিকাল চারটার দিকে চলে যান, ছবির হাঁটে, আর্ট কলেজের (চারুকলা ইন্সটিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) বিপরীত পাশে। সেখানেই আরিফের মায়ের চিকিৎসা সাহায্যার্থে কার্টুন বিক্রি হবে। আসুন না কার্টুন সেলে অংশ নিয়ে সবাই একটু এগিয়ে দেই সহমর্মীতার স্পর্শ …

সাহায্য পাঠাবার ঠিকানা:

Arifur Rahman
Dutch Bangla Bank
Shazadpur Branch
Savings Account No-157-101-8319

১১ টি মন্তব্য : “মানুষ মানুষের জন্য”

  1. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    নিতান্ত হাস্যকর কারণে আরিফের মতো বাচ্চা একটা ছেলেকে নিয়ে আমাদের মোল্লারা, সরকার আর মেরুদণ্ডহীন সম্পাদক যে খেল দেখালেন তা তুলনারহিত। ইনি নাকি আবার আলো দেখাচ্ছেন বা আলো দেখা শেখাচ্ছেন দেশকে। নানান পুরস্কারও জোটাচ্ছেন দিগ্বিদিক থেকে।আরিফের জন্য কিছু করেছেন বা করতে চেয়েছিলেন কি না জানতে পারলে ভালো লাগতো। সেইসময় খেদের বশবর্তী হয়ে তেনাকে একটা ইমেইল করেছিলাম। আজতক উত্তর পাইনি।তা না পেলে ক্ষেতি নাই। আমরা চুনোপুঁটি মানুষ!

    জবাব দিন
  2. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    রাব্বী, কাজের চাপে বেশ কিছুদিন ধরে লগ-ইন করা হয়না। কিন্তু তোমার পোস্টে আরিফ এবং প্রথম আলো নিয়ে কিছু কথা থাকায় এবং নূপুরের মন্তব্য পড়ে মনে হয়েছে, এ বিষয়টা নিয়ে গত আড়াই-তিন বছর জল কম ঘোলা হয়নি। আরিফ ইস্যুতে মতিউর রহমান ও প্রথম আলোকে ভিলেন বানানো অনেকের কাছেই বেশ আনন্দদায়ক বিষয়। আমি বলছি না এখানে তা করা হয়েছে। তবুও আমি যা জানি, তা অন্যদের জানানো দায়িত্ব মনে করি। কিছু তথ্য জেনেও সেটা নিয়ে যখন বিতর্ক চলে তখন তা চেপে রাখতে পারি না। আমার তথ্য বিশ্বাস করা না করা যার যার ব্যক্তিগত বিষয়।

    নতুন করে লিখলাম না। আরিফের মুক্তির পর সামুতে একজন ব্লগার একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। সেখানে ও পাঠকদের মন্তব্যে মতিউর রহমান ও প্রথম আলোকে যাচ্ছেতাই ভাষায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। এক পর্যায়ে আমি তার কিছু জবাব দিয়েছিলাম। মূল ব্লগার নিজেও তার জবাব দিয়েছিলেন। সেটাই এখানে তুলে দিচ্ছি।

    আমি জানি এই পোস্টের মূল ইস্যু মতিউর রহমান বা প্রথম আলো নয়। আরিফের মায়ের চিকিৎসায় সহায়তা করা। রাব্বীর পোস্টের সঙ্গে সহমত পোষণ করে সবার প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি, আসুন আমরা একজন মায়ের পাশে দাঁড়াই। তার বাঁচার লড়াইটাকে সহজ করে দিই। আরিফের মায়ের জন্য শুভকামণা।

    সামুতে উল্লিখিত পোস্টে আমার মন্তব্য : পোস্ট ও এর সঙ্গে ব্লগারদের মন্তব্য পড়ে আমার মনে কিছু প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে। সে সব প্রশ্নের উত্তরও খোঁজার চেস্টা করেছি।

    আরিফের কার্টুন আঁকা, সেটা প্রথম আলোতে প্রকাশ এবং এর পরের ঘটনা প্রবাহ কিছু শূন্যস্থান পাওয়া যায়।

    আরিফ নিজে বলেননি বা তাকে কেউ প্রশ্ন করেননি যে, প্রেপ্তারের পর প্রথম আলো বা এর সম্পাদক তার জন্য কি কিছু করেছেন। আমি এর মধ্যে অন্য কোনো উদ্দেশ্য খুঁজতে যাচ্ছিনা। প্রথম আলোর একজন শুভানুধ্যায়ী হিসাবে আমি এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে পেরেছি এবং সেটাই ব্লগে সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করতে চাইছি।

    প্রেপ্তারের পর আরিফকে নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করতে সম্পাদকসহ প্রথম আলোর কয়েকজন সাংবাদিক সরকার, গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের উপরমহলে বারবার কথা বলেছেন।

    প্রথম আলোর দুজন আইনজীবী সাংবাদিকসহ আরো কয়েকজনকে আরিফের মামলার ব্যাপারে নিয়োগ করেছিল প্রথম আলো। কারাগারে আরিফের জন্য খাবার, কাপড়চোপর পাঠিয়েছেন প্রথম আলো সম্পাদক।

    আরিফের নিয়মিত দেখাশোনার জন্য তার চাচাতো ভাই জুয়েলকে দফায় দফায় টাকা দিয়েছে প্রথম আলো।

    কারাগারে আরিফের ওপর জঙ্গিদের (আরিফের কথায় জেএমবি, আর প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী মুফতি হান্নান ও তার দল হুজি) হামলার খবর পেয়ে কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার সেল বদলানোর কাজটিও করেছে প্রথম আলোর সাংবাদিকরা।

    আর সর্বশেষ আরিফের মুক্তির জন্য সরকারে বিভিন্নমহলে ধর্নাও দিয়েছেন মতিউর রহমান। প্রধান উপদেষ্টার কাছ থেকে এই ফাইলে সই করানোর কাজটিও প্রথম আলোর সম্পাদকের করা।

    প্রথম আলো ও এর সম্পাদকের শত্রু কম নয়। এটা অনেকেই জানেন। পত্রিকাটির ঈর্ষনীয় উত্থান এবং সম্পাদক হিসাবে মতিউর রহমানের প্রতিষ্ঠা অনেকেরই চক্ষুশূল। তবুও বলবো- ঠান্ডা মাথায় ভাবুন কিছু বিষয়।

    ১. প্রথম আলোকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানাচ্ছিল মৌলবাদীরা। তত্তাবধায়ক সরকারের একাধিক প্রভাবশালী মহল এই সুযোগে প্রথম আলো ও মতিউর রহমানকে দেখে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। পত্রিকাটি বাঁচাতে ইসলামিক ফাউন্ডেশন অফিসে গিয়ে জামায়াত সমর্থক খতিব উবায়দুল হকের সঙ্গে মতিউর রহমানের আপসরফা কি ঘৃণ্য কাজ হয়েছে? সেটা না করে প্রথম আলোর ক্ষতি হলে ৫-৬শ সাংবাদিক-কর্মীর রুজি বন্ধ হলে, লাখ লাখ পাঠক প্রথম আলো পত্রিকাটি পড়তে না পেলে কি সত্যিই বিপ্লবী কাজ হতো?

    ২. মতিউর রহমান খতিবের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। এমন একটা দাবি মোল্লা আর প্রথম আলোর সমালোচকরা (নাকি নিন্দুক) করে থাকেন। আমি নিশ্চিতভাবেই জানি, তিনি ক্ষমা চাননি। দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এ নিয়ে মতিউর রহমানের নিন্দুকরা অনেক কথা বলতে পারেন, কিন্তু ওইরকম পরিস্থিতিতে যখন প্রথম আলোর পাশে তার নিরব সমর্থক পাঠকরা ছাড়া আর কেউ নেই তখন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মতো জায়গায় গিয়ে খতিবের সঙ্গে সমঝোতা করতেও সাহস লাগে।

    সামু ব্লগারের জবাব : শুভানুধ্যায়ী বলেই অনেক ভেতরের খবর দিতে পারলেন, সেজন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। তবে একটা ব্যাপার আমিও মেলাতে পারছি না। ঘটনাপ্রবাহে মনে হচ্ছে প্রথম আলো মনে করেছে যাও বাবা আমার জন্য জেল খেটেছো, ছাড়িয়ে এনেছি, শোধবোধ হয়ে গেলো। অন্তত চুপিচুপিও যদি প্রথম আলো আরিফকে ডাকিয়ে একটা স্বান্তনা দিতো আমার ধারণা আরিফের কৃতজ্ঞতাটুকু আরো বেশী পেতো। যাহোক ক্ল্যারিফিকেশনের জন্য ধন্যবাদ, আশা করি প্রথম আলোকে আর কেউ ভিলেন ভাববে না।

    প্রথম আলোর শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আমাকে আরেকটা খবর এনে দিতে পারবেন। আরিফ আলপিনে তো প্রদায়ক হিসেবে কার্টুন আকতো। ওকে একটি কার্টুনের জন্যও বিল বাবদ একটি টাকাও দেয়া হয়েছে কিনা? প্লিজ, এই কষ্টটুকু করবেন আমার জন্য।

    আমার বক্তব্য : ধন্যবাদ জবাবেব জন্য। জবাব দিতে গিয়ে আপনি যেসব বিষয় উত্থাপন করেছেন তার কি কিছু উত্তর দেব?

    আপনি বলেছেন, "তবে একটা ব্যাপার আমিও মেলাতে পারছি না। ঘটনাপ্রবাহে মনে হচ্ছে প্রথম আলো মনে করেছে যাও বাবা আমার জন্য জেল খেটেছো, ছাড়িয়ে এনেছি, শোধবোধ হয়ে গেলো। অন্তত চুপিচুপিও যদি প্রথম আলো আরিফকে ডাকিয়ে একটা স্বান্তনা দিতো আমার ধারণা আরিফের কৃতজ্ঞতাটুকু আরো বেশী পেতো।"

    ---প্রথম আলোতে (ব্লগার নিজে) একটা বড় সময় চাকরি করে প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে আপনার ধারণা দেখে বিষ্মিত হচ্ছি। আমি বেশ কিছু নাম বলতে পারি তারা সাক্ষ্য দেবে, প্রথম আলো কারো জন্য করলে হৃদয় দিয়েই করে। প্রথম আলোর আইনজীবী কারাগার থেকে বের করার পর আরিফকে তার ভাইসহ বাসায় পাঠিয়ে দেয়। তারপর এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার আরিফের ভাইকে ফোন করেছে প্রথম আলোর একাধিক সাংবাদিক, আরিফের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য। কিন্তু তার ভাই কোনো কিছু জবাব দেয়নি বা কিছু জানায়নি।

    আপনি বলেছেন, "আরিফ আলপিনে তো প্রদায়ক হিসেবে কার্টুন আকতো। ওকে একটি কার্টুনের জন্যও বিল বাবদ একটি টাকাও দেয়া হয়েছে কিনা?"

    ---একেই বোধহয় বলে কোমরের নিচে আঘাত করা! আপনি নিজে প্রথম আলোতে কাজ করেছেন, আপনার বেতন-ভাতার কোনো টাকা কি প্রথম আলো বাকি রেখেছে? প্রথম আলোতে চাকরি করার সময় অন্য ফিচার পাতায় লেখার বিল কি বাকি আছে? যদি থেকে থাকে তার দায়িত্বটা কার ছিল? বিভাগীয় সম্পাদকের নাকি সম্পাদকের? প্রদায়কের বিল মেরে দেওয়ার রেকর্ড বিভিন্ন সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার থাকলেও প্রথম আলো সম্ভবত এক্ষেত্রে সবচেয়ে স্বচ্ছ। আরিফের বিল বাকি থাকলে তা প্রথম আলো সম্পাদকের নজরে আনা হলে আমি নিশ্চিত তা পুরোপুরি পরিশোধ করা হবে।

    আর একটি বিষয়, পিয়াল আপনি নিজে তো আনিসুল হক এবং সুমনা শারমিনকে চেনেন, আপনি যদি নিশ্চিত জানেন আরিফের বিল বাকি আছে তাহলে তাদেরকে একটা ফোন করে দিন না। সেটাই আরিফের প্রকৃত বন্ধু ও সুহৃদের কাজ হবে বলে আমার মনে হয়।

    ব্লগারের জবাব : ভালোই বলছেন, কোমরের নীচে আঘাত করা। উহু ভাই, এই লেখার প্রতিপক্ষ প্রথম আলো না, উগ্র জঙ্গীরা। তারপরও কিছু পাঠকের প্রতিক্রিয়ায় আপনার ব্যাখ্যা হয়তো ভুল বোঝাবুঝি দূর করবে। এর বেশী কিছু বলে তর্কটা অন্য খাতে নিতে উৎসাহ পাচ্ছি না।

    পোস্টে অন্য একজন ব্লগারের মন্তব্য : ১। রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা হওয়ার পরেও নির্বাচন কমিশন আরিফকে কাজ দিল। কারণ কি? প্রথম আলো এ ব্যাপারে সহায়তা করেছে বলেই জানি।
    ২। আইনজীবি নিয়োগ, অর্থ সহায়তা, জেলে কাপড় পৌছে দেওয়া এবং সর্বশেষ প্রধান উপদেষ্টার কাছে যেয়ে একাধিক বৈঠক করে ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টি অনুমোদন করানো-প্রথম আলোই করেছে।
    ৩। মামলার খরচ জুগিয়েছে তার চাচাতো ভাই, কথাটি মনে হয় ঠিক না। তার চাচাতো ভাই জুয়েলকে প্রশ্ন করলে জানা যাবে প্রথম আলোর ভূমিকা এখানে কি ছিল।

    মূল ব্লগারের জবাব : হইতে পারে। এবং খুবই সম্ভব। মতি ভাইরে যদ্দূর চিনি তাতে এটুকু তিনি করবেনই।


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
    • রাব্বী (৯২-৯৮)

      লাবলু ভাই, আপনার মন্তব্যে অনেকগুলো ব্যাপার স্পষ্ট করে খুব ভাল করেছেন সেজন্য সাধুবাদ জানাই। কারণ আপনি ঘটনাটি যে প্রেক্ষাপট থেকে পর্যবেক্ষন করেছেন, আমাদের অনেকের সে সুযোগ ছিল না এবং নেই। আপনার খোলামেলা আলোচনা আশাকরি আমাদের অস্পষ্টতা দূর করবে।

      আরিফের সাথে যখন কথা হয়েছে, সেও তখন প্রথমআলো নিয়ে তেমন কোনো বিষোদাগার করেনি। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আরিফের বিপদে তাকে বাঁচানো এবং সাহায্য করা প্রথম আলোর দায়িত্বের ভিতরেই পড়ে। আরিফের একটি মামলার রায় এখনো পূর্নবিবেচনাধীন। বিবাদী পক্ষের আইনজীবিও পয়সা ছাড়া কোন কথা বলেন না। আমার প্রশ্ন হলো, যেখানে দেখি সন্ত্রাসীরা দু'আঙ্গুলে বিজয় চিন্হ উঁচিয়ে আদালত থেকে বেইল নিয়ে বেরিয়ে আসে কদিনের ভিতরে, সেখানে আরিফকে বিনাবিচারে কারাভোগ করতে হয় ছয় মাস। তাহলে আসলে সমস্যাটি কোথায়?

      পোস্টের সঙ্গে সহমত পোষণ করে সবার প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি, আসুন আমরা একজন মায়ের পাশে দাঁড়াই। তার বাঁচার লড়াইটাকে সহজ করে দিই। আরিফের মায়ের জন্য শুভকামণা।

      এই কথাগুলোর জন্য নিরন্তর ধন্যবাদ। এটাই পোষ্টের মূল উদ্দেশ্য।


      আমার বন্ধুয়া বিহনে

      জবাব দিন
  3. অসংখ্য অসংখ্য ধন্যবাদ সানা ভাই।
    আমি আসলে ফলো করিনি, আরিফ এবং তৎপরবর্তী ঘটনাগুলোকে। তবে সম্পাদকের ক্ষমা চাওয়ার বা দুঃখ প্রকাশের বিষয়টিই আমাকে বিষিয়ে তুলেছিলো ওঁর বিরুদ্ধে অমন করে ভাবতে। একটি ভীষন আপোষকারী সিদ্ধান্ত মনে হয়েছিলো সেটিকে।আমার ধারণাই ছিলোনা মোল্লারা একটা পত্রিকাকে এভাবে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে,এদের এত ক্ষমতা। পত্রিকা এবং পত্রিকা-পরিবারটিকে বাঁচানোর জন্য এটুকু করাকে আমি সম্পূর্ণ উপলব্ধি করতে পারিনি অজ্ঞতার কারণেই। তবে এটুকু নিশ্চিত বলতে পারি ওঁকে ভিলেন বানাবার যে হুজুগ উঠেছিলো তাতে আমি তখনো মাতিনি, আনন্দও পাইনি।এমনকি এসব যে চলছিলো এটা জানতে পারলাম আপনার জবাবটি পড়ে। রাব্বীর এই লেখাটা পড়ে আরিফের অসহায় ওই অসহায় মুহূর্তগুলোতে এইরকমই একটা ইমেইল করেছিলাম, ঠিক ওঁকে নয়, প্রথম আলোর ই-ঠিকানায়। সেটুকুই। আমিও তো আর খোঁজ রাখিনি কি হয়েছে, কি চলেছে। সে বিচারে আমার উষ্মাটুকু ঢালাও, সন্দেহ নেই।
    তবে এই যে আপনি জানালেন, উনি কি কি করেছেন সেই পরিস্থিতিতিতে একজন মানুষ হিসেবেই, সেটুকুই আমার জন্যে অনেক।সেটুকুই জানবার ছিলো।
    আরেকটি অসম্মানজনক বিশেষণ আমি প্রয়োগ করেছি ওঁর সম্পর্কে। সেটিও যে খুব ভেবেচিন্তে করা তা কিন্তু নয় সানাভাই। নানান কথাবার্তা যা বাতাসে ভাসছিলো তখনকার রাজনৈতিক ডামাডোলে সেসব থেকেই উদ্ভুত।সেটার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিলাম এইক্ষণে। তাছাড়া সেসব দিকে এ আলোচনা টেনে নেবার কোন যুক্তিই নেই।

    ওইরকম পরিস্থিতিতে যখন প্রথম আলোর পাশে তার নিরব সমর্থক পাঠকরা ছাড়া আর কেউ নেই তখন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মতো জায়গায় গিয়ে খতিবের সঙ্গে সমঝোতা করতেও সাহস লাগে।

    খাঁটি কথা।

    এই পোস্ট টা আসলে অন্য উদ্দেশ্যে দেয়া। জানিনা এখানে এই প্রসংগ উত্থাপন করে কোন অনভিপ্রেত আচরণ করলাম কি না। আশা করছি আমরা সবাই আরিফের মায়ের সুচিকিৎসার জন্যে এগিয়ে আসবো।
    ভালো থাকবেন সানা ভাই।
    :salute:

    জবাব দিন
    • নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

      সংযোজন/পরিমার্জন:

      রাব্বীর এই লেখাটা পড়ে আরিফের অসহায় ওই অসহায় মুহূর্তগুলোতে এইরকমই একটা ইমেইল করেছিলাম, ঠিক ওঁকে নয়, প্রথম আলোর ই-ঠিকানায়।

      রাব্বীর এই লেখাটা পড়ে, আরিফের অসহায় ওই অসহায় মুহূর্তগুলোতে এইরকমই একটা ইমেইল যে করেছিলাম, ঠিক ওঁকে নয়, প্রথম আলোর ই-ঠিকানায়, সেটা মনে পড়ে গেলো।

      জবাব দিন
    • রাব্বী (৯২-৯৮)

      নূপুর'দা, মোটেই অনভিপ্রেত কিছু বলেননি।

      আশা করছি আমরা সবাই আরিফের মায়ের সুচিকিৎসার জন্যে এগিয়ে আসবো।

      এটাই মূল আবেদন। আসুন আরিফের এবং তার মায়ের পাশে দাড়াই আমরা।


      আমার বন্ধুয়া বিহনে

      জবাব দিন
  4. ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

    আরিফের কার্টুনটা দেখে মনে হচ্ছে ছেলের এই লাইনে ভালো মেধা আছে। দেশে কাউকে বলতে হবে ওর একটা কার্টুন ্কেনার কথা।
    ধন্যবাদ পোষ্টের জন্য। পারিপার্শ্বিক আরো কিছু জানলাম।


    “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
    ― Mahatma Gandhi

    জবাব দিন
    • রাব্বী (৯২-৯৮)

      ধন্যবাদ শান্তা আপা।

      কার্টুন সেল শেষ হয়ে গিয়ে থাকলে কিশোর আহমেদের সাথে যোগাগোগ করে আরিফকে সহায়তা করা যাবে:
      kishorelovesall@gmail.com অথবা kishorctoon@yahoo.com
      ফোন নম্বর: +8802-01819186724

      আরিফের ইমেইল ঠিকানা: cartoonist_arif@yahoo.com


      আমার বন্ধুয়া বিহনে

      জবাব দিন
  5. আমাদের বাংলাদেশে কি হচ্ছে জানি না। শুধু এটুকু সেই সময় বুঝেছিলাম যে বাংলাদেশে ধর্ম নিরপেক্ষতা আসলে কোনদিন আসবে না। আরিফ যে কার্টুন ছাপায়, ওটা আসলে অনেক আগের একটা কার্টুন, যা আমরা ছোট বেলায় হাট থেকে কিনে পরতাম। ২টাকা করে ছিল নিউজ প্রিন্টের ছাপা সেই বই গুলো।নাম ছিলো যত হাসি তত কৌতুক অথবা এই রকম কিছু। পার্থক্য একটাই, তা হলো ওখানে বিড়ালের বদলে টাকি ব্যবহার করা হয়েছে। আর প্রশ্নটা ছিল তুই কি মাছ ধরিস।

    যাক সেটা ছিল একনায়ক এরশাদের সময়। আজ নাকি দেশে গনতন্ত্র আছে। হা আমরা গনতন্ত্রের ভালই সুফল পাচ্ছি।

    সবশেসে পেজ অ্যাডমিন কে ধন্যবাদ। কারন নিজের কিছু মতামত আমি লিখব এই জিনিস নিয়ে বলে অনেক খুজেও আমন কোন লেখা পাইনি যেখানে মতামত টা প্রকাশ করা যায়।
    অনতিবিলম্বে আদালত কে ভুল সিকার করার আহবান জানাচ্ছি ( যদিও সেটা করবে না)

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।